📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওস গোত্রের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 দাওস গোত্রের নবী (সা) দরবারে আগমন


দাওস গোত্রের নবী দরবারে আগমন
ইমাম ইবّন কাছীর (র) তদীয় আস্-সীরাহ আন-নাবابিয়্যার দুই স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সনদে হযরত আবূ হুরায়রা (র)-এর নবী দরবারে আগমনের বিশদ বর্ণনা দিয়াছেন।
ইমাম আহমাদ (আফফান, ওহাইب, খায়ছام ইবّن 'আরাক সনده) বর্ণনা করেন, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার স্ব-গোত্রের কয়েকজন লোকসহ মদীনায় আগমন করেন। নবী কারীম তখন খায়বরে ছিলেন। তিনি সিবা' ইবّن আরফাতা গাতফানী (র)-কে মদীনার আমীর নিযুক্ত করিয়া গিয়াছিলেন।
হযরত আবূ হুরায়রার নিজের বর্ণনা, আমি যখন মদীনার আমীর সকাশে উপনীত হইলাম, তিনি তখন ফজরের জামাতের ইমামতি করিতেছিলেন। প্রথম রাকআতে তিনি সূরা মারয়াম দ্বারা এবং দ্বিতীয় রাকআত সূরা মুতাফফিফীনের দ্বারা আদায় করেন। আমি মনে মনে বলিলাম, অমুকের জন্য সর্বনাশ সে লেনদেনের জন্য দুই দুইটি ভিন্ন ভিন্ন মাপকাঠি রাখিয়াছে-লওয়ার সময় বেশী লয়, আবার দিবার সময় কম দেওয়ার মাপকাঠিটা ব্যবহার করে (বলাবাহুল্য, শেষোক্ত সূরায় অসাধু লোকদের এই কার্যটির নিন্দাসূচক আয়াত শ্রবণ হইতেই তাঁহার মনে এই কথাটির উদয় হইয়াছিল)। সালাত শেষ তিনি আমাদিগকে পাথেয় দান করেন এবং আমরা খায়বরে উপনীত হই। রাসূলুল্লাহ্ -এর খায়বর বিজয় তখন সমাপ্ত হইয়াছে। তিনি মুজাহিদগণের সহিত পরামর্শক্রমে আমাদিগকেও গনীমতের অংশ দান করিলেন। ইমাম বুখারী স্বয়ং হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ -এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম তখন পথে আমি বলিলাম :
৪৭০ يا ليلة من طولها رعنائها - على انها من دارة الكفر نجت.
"সেই রাতের দৈর্ঘ্য ও দুর্বিষসহ অবস্থা ভুলিবার নহে; যাহাই হউক কুফরের দেশ হইতে সে নিষ্কৃতি দিয়াছে।"
পথে আমার গোলাম পলায়ন করে। তারপর যখন নবী দরবারে পৌঁছিয়া আমি তাঁহার নিকট বায়আত হইলাম, এমন সময় ঐ পলাতক গোলামটি আসিয়া হাযির হইল। রাসূলুল্লাহ্ বলিয়া উঠিলেন : কী আবূ হুরায়রা এই কী তোমার গোলামটা? আমি তৎক্ষণাত বলিয়া উঠিলামঃ আল্লাহ্ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমি তাহাকে স্বাধীন করিয়া দিলাম। এই বর্ণনা সনদে (ইসমাঈل ইبّن আবী খালিদ-কায়س ইبّن আবী হাযিম মারফত) ইমাম বুখারী একক।
ইমাম বুখারী তুফায়ل দাওسীর আগমনের যে বর্ণনা দিয়াছেন উহা ছিল হিজরত পূর্ব যুগের ঘটনা। যদি তাঁহার আগমনের ঘটনাটি হিজরত উত্তর যুগের বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায় তাহা হইলে উহা মক্কা বিজয়ের ঘটনার পূর্বে ঘটিয়া থাকিবে। কেননা দাওس প্রতিনিধি দলের সহিত আবূ হুবায়রা (রা)-ও ছিলেন। আর তাঁহার আগমন ৭ম হিজরীতেই ঘটিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ পৃ. ৬১-৬২; তাবাকাত, ১ খ., পৃ. ৩৫৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শায়বান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 শায়বান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন


শায়بان প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
আবদুল্লাহ্ ইবّন হাসান ছিলেন বনূ আম্বরের শাখাগোত্র বনূ কা'বের লোক। তিনি তদীয় দুইজন দাদী সকিয়্যা ও দুহায়বার প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন। ঐ দুইজন ছিলেন উলায়বার কন্যা। তাঁহারা উভয়ে কায়লা বিন্ত মাখরামার নিকট প্রতিপালিত হন। তাঁহারা বর্ণনা করেন যে, কায়লা বন্ জিনাবের হাবীব ইবّন আযহারের স্ত্রী ছিলেন। তাহাদের দুই কন্যার জন্ম হয়। ইসলামের সূচনা পর্বেই হাবীবের মৃত্যু হয়। কায়লার দুই কন্যাকে তাহাদের চাচা আছওয়اب ইন আযহার মায়ের কোল হইতে কাড়িয়া লন।
কায়লা ইসলামের সূচনাপর্বেই রাসূলুল্লাহ্-এর সন্ধানে বাহির হন। ঐ দুই কন্যার একজন হুদায়বা মাতার সহিত যাইবার জন্য ক্রন্দন জুড়িয়া দেয়। কাল রঙের একটি কম্বলে গা ঢাকা দিয়া তিনি সত্যসত্যই মাতার সহিত রওয়ানা হইয়া পড়িলেন।
মাতা ও কন্যা উভয়ে যখন ঊর্ধ্বগতিতে উটকে হাকাইয়া চলিতেছিলেন এমন সময় একটি খরগোশ গর্ত হইতে বাহির হয়। হুদায়با ইহাকে আছওয়াবের উপর তাহার মাতার বিজয়ের লক্ষণ রূপে ব্যাখ্যা করেন। অতঃপর একটি শৃগাল পথে পড়িলে হুদায়با উহারও একটি ব্যাখ্যা করেন, কিন্তু রাবী তাহা স্বরণ রাখিতে পারেন নাই।
তাঁহারা যখ উট হাকাইয়া চলিতেছিলেন এমন সময় আকস্মিকভাবে উটটি ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। সে কাঁপিতেছিল। তখন হুদায়با বলিয়া উঠিলেন, আমানতের কসম! তোর উপর আছওয়াবের যাদুকরী প্রভাব পড়িয়াছে। কায়লা ঘাবড়াইয়া গিয়া হুদায়বাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ তোমার জন্য আক্ষেপ হইতেছে। উট কী করিতে শুরু করিল! হুদায়با বলিলেন, কাপড় উল্টাইয়া দাও। সম্মুখের ভাগ পিছনে এবং উপরের ভাগ নীচে করিয়া দাও। উটের গদীটাও ঘুরাইয়া দাও-সম্মুখের ভাগ পিছনের দিকে এবং পিছনের ভাগ সম্মুখ দিকে করিয়া দাও। অতঃপর মেয়েটি নিজের
৪৭১ হাতাবিহীন কাল জুব্বা খুলিয়া সম্মুখের দিক পিছن দিকে এবং পিছন দিক সম্মুখের দিকে দিয়া আবার বসিয়া পড়িলেন।
যখন আমিও হুদায়বার পরামর্শমত কাজ করিলাম তখন উটটি দাঁড়াইয়া প্রস্রাব করিল। হুদায়বার কথা অনুযায়ী আমি আমার মালপত্র তাহার পিঠে চাপাইয়া দিলাম।
আমরা যখন ত্রস্তপদে উট হাঁকাইয়া যাত্রা শুরু করিলাম এমন সময় আছওয়াব একখানা ধারাল চোখ ঝলসানো তলোয়ার হাতে পিছن হইতে আসিয়া আমাদের পথরোধ করিয়া দাঁড়াইল। আমি একটি ঘরে ঢুকিয়া আত্মগোপনের চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হইলাম। তাহার তরবারির ধারাল অংশ আমার ললাটের একাংশ স্পর্শ করিল। চিৎকার করিয়া সে বলিল, আমার ভাতিজী কোথায়? বাহির করিয়া দাও! আমি তাড়াতাড়ি মেয়েটিকে তাহার হাতে তুলিয়া দিয়া আমার ভগ্নির বাড়ীর উদ্দেশ্যে ছুটিলাম যাহার বিবাহ বনূ শায়বানের একটি পরিবারে হইয়াছিল। আমার উদ্দেশ্য ছিল, সেখান হইতে আমি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইব।
একদা রাত্রিকালে আমি যখন বিছানায় এপাশ ওপাশ করিতেছিলাম তখন ভগ্নিপতি মজলিস হইতে আসিয়া বলিলেন, কায়লার জন্য খুব ভাল একটি পাত্র পাওয়া গিয়াছে। তাহারা মনে করিতেছিলেন আমি বুঝি নিদ্রিত। কিন্তু আসলে আমি জাগ্রত ছিলাম। ভগ্নিটি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে সেই পাত্রটি? ভগ্নিপতি বলিলেন: হুরায়ছ ইবّن হাসান শায়বানী। বকর ইবّن ওয়ায়েল গোত্রের প্রতিনিধিরূপে তিনি প্রত্যুষে নবী দরবারে গমন করেন। দুইজনের এই কথোপকথন আমি মনোযোগ দিয়া শ্রবণ করিলাম।
আমি আমার উটের উপরে হাওদা চাপাইলাম। হুরায়ছের খোঁজ লইয়া জানিলাম তিনি খুব নিকটেই আছেন। আমি তাঁহার নিকট পৌঁছিয়া প্রতুষে নবী দরবারে গমন কালে আমাকে সঙ্গে লওয়ার অনুরোধ জানাইলাম। তিনি সম্মত হইলেন।
উট প্রস্তুত ছিল। প্রত্যুষেই সত্যপ্রাণ লোকটির সহিত আমি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকটে আসিলাম। আমরা যখন তাঁহার নিকট পৌঁছিলাম তখন তিনি ফজরের জামা'আতের ইমামতি করিতেছিলেন। প্রভাতের আলোকরেখা সবেমাত্র দেখা দিয়াছে। আকাশে তখনও তারকারাজি চমকাইতেছে। রাত্রির অন্ধকারে লোকজন একে অপরকে তখনও চিনিতে পারিতেছিল না।
আমি পুরুষদের কাতারে দাঁড়াইয়া গেলাম। আমি তখন সবেমাত্র মুসলমান হইয়াছি। আমার নিকটে দাঁড়ানো পুরুষ লোকটি জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি পুরুষ, না মহিলা? আমি বলিলাম, আমি একজন মহিলা। লোকটি বলিলেন, তুমি তো আমাকে ফ্যাসাদে ফেলিয়া দিয়াছিলে হে! তুমি পিছনে গিয়া মহিলাদের সাথে দাঁড়াও।! ঘটনাচক্রে হুজরার পার্শ্বেই মহিলাদের কাতারও শুরু হইয়া গিয়াছিল যাহা আমি প্রবেশকালে লক্ষ্য করিতে পারি নাই। নতুবা আমি ঐখানেই তাহাদের সহিত দাঁড়াইতাম।
সূর্য উদিত হইলে আমি মজলিসের নিটকবর্তী হইলাম। কোন তরতাজা চেহারার গৌরবর্ণ সৌম্যমূর্তির লোক দেখিলেই তিনি রাসূলুল্লাহ্ কিনা এই ভাবিয়া আমি পরম ঔৎসুক্যভরে তাহার দিকে তাকাইতে লাগিলাম।
৪৭২ ততক্ষণে সূর্য বেশ উপরে উঠিয়াছে। এমন সময় এক ব্যক্তি আসিয়া আস্-সালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! বলিতেই তিনি প্রত্যুষে ওয়া আলাযকاس সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকুতুহু বলিয়া জবাব দিলেন। নবী কারীম -এর গায়ে তখন পুরাতন তালিযুক্ত চাদর শোভা পাইতেছিল যাহার জাফরানী রং দূর করা হইয়াছে বলিয়া স্পষ্ট বুঝা যাইতেছিল। তাঁহার নিকটে একটি খেজুর ডালের লাঠি ছিল-যাহার ছাল উঠাইয়া ফেলা হইয়াছে। তিনি হাত-পা গুটাইয়া বসিয়া রহিয়াছিলেন।
তাঁহার এত বিনীত ভঙ্গিতে উপবিষ্ট দেখিয়া আমার অন্তর কাঁপিয়া উঠিল। নিকটে বসা লোকটি বলিয়া উঠিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! এই বেচারী কাঁপিতেছে। আমি তাহার পিছনেই উপবিষ্ট ছিলাম। আমার দিকে না তাকাইয়াই তিনি বলিলেন:
يا مسكينة عليك السكنية.
"হে মিসকীন মহিলা! শান্ত হও” (কাঁপিও না)।
তাঁহার এরূপ বলামাত্র আমার অন্তর হইতে ভয় বিদূরিত হইল। আমি শান্ত হইলাম। আমার সহযাত্রী পুরুষটি অগ্রসর হইয়া তাহার নিজের ও তাহার গোত্রের পক্ষ হইতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হাতে বায়'আত হইলেন। অতঃপর তিনি আরয করিলেন:
يا رسول الله اكتب بيننا وبين بني تميم بالدهناء لا يجاوزنا الينا منهم الا مسافر او مجاور.
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! দাহنا প্রান্তর সম্পর্কে আমাদের ও বনূ তামীমের মধ্যে একটা পত্র লিখিয়া দিন যাহাতে একমাত্র পথচারী এবং প্রতিবেশী ভিন্ন অন্য কেহ ইহাতে আমাদের সাথে ভাগ না বসায়।" সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন:
يا غلام اكتب له بالدهناء.
"হে বালক! তাহার জন্য দাহ্না প্রান্তরটা লিখিয়া দাও।" দাহ্না প্রান্তরটি তাহার নামে লিখিয়া দেওয়া হইতেছে দেখিয়া আমার আর তর সহিল না। কেননা উহা আমার দেশ, আমার পিতৃনিবাস। আশৈশব সেখানেই মানুষ হইয়াছি। আমি প্রতিবাদ করিয়া বলিয়া উঠিলাম:
يا رسول الله انه لم يسئلك السوية من الارض اذا سألك انما هذه الدهناء عندك مقيد الجمل ومرعى الغنم ونساء تميم وابناءها وراء ذلك.
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! দাহ্না প্রান্তর চাহিয়া তিনি কোন ন্যায্য কাজ করেন নাই। এই দাহ্না আপনার নিকট, উট বাঁধিবার ও ছাগল চরাইবার স্থান। বনু তামীমের মহিলা ও বালকরা উহার উপর নির্ভরশীল"।
৪৭৩ তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ
أمسك يا غلام صدقت المسكينة المسلم أخو المسلم يسعهما الماء والشجر ويتعاونان على الفتان.
“হে বালক! থামিয়া যাও, এই মিসকীন মহিলা সত্যই বলিয়াছে। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। পানি ও গাছপালার ব্যাপারে তাহারা একে অপরের সহায়ক ও পরিপূরক হইবে। এইগুলি লইয়া বিবাদ-বিসম্বাদে একে অপরের সহযোতিা করিবে”।
যখন হুরায়ছ লক্ষ্য করিলেন যে, তাহার প্রাপ্তিতে বাধা পড়িয়া গেল, তখন তিনি তাহার এক হাত দ্বারা অপর হাতের উপর আঘাত করিয়া বলিলেন: আমরা দুইজনে এরূপ ছিলাম, যেমন প্রবাদ আছে:
حتفها تحمل ضأن باظلافها. "মেষ তাহার খুরে করিয়া নিজের মৃত্যুকে ডাকিয়া আনিল"। অর্থাৎ খাল কাটিয়া আমি কুমীর আনিয়াছি। আমি তোমাকে লইয়া না আসিলে তোমার এরূপ বাধা দানের সুযোগই ঘটিত না। আমি বলিলাম:
اما والله ان كنت لدليلا في الظلماء جوادا بذى الرحل عيفا عن الرفيقة حتى قدمت على رسول الله صلى الله عليه وسلم ولكن لا تلمني على حظى اذا سألت حظك.
"আল্লাহ্র কসম! অন্ধকার রাত্রিতে তুমি ছিলে আমার পথ প্রদর্শক, পথচারীর প্রতি মহানুভব, সহচারীর প্রতি নির্মোহ পূত চরিত্রের অধিকারী। এইভাবে নবী দরবার পর্যন্ত আমাকে লইয়া আসিয়াছ, তাই বলিয়া আমার প্রাপ্য প্রার্থনার জন্য তুমি আমাকে ভর্ৎসনা করিতে পার না"।
তখন হুরায়ছ বলিয়া উঠিলেন: ওরে পোড়ামুখী! দাহনায় আবার তোর কী প্রাপ্য থাকিতে পারে? তখন আমি বলিলাম : مقيد جملى تسئله لجمل امراتك "উহা আমার উট বাঁধিবার স্থান, তুমি উহা তোমার স্ত্রীর উটের জন্য চাহিয়া বসিয়াছ"। কায়লার এইরূপ প্রশংসাবাক্যে প্রীত হইয়া হুরায়ছ বলিয়া উঠিলেন: আজীবন আমি তোমার ভাইরূপে থাকিব। কায়লা বলিলেন, তুমি যখন উহার সূত্রপাত করিলে আমি উহা চিরদিন বহাল রাখিব।
অতঃপর মহিলাটির নিকট হইতে রাসূলুল্লাহ্ এও জানিতে পারেন যে, তাহার একটি পুত্র সন্তানও ছিল যে রাবায়া যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষে লড়াইও করিয়াছে। তারপর তাহার জন্য খায়বারে শস্য সংগ্রহ করিতে যাইয়া জ্বরাক্রান্ত হইয়া মারা যায়।
এই সময় মহিলাটি ক্রন্দন করেন এবং মেয়ে দুইটিকে রাখিয়া গিয়া সে আমাকে বিষম যন্ত্রণার মধ্যে রাখিয়া গিয়াছে বলিয়া অনুযোগ করেন। রাসূলুল্লাহ্ মহিলাটির এরূপ অনুযোগে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, পূণ্যকাজ করিতে কেহ যন্ত্রণার কারণ হইতে পারে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন:
৪৭৪ والذي نفس محمد بيده إن أحدكم ليبكي فيستعبر إليه صويحبه فيا عباد الله لا تعذبوا إخوانكم.
"মুহাম্মদের প্রাণ যাহার হাতে সেই পবিত্র সত্তার কসম! তোমাদের কোন ব্যক্তি নিজে কাঁদিয়া সাথীকেও কাঁদায়। সুতরাং হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমাদের ভাইদের কষ্টের কারণ হইও না।"
রাসূলুল্লাহ্ একটি লোহিতাভ চর্মগ্রাত্রে কায়লা এবং তাহার কন্যাদ্বয়ের স্বপক্ষে একটি পত্র লিখিয়া দেন যাহাতে তাহাদের প্রতি কোনরূপ অত্যাচার না করিতে, বলপূর্বক তাহাদিগকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে বাধ্য না করিতে এবং মু'মিন মাত্রকেই তাহাদের প্রতি সহানুভূতি সম্মত থাকিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রাবলী অধ্যায়ে উহার পাঠ দেখা যাইতে পারে।
সফিয়্যা ও দুহায়با তাহাদের পিতামহ হারমালা সম্পর্কে বর্ণনা করেন যে, হারমালা বাড়ী হইতে নির্গত হইয়া নবী দরবারে আগমন করেন। কিছুদিন সেখানে বসবাস করিয়া তিনি স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করেন। হারমালা বলেন, আমার ইচ্ছা ছিল, নবী দরবারে থাকিয়া প্রচুর ইলম অর্জন ব্যতীত আমি স্বগোত্রে ফিরিয়া যাইব না। যখন প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলাম, তখন নবী কারীম বলিলেন:
يا حرملة انت المعروف واجتنب المنكر وانظر الذي تحب أذنك إذا قمت من عند القوم أن يقولوه لك فأته والذي تكره أن يقولوه لك إذا قمت من عندهم فاحتبيه.
“হে হারমালা! সৎকর্ম করিবে এবং অসৎকর্ম হইতে বিরত থাকিবে। যখন তুমি কোন সম্প্রদায়ের নিকট হইতে প্রস্থান করিবে, তখন তোমার কান তোমার সম্পর্কে লোকের কী মন্তব্য শুনিতে পসন্দ করে তাহা লক্ষ্য রাখিবে। তুমি তাহাই করিবে। যখন তুমি কোন সম্প্রদায়ের নিকট হইতে প্রস্থান করিবে তখন লক্ষ্য রাখিবে তোমার সম্পর্কে তাহাদের কী মন্তব্য। তোমার অপসন্দ হয়, উহা হইতে তুমি বিরত থাকিবে” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১৭-২১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সা'দ আল-'আশীরা প্রতিনিধির আগমন

📄 সা'দ আল-'আশীরা প্রতিনিধির আগমন


আবদুর রহমান ইবّন আবী সাবুরা আল-জু'ফী হইতে বর্ণিত লোকজন যখন নবী কারীম -এর রওয়ানা হওয়ার সংবাদ জ্ঞাত হইল তখন বনূ আনাস সা'দ আল-'আশীর এক ব্যক্তি যুবাব উক্ত গোত্রের দেবমূর্তি কার্কাদ-এর উপর আক্রমণ চালাইয়া উহাকে চুরমার করিয়া দেয়। তারপর গোত্রের প্রতিনিধিরূপে নবী দরবারে হাযির হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিম্নরূপ কবিতা আবৃত্তি করেন:
و خلقت فراصنا بدار هوان تبعت رسول الله اذ جاء بالهدى كأن لم يكن والدهر ذو حدثان شددت عليه شدة فتركته اجبت رسول الله حين دعاني فلما رأيت الله اظهر وينه
৪৭৫ فاصبحت الاسلام ما عشت ناصرا والقيت فيما كلكلي وجراني فمن مبلغ سعد العشيره انني شربت الن يبقى يآخر فان.
"আল্লাহ্র রাসূল যখন হিদায়াতসহ আবির্ভূত হইলেন তখন আমি তাঁহার অনুসরণ করিলাম। ফারাদ দেবতাকে আমি তখন লাঞ্ছনার মধ্যে নিক্ষেপ করিলাম। আমি তাহার প্রতি অত্যন্ত কঠোর আচরণ করিলাম এবং এমন অবস্থায় তাহাকে উপনীত করিলাম যেন তাহার কোন অস্তিত্বই ছিল না, আর কাল তো পরিবর্তনশীলই। আমি যখন লক্ষ্য করিলাম, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার দীনকে জয়যুক্ত করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে আহবান জানাইতেই আমি তাঁহার ডাকে সাড়া দিলাম। আমি যতদিন জীবিত থাকিব ইসলামের সাহায্যকারীরূপেই জীবিত থাকিব এবং ইহার পিছনেই আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করিব। এমন কেহ আছেন যিনি সা'দ আল-'আশীরা গোত্রকে এই সংবাদ পৌঁছাইয়া দিবেন যে, আমি নশ্বরের বিনিময়ে অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী অর্থাৎ দুনিয়ার সাময়িক স্বার্থের পরিবর্তে আখিরাতের চিরস্থায়ী স্থানকে খরিদ করিয়া লইয়াছি"।
মুসলিম ইবّন 'আবদুল্লাহ্ ইবّن শুরায়ক আন্-নাঙ্গ তাঁহার পিতার প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, আবদুল্লাহ্ ইবّন যুবাব আল-আনাসী সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর পক্ষে যুদ্ধ করেন এবং উহাতে তাঁহার বিরাট ভূমিকা ছিল (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জায়শান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 জায়শান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন


'আমর ইবّন শু'আয়ب হইতে বর্ণিত, আবূ ওয়াহব আল-জায়শানী নিজ-সম্প্রদায়ের কতিপয় ব্যক্তিসহ নবী দরবারে উপস্থিত হন। তাঁহারা ইয়ামানের কতিপয় পানীয় সম্পর্কে তাঁহাকে প্রশ্ন করেন। এই প্রসঙ্গে তাঁহারা মধু দ্বারা প্রস্তুত বিত্' এবং যবের দ্বারা প্রস্তুত মির নামক পানীয়ের উল্লেখ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, هل تسكرون منها ؟ "উহা পানে কি তোমাদের নেশা পায়"? জবাবে তাহারা বলিলেন, إن أكثرنا سکیرنا "বেশী পরিমাণে পান করিলে তাহাতে নেশা পায়"। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন: فحرام قليل ما أسكر كثيره.
"উহার স্বল্প পরিমাণও হারাম যাহার অধিক পরিমাণে নেশা ধরে।" তারপর তাহারা এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করিলেন যে মদ্য প্রস্তুত করে এবং তাহার কর্মচারীদিগকে তাহা পান করিতে দেয়। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: كل مسكر حرام "নেশা হয় এমন প্রত্যেক বস্তু হারাম" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৫৯; সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩১৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00