📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (সা)-এর দরবারে হিংস্র শ্বাপদের আগমন

📄 মহানবী (সা)-এর দরবারে হিংস্র শ্বাপদের আগমন


মহানবী -এর দরবারে হিংস্র শ্বাপদের আগমন
শু'আয়ব ইবّن 'উবাদা আবদুল মুত্তালিব ইবّন আবদুল্লাহ্ ইবّন হানতাব হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ একদা মদীনায় তাঁহার সাহাবীগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় একটি নেকড়ে বাঘ আসিয়া তাঁহার সম্মুখে গর্জন করিয়া উঠিল। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন:
هذا وافد السباع اليكم فان احببتم تركتموه وتحذرتم منه فما اخذ فهو رزقه.
"এই, হইতেছে তোমাদের নিকট হিংস্র শ্বাপদকুলের প্রতিনিধি। তোমরা পসন্দ করিলে তাহাদের জন্য কিছু বরাদ্দ করিয়া তাহাদের অনিষ্ট হইতে রক্ষা পাইতে পার, নতুবা তাহারা যাহা ধরিয়া লইয়া যাইবে উহাই তাহাদের জীবিকাস্বরূপ হইবে। তোমরা তোমাদের পশুপালের ব্যাপারে সতর্ক থাকিবে"।
সাহাবীগণ জবাব দিলেন যে, তাঁহারা স্বেচ্ছায় তাহাদের জন্য কোন বরাদ্দ দিতে সম্মত নহেন। রাসূলুল্লাহ্ (س) তখন নেকড়েটির দিকে তিন আঙ্গুল উঁচু করিয়া ইঙ্গিত করিয়া বুঝাইয়া দিলেন, তোমরা সুযোগ বুঝিয়া তোমাদের আহার্য ছিনাইয়া লইবে। নেকড়েটি তখন মাথা দোলাইয়া হেলিয়া-দুলিয়া দ্রুত প্রস্থান করিল। এই সূত্রে হাদীছখানা মুরসাল।
ইয়াযীদ ইبّن হারুন, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একদা একটি নেকড়ে একটি ছাগলের উপর আক্রমণ করিয়া উহাকে মুখে লইয়া ছুটিয়া চলিল। রাখাল উহার পিছু ধাওয়া করিয়া ছাগلটি উহার মুখ হইতে ছিনাইয়া আনিল। নেকড়েটি তাহার লেজের উপর ভর করিয়া দাঁড়াইয়া বলিতে লাগিল, তোমার মনে আল্লাহর ভয় নাই! আমার জন্য আল্লাহ্ নির্ধারিত রিয্ক তুমি ছিনাইয়া লইলে? হতভম্ব রাখালটি আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল, লেজে ভর করিয়া ইহা যে আমার সহিত একেবারে মানুষের ভাষায় কথা বলিতেছে। জবাবে নেকড়েটি বলিল, ইহার চেয়েও আশ্চর্যের খবর আমার নিকট রহিয়াছে, তাহা কি আমি তোমাকে বলিব? ইয়াছরিবে মুহাম্মাদ (س) লোকজনকে অতীতের কাহিনীসমূহ অবগত কর রাইতেছেন।
হযরত আবূ সা'ঈদ (রা) বর্ণনা করেন, রাখালটি তখন তাহার ছাগপালকে হাঁকাইয়া লইয়া মদীনায় পৌঁছিল এবং ঐগুলিকে শহরের এক প্রান্তে রাখিয়া নবী দরবারে উপস্থিত হইল।
৪৭৯ সে তাঁহাকে আনুপূর্বিক ঘটনা বর্ণনা করিয়া শুনাইলে রাসূলুল্লাহ্ লোকজনকে সমবেত হওয়ার ঘোষণা দিলেন। লোকজন আসিয়া সমবেত হইলে তিনি রাখালকে তাহার বক্তব্য বর্ণনার নির্দেশ দিলেন। সে তাহার বক্তব্য প্রদান করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন:
صدق والذي نفس محمد بيده لا يقوم الساعة حتى تكلم السباع بالانس وتكلم الرجل عذابة سوطه وشراك نعله وتخبر فخذه بما احدث اهله بعده.
"তাহার বর্ণনা যথার্থ। যে পবিত্র সত্তার হাতে আমার জীবন তাঁহার কসম! ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হইবে না যাবত না হিংস্র প্রাণীরা মানুষের সহিত কথা বলিবে, লোকের চাবি ঝুলাইবার রশি তাহাদের সহিত কথা বলিবে এবং তাহার উরু তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার কী করিয়াছে সেই সংবাদ না দিবে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৮৬; সুবুলুল হুদা, ৬খ., পৃ. ৪৪০-৪১)।
আবদুল্লাহ্ ইবّن মাস'উদ (রা) হইতে বর্ণিত আছে, জিন্নগণ নবী কারীম-এর নিকট আসিয়া অবতরণ করে। তিনি তখন নাখলা প্রান্তরে কুরআন তিলাওয়াতে রত ছিলেন। যখন তাহারা উহা শ্রবণ করিল তখন বলাবলি করিতে লাগিল, চুপ কর (অর্থাৎ ঐ বাণী শ্রবণের জন্য একে অপরকে চুপ করিতে বলিতেছিল), আর ঐ জিন্নদের সংখ্যা ছিল নয়। তাহাদের মধ্যে একজন ছিলেন তখন-আল্লাহ তা'আলা নাযিল করিলেন ... আয়াতগুলি। এই বর্ণনা এবং ইবّن 'আব্বাসের একটি বর্ণনা অনুসারে ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের আগমন সম্পর্কে আঁচ করিতে পারেন নাই। তাহারা ঐ সময় মনোযোগ সহকারে তাঁহার তিলাওয়াত শুনিয়া স্বসম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া যায়। অতঃপর প্রতিনিধিরূপে তাহারা নবী দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে আগমন করে, এক দলের পর অপর দল, بারে بারে কয়েকবারে।
বায়হাকী বলেন, এই কথাই বলিয়াছেন ইবّন আব্বাস (রা) যে, ঐবার প্রথমবারের মত তাহারা কুরআন শ্রবণ করে এবং রাসূলুল্লাহ্-এর অবস্থাদি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়, তারপর জিন্নদের প্রতিনিধিদের আগমন ঘটে। রাসূলুল্লাহ্ তহাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনান এবং ইসলামের দাওয়াত দেন।
ইমাম মুসলিম রিওয়ায়াত করেন, 'আমির (র) বলেন, আমি আলকামাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, জিন্নদের সেই রাত্রিতে ইবّن মাস'উদ (را) কি নবী কারীম-এর সহিত ছিলেন? 'আলকামা বলেন, আমি ইবّن মাস'উদ (را)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম:
هل شهد احد منكم مع رسول الله ﷺ ليلة الجن. "আপনাদের মধ্যকার কেউ কি জিন্নদের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ্-এর সঙ্গে ছিলেন"? জবাবে তিনি বলেন:
لا ولكن كنا مع رسول الله ﷺ ذات ليلة ففقدناه فالتمسناه في الأودية والشعاب فقيل استطير اغتيل قال فبتنا بشر ليلة بات بها قوم فلما
৪৮০ اصبحنا اذا هو جاء من قبل حراء قال فقلنا يا رسول الله فقدناك فطلبناك فلم نجدك فبتنا بشر ليلة بات بها قوم فقال اتانى داعى الجن فذهبت معهم فقرأت عليهم القرآن قال فانطلق بنا فارانا اثارهم راثار نيرانهم وسأله الزاد فقال كل عظم ذكر اسم الله عليه يقع فى ايديكم او فر ما يكون لحما وكل بعرة او روثة علف الدوابكم.
"না, তবে এক রাত্রিতে আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত ছিলাম। হঠাৎ আমরা তাঁহাকে আমাদের মধ্যে দেখিতে পাইলাম না। আমরা তখন প্রান্তরে প্রান্তরে গিরি-কন্দরসমূহে তন্ন তন্ন করিয়া তাঁহাকে খুঁজিতে লাগিলাম। লোকের মধ্যে নানারূপ বলাবলি হইল, তাঁহাকে কি গোপন করা হইয়াছে, অপহরণ করা হইয়াছে? রাবী ইবّن মাস'উদ বলেন, আমরা এমন এক দূরদৃষ্টপূর্ণ রাত্রি অতিবাহিত করিলাম, যেমনটি কোন সম্প্রদায় কখনও অতিবাহিত করে নাই। সকাল বেলা আমরা হঠাৎ লক্ষ্য করিলাম, তিনি হেরা পাহাড়ের দিক হইতে আগমন করিতেছেন। রাবী বলেন, আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা আপনাকে হারাইয়া তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া না পাইয়া এমন এক দূরদৃষ্টপূর্ণ রাত্রি অতিবাহিত করিয়াছি যেমনটি কোন সম্প্রদায় কখনও অতিবাহিত করে নাই। জবাবে তিনি বলিলেন : জিন্নদের আহবানকারী আমার নিকট আগমন করে। তখন আমি তাহাদের সহিত চলিয়া যাই। আমি তাহাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনাই। রাবী বলেন, তারপর তিনি আমাদিগকে লইয়া সেই স্থানে তাহাদের চিহ্নাদি এবং তাহাদের আগুনের চিহ্নাদি দেখান"।
তাহারা ঐ সময় তাঁহার নিকট পাথেয় যাজ্ঞা করিলে তিনি বলেন : যে কোন হাড় যাহার উপর (যবেহকালে) আল্লাহ্ নাম লওয়া হইয়াছে, তাহা তোমাদের হাত স্পর্শ করামাত্র মাংসপূর্ণ হইয়া উঠিবে এবং গোবর তোমাদের জন্তুসমূহের ঘাসে রূপান্তরিত হইবে"। রাসূলুল্লাহ্ বলেনঃ
فلا تستنجوا بهما فانهما طعام اخوانكم
"সুতরাং তোমরা ঐ দুই বস্তু দ্বারা শৌচ করিবে না; কেননা ঐগুলি তোমাদের (জিন্ন) ভাইদের খাদ্য।"
আবদুল্লাহ্ ইبّن মাসউদ (রা) হইতে আরও বর্ণিত আছে। তিনি বলেন:
سمعت رسول الله ﷺ يقول بت الليلة اقرأ على الجن واقفا بالحجون.
"আমি রাসূলুল্লাহ্ -কে বলিতে শুনিয়াছি, আমি হাজুন নামক স্থানে জিন্নদিগকে কুরআন তিলাওয়াত শুনাইয়া রাত্রি যাপন করিয়াছি"।
ইবّن জারীর অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। ইবّন জারীর বলেন, ইবّن শিহাব সিরিয়াবাসী আবূ উছمان ইবّن শাব্বাহ আল-খুযাঈ হইতে বর্ণনা করেন, 'আবদুল্লাহ্ ইবّন মাস'উদ (را) বলিয়াছেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ মক্কায় অবস্থানকালে তাঁহার সাহাবীগণকে বলেন:
৪৮১ من احب منكم ان يحضر أمر الجن الليلة فليفعل فلم يحضر منهم احد غیری.
"তোমাদের মধ্যকার কেহ যদি রাত্রিবেলা জিন্নদের ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিতে পসন্দ করে তবে সে যেন তাহা করে। কিন্তু আমি ব্যতীত আর কেহ ঐ রাত্রিতে হাযির হয় নাই"।
রাবী বলেন, তারপর আমরা দুইজন পথচলা শুরু করিলাম। যখন আমরা মক্কার উঁচু এলাকায় গিয়া উপনীত হইলাম, তখন তিনি তাঁহার পবিত্র পায়ের দ্বারা একটি বৃত্ত অংকন করিয়া আমাকে উহার মধ্যে অবস্থানের আদেশ দিলেন। তারপর তিনি চলিয়া গেলেন এবং দাঁড়াইয়া কুরআন পাঠ শুরু করিলেন। এই সময় তাহাকে অনেক কৃষ্ণকায় বস্তু ঢাকিয়া ফেলিল এবং উহা তাঁহার ও আমার মধ্যে অন্তরায়স্বরূপ হইল, এমনকি তাঁহার শব্দও আর আমি শুনিতে পাইলাম না। তারপর মেঘমালা ভেদ করিবার মত আওয়ায করিয়া তাহারা প্রস্থান করিতে লাগিল। মাত্র কয়েকজন শেষ পর্যন্ত তাঁহার সহিত রহিল যাহাদের সংখ্যা নয় হইতে তের-এর মধ্যে। ফজরের উদয়কালে রাসূলুল্লাহ্ নিষ্ক্রান্ত হইলেন এবং প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলেন। তারপর আমার নিকট আগমন করিলেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: ঐ দল কী করিল? আমি বলিলাম, ঐ যে উহারা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তখন তিনি তাহাদেরকে খাদ্যস্বরূপ অস্থি ও গোবর দান করিলেন এবং কেহ যেন পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোবর ও অস্থি ব্যবহার না করে সেই নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। ইন জারীর, বায়হাকী ও আবূ নু'আয়م অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ, পৃ. ৪৩৩-৩৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইবলীসের প্রপৌত্রের আগমন

📄 ইবলীসের প্রপৌত্রের আগমন


ইবলীসের প্রপৌত্রের আগমন
হাফিয বায়হাকী তদীয় 'দালাইلُن নবৃওয়া' গ্রন্থে "ইবলীসের প্রপৌত্র হামা ইবনুল হায়ছام ইبّ লাকীس ইبّن ইবলীসের নবী দরবারে আগমন ও ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গ” শিরোনামে একটি আশ্চর্যজনক ও বিরল ঘটনার বিবরণ দিয়াছেন। তাঁহার অনুকরণে ইবّن কাছীর (র)-ও তদীয় আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া এবং আস্-সীরাহ আন-নাবابিয়্যা উভয় গ্রন্থে এই ঘটনাটি উদ্ধৃত করিয়াছেন। ঘটনাটি নিম্নরূপ:
আবুল হাসান মুহাম্মাদ ইবনুল হুসায়ন ইبّن দাউد আলভী (র) আবূ নাসর মুহাম্মাদ ইبّন হামদুয়েح ইبّن সাহل আল-কারী আল-মারূযী- আবদুল্লাহ্ ইبّن হাম্মাদ আমেলী মুহাম্মদ ইبّন আবু মা'শার আবূ মা'মার নাফি' সূত্রে ইبّن উমার (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, হযরত উমার (রা) বলিয়াছেন, "একদা আমরা তিহামায় কোন এক পাহাড়ে নবী কারীম -এর সহিত উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় একটি লাঠি হস্তে জনৈক বৃদ্ধ আসিয়া নবী কারীম -কে সালাম দিল। তিনি তাহাকে সালামের জবাব দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন:
خغمة جن وغمغمتهم من انت ؟
"ইহা তো জিন্নদের গুনগুনানী! তুমি কে হে?"
"জবাবে সে তাহার পরিচয় ব্যক্ত করিল এইভাবে, আমি হইতেছি হামা ইবনুল হায়ছام ইন্ন লাকীس ইबّن ইবলীس। নবী কারীম বলিলেনঃ তাহা হইলে তো তোমার ও ইবলীসের মধ্যে
৪৮২ মাত্র দুই পুরুষের ব্যবধান (তুমি তাহার প্রপৌত্র) তোমার বয়স কত? জবাবে সে বলিল, দুনিয়া আমার আয়ু শেষ করিয়া দিয়াছে। কাবীل যখন হাবীলকে হত্যা করে তখন আমি কয়েক বৎসরের বালক মাত্র। একটু বুঝ হইয়াছে, টিলায় টিলায় ঘুরিয়া বেড়াই, খাদ্য বিনষ্ট করা এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য লোককে প্ররোচিত করিতাম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: খেযাব ব্যবহারকারী বৃদ্ধ এবং ভর্ৎসনা ভীতু যুবকের পক্ষে উহা বড় বে-মানান অপকর্ম। হামا বলিল, ঐ সব পুরাতন কথার পুনরাবৃত্তির ব্যাপারে আমাকে ক্ষমা করুন? আমি আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছি।
"আমি নূহ (আ)-এর সহিত তাঁহার ইবাদতখানায় তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সহিত ছিলাম। আমি তাঁহার কওমের বিরুদ্ধে তাঁহার অভিশাপ দানের ব্যাপারে তাঁহাকে ভর্ৎসনা করি। তিনি এজন্য অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হইয়া রোদন করিতে থাকেন, এমনকি আমি নিজেও তাঁহার এই রোদন দেখিয়া রোদন করি। তখন তিনি বলেন, আমি অবশ্যই এইজন্য লজ্জিত, অনুতপ্ত এবং অজ্ঞ মূর্খদের তালিকাভুক্ত হওয়া হইতে আল্লাহর দরবারে পানاه চাহিতেছি। হামا বলিল, আমি বলিলাম, হে নূহ্! হাবীলের মত পুণ্যবান ভাগ্যবান শহীদের †ত্যাকাণ্ডে আমি শামিল ছিলাম। আমার এই ব্যাপারে প্রায়শ্চিত্ত বা তওবার কোন ব্যবস্থ আছে কি? জবাবে তিনি বলিলেন: ওহে হামا! পুণ্যকাজের সঙ্কল্প করিবে এবং লজ্জিত অনুতপ্ত হওয়ার পূর্বেই তাহা সম্পন্ন করিবে। আমি আমার নিকট নাযিলকৃত কিতাবে পাঠ করিয়াছি, কোন ব্যক্তি যত বড় পাপীই হউক না কেন, তওবা করিলে আল্লাহ্ তাহার তওবা কবুল করিবেন। উযূ করিয়া দুইটি সিজদা কর। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁহার নির্দেশ অনুসারে কাজ করি। একটু পরেই তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ ওহে! মস্তক উত্তোলন কর। তোমার তওবা কবুল হওয়ার সংবাদ আসমান হইতে আসিয়াছে। এই সুসংবাদ শ্রবণ মাত্র আমি পুনরায় সিজদায় পড়িয়া যাই।
"আমি হূদ আলায়হিস্ সালামের সহিত তাঁহার ইবাদতখানায় তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সহিত ছিলাম। আমি তাঁহাকেও তাঁহার স্বগোত্রের প্রতি অভিশাপ বর্ষণের দরুন ভর্ৎসনা করিয়াছি। এমনকি তিনি তাহাতে ক্রন্দন করেন এবং আমাকেও কাঁদান। তিনি বলেন, ঐ বদ-দু'আ করার জন্য আমি লজ্জিত ও অনুতপ্ত। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ্ চাই যেন তিনি এজন্য আমাকে অজ্ঞ মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না করেন। সালিح আলায়হিস্ সালামকে তাঁহার কওমের বিরুদ্ধে বদ-দুআর জন্য ভর্ৎসনা ও তাঁহার ক্রন্দনের কথাও সে অনুরূপ বর্ণনা করিল। আমি ইয়াকূব আলায়হিস্ সালামের দরবারেও হাযির হইতাম। আমি ইউসূফ (আ)-এর সহিত সংরক্ষিত স্থানে ছিলাম যখন তিনি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আমি ইলয়াস আলায়হিস্ সালামের সহিত মাঠে-প্রান্তরে সাক্ষাত করিতাম এবং এখনও তাঁহার সহিত আমার সাক্ষাত হইয়া থাকে।
"মূসা ইবّন ইমরান আলায়হিস্ সালামের সহিতও আমি সাক্ষাত করিয়াছি। তিনি তাওরাতের কিছু অংশ আমাকে শিক্ষা দেন। তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, ঈসা ইবّন মারয়ামের সহিত তোমার
৪৮৩ সাক্ষাত হইলে তাঁহাকে আমার সালাম জানাইবে। তাঁহার সহিতও আমার সাক্ষাতের সৌভাগ্য হইয়াছে এবং আমি তাঁহাকে মূسا (আ)-এর সালাম পৌঁছাইয়া দিয়াছি। ঈسا (আ) আমাকে বলিয়াছিলেন, মুহাম্মাদ-এর সহিত যদি তোমার সাক্ষাত হয় তবে তাঁহাকে আমার সালাম পৌঁছাইবে। তাহা শ্রবণ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ অশ্রুসজল নয়নে বলেন: যতদিন পর্যন্ত এই দুনিয়া কায়েম থাকিবে ততদিন পর্যন্ত ঈসা (আ)-এর প্রতি সালাম বর্ষিত হউক এবং এই আমানত পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্য তোমার প্রতিও সালাম বর্ষিত হউক।
“সে নিবেদন করিল, ইয়া রাসূলূল্লাহ্! আপনিও আমার প্রতি মূসা (আ)-এর মত আচরণ করুন। অর্থাৎ তিনি যেমন আমাকে তওরাতের শিক্ষা দিয়াছিলেন, তেমনি আপনি আমাকে কুরআন শিক্ষা দিন। সেইমতে তিনি আমাকে সূরা আল-ওয়াকি'আ, সূরা আল-মুরসালাত, সূরা আল-ইখলাস, সূরা আন-নাবা, সূরা ইযاش-শامسو কুব্বিরাত, কূল আ'উযু বিরাব্বিল ফালাক ও নাস্ পাঠ শিক্ষা দেন।” হযরত উমার (را) বলেন, মহানবী (س)-এর ইনতিকালের পর হামাকে আর আসিতে দেখি নাই। তাহার মৃত্যু হইয়াছে কিনা তাহা জানা নাই। বায়হাকী মন্তব্য করিয়াছেন যে, এই হাদীছের মধ্যবর্তী রাবী মুহাম্মাদ ইبّن মা'শার-এর নিকট হইতে শীর্ষস্থানীয় ইমামগণ রিওয়ায়াত গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছবেত্তাগণ তাঁহাকে দুর্বল সাব্যস্ত করেন। এই হাদীছটি তুলনামূলক অন্য একটি সবল সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ১৭৭-৭৯)।
গ্রন্থপঞ্জী : বরাত নিবন্ধগর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00