📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবৃওয়াত-পরবর্তী জনসেবা

📄 নবৃওয়াত-পরবর্তী জনসেবা


বিশ্ব মানবতার পরিপূর্ণ আদর্শ রাসূলে কারীম (স) ছিলেন জনসেবা ও মানব কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। এই ময়দানে তাঁহার অবদান অনবদ্য। জনমানুষকে তিনি গভীরভাবে ভালবাসিতেন, সকল অবস্থায় তাহাদের পার্শ্বে থাকিতেন, সুখে-দুঃখে তাহাদের অংশীদার হইতেন, তাহাদেরকে আপন করিয়া লইতেন, উহার নজীর মানবেতিহাসে শুধু বিরলই নহে, বরং অনুপস্থিত। নবুওয়াত সূর্যের প্রভাত কাল হইতে সুদীর্ঘ তেইশটি বৎসর তিনি বিরামহীনভাবে মানব কল্যাণের কাজ করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার জনসেবা ও সমাজকল্যাণ-মূলক কর্মের পরিধি অতি ব্যাপক ও বিস্তৃত। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য হিতকর এমন সকল প্রকার কর্মই এই সূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আলোচনার সুবিধার্থে রাসূলে কারীম (স)-এর জনসেবামূলক কর্ম অবদানসমূহকে কতিপয় উপ-শিরোনামের অধীনে পেশ করা হইল :
১. দুস্থ-অসহায় মানুষের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।
২. দুস্থ-অভাবীদের খাদ্য-বস্ত্রের ব্যবস্থা।
৩. বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
৪. দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।
৫. জনমানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ।
৬. দুর্যোগকালীন সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান।
৭. জনসেবামূলক কাজে স্বেচ্ছাশ্রম দান।
৮. দুস্থ ও অসহায়দের জন্য আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা।
৯. কর্যে হাসানার প্রবর্তন।
১০. রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ইয়াতীম, অসহায় ও বিকলাঙ্গ প্রতিবন্ধী প্রতিপালন।
১১. দুস্থ অসহায় ও গরীবদের সেবার জন্য জমি ও বাগান বরাদ্দ দান।
(এক) দুস্থ-অসহায় মানুষের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান আর্ত-পীড়িত মানুষের সেবার প্রতি রাসূলে কারীম (স) সবিশেষ গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। তিনি বলেন, তোমরা রোগীর সেবা কর (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৪৩)। সাহাবী বারাআ (রা) বলেন, আমাদেরকে আল্লাহর রাসূল (স) সাতটি বিষয়ে বিশেষভাবে আদেশ করিয়াছেন। উহার মধ্যে একটি হইল, আমরা যেন রোগীর সেবা-শুশ্রূষা করি (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৪৩)। অসুস্থ ব্যক্তি যে-ই হউক, রাসূলে করীম (স) তাহার সেবায় আগাইয়া যাইতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি ধনী গরীব, মুসলিম-অমুসলিম, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য করিতেন না। মদীনায় বসবাসকারী এক ইয়াহুদীর কিশোর ছেলের অসুস্থতার সংবাদ পাইয়া রাসূলে করীম (স) তাহার খোঁজ-খবর লওয়ার জন্য তাহাদের বাড়ীতে গমন করেন (রিয়াদুস সালিহীন, পৃ. ৩৮০-৩৮১)।
হযরত জাবির (রা) বলেন, একবার আমি ভীষণভাবে অসুস্থ হইয়া পড়িলাম। তখন রাসূলে করীম (স) ও আবূ বকর (রা) পায়ে হাঁটিয়া আমার খোঁজ-খবর লওয়ার জন্য আসিলেন। তাঁহারা আমাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) উযূ করিয়া আমার শরীরে পানি ছিটাইয়া দিলে আমি সংজ্ঞাপ্রাপ্ত হই (সহীহুল বুখারী; ১খ., পৃ. ৩২)।
হযরত সা'দ (রা) বলেন, আমি মক্কায় ভীষণ অসুস্থ হইয়া পড়িলে রাসূলে কারীম (স) আমার রোগের খোঁজ-খবর নিলেন এবং আমার সেবা করেন (রিয়াদুস সালিহীন, পৃ. ৩৮১)।
অসুস্থের সেবাকে রাসূলে কারীম (স) মুমিনের অন্যতম দায়িত্বরূপে স্থির করিয়াছেন। তাঁহার দৃষ্টিতে একজন মানুষের অপর মানুষের নিকট সেবা-শুশ্রূষা পাওয়ার অধিকার ধর্মের পরিচয়ে নহে, মানুষ হওয়ার পরিচয়ে। আর্ত-পীড়িতের সেবায় রাসূলে কারীম (স)-এর অনুসৃত নীতিতে তাঁহার "রহমাতুল্লিল আলামীন" গুণেরই রূপায়ন পাওয়া যায়।
রাসূলে কারীম (স) যুদ্ধাহত মুজাহিদদের চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষার জন্য খন্দক যুদ্ধে নির্মিত মসজিদে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প বা হাসপাতাল স্থাপন করিয়াছিলেন (সহীহুল বুখারী, বাবুল খিদমাতি ফিল-মাসাজিদি লিল-মারদা, ১খ., পৃ. ৬৬)। মদীনার সাধারণ জনতার জন্যও রাসূলে কারীম (স) চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। খন্দক যুদ্ধে নির্মিত মসজিদে তাঁবু খাটাইয়া দুইজন চিকিৎসক মদীনাবাসীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করিত। রাসূলে কারীম (স) তাহাদের ভাতা প্রদান করিতেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৫খ., পৃ. ৪৪৬)।
রাসূলে কারীম (স) যখন কাহারও অসুস্থতার সংবাদ শুনিতেন তখন তাহার খোঁজ-খবর লওয়ার জন্য তাহার বাড়ীতে গমন করিতেন। তিনি রোগীর কপালে হাত রাখিয়া তাহাকে মান্ত্বনা দিতেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিতেন। তিনি রোগীর পসন্দের খাবারের কথা জিজ্ঞাসা করিতেন এবং তাহা যোগান দানের চেষ্টা করিতেন (মিশকাত, পৃ. ১৩৮)।
(দুই) দুঃস্থ অভাবীদের খাদ্য-বস্ত্রের ব্যবস্থা রাসূলে কারীম (স) মানুষকে সর্বাধিক ভালবাসিতেন। তিনি গোটা মানব সমাজকে পারস্পরিক প্রেম-ভালবাসা, দয়া-মায়া ও মমতার দিক হইতে একটি দেহের সমতুল্য বিবেচনা করিতেন। দেহের একটি অঙ্গে ব্যথা অনুভূত হইলে যেমন গোটা দেহই অসুস্থ হইয়া পড়ে তদ্রূপ সমাজের একজন মানুষও যদি অভুক্ত থাকে, খাদ্য বস্ত্রের অভাবে ক্লিষ্ট হয় তাহা হইলে সে সমাজ সত্যিকার অর্থে মনুষ্য সমাজ হইতে পারে না।
রাসূলে কারীম (স)-এর এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মৌলিক বুনিয়াদ। তিনি তাঁহার এই অনুপম শিক্ষার উপর মদীনার সমাজ গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। ফলে মানব সেবায় মদীনার আনসার সাহাবীদের আত্মত্যাগ এখনও নজীরবিহীন ইতিহাস হইয়া রহিয়াছে। মক্কা ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মুসলিমগণ যখন হিজরত করিয়া মদীনায় গমন করেন, তখন মদীনার আনসারগণ সার্বিকভাবে মুহাজির ভাইদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থাপনার মহান খিদমত আঞ্জাম দেন। তাহাদের এই বিস্ময়কর ত্যাগের কথা আল-কুরআনে এইভাবে চিত্রিত হইয়াছে:
وَالَّذِينَ تَبَوَّلُ الدَّارَ وَالْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"আর তাহাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যাহারা (আনসারগণ) এই নগরীতে বসবাস করিয়াছে ও ঈমান আনিয়াছে তাহারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যাহা দেওয়া হইয়াছে তাহার জন্য তাহারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না, আর তাহারা মুহাজিরদেরকে প্রধান্য দেয় নিজেদের উপর, নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও। যাহারা কার্পণ্য হইতে নিজেদেরকে মুক্ত রাখিয়াছে তাহারাই সফলকাম" (৫৯: ৯)।
রাসূলে কারীম (স) মসজিদে নববীর পার্শ্ববর্তী একটি স্থানে পরিজনহারা, সহায়-সম্বলহীন মানুষের পানাহার ও বসবাসের জন্য একটি ছাউনী প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন যাহা "সুফফা" নামে খ্যাত। আশ্রয়হীন লোকজন এখানে আশ্রয় লইত। রাসূলুল্লাহ (স) নিজ তত্ত্বাবধানে তাহাদের সকলের খাদ্য-বস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনের বন্দোবস্ত করিতেন। তিনি আশ্রিতদের স্মরণ করিতেন আদ'য়াফুল ইসলাম-ইসলামের মেহমান নামে। রাসূলে কারীম (স) এই আসহাবুস-সুফফার সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলেন। তাহাদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়াপ্রবণ ও স্নেহশীল। নিজের ও নিজ পরিবারের চাহিদার উপর তিনি সর্বদা আসহাবুস-সুফফাকে প্রাধান্য দিতেন।
একদা হযরত 'আলী ও ফাতিমা (রা) তাঁহার নিকট একটি বাঁদী চাহিলেন। তিনি উত্তরে আসহাবুস-সুফফার অন্নাভাবের কথা উল্লেখ করিয়া বাদী দিতে অপারগতা প্রকাশ করিলেন (সীরাত বিশ্বকোষ, ৫খ., পৃ. ৪৮৫)।
রাসূলে কারীম (স) নিজ দস্তরখানে বসাইয়া সুফ্ফার আশ্রিতদের খাবার খাওয়াইতেন এবং বায়তুল মাল হইতেও তাহাদের যথাসম্ভব সহায়তা করিতেন। এই সুফফার আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিতদের সংখ্যা কখনও কখনও চারি শতাধিক পর্যন্ত পৌঁছিয়া যাইত (সীরাত বিশ্বকোষ, ৫খ., পৃ. ৪৮৩)।
রাসূলে কারীম (স) নিজ পরিবার ও গৃহবাসীদেরকেও এই মর্মে নির্দেশ দিয়াছিলেন যে, কোন অভাবগ্রস্ত লোক যেন নবীরগৃহ হইতে খালি হাতে ফিরিয়া না যায়। এমনকি আধা টুকরা খেজুর হইলেও যেন তাহাকে দেওয়া হয় (রিয়াদুস সালিহীন, পৃ. ২৫৯)।
রাসূলে কারীম (স)-এর আদর্শে যাকাত প্রবর্তনের মৌলিক উদ্দেশ্যও অভাবগ্রস্তদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান সমস্যার সমাধান করা। তিনি বিত্তশালীদের নিকট হইতে যাকাত গ্রহণ করিয়া বিত্তহীনদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিতেন (দ্র. ৯ ১০৩)। জনসেবা ও মানব কল্যাণের জন্য তিনি বিত্তশালীদেরকে যাকাত ব্যতীত অতিরিক্ত দান-খয়রাতেরও নির্দেশ দিয়াছেন। তাঁহার মতে প্রত্যেক জনপদের বিত্তশালীদের উপর সেই অঞ্চলের নিঃস্ব অভাবীদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের দায়িত্ব গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য। যাহারা এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করিবে তাহাদের প্রতি ইহ-পরকালীন শাস্তির হুঁশিয়ারিও উচ্চারিত হইয়াছে তাঁহার বাণীতে (দ্র. ৩: ১৮০, ৯: ৩৪-৩৫, ১০৭: ১-৩)।
হযরত মিকদাদ (রা) বলেন, আমি এবং আমার দুইজন সাথী এত দরিদ্র ছিলাম যে, অভুক্ত থাকিতে থাকিতে আমাদের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হইয়া গেল। আমাদের সাহায্যের জন্য অনেকের নিকট আবেদন করিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর আমরা রাসূলে কারীম (স)-এর খিদমতে হাজির হইলাম। তিনি আমাদের দুরাবস্থা দেখিয়া আমাদেরকে তাঁহার বাড়ীতে লইয়া গেলেন এবং তিনটি বকরী দেখাইয়া বলিলেন, এই তিনটি বকরী দোহন করিয়া তিনজনে পান করিতে থাক। এই তিনটি বকরির দুধ পান করিয়াই আমাদের তিনজনের দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল।
একবার একটি গোত্রের কিছু মুসাফির রাসূলে কারীম (স)-এর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসে। তাহাদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। ছিন্ন-জীর্ণ বস্ত্র পরিহিত লোকগুলি ছিল প্রায় অর্ধ-নগ্ন। কাহারও পায়ে জুতা ছিল না। চামড়ার সাথে লাগিয়া গিয়াছিল তাহাদের শরীরের হাড়-মাংস। তাহাদের এই করুণ অবস্থা দেখিয়া রাসূলে করীম (স)-এর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হইয়া গেল। তিনি অস্বাভাবিক উদ্বেগে কাতর হইয়া পড়িলেন। গৃহে তালাশ করিয়া কিছু না পাইয়া তিনি বিলাল (রা)-কে আযান দিতে বলিলেন। লোকজন সমবেত হইলে নামাযান্তে তিনি ভাষণ দিলেন এবং সকলকে এই দুর্গত মানুষের সাহায্যের জন্য আহ্বান করিলেন। এইভাবে তিনি দুর্গত মানুষের খাদ্য-বস্ত্রের ব্যবস্থা করিলেন (হযরত মুহাম্মদ (স), জীবনী বিশ্বকোষ, পৃ. ৬০)।
(তিন) বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ
বেকার কর্মহীন জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থান ও কর্ম যোগানের ক্ষেত্রেও রাসূলে কারীম (স) অনুপম আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন। অনাবিল দরদ লইয়া তিনি সমাজের ভিক্ষুক শ্রেণীকে ভিক্ষাবৃত্তি হইতে নিবৃত্ত করিয়া কর্মমুখী করার প্রচেষ্টা চালাইয়াছেন। প্রাক-নবৃওয়াত কাল হইতেই তিনি এই ক্ষেত্রে অবদান রাখিতে শুরু করেন। তিনি সমাজের প্রত্যেক কর্মক্ষম ব্যক্তিকে জীবিকা উপার্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন। তিনি বলেন, দাতার হাত গ্রহীতার হাত হইতে উত্তম (রিয়াদুস সালিহীন, পৃ. ২৫২)।
একদা একজন বেকার কর্মহীন আনসারী সাহাবী রাসূলুল্লাহর (স)-এর নিকট সাহায্য চাহিল। তখন তিনি তাহার একটি বস্তু নিলামে বিক্রয় করিয়া উহার দ্বারা উপার্জনের পরামর্শ দিলেন এবং তাহাকে বলিয়া দিলেন, তুমি ভিক্ষা করিয়া বেড়াও এবং কিয়ামত দিবসে অপমানিত হও উহার চাইতে ইহা অনেক ভাল (মিশকাত, পৃ. ১৬৩)। অপর বর্ণনায় আসিয়াছে, তিনি একটি কুড়াল কিনিয়া স্বয়ং উহাতে হাতল লাগাইয়া সাহাবীর হাতে তুলিয়া দেন এবং তাহাকে বলিয়া দেন, যাও, বন হইতে কাঠ সংগ্রহ কর এবং উহা বাজারে বিক্রয় করিয়া জীবিকা নির্বাহ কর। এইভাবে তিনি ঐ সাহাবীকে কেবল স্বাবলম্বী হওয়ার পথই দেখান নাই, তাহাকে মর্যাদার পথও দেখাইয়া দিয়াছেন। ভিক্ষুকের হাতকে তিনি কর্মীর হাতে পরিবর্তন করিয়াছেন (মিশকাত, পৃ. ১৬৩)।
রাসূলে কারীম (স) কর্মক্ষম মানুষকে কর্মের সুযোগ করিয়া দেওয়া, অনুরূপ কর্ম করিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে কোন শিল্পকর্মের প্রশিক্ষণ দেওয়াকে সাদাকারূপে বিবেচনা করিয়াছেন। তিনি সাহাবীগণকে এই সেবায় আগাইয়া আসার আহ্বান জানাইয়াছেন (মিশকাত, পৃ. ১৬১)।
(চার) দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন
রাসূলে কারীম (স)-এর আবির্ভাবকালে আরব সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল চরম আকারে। অধিক সংখ্যক মানুষ অর্ধাহারে, অনাহারে ও দুঃখ-কষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করিত। ইয়াহুদীরা উচ্চহারে সূদে অর্থকড়ি ধার দিত। তাহাদের অনুকরণে বিত্তশালী আরবদের
মধ্যেও সূদী কারবার শিকড় গাড়িয়া বসিয়াছিল। সূদের নিষ্পেষণে অসহায় বিত্তহীন জনগোষ্ঠী এই পরিস্থিতিতে রাসূলে কারীম (স) মানব কল্যাণে অভাবী জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে জনসমাজে সর্ববিধ অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত হয় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সুখী সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে গরীব-দুঃখী, অভাবী জনগোষ্ঠীর সেবায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর কতক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন :
(ক) বিত্তশালীদের সম্পদে যাকাত প্রবর্তন।
(খ) যাকাত ছাড়াও অতিরিক্ত সাদাকা ও দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান।
(গ) বায়তুল মাল হইতে করযে হাসানা প্রদান।
(ঘ) বিত্তশালীদেরকে করযে হাসানা প্রদানে উৎসাহ দান।
(ঙ) সূদী কারবার নিষিদ্ধকরণ।
(চ) যাকাত ছাড়াও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কর হইতে গরীব ও অভাবী জনগোষ্ঠীর জন্য অংশ নির্ধারণ।
(ছ) গরীব, নিরাশ্রয়, বেকার, বিকলাঙ্গ ও মুসাফির জনগণকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান।
(জ) ইয়াতীম ও পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের প্রতিপালন।
(ঝ) দরিদ্র মানুষের অভাব বিমোচনের জন্য রাসূলে কারীম (স) রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে দেশের নাগরিকদের জন্য নিম্নবর্ণিত সুবিধা প্রদানের নিশ্চয়তা দান করিয়াছিলেন। যথা : ১. প্রত্যেকের জন্য খাদ্য ২. বস্ত্র ৩. বাসস্থান ৪. চিকিৎসা সুবিধা ও ৫. বিবাহের ব্যবস্থা
ইহার ফলে ক্রমশ দারিদ্র্য দূরীভূত হইতে থাকে। পরবর্তী সময়ে খলীফা 'উমার ইব্‌ন আবদুল 'আযীযের সময়কালে যাকাত গ্রহণের মত কোন দরিদ্র লোক খুঁজিয়া পাওয়া কষ্টকর ছিল।
(ঞ) জনকল্যাণমুখী অর্থ ব্যবস্থা প্রবর্তন: ইহার মধ্যে সূদী লেনদেন নিষিদ্ধকরণ, করযে হাসানাহ প্রবর্তন, যাকাত আবশ্যকীয়, তাকাফুল তথা পারস্পরিক পৃষ্ঠপোষকতামূলক ইসলামী বীমা ব্যবস্থা চালুকরণ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এই সবই মূলত গরীব শ্রেণীর কল্যাণে।
(পাঁচ) জনমানুষের জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ রাসূলে কারীম (স) জনমানুষের জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বহুমুখী কার্যক্রম আঞ্জাম দিয়াছিলেন। যথাঃ
(ক) রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ।
(খ) যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
(গ) গোসল করিয়া সুগন্ধি ব্যবহার পূর্বক জনসমাবেশে গমনের নির্দেশ।
(ঘ) কাঁচা পেয়াজ ও রসুন এবং এই জাতীয় দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু আহার পূর্বক জনসমাবেশে গমন নিষিদ্ধকরণ।
(ঙ) পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে গাছপালা রোপণে উৎসাহ প্রদান।
(চ) খাবার পানির সুবন্দোবস্ত করিতে উৎসাহ প্রদান।
একবার তাঁহার একজন সাহাবী বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার আম্মা ইন্তিকাল করিয়াছেন। তাঁহার আত্মার কল্যাণের জন্য আমি কী উত্তম দান-খয়রাত করিতে পারি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহার জন্য একটি কূপ খনন কর এবং পিপাসার্তকে পানি বিলাইয়া দাও।
(ছয়) দুর্যোগকালীন সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান
একটি সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বসবাস করে। প্রত্যেকেই জীবনের কোন না কোন মুহূর্তে নানাবিধ প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়, দুর্যোগ ও বিপদাপদের ঝাপ্টায় আক্রান্ত হয়। এই সময়ে মানুষ অপরের সেবা ও সাহায্য-সহানুভূতির তীব্র প্রয়োজন অনুভব করে। রাসূলে কারীম (স) মানুষের এইরূপ দুর্যোগ মুহূর্তে ধর্ম-বর্ণ ও জাতীয়তার ঊর্ধ্বে উঠিয়া সকলের সেবা ও সহযোগিতায় ঝাপাইয়া পড়িতেন। এমনকি শত্রুপক্ষের বিপদকালীন সময়েও তাহাদের প্রতি সেবা ও সাহায্যের হাত বাড়াইয়া দিতেন। হিজরতের ৫ম বা ৬ষ্ঠ বৎসর মক্কায় চরমাকারে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। মক্কার কুরায়শরা ছিল ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রাণের শত্রু। তাহাদের সহিত ইতোমধ্যে বদর, উহুদ ও খন্দকের মত ভয়াবহ তিনটি যুদ্ধও সংঘটিত হইয়া গিয়াছে। উপরন্তু মক্কাবাসিগণ যে কোন সুযোগে ইসলাম ও মদীনা রাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়ার অপেক্ষায় দিনাতিপাত করিতেছিল। এহেন মুহূর্তে শত্রুর দুর্দশা দেখিয়া মানুষ যেখানে অট্টহাসিতে ফাটিয়া পড়ে, সেখানে রাসূলে কারীম (স) মক্কার দুর্ভিক্ষের সংবাদে খুবই মর্মাহত হইলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি দুর্ভিক্ষ পীড়িত মক্কাবাসীদের জন্য পাঁচ শত দিরহামের ত্রাণ সাহায্য কুরায়শ সর্দার আবূ সুফ্যানের নিকট প্রেরণ করিলেন। তৎকালে ইহা একটি মোটা অংকের অর্থ হিসাবেই বিবেচিত ছিল। মক্কাবাসীর এই দুর্যোগে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করিয়া তিনি আবূ সুফ্যানের নিকট একটি পত্রও প্রেরণ করিলেন। উহাতে লিখিয়া দিলেন, 'এই মুদ্রাগুলি অসহায় গরীব মানুষের সাহায্যের জন্য প্রেরিত হইল' (ড. হামীদুল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা কৌশল শীর্ষক নিবন্ধ; সীরাত স্মারক, জাতীয় সীরাত কমিটি, ১৪২২ হি.)।
কাহারও কোন দুর্ঘটনা বা মসীবতের কথা শুনিলে রাসূলে কারীম (স) তাহার প্রতি সহমর্মিতা ও সমবেদনা প্রকাশ করার জন্য তাহার আবাসস্থলে গমন করিতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম-অমুসলিম শত্রু-মিত্রের মধ্যে কোন পার্থক্য করিতেন না। কেহ ইন্তিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার জানাযায় শরীক হইতেন এবং শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতেন (সহীহুল বুখারী, কিতাবুল জানাইয)।
(সাত) জনসেবামূলক কাজে স্বেচ্ছাশ্রম দান
রাসূলে কারীম (স) জনসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অবতীর্ণ হইতেন। সাহাবাদের কোন কাজে তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে নিজেকে নিয়োগ করিতে মোটেও সংকোচ বোধ করিতেন না। হিজরতের পর মসজিদে নববী নির্মাণকালে তিনি ইট তৈরীর কাজে অংশগ্রহণ করেন এবং সাহাবীদের সহিত ইট বহন করেন (সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ., পৃ. ৪২৭)।
একবার তিনি মসজিদের দেওয়ালে থু থু দেখিতে পাইলেন। তখন তিনি স্বহস্তে উহা পরিষ্কার করিলেন এবং বলিলেন, তোমাদের কাহারও এইভাবে থু থু ফেলা উচিৎ নহে (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ২২৭)।
মদীনার সমাজে কাহারও কোন সমস্যা দেখা দিলে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাহাদের সমস্যার কথা জানাইত। রাসূলে কারীম (স) যথাসাধ্য তাহাদের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করিতেন। এই কাজটি তিনি নিজে করিতেন। একবার হযরত জাবির (রা) তাঁহার ঋণের সমস্যা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিলে তৎক্ষণাৎ তিনি তাহার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করিলেন (সহীহুল বুখারী, কিতাবুস সালাত)।
এক সফরে সাহাবীগণ একটি বকরী যবেহ করেন এবং রান্নাবান্নার কাজ পরস্পরের মধ্যে বণ্টন করিয়া লন। রাসূলে কারীম (স) বলিলেন, বন হইতে কাঠ আমি আনিব। তাঁহারা বলিলেন; ইহা হইতেই পারে না। আপনি আরাম করুন, আমরা সকল ব্যবস্থা করিতেছি। কিন্তু তিনি তাহাদের আবদার রাখিলেন না।
একদা সালাত আদায়ের জামা'আত প্রস্তুত ছিল। ইত্যবসরে এক বেদুঈন আসিয়া তাঁহার জামার আঁচল ধরিয়া বলিতে লাগিল, আমার সামান্য কাজ বাকী রহিয়া গিয়াছে। এমন না হউক যে, আমি তাহা ভুলিয়া যাই, তাই প্রথমে আপনি তাহা করিয়া দিন। রাসূলে কারীম (স) বিনা দ্বিধায় তাহার সহিত চলিয়া গেলেন এবং প্রথমে তাহার কাজ করিয়া দিলেন, অতঃপর সালাত আদায় করিলেন।
রাসূল কারীম (স)-এর সাহাবী হযরত খাব্বাব (রা) কোন এক যুদ্ধে গিয়াছিলেন। তাঁহার গৃহে তিনি ব্যতীত কোন পুরুষ ছিল না। অথচ মহিলাগণ দুধ দোহনও করিতে পারিতেছিল না। এমতাবস্থায় খাব্বাব (রা) ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) প্রতিদিন তাঁহার গৃহে যাইতেন এবং তাঁহার পরিবারের জন্য দুধ দোহন করিয়া দিয়া আসিতেন। মোটকথা জনসেবা ও মানবকল্যাণের মহান আদর্শ রাসূলে কারীম (স) জনগণের কল্যাণে স্বেচ্ছাশ্রমে অবতীর্ণ হইতেন এবং সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণ করিতেন। তিনি স্বচ্ছন্দে অন্যের কাজ করিয়া দিতেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পরিবার-পরিজনদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা

📄 পরিবার-পরিজনদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুসতাফা (স)-এর পারিবারিক জীবন ছিল খুবই শান্তিময় ও ভারসাম্যপূর্ণ। পরিবার-পরিজনদের প্রতি তাঁহার ভালবাসা ছিল অত্যন্ত সুগভীর। তাঁহার প্রথম স্ত্রী উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)-এর সঙ্গে তাঁহার ভালবাসা ছিল সীমাহীন। তাঁহাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় নবী করীম (স)-এর বয়স ছিল পঁচিশ এবং হযরত খাদীজা (রা)-এর বয়স ছিল চল্লিশ বৎসর। বিবাহের পর হযরত খাদীজা (রা) পঁচিশ বৎসর জীবিত ছিলেন। তাঁহার জীবদ্দশায় রাসূলুল্লাহ্ (স) আর কোন বিবাহ করেন নাই। তাঁহাদের দুইজনের মধ্যকার ভালবাসার গভীরতা এত বেশী ছিল যে, হযরত খাদীজা (রা)-এর ইন্তিকালের পর বাড়িতে যখনই কোন পশু যবেহ করা হইত তখনই রাসূলুল্লাহ্ (স) খুঁজিয়া খুঁজিয়া হযরত খাদীজা (রা)-র বান্ধবিগণের বাড়িতে হাদিয়াস্বরূপ সেই গোশতের অংশ পাঠাইতেন (সহীহ মুসলিম-৭খ., পৃ. ১৩৪)।
হযরত খাদীজা (রা)-র ইন্তিকালের পর তাঁহার বোন 'হালা' নবী করীম (স)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করিতে আসিয়া নিয়মানুযায়ী গৃহে প্রবেশ করার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন।¹ তাহার কন্ঠস্বরের সঙ্গে খাদীজা (রা)-এর কন্ঠস্বরের এত মিল ছিল যে, নবী করীম (স)-এর কানে সেই স্বর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার অন্তরে হযরত খাদীজা (রা)-এর স্মৃতি জাগিয়া উঠিল। তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, "হয়ত হালা হইবে।" ঐ সময় উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) সেইখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করিতে পারিলেন না। তিনি বলিলেন, 'আপনার কী হইয়াছে? একজন বৃদ্ধা, তাও আবার মৃতা, তাঁহার কথা সব সময় আপনার মনে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে তাঁহার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করিয়াছেন”। সহীহ বুখারীতে এই পর্যন্ত বর্ণনা করা হইয়াছে। কিন্তু ইসতী'আব-এ বর্ণিত আছে যে, ইহার উত্তরে নবী করীম (স) বলিলেন, "কখনও না, হে 'আইশা! যখন মানুষ আমাকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল তখন খাদীজাই আমাকে সত্যবাদী বলিয়া মানিয়া লইয়াছিল; মানুষ যখন কাফির ছিল তখন খাদীজাই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। যখন আমার কোন সাহায্যকারী ছিল না তখন খাদীজাই আমাকে সাহায্য করিয়াছিল" (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৯)।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, যদিও আমি হযরত খাদীজা (রা)-কে কখনও দেখি নাই, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তাঁহার প্রতি আমার যতটুকু হিংসা হইত আর কাহারও প্রতি তাহা হইত না। কেননা রাসূলুল্লাহ্ (স) সর্বক্ষণ তাঁহার কথা আলোচনা করিতেন। হযরত 'আইশা (রা) আরও বলিয়াছেন, আমি একবার হযরত খাদীজা (রা) প্রসঙ্গ লইয়া নবী করীম (স)-এর মনে কষ্ট দিয়াছিলাম। অতঃপর তিনি বলিলেন, আল্লাহ তা'আলাই আমার অন্তরে তাহার প্রতি গভীর ভালবাসা সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন (সহীহ মুসলিম, ফাযায়েলে খাদীজা, বরাতে আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৯)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) কখনও একই রাত্রিতে সকল সহধর্মিনীর ঘরে যাতায়াত করিতেন। তিনি সহধর্মিনিগণের সঙ্গে অবস্থানের জন্য পালা নির্ধারণ করিয়া দিয়াছিলেন। তিনি রাত্রিসমূহ এবং খোরপোষ জীবন-সঙ্গিনিগণের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু তবুও তাঁহার মনের টান সকলের প্রতি সমান ছিল এমন কথাও নিঃসন্দেহে বলা যায় না। তাই তিনি সর্বদা বলিতেন, "হে আল্লাহ! আমার আয়ত্তাধীন যাহা আছে তাহাতে আমি সমতা রক্ষা করিয়াছি, আর আমার আয়ত্ত বহির্ভূত যাহা আছে তাহাতে তুমি আমাকে অভিযুক্ত করিও না" (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৪)।
নবী করীম (স)-এর সঙ্গে উম্মাহাতুল মু'মিনীন বা তাঁহার সহধর্মিনিগণের আচার-আচরণ ছিল অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ। তাঁহাদের সঙ্গে তিনি সদাসর্বদা মধুর আচরণ করিতেন। তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর নিকট আনসার বালিকাদেরকে যাতায়াত করিতে দিতেন যাহাতে তাহারা তাঁহার সঙ্গে খেলা-ধুলা করিতে পারে। তাঁহার সহধর্মিনিগণ যখন কোন জিনিসপত্রের আকাঙ্ক্ষা করিতেন এবং তাহা যদি শরীয়তসম্মত হইত তবে তিনি যথাসাধ্য তাহা পূর্ণ করিতেন। হযরত 'আইশা (রা)-কে তিনি অত্যন্ত ভালবাসিতেন। তিনি যখন পানি পান করিতেন তখন নবী করীম (স) পানপাত্রের ঐ স্থানে ওষ্ঠদ্বয় লাগাইতেন যেই স্থানে 'আইশা (রা)-এর ওষ্ঠদ্বয় স্পর্শ করিত। হযরত 'আইশা (রা) যদি কোন হাড় হইতে গোশত খসাইয়া খাইতেন, তবে তিনি সেই হাড়ের ঐ স্থানটি চুষিতেন, যেই স্থানে 'আইশা (রা)-এর মুখ লাগিত। তিনি অনেক সময় হযরত 'আইশা (রা)-এর কোলে তাঁহার মাথা রাখিয়া বিশ্রাম করিতেন। তাঁহার কোলে মাথা রাখিয়া তিনি মাঝে মাঝে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করিতেন। কখনও বা হযরত 'আইশা (রা) ঋতুবতী অবস্থায় থাকিতেন, অথচ নবী করীম (স) তাঁহার কোলে মাথা রাখিয়া কুরআন করীম তিলাওয়াত করিতেন (আসাহ্হুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৪-৬৫)।
একবার মসজিদে নববীতে কতিপয় হাবশী লাঠিয়াল লাঠিখেলা দেখাইতেছিল। নবী করীম (স) স্বয়ং হযরত 'আইশা (রা)-কে দীর্ঘক্ষণ সেই খেলা দেখান। তিনি নবী করীম (স)-এর কাঁধে তাঁহার চিবুক রাখিয়া উহা উপভোগ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অভ্যাস ছিল যে, প্রতিদিন আসরের নামায আদায় করার পর উম্মাহাতুল মুমিনীনের গৃহে যাইতেন এবং তাঁহাদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিতেন। তবে রাত্রিকালে সেই ঘরেই অবস্থান করিতেন যাহার ঘরে সেইদিন পালা নির্ধারিত থাকিত। হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, রাত্রির পালার ব্যাপারে তিনি কাহাকেও প্রাধান্য দিতেন না এবং কদাচিৎ সকলের গৃহে তাঁহার এক চক্কর ঘুরিয়া আসার ব্যতিক্রম হইত না (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৫)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার সহধর্মিনিগণের মধ্যে রাত্রিযাপনের পালা বণ্টন করিয়া রাখিয়াছিলেন। কিন্তু উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা (রা) এই পালা বণ্টনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। দৈহিক দিক হইতে অক্ষম ছিলেন বিধায় তিনি স্বেচ্ছায় তাঁহার নিজের পালা হযরত 'আইশা (রা)-কে ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। সহীহ্ মুসলিমের বর্ণনামতে হযরত 'আতা বলিয়াছেন যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা) এই পালায় শামিল ছিলেন না। কিন্তু কাযী আয়ায এবং ইমাম তাহাবীর মতে ইহা সঠিক নহে। আর ইহার কারণ হইতেছে, একবার রাসূলুল্লাহ্ (স) কোন কারণে উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা)-এর উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। অতঃপর তিনি হযরত 'আইশা (রা)-কে বলিলেন, আপনি যদি নবী করীম (স)-এর এই অসন্তুষ্টি নিবারণ করিয়া দিতে পারেন তবে আমার এইবারের পালা আমি স্বেচ্ছায় আপনাকে ছাড়িয়া দিব। হযরত 'আইশা (রা) তাঁহার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং কর্ম সম্পাদনের পর হযরত সাফিয়্যার পালার দিন তিনি নবী করীম (স)-এর পাশে গিয়া বসিলেন। নবী করীম (স) হযরত 'আইশা (রা)-এর উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিয়া বলিলেন, হে 'আইশা! তুমি সরিয়া বস। কেননা আজ সাফিয়্যার পালা, তোমার নয়। এই কথা শুনিয়া হযরত 'আইশা (রা) বলিলেন, ইহা আল্লাহ্ দান, তিনি যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে তাহা দান করেন। এই ঘটনা হইতে হযরত 'আতা-এর ধারণা হইয়াছিল যে, হযরত সাফিয়্যা (রা) হয়ত বা তাঁহার পালা চিরতরে হযরত 'আইশা (রা)-কে দান করিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তাহা ঠিক নয়। কারণ তিনি কেবল একবারের পালাই তাঁহাকে দান করিয়াছিলেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৫)।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসা (রা) কিছুটা গরম তবিয়তের মহিলা ছিলেন। এইজন্য নবী করীম (স) একবার তাঁহাকে তালাক দিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার পিতা হযরত উমার (রা)-এর মনোকষ্টের কথা বিবেচনা করিয়া নবী করীম (স) পরে তাঁহাকে ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা (রা) নবী করীম (স)-এর সঙ্গে রাত্রি যাপনের পালা বণ্টনে শামিল ছিলেন না। তিনি স্বেচ্ছায় তাঁহার পালা হযরত 'আইশা (রা)-কে দান করিয়াছিলেন। বিষয়টি লইয়া মতভেদ রহিয়াছে। কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, তাঁহার বয়সের আধিক্যের কারণে নবী করীম (স) তাঁহাকে তালাক দিয়াছিলেন এবং হযরত 'আইশা (রা) তাঁহাকে ফিরাইয়া আনার জন্য নবী করীম (স)-কে রাযী করাইয়াছিলেন। অথবা তিনি কেবল তালাক দেওয়ার ইচ্ছাই করিয়াছিলেন, কিন্তু তালাক দেন নাই কিংবা তালাক দিবেন এইরূপ ধারণা করা হইয়াছিল। এই বিষয়ে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য রিওয়ায়াত হইতেছে, হযরত সাওদা (রা) মনে মনে আশংকা করিতেছিলেন যে, নবী করীম (স) তাঁহাকে তালাক দিবেন। তখন তিনি তাঁহাকে অনুরোধ করিলেন যে, অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা হইতে বঞ্চিত করিবেন না। আমি আমার পালা স্বেচ্ছায় হযরত 'আইশা (রা)-কে দান করিয়া দিতেছি। এই রিওয়ায়াতটি হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে জামে তিরমিযীতে এবং হযরত 'আইশা (রা) সূত্রে সুনান আবু দাউদে বর্ণিত হইয়াছে (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৭)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার সহধমিনিগণের যাবতীয় অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তাঁহাদের নিকট অবস্থানের পালা কঠোরভাবে অনুসরণ করিতেন। এমনকি অন্তিম রোগের সময় কঠিন পীড়ার যাতনা সত্ত্বেও যতটুকু সম্ভব সেই নিয়ম তিনি কঠোরভাবে পালন করিয়াছিলেন। শেষ পর্যন্ত যখন নিতান্তই দুর্বল ও অক্ষম হইয়া পড়িয়াছিলেন তখন যথারীতি সকল সহধর্মিনীর নিকট হইতে অনুমতি লইয়া হযরত 'আইশা (রা)-এর গৃহে এক সোমবার হইতে পরবর্তী সোমবার পর্যন্ত অবস্থান করিয়া সেইখানেই ইন্তিকাল করেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৭)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম যে তাহার স্ত্রীর সহিত উত্তম আচরণ করে এবং আমি আমার স্ত্রীদের সহিত সর্বাপেক্ষা উত্তম আচরণকারী (সুনান তিরমিযী, ৩খ., পৃ. ৩২২)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে নিজ স্ত্রীগণের প্রগাঢ় ভালবাসার ভিত্তি ছিল আল-কুরআনুল করীমের এই আয়াত: তাহারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের অঙ্গাবরণস্বরূপ, আর তোমরা (স্বামীগণ) তাহাদের অঙ্গাবরণ” (২: ১৮৭)। নবী করীম (স) কুরআন হাকীমের এই নীতি দর্শনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন। আদর, সোহাগ, খোশালাপ, অনুরাগ, বিরাগ, তুষ্টকরণ, আনন্দদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং তাঁহাদের পক্ষে বা বিরুদ্ধে মতামত গ্রহণ করা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় যাহা দাম্পত্য জীবনে সাধারণত সংঘটিত হইয়া থাকে, তিনি এই সকল বিষয়ে ছিলেন উত্তম আদর্শ (সহীহ মুসলিম, ৭খ, পৃ. ১৩৫)।
সন্তান-সন্ততির প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সীমাহীন ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা ছিল। তৎকালে আরবের লোক সন্তানদের চুম্বন ও আদর-সোহাগ করাকে তাহাদের নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার জন্য অশোভনীয় মনে করিত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদের এই কুপ্রথার নিন্দা করিয়াছেন। তিনি নিজ সন্তানদেরকে কোলে নিতেন, কখনও কাঁধে চড়াইতেন, সওয়ারীর উপর নিজের সাথে পশ্চাতে তাহাদেরকেও বসাইতেন, তাহাদের ললাট চুম্বন করিতেন এবং তাহাদের কল্যাণ ও বরকতের জন্য দু'আ করিতেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৪৪৩)।
নবী করীম (স) তাঁহার সন্তানদেরকে জান্নাতের পুস্পস্তবক বলিতেন, তাহাদের দেহের ঘ্রাণ লইতেন এবং বক্ষদেশে জড়াইয়া ধরিতেন। আকরা ইব্‌ন হাবিস নামক জনৈক সরদার রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে একদিন শিশুদেরকে চুম্বন করিতে দেখিয়া বলিল, আমার দশটি সন্তান আছে, আজ পর্যন্ত তাহাদের একজনকেও চুম্বন করি নাই। ইহা শুনিয়া নবী করীম (স) বলিলেন, যেই ব্যক্তি কাহারও প্রতি দয়া করে না, তাহার প্রতি দয়া করা হয় না (সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ৮০৮; জামে তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৩১৮)। আর যদি আল্লাহ তা'আলা তোমার অন্তর হইতে মায়া-মমতা উঠাইয়া নিয়া থাকেন তবে আমি কি করিতে পারি (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ১১৪)?
আল্লাহ তা'আলা নবী করীম (স)-কে শেষ জীবনে একটি পুত্র সন্তান দান করিয়াছিলেন। ইহাতে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাহার নাম রাখেন ইবরাহীম। তাহাকে দুগ্ধপান করান জনৈক কর্মকার পত্নী উম্মু সায়ফ (উম্মু বুরদা বিনতুল মুনযির: ইব্‌ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৩১-৩৭; বরাতে হযরত রাসূল করীম (স), জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৬৮)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার স্নেহাস্পদ পুত্র ইব্রাহীমকে দেখিবার উদ্দেশ্যে মাঝে-মধ্যে উন্মু সায়ফের গৃহে গমন করিতেন এবং ধুম্র আচ্ছন্ন কুটিরে বসিয়া তাঁহার শিশুপুত্রকে আদর-সোহাগ করিতেন। শৈশবকালেই ইব্রাহীম (রা)-এর ইন্তিকাল হয়। তাহার ইন্তিকালে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অশ্রুবিগলিত চক্ষু দেখিয়া জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি ক্রন্দন করিতেছেন! তিনি বলিলেন, ইহা তো স্নেহ-মমতার অভিব্যক্তি। আমি বিলাপ করিতে নিষেধ করি। অতঃপর তিনি তাহাকে দাফন করিবার সময় বলিয়াছিলেন, "হৃদয় ব্যথিত, চক্ষু অশ্রুবিগলিত। কিন্তু আমরা তাহাই বলি, যাহা আল্লাহ পছন্দ করেন। হে ইব্রাহীম! আমরা তোমার বিরহে মর্মাহত" (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৩৮-৩৯; বরাতে হযরত রাসূলে করীম (স) : জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৬৮)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কোন পুত্র সন্তান জীবিত ছিলেন না। শুধু চারিজন দুহিতা বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। বিবাহের পরে তাঁহাদের ইন্তিকাল হয়। তিনি তাঁহাদেরকে এবং তাঁহাদের সন্তান-সন্ততিগণকে অতিশয় স্নেহ করিতেন। হযরত যয়নব (রা)-এর কন্যা উমামাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। একবার উমামা তাঁহার কাঁধে সওয়ার ছিল। তিনি এই অবস্থায় সালাত আদায় করেন। যখন রুকূতে যাইতেন তখন নিচে নামাইয়া দিতেন, আবার যখন সিজদা করিতেন তখন তাঁহাকে উঠাইয়া লইতেন (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ১৪০)।
হযরত ফাতিমা (রা) ব্যতীত অন্য সকল দুহিতা নবী করীম (স)-এর জীবদ্দশাতেই ইন্তিকাল করেন। তাঁহার সর্বকনিষ্ঠা ও সর্বশেষে ইন্তিকালকারী কন্যা হযরত ফাতিমা (রা)-এর প্রতি তাঁহার স্নেহ-ভালবাসার অন্ত ছিল না। তিনি তাঁহাকে নিজ কলিজার টুকরা বলিয়া উল্লেখ করিতেন (সহীহ বুখারী, ২খ, ৫২৬; জামে তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৬৯৯)। নবী করীম (স) সফরে যাইবার প্রাক্কালে সর্বশেষে এবং প্রত্যাবর্তনের পর সর্বাগ্রে হযরত ফাতিমা (রা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতেন (মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২৭৫)। হযরত ফাতিমা (রা) যখন নবী করীম (স)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করিতে আসিতেন তখন তিনি অগ্রসর হইয়া ফাতিমা (রা)-কে খোশআমদেদ জানাইতেন এবং তাঁহার হাতে স্নেহের চুম্বন করিয়া নিজ আসনে বসাইতেন (জামে' তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৭০০)।
হযরত ফাতিমা (রা)-এর পুত্রদ্বয় হযরত হাসান (রা) ও হযরত হুসায়ন (রা)-কেও নবী করীম (স) অপরিসীম স্নেহ করিতেন, তাঁহাদেরকে কোলে বসাইতেন, চুম্বন করিতেন এবং দু'আ করিতেন : হে আল্লাহ। আমি যেমন তাহাদেরকে ভালবাসি, তুমিও অনুরূপ তাহাদেরকে ভালবাস (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৪৪৩)। একদিন জুমু'আর নামাযের খুৎবার প্রক্কালে তাঁহারা উভয়ে দৌঁড়াইয়া মসজিদে উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহাদেরকে দেখিয়া মিম্বর হইতে নিচে নামিয়া আসিয়া তাঁহাদের দুইজনকেই কোলে তুলিয়া নিলেন। অতঃপর বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা যথার্থই বলিয়াছেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো তোমাদের জন্য পরীক্ষা (আল কুরআন, ৬৪: ১৫; সুনানে আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ৬৯৩-৯৪)।
নবী করীম (স) কখনও কখনও হযরত হাসান ও হুসায়ন (রা)-কে চাদরে জড়াইয়া লইতেন, কখনও কোলে বহন করিতেন (জামে' তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৬৫২)। একবার নবী করীম (স) হযরত হাসান ও হুসায়ন (রা)-কে কাঁধে বহন করিয়া বাহিরে আসিলে জনৈক ব্যক্তি বলিলেন, তোমরা কত ভাগ্যবান যে, অতি উৎকৃষ্ট সওয়ারী পাইয়াছ! নবী করীম (স) বলিলেন, আরোহীরাও তো কত উত্তম (জামে' তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৬৬)! নবী করীম (স) এক উরুতে হযরত হাসান (রা) এবং অন্য উরুতে হযরত উসামা (রা)-কে বসাইতেন। অতঃপর তাঁহাদেরকে একত্র করিয়া বলিতেন, আয় আল্লাহ! আমি তাহাদেরকে যেই রকম স্নেহ করি, তুমিও সেই রকম স্নেহ কর (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ২২৫)।
নবী করীম (স) একবার এক যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন, হযরত ফাতিমা (রা) তাঁহার দুই শিশুপুত্র হযরত হাসান ও হুসায়ন (রা)-এর হাতে রৌপ্যের কঙ্কন পরাইয়াছেন এবং ঘরের দরজায় রঙিন পর্দা ঝুলাইয়া রাখিয়াছেন। ইহা দেখিয়া নবী করীম (স) অসন্তুষ্ট হইলেন এবং হযরত ফাতিমা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করিলেন না। তিনি বিষয়টি আঁচ করিতে পারিয়া সন্তানদের হাত হইতে কঙ্কন খুলিয়া লইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে মহানবী (স)-এর নিকট আসিলেন। অতঃপর মহানবী (স) সেই কঙ্কন বাজারে পাঠাইয়া দিয়া বলিলেন, এইগুলি বিক্রয় করিয়া হাতীর দাঁতের কঙ্কন আনিয়া দাও (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৪)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা হযরত যয়নব (রা)-এর স্বামী বদরের যুদ্ধে যখন বন্দী হইয়া আসিলেন তখন তাহার মুক্তিপণ দেওয়ার মত কোন সম্পদ তাহার হাতে ছিল না। এই সংবাদ পাইয়া হযরত যয়নব (রা) তাঁহার গলার হার খুলিয়া পাঠাইয়া দিলেন। এই হারটি হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার কন্যাকে বিবাহের সময় উপহার দিয়াছিলেন। প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা)-এর স্মৃতি বিজড়িত হারখানার উপর দৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নবী করীম (স)-এর পবিত্র নয়ন যুগল অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল। তিনি আর্দ্রকণ্ঠে সাহাবীগণকে বলিলেন, যদি তোমরা হারখানা যয়নবকে ফিরাইয়া দাও তবে ভাল হয়। সাহাবীগণ অত্যন্ত আনন্দ মনে হারখানা হযরত যয়নব (রা)-এর নিকট ফেরৎ পঠাইয়া দিলেন (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৬)।
একদিন নবী করীম (স) দাওয়াত খাইতে যাইতেছিলেন। পথিমধ্যে তিনি হযরত হুসায়ন (রা)-কে খেলায় রত অবস্থায় দেখিতে পাইলেন এবং হাত বাড়াইয়া তাঁহাকে কাছে ডাকিলেন। এই অবস্থায় শিশু হুসায়ন (রা) লুকোচুরি খেলার মত কাছে আসিয়া আবার দূরে চলিয়া গেলেন। অতঃপর নবী করীম (স) হাত বাড়াইয়া তাহার কাঁধ এবং চিবুক ধরিয়া ফেলিলেন এবং দুই হাতে তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতে লাগিলেন : হুসায়ন আমার এবং আমি হুসায়নের। অনেক সময় নবী করীম (স) তাঁহার মুখ হুসায়নের মুখে লাগাইয়া আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলিতেন : হে আল্লাহ! আমি তাঁহাকে ভালবাসি, তুমিও তাহাদেরকে ভালোবাসিও এবং যাহারা তাঁহাকে ভালবাসে তাহাদেরকেও তুমি ভালবাস (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার চাচা আবু তালিবের খান্দানের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি তাঁহার যেই ভালবাসা এবং অনুগ্রহ ছিল উহা তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছিলেন। হযরত আলী (রা)-এর জননী হযরত ফাতিমা বিন্ত আসাদ (রা) ইন্তিকাল করিলে নবী করীম (স) স্বীয় জামা খুলিয়া তাঁহাকে পরিধান করান এবং কিছুক্ষণ কবরে অবস্থান করেন। তিনি হযরত আলী (রা)-কে স্বীয় খান্দানের একজন সদস্য করিয়া লইয়াছিলেন। হযরত উম্মু হানী (রা) ও তাঁহার জননীর গৃহে তিনি প্রায়ই গমন করিতেন এবং সেইখানে বিশ্রাম করিতেন। এক বর্ণনামতে, মি'রাজের রাত্রিতেও তিনি সেইখানে বিশ্রাম করিতেছিলেন। একবার হযরত উম্মু হানী (রা) তাঁহার নিকট আসিলে তিনি 'মারহাবা' বলিয়া তাঁহাকে সাদর সম্ভাষণ জানাইয়াছিলেন (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ১৫৪)।
হযরত জাফর ইব্‌ন আবী তালিব (রা) কয়েক বৎসর আবিসিনিয়ায় অবস্থানের পর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) খায়বারের যুদ্ধ হইতে ফিরিতেছিলেন। জা'ফর (রা)-কে দেখিয়া তিনি এই বলিয়া আনন্দ প্রকাশ করেন যে, আমি বুঝিতে পারিতেছি না খায়বার বিজয়ে অধিক আনন্দিত হইয়াছি, নাকি জা'ফরের প্রত্যাবর্তনে! একবার জা'ফর (রা) সাক্ষাৎ করিতে আসিলে তিনি তাঁহাকে আলিংগন করেন এবং তাঁহার ললাটে চুম্বন করেন (সুনান আবূ দাউদ, ৫খ., পৃ. ৩৯২)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার চাচাত ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতেন, হে আল্লাহ! তাঁহাকে দীনের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান কর (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৪৪৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় দুগ্ধ সম্পর্কীয় মাতা-পিতাকে আপন পিতা-মাতার মত যত্ন করিতেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি যখন যি'ইররানা নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন তাঁহার দুধপিতা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি স্বীয় চাদর বিছাইয়া সেইখানে তাঁহাকে সসম্মানে বসাইলেন। সেখানে তাঁহার দুধমাতা (কিংবা অনুরূপ অন্য কোন মহিলা) আসিয়াছিলেন। তিনি তাঁহাকেও চাদরের অপর কিনারায় বসাইলেন। অতঃপর তাঁহার দুধভাই আবদুল্লাহ ইবনুল হারিছ আসিলে তিনি উঠিয়া তাঁহাকে স্বাগত জানাইলেন এবং নিজের স্থানে তাঁহাকে বসাইলেন (সุนান আবূ দাউদ, ৫খ., পৃ. ৩৫৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00