📄 হুনায়ন যুদ্ধের ঘটনা
কাফিরদের প্রতি মাটি নিক্ষেপের অপর 'ঘটনাটি ঘটিয়াছিল ৮ম হিঃ হুনায়ন 'যুদ্ধের সময়। যুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করিয়াছিল তখন রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় খচ্চর হইতে অবতরণ করত জমীন হইতে এক মুষ্ঠি মাটি লইলেন এবং شاهت الوجوه বলিয়া কাফিরদের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। আল্লাহ তা'আলার অসীম কুদরতে মুশরিকদের প্রত্যেকের চক্ষুতেই তাহা পতিত হইল। ফলে তাহাদের শক্তিতে ভাটা পড়িল এবং অবস্থার পরিবর্তন হইয়া গেল। তাহারা যুদ্ধ ক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিতে বাধ্য হইল (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৩০; সাফিয়্যুর রামান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৬)।
ইবনুল আছীরের বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (সংস্তাঁহার দুলদুল নামক সাদা খচ্চরের উপর আরোহণ করিয়াছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি তাঁহার খচ্চরকে মাটিতে বসিতে ইঙ্গিত করিলেন। খচ্চরটি তাহার পেট মাটির সহিত লাগাইলে তিনি এক মুষ্ঠি মাটি' লইয়া কাফিরদের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন (ইবনুল আঁছীর, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২খ., পৃ. ২৬৪)। আত-তাবারীর বর্ণনামতে মাটি নিক্ষেপকালে তিনি বলিয়াছিলেন لا ينظرون حم "হা-মীম, তাহারা সাহায্য প্রাপ্ত হইবে না।” অতঃপর মুশরিকরা পলায়ন করিতে লাগিল। তাহাদের প্রতি তীর-তরবারি ও বল্লমের দ্বারা তেমন আঘাত করিতে হইল না (আত-তাবারী, তারীখুল-উমাম ওয়াল-মূলক, ৩খ., পৃ. ৭৮; ইবনুল-জাওযী, আল-ওয়াদা, ১খ., পৃ. ৩০৪; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ৩৩০-৩১)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে কা'বা ঘরের মূর্তি ভূলুণ্ঠিত হইল
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অসংখ্য মু'জিযার মধ্যে তাঁহার অঙ্গুলীর ইশারায় কা'বা ঘরের মূর্তিসমূহ ধ্বসিয়া পড়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্ন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের দিন স্বীয় সওয়ারীতে আরোহণ করিয়া মক্কায় প্রবেশ করিয়া সর্বপ্রথম কা'বা শরীফ তাওয়াফ করেন। তখনও কা'বার চারপাশে সীসা দ্বারা মজবুতভাবে আটকানো মূর্তিসমূহ স্থাপিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাতের লাঠি দ্বারা মূর্তিগুলির দিকে ইংগিত করিয়া পাঠ করিলেন : جاء الحق وزهق الباطل إن الباطل كان زهوقًا • "সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে; মিথ্যা বিলুপ্ত হইবারই" (১৭:৮১)। এই কথা বলিয়া রাসূলুল্লাহ (স) যেই মূর্তির দিকে ইঙ্গিত করিতে লাগিলেন, তাহা চিৎ বা উপুড় হইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল। এইভাবে একে একে সব কয়টি মূর্তিই ধরাশায়ী হইল (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৪৪)।
হযরত 'আলী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) কা'বা ঘরের ছাদে উঠিলেন এবং আমাকে উঠিতে বলিলে আমিও উঠিলাম। ছাদের উপরে ছিল আর একটি বড় প্রতিমা। রাসূলুল্লাহ (স) সেইটির দিকে ইঙ্গিত করিলেন, আমি উহাকে ধাক্কা দিয়া ফেলিয়া দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে উহা ভাঙ্গিয়া চুরমার হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে হারামে প্রবেশ করিয়া সর্বপ্রথম হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করিলেন। ইহার পর সওয়ারীতে আরোহণ করিয়া তাওয়াফ করিলেন। তাওয়াফরত অবস্থায় ধনুক তাঁহার হাতেই ছিল। তিনি মূর্তিগুলির পাশ দিয়া অতিক্রমকালে ধনুক দিয়া সেইগুলির দিকে ইশারা করিতেছিলেন আর বলিতেছিলেন : جاء الحق وزهق الباطل إن الباطل كان زهوقًا "সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে; মিথ্যা তো বিলুপ্ত হইবারই” (১৭:৮১)। তিনি মূর্তির পিঠের দিকে ইশারা করিলে সেই মূর্তিটি মুখের উপর উপুড় হইয়া পড়িল আর সম্মুখে দিয়া ইশারা করিলে পিছন দিকে গড়াইয়া পড়িল। কোন কোন বর্ণনায় আসিয়াছে, সেই দিন মক্কার অপরাপর বিগ্রহগুলি ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়। মক্কায় আর একটি বড় মূর্তি ছিল হুবলের। সেইটিও সেই দিনই ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়।
কা'বার প্রাচীরের গায়ে সবচেয়ে উপরে ঝুলন্ত মূর্তিটি এতো উচ্চে ছিল যে, হাতের নাগালের বাহিরে ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আলী (রা)-কে তাহার নিজ কাঁধের উপর দাঁড় করাইয়া দিলেন আর হযরত আলী (রা) উহাকে ভাঙ্গিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিলেন। কা'বার প্রাচীরে ইবরাহীম (রা)-ও ইসমা'ঈল (আ)-এর বিশাল দুইটি ছবি শোভা পাইতেছিল। তাঁহাদের দুইজনের হাতেই ভাগ্য নির্ধারণকারী (জুয়ার) তীর ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ এই কাফিরদিগকে ধ্বংস করুন। তাঁহারা দুইজনই বিশিষ্ট নবী। তাঁহারা কখনও জুয়া খেলেন নাই। সেখানে কাষ্ঠ নির্মিত দুইটি কবুতরের মূর্তিও ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে সেইগুলি বিনষ্ট করিলেন এবং ছবিগুলি মিটাইয়া ফেলিতে নির্দেশ দেন। তৎক্ষণাৎ তাঁহার নির্দেশ প্রতিপালিত হয় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৩২-২৩৩)।
আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে কুঠারের সাহায্যে মূর্তি ভাঙ্গিয়া ফেলার সম্মান দান করিয়াছিলেন, আর আমাদের নবী করীম (স)-কে অত্যন্ত কঠিন ও মজবুত মূর্তি যাহা কা'বা শরীফের দেওয়ালের পার্শ্বে ছিল, তাহা সামান্য এক খণ্ড কাঠের ইশারায় ভাঙ্গিয়া ফেলার গৌরব দান করিয়াছিলেন (মাদারিজুন-নুবৃওয়াত, ১খ., পৃ. ২১২)। রাসূলুল্লাহ (স) হস্তস্থিত ধনুক দ্বারা হৌবলের চক্ষুদ্বয়ে খোঁচা দিতে দিতে বলিতে লাগিলেন: جاء الحق وزهق الباطل إن الباطل كان زهوقًا . "সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে, মিথ্যাতো বিলুপ্ত হইবায়ই" (১৭:৮১)। রাসূলুল্লাহ (স) আল-কুরআনের উল্লিখিত আয়াত পাঠ করিতে করিতে ধনুক দ্বারা প্রত্যেকটি বিগ্রহের প্রতি ইংগিত করিতেই সবগুলিই ভাঙ্গিয়া খানখান হইয়া যাইতে লাগিল (সাইয়্যেদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮৮২)।
রাসূলুল্লাহ (স) কা'বা শরীফে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, তিল ধারণের মত খালি স্থান নাই। কা'বা শরীফের দেওয়ালে খোদাই করাছিল ফেরেশতা ও নবীদের প্রতীকী মূর্তি। তিনি দেখিলেন, ইবরাহীম (আ)-এর মূর্তি ভাগ্যের প্রতি নিক্ষিপ্ত তীর তাঁহার হাতে। ইহার পাশেই রহিয়াছে কাঠের তৈরি একটি ময়ূর। ফেরেশতাদেরকে রূপায়িত করা হইয়াছে মহিলার বেশে। অট্রালিকার প্রত্যেক কোণায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে মূর্তি। সবার মাঝে রহিয়াছে আকীক পাথরের তৈরীর 'হবল মূর্তি'। হযরত মুহাম্মাদ (স) তাঁহার লাঠি উঠাইয়া হুবল ও ময়ূরকে আঘাত করা মাত্রই সেইগুলি মাটিতে পড়িয়া গেল (যাইনুল আবেদীন রাহনুমা, অনু., আবূ জাফর, পৃ. ৪১৬)।
কা'বায় হুবল দেবতার মূর্তি ছিল; ইহাকে মক্কা ও কা'বার দেবতা বলা হইত। কা'বা প্রাঙ্গণে রক্ষিত অন্যান্য দেবদেবীর মধ্যে 'আল-লাত', 'আল-'উযযা' এবং 'আল-মানাতের' উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হইয়াছে: أَفَرَأَيْتُمُ اللاتَ وَالعُزَّى وَمَنُوةَ الثَّالِثَةَ الأخرى . "তোমরা কি ভাবিয়া দেখিয়াছ 'লাত' ও 'উয্যা' সম্বন্ধে এবং তৃতীয় আরেকটি 'মানাত' সম্বন্ধে” (৫৩: ১৯)?
ইহারা ব্যতীত কা'বা প্রাঙ্গণে রক্ষিত আরও অনেক দেবদেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইহা ঐতিহাসিক সত্য যে, কা'বা প্রাঙ্গণে ৩৬০টি প্রতিমা রক্ষিত ছিল। যখন রাসূলুল্লাহ (স) আপন হস্তের লাঠি দ্বারা মূর্তিগুলিকে আঘাত করেন এবং পাঠ করেন: جاء الحق وزهق الباطل إن الباطل كان زهوقًا . "সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে; মিথ্যা তো বিলুপ্ত হইবারই" (১৭:৮১), তখনই উহা ভূলুণ্ঠিত হইয়া পড়িল।
কা'বার অভ্যন্তরে 'হুবল' দেবের যে প্রতিমূর্তি আমর ইব্ন লুহাই কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ছিল তাহা এবং নবীগণের প্রতিকৃতিগুলিও তখনই অপসারিত হইল, (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন- নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৮২৩, কিতাবুল আসনাম)।
কাষ্ঠ নির্মিত কবুতরের প্রতিমূর্তিও কা'বায় রক্ষিত ছিল, তাহাও মহানবী (স)-এর আদেশে ভাঙ্গিয়া ফেলা হয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ.)?
'আল-লাত' প্রাচীন আরবের একটি দেবী। প্রাচীন নাবাতীয় ও পামীরীয় শিলালিপিতেও এই নাম দেখা যায়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বেদুঈন গোত্র ইহার পূজা করিত (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা)।
তায়েফের নিকট ওয়াজ্জ উপত্যকায় এই দেবীর প্রধান মন্দির ছিল। মু'আত্তিব ইব্ন মালিক ইব্ন কা'ব ইহার পুরোহিত ছিলেন। একটি সুসজ্জিত ঝুলন্ত শ্বেত প্রস্তরই ছিল এই তিন দেবীর প্রতীক। কুরায়শগণ লাত, মানাত এবং উয্যা এই তিন দেবীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিত। মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে তায়েফে 'আল-লাত' এবং উহার মন্দির আল-মুগীরা (রা) ধ্বংস করিয়াছিলেন (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ২খ., পৃ. ৪০৩)।
আল-উয্যা একটি পুরাকালের আরবদেশীয় দেবীর নাম। এই নামের অর্থ শক্তিশালীনি ও ক্ষমতাধারিণী। ইহাকে বিশেষ করিয়া গাতাফান গোত্রের সহিত সম্পর্কিত করা হইয়াছে। কিন্তু ইহার প্রধান মন্দির ছিল নাখ্যা উপত্যকায়, মক্কা হইতে তায়িফের পথে। হাসান ইব্ন ছাবিত (রা) এই কথা উল্লেখ করিয়াছেন। সেইখানে তিনটি বাবলা গাছ ছিল, উহাদের একটিতে উয্যা অবতীর্ণ হইত।
তৃতীয় হিজরী সনে আবূ সুফ্যান হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রাকালে আল- উয্যা ও আল-লাতের প্রতিমূর্তি সঙ্গে লইয়াছিল। এই দুইটি প্রতিমূর্তির মধ্যে আল-উয্যা প্রধান ছিল। ইহাকে মক্কার রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে গণ্য করা হইত। কেননা আবূ সুফ্যান 'আল-উয্যা আমাদের পক্ষে, তোমাদের পক্ষে নহে' এই বলিয়া রণ-ধ্বনি দিত। আর অপর ধ্বনি ছিল 'উ'লু হুবল' (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ২৩৩)।
মক্কা বিজয়ের পর হযরত মুহাম্মাদ (স) খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-কে উয্যার মন্দির ধ্বংস করিতে প্রেরণ করেন। ওয়াকিদীর মতে উহার শেষ পুরোহিত ছিল আফলাহ্ ইব্ন নাসর আশ- শায়বানী এবং ইব্ন কালবীর মতে দুবায়্যা ইব্দ হারুন। ইহার পর আল-উয্যার পূজা তিরোহিত হয় (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ১ম সং, ১খ., পৃ. ২৩৩)
'আল-মানাত' প্রাচীন আরবের আরাধ্য এক দেবী। এই নামটি বহুবচনরূপে আরামাইক ও হিব্রু ভাষায় ব্যবহৃত ভাগ্য দেবীর নামের সহিত সম্পর্কযুক্ত মনে হয়। আরামাইকে 'মেনাতা' বহু বচনে 'মেনা ওয়াতা' অর্থ অংশ বা ভাগ্য। হিব্রুতে 'ম্যানা' বহুবচনে 'মানোত' বা অদৃষ্ট দেব (Is. IXV. II; তু. IXX)।
আল-মানাত-এর বেদী 'কাদীদ' যাহা হুযায়ল গোত্রের এলাকা, মক্কার অনতিদূরে মদীনাগামী পথের ধারে মুশার্ললাল নামক এক পাহাড়ের নিকট। সেই বেদীতে এই দেবী একটি কৃষ্ণকায় প্রস্তরের রূপে অধিষ্ঠিত ছিল। অনেক আরব গোত্র; প্রধানত ইয়াছরিবের আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় ইহার পূজা করিত। মক্কায় আল-লাত ও আল-উয্যা দেবীদ্বয়ের সঙ্গে আল-মানাতও অতি জনপ্রিয় ছিল। ইবনুল-কালবীর মতানুসারে আল-মানাত সর্বাপেক্ষা প্রাচীন দেবী। ইবন হিশামের কবিতায় আল-মানাত ও আল-লাতকে আল-উয্যার দুইটি কন্যারূপে উল্লেখ করা হইয়াছে। কতিপয় লেখক আল-মানাতকে হজ্জের সহিত সংযুক্ত করিয়াছেন। তাহাদের মতে এক সময় আওস ও খাযরাজসহ অনেক গোত্র আল-মানাতের মন্দিরে হজ্জের ইহরাম করিত এবং অনুষ্ঠানশেষে তাহার পুনরায় সেই স্থানে আসিয়া চুল কাটিয়া ইহরাম হইতে মুক্ত হইত (ইবন হিশামের কবিতা, পৃ. ১৪৫) ইবন হিশামের বর্ণনায় সুস্পষ্টরূপে জানা যায়, আল-মানাত গৃহদেবীও ছিল। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে কাদীদের বিরাট মন্দির বিধ্বস্ত করা হয় ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ২খ., পৃ. ২১৪)।
আল্লামা শিবলী নো'মামী সীরাতুন নবীতে উল্লেখ করেন যে, কা'বা শরীফে বহু দেবমূর্তি ছিল। 'তন্মধ্যে 'হবল' দেখতা ছিল মূর্তিপূজকদের প্রধান দেবতা। ইহা ছিল গাঢ় রক্ত বর্ণের মূল্যবান ইয়াকৃক্ত পাথরে প্রস্তুত, মানুষের আকৃতিবিশিষ্ট। আদনানের প্রপৌত্র ও মুদারের পৌত্র খুযায়মা ইন্ন মুদরিকা সর্বপ্রথম এই দেব মূর্তিকে কা'বা গৃহে আনিয়া স্থাপন করেন। হুবলের সম্মুখে সাতটা তীর থাকিত। এই সমস্ত তীরের উপর 'হাঁ' ও 'না' লেখা ছিল। আরবেরা যখন কোন কাজ করিতে ইচ্ছা করিত, তখন ঐ সমস্ত তীর দ্বারা লটারী করিত। লটারীতে 'হাঁ' অথবা 'না' যাহা উঠিত সেই মুতাবিক কর্ম করিত। উহুদের যুদ্ধে আবূ সুফয়ান এই হুবল দেবতারই জয়ধ্বনি করিয়াছিলেন। উহা কা'বা গৃহের অভ্যন্তরে স্থাপিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন কা'বা গৃহে প্রবেশ করিয়াছিলেন তখন অন্যান্য দেবমূর্তির সহিত উহাকেও উৎপাটিত করা হয়।
মক্কার আনাচে-কানাচে ও পথে-প্রান্তরে আরও অনেক বড় বড় মূর্তি বিদ্যমান ছিল। উহাদের জন্য হজ্জের অনুষ্ঠান পালন করা হইত। উহাদের মধ্যে লাত, মামাত ও উয্যা ছিল সর্ববৃহৎ। উয্যা কুরায়শদের এবং লাত তায়েফবাসীর পূজ্য দেবতা ছিল। মক্কা নগরী হইতে এক মনযিল দূরে 'নাখলা' নামক স্থানে উয্যা দেবতা প্রতিষ্ঠিত ছিল। 'বন্ শায়বা গোত্র এই দেবতার পুরোহিত বা সেবায়েত ছিল। আরবদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ শীতকালে লাত দেবতার নিকট এবং গ্রীষ্মকালে উয্যা দেবতার নিকট অবস্থান করেন। আরবরা কা'বা ঘরে যে সব অনুষ্ঠান পালন করিত ও কুরবানী করিত উয্যা দেবতার সম্মুখেও তদসমুদয় আচার-অনুষ্ঠানই পালন করিত। তাহারা উহাকে প্রদক্ষিণ করিত এবং উহার নামে কুরবানী করিত।
মদীনা মুনাওয়ারা হইতে মক্কার পথে সাত মাইল দূরে কাদীদ নামক স্থানের নিকটবর্তী মুগাল্লালে মানাতের দেব মন্দির অবস্থিত ছিল। ইহা ছিল কারুকার্যবিহীন এক প্রস্তর খণ্ড। আদ, গাসসান, আওস ও খাযরাজ গোত্রসমূহ উহার নিকট হজ্জের ইহরাম বাঁধিত এবং ইঞ্জ সমাপ্ত করিয়া ইহরাম খুলিত। আমর ইব্ন লুহাই যে সমস্ত মূর্তি স্থাপন করিয়াছিল ইহা ছিল তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা কা'বা শরীফে হজ্জ সমাপনান্তে মস্তক মুণ্ডন পূর্বক ইহরাম ভংগের 'অনুষ্ঠান এই দেবতার সম্মুখে পালন করিত।
হুষায়ল গোত্রের দেবতা ছিল 'সুওয়া'। উহা ইয়ামবায়ের পার্শ্ববর্তী বাহাত নামক স্থানে স্থাপিত ছিল। উহা ছিল এক খণ্ড প্রস্তর। বনূ লিহয়ান গোত্র ছিল ইহার পুরোহিত বা সেবায়েত। মূর্তি পূজার এই কুহকে সমগ্র আরব জাতি নিমজ্জিত ছিল। যখন মক্কা বিজয় হইল তখন উহাদের ধ্বংসের সময় আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) সকল মূর্তি ও মূর্তি গৃহ ভূমিসাৎ করিয়া দিলেন (নদবী, সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ৩০৪)।
কাতাদা বর্ণনা করিয়াছেন, তায়েফের বনী ছাকীফের একটি প্রতিমার নাম ছিল লাত। ইব্ন যায়দ বলিয়াছেন, নাখলা নামক স্থানে ছিল লাত নামের একটি কুঠরি। কুরায়শরা ওই কুঠরিটির পূজা করিত। মুজাহিদ বলিয়াছেন, উয্যা ছিল গাতাফান গোত্রের আবাসভূমিতে অবস্থিত একটি বৃক্ষের নাম। গাতাফানীরা ওই বৃক্ষের পূজা করিত। ইবন ইসহাক বলিয়াছেন, নাখলার একটি কুঠুরির নাম ছিল উষ্যা। কুঠুরিটি রক্ষণাবেক্ষণ করিত বনী শায়বানের লোকেরা। শায়বানীরা ছিল কুরায়শদের সহিত সন্ধিবদ্ধ। কুরায়শ ও বনী কিনানাদের ইহাই ছিল সর্ববৃহৎ মূর্তি। আমর ইব্ন লুহাই বনী কিনানা ও কুরায়শদেরকে বলিয়াছিল, তোমাদের প্রভু শীতকালে তায়েফে আসিয়া লাতের সহিত এবং গ্রীষ্মকালে উয্যার সহিত কাল যাপন করে। লোকেরা তাই প্রতিমা দুইটিকেই সম্মান করিত এবং প্রতিমা দুইটির জন্য তাহারা কক্ষ নির্মাণ করিয়াছিল। সেই কালে কা'বা গৃহের উদ্দেশ্যে যেমন কুরবানীর পশু প্রেরণ করা হইত, তেমনি তাহারা কুরবানীর পশু প্রেরণ করিত ওই প্রতিমা দুইটির জন্যও (তাফসীর মাযহারী, ৯খ., পৃ. ১১৬)।
হযরত আবুত তুফায়ল (রা) সূত্রে বায়হাকী বর্ণনা করিয়াছেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (স) হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদকে গাতাফান জনপদে পাঠাইলেন। তিনি সেইখানে পৌছিয়া সেখানকার বাবলা বৃক্ষগুলিকে কাটিয়া ফেলিলেন এবং উয্যা প্রতিমাটিকে ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন, তাহার পর রাসূলুল্লাহ (স) সকাশে ফিরিয়া আসিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সেইখানে তুমি কি কিছু দেখিতে পাইয়াছ? খালিদ (রা) বলিলেন, না। তিনি বলিলেন, তবে তো তুমি কিছুই ভাঙ্গিতে পার নাই। খালিদ (রা) পুনরায় সেইখানে গেলেন। দেখিলেন, প্রতিমা রক্ষণাবেক্ষণকারীরা সেখানে জড়ো হইয়া কি যেন শলাপরামর্শ করিতেছে। খালিদ (রা)-কে দেখিয়া তাহারা পাহাড়ের দিকে পালাইয়া গেল। তাহারা চিৎকার দিয়া বলিতে লাগিল, ওহে উয্যা! ওকে ধর, হত্যা কর, নচেৎ অপদস্থ হইয়া মরিয়া যাও। তাহাদের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মাথা ও মুখে ধুলি উড়াইতে উড়াইতে সম্মুখে আগাইয়া আসিল আলুথালু কেশবিশিষ্ট এক বিরাট নারী মূর্তি। খালিদ (রা) অসি উত্তোলন করিয়া বলিয়া উঠিলেন, আমি তোমাকে মানি না। তোমাকে পবিত্রও মনে করি না। আমি দেখিতে পাইতেছি, আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করিয়াছেন। এই কথা বলিয়াই তিনি তাহার হাতের অসি দ্বারা ওই কু-দর্শনা নারীকে দুই টুকরা করিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তিনি সবকিছু খুলিয়া বলিলেন। তিনি বলিলেন, ওইটাই ছিল উষ্যা। তোমাদের শহরে উহার উপাসনা আর হইবে না জানিয়া আজ হইতে সে চির দিনের জন্য নিরাশ হইয়া গেল (তাফসীর মাযহারী, ৯খ., পৃ. ১১৬)।
দাহহাক বর্ণনা করিয়াছেন, উয্যা ছিল বনী গাতাফান জনপদের একটি প্রতিমার নাম। প্রতিমাটি প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল সা'ঈদ ইব্ন সালেম গাতাফানী নামক এক ব্যক্তি। সে একবার মক্কা শরীফে দেখিতে পাইল, লোকজন সাফা ও মারওয়া পাহাড় দুইটির মাঝে দৌড়াদৌড়ি করিতেছে। আপন জনপদে ফিরিয়া আসিয়া সে তাহাদের গোত্রের লোকদিগকে বলিল, মক্কাবাসীদের রহিয়াছে সাফা ও মারওয়া। তোমাদের সেই রকম কিছুই নাই। তাহারা একজনের উপাসনা করে। তোমাদের তো কোন উপাস্য নাই। লোকেরা বলিল, তবে আমরা কি করিতে পারি? সা'ঈদ বলিল, আমিই সবকিছু ঠিকঠাক করিয়া দিব। এই কথা বলিয়া সে সাফা ও মারওয়া পাহাড় হইতে একটি করিয়া পাথর আনিল। কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখিয়া পাথর দুইটি স্থাপন করিল একটি খোলা ময়দানে। সা'ঈদ বলিল, এই দুইটি পাথরই তোমাদের সাফা ও মারওয়া। ইহার পর মধ্যবর্তী এক বৃক্ষের নীচে তিনটি বৃহৎ পাথর সাজাইয়া দিয়া বলিল, আর ইহা হইল তোমাদের প্রভু। তখন হইতে লোকেরা সেইখানে দৌড়াদৌড়ি করিতে শুরু করিল এবং মধ্যবর্তী পাথর তিনটির পূজা করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন মক্কা জয় করিলেন, তখন খালিদ (রা)-কে সেখানে প্রেরণ করিয়া তাহাদের সবকিছু ধ্বংস করিয়া দিলেন (তাফসীর মাযহারী, ৯খ., পৃ. ১১৬)।
কাতাদা বলিয়াছেন, মানাত ছিল কাদীদ নামক স্থানে রক্ষিত বনী খুযা'আ গোত্রের একটি বিগ্রহ। 'আইশা (রা) বলিয়াছেন, মানাত ছিল আনসারদের প্রতিমা। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আনসাররা মানাতকে সম্মান করিত। আর মানাত ছিল কাদীদের নিকট। ইব্ন যায়দ বলিয়াছেন, মানাত ছিল মুশাল্লাল নামক স্থানের একটি প্রকোষ্ঠ। কা'ব গোত্রের লোকেরা তাহার পূজা-অর্চনা করিত। দাহহাক বলিয়াছেন, বনু খুযা'আ এবং বনূ হুযায়লের একটি প্রতিমা ছিল। মক্কাবাসীরা তাহার পূজা করিত। কেহ কেহ বলিয়াছেন, "লাত, উয্যা ও মানাত” তিনটি বিগ্রহ মূর্তিই ছিল মক্কার কা'বা প্রাঙ্গণে। মুশরিকরা সেইগুলির পূজা করিত। মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ সালিহী তাঁহার সুবুলুল হুদা পুস্তকে লিখিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা বিজয়ের সাথে সাথে সা'দ ইব্ন যায়দ আশহালীকে মানাত প্রতিমা ধ্বংসের জন্য প্রেরণ করিলেন। প্রতিমাটি ছিল মুশাল্লাল পাহাড়ে। আর মুশাল্লাল হইতেছে ওই পাহাড়, যাহা অতিক্রম করিয়া কাদীদ উপত্যকায় যাইতে হয়। মদীনার আওস, খাযরাজ ও গাসসান গোত্রের প্রতিমার নামও ছিল মানাত। একজন পুরোহিতের উপরে ছিল প্রতিমাটির দেখাশোনার ভার। সাঈদ ইব্ন্ন যায়দ (রা) বিশজন অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া সেখানে পৌছিলেন। পুরোহিত জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি চাও? সা'দ (রা) বলিলেন, মানাতকে ধ্বংস করিতে চাই। পুরোহিত বলিল, তুমি জান আর সে জানে। সা'দ (রা) পায়ে হাঁটিয়া মানাত প্রতিমাটির দিকে আগাইয়া গেলেন। দেখিলেন কৃষ্ণমুখী বিবস্ত্র এলোকেশী এক কুৎসিত রমণী বুক চাপড়াইতে চাপড়াইতে মৃত্যু কামনা করিতে করিতে আগাইয়া আসিতেছে। সা'দ (রা) তাহার তলোয়ার দ্বারা সজোরে আঘাত করিলেন। সাথে সাথে সে ধ্বংস হইয়া গেল (তাফসীর মাযহারী, ৯খ., পৃ. ১১৬-১১৭)।
কিতাবুল আসনাম প্রণেতা ইব্দুল কালবী বলিয়াছেন, মক্কার মুশরিকরা তাহাদের পূজনীয় প্রতিমাসমূহকে আল্লাহ্র কন্যা মনে করিত (তাফসীর মাযহারী, ৯খ., পৃ. ১১৭)।
জারীর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, তুমি কি আমাকে যুল-খালাসা হইতে মুক্তি দিবে না? আমি বলিলাম, হাঁ, অবশ্যই মুক্তি দিব। ইহার পর আমি রওয়ানা দিলাম আহমাস গোত্রের এক শত পঞ্চাশজন সওয়ারী নিয়া। তাহারা সবাই ঘোড়ায় সওয়ার ছিল। আমি ঘোড়ার পিঠে মজবুতভাবে বসিতে পারিতেছিলাম না। রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই কথা বলিলে তিনি আমার বুকে হাত রাখিলেন। এমনকি আমি নিজের বুকে তাঁহার হাতের স্পর্শ অনুভব করিলাম। তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ! ইহাকে ঘোড়ার পিঠে মজবুতভাবে কায়েম রাখিও, ইহাকে হেদায়াত দানকারী ও হেদায়াত গ্রহণকারীতে পরিণত করিও। জারীর বলেন, ইহার পর আমি কখনও ঘোড়া হইতে পড়িয়া যাই নাই। তিনি বলেন, যুল-খালাসা ছিল য়ামানের খাস'আম ও বাজীলা গোত্রের মূর্তিগৃহ। এই গৃহে তাহারা মূর্তিপূজা করিত। ইহাকে কা'বাও বলা হইত। তিনি সেইখানে পৌছিয়া ওই গৃহে আগুন লাগাইয়া দিলেন এবং উহা ভাঙ্গিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিলেন (বুখারী, কিতাবুল সাগাষী, ২খ., পৃ. ৬২৪)।
য়ামানের একটি কবিলার নাম খাওলান। দশজনের একটি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, আমরা কবিলার প্রতিনিধি। তাহাদের বিগ্রহের নাম ছিল 'আম্মু আনাস'। রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে চাহিলেন, উহার কি করা হইয়াছে? উত্তরে বলা হইল, একজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও তাহাদের সাংগপাংগ ছাড়া আর সকলেই উহা বর্জন করিয়াছে। দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া উহা ধ্বংস করিবেন বলিয়া তাহারা মনোভাব ব্যক্ত করিলেন। তাহারা বলিলেন, আমরা, এতকাল উহার প্রতারণা জালে আবদ্ধ ছিলাম ও ফেৎনায় ডুবিয়া ছিলাম। রাসুলুল্লাহ (স) উহার সর্ববৃহৎ ফেতনা অবগত হইতে চাহিলেন। তাহারা বলিলেন, এক বৎসর অনাবৃষ্টি দেখা দিল। গৃহে যাহা সঞ্চিত ছিল খাইয়া ফেলিলাম, অর্থ যাহা কিছু ছিল তাহা সংগ্রহ করিয়া এক শত ষাঁড় ক্রয় করিয়া উহার উদ্দেশ্যে কুরবানী করিলাম। আমরা ক্ষুধায় কাতর এবং তাহা ভক্ষণের আবশ্যকতা আমাদেরই অধিক ছিল; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও আমরা তাহা স্পর্শ করিলাম না। হিংস্র জন্তুরা তাহাতে তাহাদের উদর পূর্ণ করিল। ঐ মুহূর্তেই মেঘ দেখা দিল ও বারিপাত হইল। আমাদের উক্তিকারী ঘোষণা করিল, "ইহা আম্মু আনাসের অনুগ্রহ"। মাল এবং পশুও উহার জন্য ভাগ করিয়া দেওয়া হইত। শস্য হইলে মাঠের উৎকৃষ্ট অংশ উহার নামে এবং বাকী অংশ আল্লাহর নামে উৎসর্গীকৃত হইত।" রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাদের সম্বন্ধে আল্লাহ নাযিল করিয়াছেন:
وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَا مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيبًا فَقَالُوا هَذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهَذَا لشُرَكَائِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلَا يَصِلُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَى شُرَكَائِهِمْ سَاءَمَا يَحْكُمُونَ .
""আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করিয়াছেন তন্মধ্য হইতে তাহারা আল্লাহর জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলে, ইহা আল্লাহ্ জন্য এবং ইহা আমাদের দেবতার জন্য। যাহা তাহাদের দেবতাদের অংশ তাহা আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এবং যাহা আল্লাহ্ অংশ তাহা তাহাদের দেবতাদের কাছে পৌঁছায়; তাহারা যাহা মীমাংসা করে তাহা নিকৃষ্ট” (৬ঃ ১৩৬)।
তাহারা বলিলেন, আমরা আম্মু আনাসের নিকট বিচার প্রার্থনা করিতাম। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, শয়তানের দলই তোমাদের সহিত কথা বলিত। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে ফরয সংক্রান্ত বিষয়াদি উপদেশ দিলেন। বিদায়ের পূর্বে প্রত্যেকে বিশ উকিয়া রৌপ্য লাভ করিলেন। দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া তল্পীতল্পার বন্ধন মোচন করিবার পূর্বেই তাহারা আম্মু আনাসকে ধ্বংস করিয়া দিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৮৩; সাইয়্যেদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ১০৬৯-১০৭১)।
যুল-কাফ্ফায়ন দাওস কবিলার একটি কাষ্ঠ বিগ্রহ। তায়েফ অভিযানের পূর্ব মুহূর্তে তাহা ধ্বংস করিবার জন্য একটি সারিয়্যা প্রেরিত হইল। আমীর ছিলেন হযরত তুফায়ল ইবন আমর দাওসী (রা)। কার্যশেষে সৈন্য লইয়া তায়েফে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইবার জন্য তাঁহার প্রতি নির্দেশ ছিল। সেইখানে উপস্থিত হইয়া তিনি উক্ত কাষ্ঠমুর্তি ধ্বংস করিয়া ফেলিলেন। তারপর দাওস কবিলার চারি শত-মতান্তরে বার শত লোকসহ তিনি তায়েফে রাসুলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন (আসাহহুস্ সিয়ার, পৃ. ২৫৩)।
'সুওয়া' বিগ্রহের উপাসক ছিল বানু হুযায়ল। তাহা ধ্বংস করিবার জন্য কতিপয় সাহাবীসহ হযরত আমর (রা) প্রেরিত হইলেন। 'সুওয়া'-এর তত্ত্বাবধায়ক বলিল, তোমরা ইহা ধ্বংস করিতে সমর্থ হইবে না। কারণ সে আত্মরক্ষা করিবে। হযরত আমর (রা) বলিলেন, এখন পর্যন্ত অসত্যকে আকড়াইয়া আছ! উহা কি দেখিতে ও শুনিতে পায়? এই বলিয়া তিনি তাহা ধ্বংস করিয়া ফেলিলেন এবং তত্ত্বাবধায়ককে বলিলেন, মূর্তি পূজার অসারতা কি বুঝিতে পারিলে? সে বলিয়া উঠিল, আমি আল্লাহ্ ওয়ান্তে ইসলাম গ্রহণ করিগ্রাম (আলাহহুস সিয়ার, পৃঃ ২৩৯)।
দানবীর হাতেম তাঈ'র কবিলার নাম তাঈ। তাহাদের বিগ্রহের নাম 'ফুলস' বা 'কালাস' অথবা 'কালিসা'। তাহা ধ্বংস করিবার জন্য হয়রত আলী (রা)-কে প্রেরণ করা হইয়াছিল। বাহিনীতে মুজাহিদ ছিলেন এক শত পঞ্চাশজন। তাহাদের বাহন ছিল এক শত উষ্ট্র ও পঞ্চাশটি অশ্ব। তিনি প্রভাতে অতর্কিত আক্রমণ চালাইয়া 'ফুলস' বা 'কালাস' মূর্তি ধ্বংস ও ভস্মীভূত করিলেন (যাদুল মাআদ, ২খ., পৃ. ২০৪)।
ইবন ইসহাক বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (স) হুনায়ন হইতে রওয়ানা হইয়া নাখলা, ইয়ামানিয়া, কারণ ও মালীহ হইয়া 'বাহরাৎ-রুগা' আসিয়া পৌঁছেন। ইহা 'লিয়া' এলাকায় অবস্থিত। এইখানে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এই 'লিয়া'য় ছিল মালিক ইন আওফের দুর্গ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে তাহা ধ্বংস করা হয়। তারপর সেইখাম হইতে তায়েফে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবাগণ কিল্লার পাশে অবস্থান গ্রহণ করেন।
জামাওলানী শাহ আবদুল হক মুহাদ্দিছে দিইলাতী (র) বলেন, এই অবরোধ চলাকালে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আলী (রা)-কে আশেপাশের ছাকীফ গোত্রীয়দের দেবমন্দিরসমূহ ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করেন। তিনি কয়েক দিনের মধ্যে সকল দেবমন্দির ও তাহাতে সংস্থাপিত মূর্তিগুলি ধ্বংস করিয়া দেন (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৫৫)।
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدَأَ وَلا سُوَاعًا وَلَا يَغُوْثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا.
"এবং তাহারা বলিয়াছিল, তোমরা কখনও পরিত্যাগ করিও না তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করিও না ওয়াদ, সুওয়া'আ, ইয়াগৃছ, ইয়া'উক ও নাসরকে” (৭১: ২৩)।
মুহাম্মাদ ইব্ন কা'বের উক্তি উল্লেখ করিয়া বাগাবী লিখিয়াছেন, তাহাদের উপাস্যগুলি ছিল তাহাদের সজ্জন পিতৃপুরুষদের কাল্পনিক মূর্তি, যাহারা অতীত হইয়াছিল হযরত আদম ও হযরত নূহ (আ)-এর মধ্যবর্তী সময়ে। শয়তান তাহাদেরকে এইমর্মে প্ররোচণা দিয়াছিল যে, ওই সকল সাধু পুরুষদের বিগ্রহ সম্মুখে রাখিয়া যদি তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর, তাহা হইলে তোমাদের ইবাদত হইবে অত্যধিক গ্রহণীয়। এইভাবে সে সক্ষম হইল পরের প্রজন্মকে আগের প্রজন্মের সাধু পুরুষদের বিগ্রহ মূর্তির অনুরাগী হইতে। এইভাবে বংশানুক্রমিকভাবে চলিতে লাগিল পিতৃ পুরুষদের বিগ্রহ মূর্তির উপাসনা। ঐ মূর্তিগুলিকেই তাহারা বলিত দেব-দেবী (তাফসীরে মাযহারী, ১০খ., পৃ. ৭৬)।
হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, কিছু সংখ্যক পুণ্যবান ব্যক্তিত্ব ছিলেন হযরত নূহ (আ)-এর সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষ। তাহাদের তিরোধানের পর শয়তান তাহাদেরকে বুঝাইল, তোমাদের উচিৎ তাহারা যেইখানে উপবেশন করিতেন সেইখানে তাহাদের প্রতিমা বানাইয়া তাহাদের পুণ্যময় স্মৃতি রক্ষা করা। তাহাই করিল তাহারা। কিন্তু মূর্তিগুলির আরাধনা তাহারা করিত না। আরাধনা করিত তাহাদের পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা। তাহারা ধরিয়াই নিল যে, সেই মূর্তিগুলিই তাহাদের দেবতা।
'তিনি আরও বলিয়াছেন, মহাপ্লাবনে ঐ মূর্তিগুলি জলমগ্ন হইয়াছিল, চাপা পড়িয়াছিল মাটির তলায়। পরে শয়তান সেইগুলিকে মক্কাবাসীদের জন্য পুনরুদ্ধার করে। এইভাবে দূমাতুল জান্দালের কিলাব গোত্রের লোকেরা পূজা করিতে শুরু করে 'ওয়াদ্দা' প্রতিমাটির। সুওয়া'আ হইয়া যায় হ্যায়ল গোত্রের দেরতা। 'ইয়াগুদ্ধ' প্রথমে পূজিত হয় রনী মুররা গোত্রের লোকদের দ্বারা। পরে তাহার পুজারী হয় বনী আতফেরা। তাহারা প্রতিমাটিকে লইয়া যায় সাবা অঞ্চলে। ইয়া'উকের উপাসনা করিত হামাদান গোত্র এবং বনী হুযায়ল ভক্ত ছিল 'নাসর' প্রতিমার (তাফসীরে মাযহারী, ১০খ., পৃ. ৭৭)।
ইসমাইল (আ) বংশীয় ও অন্যান্য গোত্রের যাহারা দীনে ইসমাইলকে বর্জনকালে বিভিন্ন দেবদেরী গ্রহণ করিয়াছিল এবং নিজেদের নামে সেইগুলির নামকরণ করিয়াছিল তাহারা হইল: হুয়ায়ল ইব্ন মুদুরিকা ইব্ন ইন্দ্রয়াস ইব্ন মুদার-এর বংশধর। ইহারা- 'সুওয়া'কে উপাস্যরূপে গ্রহণ করিয়াছিল এবং তাহাদের দেবমূর্তি রূহাতে ছিল। কুরআন উপগোত্র কালব ইবন ওয়ারা। তাহারা দূমাতুল জান্দাল অঞ্চলে ওয়াদ্দ দেবমূর্তি স্থাপন করিয়াছিল।
ইবন ইসহাক বলেন, কা'ব ইব্ন মালিক আনসারী (রা) তাহার কবিতায় বলিয়াছেন, আমরা লাত, উয্যা, ওয়াদ্দ মূর্তিগুলি ভুলিয়া যাইব এবং সেইগুলির গলার ও কানের গয়নাগুলি ছিনাইয়া লইব। ইসলামী আমলে ওয়াদ্দ মূর্তির বিনাশ সাধন করা হয় (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৮৪)।
ইবন ইসহাক বলেন, বনী তাঈ-এর আন'উম আর বনী মাযহিজ গোত্রের জুরাশবাসীরা জুরাশে 'ইয়াগৃছ' মূর্তি স্থাপন করিয়াছিল (আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৮৪)।
ইবন ইসহাক আরও বলেন, হামাদানের শাখাগোত্র খাওয়ানরা ইয়ামানের হামাদান এলাকায় ইয়া'উক নামক মূর্তি স্থাপন করিয়াছেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ.-৮৪)।
হিময়ার গোত্রের শাখাগোত্র যুলকিলা হিময়ারী অঞ্চলে 'নাসর' নামক মূর্তি স্থাপন করিয়া ছিল। ইসলামী যুগে এই সকল মূর্তির ধ্বংসসাধন করা হয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন- নাবabiyya, 1st ed., p. 84).
ইব্ন ইসহাক বলেন, সান'আ এলাকায় রিআম নামে হিময়ারী ও ইয়ামানীদের একটি উপসনালয় ছিল। ঐ ঘরে নানা রকমের বলি দেওয়া হইত। ইসলামী যুগে তাহাও ধসাইয়া দেওয়া হয় (ইবুন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৯১)।
ইবন ইসহাক আরও বলেন, বনু রবীআ ইবনু কা'ব ইবন সা'দ ইবন যায়দ মানাত ইবন তামীম-এর 'রুযা' নামক একটি উপাসনালয় ছিল। ইসলামী যুগে তাহা ভাঙ্গিয়া দেওয়া হয়।
সেই উপলক্ষে মুসতাওগীয় ইর্ন রবী'আ 'ইন্ন কা'ব ইবন সা'দ বলেন, 'রুযা' উপাসনালয়ে এমন আঘাত হানিয়াছিলাম যে, তাহা বিরান ভূমিতে পরিণত হইয়াছে (আস-সীরাতুন- নাবabiyya, 1st ed., p. 91).
ফুল-কা'আবাত ও উহার সেবায়েত
ইন ইসহাক বলেন, সানদাদ এলাকায় 'ওয়াইল ও ইয়াদেব-এর দুই ছেলে বকর ও তাঁগলিষ এর যুল-কা'আবাত নামে একটি উপাসনালয় ছিল।
এই উপাসনালয় সম্পর্কেই বন্ধু কায়স ইব্ন ছা'লাবা গোত্রের আ'শা বলেন, 'খাওয়াকনাক', ''সাদীর"ও 'বারিক নামক এলাকার মাঝে সানদাদ এলাকার চার কোণবিশিষ্ট ঘরের 'শপথ।
ইবন হিশাম বলেন, এই পংক্তিটি আসওয়াদ ইবন ইয়াফুর আন-নাহশালীর একটি কবিতার অংশ। আবু মুহরিষ খালাফ আহমার-এর নিকট পংক্তিটি ছিল এইরূপ: তারা খাওয়ারনাক, সাদীর, বারিক ও সিম্পাদ এলাকরি সম্মানিত ঘরের মালিক। ইসলামী যুগে এই সকল গৃহের বিনাশ সাধন করা হয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৯২)।
ইসাফ ও নাইলা
ইবন ইসহাক বলেন, আরবরা যমযম কূপের নিকট ইসাফ ও নাইলা নামক দুইটি মূর্তি স্থাপন করিয়াছিল। সেইখানে তাহারা কুরবানী করিত। আরবদের পৌরণিক কাহিনীমতে ইসাফ ও নাইলা ছিল জুরহুম গোত্রের দুই নারী-পুরুষ। ইসাফ হইল বাগঈ-এর পুত্র আর নাইলা হইল 'দীক'-এর মেয়ে। ইসাফ কা'বা গৃহের ভিতরে নাইলার সহিত অপকর্মে লিপ্ত হয়। তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে পাথরে পরিণত করেন।
ইবন ইসহাক বলেন, আমরাহ বিনত আবদুর-রাহমান ইবন সা'দ ইব্ন যুরারাহ বলিয়াছেন, হযরত আইশা (রা)-কে আমি বলিতে শুনিয়াছি, আমরা তো ইহাই শুনিয়া আসিতেছি যে, ইসাফ ও নাইলা বনূ জুরহুমের একজোড়া নারী-পুরুষ। তাহারা কা'বা শরীফে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার ফলে আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে পাথরে রূপান্তরিত করেন। আল্লাহই অধিক অবগত।
ইবন ইসহাক বলেন, আবূ তালিঘ বলিয়াছেন, ইসাফ ও নাইলা' নিকটস্থ জলস্রোত প্রবাহিত হওয়ার স্থানে অবস্থিত, যেখানে আশআরী সম্প্রদায় নিজেদের উট বসায়। ইসলামী যুগে সকল মূর্তি ও অপরীতির বিনাশ সাধন করা হয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৮৭)।
ইবন ইসহাক বলেন, আরবদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাড়িতে একটি করিয়া মূর্তি স্থাপন করিত এবং তাহার পূজা-অর্চনা করিত। তাহারা যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করিত তখন তাহারা বাহনে আরোহণ করার সময় মূর্তিটি স্পর্শ করিত। সফরে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে ইহাই ছিল তাহাদের শেষ কাজ। ফিরিয়া আসিয়াও ঘরে প্রবেশের পূর্বে ইহাই ছিল তাহাদের প্রথম কাজ। অতঃপর আল্লাই যখন তাঁহার রাসূল মুহাম্মাদ (স)-কে তাঁওহীদসহ প্রেরণ করিলেন, তখন কুরায়শরা বলাবলি করিত—
اجَعَلَ الْأَلِهَةَ إلها واحداً إِنَّ هَذَا لَشَى عُجَابٌ ...
"সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ বানাইয়া লইয়াছে! ইহা তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার" (৩৮:৫)।
আববরা কা'বা শরীফের পাশাপাশি কয়েকটি 'তাগুত তথা মূর্তিঘর স্থাপণ করিয়া এইগুলিকে তাহারা কা'বা শরীফের মতো সম্মান করিত। এইগুলির সেরক ও তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিত। কা'বা শরীফের ন্যায় সেই গুলিরও তাওয়াক করিত এবং সেখানেও, পর বলি দিত। অবশ্য সেগুলির উপর কা'বার শ্রেষ্ঠত্ব তাহারা স্বীকার করিত। কেননা তাহারা জানিত য়ে, কা'বা শরীফ হইতেছে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর নির্মিত ঘর এবং তাঁহার, মসজিদ (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন্ন-নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৮৮)।
বর্ণিত রহিয়াছে, বনী আসরারের এক প্রতিমার ভিতর হইতে লোকেরা অদ্ভুত কথাবার্তা শুনিয়ে পাইত। অতঃপর, সমল, ইন্ন আমর আয়রা গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করে। প্রতিমার মুখে তাহারা যাহা শুনিয়া ছিল তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বর্ণনা করিলে তিনি বলিলেন, সেই প্রতিমায় একটি জিন ছিল। সে বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ করিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, সে (উক্ত জিন) ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, ঐ প্রতিমা হইতে আর কোন অওয়াজ হইবে না (খাসাইসুল-কুবরা, ২খ., পৃ. ২৪)।
আবূ নু'আয়মের বর্ণনায় রাশিদ ইবন আবদে রববিহি বলেন, বনূ যুফার নৈবেদ্য দিয়া আমাকে 'সুওয়া'র নিকট প্রেরণ করেন। আমি 'সুওয়া'র পূর্বে আরও একটি প্রতিমার নিকট পৌছিলাম। আমি উহার পেট হইতে অদ্ভুত আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মূর্তির পেট হইতেও অনুরূপ আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। মক্কা বিজয়ের পর এই সকল মূর্তির বিনাশ সাধন করা হয় (খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩২)।