📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাদ্রামাওতের প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 হাদ্রামাওতের প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন


হাদ্রামাওতের প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
হাদ্রামাওতের তান'আ গোত্রের জনৈকা মহিলা তাহ্নাত বিন্ত কুলায়ب আপন পুত্র কুলায়ب ইبّن আসادকে একটি বস্ত্রের উপঢৌকনসহ নবী দরবারে প্রেরণ করেন। কুলায়ب নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার জন্য দু'আ করেন। কুলায়ب দরবারে নববীতে হাযির হওয়ার সময় কয়েকটি পংক্তিতে তাঁহার প্রশংসা করেন। ঐ পংক্তিগুলিতে এই কথার স্বীকারোক্তি ছিল যে, তিনি সেই বহুল প্রতীক্ষিত নবী যাঁহার সু-সমাচার আমাদিগকে তওরাত ও ইঞ্জীলের মাধ্যমে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ দিয়া গিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩২১-৩২২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জারম গোত্রের প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 জারম গোত্রের প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন


জারم গোত্রের প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
ইবন সা'د (ر) সা'দ ইব্‌ن মুরাহ আল-কারমী হইতে এবং তিনি তাহার পিতার বরাতে বর্ণনা করেন, আমাদের স্ব-গোত্রের দুইব্যক্তি প্রতিনিধিরূপে রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁহাদের একজন হইতেছেন আস্কা ইبّن শুরায়ح্ ইبّن সুলায়م ইন্ন আমর ইব্‌ن রিয়াহ আর অপর জন হাওযা ইবّن আমর ইبّن য়াযীদ ইবّন আমর ইبّن রিয়াহ। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদিগকে একখানা লিপিও প্রদান করেন। রিয়াহ-এর ঊর্ধ্বতন বংশ তালিকা জারم পর্যন্ত এইরূপ : রিয়াহ ইبّن 'আওফ ইبّন উমায়রা ইবনুল হাওন ইবّন 'আজাব ইবّ কুদামাহ্ ইবّن জারم। আস্কা-এর নাম উল্লেখ করিয়া ইন্ন সা'د বলেন : অর্থাৎ আমির ইبّن আস্থা ইبّن শুরায়ح্। অতঃপর তিনি জারم গোত্রীয় কতিপয় লোকের বরাতে আস্কার নিম্নলিখিত কবিতা উদ্ধৃত করিয়াছেন :
وكان ابو شر الخير عمى فتى الفتيان حمال الغرامة ذود الاكال سامونا ظلامه عميد الحي من جرم اذا ما
467 وسابق قومه لما دعاهم الى الاسلام احمد من تهامه قلباه وكان له ظهيرا فرخله على حي قدامه
"আবূ শুরায়ح আল-খায়র আমার চাচা ছিলেন। বীরপুরুষ ও অন্যদের ঋণ পরিশোধের ও গুরুতর দায়িত্বভার বহনকারী ছিলেন তিনি।
এমন অবস্থায়ও তিনি জারم গোত্রের সর্দার ছিলেন যখন ধনলিঙ্গু হস্তক্ষেপকারীরা তাহাদের লুণ্ঠন প্রবৃত্তির দ্বারা আমাদের জীবন দুর্বিসহ করিয়া রাখিয়াছিল।
"আহমাদ যখন তিহামা অঞ্চলের মক্কা ভূমি হইতে তাহার গোত্রকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাইলেন তখন তিনি অন্যান্যদের পূর্বেই সেই ব্যাপারে অগ্রসর হন।
"তিনি তাঁহার সেই আহ্বানে সাড়া দেন এবং তাঁহার সাহায্যকারী হইয়া যান। তিনি তাহাকে কুদামার উভয় গোত্রের শাসনভার অর্পণ করেন"।
অনুরূপ আমর ইبّন সালিমাহ ইবّن কায়س আল-জারমী (রা) হইতে ইবّন সা'د বর্ণনা করেন, যখন তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করিলেন তখন তাহার নিজের পিতা এবং গোত্রের কতিপয় লোক প্রতিনিধিরূপে রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট উপস্থিত হন। তাহারা তাঁহার নিকট কুরআন শিক্ষা করেন এবং তাহাদের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে জিজ্ঞাসা করেন, আমাদের নামাযের ইমামতি কে করিবে? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (س) বলেন:
ليصل بكم اكثركم جمعا او اخذا للقرآن.
"তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি কুরআন বেশী মুখস্থ করিয়াছে বা আয়ত্ত করিয়াছে সেই তোমাদের সালাতের ইমামতি করিবে।"
তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট হইতে ফিরিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া আমার চেয়ে বেশী কুরআন জানা লোক খুঁজিয়া পাইলেন না। অথচ তখন আমার বয়স এতই কম ছিল যে, একখানা চাঁদর ছাড়া তখন আমার গায়ে অন্য কোন কাপড় ছিল না। অগত্যা তাঁহারা আমাকেই ইমাম মনোনীত করিলেন। আমি সালাতে তাঁহাদের ইমামতি করিলাম। আজ পর্যন্ত জারم গোত্রের কোন জুমআর সালাতে আমার উপস্থিতিতে অন্য কেহ ইমামতির করিয়াছে এমনটি হয় নাই। রাবী বলেন, আমর ইبّن সালিমা আজীবন জানাযার নামাযে ইমামতি দায়িত্ব পালন করিয়া যান এবং মসজিদের ইমামতিও করেন। বুখারী শরীফে বর্ণনায় আছে,
আবূ য়াযীদ- আমর ইবّن সালিমাহ্ আল-জারামী হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি জলাধার (কূপ)-এর নিকট বাস করিতাম যাহা জনসাধারণের চলাচলের পথে অবস্থিত। আমরা লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিতাম (ইসলামের) ঐ ব্যাপারটি কী? তাহারা জবাব দিত:
رجل يزعم انه نبى وان الله ارسله وأن الله اوحى اليه كذا وكذا .
"এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটিয়াছে যিনি দাবী করেন যে, তিনি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল এবং আল্লাহ্ তাঁহার প্রতি অমুক অমুক ওহী নাযিল করিয়াছেন।"
রাবী বলেন:
فجعلت لا اسمع شيئا من ذلك الا حفظته كانما يغرى فى صدرى بغراء حتى جمعت فيه قرآنا كثيرا وكانت العرب تلوم باسلامها الفتح يقولون انظروا فإن ظهر عليهم فهو صادق وهو نبى فلما جاءتنا وقعه الفتح بادر كل قوم با سلامهم فانطلق ابی با سلام حوائنا ذلك واقام مع رسول الله ﷺ ما شاء الله ان يقيم.
"তারপর আমি কুরআনের যাহাই শুনিতাম তাহাই মুখস্থ করিয়া রাখিতাম যেন উহা দ্বারা আমার বক্ষে রঙ করিয়া দেওয়া হইল। এমনটি করিতে করিতে আমি আমার বক্ষে প্রচুর কুরআনের আয়াত সংরক্ষণ করিয়া ফেলিলাম। এদিকে আরবগণ ইসলাম গ্রহণের জন্য মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। তাহারা বলাবলি করিত, অপেক্ষা কর, যদি তিনি কুরায়শদের উপর বিজয়ী হন তাহা হইলে বুঝিতে হইবে যে, তিনি সত্য নবী। মক্কা বিজেেয়র সংবাদ আসিতেই সমস্ত গোত্র ইসলাম গ্রহণের জন্য হুমড়ি খাইয়া পড়িল। কে কাহার আগে ইসলাম গ্রহণ করিবে উহার প্রতিযোগিতা শুরু হইয়া গেল। আমার পিতা আমাদের প্রতিবেশীদের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ লইয়া নবী দরবারে গিয়া উপস্থিত হইলেন। আল্লাহ্র যতদিন ইচ্ছা ছিল ততদিন তিনি সেখানে থাকিলেন"।
তারপর দীর্ঘদিন নবী কারীম ﷺ-এর সাহচর্য লাভ করিয়া স্বগোত্রে ফিরিয়া আসিলেন। লোকজন তাহাকে ঘিরিয়া ধরিল। তিনি বলিলেন:
جئتكم والله من عند رسول الله حقا. "আমি আল্লাহ্ সত্য রাসূলের নিকট হইতে তোমাদের নিকট আসিয়াছি।" তারপর বলিলেন:
انه يأمركم بكذا وكذا وينهاكم عن كذا وكذا وان تصلوا صلاة كذا في حين كذا واذا حضرت الصلاة فليؤذن احدكم وليؤمكم اكثركم قرآنا .
"তিনি তোমাদিগকে অমুক অমুক কাজের আদেশ দিয়াছেন এবং অমুক অমুক কাজ হইতে বারণ করিয়াছেন এবং অমুক অমুক সময় অমুক অমুক সালাতের নির্দেশ দিয়াছেন। যখন সালাতের ওয়াক্ত হইবে তখন তোমাদের মধ্যকার একজন আযান দিবে এবং তোমাদের মধ্যকার অধিকতর কুরআন জানা লোক তোমাদের ইমামতি করিবে।" রাবী আমর ইبّন সালিমা (রা) বলেন,
فما وجدوا احدا اكثر قرآنا منى الذي كنت احفظه من الركبان فدعوني فعلموني الركوع والسجود وقدموني بين ايديهم فكنت اصلى بهم وانا ابن ست سنين.
৪৬৯ "আমাদের আশেপাশের লোকজন চতুর্দিকে নজর বুলাইয়া আমার চেয়ে বেশী কুরআন জানা আর কোন লোক খুঁজিয়া পাইলেন না-সেই কুরআন যাহা আমি মুসাফিরদের নিকট হইতে শুনিয়া মুখস্ত করিয়াছিলাম। তাহারা আমাকেই ডাকিয়া লইয়া রুকু সিজদা শিক্ষা দিলেন এবং আমাকে ইমামতির জন্য তাহাদের আগে দাঁড় করাইয়া দিলেন। অথচ আমার বয়স যখন মাত্র ছয় বৎসর"। রাবী বলেন :
وكان على بردة كنت اذا سجدت تقلت عنى فقالت امرأة من الحي الا نغطون عنا است قاركم فال فكسوني قميصا من معقد البحرين قال فما فرحت شيئ اشد من فرحى بذلك القميص.
"আমার ছিল একটি চাদর। সিজদায় গেলে আমার নিম্নাংগ অনাবৃত হইয়া পড়িত। তাহা লক্ষ্য করিয়া এক মহিলা বলিলেন, তোমাদের কারী সাহেবের নিতম্ব কি ঢাকিয়া দিবে না যাহাতে আমাদের নজরে না পড়ে! তিনি বলেন : ফলে আমাকে একটি বাহ্রায়নী কামীস প্রদান করা হইল— যাহা পাইয়া আমি এতই আনন্দিত হইলাম যেরূপ আনন্দিত আর কিছুতেই হই নাই" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৩৬-৩৩৭; সুবুলুল হুদা, ৬/৩০৯-১০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওস গোত্রের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 দাওস গোত্রের নবী (সা) দরবারে আগমন


দাওস গোত্রের নবী দরবারে আগমন
ইমাম ইবّন কাছীর (র) তদীয় আস্-সীরাহ আন-নাবابিয়্যার দুই স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সনদে হযরত আবূ হুরায়রা (র)-এর নবী দরবারে আগমনের বিশদ বর্ণনা দিয়াছেন।
ইমাম আহমাদ (আফফান, ওহাইب, খায়ছام ইবّن 'আরাক সনده) বর্ণনা করেন, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার স্ব-গোত্রের কয়েকজন লোকসহ মদীনায় আগমন করেন। নবী কারীম তখন খায়বরে ছিলেন। তিনি সিবা' ইবّن আরফাতা গাতফানী (র)-কে মদীনার আমীর নিযুক্ত করিয়া গিয়াছিলেন।
হযরত আবূ হুরায়রার নিজের বর্ণনা, আমি যখন মদীনার আমীর সকাশে উপনীত হইলাম, তিনি তখন ফজরের জামাতের ইমামতি করিতেছিলেন। প্রথম রাকআতে তিনি সূরা মারয়াম দ্বারা এবং দ্বিতীয় রাকআত সূরা মুতাফফিফীনের দ্বারা আদায় করেন। আমি মনে মনে বলিলাম, অমুকের জন্য সর্বনাশ সে লেনদেনের জন্য দুই দুইটি ভিন্ন ভিন্ন মাপকাঠি রাখিয়াছে-লওয়ার সময় বেশী লয়, আবার দিবার সময় কম দেওয়ার মাপকাঠিটা ব্যবহার করে (বলাবাহুল্য, শেষোক্ত সূরায় অসাধু লোকদের এই কার্যটির নিন্দাসূচক আয়াত শ্রবণ হইতেই তাঁহার মনে এই কথাটির উদয় হইয়াছিল)। সালাত শেষ তিনি আমাদিগকে পাথেয় দান করেন এবং আমরা খায়বরে উপনীত হই। রাসূলুল্লাহ্ -এর খায়বর বিজয় তখন সমাপ্ত হইয়াছে। তিনি মুজাহিদগণের সহিত পরামর্শক্রমে আমাদিগকেও গনীমতের অংশ দান করিলেন। ইমাম বুখারী স্বয়ং হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ -এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম তখন পথে আমি বলিলাম :
৪৭০ يا ليلة من طولها رعنائها - على انها من دارة الكفر نجت.
"সেই রাতের দৈর্ঘ্য ও দুর্বিষসহ অবস্থা ভুলিবার নহে; যাহাই হউক কুফরের দেশ হইতে সে নিষ্কৃতি দিয়াছে।"
পথে আমার গোলাম পলায়ন করে। তারপর যখন নবী দরবারে পৌঁছিয়া আমি তাঁহার নিকট বায়আত হইলাম, এমন সময় ঐ পলাতক গোলামটি আসিয়া হাযির হইল। রাসূলুল্লাহ্ বলিয়া উঠিলেন : কী আবূ হুরায়রা এই কী তোমার গোলামটা? আমি তৎক্ষণাত বলিয়া উঠিলামঃ আল্লাহ্ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমি তাহাকে স্বাধীন করিয়া দিলাম। এই বর্ণনা সনদে (ইসমাঈل ইبّن আবী খালিদ-কায়س ইبّن আবী হাযিম মারফত) ইমাম বুখারী একক।
ইমাম বুখারী তুফায়ل দাওسীর আগমনের যে বর্ণনা দিয়াছেন উহা ছিল হিজরত পূর্ব যুগের ঘটনা। যদি তাঁহার আগমনের ঘটনাটি হিজরত উত্তর যুগের বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায় তাহা হইলে উহা মক্কা বিজয়ের ঘটনার পূর্বে ঘটিয়া থাকিবে। কেননা দাওس প্রতিনিধি দলের সহিত আবূ হুবায়রা (রা)-ও ছিলেন। আর তাঁহার আগমন ৭ম হিজরীতেই ঘটিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ পৃ. ৬১-৬২; তাবাকাত, ১ খ., পৃ. ৩৫৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শায়বান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 শায়বান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন


শায়بان প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
আবদুল্লাহ্ ইবّন হাসান ছিলেন বনূ আম্বরের শাখাগোত্র বনূ কা'বের লোক। তিনি তদীয় দুইজন দাদী সকিয়্যা ও দুহায়বার প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন। ঐ দুইজন ছিলেন উলায়বার কন্যা। তাঁহারা উভয়ে কায়লা বিন্ত মাখরামার নিকট প্রতিপালিত হন। তাঁহারা বর্ণনা করেন যে, কায়লা বন্ জিনাবের হাবীব ইবّন আযহারের স্ত্রী ছিলেন। তাহাদের দুই কন্যার জন্ম হয়। ইসলামের সূচনা পর্বেই হাবীবের মৃত্যু হয়। কায়লার দুই কন্যাকে তাহাদের চাচা আছওয়اب ইন আযহার মায়ের কোল হইতে কাড়িয়া লন।
কায়লা ইসলামের সূচনাপর্বেই রাসূলুল্লাহ্-এর সন্ধানে বাহির হন। ঐ দুই কন্যার একজন হুদায়বা মাতার সহিত যাইবার জন্য ক্রন্দন জুড়িয়া দেয়। কাল রঙের একটি কম্বলে গা ঢাকা দিয়া তিনি সত্যসত্যই মাতার সহিত রওয়ানা হইয়া পড়িলেন।
মাতা ও কন্যা উভয়ে যখন ঊর্ধ্বগতিতে উটকে হাকাইয়া চলিতেছিলেন এমন সময় একটি খরগোশ গর্ত হইতে বাহির হয়। হুদায়با ইহাকে আছওয়াবের উপর তাহার মাতার বিজয়ের লক্ষণ রূপে ব্যাখ্যা করেন। অতঃপর একটি শৃগাল পথে পড়িলে হুদায়با উহারও একটি ব্যাখ্যা করেন, কিন্তু রাবী তাহা স্বরণ রাখিতে পারেন নাই।
তাঁহারা যখ উট হাকাইয়া চলিতেছিলেন এমন সময় আকস্মিকভাবে উটটি ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। সে কাঁপিতেছিল। তখন হুদায়با বলিয়া উঠিলেন, আমানতের কসম! তোর উপর আছওয়াবের যাদুকরী প্রভাব পড়িয়াছে। কায়লা ঘাবড়াইয়া গিয়া হুদায়বাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ তোমার জন্য আক্ষেপ হইতেছে। উট কী করিতে শুরু করিল! হুদায়با বলিলেন, কাপড় উল্টাইয়া দাও। সম্মুখের ভাগ পিছনে এবং উপরের ভাগ নীচে করিয়া দাও। উটের গদীটাও ঘুরাইয়া দাও-সম্মুখের ভাগ পিছনের দিকে এবং পিছনের ভাগ সম্মুখ দিকে করিয়া দাও। অতঃপর মেয়েটি নিজের
৪৭১ হাতাবিহীন কাল জুব্বা খুলিয়া সম্মুখের দিক পিছن দিকে এবং পিছন দিক সম্মুখের দিকে দিয়া আবার বসিয়া পড়িলেন।
যখন আমিও হুদায়বার পরামর্শমত কাজ করিলাম তখন উটটি দাঁড়াইয়া প্রস্রাব করিল। হুদায়বার কথা অনুযায়ী আমি আমার মালপত্র তাহার পিঠে চাপাইয়া দিলাম।
আমরা যখন ত্রস্তপদে উট হাঁকাইয়া যাত্রা শুরু করিলাম এমন সময় আছওয়াব একখানা ধারাল চোখ ঝলসানো তলোয়ার হাতে পিছن হইতে আসিয়া আমাদের পথরোধ করিয়া দাঁড়াইল। আমি একটি ঘরে ঢুকিয়া আত্মগোপনের চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হইলাম। তাহার তরবারির ধারাল অংশ আমার ললাটের একাংশ স্পর্শ করিল। চিৎকার করিয়া সে বলিল, আমার ভাতিজী কোথায়? বাহির করিয়া দাও! আমি তাড়াতাড়ি মেয়েটিকে তাহার হাতে তুলিয়া দিয়া আমার ভগ্নির বাড়ীর উদ্দেশ্যে ছুটিলাম যাহার বিবাহ বনূ শায়বানের একটি পরিবারে হইয়াছিল। আমার উদ্দেশ্য ছিল, সেখান হইতে আমি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইব।
একদা রাত্রিকালে আমি যখন বিছানায় এপাশ ওপাশ করিতেছিলাম তখন ভগ্নিপতি মজলিস হইতে আসিয়া বলিলেন, কায়লার জন্য খুব ভাল একটি পাত্র পাওয়া গিয়াছে। তাহারা মনে করিতেছিলেন আমি বুঝি নিদ্রিত। কিন্তু আসলে আমি জাগ্রত ছিলাম। ভগ্নিটি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে সেই পাত্রটি? ভগ্নিপতি বলিলেন: হুরায়ছ ইবّن হাসান শায়বানী। বকর ইবّن ওয়ায়েল গোত্রের প্রতিনিধিরূপে তিনি প্রত্যুষে নবী দরবারে গমন করেন। দুইজনের এই কথোপকথন আমি মনোযোগ দিয়া শ্রবণ করিলাম।
আমি আমার উটের উপরে হাওদা চাপাইলাম। হুরায়ছের খোঁজ লইয়া জানিলাম তিনি খুব নিকটেই আছেন। আমি তাঁহার নিকট পৌঁছিয়া প্রতুষে নবী দরবারে গমন কালে আমাকে সঙ্গে লওয়ার অনুরোধ জানাইলাম। তিনি সম্মত হইলেন।
উট প্রস্তুত ছিল। প্রত্যুষেই সত্যপ্রাণ লোকটির সহিত আমি রাসূলুল্লাহ্-এর নিকটে আসিলাম। আমরা যখন তাঁহার নিকট পৌঁছিলাম তখন তিনি ফজরের জামা'আতের ইমামতি করিতেছিলেন। প্রভাতের আলোকরেখা সবেমাত্র দেখা দিয়াছে। আকাশে তখনও তারকারাজি চমকাইতেছে। রাত্রির অন্ধকারে লোকজন একে অপরকে তখনও চিনিতে পারিতেছিল না।
আমি পুরুষদের কাতারে দাঁড়াইয়া গেলাম। আমি তখন সবেমাত্র মুসলমান হইয়াছি। আমার নিকটে দাঁড়ানো পুরুষ লোকটি জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি পুরুষ, না মহিলা? আমি বলিলাম, আমি একজন মহিলা। লোকটি বলিলেন, তুমি তো আমাকে ফ্যাসাদে ফেলিয়া দিয়াছিলে হে! তুমি পিছনে গিয়া মহিলাদের সাথে দাঁড়াও।! ঘটনাচক্রে হুজরার পার্শ্বেই মহিলাদের কাতারও শুরু হইয়া গিয়াছিল যাহা আমি প্রবেশকালে লক্ষ্য করিতে পারি নাই। নতুবা আমি ঐখানেই তাহাদের সহিত দাঁড়াইতাম।
সূর্য উদিত হইলে আমি মজলিসের নিটকবর্তী হইলাম। কোন তরতাজা চেহারার গৌরবর্ণ সৌম্যমূর্তির লোক দেখিলেই তিনি রাসূলুল্লাহ্ কিনা এই ভাবিয়া আমি পরম ঔৎসুক্যভরে তাহার দিকে তাকাইতে লাগিলাম।
৪৭২ ততক্ষণে সূর্য বেশ উপরে উঠিয়াছে। এমন সময় এক ব্যক্তি আসিয়া আস্-সালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! বলিতেই তিনি প্রত্যুষে ওয়া আলাযকاس সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকুতুহু বলিয়া জবাব দিলেন। নবী কারীম -এর গায়ে তখন পুরাতন তালিযুক্ত চাদর শোভা পাইতেছিল যাহার জাফরানী রং দূর করা হইয়াছে বলিয়া স্পষ্ট বুঝা যাইতেছিল। তাঁহার নিকটে একটি খেজুর ডালের লাঠি ছিল-যাহার ছাল উঠাইয়া ফেলা হইয়াছে। তিনি হাত-পা গুটাইয়া বসিয়া রহিয়াছিলেন।
তাঁহার এত বিনীত ভঙ্গিতে উপবিষ্ট দেখিয়া আমার অন্তর কাঁপিয়া উঠিল। নিকটে বসা লোকটি বলিয়া উঠিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! এই বেচারী কাঁপিতেছে। আমি তাহার পিছনেই উপবিষ্ট ছিলাম। আমার দিকে না তাকাইয়াই তিনি বলিলেন:
يا مسكينة عليك السكنية.
"হে মিসকীন মহিলা! শান্ত হও” (কাঁপিও না)।
তাঁহার এরূপ বলামাত্র আমার অন্তর হইতে ভয় বিদূরিত হইল। আমি শান্ত হইলাম। আমার সহযাত্রী পুরুষটি অগ্রসর হইয়া তাহার নিজের ও তাহার গোত্রের পক্ষ হইতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হাতে বায়'আত হইলেন। অতঃপর তিনি আরয করিলেন:
يا رسول الله اكتب بيننا وبين بني تميم بالدهناء لا يجاوزنا الينا منهم الا مسافر او مجاور.
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! দাহنا প্রান্তর সম্পর্কে আমাদের ও বনূ তামীমের মধ্যে একটা পত্র লিখিয়া দিন যাহাতে একমাত্র পথচারী এবং প্রতিবেশী ভিন্ন অন্য কেহ ইহাতে আমাদের সাথে ভাগ না বসায়।" সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন:
يا غلام اكتب له بالدهناء.
"হে বালক! তাহার জন্য দাহ্না প্রান্তরটা লিখিয়া দাও।" দাহ্না প্রান্তরটি তাহার নামে লিখিয়া দেওয়া হইতেছে দেখিয়া আমার আর তর সহিল না। কেননা উহা আমার দেশ, আমার পিতৃনিবাস। আশৈশব সেখানেই মানুষ হইয়াছি। আমি প্রতিবাদ করিয়া বলিয়া উঠিলাম:
يا رسول الله انه لم يسئلك السوية من الارض اذا سألك انما هذه الدهناء عندك مقيد الجمل ومرعى الغنم ونساء تميم وابناءها وراء ذلك.
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! দাহ্না প্রান্তর চাহিয়া তিনি কোন ন্যায্য কাজ করেন নাই। এই দাহ্না আপনার নিকট, উট বাঁধিবার ও ছাগল চরাইবার স্থান। বনু তামীমের মহিলা ও বালকরা উহার উপর নির্ভরশীল"।
৪৭৩ তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ
أمسك يا غلام صدقت المسكينة المسلم أخو المسلم يسعهما الماء والشجر ويتعاونان على الفتان.
“হে বালক! থামিয়া যাও, এই মিসকীন মহিলা সত্যই বলিয়াছে। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। পানি ও গাছপালার ব্যাপারে তাহারা একে অপরের সহায়ক ও পরিপূরক হইবে। এইগুলি লইয়া বিবাদ-বিসম্বাদে একে অপরের সহযোতিা করিবে”।
যখন হুরায়ছ লক্ষ্য করিলেন যে, তাহার প্রাপ্তিতে বাধা পড়িয়া গেল, তখন তিনি তাহার এক হাত দ্বারা অপর হাতের উপর আঘাত করিয়া বলিলেন: আমরা দুইজনে এরূপ ছিলাম, যেমন প্রবাদ আছে:
حتفها تحمل ضأن باظلافها. "মেষ তাহার খুরে করিয়া নিজের মৃত্যুকে ডাকিয়া আনিল"। অর্থাৎ খাল কাটিয়া আমি কুমীর আনিয়াছি। আমি তোমাকে লইয়া না আসিলে তোমার এরূপ বাধা দানের সুযোগই ঘটিত না। আমি বলিলাম:
اما والله ان كنت لدليلا في الظلماء جوادا بذى الرحل عيفا عن الرفيقة حتى قدمت على رسول الله صلى الله عليه وسلم ولكن لا تلمني على حظى اذا سألت حظك.
"আল্লাহ্র কসম! অন্ধকার রাত্রিতে তুমি ছিলে আমার পথ প্রদর্শক, পথচারীর প্রতি মহানুভব, সহচারীর প্রতি নির্মোহ পূত চরিত্রের অধিকারী। এইভাবে নবী দরবার পর্যন্ত আমাকে লইয়া আসিয়াছ, তাই বলিয়া আমার প্রাপ্য প্রার্থনার জন্য তুমি আমাকে ভর্ৎসনা করিতে পার না"।
তখন হুরায়ছ বলিয়া উঠিলেন: ওরে পোড়ামুখী! দাহনায় আবার তোর কী প্রাপ্য থাকিতে পারে? তখন আমি বলিলাম : مقيد جملى تسئله لجمل امراتك "উহা আমার উট বাঁধিবার স্থান, তুমি উহা তোমার স্ত্রীর উটের জন্য চাহিয়া বসিয়াছ"। কায়লার এইরূপ প্রশংসাবাক্যে প্রীত হইয়া হুরায়ছ বলিয়া উঠিলেন: আজীবন আমি তোমার ভাইরূপে থাকিব। কায়লা বলিলেন, তুমি যখন উহার সূত্রপাত করিলে আমি উহা চিরদিন বহাল রাখিব।
অতঃপর মহিলাটির নিকট হইতে রাসূলুল্লাহ্ এও জানিতে পারেন যে, তাহার একটি পুত্র সন্তানও ছিল যে রাবায়া যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষে লড়াইও করিয়াছে। তারপর তাহার জন্য খায়বারে শস্য সংগ্রহ করিতে যাইয়া জ্বরাক্রান্ত হইয়া মারা যায়।
এই সময় মহিলাটি ক্রন্দন করেন এবং মেয়ে দুইটিকে রাখিয়া গিয়া সে আমাকে বিষম যন্ত্রণার মধ্যে রাখিয়া গিয়াছে বলিয়া অনুযোগ করেন। রাসূলুল্লাহ্ মহিলাটির এরূপ অনুযোগে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, পূণ্যকাজ করিতে কেহ যন্ত্রণার কারণ হইতে পারে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন:
৪৭৪ والذي نفس محمد بيده إن أحدكم ليبكي فيستعبر إليه صويحبه فيا عباد الله لا تعذبوا إخوانكم.
"মুহাম্মদের প্রাণ যাহার হাতে সেই পবিত্র সত্তার কসম! তোমাদের কোন ব্যক্তি নিজে কাঁদিয়া সাথীকেও কাঁদায়। সুতরাং হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমাদের ভাইদের কষ্টের কারণ হইও না।"
রাসূলুল্লাহ্ একটি লোহিতাভ চর্মগ্রাত্রে কায়লা এবং তাহার কন্যাদ্বয়ের স্বপক্ষে একটি পত্র লিখিয়া দেন যাহাতে তাহাদের প্রতি কোনরূপ অত্যাচার না করিতে, বলপূর্বক তাহাদিগকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে বাধ্য না করিতে এবং মু'মিন মাত্রকেই তাহাদের প্রতি সহানুভূতি সম্মত থাকিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রাবলী অধ্যায়ে উহার পাঠ দেখা যাইতে পারে।
সফিয়্যা ও দুহায়با তাহাদের পিতামহ হারমালা সম্পর্কে বর্ণনা করেন যে, হারমালা বাড়ী হইতে নির্গত হইয়া নবী দরবারে আগমন করেন। কিছুদিন সেখানে বসবাস করিয়া তিনি স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করেন। হারমালা বলেন, আমার ইচ্ছা ছিল, নবী দরবারে থাকিয়া প্রচুর ইলম অর্জন ব্যতীত আমি স্বগোত্রে ফিরিয়া যাইব না। যখন প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলাম, তখন নবী কারীম বলিলেন:
يا حرملة انت المعروف واجتنب المنكر وانظر الذي تحب أذنك إذا قمت من عند القوم أن يقولوه لك فأته والذي تكره أن يقولوه لك إذا قمت من عندهم فاحتبيه.
“হে হারমালা! সৎকর্ম করিবে এবং অসৎকর্ম হইতে বিরত থাকিবে। যখন তুমি কোন সম্প্রদায়ের নিকট হইতে প্রস্থান করিবে, তখন তোমার কান তোমার সম্পর্কে লোকের কী মন্তব্য শুনিতে পসন্দ করে তাহা লক্ষ্য রাখিবে। তুমি তাহাই করিবে। যখন তুমি কোন সম্প্রদায়ের নিকট হইতে প্রস্থান করিবে তখন লক্ষ্য রাখিবে তোমার সম্পর্কে তাহাদের কী মন্তব্য। তোমার অপসন্দ হয়, উহা হইতে তুমি বিরত থাকিবে” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১৭-২১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00