📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বৃক্ষের আগমন
হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, একদা আমরা মহানবী (স)-এর সহগামী হইয়া ভ্রমণ ব্যাপদেশে একটি বিশাল উপত্যকায় পৌছিলাম। মহানবী (স) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে প্রস্থান করিলেন। পানির পাত্র সহ আমিও তাঁহার অনুগমন করিলাম। চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া তিনি এমন কোন গোপন স্থান পাইলেন না যেখানে তিনি তাঁহার প্রয়োজন সমাধা করিতে পারেন। উপত্যকার শেষ সীমান্তে দুইটি বৃক্ষ দৃষ্টিগোচর হইল। মহানবী (স) একটি বৃক্ষের নিকটবর্তী হইয়া উহার, শাখা ধরিয়া বলিলেন, “ওহে বৃক্ষ শাখা। আল্লাহ্র আদেশে তুমি আমার প্রতি অবনমিত হও”।
লাগাম পরা উষ্ট্র যেমন চালকের ইঙ্গিতে অবনমিত হয়, তেমনই বৃক্ষটি মহানবী (স)-এর প্রতি অবনমিত হইল। এইরূপে তিনি দ্বিতীয় বৃক্ষটির নিকট গমন করিয়া উহার শাখা ধরিয়া উহাকেও অবনমিত করিলেন। বৃক্ষ দুইটি পরস্পর বন্ধন কৃত অবস্থায় একত্র মনে হইলে অতঃপর তিনি বলিলেন, "তোমরা আল্লাহ্র আদেশে একত্র হইয়া যাও।” উহারা একত্র হইল। একটি অন্তরালের সৃষ্টি হইল। হযরত জাবির বলেন, আমি দূরে সরিয়া গিয়া বসিয়া বসিয়া আপন মনে চিন্তা করিতে লাগিলাম, দেখি মহানবী (স) আমার সম্মুখে উপস্থিত। বৃক্ষ দুইটিকে দেখিলাম, সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া পৃথক হইয়া গিয়াছে। আরও দেখিলাম, মহানবী (স) সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিলেন এবং নিজের শির মুবারক ডাইনে বামে দোলাইলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৫; দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ., ৩৩৪; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৬; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৬১৯)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, মক্কার জনৈক পাষণ্ড কর্তৃক প্রহৃত হইয়া রক্তরঞ্জিত দেহে দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে মহানবী (স) নিভৃতে বসিয়া ছিলেন। ইত্যবসরে হযরত জিবরাঈল (আ) তথায় আগমন করিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে নবী। আপনার কী হইয়াছে? তিনি বলিলেন, মক্কাবাসীরা আমার এই অবস্থা করিয়াছে। হযরত জিবরাঈল বলিলেন, "আপনি কি আনন্দিত হইবেন, যদি আমি এখনই একটি নিদর্শন প্রদর্শন করি? তিনি সম্মতি দান করেন। হযরত জাবির (রা) বলেন, হযরত জিবরাঈল উপত্যকার পশ্চাতে একটি বৃক্ষ দেখাইয়া মহানবী (স)-কে বলিলেন, হে নবী! আপনি ঐ বৃক্ষটিকে আহবান করুন। তিনি বৃক্ষটিকে ডাক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষটি হাঁটিয়া অগ্রসর হইয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতঃপর হযরত জিবরাঈল বলিলেন, হে নবী! আপনি বৃক্ষটিকে ফিরিয়া যাইতে আদেশ করুন। তিনি আদেশ করিলে গাছটি স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিল। অনন্তর মহানবী (স) বলিলেন, ইহাই আমার জন্য যথেষ্ট (প্রাগুক্ত)।
ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, মহানবী (স) এক সময় পৌত্তলিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া মনঃক্ষুণ্ণ হৃদয়ে দিনাতিপাত করিতেছিলেন। তিনি আল্লাহ পাকের নিকট দু'আ করিলেন, "হে পালনকর্তা! তুমি অদ্য আমাকে এখনই একটি নিদর্শন প্রদর্শন কর, যাহার পরে আর কেহ আমার প্রতি অসত্যারোপ করিতে সক্ষম, হইবে না"। হযরত 'উমার (রা) বলেন অতঃপর মহানবী (স) আল্লাহ পাকের নির্দেশে মদীনার গিরিপ্রান্তর হইতে একটি বৃক্ষকে ডাক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষটি ভূমি আঁচড়াইয়া মহানবী (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হইল। অনন্তর গাছটি তাঁহার পুননির্দেশানুসারে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "ইহার পর আমার স্বজাতি আমার প্রতি অসত্যারোপ করিতে আর সক্ষম হইবে না" (প্রাগুক্ত; কানযুল-উম্মাল, ১২খ., পৃ. ৩৫৪; সুবুলুন হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫০০;, দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩২)।
হাসান (র) সূত্রে ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেন, মহানবী (স)-এর প্রতি তাঁহার স্বজাতির অসত্যারোপ তাঁহাকে ব্যথিত ও বিচলিত করিয়া তুলিয়াছিল। দুঃখ জর্জরিত ও ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে তিনি মক্কা নগরীর গিরি-উপত্যকায় বিচরণ করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে মুনাজাত করিলেন, ইলাহী। তুমি আমাকে এখন একটি বিষয় প্রদর্শন কর যাহাতে আমার অশান্ত হৃদয় প্রশান্ত হয় ও দুঃখ-ক্লেশ প্রশমিত হয়। ইহাতে আল্লাহ পাক তাঁহার প্রতি প্রত্যাদেশ করিলেন, হে আমার প্রিয়তম রাসূল! ঐ বৃক্ষগুলি হইতে আপনার ইচ্ছামত শাখাসমূহকে আপনার প্রতি আহবান করুন। তিনি তাহাই করিলেন। শাখাগুলি বৃক্ষ হইতে পৃথক হইয়া মাটি দলিত মথিত করিয়া তাঁহার প্রতি অগ্রসর হইল। তাঁহার সন্নিকটে উপস্থিত হইলে তিনি আদেশ করিলেন, তোমরা স্বস্থানে ফিরিয়া যাও। শাখাগুলি স্বস্থানে ফিরিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ পাকের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৭; কানযুল 'উম্মাল, ১২খ., পৃ. ৩৫৪; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫০০)।
হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) সূত্রে ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করেন, হযরত ইবন 'আব্বাস বলেন, একদা বানু আমেরের জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল, হে মহান নবী। আপনার গ্রীবাদ্বয়ের মধ্যস্থিত মোহরে নুবৃওয়তটি কি আমাকে দেখাইবেন? যেহেতু আমি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি তাহাকে বলিলেন, আমি কি তোমাকে একটি নিদর্শন দেখাইব? সে বলিল, অবশ্যই। হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, মহানবী (স) একটি খেজুর গাছের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে বলিলেন, ঐ শাখা-প্রশাখাহীন নাঙ্গা গাছটিকে ডাক দাও। তখন সে বৃক্ষটিকে ডাক দিল। মাটি আঁচড়াইয়া বৃক্ষটি তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতঃপর মহানবী (স) উহাকে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিতে বলিলেন। তৎক্ষণাৎ বৃক্ষটি স্বস্থানে প্রস্থান করিল। অতঃপর আমিরী তাহার স্বজাতিকে আহবান করিয়া বলিল, হে আমের গোত্রের জনগণ! আমি অদ্যাবধি এই লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ যাদুকর দেখি নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৭, হাদীছটি আবূ নু'আয়ম সূত্রে ইমাম আহমাদ, বুখারী, তিরমিযী ও হাকেম বর্ণনা করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৯; দালাইলুন- নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩৫)।
মুহাম্মাদ ইব্ন আবী 'উবায়দা সূত্রে ইমাম বায়হাকী হইতে বর্ণিত। হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, একদা আমের গোত্রের এক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া বলিল, আমি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও বিজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তি! তাহাতে আপনার কি কোন অভিযোগ আছে? আর আপনি মানুষকে যে বিষয়ের প্রতি আহবান করিতেছেন, সে ব্যাপারে আপনার নিকট দৃষ্টান্তমূলক কোন প্রমাণ আছে? তিনি বলিলেন, আমি মানুষকে আল্লাহ এবং ইসলামের প্রতি আহবান করি। সে বলিল, আপনি সঠিক করিতেছেন না। আপনার দাবির সমর্থনে আপনার নিকট কি কোন নিদর্শন আছে? তিনি বলিলেন, অবশ্যই আছে। তোমার বাসনা থাকিলে আমি তোমাকে নিদর্শন দেখাইতে পারি। তাহাদের সম্মুখে ছিল একটি বৃক্ষ। মহানবী (স) বৃক্ষটির শাখার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলিলেন, ওহে বৃক্ষশাখা! তুমি শীঘ্র আমার নিকট আইস। সঙ্গে সঙ্গে পল্লবিত শাখা বৃক্ষ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া ভূপাতিত হইল এবং ভূমি আছড়াইতে আছড়াইতে তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতঃপর তিনি শাখাটিকে স্বস্থানে প্রস্থান করিতে বলিলে উহা স্বস্থানে প্রস্থান করিল। এই ঘটনার পর আমেরী তাহার গোত্রকে সম্বোধন করিয়া বলিল, "হে আমের ইবন সা' সা' সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ বা তাঁহার মতাদর্শ সম্পর্কে আমি আর কোন দিনই তোমাদেরকে তিরস্কার করিব না" (প্রাগুক্ত, বায়হাকীর, দালাইল, ৬খ., পৃ. ১৬; দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, ৩৩৫; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৯)।
হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) সূত্রে ইমাম বায়হাকী কর্তৃক বর্ণিত। হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, আপনার সহচরবৃন্দ আপনার সম্পর্কে এইসব কি বলেন? হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, সেই সময় মহানবী (স) পল্লবিত শাখাবিশিষ্ট ও শাখাহীন তরুলতার মধ্যখানে ছিলেন। তিনি লোকটিকে বলিলেন, আমি কি তোমাকে কোন নিদর্শন প্রদর্শন করিব? সে বলিল, নিশ্চয়। তখন তিনি একটি শাখাহীন বৃক্ষকে আহবান করিলেন। বৃক্ষটি মাটি ছেদ করিয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল এবং সিজদা করিল, মস্তক উঠাইল, দাঁড়াইয়া রহিল কিছুক্ষণ। রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে স্বস্থানে ফিরিয়া যাইতে বলিলে উহা প্রস্থান করিল। অনন্তর লোকটি তাহার স্বজাতিকে বলিল, তাই আমের ইবন সা' সা' গোত্র! আমি আর কোন দিন মুহাম্মাদের প্রতি অসত্যারোপ করিব না। তাহার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণে তোমাদেরকেও আর তিরস্কার করিব না" (প্রাগুক্ত; বায়হাকীর দালাইল, ৬খ., পৃ. ১৭)।
অপর একটি সূত্রে ইমাম বায়হাকী (রা) বলেন, হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, একদা এক বেদুঈন মহানবী (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিকট নিবেদন জানাইল, আমি কেমন করিয়া বুঝিব যে, আপনি আল্লাহর রাসূল? তিনি তাহাকে বলিলেন, তুমি কি চাও, আমি ঐ খেজুর বীথি হইতে একটি শাখাহীন খেজুর গাছ ডাকিয়া লইয়া আসি। তাহা হইলেই কি তুমি বুঝিবে যে, আমি আল্লাহর রাসূল এবং তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আমি নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল? লোকটি বলিল, হাঁ। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, মহানবী (স) একটি শাখাহীন গাছকে ডাক দিলেন। গাছটি খেজুর বাগান হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া ভূমিতে অবনমিত হইল এবং ভূমি দলিত মথিত করিয়া মহানবী (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতপর তিনি উহাকে স্বস্থানে প্রস্থান করিতে বলিলেন, তৎক্ষণাৎ উহা স্বস্থানে প্রস্থান করিল। বেদুঈন লোকটি সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষ্য প্রদান করিল, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল। সে ঈমান গ্রহণ করিল (প্রাগুক্ত; ৬খ., পৃ. ১৩৭; হাদীছটি ইমাম বুখারী তদীয় ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ., ৪৯৯; বায়হাকীর দালাইল, ৬খ., পৃ. ১৫)।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, এক ভ্রমণে আমরা মহানবী (স)-এর সফরসঙ্গী ছিলাম। পথে এক বেদুঈনের সহিত সাক্ষাৎ হইল। সে আমাদের নিকটবর্তী হইলে মহানবী (স) তাহাকে শুধাইলেন, কোথায় যাও। সে বলিল, আমার পরিবারের নিকট। তিনি বলিলেন, তোমার নিকট কল্যাণজনক কিছু আছে কি? সে বলিল, সেইটা আবার কি! তিনি বলিলেন, তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই। তিনি এক, তাঁহার কোন সমকক্ষ নাই আর মুহাম্মদ তাঁহার দাস ও রাসূল। সে বলিল, আপনার কথার সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে? তিনি বলিলেন, ঐ গাছটিই তাহার প্রমাণ দিবে। গাছটি ছিল উপত্যকার শেষ প্রান্তে। তিনি উহাকে ডাক দিলেন। মাটি আছড়াইতে আছড়াইতে উহা মহানবী (স)-এর প্রতি অগ্রসর হইল। তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া আল্লাহ পাকের একত্ব ও মহানবী (স)-এর নবৃওয়াতের উপর তিনবার সাক্ষ্য প্রদান করিল। অতঃপর মহানবী (স)-এর নির্দেশানুসারে উহা স্বস্থানে প্রস্থান করিল। আর বেদুঈন লোকটি তাহার স্বজাতির নিকট গমন করিল এবং বলিল, তাহার গোত্রের লোকো তাঁহার অনুসরণ করিলে তাহাদিগকে সঙ্গে লইয়া আসিবে। অন্যথা সে একাই তাঁহার নিকট আসিবে এবং তাঁহার অনুগামী হইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৮; ইব্ন হিববান ও হাকেমও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। হাকেম কর্তৃক উহা প্রত্যয়িত হইয়াছে। যাহাবী বলেন, হাদীছটির বর্ণনা-পরম্পরা অতি উত্তম। সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৯)।
হযরত গায়লান ইব্ন সালামা আছ-ছাকাফী (রা), যিনি তায়েফ বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, বলেন, একবার আমরা নবী করীম (স)-এর সঙ্গে ভ্রমণে বাহির হইলাম। পথিমধ্যে আমরা প্রভূত অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম। এক সময় আমরা বিক্ষিপ্ত নাতিদীর্ঘ খেজুর বাগানের মধ্য দিয়া অতিক্রম করিতেছিলাম। মহানবী (স) আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, গায়লান! ঐ ছোট খেজুর গাছ দুইটিকে ডাক দাও, উহাদেরকে পরস্পর মিলিত হইবার নির্দেশ প্রদান কর, যেন উহাকে আড়াল হিসাবে ব্যবহার করিয়া আমি প্রয়োজন সমাধা করিতে পারি। আমি গাছ দুইটির নিকট গেলাম। উহাদিগকে বলিলাম, আল্লাহর রাসূল তোমাদেরকে পরস্পর মিলিত হইবার আদেশ প্রদান করিয়াছেন। ইহাতে একটি গাছ ভূমিতে অবনমিত হইয়া হেঁচড়াইতে হেঁচড়াইতে অপরটির নিকট গমন করিল। পরস্পর মিলিত হইলে মহানবী (স) বাহন হইতে অবতরণ করিলেন। উহাদের পশ্চাতে গমন করিয়া স্বীয় প্রয়োজন সমাধা করিলেন। অতঃপর গাছ দুইটিও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়া পূর্ববৎ স্বস্থানে অবস্থান লইল (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৭; আবূ নু'আয়ম, দালাইলুন- নুবৃওয়াহ, পৃঃ ৩৩৪)।
হযরত উসামা ইব্ন যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) হইতে খারিজা ইব্ন যায়দ কর্তৃক বর্ণিত। হযরত উসামা বিদায় হজ্জে মহানবী (স)-এর সহযাত্রী ছিলেন। তাঁহার সম্মুখে মহানবী (স)-এর দুইটি অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। তাঁহার বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে তিনি বলেন, মহানবী (স) আমাকে বলিলেন, 'উসামা! তুমি বাহিরে যাও। দেখতো কোন গোপন স্থান পাও কিনা? আমি ইসতিনজা করিব। আমি তাঁবুর বাহির হইলাম। দেখিতে পাইলাম, সম্মুখে বিশাল জনসমাগম। কোনরূপ আড়াল দেখিতে পাইলাম না। সংবাদটি মহানবী (স)-কে জানাইলে তিনি বলিলেন, কোথাও কোন বৃক্ষলতা অথবা বৃহৎ প্রস্তর খণ্ডও কি নাই? আমি বলিলাম, হাঁ, নাতিদীর্ঘ খেজুর গাছ ও বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তর খণ্ড দেখা যায়। তিনি বলিলেন, আসীম! তুমি পুনরায় যাও। বিচ্ছিন্ন খেজুর গাছগুলিকে বল, আল্লাহ্র রাসূল তোমাদিগকে পরস্পর একত্র হইতে বলিয়াছেন, আর বিক্ষিপ্ত প্রস্তর খণ্ডগুলিকে বল, আল্লাহ্র রাসূল তোমাদিগকে একত্র হইয়া আড়াল সৃষ্টি করিতে বলিয়াছেন। আমি তাহাই করিলাম। সে কি বিস্ময়! যিনি তাঁহাকে সত্য নবী করিয়া প্রেরণ করিয়াছেন তাঁহার কসম করিয়া বলিতেছি, গাছগুলি কিভাবে মূলসহ পরস্পর প্রতিযোগিতা করিয়া একত্র হইল। মনে হইল যেন একটি গাছ। অনুরূপ প্রস্তর খণ্ডগুলি পরস্পর প্রতিযোগিতা করিয়া পরস্পর গ্রথিত হইল, মনে হইল যেন একটি প্রাচীর। আমি ফিরিয়া গিয়া মহানবী (স)-কে বিষয়টি অবগত করিলাম। তিনি বলিলেন, পানির পাত্র লও। আমি পানির পাত্রসহ তাঁহার সহিত চলিলাম। আড়ালকৃত স্থানটির নিকটে গিয়া পানির পাত্র রাখিয়া আমি ফিরিয়া আসিলাম। তিনি অগ্রসর হইয়া তাঁহার প্রয়োজন সমাধা করিয়া ফিরিয়া আসিলে আমি তাঁহার হস্ত হইতে পানির পাত্র লইয়া তাঁহার সহিত তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম।
এইবার মহানবী (স) আমাকে বলিলেন, আসীম! তুমি আবার যাও। গাছগুলি ও প্রস্তর খণ্ডগুলিকে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিতে বল। আমি তাহাই করিলাম। পূর্বের মতই উহারা প্রতিযোগিতা করত বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। আমিও প্রত্যাবর্তন করিয়া মহানবী (স)-কে বিষয়টি অবগত করিলাম (কানযুল উম্মাল, ১২খ., ৪০৩; ইব্ন কাছীর, জামি'উল মাসানীদ ওয়াস-সুনান, ১খ., পৃ. ২২২; সুবুলুল হুদা ওয়ার- রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৭; আবূ নু'আয়ম, দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩৬)।
'হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) সূত্রে আবূ নু'আয়ম (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমরা খায়বার অভিযানে মহানবী (স)-এর সহগামী হইয়াছিলাম। তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে মনস্থ করিয়া বলিলেন, 'আবদুল্লাহ! তুমি একটু দেখ কোন আড়াল পাওয়া যায় কি না, আমি প্রয়োজন সারিব। আমি লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম, মাত্র একটি গাছ সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে। আমি একথা তাঁহাকে জানাইলে তিনি বলিলেন, "ভাল করিয়া দেখ। আরও কিছু দেখা যায় কিনা?" আমি লক্ষ্য করিলাম, বিস্তর ব্যবধানে আরও একটি গাছ দণ্ডায়মান। এই সংবাদটিও-আমি তাঁহাকে জানাইলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, আবদুল্লাহ! তুমি উহাদিগকে বল, আল্লাহর রাসূল তোমাদিগকে একত্র হইতে বলিয়াছেন। আমি তাহাই করিলাম। উহারা পরস্পর মিলিত হইল। মহানবী (স) উহার অন্তরালে প্রয়োজন সারিয়া প্রত্যাবর্তন করিলে গাছগুলি যথাস্থানে গিয়া দণ্ডায়মান হইল (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৬)।
হযরত ইয়া'লা ইব্ন মুররা (রা) হইতে ইমাম আহমাদ ইবন সা'দ এবং ইব্ন আবী শায়বা বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ বর্ণনাকারিগণের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে, ইমাম হাকেম কর্তৃক প্রত্যয়িতও হইয়াছে। হযরত ইয়া'লা বলেন, আমরা এক ভ্রমণে মহানবী (স)-এর সহযাত্রী ছিলাম। এক স্থানে আমরা যাত্রাবিরতি করিয়া বাহন হইতে অবতরণ করিলাম। মহানবী (স) আমাকে বলিলেন, ঐ ছোট ছোট খেজুর গাছগুলির নিকট যাও এবং বল, মহানবী (স) তোমাদেরকে একত্র হইতে বলিয়াছেন। আমি উহাদের নিকট গিয়া উহাদিগকে মহানবী (স)-এর কথা জানাইলাম। তখন উহারা হুড়াহুড়ি করিয়া একত্র হইল। মহানবী (স) উহার অন্তরালে প্রয়োজন সারিয়া প্রত্যাবর্তন করিলে গাছগুলি যথাস্থানে গিয়া দণ্ডায়মান হইল (প্রাগুক্ত; দালাইলুন-নুবৃওয়াত, পৃ. ৩৩৩)।
হযরত বুরায়দা (রা) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন, একদা এক বেদুঈন মহানবী (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। এখন আপনি আমাকে এমন বিস্ময়কর কিছু প্রদর্শন করুন যাহাতে আমার প্রতীতি সুদৃঢ় হয়। তিনি বলিলেন, তুমি কিরূপ নিদর্শন দেখিতে চাও? লোকটি বলিল, আপনি ঐ গাছটিকে ডাক দিন, উহা আপনার নিকট উপস্থিত হউক। তিনি বলিলেন, তুমি যাও, উহাকে ডাক দাও। লোকটি গাছের নিকট গিয়া বলিল, হে গাছ! মহানবীর ডাকে সাড়া দাও। গাছটি সম্বোধিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমূলে উৎপাটিত হইল, অতঃপর মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সালাম জানাইল। বেদুঈন লোকটি তখন মহানবী (স)-কে বলিল, ইহাই আমার জন্য যথেষ্ট, ইহাই আমার জন্য যথেষ্ট, হে মহানবী (স)! এইবার গাছটিকে উদ্দেশ্য করিয়া মহানবী (স) বলিলেন, প্রত্যাবর্তন কর। গাছটি স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিল ও শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করিয়া দণ্ডায়মান রহিল। এইবার লোকটি বলিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি সদয় অনুমতি দিলে আমি আপনার শির মুবারক ও চরণ দুইখানি চুম্বন করিতাম। অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া লোকটি তাহাই করিল। অতঃপর সিজদা করিবার অনুমতি কামনা করিলে তাহাকে মহানবী (স) বলিলেন, কেহ কাহাকেও সিজদা করিবে না। আমি যদি কাহাকেও সিজদা করিবার অনুমতি প্রদান করিতাম তাহা হইলে স্বামীকে সিজদা করার জন্য স্ত্রীকে অনুমতি প্রদান করিতাম (দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩২)।
হযরত 'আলী (রা) বলেন, আমি মহানবী (স)-এর সঙ্গে মক্কা নগরীতে বসবাস করিতাম। একদা তাঁহার সহিত মক্কার পার্শ্বে গিরিউপত্যাকায় ভ্রমণে বাহির হইলাম। আমরা যখনই কোন বৃক্ষ, পাথর বা পাহাড়ের পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম করিতাম, তখনই প্রত্যেকেই বলিত, আস্সালামু 'আলায়কুম ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (প্রাগুক্ত)।
হযরত ইয়া'লা ইব্ন মুররা ছাকাফী (রা) বর্ণনা করেন, একবার আমরা মহানবী (স)-এর সহিত ভ্রমণ করিতেছিলাম। এক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলাম। মহানবী (স) নিদ্রা গেলেন। হঠাৎ করিয়া একটি বৃক্ষ ভূমি বিদীর্ণ করিয়া আসিয়া তাঁহাকে ঢাকিয়া ফেলিল, অতঃপর ফিরিয়া গেল। মহানবী (স) জাগরিত হইলে বিষয়টি তাঁহাকে জানান হইল। তিনি বলিলেন, "আমাকে সালাম জানাইবার জন্য গাছটি উহার পালনকর্তার নিকট অনুমতি চাহিয়াছিল। অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া উহা আমাকে সালাম জানাইতে আগমন করিয়াছিল" (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৮)।
📄 রুকানার সহিত কুস্তি লড়াই
হযরত আবু উমামা (রা) বলেন, তৎকালীন আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্ত্রাসীর নাম ছিল রুকানা। সে নরঘাতক ছিল। ইদম উপত্যকা তাহার একক দখলে ছিল। প্রচণ্ড দাপটে সে তথায় তাহার মেষ-ছাগলগুলি চরাইত। একদা মহানবী (স) ইদম উপত্যকায় যাওয়ার উদ্দেশ্য 'আইশা (রা)-র গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কেহই তাঁহার সফরসঙ্গী ছিল না। তিনি ইদমে উপনীত হইলে রুকানা সদম্ভে তাঁহার পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইল। বলিল, মুহাম্মাদ! তুমিই তো আমাদের উপাস্য দেব-দেবী লাত ও 'উয্যাকে মন্দ বল। আবার তুমিই এক মহাপরাক্রান্ত কুশলী প্রভুর প্রতি মানুষকে আমন্ত্রণ জানাও। আমাদের মধ্যে যদি আত্মীয়তার বন্ধন না থাকিত, তবে তোমার সহিত কথা বলিবার পূর্বেই তোমার ভবলীলা সাঙ্গ করিতাম। ঠিক আছে, এখনই জানা যাইবে কাহার প্রভু শ্রেষ্ঠ; অজেয়, মহাপরাক্রান্তশালী।
আমি কুস্তি প্রতিযোগিতা অবতীর্ণ হওয়ার জন্য আহ্বান করিতেছি। তুমি তোমার মহাপরাক্রান্ত কুশলী প্রভুর নিকট সাহায্যের আবেদন জানাও, আমিও আমার প্রভু লাত ও 'উয্যার নিকট সাহায্য কামনা করি। যদি তুমি আমাকে পরাজিত করিতে পার তাহা হইলে আমার ছাগলগুলি হইতে তোমার জন্য দশটি ছাগল পুরস্কার রহিল। মহানবী (স) বলিলেন, ঠিক আছে, আমি তোমার সহিত প্রতিযোগিতা করিতে প্রস্তুত। তুমি প্রস্তুত হও।
এই বলিয়া মহানবী (স) রুকানার উপর জয়ী হওয়ার জন্য মহামহিম আল্লাহ পাকের দরবারে দু'আ করিলেন। রুকানাও লাত-উষ্যার নিকট প্রার্থনা জানাইল। এইবার পরস্পর মুখামুখি দাঁড়াইলে প্রথম আক্রমণেই মহানবী (স) রুকানাকে ধরাশায়ী করিলেন, চড়িয়া বসিলেন তাহার বুকের উপর। বিস্ময়াভিভূত হইয়া রুকানা বলিল, "না, না, তুমি আমাকে পরাজিত করিতে পার না। এইরূপ কর্ম সম্ভব হইয়াছে তোমার মহাশক্তিধর প্রভুর দ্বারা। আর আমার প্রভু আমাকে লাথি মারিয়া লাঞ্ছিত করিয়াছে। তোমার পূর্বে আমার পার্শ্বদেশ কেহই হেলাইতে পারে নাই। অদ্য তুমি আমাকে পরাজিত করিয়াছ বলিয়া আমার ছাগলগুলি হইতে দশটি ছাগল গ্রহণ কর।"
অতঃপর রুকানা পুনর্বার মহানবী (স)-কে দশটি ছাগলের বিনিময়ে কুস্তি লড়িষার জন্য আহবান জানাইল। মহানবী (স) তাহার প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন। তাহার উপর বিজয়ী হওয়ার জন্য মহান আল্লাহ পাকের দরবারে মোনাজাত করিয়া রুকানাকে এক আছাড়ে ধরাশায়ী করত তাহার বক্ষোপরি বসিলেন। এই বারও রুকানা একই মন্তব্য করিল। সে বলিল, আমাকে পরাজিত করা তোমার কাজ নহে, বরং এ কর্মটি তোমার অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপালক করিয়াছেন। আর আমার প্রভু লাত ও উয্যা আমাকে হেনস্থা কারিয়াছে। ভাল কথা, শর্তানুসারে তুমি আরও দশটি ছাগল গ্রহণ কর।
রুকানা পুনরূপ তাঁহাকে কুস্তি প্রতিযোগিতার আমন্ত্রণ জানাইয়া বলিল "মুহাম্মাদ! আইস, পুনরায় আমরা কুস্তি লড়িব। এইবারও যদি তুমি সফলকাম হও, তাহা হইলে, পুনরায় দশটি ছাগল পুরস্কার পাইবে। মহানবী (স) তাহার আমন্ত্রণ গ্রহণ করিলেন। মহানবী (স) মহান আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যে সাহায্য কামনা করিলেন। রুকানাও লাত ও উয্যার নিকট সাহায্যের প্রত্যাশী হইল। অতঃপর পরস্পর সামনা-সামনি হইলে মহানবী (স) তাহাকে এক আঘাতেই কুপোকাত করিয়া ফেলিলেন। আশ্চর্যান্বিত হইয়া রুকানা বলিল, মুহাম্মাদ! আমাকে বিজিত করা তোমার কর্ম নহে। ইহা অবশ্যই করিয়াছে তোমার মহা প্রতাপশালী প্রভু। আর আমার প্রভু লাত ও উষযা আমাকে হেনস্থা কারিয়াছে। ভাল কথা, এখন তুমি তোমার পসন্দ মত ত্রিশটি ছাগল আমার ছাগ পাল হইতে গ্রহণ কর।
ইহাতে মহানবী (স) বলিলেন, রুকানা! তোমার ছাগল গ্রহণ করা আমার উদ্দেশ্য নহে, বরং আমি চাই তুমি ইসলামে দীক্ষিত হও। ইহাতে শান্তি পাইবে। তোমাকে চিরস্থায়ী নরক যন্ত্রণা হইতে আমি অব্যাহতি দিতে চাই। মুসলমান হইলে তুমি শান্তি পাইবে। রুকানা বলিল, না, না, উহা সম্ভব নহে; বরং তুমি আমাকে অলৌকিক কিছু দেখাও। তিনি বলিলেন, রুকানা! মহান আল্লাহ্ তোমার উপর নজরদারি করিতেছেন। আমি তাঁহার নিকট চাহিলে আর তিনি ইচ্ছা করিলে তোমাকে অলৌকিক ঘটনা দেখাইবেন। অতঃপর তোমাকে ইসলামে দীক্ষিত হইতে হইবে। প্রত্যুত্তরে সে বলিল, তাহাই হইবে।
নিকটেই দাঁড়াইয়াছিল ঝাড় শাখাবিশিষ্ট একটি বাবলা গাছ। মহানবী (স) উহার প্রতি ইঙ্গিত করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সমূলে ও শাখা-প্রশাখাসহ গাছটি দ্বিধাবিভক্ত হইল। সেই অবস্থায় অগ্রসর হইয়া মহানবী ও রুকানার মধ্যখানে আসিয়া দাঁড়াইল। ইহাতে রুকানা চমৎকৃত হইয়া বলিল, তুমি আমাকে আশ্চর্যজনক ব্যাপার দেখাইলে! এখন উহাকে স্বস্থানে ফিরিয়া যাইতে বল। মহানবী (স) উহাকে স্বস্থানে ফিরিয়া যাইতে বলিলেন। গাছটি তখন উহার ডালপালাসহ সস্থানে প্রত্যাবর্তন করত পূর্বেকার অর্ধেকের সহিত মিলিত হইয়া পূর্ববৎ দণ্ডায়মান রহিল।
এইবার মহানবী (স) তাহাকে বলিলেন, এখন ইসলাম গ্রহণ কর। সে বলিল, দেখ মুহাম্মাদ! কেহ আমাকে কোন দিন পরাজিত করিতে পারে নাই কিম্বা কেহ কোন দিন আমার মনে ভীতি প্রবেশ করাইতেও পারে নাই। অদ্য যদি মদীনার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা ঘটনাটি জানিতে পারে তাহা হইলে আমার অপমানের আর সীমা থাকিবে না। সুতরাং তুমি তোমার ছাগল লইয়া প্রস্থান কর। সেইটাই হইবে উত্তম। মহানবী (স) বলিলেন, তোমার ছাগলে আমার কোনই প্রয়োজন নাই, এই বলিয়া তিনি সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন (প্রাগুক্ত)।
বর্ণিত ঘটনাপঞ্জী জীবন্ত বৃক্ষলতার। জীবন্ত ফলমূল শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট বৃক্ষের কথা বলা, চলাফেরা করা হয়তবা কিছুটা স্বাভাবিক হইতেও পারে। বিজ্ঞান উহার সমর্থন করে। পক্ষান্তরে শুকনা কাঠের গুঁড়ি কিভাবে রোদন করিতে পারে, উহাও আমাদের ভাবিয়া দেখা দরকার। দেখা গিয়াছে মহানবী (স)-এর মসজিদে খুৎবা দানের সময় তিনি হেলান দিতেন একটি খেজুর গাছের গুড়িতে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিচ্ছেদ ব্যথায় সেই শুকনা কাঠের গুঁড়ি কিরূপ করুণ সুরে বিলাপ করিয়াছিল উহা নিম্নে বর্ণিত হইল।
হযরত জাবির বলেন, মহানবী (স) শুকনা একটি খেজুরের গুঁড়িতে হেলান দিয়া খুৎবা প্রদান করিতেন। তাঁহার জন্য একটি নূতন মিম্বর নির্মাণ করা হইলে খুৎবা প্রদানের উদ্দেশ্যে তিনি উহাতে দাঁড়াইলেন। সঙ্গে সঙ্গে শুকনা খেজুরের গুঁড়ি করুণ সুরে কাঁদিতে লাগিল। মহানবী (স) নামিয়া আসিয়া উহাকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া সান্ত্বনা প্রদান করিলে তবেই উহা আশ্বস্ত হইল। হযরত জাবির (রা) বলেন, গুঁড়িটির করুণ রোদনের সাক্ষ্য আমি নিজেই। অতঃপর মহানবী (স) বলিলেন, আমি যদি বুকে জড়াইয়া ধরিয়া ইহাকে আশ্বস্ত না করিতাম তাহা হইলে কিয়ামত পর্যন্ত এইভাবে উহা করুণ বিলাপ করিতে থাকিত (যাদুল মা'আদ, আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৬১৪; কানযুল-'উম্মাল, ১২খ., পৃ. ৪১১; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৪)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর পর্বতারোহণে উহার কম্পমান অবস্থা
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত ও রিসালাত শুধু প্রাণীজগত কর্তৃক নয়, বরং উদ্ভিদ ও জড়জগত দ্বারাও স্বীকৃত ছিল। ইহাদের প্রত্যেকেই তাঁহার মান-মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিল। ইহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে সম্মান করিত এবং তাঁহার যে কোন নির্দেশ অবনত মস্তকে মানিয়া লইত। এমন দৃষ্টান্ত রহিয়াছে ভুরিভুরি। একবার তিনি উহুদ অথবা হেরা পর্বতের উপর আরোহণ করিলেন এবং পর্বত প্রকম্পিত হইতে লাগিল। অবশেষে তাঁহার নির্দেশে শান্ত হইল। যেমন হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে:
عن انس بن مالك قال صعد النبي ﷺ الى احد ومعه ابو بكر وعمر وعثمان فرجف بهم فضربه برجله وقال الثبت احد فانما عليك نبی و صدیق و شهیدان .
"হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করিলেন। তাঁহার সঙ্গে ছিলেন হযরত আবু বকর (রা), হযরত 'উমার (রা) ও হযরত 'উছমান (রা)। অতঃপর পাহাড় প্রকম্পিত হইতে লাগিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পা দ্বারা পাহাড়ে মৃদু আঘাত করিয়া বলিলেন, স্থির হও। কেননা তোমার উপর রহিয়াছেন একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দুইজন শহীদ” (বুখারী, হাদীছ নং ৩৬৭৫ ও ৩৬৮৬, পৃ. ৭৫০ এবং ৭৫৩; তিরমিযী, হাদীছ নং ৩৬৯৭, ৫খ., পৃ. ৬২৪)।
অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
عن ابي هريرة أن رسول الله ﷺ كان علي حراء هو و ابو بكر وعمر وعلى وعثمان وطلحة والزبير فتحركت الصخرة فقال النبى ﷺ اهداء انما عليك نبي او صديق او شهیدان .
"হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) হেরা পর্বতের উপর ছিলেন। তাঁহার সাথে আরো ছিলেন হযরত আবূ বকর (রা), হযরত 'উমার (রা), হযরত 'আলী (রা), হযরত 'উছমান (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবায়র (রা)। তখন পাহাড় কাঁপিয়া উঠিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, শান্ত হও। কারণ তোমার উপর রহিয়াছে একজন নবী অথবা একজন সিদ্দীক অথবা দুইজন শহীদ” (তিরমিযী, হাদীছ নং ৩৬৯৭, ৫খ., পৃ. ৬২৪)।
৩০১ وفي حديث سعيد بن زيد مثله لكن عدهم رسول الله ﷺ وابو بكر وعمر وعثمان وعلى وطلحة والزبير و سعد وابن عوف وسعيد ابن زيد .
"আর সাঈদ ইব্ন যায়দ (রা)-এর হাদীছেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। তবে তাঁহাদের সংখ্যা দশ জন গণনা করা হইয়াছে। তাঁহারা হইলেন: রাসূলুল্লাহ (স), আবূ বকর (রা), 'উমার (রা), 'উছমান (রা), 'আলী (রা), তালহা (রা), যুবায়র (রা), সা'দ (রা), ইন্ন 'আওফ (রা) ও সা'ঈদ ইব্ন যায়দ (রা)” (সুনান ইবন মাজা', হাদীছ নং ১৩৪, ১খ., পৃ. ৪৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে কে কে ছিলেন এই ব্যাপারে বিভিন্ন মত রহিয়াছে। কোন কোন রিওয়ায়াতে "," (অথবা) শব্দের প্রয়োগ করা হইয়াছে। অনুরূপভাবে কতজন ছিলেন সেই সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে। ইবন মাজা শরীফে সর্বোচ্চ দশজনের কথা বলা হইয়াছে।
বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে, এই পাহাড় ছিল উহুদ আর মুসনাদে আহমাদ ও সুনান ইব্ন মাজাতে হেরা পর্বতের কথা বলা হইয়াছে, তবে তিরমিযীতে উভয় পর্বতের কথা উল্লেখ রহিয়াছে।
📄 চতুষ্পদ জন্তুর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথোপকথন
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে অসংখ্য মু'জিযা সংঘটিত হইয়াছিল। আল্লাহ তা'আলা প্রাণীকুলকেও রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুগত করিয়া দিয়াছিলেন। তাহাদের নিকট হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ঈমান ও আনুগত্য ব্যতীত শরীয়ত পালনের আর কোন নিদর্শন দেখিতে পাওয়া যায় না। চতুষ্পদ জন্তুরাও তাহাদের অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অভিযোগ পেশ করিত।
হযরত হাসান (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, একদা রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় একটি উট ছুটিয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মাথা নত করিল এবং বিড় বিড় করিয়া কি যেন বলিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই উট বলিতেছে যে, ইহার মালিক ইহাকে পিতার জন্য ভোজ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যবেহ করিতে চাহে। অতঃপর তিনি উটের মালিকের নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল, হাঁ, আমি ইহাকে যবেহ করিতে চাহিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহাকে যবেহ করিও না। সেমতে মালিক উহাকে যবেহ করিল না (আল-খাসাইসুল-কুবরা, ২খ., পৃ. ৫৭)।
ইয়া'লা ইবন মুররা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদিন বাহিরে গেলেন। দেখিলেন, একটি উট চীৎকার করিতেছে। উট তাঁহাকে দেখিবামাত্র সিজদা করিল। সাহাবায়ে কিরাম বলিলেন, আমরাও আপনাকে সিজদা করার অধিকার রাখি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সিজদা করার আদেশ দিতাম, তবে নারীকে আদেশ দিতাম তাহার স্বামীকে সিজদা করিতে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই উট কি বলিতেছে জান? সে বলিতেছে, আমি আমার মালিকদের চল্লিশ বৎসর সেবা করিয়াছি। এখন আমি বৃদ্ধ হইয়া পড়িয়াছি। তাহারা আমার ঘাসপানি কমাইয়া দিয়াছে এবং কাজ বেশী লইতে শুরু করিয়াছে, আর বিবাহ উপলক্ষে আমাকে যবেহ করিতে চাহে। রাসূলুল্লাহ (স) উটের মালিকের নিকট লোক পাঠাইয়া তাহাকে ডাকাইয়া আনিয়া উটের অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। সে বলিল, সত্য। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উটটি আমার নিকট বিক্রয় করিয়া দাও (আল-খাসাইসুল-কুবরা, ২ খ., পৃ. ৫৭)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, আনসার গোত্রের প্রত্যেকেই উট পালন করিত। এক বাড়ীওয়ালা নবী কারীম (স)-এর নিকট আরয করিল, আমার একটি উট রহিয়াছে যাহার পিঠে করিয়া আমি পানি বহন করিয়া থাকি। উটটি বড় বেয়াড়া হইয়া গিয়াছে, বোঝা বহন করিতে চাহে না। আর আমার খেজুর বাগান পানির অভাবে শুকাইয়া যাইতেছে। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে সঙ্গে লইয়া উটটির নিকট গেলেন। তিনি বাগানে পৌঁছিয়া এক স্থানে দাঁড়াইলেন। বাগানের এক কোণে ছিল উটটি। আনসারী লোকটি বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ। ইহাই সেই উট। যে কুকুরের মতো মানুষকে কামড়াইতে চায়। আমার ভয় হইতেছে, না জানি আপনাকেও সে কামড় দেয়। তিনি বলিলেন, আমার ব্যাপারে ভয় করিও না। রাসূলুল্লাহ (স) উটটির সামনে গেলেন। উটটি তাঁহাকে দেখিবামাত্র মাথা উঠাইল এবং তাঁহার সম্মুখে গিয়া কদম মুবারকের নিকট মাথা নত করিয়া সিজদা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) উটটির মাথার পশম ধরিয়া টান দিয়া কাজে লাগাইয়া দিলেন।
অন্য হাদীছে আসিয়াছে, উটটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে আসিয়া গর্দান নত করিয়া উহার নিজের ভাষায় ফরিয়াদ করিয়াছিল। তাহা দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) উহার মাথার চুল ধরিয়া টানিয়া দাঁড় করাইলেন এবং তাহার মালিককে বলিলেন, উটটি আমার নিকট বিক্রয় করিয়া দাও। লোকটি বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার খিদমতে হাজির। কিন্তু উটটি আমার পরিবারের প্রয়োজন মিটায়। জীবিকার জন্য এই উটটি ছাড়া আমার আর কিছু নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উটটি অভিযোগ করিতেছে যে, তুমি উহার দ্বারা বেশী কাজ করাও আর খাইতে দাও কম। তুমি উহার অধিকারের দিকে খেয়াল রাখ না। সুতরাং এখন হইতে উহার অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখিও (আল-খাসাইসুল-কুবরা, ২খ., পৃ. ৫৬; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ., পৃ. ৩৪২-৪৩)।
হযরত যায়দ ইব্ন ছাবিত (রা) বলেন, এক যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমি দেখিতে পাইলাম, জনৈক বেদুঈন একটি উটের রশি ধরিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। উটটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাম করিল। তিনি সালামের জওয়াব দিলেন। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি আসিয়া বলিল, এই লোকটি আমার উট চুরি করিয়া নিয়া আসিয়াছে। এই কথা শুনিবার পর উটটি চিৎকার করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রতিবাদ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) উটটির অভিযোগ শুনিয়া দাবিদারকে বলিলেন, উটটি আমার নিকট অভিযোগ করিতেছে যে, তুমি মিথ্যাবাদী (আশ-শিফা, পৃ. ৬০৫; নাসীমুর রিয়াদ, ৩খ., পৃ. ৮৭)।
'আবদুল্লাহ ইব্ন আবী আওফা (রা) বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বসা ছিলাম। এক ব্যক্তি আসিয়া বলিল, অমুক গোত্রের পানিবাহী উট অবাধ্য হইয়া পালাইয়া গিয়াছে। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) উঠিয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার সহিত আমরাও দাঁড়াইলাম। আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এই উটের নিকট যাইবেন না। কিন্তু তিনি উটের নিকট গেলেন। উট তাহাকে দেখিয়া সিজদা করিল। তিনি উহার মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন, লাগাম আন। লাগাম আনা হইলে তিনি উটের মাথায় রাখিয়া বলিলেন, উটের মালিককে ডাক। মালিক আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহাকে উত্তমরূপে ঘাসপানি দিবে এবং কঠোর আচরণ করিবে না (আল-খাসাইসুল-কুবরা, ২ খ., পৃ. ৫৬)।
হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, কিছু লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আমাদের উট বাগান দখল করিয়া লইয়াছে, সেখান হইতে কোন অবস্থাতে বাহির হইতেছে না। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে গেলেন এবং উটকে আওয়ায দিলেন। উট মাথা নত করিয়া তাঁহার নিকট চলিয়া আসিল। তিনি উটের লাগাম বাঁধিয়া মালিকের হাতে দিলেন। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) বলিলেন, এই উট জানে যে, আপনি আল্লাহর রাসূল? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কাফের জিন ও কাফের মানব ছাড়া আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে এমন কোন বস্তু নাই, যে জানে না যে, আমি আল্লাহ্ নবী (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬-৫৭)।
একদা একটি উট রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহার কওমের লোকদের সম্পর্কে অভিযোগ করিল যে, তাহারা ইশার সালাত আদায় না করিয়াই ঘুমাইয়া পড়ে। আমার ভয় হইতেছে যে, না জানি আল্লাহ তা'আলা তাহাদের উপর আযাব নাযিল করেন। রাসূলুল্লাহ (স) ঐ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে ডাকিয়া বলিলেন, তাহারা যেন ইশার সালাত আদায়ের পূর্বে শয্যা গ্রহণ না করে (মাদারিজুন নুযূওয়াত, ১খ., পৃ. ৩)।
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেন, আমাদের ঘরে একটি বকরী ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন ঘরে থাকিতেন তখন উহা চুপচাপ শুইয়া থাকিত। আর তিনি ঘর হইতে বাহির হইলে পেরেশান হইয়া এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করিত (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৩)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবু বকর ও হযরত 'উমার (রা)-কে সঙ্গে লইয়া জনৈক আনসারীর বাগানে গেলেন। সেখানে একটি বকরী ছিল। বকরীটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে সিজদা করিল। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরাও তো আপনাকে সিজদা করার অধিকার রাখি। তিনি বলিলেন, এক মানুষের জন্য অন্য মানুষকে সিজদা করা বৈধ নয় (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৩)।
এক বর্ণনায় রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন উট কুরবানী করিতে উদ্যত হইলেন, তখন উটগুলি একে অপরকে সরাইয়া দিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে দাঁড়াইয়া যাইত (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৪)।
উম্মে সালামা (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসুলুল্লাহ (স) মরুভূমি অতিক্রম করিতেছিলেন। অকস্মাৎ তিনি "ইয়া রাসূলাল্লাহ” এই রকম তিনটি আওয়ায শুনিতে পাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সেই আওয়াযের দিকে অগ্রসর হইলেন। দেখিলেন, একটি হরিণী বাঁধা অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। কাছেই এক বেদুঈন চাদর মুড়ি দিয়া শুইয়া আছে। তিনি হরিণীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, বল, কি প্রয়োজন তোমার? হরিণী বলিল, আমাকে এই লোক শিকার করিয়া বাঁধিয়া রাখিয়াছে। আমার দুইটি বাচ্চা এই পাহাড়ের গর্তের ভিতর রহিয়াছে। আপনি যদি আমাকে মুক্ত করিয়া দেন তাহা হইলে বাচ্চা দুইটিকে দুধ পান করাইয়া আমি আবার ফিরিয়া আসিব। তিনি বলিলেন; তুমি কি আবার ফিরিয়া আসিবে? হরিণী বলিল, ফিরিয়া না আসিলে আল্লাহ তা'আলা আমাকে যেন ঐ শাস্তি প্রদান করেন যে শাস্তি তিনি যাকাত আত্মসাৎকারীর জন্য নির্ধারণ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে মুক্ত করিয়া দিলে উহা চলিয়া গেল, অল্পক্ষণ পরেই আবার ফিরিয়া আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে আগের মত বাঁধিয়া রাখিলেন। বেদুঈন লোকটি জাগিয়া উঠিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কি কোন উদ্দেশ্য আছে? তিনি বলিলেন, আমার ইচ্ছা তুমি হরিণীকে মুক্তি দাও। লোকটি হরিণীকে ছাড়িয়া দিল। উহা মনের আনন্দে চক্কর দিয়া দৌড়িয়া পাহাড়ের দিকে চলিয়া গেল। যাওয়ার সময় উহা-সাক্ষ্য দিতেছিল, আশহাদু আন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ (আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬০; মাদারিজুন-নুবৃওয়াত, ১ খ., পৃ. ৩৪৬)।
আরেকটি ঘটনা, রাসূলুল্লাহ (স) এক সেনাবাহিনীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। সেনাদল ছিল তৃষ্ণার্ত। এক সময় দেখা গেল একটি জলাশয়। এমন সময় একটি হরিণী নবী কারীম (স)-এর নিকটে আসিল। তিনি হরিণের দুধ দোহন করিলেন এবং বাহিনীর সমস্ত সৈন্যকে দুধ পান করাইলেন। সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় তিন শত। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার মুক্তদাস রাফে' (রা)-কে বলিলেন, তুমি হরিণীর প্রতি লক্ষ্য রাখিও। তিনি হরিণীকে বাঁধিয়া রাখিলেন। কিছুক্ষণ পর দেখিলেন; হরিণীটি নাই। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যিনি উহাকে পাঠাইয়াছিলেন তিনিই উহাকে লইয়া গিয়াছেন (মাদারিজুন নুযূওয়াত, ১খ, পৃঃ ৩৪৬)।
যায়দ ইক্স আরকাম (রা) বর্ণনা করেন, আমি নবী করীম (স)-এর সঙ্গে মদীনার গলিপথ দিয়া যাইতেছিলাম। জনৈক বেদুঈনের তাঁবুতে পৌঁছিয়া আমরা একটি হরিণীকে বাঁধা অবস্থায় দেখিলাম। হরিণী বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই বেদুঈন আমাকে শিকার করিয়াছে। জঙ্গলে আমার দুইটি বাচ্চা ক্ষুধায় কষ্ট পাইতেছে। আর স্তনে দুধ জমা হওয়ার কারণে আমিও নিদারুণ যাতনা অনুভষ করিতেছি। বেদুঈন আমাকে যবেহ করিলে আমি এই যাতনা হইতে রৈহাই পাইতাম, আর ছাড়িয়া দিলে বাচ্চাদের নিকট চলিয়া যাইতাম। কিন্তু সে কিছুই করিতেছে না। রাসূলুল্লাহ (স) হরিণীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, যদি আমি তোমাকে ছাড়িয়া দেই তাহা হইলে তুমি কি ফিরিয়া-ক্যাস্টিকে যে বলিল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে ছাড়িয়া দিলেন। যে কিছুক্ষণের মধ্যে জিহ্বা চাটিতে চাটিতে ফিরিয়া আসিল। রাসূলুল্লাহ (স), উহাকে রাঁধিয়া রাখিলেন। ইতোমধ্যেই বেদুঈন আসিয়া পড়িল। তাহার সহিত ছিল পানির একটি মশক। রাসুলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি হরিণীটি বিক্রয় করিবে কি? সে বলিল, হরিণীটি আপনারই। তখন রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে মুক্ত করিয়া দিলেন। যায়দ ইব্ন আরকাম (রা) বলেন, হরিণীটি কলেমা তায়্যিবা উচ্চারণ করিতে করিতে জঙ্গলের দিকে চলিয়া গেল (প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১)।
মুত্তালিব ইবন 'আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় এক বাঘ আসিয়া তাঁহার সামনে দাঁড়াইয়া কথা বলিতে শুরু স্কায়েন। 'রাসূলুল্লাই (স) বলিলেন, তোমাদের নিকট বাঘদের এই দূত আসিয়াছে। তোমরা ইচ্ছা করিলে তাহার জন্য কিছু ভাতা নির্দিষ্ট করিয়া দাও। সে ইহার বেশী লইবে না। আর তাহা না হইলে এমনিতেই ছাড়িয়া দাও। সে যাহা পাইবে নিয়া যাইবে। এমতাবস্থায় তোমাদের ভয় থাকিয়া যাইবে। সে যাহা কিছু নিবে তাহা তাহার রিযিক হইবে। সাহাবায়ে কিরাম আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা ইহার জন্য কিছু নির্দিষ্ট করিয়া দিতে সম্মত না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তিন আঙ্গুল দিয়া বাঘের দিকে ইশারা করিয়া বুঝাইয়া দিলেন, তুই তাহাদের ছাগল ছোঁ মারিয়া লইয়া যা। ইহাতে বাঘটি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া মাথা নাড়িয়া দৌড়াইয়া চলিয়া গেল (প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৩)।
ইব্ন মানযূর বর্ণনা করেন, খায়বার বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ (স) একটি কালো গাধা পাইলেন। তিনি ঐ গাধার সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন; তোর নাম কি? সে বলিল, ইয়া'দীদ ইব্ন শিহাব। আমার দাদার বংশ হইতে আল্লাহ্ তা'আলা ষাটটি গাধা সৃষ্টি করিয়াছেন। সেইগুলির সকলের পিঠে পয়গাম্বরগণ সওয়ার হইয়াছেন। আমার বিশ্বাস, আপনি আমার পিঠে সওয়ার হইবেন। কেননা এখন আমার দাদার বংশে আমি ছাড়া কেহ বাঁচিয়া নাই। আর পয়গাম্বরগণের মধ্যে আপনি ছাড়া কেহ অবশিষ্ঠ নাই। ইহা আরও বলিল, আপনার নিকট আসার পূর্বে আমি এক ইয়াহুদীর অধীনে ছিলাম। সে আমার পিঠে উঠিতে চাহিলে আমি ইচ্ছা করিয়া লাফালাফি করিয়া তাহাকে ফেলিয়া দিতাম। আমার পিঠে তাহাকে উঠিতেই দিতাম না। এজন্য সে আমার পেটে ও পিঠে আঘাত করিত, আমাকে অনাহারে রাখিত। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আজ হইতে তোমার নাম ইয়া গাফুর। এই ইয়া গাফুর নামক গাধাটি সর্বদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির থাকিত। তিনি কাহাকেও ডাকিয়া আনার জন্য ইহাকে পাঠাইলে সে সেই লোকের বাড়ির দরজায় উপস্থিত হইয়া মাথা ঠুকিতে থাকিত। গৃহকর্তা বাহির হইয়া আসিলে তাহাকে ইশারায় বুঝাইয়া দিত যে, রাসূলুল্লাহ (স)-তাহাকে ডাকিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওফাতের পর ইয়া গাফুর নামক গাধাটি তাঁহার বিরহব্যথা সহ্য করিতে না পারিয়া আবুল হায়ছাম ইব্ন নাহিয়ানের কূপের মধ্যে ঝাঁপ দিয়া শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছিল (আল-খাসাইসুল কুবরা, ২৯, পৃ. ৬৪; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১ খ., পৃ. ৩৪৬-৪৭)।
প্রাণীকূল ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাহাদের দুঃখ-কষ্টের কথা ব্যক্ত করিয়া বিভিন্ন জনের উপর অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছে। আর আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) সেইগুলির অভিযোগ শুনিতেন এবং উহাদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেন।