📄 কুধারণা পোষণ হইতে বিরত থাকা
আখলাকে সায়্যিআর (কুচরিত্র) মধ্যে মারাত্মক ধরনের বদ অভ্যাস হইল অন্যের প্রতি কুধারণা পোষণ করা। অন্যের প্রতি অহেতুক কুধারণা পোষণ করা হারাম। ইমাম আবূ বকর আল-জাসসাস (র) আহকামুল কুরআন গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন, ধারণা চার প্রকার। এক প্রকার হারাম, দ্বিতীয় প্রকার ওয়াজিব, তৃতীয় প্রকার মুস্তাহাব এবং চতুর্থ প্রকার জায়েয। হারাম ধারণা এই যে, আল্লাহর প্রতি এমন কুধারণা রাখা যে, তিনি আমাকে শাস্তি দিবেনই অথবা আমাকে বিপদে ফেলিবেনই। মূলত এইরূপ ধারণা আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত হইতে নিরাশ হওয়ার নামান্তর। হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
لا يموتن احدكم الا وهو يحسن الظن بالله
“তোমাদের কাহারও আল্লাহ্র প্রতি সুধারণা পোষণ ব্যতীত মৃত্যুবরণ উচিত নহে।”
অন্য এক হাদীছে আছে : انا عند ظن عبدی بی "আমি আমার বান্দার সহিত তেমনি ব্যবহার করি যেমন সে আমার সম্বন্ধে ধারণা রাখে।"
উক্ত আলোচনা হইতে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করা ফরয এবং কুধারণা পোষণ করা হারাম। এমনিভাবে যেসব মুসলমান বাহ্যিক দৃষ্টিতে সৎ কর্মপরায়ণ তাহাদের প্রতি কোন প্রমাণ ছাড়া কুধারণা পোষণ করাও হারাম (মা'আরিফুল কুরআন, পৃ. ১২৮৩)। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ ، إِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ.
"হে মু'মিনগণ! তোমরা কুধারণার আধিক্য হইতে দূরে থাকিবে; কারণ অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ। তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করিও না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করিও না। তোমাদের মধ্যে কি কেহ তাহার মৃত ত্রাতার গোশত খাইতে চাহিবে? বস্তুত তোমরা তো ইহাকে ঘৃণার্হ মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু” (৪৯ : ১২)।
لوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هُذَا أَفْكَ مُّبِينٌ.
"যখন তাহারা ইহা শুনিল তখন মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারিগণ আপন লোকদের সম্পর্কে কেন ভাল ধারণা করিল না এবং বলিল না, ইহা তো সুস্পষ্ট অপবাদ" (২৪: ১২)?
অন্যের প্রতি কুধারণা পোষণ করা মূলত বড় ধরনের মিথ্যা প্রবণতা। তাই নবী করীম (স) এহেন মিথ্যা বদ অভ্যাস হইতে দূরে থাকার জন্য জোর তাকীদ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
اياكم والظن فان الظن اكذب الحديث ولا تحسسوا ولا تجسسوا ولا تناجشوا ولا تحاسدوا ولا تباغضوا ولا تدابروا وكونوا عباد الله اخوانا .
"তোমরা কুধারণা করা হইতে বাঁচিয়া থাকিবে কারণ কুধারণা মারাত্মক ধরনের মিথ্যা। আর তোমরা কাহারও দোষ অনুসন্ধান করিও না, গোয়েন্দাগিরি করিও না, একে অন্যকে ধোঁকা দিও না, পরস্পর হিংসা করিও না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিও না এবং পরস্পর বিরুদ্ধাচরণ করিও না, বরং সকল আল্লাহ্র বান্দা ভাই ভাই হইয়া থাকিও” (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯২)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, اياكم والظن فان الظن اكذب الحديث "তোমরা কুধারণা পোষণ করা হইতে দূরে থাকিবে। কারণ কুধারণা জঘন্য ধরনের মিথ্যা" (জামে' তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১৯)।
হযরত আবদুল্লাহ (রা) বলেন, যে ব্যক্তির মাল চুরি হইয়া যায় সে অন্যের প্রতি কুধারণা পোষণ করিতে থাকে। এমনিভাবে কুধারণা পোষণ করিতে করিতে তাহার অপরাধের পরিমাণ চোরের চাইতেও গুরুতর হইয়া যায় (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৩০)। বিলাল ইবন সা'দ আশ'আরী (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার হযরত মু'আবিয়া (রা) আবূ দারদা (রা)-এর নিকট এই মর্মে পত্র দিলেন, যে, দামিশক শহরে যেসব দুষ্কৃতিকারী আছে তাহাদের তালিকা প্রস্তুত করিয়া আপনি তাহা আমার নিকট প্রেরণ করুন। জবাবে তিনি বলিলেন, দামিশকের দুষ্কৃতিকারীদের সহিত আমার কি সম্পর্ক আছে। আমি তাহাদেরকে কেমন করিয়া চিনিব? তখন তাহার পুত্র বিলাল (র) বলিলেন, আমি তাহাদের তালিকা লিখিয়া দিব। অতঃপর তিনি তাহা লিখিলেন। ইহা দেখিয়া আবূ দারদা (রা) তাহাকে বলিলেন, তুমি তাহাদের একজন না হইলে কেমন করিয়া তুমি এই কথা জানিবে এবং বুঝিবে যে, তাহারা দুষ্কৃতিকারী। অতএব, প্রথমে তুমি তোমার নিজের নাম লিখিয়া পাঠাও, তাহাদের নাম পাঠাইও না (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৩০)।
যদি কোন ব্যক্তি হইতে এমন কোন কাজ হইয়া যায় অথবা যদি কোন ব্যক্তি এমন অবস্থায় নিপতিত হয়, যাহার ফলে অন্য কাহারও কুধারণা পোষণ করার সুযোগ সৃষ্টি হইয়া যায়, তবে তাহার উচিত ঐ কুধারণা দূরীভূত করার লক্ষ্যে নিজের পক্ষ হইতে ইহার যথার্থ কারণ জানাইয়া দেওয়া। হাদীছে আছে, নবী-পত্নী হযরত সাফিয়্যা (রা) বলেন, (রমযানের শেষ দশকে) নবী করীম (স) মসজিদে ই'তিকাফরত ছিলেন। তাঁহার সহিত সাক্ষাত করার জন্য এক রাত্রিতে আমি তাঁহার নিকট আসিলাম এবং তাঁহার সহিত আলাপ-আলোচনা করিলাম, অতঃপর আমি বাড়িতে ফিরিয়া আসার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইলাম। নবী করীম (স)-ও আমাকে বিদায় দেওয়ার জন্য দাঁড়াইলেন। তখন আমার আবাস ছিল উসামা ইন্ন যায়দের বাড়িতে। এহেন অবস্থায় দুইজন আনসারী সাহাবী সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহারা নবী করীম (স)-কে (এক মহিলার সহিত) দেখিয়া দ্রুত অন্যদিকে সরিয়া যাইতে লাগিলেন। নবী করীম (স) এই অবস্থা দেখিয়া তাঁহাদের ডাক দিলেন, থাম, আমার সঙ্গের এই মহিলা হইল আমার স্ত্রী সফিয়্যা। তখন তাঁহারা বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমাদের মধ্যে কাহারও প্রতি কুধারণা পোষণ করার প্রবণতা থাকিত তাহা হইলেও আমরা আপনার প্রতি কুধারণা পোষণ করিতাম না। তাঁহাদের কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, নিশ্চয় শয়তান মানুষের অভ্যন্তরে রক্ত সঞ্চালন ক্রিয়ার মতই চলাচল করিয়া থাকে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২১৬; সীরাতুন নবী, ৬খ., পৃ. ৩১৪-৩১৫)।
📄 মু'জিযা কি ও কেন?
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 ঘৃতে বরকত হওয়ার ঘটনা
ঘৃতে বরকত হওয়ার ঘটনাও ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা। অবশ্য এই মু'জিযা অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী পরিমাণে বৃদ্ধি হওয়া সংক্রান্ত মু'জিযা হইতে একটু ভিন্ন প্রকৃতির। কারণ অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী পরিমাণে বৃদ্ধি হওয়ার কোনটি ছিল দু'আর বরকতে, আবার কোনটি ছিল তাঁহার পবিত্র সংশ্রবের বরকতে। কিন্তু "ঘৃত বৃদ্ধি” না ছিল দু'আর বরকতে, আর না ছিল তাঁহার পবিত্র সংশ্রবের বরকতে বরং রাসূলুল্লাহ (স)-কে সম্মানিত করিবার জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীন তাহা বাড়াইয়া দেন। যেমন হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে:
عن انس عن امه قال كانت لها شاة فجمعت من سمنها في عكة فملات العكة ثم بعثت بها مع ربيبة فقالت يا ربيبة ابلغى هذه العكة رسول الله ﷺ يائدم بها فانطلقت بها ربيبة حتى انت رسول الله ﷺ فقالت يا رسول الله هذه عكة سمن بعثت بها اليك ام سليم قال افرغوا لها عكتها ففرغت العكة فدفعت اليها فانطلقت بها وجاءت وام سليم ليست في البيت فعلقت العكة على وتد فجاءت ام سليم فرأت العكة ممتلئة تقطر فقالت ام سليم يا ربيبة اليس امرتك ان تنطلقى بها الى رسول الله ﷺ فقال قد فعلت قد جاءت قالت والذي بعثك بالحق ودين الحق انها لممتلئة تقطر سمنا قال فقال لها رسول الله ﷺ يا ام سليم اتعجبين ان كان الله اطعمك كما اطعمت نبیه کلی واطعمى قالت فجئت الى البيت فقسمت في قعب لنا كذا وكذا و شركت فيها ما ائتدمنا به شهرا او شهرين .
"হযরত আনাস (রা) বলেন, তাঁহার মায়ের একটি বকরী ছিল। তিনি ইহার দুধ হইতে প্রাপ্ত ঘি একটি চামড়ার পাত্রে জমাইতেন। ঘি জমিতে জমিতে এক সময় পাত্র পরিপূর্ণ হইয়া গেল। তারপর তিনি ইহা (পালিতা কন্যা) মারফতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পাঠাইলেন এবং বলিলেন, হে রবীবা! এই পাত্রটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছাইয়া দাও যেন তিনি উহা দ্বারা তরকারী রান্না করিতে পারেন। তারপর রবীবা ইহা লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইল এবং বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ঘি-এর পাত্র উম্মু সুলায়ম আপনার নিকট পাঠাইয়াছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) ঘরের লোকজনকে বলিলেন, তোমরা তাহার পাত্রটি খালি করিয়া দাও। তাহারা পাত্রটি খালি করিয়া তাহাকে ফেরত দিল। সে তাহা লইয়া ফিরিয়া আসিল কিন্তু তখন উম্মু সুলায়ম বাড়িতে ছিলেন না। সে পাত্রটি একটি পেরেকের সহিত ঝুলাইয়া রাখিল। উম্মু সুলায়ম বাড়িতে আসিয়া দেখিলেন, পাত্রটি "ঘি"-এ পরিপূর্ণ হইয়া টপটপ করিয়া ঘি পড়িতেছে। তিনি রবীবাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে রবীবা! আমি কি তোমাকে এই পাত্রটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছাইয়া দিতে হুকুম করি নাই? সে বলিল, আমি তো আপনার কথামত তাহা পৌঁছাইয়া দিয়াছি। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলেন এবং বলিলেন, সেই সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য এবং সত্য দীনসহ পাঠাইয়াছেন। ইহা যে "ঘি”-এ পরিপূর্ণ হইয়া উপচাইয়া টপটপ করিয়া পড়িতেছে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উম্মু সুলায়ম! তুমি কি ইহাতে অবাক হইবে, যদি আল্লাহ তোমাকে সেইভাবে খাওয়ান, যেইভাবে তিনি তাঁহার রাসূল (স)-কে খাওয়ান? বরং তুমি তাহা নিজেও খাও এবং অপরকেও খাওয়াও। উম্মু সুলায়ম বলিলেন, আমি বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম এবং ঘি অমুক অমুক পাত্র যাহা ছিল তাহাতে ভাগ করিয়া রাখিলাম। আর উহাতেও কিছু বাকি রাখিলাম যাহা আমাদের এক মাস অথবা দুই মাস তরকারীর সাথে ব্যবহার করিতে পারি” (আল-ইসাবা, ৪খ., পৃ. ৩২০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১১৩; হাযাল হাবীব, পৃ. ৫০৩)।
وزاد في رواية اخرى ... فاهديته رسول الله ﷺ فقبله وترك في العكة قليلا . ونفخ فيها ودعا بالبركة . ثم قال ردوا عليها عكها . فردوها عليها وهي مملؤة سمنا . فاكلت بقية عمر النبي ﷺ وولاية أبي بكر وولاية عمر وولاية عثمان. حتى كان من أمر على ومعاوية ماكان .
"অপর একটি বর্ণনায় এই কথাও বলা হইয়াছে যে, আমি তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়া দিলাম এবং তিনি তাহা কবুলও করিলেন, তবে তিনি পাত্রে কিছু ঘি রাখিয়া দিলেন এবং তাহাতে বরকতের জন্য দু'আ করিয়া ফুঁক দিলেন। তারপর বলিলেন, তাহার পাত্র তাহাকে ফেরত দাও। অতএব তাহা তাহার নিকট ফেরত দেওয়া হইল। আর উহা ছিল ঘি-এ পরিপূর্ণ। উম্মু সুলায়ম (রা) বলেন, আমি তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাকি জীবন, আবু বকর (রা)-এর খেলাফত, 'উমার (রা)-এর খেলাফত এবং 'উছমান (রা)-এর খেলাফত পর্যন্ত ব্যবহার করিয়াছি। অবশেষে তাহা 'আলী (রা) ও মু'আবিয়া (রা)-এর যুদ্ধের সময় শেষ হয়" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১১৩-১১৪)।
عن جابر ان ام مالك البهزية كانت تهدى في عكة لها سمنا للنبي ﷺ فبينما بنوها يسألونها الادم وليس عندها شئ. فعمدت الى عكتها التي تهدى فيها الى النبي ﷺ فقال اعصرتيه ؟ فقلت نعم قال لو تركتيه ما زال قائما .
"হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। উম্মে মালিক আল-বাহযিয়া (রা) একটি বরতনে করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে ঘি হাদিয়া দিতেন। যখন তাঁহার সন্তান তরকারী চাইতো এবং তাহার নিকট তরকারী বলিতে কিছু না থাকিত, তখন তিনি সেই বরতনটি, যাহাতে করিয়া তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে ঘি হাদিয়া পাঠাইতেন, উঠাইয়া দেখিতেন যে, উহাতে প্রয়োজনীয় ঘি রহিয়াছে। অবশেষে একদিন তিনি বরতনটি নিংড়াইয়া লইলেন। ফলে বরকত বন্ধ হইয়া গেল। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অভিযোগ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি তাহা নিংড়াইয়াছ? আমি বলিলাম, হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বলিলেন, যদি না নিংড়াইয়া স্বাভাবিকভাবেই রাখিয়া দিতে তবে তাহা কোন দিন বন্ধ হইত না" (ইমাম আহমদ, মুসনাদ, হা. ১৪২৫৪, ৪খ., পৃ. ২৯৯; মুসলিম, ৪খ., পৃ. ৫৯-৬০; মিশকাতুল মাসাবীহ, হা. ৫৯০৭, ৩খ., পৃ. ১২৫৮; আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫৭৫)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বৃক্ষের আগমন
হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, একদা আমরা মহানবী (স)-এর সহগামী হইয়া ভ্রমণ ব্যাপদেশে একটি বিশাল উপত্যকায় পৌছিলাম। মহানবী (স) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে প্রস্থান করিলেন। পানির পাত্র সহ আমিও তাঁহার অনুগমন করিলাম। চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া তিনি এমন কোন গোপন স্থান পাইলেন না যেখানে তিনি তাঁহার প্রয়োজন সমাধা করিতে পারেন। উপত্যকার শেষ সীমান্তে দুইটি বৃক্ষ দৃষ্টিগোচর হইল। মহানবী (স) একটি বৃক্ষের নিকটবর্তী হইয়া উহার, শাখা ধরিয়া বলিলেন, “ওহে বৃক্ষ শাখা। আল্লাহ্র আদেশে তুমি আমার প্রতি অবনমিত হও”।
লাগাম পরা উষ্ট্র যেমন চালকের ইঙ্গিতে অবনমিত হয়, তেমনই বৃক্ষটি মহানবী (স)-এর প্রতি অবনমিত হইল। এইরূপে তিনি দ্বিতীয় বৃক্ষটির নিকট গমন করিয়া উহার শাখা ধরিয়া উহাকেও অবনমিত করিলেন। বৃক্ষ দুইটি পরস্পর বন্ধন কৃত অবস্থায় একত্র মনে হইলে অতঃপর তিনি বলিলেন, "তোমরা আল্লাহ্র আদেশে একত্র হইয়া যাও।” উহারা একত্র হইল। একটি অন্তরালের সৃষ্টি হইল। হযরত জাবির বলেন, আমি দূরে সরিয়া গিয়া বসিয়া বসিয়া আপন মনে চিন্তা করিতে লাগিলাম, দেখি মহানবী (স) আমার সম্মুখে উপস্থিত। বৃক্ষ দুইটিকে দেখিলাম, সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া পৃথক হইয়া গিয়াছে। আরও দেখিলাম, মহানবী (স) সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিলেন এবং নিজের শির মুবারক ডাইনে বামে দোলাইলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৫; দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ., ৩৩৪; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৬; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৬১৯)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, মক্কার জনৈক পাষণ্ড কর্তৃক প্রহৃত হইয়া রক্তরঞ্জিত দেহে দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে মহানবী (স) নিভৃতে বসিয়া ছিলেন। ইত্যবসরে হযরত জিবরাঈল (আ) তথায় আগমন করিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে নবী। আপনার কী হইয়াছে? তিনি বলিলেন, মক্কাবাসীরা আমার এই অবস্থা করিয়াছে। হযরত জিবরাঈল বলিলেন, "আপনি কি আনন্দিত হইবেন, যদি আমি এখনই একটি নিদর্শন প্রদর্শন করি? তিনি সম্মতি দান করেন। হযরত জাবির (রা) বলেন, হযরত জিবরাঈল উপত্যকার পশ্চাতে একটি বৃক্ষ দেখাইয়া মহানবী (স)-কে বলিলেন, হে নবী! আপনি ঐ বৃক্ষটিকে আহবান করুন। তিনি বৃক্ষটিকে ডাক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষটি হাঁটিয়া অগ্রসর হইয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতঃপর হযরত জিবরাঈল বলিলেন, হে নবী! আপনি বৃক্ষটিকে ফিরিয়া যাইতে আদেশ করুন। তিনি আদেশ করিলে গাছটি স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিল। অনন্তর মহানবী (স) বলিলেন, ইহাই আমার জন্য যথেষ্ট (প্রাগুক্ত)।
ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, মহানবী (স) এক সময় পৌত্তলিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া মনঃক্ষুণ্ণ হৃদয়ে দিনাতিপাত করিতেছিলেন। তিনি আল্লাহ পাকের নিকট দু'আ করিলেন, "হে পালনকর্তা! তুমি অদ্য আমাকে এখনই একটি নিদর্শন প্রদর্শন কর, যাহার পরে আর কেহ আমার প্রতি অসত্যারোপ করিতে সক্ষম, হইবে না"। হযরত 'উমার (রা) বলেন অতঃপর মহানবী (স) আল্লাহ পাকের নির্দেশে মদীনার গিরিপ্রান্তর হইতে একটি বৃক্ষকে ডাক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষটি ভূমি আঁচড়াইয়া মহানবী (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হইল। অনন্তর গাছটি তাঁহার পুননির্দেশানুসারে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "ইহার পর আমার স্বজাতি আমার প্রতি অসত্যারোপ করিতে আর সক্ষম হইবে না" (প্রাগুক্ত; কানযুল-উম্মাল, ১২খ., পৃ. ৩৫৪; সুবুলুন হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫০০;, দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩২)।
হাসান (র) সূত্রে ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেন, মহানবী (স)-এর প্রতি তাঁহার স্বজাতির অসত্যারোপ তাঁহাকে ব্যথিত ও বিচলিত করিয়া তুলিয়াছিল। দুঃখ জর্জরিত ও ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে তিনি মক্কা নগরীর গিরি-উপত্যকায় বিচরণ করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে মুনাজাত করিলেন, ইলাহী। তুমি আমাকে এখন একটি বিষয় প্রদর্শন কর যাহাতে আমার অশান্ত হৃদয় প্রশান্ত হয় ও দুঃখ-ক্লেশ প্রশমিত হয়। ইহাতে আল্লাহ পাক তাঁহার প্রতি প্রত্যাদেশ করিলেন, হে আমার প্রিয়তম রাসূল! ঐ বৃক্ষগুলি হইতে আপনার ইচ্ছামত শাখাসমূহকে আপনার প্রতি আহবান করুন। তিনি তাহাই করিলেন। শাখাগুলি বৃক্ষ হইতে পৃথক হইয়া মাটি দলিত মথিত করিয়া তাঁহার প্রতি অগ্রসর হইল। তাঁহার সন্নিকটে উপস্থিত হইলে তিনি আদেশ করিলেন, তোমরা স্বস্থানে ফিরিয়া যাও। শাখাগুলি স্বস্থানে ফিরিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ পাকের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৭; কানযুল 'উম্মাল, ১২খ., পৃ. ৩৫৪; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫০০)।
হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) সূত্রে ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করেন, হযরত ইবন 'আব্বাস বলেন, একদা বানু আমেরের জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল, হে মহান নবী। আপনার গ্রীবাদ্বয়ের মধ্যস্থিত মোহরে নুবৃওয়তটি কি আমাকে দেখাইবেন? যেহেতু আমি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি তাহাকে বলিলেন, আমি কি তোমাকে একটি নিদর্শন দেখাইব? সে বলিল, অবশ্যই। হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, মহানবী (স) একটি খেজুর গাছের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে বলিলেন, ঐ শাখা-প্রশাখাহীন নাঙ্গা গাছটিকে ডাক দাও। তখন সে বৃক্ষটিকে ডাক দিল। মাটি আঁচড়াইয়া বৃক্ষটি তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতঃপর মহানবী (স) উহাকে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিতে বলিলেন। তৎক্ষণাৎ বৃক্ষটি স্বস্থানে প্রস্থান করিল। অতঃপর আমিরী তাহার স্বজাতিকে আহবান করিয়া বলিল, হে আমের গোত্রের জনগণ! আমি অদ্যাবধি এই লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ যাদুকর দেখি নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৭, হাদীছটি আবূ নু'আয়ম সূত্রে ইমাম আহমাদ, বুখারী, তিরমিযী ও হাকেম বর্ণনা করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৯; দালাইলুন- নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩৫)।
মুহাম্মাদ ইব্ন আবী 'উবায়দা সূত্রে ইমাম বায়হাকী হইতে বর্ণিত। হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, একদা আমের গোত্রের এক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া বলিল, আমি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও বিজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তি! তাহাতে আপনার কি কোন অভিযোগ আছে? আর আপনি মানুষকে যে বিষয়ের প্রতি আহবান করিতেছেন, সে ব্যাপারে আপনার নিকট দৃষ্টান্তমূলক কোন প্রমাণ আছে? তিনি বলিলেন, আমি মানুষকে আল্লাহ এবং ইসলামের প্রতি আহবান করি। সে বলিল, আপনি সঠিক করিতেছেন না। আপনার দাবির সমর্থনে আপনার নিকট কি কোন নিদর্শন আছে? তিনি বলিলেন, অবশ্যই আছে। তোমার বাসনা থাকিলে আমি তোমাকে নিদর্শন দেখাইতে পারি। তাহাদের সম্মুখে ছিল একটি বৃক্ষ। মহানবী (স) বৃক্ষটির শাখার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলিলেন, ওহে বৃক্ষশাখা! তুমি শীঘ্র আমার নিকট আইস। সঙ্গে সঙ্গে পল্লবিত শাখা বৃক্ষ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া ভূপাতিত হইল এবং ভূমি আছড়াইতে আছড়াইতে তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতঃপর তিনি শাখাটিকে স্বস্থানে প্রস্থান করিতে বলিলে উহা স্বস্থানে প্রস্থান করিল। এই ঘটনার পর আমেরী তাহার গোত্রকে সম্বোধন করিয়া বলিল, "হে আমের ইবন সা' সা' সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ বা তাঁহার মতাদর্শ সম্পর্কে আমি আর কোন দিনই তোমাদেরকে তিরস্কার করিব না" (প্রাগুক্ত, বায়হাকীর, দালাইল, ৬খ., পৃ. ১৬; দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, ৩৩৫; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৯)।
হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) সূত্রে ইমাম বায়হাকী কর্তৃক বর্ণিত। হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি মহানবী (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, আপনার সহচরবৃন্দ আপনার সম্পর্কে এইসব কি বলেন? হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলেন, সেই সময় মহানবী (স) পল্লবিত শাখাবিশিষ্ট ও শাখাহীন তরুলতার মধ্যখানে ছিলেন। তিনি লোকটিকে বলিলেন, আমি কি তোমাকে কোন নিদর্শন প্রদর্শন করিব? সে বলিল, নিশ্চয়। তখন তিনি একটি শাখাহীন বৃক্ষকে আহবান করিলেন। বৃক্ষটি মাটি ছেদ করিয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল এবং সিজদা করিল, মস্তক উঠাইল, দাঁড়াইয়া রহিল কিছুক্ষণ। রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে স্বস্থানে ফিরিয়া যাইতে বলিলে উহা প্রস্থান করিল। অনন্তর লোকটি তাহার স্বজাতিকে বলিল, তাই আমের ইবন সা' সা' গোত্র! আমি আর কোন দিন মুহাম্মাদের প্রতি অসত্যারোপ করিব না। তাহার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণে তোমাদেরকেও আর তিরস্কার করিব না" (প্রাগুক্ত; বায়হাকীর দালাইল, ৬খ., পৃ. ১৭)।
অপর একটি সূত্রে ইমাম বায়হাকী (রা) বলেন, হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, একদা এক বেদুঈন মহানবী (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিকট নিবেদন জানাইল, আমি কেমন করিয়া বুঝিব যে, আপনি আল্লাহর রাসূল? তিনি তাহাকে বলিলেন, তুমি কি চাও, আমি ঐ খেজুর বীথি হইতে একটি শাখাহীন খেজুর গাছ ডাকিয়া লইয়া আসি। তাহা হইলেই কি তুমি বুঝিবে যে, আমি আল্লাহর রাসূল এবং তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আমি নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল? লোকটি বলিল, হাঁ। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, মহানবী (স) একটি শাখাহীন গাছকে ডাক দিলেন। গাছটি খেজুর বাগান হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া ভূমিতে অবনমিত হইল এবং ভূমি দলিত মথিত করিয়া মহানবী (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হইল। অতপর তিনি উহাকে স্বস্থানে প্রস্থান করিতে বলিলেন, তৎক্ষণাৎ উহা স্বস্থানে প্রস্থান করিল। বেদুঈন লোকটি সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষ্য প্রদান করিল, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল। সে ঈমান গ্রহণ করিল (প্রাগুক্ত; ৬খ., পৃ. ১৩৭; হাদীছটি ইমাম বুখারী তদীয় ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ., ৪৯৯; বায়হাকীর দালাইল, ৬খ., পৃ. ১৫)।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, এক ভ্রমণে আমরা মহানবী (স)-এর সফরসঙ্গী ছিলাম। পথে এক বেদুঈনের সহিত সাক্ষাৎ হইল। সে আমাদের নিকটবর্তী হইলে মহানবী (স) তাহাকে শুধাইলেন, কোথায় যাও। সে বলিল, আমার পরিবারের নিকট। তিনি বলিলেন, তোমার নিকট কল্যাণজনক কিছু আছে কি? সে বলিল, সেইটা আবার কি! তিনি বলিলেন, তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই। তিনি এক, তাঁহার কোন সমকক্ষ নাই আর মুহাম্মদ তাঁহার দাস ও রাসূল। সে বলিল, আপনার কথার সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে? তিনি বলিলেন, ঐ গাছটিই তাহার প্রমাণ দিবে। গাছটি ছিল উপত্যকার শেষ প্রান্তে। তিনি উহাকে ডাক দিলেন। মাটি আছড়াইতে আছড়াইতে উহা মহানবী (স)-এর প্রতি অগ্রসর হইল। তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া আল্লাহ পাকের একত্ব ও মহানবী (স)-এর নবৃওয়াতের উপর তিনবার সাক্ষ্য প্রদান করিল। অতঃপর মহানবী (স)-এর নির্দেশানুসারে উহা স্বস্থানে প্রস্থান করিল। আর বেদুঈন লোকটি তাহার স্বজাতির নিকট গমন করিল এবং বলিল, তাহার গোত্রের লোকো তাঁহার অনুসরণ করিলে তাহাদিগকে সঙ্গে লইয়া আসিবে। অন্যথা সে একাই তাঁহার নিকট আসিবে এবং তাঁহার অনুগামী হইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৩৮; ইব্ন হিববান ও হাকেমও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। হাকেম কর্তৃক উহা প্রত্যয়িত হইয়াছে। যাহাবী বলেন, হাদীছটির বর্ণনা-পরম্পরা অতি উত্তম। সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৯)।
হযরত গায়লান ইব্ন সালামা আছ-ছাকাফী (রা), যিনি তায়েফ বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, বলেন, একবার আমরা নবী করীম (স)-এর সঙ্গে ভ্রমণে বাহির হইলাম। পথিমধ্যে আমরা প্রভূত অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম। এক সময় আমরা বিক্ষিপ্ত নাতিদীর্ঘ খেজুর বাগানের মধ্য দিয়া অতিক্রম করিতেছিলাম। মহানবী (স) আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, গায়লান! ঐ ছোট খেজুর গাছ দুইটিকে ডাক দাও, উহাদেরকে পরস্পর মিলিত হইবার নির্দেশ প্রদান কর, যেন উহাকে আড়াল হিসাবে ব্যবহার করিয়া আমি প্রয়োজন সমাধা করিতে পারি। আমি গাছ দুইটির নিকট গেলাম। উহাদিগকে বলিলাম, আল্লাহর রাসূল তোমাদেরকে পরস্পর মিলিত হইবার আদেশ প্রদান করিয়াছেন। ইহাতে একটি গাছ ভূমিতে অবনমিত হইয়া হেঁচড়াইতে হেঁচড়াইতে অপরটির নিকট গমন করিল। পরস্পর মিলিত হইলে মহানবী (স) বাহন হইতে অবতরণ করিলেন। উহাদের পশ্চাতে গমন করিয়া স্বীয় প্রয়োজন সমাধা করিলেন। অতঃপর গাছ দুইটিও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়া পূর্ববৎ স্বস্থানে অবস্থান লইল (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৭; আবূ নু'আয়ম, দালাইলুন- নুবৃওয়াহ, পৃঃ ৩৩৪)।
হযরত উসামা ইব্ন যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) হইতে খারিজা ইব্ন যায়দ কর্তৃক বর্ণিত। হযরত উসামা বিদায় হজ্জে মহানবী (স)-এর সহযাত্রী ছিলেন। তাঁহার সম্মুখে মহানবী (স)-এর দুইটি অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। তাঁহার বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে তিনি বলেন, মহানবী (স) আমাকে বলিলেন, 'উসামা! তুমি বাহিরে যাও। দেখতো কোন গোপন স্থান পাও কিনা? আমি ইসতিনজা করিব। আমি তাঁবুর বাহির হইলাম। দেখিতে পাইলাম, সম্মুখে বিশাল জনসমাগম। কোনরূপ আড়াল দেখিতে পাইলাম না। সংবাদটি মহানবী (স)-কে জানাইলে তিনি বলিলেন, কোথাও কোন বৃক্ষলতা অথবা বৃহৎ প্রস্তর খণ্ডও কি নাই? আমি বলিলাম, হাঁ, নাতিদীর্ঘ খেজুর গাছ ও বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তর খণ্ড দেখা যায়। তিনি বলিলেন, আসীম! তুমি পুনরায় যাও। বিচ্ছিন্ন খেজুর গাছগুলিকে বল, আল্লাহ্র রাসূল তোমাদিগকে পরস্পর একত্র হইতে বলিয়াছেন, আর বিক্ষিপ্ত প্রস্তর খণ্ডগুলিকে বল, আল্লাহ্র রাসূল তোমাদিগকে একত্র হইয়া আড়াল সৃষ্টি করিতে বলিয়াছেন। আমি তাহাই করিলাম। সে কি বিস্ময়! যিনি তাঁহাকে সত্য নবী করিয়া প্রেরণ করিয়াছেন তাঁহার কসম করিয়া বলিতেছি, গাছগুলি কিভাবে মূলসহ পরস্পর প্রতিযোগিতা করিয়া একত্র হইল। মনে হইল যেন একটি গাছ। অনুরূপ প্রস্তর খণ্ডগুলি পরস্পর প্রতিযোগিতা করিয়া পরস্পর গ্রথিত হইল, মনে হইল যেন একটি প্রাচীর। আমি ফিরিয়া গিয়া মহানবী (স)-কে বিষয়টি অবগত করিলাম। তিনি বলিলেন, পানির পাত্র লও। আমি পানির পাত্রসহ তাঁহার সহিত চলিলাম। আড়ালকৃত স্থানটির নিকটে গিয়া পানির পাত্র রাখিয়া আমি ফিরিয়া আসিলাম। তিনি অগ্রসর হইয়া তাঁহার প্রয়োজন সমাধা করিয়া ফিরিয়া আসিলে আমি তাঁহার হস্ত হইতে পানির পাত্র লইয়া তাঁহার সহিত তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম।
এইবার মহানবী (স) আমাকে বলিলেন, আসীম! তুমি আবার যাও। গাছগুলি ও প্রস্তর খণ্ডগুলিকে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিতে বল। আমি তাহাই করিলাম। পূর্বের মতই উহারা প্রতিযোগিতা করত বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। আমিও প্রত্যাবর্তন করিয়া মহানবী (স)-কে বিষয়টি অবগত করিলাম (কানযুল উম্মাল, ১২খ., ৪০৩; ইব্ন কাছীর, জামি'উল মাসানীদ ওয়াস-সুনান, ১খ., পৃ. ২২২; সুবুলুল হুদা ওয়ার- রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৭; আবূ নু'আয়ম, দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩৬)।
'হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) সূত্রে আবূ নু'আয়ম (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমরা খায়বার অভিযানে মহানবী (স)-এর সহগামী হইয়াছিলাম। তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে মনস্থ করিয়া বলিলেন, 'আবদুল্লাহ! তুমি একটু দেখ কোন আড়াল পাওয়া যায় কি না, আমি প্রয়োজন সারিব। আমি লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম, মাত্র একটি গাছ সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে। আমি একথা তাঁহাকে জানাইলে তিনি বলিলেন, "ভাল করিয়া দেখ। আরও কিছু দেখা যায় কিনা?" আমি লক্ষ্য করিলাম, বিস্তর ব্যবধানে আরও একটি গাছ দণ্ডায়মান। এই সংবাদটিও-আমি তাঁহাকে জানাইলাম। তিনি আমাকে বলিলেন, আবদুল্লাহ! তুমি উহাদিগকে বল, আল্লাহর রাসূল তোমাদিগকে একত্র হইতে বলিয়াছেন। আমি তাহাই করিলাম। উহারা পরস্পর মিলিত হইল। মহানবী (স) উহার অন্তরালে প্রয়োজন সারিয়া প্রত্যাবর্তন করিলে গাছগুলি যথাস্থানে গিয়া দণ্ডায়মান হইল (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪৯৬)।
হযরত ইয়া'লা ইব্ন মুররা (রা) হইতে ইমাম আহমাদ ইবন সা'দ এবং ইব্ন আবী শায়বা বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ বর্ণনাকারিগণের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে, ইমাম হাকেম কর্তৃক প্রত্যয়িতও হইয়াছে। হযরত ইয়া'লা বলেন, আমরা এক ভ্রমণে মহানবী (স)-এর সহযাত্রী ছিলাম। এক স্থানে আমরা যাত্রাবিরতি করিয়া বাহন হইতে অবতরণ করিলাম। মহানবী (স) আমাকে বলিলেন, ঐ ছোট ছোট খেজুর গাছগুলির নিকট যাও এবং বল, মহানবী (স) তোমাদেরকে একত্র হইতে বলিয়াছেন। আমি উহাদের নিকট গিয়া উহাদিগকে মহানবী (স)-এর কথা জানাইলাম। তখন উহারা হুড়াহুড়ি করিয়া একত্র হইল। মহানবী (স) উহার অন্তরালে প্রয়োজন সারিয়া প্রত্যাবর্তন করিলে গাছগুলি যথাস্থানে গিয়া দণ্ডায়মান হইল (প্রাগুক্ত; দালাইলুন-নুবৃওয়াত, পৃ. ৩৩৩)।
হযরত বুরায়দা (রা) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন, একদা এক বেদুঈন মহানবী (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। এখন আপনি আমাকে এমন বিস্ময়কর কিছু প্রদর্শন করুন যাহাতে আমার প্রতীতি সুদৃঢ় হয়। তিনি বলিলেন, তুমি কিরূপ নিদর্শন দেখিতে চাও? লোকটি বলিল, আপনি ঐ গাছটিকে ডাক দিন, উহা আপনার নিকট উপস্থিত হউক। তিনি বলিলেন, তুমি যাও, উহাকে ডাক দাও। লোকটি গাছের নিকট গিয়া বলিল, হে গাছ! মহানবীর ডাকে সাড়া দাও। গাছটি সম্বোধিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমূলে উৎপাটিত হইল, অতঃপর মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সালাম জানাইল। বেদুঈন লোকটি তখন মহানবী (স)-কে বলিল, ইহাই আমার জন্য যথেষ্ট, ইহাই আমার জন্য যথেষ্ট, হে মহানবী (স)! এইবার গাছটিকে উদ্দেশ্য করিয়া মহানবী (স) বলিলেন, প্রত্যাবর্তন কর। গাছটি স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিল ও শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করিয়া দণ্ডায়মান রহিল। এইবার লোকটি বলিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি সদয় অনুমতি দিলে আমি আপনার শির মুবারক ও চরণ দুইখানি চুম্বন করিতাম। অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া লোকটি তাহাই করিল। অতঃপর সিজদা করিবার অনুমতি কামনা করিলে তাহাকে মহানবী (স) বলিলেন, কেহ কাহাকেও সিজদা করিবে না। আমি যদি কাহাকেও সিজদা করিবার অনুমতি প্রদান করিতাম তাহা হইলে স্বামীকে সিজদা করার জন্য স্ত্রীকে অনুমতি প্রদান করিতাম (দালাইলুন-নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৩২)।
হযরত 'আলী (রা) বলেন, আমি মহানবী (স)-এর সঙ্গে মক্কা নগরীতে বসবাস করিতাম। একদা তাঁহার সহিত মক্কার পার্শ্বে গিরিউপত্যাকায় ভ্রমণে বাহির হইলাম। আমরা যখনই কোন বৃক্ষ, পাথর বা পাহাড়ের পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম করিতাম, তখনই প্রত্যেকেই বলিত, আস্সালামু 'আলায়কুম ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (প্রাগুক্ত)।
হযরত ইয়া'লা ইব্ন মুররা ছাকাফী (রা) বর্ণনা করেন, একবার আমরা মহানবী (স)-এর সহিত ভ্রমণ করিতেছিলাম। এক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলাম। মহানবী (স) নিদ্রা গেলেন। হঠাৎ করিয়া একটি বৃক্ষ ভূমি বিদীর্ণ করিয়া আসিয়া তাঁহাকে ঢাকিয়া ফেলিল, অতঃপর ফিরিয়া গেল। মহানবী (স) জাগরিত হইলে বিষয়টি তাঁহাকে জানান হইল। তিনি বলিলেন, "আমাকে সালাম জানাইবার জন্য গাছটি উহার পালনকর্তার নিকট অনুমতি চাহিয়াছিল। অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া উহা আমাকে সালাম জানাইতে আগমন করিয়াছিল" (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৮)।