📄 অহংকার ও দাম্ভিকতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নীতি
আত্মার ব্যাধিসমূহের মধ্যে অহংকার (কিবর) ও দাম্ভিকতা হইল এক মারাত্মক ও জঘন্য ধরনের ব্যাধি। অহংকারের অর্থ হইল নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় জ্ঞান করা এবং অন্যকে তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট মনে করা। বস্তুত অহংকারী ও দাম্ভিক মানুষকে আল্লাহ তা'আলা পসন্দ করেন না। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا.
"নিশ্চয় আল্লাহ পসন্দ করেন না দাম্ভিক ও অহংকারীকে" (৪: ৩৬)। তিনি আরও ইরশাদ করেন:
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا.
"আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত অহংকারীকে পসন্দ করেন না" (৩১: ১৮)।
'আল্লামা শিবলী নু'মানী ও মাওলানা সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী বলেন, অহংকারের কুফল অনেক বেশী। অহংকারী শ্রেষ্ঠ মনে করে এই কারণে যে, সে সাধারণ মানুষের সহিত উঠা-বসা পানাহার ও কথাবার্তা বলাকে নিজের মর্যাদা হানিকর মনে করে। সর্বদা তাহার এই প্রত্যাশা থাকে যে, মানুষ তাহার সামনে হাত জোড় করিয়া দাঁড়াইয়া থাকুক। যখন সে মানুষের সহিত মিলিত হয় তখন কামনা করে যে, মানুষ তাহাকে অগ্রে সালাম করুক। পথ চলার সময় সে মানুষের আগে আগে চলিতে চায় এবং মজলিসে ও অনুষ্ঠানাদিতে সে সদর (সভাপতি) হওয়ার বাসনা পোষণ করে ইত্যাদি (সীরাতুন নবী, ৬খ., পৃ. ৩৫০)।
আল-মুরশিদুল আমীন গ্রন্থে ইমাম গাযালী (র) অহংকার ও দাম্ভিকতা সম্পর্কে বলেন, অহংকার মানসিক একটি অবস্থার নাম। মানুষের আমিত্ব হইতেই এই অহংকারের জন্ম। রাসূলুল্লাহ (স) অহংকারের সামান্যতম সংশ্রব হইতেও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিয়াছেন। মহানবী (স) ছিলেন বিনয়ের মূর্ত প্রতীক। তিনি নিজে দাম্ভিক ছিলেন না এবং দাম্ভিকতাকে পসন্দও করিতেন না। খাওয়া-পরা, উঠা-বসা, চলা-ফেরা, কথা-বার্তা এবং আচার-আচরণ কোন কিছুতেই তিনি দাম্ভিকতা ও অহংকারকে প্রশ্রয় দিতেন না। দাম্ভিকতা প্রকাশ পায় এরূপে বসিয়া তিনি কখনও আহার করিতেন না। হাদীছে আছে:
ان رسول الله ﷺ قال لا أكل متكنا
"রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি হেলান দিয়া আহার গ্রহণ করি না" (সুনান ইবন মাজা, কিতাবুল আত'ইমা, পৃ. ২৪২)।
অপর এক হাদীছে আছে:
حدثنا عبد الله بن بسر قال اهديت للنبي ﷺ شاة فجثى رسول الله ﷺ على ركبتيه ياكل فقال اعرابي ما هذه الجلسة فقال ان الله جعلنى عبدا كريما ولم يجعلني جبارا عنيدا.
'আবদুল্লাহ ইব্ন বুসর (রা) বলেন, আমি নবী (স)-কে একটি বকরী হাদিয়া দিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) হাঁটু গাড়িয়া উপবিষ্ট হইয়া উহা ভক্ষণ করিতেছিলেন। এক বেদুঈন বলিল, ইহা আবার কোন ধরনের বসা! তিনি বলিলেন, "আল্লাহ আমাকে ভদ্র ও বিনীত বান্দা বানাইয়াছেন, অহংকারী ও দাম্ভিক বানান নাই" (সুনান ইবন মাজা, আত'ইমা, বাবুল আকলি মুত্তাকিয়ান, নং ৩২৬৩)।
হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বসিয়া বাম হাতে আহার করিতেছিল। ইহা দেখিয়া নবী কারীম (স) বলিলেন, ডান হাতে খাও। সে বলিল, আমি ডান হাতে খাইতে পারি না। নবী কারীম (স) বলিলেন, তোমার শক্তি না থাকুক। বস্তুত অহংকারই তাহাকে নবী কারীম (স)-এর কথা মান্য করা হইতে বিরত রাখিয়াছে। বর্ণনাকারী বলেন, ইহার পর সে আর তাহার হাত মুখ পর্যন্ত উত্তোলন করিতে সক্ষম হয় নাই (রিয়াদুস সালিহীন, বাবু তাহরীমিল কির, পৃ. ২৭০-সূত্র সহীহ মুসলিম)।
হযরত জাবির ইবন 'আবদুল্লাহ (রা) বলিয়াছেন, ইসলামে দীক্ষিত হইবার পর যখনই আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে উপস্থিত হইতাম তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানাইতেন। আমাকে গ্রহণ করিবার সময় সর্বদা আমি তাঁহার মুখে হাসি বিচ্ছুরিত দেখিতে পাইতাম। হযরত আবদুল্লাহ ইবন হারিছ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত মুহাম্মাদ (স) অপেক্ষা অধিক বিনয়ী মানুষ তাহার চোখে পড়ে নাই। যে কোন লোকের সাথে দেখা হইলে রাসূলুল্লাহ (স)-ই প্রথম সালাম জানাইতেন এবং লোকটির কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করিতেন। ইহা ছিল তাঁহার চিরাচরিত রীতি। কোন লোক একান্তে তাঁহার সহিত কথা বলিতে চাহিলে তাঁহার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং স্বেচ্ছায় সে প্রস্থান না করা পর্যন্ত তিনি তাহার দিক হইতে কখনও মুখ ফিরাইয়া লইতেন না। কাহারও সহিত করমর্দনের সময় তিনি নিজের হাত ছাড়াইতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না লোকটি তাহার হাত ছাড়াইয়া লইত। সাহাবীগণের সহিত উপবেশন কালে তিনি এমনভাবে বসিতেন যাহাতে তাঁহাকে তাঁহাদের একজন বলিয়া মনে হইত। কখনও তিনি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কোন উচ্চ আসন কিংবা উচ্চ স্থানে উপবেশন করিতেন না। বৈদেশিক প্রতিনিধিদলসহ বহু লোকজন মদীনায় তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিত। অনেক সময় দেখা যাইত, তিনি মসজিদে যখন তাঁহার সহচদের সহিত একত্রে বসিয়া আলাপ-আলোচনা করিতেন তখন তাঁহার সাধারণ পোশাক এবং বসিবার ধরনের কারণে তাঁহাকে চিনিয়া লওয়া প্রায়শই তাহাদের পক্ষে সম্ভব হইত না।
একবার আবিসিনিয়ার সম্রাটের কয়েকজন দূত তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসে। তিনি তাহাদেরকে নিজস্ব অতিথি হিসাবে তাঁহার নিজের কাছে রাখেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তাহাদের সেবা করেন, এমনকি তাঁহার কাছে অবস্থান কাল পর্যন্ত তাহাদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার আয়োজন করেন। নিজের হাতেই তিনি এইসব করেন। তাঁহার সহচরগণ অতিথিবর্গের সেবার দায়িত্ব তাহাদের উপর ছাড়িয়া দেওয়ার প্রস্তাব করিলে তিনি জবাবে বলেন, ইহারা এক সময় আবিসিনিয়ায় আশ্রয়গ্রহণকারী তাঁহার বিপন্ন বন্ধুদের সেবা করিয়াছিলেন। সুতরাং স্বয়ং তাঁহাকেই ইহাদের আদর-আপ্যায়নের কর্তব্য পালন করিতে হইবে (হযরত মুহাম্মদ (সা) জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৪৯-৫০)।
রাসূলুল্লাহ (স) যে বিনয়ের পূর্ণ প্রতীক ছিলেন এবং তিনি যে অহংকার বর্জন করিয়া চলিতেন নিম্নোক্ত ঘটনা হইতেও তাহা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (স) 'উকবা ইবন 'আমর (রা)-কে সঙ্গে লইয়া একটি সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করিতেছিলেন। তিনি ছিলেন তখন উষ্ট্রের পৃষ্ঠে। কিছু দূর যাওয়ার পর তিনি 'উকবা (রা)-কে তাঁহার পালা হিসাবে জন্তুযানে আরোহণ করিতে বলিলেন। কিন্তু 'উকবা (রা) ব্যাপারটিকে তাহার জন্য অসঙ্গত বলিয়া মনে করিলেন। কারণ আল্লাহ্র রাসূল (স) পায়ে হাঁটিয়া চলিবেন, আর তিনি উটের পিঠে বসিয়া আরাম করিবেন, ইহা কিছুতেই মানিয়া লইতে পারিলেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) উটের পিঠ হইতে নামিলেন এবং 'উকবা (রা)-কে বাধ্য করিলেন তাঁহার জায়গায় আসন গ্রহণ করিতে (হযরত মুহাম্মদ (স) জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৫০)।
রাসূলুল্লাহ (স) নিজে অহংকার হইতে বাঁচিয়া থাকার পাশাপাশি মানুষকেও অহংকার হইতে বাঁচিয়া থাকার জন্য আদেশ করিয়াছেন এবং এই ব্যাপারে লোকদেরকে সতর্ক করিয়াছেন। তিনি বলেন: لا يدخل النار احد في قلبه مثقال حبة من خردل من ايمان ولا يدخل الجنة احد في قلبه مثقال حبة من خردل من كبر .
"এমন কোন লোক জাহান্নামে প্রবেশ করিবে না যাহার অন্তরে সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে। এমন কোন ব্যক্তিও জান্নাতে প্রবেশ করিবে না যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ অহংকার থাকিবে" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৫)। لا يدخل الجنة من كان في قلبه مثقال ذرة من كبره فقال رجل ان الرجل يحب ان يكون ثوبه حسنا ونعله حسنا قال ان الله جميل يحب الجمال الكبر بطر الحق وغمط الناس.
"যাহার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকিবে সে জান্নাতে প্রবেশ করিবে না। এক ব্যক্তি বলিল, প্রত্যেক ব্যক্তিই তো ইহা পছন্দ করে যে, তাহার কাপড় সুন্দর হউক এবং তাহার জুতা জোড়া সুন্দর হউক। তিনি বলিলেন, নিশ্চয় আল্লাহ নিজেও সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দও করেন (অহংকার হইল দম্ভভরে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে হেয় ও তুচ্ছজ্ঞান করা” (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৫)।
উপরিউক্ত হাদীছের দার্শনিক কারণ বিশ্লেষণ করত ইমাম গাযালী (র) বলিয়াছেন— মুসলমানদের সুনির্দিষ্ট যে আখলাক রহিয়াছে তাহা হইল জাড়াতের দরজা, কিন্তু অহংকার এই সকল দরজাকে বন্ধ করিয়ছ দেয়। এই কারণেই যাহার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার ষাকিবে সে জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবেচনা (সীরাতনে নবী, ৬খ., পৃ. ৩৫১)।
নিজের নামের সহিত লম্বা লম্ব” লকব বা উপাধি যোগ করিয়া দেওয়া উচিত০নহে। কেননা এই সকল উপাধি যদি বাস্তবতার বিপরীত হয় তবে তাহা সর্বৈব মিথ্যা, আর যদি বাস্তবসম্মতও হয় তবুস্ক তাহা অহংকার ও দাম্ভিকতার অন্তর্ভুক্ত বলিয়া গণ্য হইবে। কতিপয় অনারব বাদশাহ অহংকারবশে নিজেদেরকে ملك الاملاك তথা শাহানশাহ্ বা রাজাবিধরাজ বলিয়া অভিহিত করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহা অপসন্দ করেন। তিনি বলেন—
ان احنى الاسماء يوم القيامة عند الله رجل تسمى ملك الاملاك.
“আল্লাহ্র নিকট কিয়ামত দিবসে ঐ ব্যক্তির নাম সবচেয় ঘৃণিত যে তাহার নিজের নাম ধারণ করিয়াছে শাহানশাহ বা রাজাবিধরাজ” (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯১৬, আদাব, বাব আবগাদি’ল আসমা ইলাল্লাহ, নং ৬২০৫-৬; মুসলিম, আদাব, নং ২০, ২১; আবু দাউদ, আদাব, বাব ৬২; তিরমিযী, আদাব, বাব ৬৫)।
বস্তুত অহংকার মানুষকে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেয়। কিন্তু বিনয় ও নম্রতা মানুষকে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেয়। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন :
الا اخبركم بأهل الجنة كل ضعيف متضعف لو اقسم على الله لابره الا اخبركم باهل النار كل عتل جواظ مستكبر
“আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী মানুষ সম্পর্কে অবহিত করিব না? তাহারা হইল ঐ সমস্ত লোক যাহারা দুর্বল ও অসহায় এবং যাহাদেরকে দুর্বল ও অসহায় মনে করা হয়। তাহারা যদি আল্লাহর নামে শপথ করে তবে তিনি তাহা নিশ্চয় পূর্ণ করিয়া দেন। আর আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে অবহিত করিব না? তাহারা হইল রূঢ় স্বভাব ও কঠিন হৃদয়সম্পন্ন দাম্ভিক মানুষ” (মিশকাত শরীফ, পৃ. ৪৩৩)।
আল্লাহ তা'আলা অহংকারী ও দাম্ভিক মানুষের প্রতি রহমতের নজরে তাকাইবেন না এবং তাহাকে পরিশোধিতও করিবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন :
ثلثة لا يكلمهم الله يوم القيامة ولا يزكيهم وفى رواية ولا ينظر اليهم ولهم عذاب اليم شيخ زان وملك كذاب وعائل مستكبر
“তিন শ্রেণীর মানুষ এমন যাহাদের সহিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা রলিবেন না, তাহাদেরকে পবিত্র করিবেন না, অপর এক বর্ণনামতে তাহাদের প্রতি রহমতের নজরে তাকাইবেন না এবং তাহাদের জন্য রহিয়াছে মর্মন্তদ শাস্তি: (১) বৃদ্ধ ব্যভিচারী; (২) মিথ্যাবাদী শাসক ও (৩) অভাবী অহংকারী” (মিশকাত, বাবুল গাদবি ওয়াল-কিবর, পৃ. ৪৩৩)।
হাদীছে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
الكبرياء درائي والعظمة ازارى فمن نازعنى واحدا منهما ادخلته النار .
"অহংকার আমার চাদর এবং মহত্ত্ব আমার ভূষণ। কেহ যদি এই দুইটির কোন একটি লইয়া আমার সহিত টানাটানি করে তবে আমি তাহাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করিব" (মিশকাত, বাবুল গাদবি ওয়াল-কিবর, পৃ. ৪৩৩)।
অন্য এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
لا يزال الرجل يذهب بنفسه حتى يكتب في الجبارين فيصيبه ما اصابهم .
"কোন মানুষ এমনভাবে আত্মগর্বে লিপ্ত হয় যে, অবশেষে তাহার নাম উদ্ধত অহংকারীদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হইয়া যায়। ফলে তাহার উপর ঐ আযাব আপতিত হয় যাহা তাহাদের (অহংকারীদের) উপর আপতিত হইয়া থাকে" (মিশকাত, বাবুল গাদবি ওয়াল-কিবর, পৃ. ৪৩৩)।
কিয়ামতের দিন দাম্ভিক ও অহংকারী লোকদেরকে "বাওলাস” নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে এবং অপমান চতুর্দিক হইতে তাহাদিগকে আচ্ছন্ন করিয়া লইবে। নবী করীম (স) বলেন-
يحشر المتكبرون امثال الذى يوم القيامة في صورة الرجال يغشاهم الذل من كل مكان يساقون الى سجن في جهنم يسمى بولس تعلوهم نار الانيار يسقون من عصارة اهل النار طينة الخبال .
"কিয়ামতের দিন অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদিগকে পিপীলিকার আকারে জড়ো করা হইবে এবং তাহাদের আকৃতি ও অবয়ব হইবে মানুষের ন্যায়। অপমান তাহাদেরকে চতুর্দিক হইতে বেষ্টন করিয়া লইবে। 'বাওলাস' নামক জাহান্নামের দিকে তাহাদেরকে হাঁকাইয়া লইয়া যাওয়া হইবে। আগুনের অগ্নিশিখা তাহাদেরকে আচ্ছাদিত করিবে। আর তাহাদেরকে পান করানো হইবে জাহান্নামীদের দেহ নিংড়ানো কদর্য পুঁজ রক্ত” (মিশকাত, পৃ. ৪৩৩-৪৩৪)।
অহংকারী ব্যক্তি মানুষের কাছে তুচ্ছ, এমনকি কুকুর ও শূকর অপেক্ষা ঘৃণিত বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে। হাদীছে আছেঃ
عن عمر قال وهو على المنبر يايها الناس تواضعوا فاني سمعت رسول الله ﷺ يقول من تواضع لله رفعه الله فهو في نفسه صغير وفي اعين الناس عظيم ومن تكبر وضعه الله فهو في اعين الناس صغير وفى نفسه كبير حتى لهو اهون عليهم من كلب او خنزير .
"হযরত 'উমার (রা) মিম্বরে দাঁড়াইয়া বলিলেন, হে লোকসকল! তোমরা বিনয়ী হও। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয় আল্লাহ তাহার মর্যাদা বৃদ্ধি করিয়া দেন। সে নিজের কাছে ছোট কিন্তু মানুষের চোখে বড় হইয়া যায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অহংকার করে আল্লাহ তাহাকে হেয় করিয়া দেন। সে মানুষের নজরে তুচ্ছে পরিণত হয়, কিন্তু নিজের কাছে বড় মনে হয়। পরিশেষে সে মানুষের কাছে কুকুর কিংবা শূকর অপেক্ষা ঘৃণিত হয়” (মিশকাত, ১খ., পৃ. ৪৩৪)।
এক দীর্ঘ হাদীছে দাম্ভিকতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, সেই বান্দাই সর্বাপেক্ষা মন্দ যে নিজেকে অন্যের চাইতে ভাল মনে করে ও আত্মগরিমায় লিপ্ত হয় এবং সুমহান পরাক্রমশালী সত্তার কথা ভুলিয়া যায়।........ সেই বান্দাই সর্বপেক্ষা মন্দ, যে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে এবং সীমালংঘন করে আর নিজেকে ও শেষ পরিণতিকে ভুলিয়া যায় (মিশকাত, ১খ., পৃ. ৪৩৪)।
উল্লেখ্য যে, অহংকার এবং দাম্ভিকতার কারণ অনেক। তবে মানুষ সাধারণত যেইসব কারণে অহংকার করে তাহা হইল বংশকুল, মাল-দৌলত, রূপ-সৌন্দর্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, সন্তান- সন্তুতি ইত্যাদি। কুরআনে এই সবের হাকীকত এবং প্রকৃত অবস্থা বিশ্লেষণ পূর্বক এইগুলি হইতে দূরে থাকার হুকুম দেওয়া হইয়াছে। আর রাসূলুল্লাহ (স) যেহেতু কুরআনেরই বাস্তব নমুনা ছিলেন তাই তিনি অহংকারের যাবতীয় উপকরণ হইতে বাঁচিয়া থাকিতেন এবং সাহাবায়ে কিরামকেও এইসব মন্দ স্বভাব হইতে বাঁচিয়া থাকার আদেশ করিতেন। সর্বোপরি কি কি কাজ করিলে অন্তর হইতে অহংকার দূরীভূত হইতে পারে সেই পথও তিনি বলিয়া দিয়াছেন। প্রাক-ইসলামী যুগে আরবদের অহংকারের বিষয় ছিল বংশকুলের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। ইসলাম কৌলিণ্যের এই অহেতুক ধারণাকে ধূলিসাত করিয়া দিয়াছে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ.
"হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছি এক পুরুষ ও এক নারী হইতে; পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করিয়াছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাহাতে তোমরা একে অপরের সহিত পরিচিত হইতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্র নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ সকল কিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন" (৪৯:১৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত আয়াতের বিশ্লেষণ করত বলেন, মানুষের উচিত নিজেদের মৃত পূর্বপরুষদেরকে লইয়া গর্ব করা সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা। কেননা তাহারা তো জাহান্নামের কয়লা হইয়া গিয়াছে অথবা গোবরের কীট, যাহা নিজের মুখে নাপাক বস্তু বহন করিয়া চলে— তাহা অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট। আল্লাহ তা'আলা জাহিলী যুগের অহংকার এবং পিতৃপুরুষদের বিষয়ে গর্ব করাকে মিটাইয়া দিয়াছেন। এখন শুধু দুই শ্রেণীর মানুষ আছে— (১) পরহেযগার মু'মিন, (২) গুনাহগার পাপী মানুষ। জানিয়া রাখিও, মানুষ সকলেই আদম সন্তান। আর আদম (আ)-কে মাটি হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে (আবূ দাউদ ও তিরমিযী সূত্র আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৫৭৩-৫৭৪)।
পোশাক-পরিচ্ছদের কারণেও মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হয়। যেই পোশাক পরিধান করিলে অহংকার সৃষ্টি হয় তাহা বর্জন করার ব্যাপারে শারী'আতে তাকীদ করা হইয়াছে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
يُبَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَواتِكُمْ وَرِيْشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ذلك مِنْ أَيْتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ.
"হে বনী আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকিবার ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছদ দিয়াছি এবং তাকওয়ার পরিচ্ছদ, ইহাই সর্বোৎকৃষ্ট। ইহা আল্লাহ্ নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাহাতে তাহারা উপদেশ গ্রহণ করে" (৭ঃ ২৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
اياكم والكبر فان الكبر يكون في الرجل وان عليه العباءة
"সাবধান! তোমরা অহংকার হইতে বাঁচিয়া থাকিবে। আবা (মূল্যবান পোশাক) পরিহিত অবস্থায়ও ব্যক্তির মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হইয়া থাকে” (তাবারানী, সূত্র আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ৫৬১)।
এমনিভাবে যেই তরীকায় জামা-কাপড় পরিধান করিলে অহংকার সৃষ্টি হয় তাহাও শারী'আতে পরিত্যাজ। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
لا ينظر الله الى من جر ثوبه خيلاء
"আল্লাহ সেই ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাইবেন না যে অহংকারের সহিত তাহার পরিধেয় টানিয়া হেঁচড়াইয়া চলে" (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৬০)।
كلوا واشربوا والبسوا وتصدقوا في غير اسراف ولا مخيلة
"তোমরা খাও, পান কর, পরিধান কর এবং সাদাকা কর, তবে অপচয় করিও না এবং অহংকার প্রকাশ করিও না” (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৮৬০)।
উপরিউক্ত ব্যবস্থাসমূহ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (স) অহংকার দূর করার আরও কিছু পদ্ধতির উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেন:
ما استكبر من اكل معه خادمه وركب الحمار بالاسواق واعتقل الشاة فحلبها
"যেই ব্যক্তির সহিত তাহার খাদেম আহার করে, যে গাধায় চড়িয়া বাজারে যায় এবং নিজ হাতে বকরী বাঁধিয়া উহার দুগ্ধ দোহন করে সে দাম্ভিক বা অহংকারী নয়” (আল- আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ১৪৫)।
হযরত জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা বলে যে, আমার মধ্যে অহংকার এবং দাম্ভিকতা আছে। অথচ আমি গাধায় আরোহণ করি, চাদর ব্যবহার করি এবং নিজ হাতে বকরীর দুগ্ধ দোহন করি। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিয়াছেন, যেই ব্যক্তি এই কাজগুলি করিবে তাহার মধ্যে কোন অহংকার থাকিতে পারে না (তিরমিযী, ২খ., পৃ. ২০)।
মোটকথা, অহংকার যেই কারণেই হউক ইহার পরিণতি অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ। তাই রাসূলুল্লাহ (স) ইহা হইতে সর্বতোভাবে পরহেয করিয়া চলিয়াছেন এবং অন্যদেরকেও ইহা হইতে বাঁচিয়া থাকার ব্যাপারে কঠিন ভাষায় উপদেশ প্রদান করিয়াছেন।
📄 রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) বা লোক দেখানো মনোভাব
রিয়া (ریاء) শব্দটির আভিধানিক অর্থ লোক দেখানো ভাব। শারী'আতের পরিভাষায় রিয়া বলা হয়:
ترك الاخلاص في العمل بملا حظة غير الله او عمل الغير لاراءة الغير "মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া কর্মে একনিষ্ঠতা (اخلاص) ত্যাগ করা অথবা লোক দেখানোর উদ্দেশে সৎ কর্ম করা” (কাওয়াইদুল ফিক'হ, পৃ. ৩১১)।
ইমাম গাযালী (র) বলেন, রিয়ার হাকীকত হইল ব্যক্তির কোন নেক আমল করার প্রাক্কালে এই উদ্দেশ্য পোষণ করা যে, লোকে তাহার আমল দেখুক এবং মানুষের মধ্যে তাহার সম্মান ও প্রতিপত্তি প্রকাশিত হউক। এইরূপে চালচলনেও রিয়া প্রকাশিত হইতে পারে। যেমন মোটা মোটা কাপড় পরিধান করা; চেহারার রং ফ্যাকাশে করিয়া ফেলা, চক্ষুকে অশ্রুসিক্ত করিয়া রাখা, কথাবার্তা অস্পষ্ট স্বরে বলা অগ্রে, সালাম প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা; পথ চলার সময় মানুষের আগে আগে চলা, ধীরে ধীরে চলা, এলোমেলো চুল রাখা ইত্যাদি। এইগুলিও এক প্রকারের রিয়া। কাজেই মানুষের সামনে নিজের আভিজাত্য ও বড়ত্ব জাহির করার জন্য এবং লোক দেখানোর নিমিত্ত এইরূপ ভাব অবলম্বন করা হারাম।
অনুরূপভাবে আলিমদের অতিরঞ্জন করিয়া কথা বলা যাহাতে মানুষ তাহাদের ইলমের উপর আস্থাশীল হয়, তাহাও নিষিদ্ধ। অবশ্য কেহ যদি দীনী বিষয়কে ভালভাবে বুঝাইয়া দেওয়ার নিমিত্ত এইরূপ করে তবে তাহা জায়েয।
এমনিভাবে ইবাদতের ক্ষেত্রেও রিয়া হইতে পারে। যেমন কাহারও প্রকাশ্যে সালাত আদায় করার সময় দীর্ঘ রুকু-সিজদা করা, যাহাতে মানুষ তাহাকে আবিদ ও পরহেজগার বলিয়া মনে করে। ইবাদতে রিয়ার বিভিন্ন স্তর রহিয়াছে। যদি ইবাদত দ্বারা রিয়াই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তবে এই ইবাদত অবশ্যই বাতিল গণ্য হইবে। যদি ইবাদতের নিয়তের সহিত রিয়াও যুক্ত থাকে এবং তাহাই অধিক হয় তবে ইহাতেও ইবাদত বিনষ্টের প্রবল আশংকা রহিয়াছে। যদি উভয়টিই সমান হয় তবে তদ্দ্বারা লাভ-ক্ষতি কোনটাই হইবে না, অবশ্য ইবাদতের প্রতিদানে কিছুটা ঘাটতি পরিলক্ষিত হইবে। আর যদি ইবাদতের নিয়তের সহিত রিয়ার কিছুটা সংমিশ্রণ থাকিলেও ইবাদতের নিয়তই প্রবল থাকে তবে এই রিয়ার কারণে ইবাদতের মৌলিকত্বের কোন ক্ষতি হইবে না। অবশ্য ছওয়াব কম হওয়ার আশংকা রহিয়াছে এবং এই রিয়ার কারণে শান্তি ভোগ করারও আশংকা রহিয়াছে।
স্মর্তব্য যে, রিয়া যদি মূল ঈমানের সহিত সম্পৃক্ত হইয়া পড়ে, তবে ইহা মুনাফিকীরূপে গণ্য হইবে। জাহান্নামের অতল গহ্বর তাহার জন্য নির্ধারিত আছে। আর যদি দীনের মৌলিক বিষয়াদি ও ফরযসমূহে রিয়া যুক্ত হয় তবে ইহাও গুরুতর অপরাধ। অবশ্য পূর্বোক্ত গুনাহের তুলনায় উহা একটু লঘু। আর যদি নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে রিয়া যুক্ত হয় তবে তাহাও পাপ বলিয়া গণ্য হইবে, কিন্তু এই পাপ পূর্বোক্ত পাপের তুলনায় সামান্য হালকা হইবে।
উল্লেখ্য যে, রিয়া দুই প্রকার: (১) রিয়া জলী (رياء جلی = প্রকাশ্য রিয়া) ও (২) রিয়া খাফী (رياء خفی = অপ্রকাশ্য বা সূক্ষ্ম রিয়া)। পূর্বে প্রকাশ্য রিয়ার কথা আলোচনা করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে সূক্ষ্ম রিয়া হইল লোক দেখানোর উদ্দেশে নহে, বরং ইবাদত করার সময় মনে মনে এইরূপ খেয়াল করা যে, মানুষ তাহার ইবাদত সম্পর্কে অবগত হউক এবং তদ্দ্বারা তাহার অন্তরে আনন্দ অনুভূত হউক (আল-মুরশিদুল আমীন, পৃ. ২৯২-২৯৫)।
রিয়া প্রকাশ্য অথবা গোপন হউক, ইসলামে ইহার কোনই সুযোগ নাই। সব ধরনের রিয়াই নিন্দনীয় ও বর্জনীয়। মুসলমানের প্রতিটি কাজ হইতে হইবে একমাত্র মহান আল্লাহ্র জন্য। মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তই হইবে মুসলমানদের প্রতিটি কাজের মূল চালিকাশক্তি। একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশেই যেন প্রতিটি কাজ আঞ্জাম দেওয়া হয়, তজ্জন্য ইসলামী শরী'আতে বিশেষ তাকীদ ও গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: وَمَا أُمِرُوا إِلا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلوةَ وَيُؤْتُوا الزَّكُوةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ .
"তাহারা তো আদিষ্ট হইয়াছিল আল্লাহ্ আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হইয়া একনিষ্ঠভাবে তাঁহার ইবাদত করিতে এবং সালাত কায়েম করিতে ও যাকাত দিতে, ইহাই সঠিক দীন" (৯৮:৫)।
পক্ষান্তরে কেহ যদি লোক দেখানোর জন্য কোন আমল করে, এমনকি সালাত আদায় করে, তবে উহা তাহার জন্য দুর্ভোগ টানিয়া আনিবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ.
"সুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের যাহারা তাহাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যাহারা লোক দেখানোর জন্য উহা করে" (১০৭:৪-৫-৬)।
দান-সাদাকা বড়ই নেকীর কাজ। কিন্তু কেহ যদি লোক দেখানোর জন্য দান-সাদাকা করে তবে উহা বাতুলতায় পর্যবসিত হইবে। ইহাতে দানকারী কোনই ছওয়াব পাইবে না। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقْتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْآذِى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانِ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَفِرِينَ.
"হে মু'মিনগণ! তোমরা দানের কথা বলিয়া বেড়াইয়া এবং ক্লেশ দিয়া তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল করিও না যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করিয়া থাকে এবং যে আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে না। তাহার উপমা একটি মসৃণ পাথর যাহার উপর কিছু মাটি থাকে, অতঃপর তাহার উপর পতিত প্রবল বৃষ্টিপাত উহাকে পরিষ্কার করিয়া রাখিয়া দেয়। যাহা তাহারা উপার্জন করিয়াছে তাহার কিছুই তাহারা তাহাদের কাজে লাগাইতে পারিবে না। আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সৎ পথে পরিচালিত করেন না" (২ঃ ২৬৪)।
وَالَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَنْ يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا .
"এবং যাহারা মানুষকে দেখাইবার জন্য তাহাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে না আল্লাহ তাহাদেরকে ভালবাসেন না। আর শয়তান কাহারও সঙ্গী হইলে সেই সঙ্গী কত মন্দ" (৪: ৩৮)!
এমনিভাবে জিহাদ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও রিয়া পসন্দনীয় নহে। ইহার কারণে আমল অসার ও ফলশূন্য হইয়া যায়। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ خَرَجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بَطَرًا وَرِنَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَاللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ.
"তোমরা তাহাদের ন্যায় হইবে না যাহারা দম্ভভরে ও লোক দেখাইবার জন্য স্বীয় গৃহ হইতে বাহির হইয়াছিল এবং লোকদেরকে আল্লাহর পথ হইতে নিবৃত্ত করে। তাহারা যাহা করে আল্লাহ তাহা পরিবেষ্টন করিয়া রহিয়াছেন" (৮ঃ ৪৭)।
লোক দেখানোর উদ্দেশে কৃত কর্মের পরিণাম হইল জাহান্নাম। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
تعوذوا بالله من جب الحزن قالوا يا رسول الله وما جب الحزن قال واد في جهنم يتعوذ منه جهنم كل يوم اربع مأة مرة قيل يا رسول الله ومن يدخلها قال القراء المرامون باعمالهم .
"তোমরা জুববুল হুযন হইতে আল্লাহ্র নিকট পরিত্রাণ চাও। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! জুববুল হুযন কি? তিনি বলিলেন, ইহা জাহান্নামের একটি প্রান্তর যাহা হইতে জাহান্নাম দৈনিক চার শতবার নিরাপদ আশ্রয় চাহিয়া থাকে। সাহাবীগণ পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, উহাতে কাহারা প্রবেশ করিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহাতে ঐ সকলকারী প্রবেশ করিবে যাহারা দেখাইবার উদ্দেশে আমল (তথা আল-কুরআন তিলাওয়াত) করিয়াছে” (সুনান ইবন মাজা, পৃ. ২৩; মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ২৮)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত অপর এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কিয়ামতের দিন (রিয়াকারদের মধ্যে) প্রথমে যে ব্যক্তির বিচার হইবে সে হইবে একজন শহীদ। তাহাকে আল্লাহর দরবারে হাযির করা হইবে এবং আল্লাহ তাহাকে (দুনিয়াতে প্রদত্ত) আপন নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করাইয়া দিবেন। আর (তখন) তাহারও ঐ নিয়ামতরাজির কথা স্মরণ হইবে এবং মনে পড়িবে। অতঃপর তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, তুমি এই নিয়ামতের বিনিময়ে দুনিয়ায় কি কি কাজ করিয়াছ? সে বলিবে, আপনাকে (আল্লাহকে) সন্তুষ্ট করার জন্য আপনার প্রদর্শিত পথে আমি কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াছি, এমন কি শেষ পর্যন্ত আমি শহীদ হইয়াছি। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, তুমি মিথ্যা বলিয়াছ, বরং তুমি তো এইজন্য লড়াই করিয়াছিলে যে, তোমাকে বীরপুরুষ বলা হইবে। আর তোমাকে উহা বলাও হইয়াছে। অতঃপর তাহার সম্পর্কে (ফেরেস্তাদেরকে) আদেশ দেওয়া হইবে এবং তাহাকে অধঃমুখী করিয়া টানিতে টানিতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে।
তখন এমন এক ব্যক্তিরও বিচার করা হইবে যে বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছে এবং অপরকে উহা শিক্ষাও দিয়াছে এবং আল-কুরআনও পড়িয়াছে। তাহাকে মহান আল্লাহ্র সমীপে উপস্থিত করার পর প্রথমে আল্লাহ তা'আলা তাহাকে স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করাইয়া দিবেন এবং সেও উহা স্মরণ করিবে অর্থাৎ এইগুলির কথা তাহারও মনে পড়িবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, তুমি এই সকল নিয়ামতের বিনিময়ে কি কি কাজ করিয়াছ? সে জবাব দিবে, আমি ইল্ম শিখিয়াছি, অপরকে উহা শিক্ষা দিয়াছি এবং আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আল-কুরআন পড়িয়াছি। তখন আল্লাহ বলিবেন, তুমি মিথ্যা বলিয়াছ, বরং তুমি তো বিদ্যা শিখিয়াছ এইজন্য যাহাতে তোমাকে আলিম (বিদ্বান) বলা হইবে এবং এইজন্য আল-কুরআন পড়িয়াছ, যাহাতে তোমাকে কারী বলা হইবে। আর উহা তো বলাই হইয়াছে। অতঃপর (ফেরেস্তাদেরকে) তাহার সম্পর্কে আদেশ করা হইবে। সেই প্রেক্ষিতে তাহাকে উপুড় করিয়া টানিতে টানিতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে।
তখন এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হইবে যাহাকে আল্লাহ তা'আলা বহু প্রাচুর্য দান করিয়াছিলেন এবং তাহাকে সর্বপ্রকার ধন-দৌলত দিয়াছিলেন। তাহাকে মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হইবে। ইহার পর আল্লাহ তা'আলা তাহাকে স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করাইয়া দিবেন এবং তাহারও এইগুলির কথা স্মরণ হইবে অর্থাৎ এইগুলির কথা তাহার মনে পড়িবে। অতঃপর তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, তুমি এইসব নিয়ামতের বিনিময়ে কি কি কাজ করিয়াছ? সে বলিবে, এমন কোন রাস্তা অর্থাৎ ক্ষেত্র ছিল না যাহাতে দান করা আপনি পসন্দ করিতেন না। আমি আপনার অপসন্দনীয় ক্ষেত্রে দান করি নাই। এই জবাব শুনিয়া তিনি বলিবেন, তুমি মিথ্যা বলিয়াছ। বরং তুমি তো এইজন্য দান করিয়াছ যাহাতে তোমাকে বলা হয়, "সে বড় দানবীর।" আর তাহা তো বলাই হইয়াছে। ইহার পর তাহার সম্পর্কেও (ফেরেশতাদেরকে) আদেশ দেওয়া হইবে। সে মতে অধঃমুখী করিয়া তাহাকে টানিতে টানিতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে (সহীহ মুসলিম, সূত্র মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৩৩)।
সহীহ ইব্ন খুযায়মা গ্রন্থে আছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) উক্ত হাদীছটি বর্ণনার প্রাক্কালে তিনবার বেহুঁশ হইয়া গিয়াছিলেন। উক্ত বর্ণনায় অতিরিক্ত এই কথাও উল্লেখ রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছেন:
ইয়া আবা হুরায়রা ওলাইকাচ্ছালা ছাতু আউয়ালু খালক্বিল্লাহু তাস্ছারু বিহিমুন্নারু ইয়াওমাল ক্বিয়ামাহ।
"হে আবূ হুরায়রা! আল্লাহ্ সৃষ্টির মধ্যে এই তিন ব্যক্তিই হইল এমন, যাহাদের দ্বারা কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জাহান্নামের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হইবে" (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১খ., পৃ. ৬২-৬৩)।
মানুষকে দেখানো ও শুনানোর উদ্দেশে কেহ যদি ইবাদত ও সৎ কাজ করে তবে আল্লাহ তা'আলা-কিয়ামতের দিন তাহার এই অসৎ নিয়তের কথা সমস্ত মানুষকে জানাইয়া দিবেন। নবী করীম (স) বলেন:
মান সাম্মায়া সাম্মায়াল্লাহু বিহি ওয়ামান ইউরায়ী ইউরাইল্লাহু বিহি।
"কোন ব্যক্তি যদি ইবাদত বা সৎকাজ মানুষকে শুনানোর উদ্দেশে করিয়া থাকে, তবে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাহা অর্থাৎ তাহার অসৎ নিয়তের কথা লোকদেরকে শুনাইয়া দিবেন। আর কোন ব্যক্তি যদি ইবাদত বা সৎ কাজ লোক দেখানোর উদ্দেশে করিয়া থাকে তবে আল্লাহ তা'আলাও কিয়ামতের দিন তাহা লোকদের কাছে প্রকাশ করিয়া দিবেন” (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৬২)।
হযরত আদী ইব্ন হাতিম (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কিয়ামতের দিন কতিপয় মানুষের ব্যাপারে জান্নাতের আদেশ দেওয়া হইবে। অতঃপর যখন তাহারা জান্নাতের কাছাকাছি পৌঁছিয়া জান্নাতের মৃদুমন্দ বায়ুর ঘ্রাণ লইবে, জান্নাতের অট্টালিকাসমূহ দেখিবে এবং আল্লাহ তা'আলা তথায় জান্নাতী মানুষের জন্য যে নিয়ামতসমূহ তৈরি করিয়া রাখিয়াছেন তাহার প্রতি লক্ষ্য করিবে তখন আকস্মিকভাবে ঘোষণা করা হইবে, তাহাদেরকে ঐদিক হইতে ফিরাইয়া দাও। জান্নাতে তাহাদের কোন অংশ নাই। তখন তাহারা সেখান হইতে লাঞ্ছিত ও দুঃখিত হইয়া ফিরিয়া আসিবে। অতঃপর তাহারা বলিবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি জান্নাতে আপনার বন্ধুদের জন্য যে নিয়ামত এবং যে পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখিয়াছেন তাহা আমাদেরকে দেখাইবার পূর্বেই যদি আমাদেরকে জাহান্নামে দাখিল করিতেন, তবে উহা আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হইত। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, আমি তো ইচ্ছা করিয়াই এইরূপ করিয়াছি। কারণ নির্জন অবস্থায় তোমরা বড় বড় পাপকার্য সম্পাদন করিতে। আর লোকালয়ে থাকিতে অত্যন্ত বিনয়ী অর্থাৎ আল্লাহ্র ভয়ে প্রকম্পিত মানুষ হিসাবে। উদ্দেশে হইল মানুষকে দেখানো। এই অবস্থা তোমাদের মানসিক অবস্থার পরিপন্থী ছিল। তোমরা মানুষকে ভয় করিতে, কিন্তু আমাকে ভয় করিতে না। তোমরা মানুষকে বড় মনে করিতে, কিন্তু আমাকে-বড় মনে করিতে না। মানুষকে খুশী করার উদ্দেশে অনেক কিছু বর্জন করিতে, কিন্তু আমার জন্য কিছুই বর্জন করিতে না। পরকালের পুরস্কার হইতে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি, আজ আমি তোমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি আস্বাদন করাইব (তাবারানী, বায়হাকী, সূত্র আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১খ., পৃ. ৭২)।
মানুষ যখন লোক দেখানোর উদ্দেশে কোন কাজ করে তখন তাহার এই কাজে আল্লাহকে। রাযী-খুশী করার কোন মনোবৃত্তি থাকে না বরং তখন পার্থিব কোন স্বার্থই তাহার সামনে বিদ্যমান থাকে। এই কারণে রিয়াকে কুরআন ও হাদীছে শিরকে খফী (شرك خفى) ও শিরকে আসগার (شرك اصغر) অর্থাৎ ছোট শিরক বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে। ইমাম হাকেম (র) তৎসংকলিত আল-মুস্তাদরাক গ্রন্থে হযরত ইব্ন আব্বাস (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, জনৈক মুসলমান আল্লাহর পথে জিহাদ করিত এবং মনে মনে কামনা করিত যেন জনসমাজে তাহার শৌর্য-বীর্য প্রকাশিত হয়। তাহার সম্পর্কেই নাযিল হইয়াছে:
فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَداً . "সুতরাং যে তাহার প্রতিপালকের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎ কর্ম করে এবং তাহার প্রতিপালকের ইবাদতে কাহাকেও শরীক না করে" (১৮: ১১০)।
ইব্ন আবী হাতিম ও ইব্ন আবিদ-দুয়া (র) কিতাবুল ইখলাসে তাউস (র) হইতে বর্ণনা করেন, জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বলিলেন, আমি মাঝে মধ্যে যখন কোন সৎ কর্ম সম্পাদনের অথবা ইবাদতের উদ্যোগ গ্রহণ করি তখন আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিই থাকে আমার উদ্দেশ্য, কিন্তু সাথে সাথে এই কামনাও মনে জাগে যে, লোকেরা আমার কাজটি দেখুক। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) চুপ করিয়া রহিলেন। অবশেষে উল্লিখিত আয়াত নাযিল হয়। আবূ নু'আয়ম (র) তারীখে আসাকির গ্রন্থে হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত জুনদুব ইব্ন সুহায়ব (রা) যখন নামায পড়িতেন, রোযা রাখিতেন অথবা দান-খয়রাত করিতেন এবং এইসব আমলের কারণে লোকদেরকে তাহার প্রশংসা করিতে দেখিতেন তখন মনে মনে আনন্দিত হইতেন। ফলে আমল আরও বাড়াইয়া দিতেন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হইয়াছে। উক্ত রিওয়ায়াতসমূহের সারমর্ম হইল, উপরিউক্ত আয়াতে রিয়াকারী ব্যক্তিদেরকে গোপন শিরক হইতে নিবৃত্ত থাকার উপদেশ প্রদান করা হইয়াছে (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত, পৃ. ৮২৯)।
হযরত আলী (রা) বলিয়াছেন, ব্যয় কর কিন্তু খ্যাতি অর্জনের চেষ্টা করিও না। নিজের ব্যক্তিত্বকে এই উদ্দেশে উঁচু করিও না যে, মানুষ তোমার মহিমা কীর্তন করিবে, তোমাকে জানিবে ও চিনিবে, বরং নাখোশ থাক, লুকাইয়া থাক, তবেই নিরাপদ থাকিবে।
ইবরাহীম ইবন আদহাম (র) বলেন, যে ব্যক্তি সুখ্যাতি ভালবাসিয়াছে, সে যেন আল্লাহকে বিশ্বাস করে নাই। হযরত তালহা (রা) একদল লোককে তাঁহার পিছনে হাঁটিতে দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন, এইগুলি মধু পোকা আর পতঙ্গের ঝাঁক। সুলায়মান ইবন হানযালা (রা) বর্ণনা করেন, একদা আমরা উবায়্যি ইন্ন কা'ব (রা)-এর পিছনে পিছনে যাইতেছিলাম। হযরত উমার (রা) এতদ্দর্শনে ক্ষিপ্ত হইয়া চাবুক উত্তোলন করিলেন। ইহা দেখিয়া উবায়িয় ইন্ন কা'ব (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি ইহা কি করিতেছেন? হযরত উমার (রা) বলিলেন, ইহা অনুসরণকারীর জন্য অবমাননাকর এবং অগ্রগামী ব্যক্তির জন্য আশংকাজনক। হযরত হাসান (রা) হইতে বর্ণিত আছে, একবার হযরত ইবন মাস'উদ (রা) নিজ গৃহ হইতে বাহির হইলেন, তখন বহু লোক তাঁহার সঙ্গী হইয়া চলিল। তিনি তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা আমার পিছনে পিছনে কেন আসিতেছ? যদি তোমরা ইহা জানিতে যে, আমার অভ্যন্তরীণ অবস্থা কি, তবে তোমাদের কেহই এইভাবে আমার পিছনে পিছনে আসিতে না। হাসান (রা) বলেন, পশ্চাদানুসরণকারীদের জুতার শব্দ এমনি বস্তু যাহার প্রতিক্রিয়া হইতে সম্ভবত কেহই রেহাই পাইতে পারে না (আল-মুরশিদুল আমীন, পৃ. ২৮০-২৮১)।
রিয়া যে শিরকে খফী এই কথাটি বহু হাদীছে বিবৃত হইয়াছে। হযরত যায়দ ইব্ন আসলাম (র) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন, একদা হযরত উমার (রা) নিজ গৃহ হইতে মসজিদের উদ্দেশে বাহির হইলেন। অতঃপর দেখিলেন, হযরত মু'আয (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর কবরের পার্শ্বে বসিয়া কাঁদিতেছেন। হযরত উমার (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কাঁদিতেছ কেন? তিনি বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, সামান্যতম রিয়াও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহর কোন বন্ধুর সহিত শত্রুতা পোষণ করিল সে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিল। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ঐ সমস্ত লুক্কায়িত মুত্তাকী পুণ্যবান লোকদেরকে অধিকতর ভালবাসেন, অনুপস্থিত থাকিলে তাঁহাদের কেহ সন্ধান করে না এবং উপস্থিত থাকিলে কেহ তাঁহাদেরকে চিনে না, অথচ তাঁহাদের অন্তর হিদায়াতের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাঁহারা সর্বপ্রকার কলুষতা, যুলুম ও অবিচার হইতে মুক্ত (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১খ., পৃ. ৬৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
ان اخوف ما اخاف عليكم الشرك الأصغر قالوا وما الشرك الأصغر يا رسول الله قال الرياء يقول الله عز وجل اذا جزى الناس باعمالهم اذهبوا الى الذين كنتم تراءون في الدنيا فانظروا هل تجدون عندهم جزاء .
“সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর বস্তু, যাহা হইতে আমি তোমাদের ব্যাপারে ভয় করি তাহা হইতেছে শিরকে আসগার (ক্ষুদ্র শিরক)। লোকজন জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! শিরকে আসগার কোন্টি? তিনি বলিলেন, রিয়া। অতঃপর নবী করীম (স) বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন যখন বান্দাদের আমলের প্রতিদান দিবেন তখন এক শ্রেণীর আমলকারীকে বলিবেন, দুনিয়াতে যাহাদেরকে দেখাইতে অর্থাৎ দেখাইবার জন্য আমল করিতে তাহাদের নিকট যাও। দেখ, তাহাদের নিকট কোন প্রতিদান পাও কি না" (আত-তারগীব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৯)।
ان أخوف ما اتخوف على امتى الاشراك بالله اما انى لست اقول يعبدون شمسا ولا قمرا ولا وثنا ولكن اعمالا لغير الله وشهوة خفية .
“সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর বস্তু, যাহা হইতে আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে ভয় করি তাহা হইতেছে আল্লাহ্ সহিত শিরক করা। আমি এই কথা বলি না যে, তাহারা চন্দ্র, সূর্য ও প্রতিমা পূজা করিবে, বরং তাহারা গায়রুল্লাহ্ জন্য আমল করিবে এবং সূক্ষ্ম আকাঙ্ক্ষায় আক্রান্ত থাকিবে" (সুনান ইবন মাজা, পৃ. ৩২০)।
গায়রুল্লাহ্র উদ্দেশে কৃত ও সম্পাদিত আমলের সহিত আল্লাহ্র কোন সম্পর্ক নাই। হাদীছে কুদ্সীতে আছে, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
انا اغنى الشركاء عن الشرك فمن عمل لى عملا اشرك فيه غيري فانا منه برىء وهو الذي اشرك .
"আমি শরীকদের শিরক হইতে অতি ঊর্ধ্বে। কেহ যদি আমার উদ্দেশে কোন নেক কাজ করে এবং ইহাতে আমি ব্যতীত অন্য কাহাকেও শরীক করে তবে ইহার সহিত আমার কোন সম্পর্ক নাই অর্থাৎ শিরককারী ব্যক্তির সহিত আমার কোন সম্পর্ক নাই” (সুনান ইবন মাজা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২০)।
রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলেন:
اذا جمع الله الاولين والآخرين يوم القيامة ليوم لا ريب فيه نادى مناد من كان شرك في عمل عمله لله فليطلب ثوابه من عند غير الله فان الله اغنى الشركاء عن الشرك .
"যখন আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে কিয়ামতের দিন একত্র করিবেন, যেই দিনের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই, তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করিবেন, যেই ব্যক্তি নিজের সেই আমলের সহিত যাহা আল্লাহর জন্য করিয়াছে, অন্য কাহাকেও শরীক করিয়া লইয়াছে, সে যেন উহার ছওয়াব ঐ গায়রুল্লাহর কাছেই দাবি করে। কেননা আল্লাহ তা'আলা শরীকদের শিরক হইতে মুক্ত” (সুনান ইবন মাজা, পৃ. ৩২০)।
রিয়ার বিষয়টি মসীহ দাজ্জাল হইতেও ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, একদা আমরা মসীহ দাজ্জালের কথা আলোচনা করিতেছিলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের মাঝে আগমন করিলেন এবং বলিলেন, আমার মতে তোমাদের জন্য যেই বিষয়টি মসীহ দাজ্জাল হইতেও অধিক ভীতিপ্রদ ও ভয়ংকর, আমি কি তোমাদেরকে সেই বিষয়ে অবহিত করিব না? রাবী বলেন, আমরা বলিলাম, হাঁ, অবশ্যই অবগত করাইবেন। তখন তিনি বলিলেন, তাহা হইল শিরকে খফী (شرك خفى) তথা সূক্ষ্ম শিরক অর্থাৎ মানুষ সালাত আদায়ের উদ্দেশে দাঁড়ায় এবং সুন্দরভাবে সালাত আদায় করে, আবার দেখিতে থাকে যে, অন্য লোকজন তাহাকে দেখিতেছে বা তাহার দিকে তাকাইতেছে কি না (সুনান ইবন মাজা, পৃ. ৩২০)।
হযরত মু'আয (রা) হইতে বর্ণিত। একদা এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) হইতে আপনি সরাসরি যে হাদীছটি শ্রবণ করিয়াছেন তাহা আমার নিকট বর্ণনা করুন। এই কথা শুনিয়া হযরত মু'আয (রা) এত বেশী কাঁদিলেন যে, আমার মনে হইতেছিল, তিনি হয়ত আর শান্ত হইবেন না। দীর্ঘক্ষণ পর তিনি শান্ত হইয়া বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছেন, হে মু'আয! জবাবে আমি বলিলাম, لبيك (উপস্থিত আছি), আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীকৃত হউক! অতঃপর তিনি বলিলেন, আমি তোমাকে একটি হাদীছ শুনাইতেছি, যদি তুমি উহা স্মরণ রাখ, তবে ইহাতে তোমার ফায়দা হইবে। আর যদি তুমি তাহা ভুলিয়া যাও, মুখস্থ না কর, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে তোমার দলীল পেশ করার সুযোগ বন্ধ হইয়া যাইবে।
হে মু'আয! আল্লাহ তা'আলা আসমান যমীন সৃজন করার পূর্বে সাতজন ফেরেস্তা সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহার পর আসমান-যমীন সৃষ্টি করিয়াছেন, অতঃপর তাঁহাদের এক একজনকে এক এক আসমানের দারোয়ান নিয়োগ করিয়াছেন। তিনি তাঁহাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করিয়াছেন। অতঃপর রক্ষী ফিরিস্তাগণ যখন বান্দার সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃত সকল আসল লইয়া ঊর্ধ্বাকাশে গমন করিতে থাকেন তখন ঐ আমলের অবস্থা সূর্যের আলোর ন্যায় দেদীপ্যমান হইয়া থাকে। ঐ আমল লইয়া রক্ষী ফেরেস্তাগণ প্রথম আসমানের কাছাকাছি আরোহণ করার পর তাঁহারা উহা সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং উহাকে বহু গুণে বৃদ্ধি করিয়া প্রথম আকাশে পাঠাইয়া দেন। তখন দ্বাররক্ষী ফেরেস্তা আমলকারীর আমল প্রসঙ্গে বলেন, যাও, এই আমল আমলকারীর মুখে ছুঁড়িয়া মার। আমি গীবতের তত্ত্বাবধায়ক। আমার প্রতিপালক আমাকে হুকুম দিয়াছেন যেন মানুষের গীবতকারী ব্যক্তির আমলকে আমার সম্মুখ দিয়া অতিক্রম করিয়া যাইতে না দেই।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, অতঃপর রক্ষী ফেরেশতা ঐ বান্দার অন্য কোন নেক আমল লইয়া আসিয়া তাহাসহ সামনের দিকে আগাইতে থাকেন। ইহার পর ফেরেশতা উহাকে পরিশুদ্ধ করত বাড়াইতে থাকেন। এমনিভাবে দ্বিতীয় আসমানের দরজায় গিয়া পৌছেন। তখন দ্বিতীয় আসমানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেস্তা রক্ষী ফেরস্তাগণকে বলেন, দাঁড়াও এবং এই আমলকে আমলকারীর মুখে ছুঁড়িয়া মার। উক্ত ব্যক্তি এই আমলের মাধ্যমে পার্থিব সামগ্রী হাসিল করার ইচ্ছা করিয়াছিল। আমার প্রতিপালক আমাকে হুকুম করিয়াছেন, আমি যেন তাহার আমলকে অতিক্রম করিয়া যাওয়ার সুযোগ না দেই। সে মানুষের মাহফিলে বসিয়া মানুষের সহিত অহংকার করিত।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, অতঃপর রক্ষী ফেরেশতাগণ ঐ বান্দার অন্য কতকগুলি আমল লইয়া ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করিতে থাকেন। তখন তাহার প্রদত্ত সদাকা ও আদায়কৃত সালাত ও সাওম হইতে নূর বিচ্ছুরিত হইতে থাকিবে। ইহাতে রক্ষী ফেরেশতাগণ বিস্ময়াভিভূত হইবেন। অতঃপর রক্ষী ফেরেস্তাগণ উক্ত আমল লইয়া তৃতীয় আসমানের দরজা পর্যন্ত পৌঁছেন। তখন তৃতীয় আসমানের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তা বলেন, দাঁড়াও, এই আমলকে আমলকারীর মুখে ছুঁড়িয়া মার। আমি অহংকারের তত্ত্বাবধায়ক। আমার প্রতিপালকের নির্দেশ, আমি যেন তাহার এই আমলকে তদূর্ধ্বে যাইতে না দেই। এই ব্যক্তি মানুষের মজলিসে বসিয়া অহংকার ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করিত।
নবী করীম (স) বলেন, অতঃপর রক্ষী ফেরেশতা ঐ বান্দার এমন আমল যাহা উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় ঝলমল করিতেছে এবং মধু মক্ষিকার গুঞ্জনের ন্যায় তাহার তাসবীহ, সালাত, হজ্জ ও উমরা আওয়াজ করিতেছে, উহা লইয়া চতুর্থ আসমানের দরজায় গিয়া হাযির হন। সেখানকার প্রহরী ফেরেশতা তাঁহাদেরকে ডাক দিয়া বলেন, দাঁড়াও, এই আমলকে আমলকারীর মুখে, পেটে ও পিঠে ছুঁড়িয়া মার। আমি অহংকারের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেস্তা। আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের নির্দেশ: আমি যেন তাহার আমলকে আগে অগ্রসর হইতে না দেই। এই ব্যক্তি যখন আমল করিত তখন তাহার মধ্যে অহংকার বিরাজ করিত।
নবী করীম (স) বলেন, এইভাবে রক্ষী ফেরেশতা ঐ বান্দার অন্য কোন আমল লইয়া ঊর্ধ্বাকাশের দিকে আরোহণ করেন এবং তাহা লইয়া পঞ্চমাকাশের দরজায় গিয়া পৌঁছেন। আমল এত সুসজ্জিত যেন নব দম্পতির সুষমামণ্ডিত সুসজ্জিত মুখাবয়ব। তখন উক্ত আসমানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেস্তা তাঁহাদেরকে বলেন, তোমরা দাঁড়াও এবং এই আমলকে আমলকারীর মুখের উপর ছুঁড়িয়া মার এবং উহাকে তাহার কাঁধের উপর তুলিয়া দাও। আমি হিংসা-বিদ্বেষের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেস্তা। সে মানুষের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করিত, হিংসা-বিদ্বেষ করিত ঐ সমস্ত মানুষের প্রতি যাহারা তাহার সমপর্যায়ের বিদ্যা ও আমলের অধিকারী ছিল। এমনিভাবে সে ঐ মানুষের প্রতিও হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করিত, যে কোন না কোন ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিল। আমার প্রতিপালক আমাকে আদেশ করিয়াছেন যাহাতে আমি তাহার আমলকে ঊর্ধ্বকাশে যাইবার সুযোগ না দেই।
নবী করীম (স) বলেন, অতঃপর রক্ষী ফেরেস্তা বান্দার সালাত, যাকাত, হজ্জ, উমরা এবং সাওমসহ ৬ষ্ঠ আকাশের দিকে গমন করিতে থাকেন এবং ৬ষ্ঠ আকাশে গিয়া পৌঁছেন। তখন তথাকার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা বলেন, থাম, এই আমল উক্ত আমলকারীর মুখে ছুঁড়িয়া মার। এই ব্যক্তি আল্লাহর কোন বিপদগ্রস্ত বান্দার প্রতি কোনরূপ দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করে নাই, বরং তাহার প্রতি বিদ্রূপ করিয়াছে, হাসি-কৌতুক করিয়াছে। আমি রহমতের ফেরেস্তা। আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, আমি যেন তাহার আমলকে আমাকে অতিক্রম করিয়া সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ না দেই।
নবী করীম (স) বলেন, অতঃপর রক্ষী ফেরেস্তা ঐ বান্দার সালাত, সাওম, দান-সদাকা, ইজতিহাদ, পরহেযগারী ইত্যাদি আমল লইয়া সপ্তম আসমানের দিকে আরোহণ করেন। ঐ আমলের মধ্যে সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বলতা এবং মেঘের গর্জনের ন্যায় আওয়াজ থাকিবে। আর ঐ আমলের সহিত তিন হাজার ফেরেস্তা সহযাত্রী হইয়া থাকেন। তাঁহারা ঐ আমল লইয়া সপ্তম আকাশের দ্বারপ্রান্তে গিয়া পৌঁছেন। অমনি সপ্তম আকাশের দ্বাররক্ষী ফেরেশতা তাঁহাদেরকে বলেন, তোমরা দাঁড়াও এবং এই আমলকে আলমকারীর মুখের উপর ছুঁড়িয়া মার এবং তাহার সর্বাঙ্গে উহা দ্বারা আঘাত কর। আর এই আমল দ্বারাই তাহার হৃদয়ে তালা লাগাইয়া দাও। যে আমল আমার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির উদ্দেশে করা হয় নাই তাহা আমি আমার প্রতিপালকের নিকট পৌছিতে দিব না। সে তো মহান আল্লাহ্ উদ্দেশে আমল করে নাই। সে আমল করিয়াছে ফকীহদের নিকট তাহার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, আলিমদের নিকট তাহার যশখ্যাতি ছড়াইয়া পড়ার জন্য এবং শহরে শহরে তাহার আমলের সুনাম অর্জনের জন্য। তাহার আমল যেন ঊর্ধ্ব জগতের দিকে যাইতে না পারে সেইজন্য আমাকে আদেশ দেওয়া হইয়াছে। যে আমল একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহ্র জন্য সম্পাদন করা হয় নাই তাহাই রিয়া। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশে আমল করে আল্লাহ তা'আলা তাহার সেই আমল কবুল করেন না।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, অতঃপর রক্ষী ফেরেস্তা এই বান্দার সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, উমরা, সচ্চরিত্র, যিকির ইত্যাদি আমল লইয়া ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ করেন। আর আসমানের ফেরেস্তাগণ সকলেই ঐ আমলকে বিদায় সম্ভাষণ জানান। অবশেষে ফেরেস্তাগণ ঐ সকল আমল লইয়া একে একে সকল পর্দা ভেদ করিয়া মহান আল্লাহ্র দরবারে গিয়া হাযির হন। অতঃপর তাহারা ঐ বান্দার পক্ষে এই মর্মে সাক্ষ্য দেন যে, এই নেক আমলসমূহ একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর জন্যই সম্পাদন করা হইয়াছে। নবী করীম (স) বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ ফেরেশতাদেরকে বলেন, তোমরা আমার বান্দার আমলের রক্ষণাবেক্ষণকারী। আর আমি তাহার নিজের সত্তার রক্ষণাবেক্ষণকারী। সে আমার সন্তুষ্টির নিমিত্ত এইসব আমল করে নাই। সে তো গায়রুল্লাহ্র উদ্দেশে এইসব আমল করিয়াছে। কাজেই তাহার উপর আমার লা'নত বর্ষিত হউক! তখন ফেরেস্তাগণ সকলে সমস্বরে বলিয়া উঠেন, তাহার উপর আপনার লা'নত এবং আমাদেরও লা'নত। এতশ্রবণে পর সপ্ত আকাশ সমস্বরে ঘোষণা করে, তাহার উপর আল্লাহর লা'নত, আমাদের লা'নত এবং সপ্ত আকাশ ও উহাতে যাহা কিছু আছে সকলের লা'নত!
মু'আয (রা) বলেন, অতঃপর আমি বলিলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি তো আল্লাহ্র রাসূল আর আমি মু'আয (আমাদের নাজাতের উপায় কী?)। জবাবে তিনি বলিলেন, আমার আনুগত্য করিবে। হে মু'আয! যদি তোমার আমলে কোন ত্রুটি থাকে তবে জিহ্বার হিফাযত করিবে। জিহ্বা আল-কুরআনের ধারক-বাহক, উহা যেন তোমার কোন ভাইকে কষ্ট না দেয়। তোমার পাপের বোঝা তুমি নিজেই বহন করিবে, অন্যের উপর ফেলিতে চেষ্টা করিও না। অন্যকে দোষারোপ করিয়া নিজেকে নিষ্পাপ প্রকাশ করিও না। অন্যের উপর নিজেকে প্রাধান্য দিও না। আখিরাতের আমলের সহিত দুনিয়ার আমলকে মিশ্রিত করিও না। নিজের মজলিসে এইরূপ আত্মগর্ব করিও না, যাহা দ্বারা মানুষ তোমার সাহচর্যকে ভীতিকর মনে করিতে থাকে। কোন তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিতে দুইজনে কানে কানে কথা বলিও না। মানুষের সহিত ছলচাতুরী করিয়া বড় হওয়ার চেষ্টা করিও না। মানুষের সহিত মন কষাকষি করিও না। যদি এইরূপ কর তবে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের কুকুর তোমাকেও ধাওয়া করিবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطًا "এবং যাহারা মৃদুভাবে বন্ধনমুক্ত করিয়া দেয়”। বলিতে পার, ইহার তাৎপর্য কী, হে মু'আয! আমি বলিলাম, আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান হউক! ইহা কি? জবাবে তিনি বলিলেন, ইহা জাহান্নামের কুকুর যাহারা গোশত ও হাড্ডি সবই চিবাইয়া খায়। অতঃপর আমি বলিলাম, আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত হউক, কে আছে এমন যে এই গুণাবলীর অধিকারী হইবে এবং এই ভয়াবহ আযাব হইতে নাজাত পাইবে? উত্তরে নবী করীম (স) বলিলেন, হে মু'আয! ইহা অত্যন্ত সহজ, যাহার জন্য মহান আল্লাহ সহজ করিয়া দেন। বর্ণনাকারী বলেন, মু'আয (রা)-এর ন্যায় কুরআন মজীদ অধিক তিলাওয়াতকারী আমি আর কাহাকেও দেখি নাই। কেননা তিনি উক্ত হাদীছে বর্ণিত নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর কার্যকলাপ হইতে বাঁচিয়া থাকার চেষ্টা করিতেন (আত-তারগীব ওয়াত- তারহীব, ১ খ., পৃ. ৭৩-৭৬)।
ইমাম গাযালী (র) বলেন, “রিয়া হইতে বাঁচিবার উপায় হইল, সম্মান, প্রতিপত্তি, মাল, দৌলত, প্রশংসা ও যশ-খ্যাতির পরিণতি সম্পর্কে সর্বদা চিন্তা করা এবং বারংবার এই কথার প্রতি লক্ষ্য করা যে কোন অবস্থাতেই মহান আল্লাহ তাহার মনের অবস্থার খবর রাখিতেছেন। মনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কল্পনা সম্পর্কেও তিনি অবগত। তৎসঙ্গে এই কথাও চিন্তা করিবে যে, এই রিয়ার পরিণামে কিছুই পাওয়া যাইবে না। এইভাবে রিয়ার অপকারিতা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করিতে থাকিলে পর্যায়ক্রমে তাহা অন্তর হইতে বিদূরীত হইয়া যাইবে (আল মুরশিদুল আমীন, পৃ. ২৮৫-২৯৬)।
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন : يَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا هَذَا الشِّرْكَ فَانَهُ أَخْفَى مِنْ دَبِيبِ النَّمْلِ فَقَالَ لَهُ مَنْ شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَقُولُ وَكَيْفَ نَتَّقِيهِ وَهُوَ أَخْفَى مِنْ دَبِيبِ النَّمْلِ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ قُولُوا اللَّهُمَّ أَنَا نَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ نُشْرِكَ بِكَ شَيئًا نَعْلَمُهُ وَنَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا نَعْلَمُهُ.
“হে লোক সকল! তোমরা এই শিরককে ভয় করিবে। কেননা তাহা ক্ষুদ্র পিঁপড়ার পদধ্বনি হইতেও নিঃশব্দে মানুষের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া থাকে। অতঃপর উপস্থিত লোকদের মধ্য হইতে একজন বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! ইহা তো ক্ষুদ্রাকৃতির পিপীলকার নিঃশব্দ গতি হইতেও বেশী সন্তর্পণে মানুষের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া থাকে। এমতাবস্থায় কেমন করিয়া আমরা ইহা হইতে বাঁচিয়া থাকিব? তিনি বলিলেন, তোমরা বলিবে : হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি জানিয়া-বুঝিয়া কোন কিছুতে আপনার সহিত শরীক করা হইতে এবং আমরা আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি এমন শিরক করা হইতে যাহাতে আমি না জানিয়া লিপ্ত হইয়াছি” (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১খ.; পৃ. ৭৬)।
📄 কুধারণা পোষণ হইতে বিরত থাকা
আখলাকে সায়্যিআর (কুচরিত্র) মধ্যে মারাত্মক ধরনের বদ অভ্যাস হইল অন্যের প্রতি কুধারণা পোষণ করা। অন্যের প্রতি অহেতুক কুধারণা পোষণ করা হারাম। ইমাম আবূ বকর আল-জাসসাস (র) আহকামুল কুরআন গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন, ধারণা চার প্রকার। এক প্রকার হারাম, দ্বিতীয় প্রকার ওয়াজিব, তৃতীয় প্রকার মুস্তাহাব এবং চতুর্থ প্রকার জায়েয। হারাম ধারণা এই যে, আল্লাহর প্রতি এমন কুধারণা রাখা যে, তিনি আমাকে শাস্তি দিবেনই অথবা আমাকে বিপদে ফেলিবেনই। মূলত এইরূপ ধারণা আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত হইতে নিরাশ হওয়ার নামান্তর। হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
لا يموتن احدكم الا وهو يحسن الظن بالله
“তোমাদের কাহারও আল্লাহ্র প্রতি সুধারণা পোষণ ব্যতীত মৃত্যুবরণ উচিত নহে।”
অন্য এক হাদীছে আছে : انا عند ظن عبدی بی "আমি আমার বান্দার সহিত তেমনি ব্যবহার করি যেমন সে আমার সম্বন্ধে ধারণা রাখে।"
উক্ত আলোচনা হইতে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করা ফরয এবং কুধারণা পোষণ করা হারাম। এমনিভাবে যেসব মুসলমান বাহ্যিক দৃষ্টিতে সৎ কর্মপরায়ণ তাহাদের প্রতি কোন প্রমাণ ছাড়া কুধারণা পোষণ করাও হারাম (মা'আরিফুল কুরআন, পৃ. ১২৮৩)। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ ، إِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ.
"হে মু'মিনগণ! তোমরা কুধারণার আধিক্য হইতে দূরে থাকিবে; কারণ অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ। তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করিও না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করিও না। তোমাদের মধ্যে কি কেহ তাহার মৃত ত্রাতার গোশত খাইতে চাহিবে? বস্তুত তোমরা তো ইহাকে ঘৃণার্হ মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু” (৪৯ : ১২)।
لوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هُذَا أَفْكَ مُّبِينٌ.
"যখন তাহারা ইহা শুনিল তখন মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারিগণ আপন লোকদের সম্পর্কে কেন ভাল ধারণা করিল না এবং বলিল না, ইহা তো সুস্পষ্ট অপবাদ" (২৪: ১২)?
অন্যের প্রতি কুধারণা পোষণ করা মূলত বড় ধরনের মিথ্যা প্রবণতা। তাই নবী করীম (স) এহেন মিথ্যা বদ অভ্যাস হইতে দূরে থাকার জন্য জোর তাকীদ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
اياكم والظن فان الظن اكذب الحديث ولا تحسسوا ولا تجسسوا ولا تناجشوا ولا تحاسدوا ولا تباغضوا ولا تدابروا وكونوا عباد الله اخوانا .
"তোমরা কুধারণা করা হইতে বাঁচিয়া থাকিবে কারণ কুধারণা মারাত্মক ধরনের মিথ্যা। আর তোমরা কাহারও দোষ অনুসন্ধান করিও না, গোয়েন্দাগিরি করিও না, একে অন্যকে ধোঁকা দিও না, পরস্পর হিংসা করিও না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিও না এবং পরস্পর বিরুদ্ধাচরণ করিও না, বরং সকল আল্লাহ্র বান্দা ভাই ভাই হইয়া থাকিও” (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৯২)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, اياكم والظن فان الظن اكذب الحديث "তোমরা কুধারণা পোষণ করা হইতে দূরে থাকিবে। কারণ কুধারণা জঘন্য ধরনের মিথ্যা" (জামে' তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১৯)।
হযরত আবদুল্লাহ (রা) বলেন, যে ব্যক্তির মাল চুরি হইয়া যায় সে অন্যের প্রতি কুধারণা পোষণ করিতে থাকে। এমনিভাবে কুধারণা পোষণ করিতে করিতে তাহার অপরাধের পরিমাণ চোরের চাইতেও গুরুতর হইয়া যায় (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৩০)। বিলাল ইবন সা'দ আশ'আরী (র) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার হযরত মু'আবিয়া (রা) আবূ দারদা (রা)-এর নিকট এই মর্মে পত্র দিলেন, যে, দামিশক শহরে যেসব দুষ্কৃতিকারী আছে তাহাদের তালিকা প্রস্তুত করিয়া আপনি তাহা আমার নিকট প্রেরণ করুন। জবাবে তিনি বলিলেন, দামিশকের দুষ্কৃতিকারীদের সহিত আমার কি সম্পর্ক আছে। আমি তাহাদেরকে কেমন করিয়া চিনিব? তখন তাহার পুত্র বিলাল (র) বলিলেন, আমি তাহাদের তালিকা লিখিয়া দিব। অতঃপর তিনি তাহা লিখিলেন। ইহা দেখিয়া আবূ দারদা (রা) তাহাকে বলিলেন, তুমি তাহাদের একজন না হইলে কেমন করিয়া তুমি এই কথা জানিবে এবং বুঝিবে যে, তাহারা দুষ্কৃতিকারী। অতএব, প্রথমে তুমি তোমার নিজের নাম লিখিয়া পাঠাও, তাহাদের নাম পাঠাইও না (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৩০)।
যদি কোন ব্যক্তি হইতে এমন কোন কাজ হইয়া যায় অথবা যদি কোন ব্যক্তি এমন অবস্থায় নিপতিত হয়, যাহার ফলে অন্য কাহারও কুধারণা পোষণ করার সুযোগ সৃষ্টি হইয়া যায়, তবে তাহার উচিত ঐ কুধারণা দূরীভূত করার লক্ষ্যে নিজের পক্ষ হইতে ইহার যথার্থ কারণ জানাইয়া দেওয়া। হাদীছে আছে, নবী-পত্নী হযরত সাফিয়্যা (রা) বলেন, (রমযানের শেষ দশকে) নবী করীম (স) মসজিদে ই'তিকাফরত ছিলেন। তাঁহার সহিত সাক্ষাত করার জন্য এক রাত্রিতে আমি তাঁহার নিকট আসিলাম এবং তাঁহার সহিত আলাপ-আলোচনা করিলাম, অতঃপর আমি বাড়িতে ফিরিয়া আসার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইলাম। নবী করীম (স)-ও আমাকে বিদায় দেওয়ার জন্য দাঁড়াইলেন। তখন আমার আবাস ছিল উসামা ইন্ন যায়দের বাড়িতে। এহেন অবস্থায় দুইজন আনসারী সাহাবী সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহারা নবী করীম (স)-কে (এক মহিলার সহিত) দেখিয়া দ্রুত অন্যদিকে সরিয়া যাইতে লাগিলেন। নবী করীম (স) এই অবস্থা দেখিয়া তাঁহাদের ডাক দিলেন, থাম, আমার সঙ্গের এই মহিলা হইল আমার স্ত্রী সফিয়্যা। তখন তাঁহারা বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমাদের মধ্যে কাহারও প্রতি কুধারণা পোষণ করার প্রবণতা থাকিত তাহা হইলেও আমরা আপনার প্রতি কুধারণা পোষণ করিতাম না। তাঁহাদের কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, নিশ্চয় শয়তান মানুষের অভ্যন্তরে রক্ত সঞ্চালন ক্রিয়ার মতই চলাচল করিয়া থাকে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২১৬; সীরাতুন নবী, ৬খ., পৃ. ৩১৪-৩১৫)।
📄 মু'জিযা কি ও কেন?
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।