📄 সা'দ আল-'আশীরা প্রতিনিধির আগমন
আবদুর রহমান ইবّন আবী সাবুরা আল-জু'ফী হইতে বর্ণিত লোকজন যখন নবী কারীম -এর রওয়ানা হওয়ার সংবাদ জ্ঞাত হইল তখন বনূ আনাস সা'দ আল-'আশীর এক ব্যক্তি যুবাব উক্ত গোত্রের দেবমূর্তি কার্কাদ-এর উপর আক্রমণ চালাইয়া উহাকে চুরমার করিয়া দেয়। তারপর গোত্রের প্রতিনিধিরূপে নবী দরবারে হাযির হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিম্নরূপ কবিতা আবৃত্তি করেন:
و خلقت فراصنا بدار هوان تبعت رسول الله اذ جاء بالهدى كأن لم يكن والدهر ذو حدثان شددت عليه شدة فتركته اجبت رسول الله حين دعاني فلما رأيت الله اظهر وينه
৪৭৫ فاصبحت الاسلام ما عشت ناصرا والقيت فيما كلكلي وجراني فمن مبلغ سعد العشيره انني شربت الن يبقى يآخر فان.
"আল্লাহ্র রাসূল যখন হিদায়াতসহ আবির্ভূত হইলেন তখন আমি তাঁহার অনুসরণ করিলাম। ফারাদ দেবতাকে আমি তখন লাঞ্ছনার মধ্যে নিক্ষেপ করিলাম। আমি তাহার প্রতি অত্যন্ত কঠোর আচরণ করিলাম এবং এমন অবস্থায় তাহাকে উপনীত করিলাম যেন তাহার কোন অস্তিত্বই ছিল না, আর কাল তো পরিবর্তনশীলই। আমি যখন লক্ষ্য করিলাম, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার দীনকে জয়যুক্ত করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে আহবান জানাইতেই আমি তাঁহার ডাকে সাড়া দিলাম। আমি যতদিন জীবিত থাকিব ইসলামের সাহায্যকারীরূপেই জীবিত থাকিব এবং ইহার পিছনেই আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করিব। এমন কেহ আছেন যিনি সা'দ আল-'আশীরা গোত্রকে এই সংবাদ পৌঁছাইয়া দিবেন যে, আমি নশ্বরের বিনিময়ে অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী অর্থাৎ দুনিয়ার সাময়িক স্বার্থের পরিবর্তে আখিরাতের চিরস্থায়ী স্থানকে খরিদ করিয়া লইয়াছি"।
মুসলিম ইবّন 'আবদুল্লাহ্ ইবّن শুরায়ক আন্-নাঙ্গ তাঁহার পিতার প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, আবদুল্লাহ্ ইবّন যুবাব আল-আনাসী সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর পক্ষে যুদ্ধ করেন এবং উহাতে তাঁহার বিরাট ভূমিকা ছিল (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪২)।
📄 জায়শান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন
'আমর ইবّন শু'আয়ب হইতে বর্ণিত, আবূ ওয়াহব আল-জায়শানী নিজ-সম্প্রদায়ের কতিপয় ব্যক্তিসহ নবী দরবারে উপস্থিত হন। তাঁহারা ইয়ামানের কতিপয় পানীয় সম্পর্কে তাঁহাকে প্রশ্ন করেন। এই প্রসঙ্গে তাঁহারা মধু দ্বারা প্রস্তুত বিত্' এবং যবের দ্বারা প্রস্তুত মির নামক পানীয়ের উল্লেখ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, هل تسكرون منها ؟ "উহা পানে কি তোমাদের নেশা পায়"? জবাবে তাহারা বলিলেন, إن أكثرنا سکیرنا "বেশী পরিমাণে পান করিলে তাহাতে নেশা পায়"। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন: فحرام قليل ما أسكر كثيره.
"উহার স্বল্প পরিমাণও হারাম যাহার অধিক পরিমাণে নেশা ধরে।" তারপর তাহারা এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করিলেন যে মদ্য প্রস্তুত করে এবং তাহার কর্মচারীদিগকে তাহা পান করিতে দেয়। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: كل مسكر حرام "নেশা হয় এমন প্রত্যেক বস্তু হারাম" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৫৯; সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩১৮)।
📄 হাদ্রামাওত প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন
হাদ্রামাওত প্রতিনিধি দল কিন্দা প্রতিনিধি দলের সহিত নবী দরবারে আগমন করেন। তাহারা ছিলেন বনূ ওয়ালি'আ হাদ্রামওতের রাজন্যবর্গ জাগাদ, মিখওয়াস, মিশরাহ্ ও আব্দা'আ। তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন মিখওয়াস বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার জন্য দু'আ করুন যেন আল্লাহ্ আমার মুখের তোতলামী দূর করিয়া দেন। সেই মতে
৪৭৬ রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার জন্য দু'আ করেন এবং হাদ্রামাওতের সাদাকা হইতে তাহাকে একটি অংশ বরাদ্দ করেন।
ওয়াইল ইবّن হুজر আল-হাদ্রামী প্রতিনিধিরূপে নবী দরবারে আগমন করেন। তিনি জানান, ইসলাম গ্রহণ ও হিজরতের উদ্দেশ্যে তিনি আগমন করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার জন্য দু'আ করেন এবং তাঁহার মাথায় হাত বুলাইয়া দেন। ওয়া'ইল ইবّن হুজر (স)-এর আগমনে খুশীতে বিশেষভাবে جامعة الصلوة বলিয়া লোকজনকে সমবেত হওয়ার জন্য ঘোষণা দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ্ (س) মু'আবিয়া ইبّন আবী সুফ্ফানকে তাহাদের অবতরণ ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন।
উষ্ট্রারোহী মেহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে মহানবী মু'আবিয়া (রা)-কে তাহার সঙ্গী হিসাবে প্রেরণ করেন। তাহার সহিত পদব্রজে মু'আবিয়া আগাইয়া চলিলেন। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর উপর দিয়া পদব্রজে খালি পায়ে চলা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। মু'আবিয়া ওয়াইলকে বলেন, আপনার পাদুকা জোড়া আমার জন্য ছুঁড়িয়া ফেলিয়া আমাকে একটু সাহায্য করুন। জবাবে ওয়া'ইল বলিলেন: তুমি ব্যবহার করার পর আবার আমি ঐগুলি ব্যবহার করিব তাহা তো হয় না। এবার মু'আবিয়া বলিলেন, তাহা হইলে আপনার পিছনে আমাকে একটু বসাইয়া নিন! ওয়াইল বলিলেন, রাজার সহিত একই বাহনে আরোহণের যোগ্য তুমি নও। মু'আবিয়া বলিলেন, মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে আমার পা দুইটি তো ঝল্ল্সাইয়া যাইতেছে। ওয়া'ইল বলিলেন, আমার উটনীর ছায়ায় ছায়ায় তুমি পথ চল। ইহাই তোমার সম্মানের জন্য যথেষ্ট।
ওয়াইল ইবّন হুজر স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাকে হাদ্রামাওতের ভূ-সম্পদ ও দুর্গের কর্তৃত্ব অর্পণ করিয়া তাঁহাকে একটি পত্র দান করেন— যাহার বিবরণ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্রাবলী অধ্যায়ে দেখা যাইতে পারে।
আবূ 'উবায়দা হইতে বর্ণিত, মিখওয়াস ইبّن মা'দীকারিব ইبّن ওয়ালী'আ তদীয় সঙ্গী-সাথিগণসহ প্রতিনিধিরূপে নবী দরবারে আগমন করিয়া প্রত্যাবর্তনকালে মিখওয়াসের তোতলামী রোগ দেখা দেয়। তাঁহাদের মধ্যকার কয়েকজন নবী দরবারে ফিরিয়া আসিয়া আরয করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আরব নেতা তোতলামী রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছেন। আপনি আমাদেরকে তাহার প্রতিষেধক কী বলিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন:
خذوا مخيطا فاحمره في النار ثم اقلبوا شفرة عينه ففيها شفاؤه واليها مصيرة فالله اعلم ما قلتم حين خرجتم.
"একটি সূঁচ লইয়া উহাকে অগ্নিতে উত্তপ্ত কর, তারপর তার দুই চক্ষুর পাতা উল্টাইয়া দাও। ইহাতেই তাহার রোগমুক্তি রহিয়াছে' এবং তাঁহারই সমীপে শেষ প্রত্যাবর্তন। আল্লাহই ভাল জানেন যে, আমার নিকট হইতে প্রস্থানকালে তোমরা কী বলিয়াছ"।
'আমর ইبّن মুহাজির আল-কিন্দী হইতে বর্ণিত। হাদ্রামাওতের তিন'আ গোত্রের জনৈক মহিলা তিনাহ্ বিন্ত কুলায়ب রাসূলুল্লাহ্ -এর জন্য এক জোড়া বস্ত্র প্রস্তুত করাইয়া উহা তাঁহার পুত্র কুলায়ب ইبّن আসاد ইبّن কুলায়বের মাধ্যমে নবী কারীম -এর নিকট
৪৭৭ উপঢৌকনস্বরূপ প্রেরণ করেন। পুত্রটি যথারীতি তাহা নবী করীম-এর নিকট পৌঁছাইয়া দিয়া নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার জন্য দু'আ করেন। তিনি তাঁহার বংশধরদের মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র গৌরব প্রকাশ করিতে গিয়া কবিতায় বলেন:
لقد مسح الرسول ابا ابينا ولم يمسح وجوه نبي بحير شبا يهم رشيهم سواء فهم في اللوم اسنان الحمير من وسنر برهوت تهوی بی عذافرة اليك يا خير من بخفي وينتعل تزداد عفوه اذ ما كلت الابل تجوب بی هفصفا غير مناهله شمرين اعملها نصبا على وجد ارجوا بذاك ثواب الله يارجل انت النبي الذي كنا نخبره وبشرتنا به التوراة والرسل.
"আল্লাহ্র রাসূল আমাদের পিতামহের মাথায় তাঁহার পবিত্র হস্ত বুলাইয়া দিয়াছেন। বনূ বুহায়রের কাহারও মাথায় তিনি হাত বুলান নাই। তাহাদের যুবা-বৃদ্ধ সকলেই এই ব্যাপারে সমান। হীনতায় তাহারা গাধার দাঁত সদৃশ। আমি বারহৃত হইতে আসিতেছি। আসিতে আসিতে আমি বারবার ঝুঁকিয়া পড়িতেছি। হে পাদুকাবিহীন ও পাদুকাধারীদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ পুরুষ! আমি আপনার দরবারে আসিতেছি। বাহন আমাকে এমন প্রান্তরসমূহের মধ্য দিয়া লইয়া যাইতেছে যেখানকার জলাশয়সমূহের মাঠগুলি ধুলায় পরিপূর্ণ। উট যখন ক্লান্ত অবসন্ন হইয়া পড়ে তখন সেই ধুলা-বালির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। এই প্রান্তর পরিক্রমায় দুই দুইটি মাস অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। তাপিত অন্তরে আমি সফর করিয়া চলিয়াছি আর এই সফরের জন্য আল্লাহ্র দরবারে ছওয়াবের আশা রাখি। আপনিই সেই নবী যাঁহার সুসমাচার আমাদিগকে দেওয়া হইয়া আসিতেছিল। তাওরাত কিতাব এবং রাসূলগণ আপনার শুভাগমনের সুসংবাদ দিয়াছেন"।
আলকমা ইবّن ওয়াইল (রা) বর্ণনা করেন, ওয়াইল ইبّن হুজر ইبّন সা'د আল্-হাদ্রামী প্রতিনিধরূপে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খেদমতে আগমন করিলে রাসূলুল্লাহ্ (س) তাঁহার চেহারায় হাত বুলাইয়া দিয়া তাঁহার জন্য দু'আ করেন। তিনি তাঁহাকে তাঁহার সম্প্রদায়ের নেতা মনোনীত করেন। রাসূলুল্লাহ্ পরম আনন্দে লোকজনের সম্মুখে ভাষণ দিয়া বলেন, এই ওয়াইল ইبّن হুজر সুদূর হাদরামাওত হইতে ইসলামের প্রেরণায় উজ্জীবিত হইয়া তোমাদের সহিত সাক্ষাত করার উদ্দেশ্যে আসিয়াছে। এই কথাগুলি উচ্চারণের সময় তিনি তাঁহার আওয়াযকে উচ্চ করেন। তারপর মু'আবিয়াকে লক্ষ্য করিয়া বলেন: ইহাদেরকে হাররাতে লইয়া গিয়া কোন বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করিয়া দাও।
মু'আবিয়া (রা) বলেন, আমি তাহাদেরকে লইয়া হাররার দিকে রওয়ানা হইলাম। রৌদ্রতাপে উত্তপ্ত বালুতে আমার পদদ্বয় ঝলসাইয়া যাইতেছিল। আমি ওয়াইল ইبّন হুজرকে বলিলাম, আমাকেও উটের উপর আপনার সাথে বসাইয়া লন। উত্তরে তিনি বলিলেন, কোন নৃপতির সহিত এক আসনে উপবেশনের যোগ্য তুমি নও। আমি বলিলাম, তাহা হইলে আপনার জুতাজোড়া আমাকে পরিতে দিন যাহাতে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকারাশি হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারি। তিনি
৪৭৮ বলিলেন, ইয়ামানবাসীরা জানিতে পারিবে যে, তাহাদের বাদশাহ্ জুতা একজন সাধারণ প্রজা পরিধান করিয়াছে। তুমি চাহিলে বড়জোর আমি আমার উটের গতি একটু শ্লথ করিয়া দিতে পারি— যাহাতে তুমি উহার ছায়ায় পথ চলিতে পার।
মু'আবিয়া (রা) বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ -কে যখন আমি এই ঘটনা জানাইলাম তখন তিনি বলিলেন: সন্দেহ নাই, এখনও তাহার মধ্যে জাহিলিয়াতের কিছু অভ্যাস ও মন-মানসিকতা রহিয়াছে। ওয়াইল ইবّن হুজر (রা)-এর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ্ -এর দ্বারা একটি ফরমান তাঁহার স্বপক্ষে লিখাইয়া লন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৯- ৫১)।
📄 মহানবী (সা)-এর দরবারে হিংস্র শ্বাপদের আগমন
মহানবী -এর দরবারে হিংস্র শ্বাপদের আগমন
শু'আয়ব ইবّن 'উবাদা আবদুল মুত্তালিব ইবّন আবদুল্লাহ্ ইবّন হানতাব হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ একদা মদীনায় তাঁহার সাহাবীগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় একটি নেকড়ে বাঘ আসিয়া তাঁহার সম্মুখে গর্জন করিয়া উঠিল। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন:
هذا وافد السباع اليكم فان احببتم تركتموه وتحذرتم منه فما اخذ فهو رزقه.
"এই, হইতেছে তোমাদের নিকট হিংস্র শ্বাপদকুলের প্রতিনিধি। তোমরা পসন্দ করিলে তাহাদের জন্য কিছু বরাদ্দ করিয়া তাহাদের অনিষ্ট হইতে রক্ষা পাইতে পার, নতুবা তাহারা যাহা ধরিয়া লইয়া যাইবে উহাই তাহাদের জীবিকাস্বরূপ হইবে। তোমরা তোমাদের পশুপালের ব্যাপারে সতর্ক থাকিবে"।
সাহাবীগণ জবাব দিলেন যে, তাঁহারা স্বেচ্ছায় তাহাদের জন্য কোন বরাদ্দ দিতে সম্মত নহেন। রাসূলুল্লাহ্ (س) তখন নেকড়েটির দিকে তিন আঙ্গুল উঁচু করিয়া ইঙ্গিত করিয়া বুঝাইয়া দিলেন, তোমরা সুযোগ বুঝিয়া তোমাদের আহার্য ছিনাইয়া লইবে। নেকড়েটি তখন মাথা দোলাইয়া হেলিয়া-দুলিয়া দ্রুত প্রস্থান করিল। এই সূত্রে হাদীছখানা মুরসাল।
ইয়াযীদ ইبّن হারুন, আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একদা একটি নেকড়ে একটি ছাগলের উপর আক্রমণ করিয়া উহাকে মুখে লইয়া ছুটিয়া চলিল। রাখাল উহার পিছু ধাওয়া করিয়া ছাগلটি উহার মুখ হইতে ছিনাইয়া আনিল। নেকড়েটি তাহার লেজের উপর ভর করিয়া দাঁড়াইয়া বলিতে লাগিল, তোমার মনে আল্লাহর ভয় নাই! আমার জন্য আল্লাহ্ নির্ধারিত রিয্ক তুমি ছিনাইয়া লইলে? হতভম্ব রাখালটি আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল, লেজে ভর করিয়া ইহা যে আমার সহিত একেবারে মানুষের ভাষায় কথা বলিতেছে। জবাবে নেকড়েটি বলিল, ইহার চেয়েও আশ্চর্যের খবর আমার নিকট রহিয়াছে, তাহা কি আমি তোমাকে বলিব? ইয়াছরিবে মুহাম্মাদ (س) লোকজনকে অতীতের কাহিনীসমূহ অবগত কর রাইতেছেন।
হযরত আবূ সা'ঈদ (রা) বর্ণনা করেন, রাখালটি তখন তাহার ছাগপালকে হাঁকাইয়া লইয়া মদীনায় পৌঁছিল এবং ঐগুলিকে শহরের এক প্রান্তে রাখিয়া নবী দরবারে উপস্থিত হইল।
৪৭৯ সে তাঁহাকে আনুপূর্বিক ঘটনা বর্ণনা করিয়া শুনাইলে রাসূলুল্লাহ্ লোকজনকে সমবেত হওয়ার ঘোষণা দিলেন। লোকজন আসিয়া সমবেত হইলে তিনি রাখালকে তাহার বক্তব্য বর্ণনার নির্দেশ দিলেন। সে তাহার বক্তব্য প্রদান করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন:
صدق والذي نفس محمد بيده لا يقوم الساعة حتى تكلم السباع بالانس وتكلم الرجل عذابة سوطه وشراك نعله وتخبر فخذه بما احدث اهله بعده.
"তাহার বর্ণনা যথার্থ। যে পবিত্র সত্তার হাতে আমার জীবন তাঁহার কসম! ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হইবে না যাবত না হিংস্র প্রাণীরা মানুষের সহিত কথা বলিবে, লোকের চাবি ঝুলাইবার রশি তাহাদের সহিত কথা বলিবে এবং তাহার উরু তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার কী করিয়াছে সেই সংবাদ না দিবে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৮৬; সুবুলুল হুদা, ৬খ., পৃ. ৪৪০-৪১)।
আবদুল্লাহ্ ইবّن মাস'উদ (রা) হইতে বর্ণিত আছে, জিন্নগণ নবী কারীম-এর নিকট আসিয়া অবতরণ করে। তিনি তখন নাখলা প্রান্তরে কুরআন তিলাওয়াতে রত ছিলেন। যখন তাহারা উহা শ্রবণ করিল তখন বলাবলি করিতে লাগিল, চুপ কর (অর্থাৎ ঐ বাণী শ্রবণের জন্য একে অপরকে চুপ করিতে বলিতেছিল), আর ঐ জিন্নদের সংখ্যা ছিল নয়। তাহাদের মধ্যে একজন ছিলেন তখন-আল্লাহ তা'আলা নাযিল করিলেন ... আয়াতগুলি। এই বর্ণনা এবং ইবّن 'আব্বাসের একটি বর্ণনা অনুসারে ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের আগমন সম্পর্কে আঁচ করিতে পারেন নাই। তাহারা ঐ সময় মনোযোগ সহকারে তাঁহার তিলাওয়াত শুনিয়া স্বসম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া যায়। অতঃপর প্রতিনিধিরূপে তাহারা নবী দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে আগমন করে, এক দলের পর অপর দল, بারে بারে কয়েকবারে।
বায়হাকী বলেন, এই কথাই বলিয়াছেন ইবّন আব্বাস (রা) যে, ঐবার প্রথমবারের মত তাহারা কুরআন শ্রবণ করে এবং রাসূলুল্লাহ্-এর অবস্থাদি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়, তারপর জিন্নদের প্রতিনিধিদের আগমন ঘটে। রাসূলুল্লাহ্ তহাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনান এবং ইসলামের দাওয়াত দেন।
ইমাম মুসলিম রিওয়ায়াত করেন, 'আমির (র) বলেন, আমি আলকামাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, জিন্নদের সেই রাত্রিতে ইবّن মাস'উদ (را) কি নবী কারীম-এর সহিত ছিলেন? 'আলকামা বলেন, আমি ইবّن মাস'উদ (را)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম:
هل شهد احد منكم مع رسول الله ﷺ ليلة الجن. "আপনাদের মধ্যকার কেউ কি জিন্নদের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ্-এর সঙ্গে ছিলেন"? জবাবে তিনি বলেন:
لا ولكن كنا مع رسول الله ﷺ ذات ليلة ففقدناه فالتمسناه في الأودية والشعاب فقيل استطير اغتيل قال فبتنا بشر ليلة بات بها قوم فلما
৪৮০ اصبحنا اذا هو جاء من قبل حراء قال فقلنا يا رسول الله فقدناك فطلبناك فلم نجدك فبتنا بشر ليلة بات بها قوم فقال اتانى داعى الجن فذهبت معهم فقرأت عليهم القرآن قال فانطلق بنا فارانا اثارهم راثار نيرانهم وسأله الزاد فقال كل عظم ذكر اسم الله عليه يقع فى ايديكم او فر ما يكون لحما وكل بعرة او روثة علف الدوابكم.
"না, তবে এক রাত্রিতে আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত ছিলাম। হঠাৎ আমরা তাঁহাকে আমাদের মধ্যে দেখিতে পাইলাম না। আমরা তখন প্রান্তরে প্রান্তরে গিরি-কন্দরসমূহে তন্ন তন্ন করিয়া তাঁহাকে খুঁজিতে লাগিলাম। লোকের মধ্যে নানারূপ বলাবলি হইল, তাঁহাকে কি গোপন করা হইয়াছে, অপহরণ করা হইয়াছে? রাবী ইবّن মাস'উদ বলেন, আমরা এমন এক দূরদৃষ্টপূর্ণ রাত্রি অতিবাহিত করিলাম, যেমনটি কোন সম্প্রদায় কখনও অতিবাহিত করে নাই। সকাল বেলা আমরা হঠাৎ লক্ষ্য করিলাম, তিনি হেরা পাহাড়ের দিক হইতে আগমন করিতেছেন। রাবী বলেন, আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা আপনাকে হারাইয়া তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া না পাইয়া এমন এক দূরদৃষ্টপূর্ণ রাত্রি অতিবাহিত করিয়াছি যেমনটি কোন সম্প্রদায় কখনও অতিবাহিত করে নাই। জবাবে তিনি বলিলেন : জিন্নদের আহবানকারী আমার নিকট আগমন করে। তখন আমি তাহাদের সহিত চলিয়া যাই। আমি তাহাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনাই। রাবী বলেন, তারপর তিনি আমাদিগকে লইয়া সেই স্থানে তাহাদের চিহ্নাদি এবং তাহাদের আগুনের চিহ্নাদি দেখান"।
তাহারা ঐ সময় তাঁহার নিকট পাথেয় যাজ্ঞা করিলে তিনি বলেন : যে কোন হাড় যাহার উপর (যবেহকালে) আল্লাহ্ নাম লওয়া হইয়াছে, তাহা তোমাদের হাত স্পর্শ করামাত্র মাংসপূর্ণ হইয়া উঠিবে এবং গোবর তোমাদের জন্তুসমূহের ঘাসে রূপান্তরিত হইবে"। রাসূলুল্লাহ্ বলেনঃ
فلا تستنجوا بهما فانهما طعام اخوانكم
"সুতরাং তোমরা ঐ দুই বস্তু দ্বারা শৌচ করিবে না; কেননা ঐগুলি তোমাদের (জিন্ন) ভাইদের খাদ্য।"
আবদুল্লাহ্ ইبّن মাসউদ (রা) হইতে আরও বর্ণিত আছে। তিনি বলেন:
سمعت رسول الله ﷺ يقول بت الليلة اقرأ على الجن واقفا بالحجون.
"আমি রাসূলুল্লাহ্ -কে বলিতে শুনিয়াছি, আমি হাজুন নামক স্থানে জিন্নদিগকে কুরআন তিলাওয়াত শুনাইয়া রাত্রি যাপন করিয়াছি"।
ইবّن জারীর অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। ইবّন জারীর বলেন, ইবّن শিহাব সিরিয়াবাসী আবূ উছمان ইবّن শাব্বাহ আল-খুযাঈ হইতে বর্ণনা করেন, 'আবদুল্লাহ্ ইবّন মাস'উদ (را) বলিয়াছেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ মক্কায় অবস্থানকালে তাঁহার সাহাবীগণকে বলেন:
৪৮১ من احب منكم ان يحضر أمر الجن الليلة فليفعل فلم يحضر منهم احد غیری.
"তোমাদের মধ্যকার কেহ যদি রাত্রিবেলা জিন্নদের ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিতে পসন্দ করে তবে সে যেন তাহা করে। কিন্তু আমি ব্যতীত আর কেহ ঐ রাত্রিতে হাযির হয় নাই"।
রাবী বলেন, তারপর আমরা দুইজন পথচলা শুরু করিলাম। যখন আমরা মক্কার উঁচু এলাকায় গিয়া উপনীত হইলাম, তখন তিনি তাঁহার পবিত্র পায়ের দ্বারা একটি বৃত্ত অংকন করিয়া আমাকে উহার মধ্যে অবস্থানের আদেশ দিলেন। তারপর তিনি চলিয়া গেলেন এবং দাঁড়াইয়া কুরআন পাঠ শুরু করিলেন। এই সময় তাহাকে অনেক কৃষ্ণকায় বস্তু ঢাকিয়া ফেলিল এবং উহা তাঁহার ও আমার মধ্যে অন্তরায়স্বরূপ হইল, এমনকি তাঁহার শব্দও আর আমি শুনিতে পাইলাম না। তারপর মেঘমালা ভেদ করিবার মত আওয়ায করিয়া তাহারা প্রস্থান করিতে লাগিল। মাত্র কয়েকজন শেষ পর্যন্ত তাঁহার সহিত রহিল যাহাদের সংখ্যা নয় হইতে তের-এর মধ্যে। ফজরের উদয়কালে রাসূলুল্লাহ্ নিষ্ক্রান্ত হইলেন এবং প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলেন। তারপর আমার নিকট আগমন করিলেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: ঐ দল কী করিল? আমি বলিলাম, ঐ যে উহারা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তখন তিনি তাহাদেরকে খাদ্যস্বরূপ অস্থি ও গোবর দান করিলেন এবং কেহ যেন পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোবর ও অস্থি ব্যবহার না করে সেই নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। ইন জারীর, বায়হাকী ও আবূ নু'আয়م অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ, পৃ. ৪৩৩-৩৫)।