📄 ইবলীসের প্রপৌত্রের আগমন
ইবলীসের প্রপৌত্রের আগমন
হাফিয বায়হাকী তদীয় 'দালাইلُن নবৃওয়া' গ্রন্থে "ইবলীসের প্রপৌত্র হামা ইবনুল হায়ছام ইبّ লাকীس ইبّن ইবলীসের নবী দরবারে আগমন ও ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গ” শিরোনামে একটি আশ্চর্যজনক ও বিরল ঘটনার বিবরণ দিয়াছেন। তাঁহার অনুকরণে ইবّن কাছীর (র)-ও তদীয় আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া এবং আস্-সীরাহ আন-নাবابিয়্যা উভয় গ্রন্থে এই ঘটনাটি উদ্ধৃত করিয়াছেন। ঘটনাটি নিম্নরূপ:
আবুল হাসান মুহাম্মাদ ইবনুল হুসায়ন ইبّن দাউد আলভী (র) আবূ নাসর মুহাম্মাদ ইبّন হামদুয়েح ইبّن সাহل আল-কারী আল-মারূযী- আবদুল্লাহ্ ইبّن হাম্মাদ আমেলী মুহাম্মদ ইبّন আবু মা'শার আবূ মা'মার নাফি' সূত্রে ইبّن উমার (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, হযরত উমার (রা) বলিয়াছেন, "একদা আমরা তিহামায় কোন এক পাহাড়ে নবী কারীম -এর সহিত উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় একটি লাঠি হস্তে জনৈক বৃদ্ধ আসিয়া নবী কারীম -কে সালাম দিল। তিনি তাহাকে সালামের জবাব দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন:
خغمة جن وغمغمتهم من انت ؟
"ইহা তো জিন্নদের গুনগুনানী! তুমি কে হে?"
"জবাবে সে তাহার পরিচয় ব্যক্ত করিল এইভাবে, আমি হইতেছি হামা ইবনুল হায়ছام ইন্ন লাকীس ইबّن ইবলীس। নবী কারীম বলিলেনঃ তাহা হইলে তো তোমার ও ইবলীসের মধ্যে
৪৮২ মাত্র দুই পুরুষের ব্যবধান (তুমি তাহার প্রপৌত্র) তোমার বয়স কত? জবাবে সে বলিল, দুনিয়া আমার আয়ু শেষ করিয়া দিয়াছে। কাবীل যখন হাবীলকে হত্যা করে তখন আমি কয়েক বৎসরের বালক মাত্র। একটু বুঝ হইয়াছে, টিলায় টিলায় ঘুরিয়া বেড়াই, খাদ্য বিনষ্ট করা এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য লোককে প্ররোচিত করিতাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: খেযাব ব্যবহারকারী বৃদ্ধ এবং ভর্ৎসনা ভীতু যুবকের পক্ষে উহা বড় বে-মানান অপকর্ম। হামا বলিল, ঐ সব পুরাতন কথার পুনরাবৃত্তির ব্যাপারে আমাকে ক্ষমা করুন? আমি আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছি।
"আমি নূহ (আ)-এর সহিত তাঁহার ইবাদতখানায় তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সহিত ছিলাম। আমি তাঁহার কওমের বিরুদ্ধে তাঁহার অভিশাপ দানের ব্যাপারে তাঁহাকে ভর্ৎসনা করি। তিনি এজন্য অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হইয়া রোদন করিতে থাকেন, এমনকি আমি নিজেও তাঁহার এই রোদন দেখিয়া রোদন করি। তখন তিনি বলেন, আমি অবশ্যই এইজন্য লজ্জিত, অনুতপ্ত এবং অজ্ঞ মূর্খদের তালিকাভুক্ত হওয়া হইতে আল্লাহর দরবারে পানاه চাহিতেছি। হামا বলিল, আমি বলিলাম, হে নূহ্! হাবীলের মত পুণ্যবান ভাগ্যবান শহীদের †ত্যাকাণ্ডে আমি শামিল ছিলাম। আমার এই ব্যাপারে প্রায়শ্চিত্ত বা তওবার কোন ব্যবস্থ আছে কি? জবাবে তিনি বলিলেন: ওহে হামا! পুণ্যকাজের সঙ্কল্প করিবে এবং লজ্জিত অনুতপ্ত হওয়ার পূর্বেই তাহা সম্পন্ন করিবে। আমি আমার নিকট নাযিলকৃত কিতাবে পাঠ করিয়াছি, কোন ব্যক্তি যত বড় পাপীই হউক না কেন, তওবা করিলে আল্লাহ্ তাহার তওবা কবুল করিবেন। উযূ করিয়া দুইটি সিজদা কর। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁহার নির্দেশ অনুসারে কাজ করি। একটু পরেই তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ ওহে! মস্তক উত্তোলন কর। তোমার তওবা কবুল হওয়ার সংবাদ আসমান হইতে আসিয়াছে। এই সুসংবাদ শ্রবণ মাত্র আমি পুনরায় সিজদায় পড়িয়া যাই।
"আমি হূদ আলায়হিস্ সালামের সহিত তাঁহার ইবাদতখানায় তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সহিত ছিলাম। আমি তাঁহাকেও তাঁহার স্বগোত্রের প্রতি অভিশাপ বর্ষণের দরুন ভর্ৎসনা করিয়াছি। এমনকি তিনি তাহাতে ক্রন্দন করেন এবং আমাকেও কাঁদান। তিনি বলেন, ঐ বদ-দু'আ করার জন্য আমি লজ্জিত ও অনুতপ্ত। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ্ চাই যেন তিনি এজন্য আমাকে অজ্ঞ মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না করেন। সালিح আলায়হিস্ সালামকে তাঁহার কওমের বিরুদ্ধে বদ-দুআর জন্য ভর্ৎসনা ও তাঁহার ক্রন্দনের কথাও সে অনুরূপ বর্ণনা করিল। আমি ইয়াকূব আলায়হিস্ সালামের দরবারেও হাযির হইতাম। আমি ইউসূফ (আ)-এর সহিত সংরক্ষিত স্থানে ছিলাম যখন তিনি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আমি ইলয়াস আলায়হিস্ সালামের সহিত মাঠে-প্রান্তরে সাক্ষাত করিতাম এবং এখনও তাঁহার সহিত আমার সাক্ষাত হইয়া থাকে।
"মূসা ইবّন ইমরান আলায়হিস্ সালামের সহিতও আমি সাক্ষাত করিয়াছি। তিনি তাওরাতের কিছু অংশ আমাকে শিক্ষা দেন। তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, ঈসা ইবّন মারয়ামের সহিত তোমার
৪৮৩ সাক্ষাত হইলে তাঁহাকে আমার সালাম জানাইবে। তাঁহার সহিতও আমার সাক্ষাতের সৌভাগ্য হইয়াছে এবং আমি তাঁহাকে মূسا (আ)-এর সালাম পৌঁছাইয়া দিয়াছি। ঈسا (আ) আমাকে বলিয়াছিলেন, মুহাম্মাদ-এর সহিত যদি তোমার সাক্ষাত হয় তবে তাঁহাকে আমার সালাম পৌঁছাইবে। তাহা শ্রবণ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ অশ্রুসজল নয়নে বলেন: যতদিন পর্যন্ত এই দুনিয়া কায়েম থাকিবে ততদিন পর্যন্ত ঈসা (আ)-এর প্রতি সালাম বর্ষিত হউক এবং এই আমানত পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্য তোমার প্রতিও সালাম বর্ষিত হউক।
“সে নিবেদন করিল, ইয়া রাসূলূল্লাহ্! আপনিও আমার প্রতি মূসা (আ)-এর মত আচরণ করুন। অর্থাৎ তিনি যেমন আমাকে তওরাতের শিক্ষা দিয়াছিলেন, তেমনি আপনি আমাকে কুরআন শিক্ষা দিন। সেইমতে তিনি আমাকে সূরা আল-ওয়াকি'আ, সূরা আল-মুরসালাত, সূরা আল-ইখলাস, সূরা আন-নাবা, সূরা ইযاش-শامسو কুব্বিরাত, কূল আ'উযু বিরাব্বিল ফালাক ও নাস্ পাঠ শিক্ষা দেন।” হযরত উমার (را) বলেন, মহানবী (س)-এর ইনতিকালের পর হামাকে আর আসিতে দেখি নাই। তাহার মৃত্যু হইয়াছে কিনা তাহা জানা নাই। বায়হাকী মন্তব্য করিয়াছেন যে, এই হাদীছের মধ্যবর্তী রাবী মুহাম্মাদ ইبّن মা'শার-এর নিকট হইতে শীর্ষস্থানীয় ইমামগণ রিওয়ায়াত গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছবেত্তাগণ তাঁহাকে দুর্বল সাব্যস্ত করেন। এই হাদীছটি তুলনামূলক অন্য একটি সবল সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ১৭৭-৭৯)।
গ্রন্থপঞ্জী : বরাত নিবন্ধগর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।