📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাদিক গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন

📄 সাদিক গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন


সাদিপ গোত্রের একদল লোকের বর্ণনা আমাদের তের হইতে উনিশের মধ্যবর্তী সংখ্যার একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ -এর বাসস্থান এবং তাঁহার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করেন। তাঁহারা উটে আরোহণ করিয়া লুঙ্গি ও চাদর গায়ে তাঁহার নিকট গিয়াছিলেন। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ -কে সালাম না দিয়াই মজলিসে বসিয়া পড়িয়াছিলেন। তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন: কী হে! তোমরা কি মুসলমান নও? তাঁহারা বলিলেন: জ্বী, হাঁ। তিনি আবার বলিলেন: তাহা হইলে তোমরা সালাম দিলে না কেন? তখন তাঁহারা দাঁড়াইয়া বলিলেন:
السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته. "আপনার প্রতি সালাম, রহমত ও বরকত নাযিল হউক হে নবী "! জবাবে নবী কারীম বলিলেন: وعلیکم السلام اجلسوا .
"তোমাদের প্রতিও সালাম (শান্তি) বর্ষিত হউক! তোমরা বসিয়া পড়!" তখন তাঁহারা বসিয়া পড়িলেন এবং রাসূলুল্লাহ -কে সালাতের ওয়াজসমূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করিলেন। তিনি তাঁহাদেগকে সেই ব্যাপারে অবহিত করিলেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাখ'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 নাখ'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


না'আ প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
সর্বশেষ যে প্রতিনিধি দলটি নবী কারীম -এর দরবারে উপস্থিত হয় তাহা হইল একাদশ হিজরীর মুহাররম মাসের মাঝামাঝি সময়ে আগত-মাখ'আ গোত্রের প্রতিনিধিদল। উহাতে দুইশত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহারা প্রতিনিধিদলসমূহের জন্য নির্ধারিত মেহমানখানায় অবতরণ করেন। অতঃপর ইসলামের স্বীকারোক্তিকারী রূপে নষী দরবারে উপস্থিত হন। কেননা ইতোপূর্বেই তাঁহারা মু'আয ইবন জাবালের হাতে বায়'আতের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন।
তাঁহাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি যুরারা ইব্‌ন আমর বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ? আমি এই সফরে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিয়াছি। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন: কী দেখিলে? তিনি
৪৫৮ বলিলেন: আমি একটি গর্দভী বাড়ীতে রাখিয়া আসিয়াছি। দেখিলাম সে একটি লোহিতাভ ও সবুজাভ কাল বর্ণের ছাগল ছানা প্রসব করিয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: তুমি কি বাড়ি হইতে আসার সময় কোন প্রসবাসন্না বাঁদী রাখিয়া আসিয়াছ? তিনি বলিলেন, জ্বী হাঁ। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সে তোমার একটি পুত্র সন্তান প্রসব করিয়াছে। তখন তিনি বলিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহার লোহিতাভ কাল হওয়ার ব্যাপারটি কী? বলিলেন: তুমি আমার নিকটে আইস। নিকটে আসিলে তিনি বলিলেন: তোমার কি শ্বেতকুষ্ঠ রহিয়াছে যাহা তুমি গোপন করিয়া আসিতেছ?
যুরারা বলিয়া উঠিলেন: আপনাকে যে পবিত্র সত্তা নবীরূপে প্রেরণ করিয়াছেন তাঁহার কসম! আপনি ছাড়া এই পৃথিবীর একটি প্রাণীকেও তাহা অবগত করি নাই। বলিলেন: ইহাই হইতেছে উহার কারণ (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৪২৩-২৪)।
যুরারা বলিলেন: নু'মান ইব্‌ন মুনযিরকে দেখিলাম, তিনি কানে দুল, বাহুতে বাযুবন্দ এবং হাতে কঙ্কন পরিয়া থাকেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: তিনি ছিলেন একজন আরব নৃপতি, উত্তম পোশাক ও সাজসজ্জায় সজ্জিত হইয়া দাপটে রাজ ক্ষমতায় পুনঃ অধিষ্ঠিত হইয়াছেন।
অতঃপর যুরারা আবার বলিলেন: আমি স্বপ্নে একটি বৃদ্ধাকে দেখিলাম যাহার শ্বেত শুভ্র চুলের মধ্যে কিছু কিছু কাল চুলেরও সংমিশ্রণ রহিয়াছে। সে মাটি ফুড়িয়া বাহির হইয়া আসিল। তাঁহার শ্বেত শুভ্র চুলরাশির মধ্যে কিছু কিছু কাল চুলেরও সংমিশ্রণ ছিল।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন: উহা হইতেছে দুনিয়ার অবশিষ্ট দিনগুলি। অতঃপর যুরারাহ্ বলিলেন: যমীন হইতে একটি অগ্নিশলাকা নির্গত হইয়া আমার ও আমার পুত্র আমরের মধ্যে অন্তরায় হইয়া গেল। সেই অগ্নিশলাকা ডাকিয়া ডাকিয়া বলিতেছিল: আমি আগুন! আমি আগুন! আমাকে চক্ষুষ্মান ও চক্ষুহীন শন্ধ-খাইতে দাও! আমি তোমাদিগকে গ্রাস করিব। তোমাদের পরিবার পরিজন ও ধন-সম্পদকে গ্রাস করিব!
রাসূলুল্লাহ উহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বলিলেন: ইহা একটি ফিৎনার ইঙ্গিত যাহা আখেরী যামানায় সংঘটিত হইবে।
যুরারাহ্ জিজ্ঞাসা করিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ ফিৎনাটি কী?
জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন: লোকজন তাহাদের খলীফাকে হত্যা করিবে। বড় বড় লোক সেই ফিৎনায় জড়াইয়া পড়িবে। এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহার হাতের আঙ্গুলগুলিকে অপর হাতের আঙ্গুলগুলির মধ্যে ঢুকাইয়া দিলেন।
তখন একজন মু'মিনের কাছে অন্য মু'মিনের রক্ত ঠাণ্ডা পানির চাইতেও অধিক লোভনীয় মনে হইবে। তোমার পুত্রের যদি আগে মৃত্যু ঘটে তবে তুমি তাহা দেখিতে পাইবে, আর যদি তুমি আগে মৃত্যুমুখে পতিত হও তাহা হইলে সে তাহা দেখিতে পাইবে।
এই কথা শ্রবণে যুরারা বলিয়া উঠিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্, দু'আ করুন, আমি যেন এই ফিৎনার যুগটা না পাই। রাসূলুল্লাহ্, দু'আ করিলেন: اللهم لا يدركها "হে আল্লাহ্! সে যেন এই ফিৎনা না পায়" সত্যসত্যই তিনি ইন্তেকাল করেন এবং তাঁহার পুত্র আমর বাঁচিয়া ছিল এবং সে হযরত উছমান (রা)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৪২৩-২৪)।
৪৫৯ এক রিওয়ায়াতে আছে যে, নাখ'আ গোত্রের লোকজন প্রথম তাহাদের কেবল দুই ব্যক্তিকে তাহাদের প্রতিনিধিরূপে প্রেরণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিতি হইয়াই তাহারা তাহাদের গোটা সম্প্রদায়ের পক্ষ হইতে তাঁহার নিকট বায়'আত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁহাদের দুইজনের একজন ছিলেন আরতাত ইন্ন শারাহীল যিনি বনূ বকরের সদস্য ছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৩ তা. বি)।
বনু নাখ'আর উক্ত সুবেশধারী লোকের ইসলাম গ্রহণের যায় তাহাদের এই ছিমছাম বেশভূষার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের পশ্চাতে থাকা তোমাদের গোত্রের সকলেই কি তোমদেরই মত?
তাঁহারা জবাব দিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা আমাদের সম্প্রদায়ের যে সত্তর জন লোককে পিছনে রাখিয়া আসিয়াছি তাঁহাদের প্রত্যেকেই আমাদের চাইতে উত্তম এবং ক্ষমতাবান। তাঁহারা যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি তাঁহাদের দুই জনের জন্য এবং তাঁহাদের সম্প্রদায়ের জন্য দু'আ করিলেন:
اللهم بارك في النخع. “হে আল্লাহ্! না'আ গোষ্ঠীকে তুমি বরকত দান কর।"
তিনি হযরত আরতাত (রা)-এর হাতে তাঁহাদের সম্প্রদায়ের জন্য একটি পতাকা তুলিয়া দেন। মক্কা বিজয়ের দিন এই পতাকা তাঁহার হাতে ছিল। ঐ পতাকা হাতে তিনি কাদেসিয়ার যুদ্ধেও যোগদান করেন এবং ঐ দিনই শাহাদত বরণ করেন। আল্লাহ্ তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হউন! এখানে প্রশ্ন উঠিতে পারে, যেখানে নাখ'আ প্রতিনিধি দল ১১ হিজরীতে নবী দরবারে আসার কথা পূর্বে বলা হইয়াছে, অথচ মক্কা বিজয় উহার তিন বৎসর পূর্বের অষ্টম হিজরীর কথা। তখন ঐ পতাকা তাঁহার হাতে আসিল কী করিয়া? উহার জবাব হইল, ঐ দুই ব্যক্তির প্রতিনিধি দলটি মক্কা বিজয়ের পূর্বেই নবী দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। তখন তাঁহাদের নিকট ঐ পতাকা দেওয়া হয়। ১৯ হিজরীতে আগত প্রতিনিধি দলে দুইশত সদস্য ছিলেন। অতএব তাঁহাদের প্রতিনিধি দল যারা নবী দরবারে আসিয়া ছিল।
ইবন সা'د নাখা প্রতিনিধি দলের বর্ণনার পর হিশাম ইবন মুহাম্মাদের বরাতে বলেন: যুরারা ইন কায়সের কি ছিলেন হারিছ এবং তাঁহার প্রপিতামহের নাম ছিল আদা তিনি খ্রিষ্টান ছিলেন (তাবাকা, খ, ১, পৃ. ৩৪৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ হারব ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ আল-উকায়লীর নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 আবূ হারব ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ আল-উকায়লীর নবী (সা) দরবারে আগমন


আবূ হারب ইব্‌ن খুওয়ায়লিদ আল-উকায়লীর নবী দরবারে আগমন
আবূ হারب খুওয়ায়লিদ ইব্‌ن আমির ইবন 'উকায়ل রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আগমন করিলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে কুরআন পাঠ করিয়া শুনাইলেন। তিনি তাঁহার নিকট ইসলামের দা'ওয়াত পেশ করিলেন। জবাবে আগন্তুক বলিলেন: নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ্র সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হইয়াছেন অথবা আল্লাহর সহিত সাক্ষাৎপ্রাপ্ত জনের সাক্ষাৎ আপনি লাভ করিয়াছেন। নিঃসন্দেহে আপনি যাহা বলেন এরূপ উত্তম বাণী আমাদের জানা নাই। তবে আমি আপনি যে দীনের দাওয়াত দিতেছেন আর আমি যে ধর্মে আছি, উভয়টার মধ্যে তীর-এর মাধ্যমে উত্তমটি লটারী করিয়া নির্ণয় করিব। সেই মতে তিনি তীর ঘুরাইয়া একাধিকবার তাঁহার স্বধর্মের বিরুদ্ধে রায় পাইলেন এবং বলিলেন: আমার তীর তো আপনার ধর্মের স্বপক্ষেই রায় দিল।
৪৬০ এই রূপ কথাবার্তার পর তিনি তদীয় ভ্রাতা 'ইকাল ইব্‌ن খুওয়ায়লিদের কাছে গেলেন এবং তাহাকে বলিলেন: قل خيسك هل لك في محمد بن عبد الله يدعوا الى دين الاسلام ويقرأ القرآن وقد اعطاني عقيق ان انا اسلمت ؟
তখন 'ইকাল তাহাকে বলিলেন: انا والله اخطك اكثر مما يخطك محمد "আল্লাহ্র কসম! আমি তোমকে মুহাম্মদের চেয়ে বেশী ভূমি বরাদ্দ দিব"। তারপর আবূ হারب তাহার অশ্বের পিঠে চাপিয়া আকীকের নিম্ন এলাকায় গিয়া উপস্থিত হইলেন এবং ঝর্ণাসহ উহার নিম্নাঞ্চল নিজ দখলে লইয়া লইলেন।
তার পর ইকাল নিজে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট উপস্থিত হইলেন রাসূলুল্লাহ্, (স) তাঁহাকেও ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাহাকে বলিলেন: أتشهد أن محمدا رسول الله ؟
"তুমি কি এই মর্মে সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল"? সে বলিতে শুরু করিল: أشهد أن هبيرة بن النفاضة نعم الفارس يوم قرني لبان.
"আমি সাক্ষ্য দেই যে, হুরায়রা ইবন নুফাদা কী উত্তম ঘোড়সওয়ার লাবান পর্বত শৃঙ্গদ্বয়ের (যুদ্ধের) দিনে"।
রাসূলুল্লাহ্, পুনরায় বলিলেন: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল? সে বলিলঃ "নির্ভেজাল দুধ বা শরাব ফেনার নীচে হইয়া থাকে।" তৃতীয় বার রাসূলুল্লাহ্ যখন পুনরায় ঐরূপ প্রশ্ন করিলেন, তখন সে বলিয়া উঠিল: اشهد ان محمدا رسول الله
"আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল।" এইভাবে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রাবী বলেন: ইব্‌ন নুফাদা হুবায়রা ইন্ন মু'আবিয়া ইবন উবাদা ইবন 'উকায়ل। আর মু'আবিয়া ছিলেন হারির নামক বিখ্যাত ঘোড়ার আরোহী। লাবান স্থানের নাম। বর্ণনাকারিগণ বলেন: ঐ বংশের হুসায়ন (حصین) ইবনুল মু'আল্লা ইন্ন রবী'আ ইন্ন 'উকায়ل এবং যুল-জাওশান আদ্‌-দাবরীও নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গহণ করেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩৮৪-৮৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনু সুলায়মান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন

📄 বনু সুলায়মান প্রতিনিধি দলের নবী (সা) দরবারে আগমন


বনূ সুলায়ম প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
বনূ সুলায়ম গোত্র নজদে বসবাস করিত। তাহাদের কোন কোন শাখা খায়বরের নিকট পর্যন্ত উপস্থিত হইয়া তাঁহার বাণী শ্রবণ করে। কায়স ইবন নুসায়বা নামক বনূ সুলায়ম গোত্রের এক ব্যক্তি নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার বাণী শ্রবণ করেন। তিনি কয়েকটি ব্যাপারে প্রশ্ন করেন।
রাসূলুল্লাহ্ যথারীতি তাঁহার প্রশ্নসমূহের জবাব দেন। তিনি সেইগুলি মুখস্ত করেন এবং তাঁহার অন্তরে গাঁথিয়া লন।
রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি অতঃপর তাঁহার স্বগোত্র বনূ সুলায়ম প্রত্যাবর্তন করিয়া তাঁহার গোত্রের লোকজনকে বলেন: قد سمعت ترجمة الروم وهينمة فارس وأشعار العرب وكهانة الكاهن وكلام مقاول حمير فما يشبه كلام محمد شيئا من كلامهم فأطيعوني خذوا بنصيبكم منه.
"রোমকদের বীরগাথা, পারসিক উপকথা, আরবের কবিতা, জ্যোতিষীদের উপভোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী, হিময়ারী বক্তাদের চটকদার বক্তৃতা শুনিবার সুযোগ আমার ঘটিয়াছে, কিন্তু ঐগুলির কোনটিই মুহাম্মাদ-এর বাণীর সহিত সামাঞ্জস্যপূর্ণ নহে। তাঁহার বাণীর সহিত ঐগুলির কোন তুলনাই হয় না। সুতরাং তোমরা আমার কথা শোন! তোমরা ঐ ব্যক্তির আনুগত্য অবলম্বন কর এবং নিজেদের সৌভাগ্যের অংশ তাঁহার নিকট হইতে বুঝিয়া লও”।
মক্কা বিজয়ের বৎসরে বনূ সুলায়ম গোত্র নবী কারীম-এর উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়ে। কুদায়د নামক স্থানে (ঐ স্থানটি মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত) তাঁহারা তাঁহার সাক্ষাৎ লাভ করেন। সংখ্যায় তাঁহারা ছিলেন সাতশত, মতান্তরে এক হাজার; আবার কেহ বলেন নয়শত ছিল। আব্বাস ইব্‌ن মিরদাস, আনাস ইব্‌ন আব্বাস ইবন ইয়াদ, রাশিদ ইব্‌ন আব্দ রাব্বিহী প্রমুখ এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং এই মর্মে আবেদন জানান যে, তাঁহাদিগকে যেন অগ্রগামী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়, আমাদের ঝাণ্ডা যেন লোহিত বর্ণের হয় এবং আমাদের সাংকেতিক প্রতীকী শব্দ যেন 'মুকাদ্দম' (অগ্রবর্তী বাহিনী) হয়।
তাহারা মক্কা বিজয়ে এবং হুনায়নেও তাঁহার সঙ্গী হন। রাসূলুল্লাহ্ রাশিد ইবন 'আবদে রাব্বীকে মক্কা হইতে তিন মাইল দূরবর্তী রুহাত নামক স্থানটি বরাদ্দ দান করেন। সেখানে 'আয়নুর-রাসূল (রাসূল প্রস্রবণ) নামক একটি ঝর্ণা ছিল।
রাশিد বনূ সুলায়م গোত্রের মূর্তি মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন। একদা দুইটি শৃগালকে মূর্তি পাত্রে পেশাব করিতে দেখিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন: أرب يبول الثعلبان برأسه - لقد ذل من بالت عليه الثعالب.
"শিরে যার দুই শিয়ালে মুত্র ত্যাগ করে এহেন হীন মূর্তি দেবতা কী প্রকারে"?
তিনি ঐ দেব মূর্তির উপর আক্রমণ চালাইলেন এবং দেখিতে দেখিতে উহাকে চুরমার করিয়া দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহার নাম কী জিজ্ঞাসা করেন। জবাবে তিনি বলেন, غاوى بن عبد العزى (গাবা ইব্‌ন আবদুল উয্যা) যাহার অর্থ দাঁড়ায় উয্যা মূর্তির গোলামের পুত্র বিভ্রান্ত।
রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: أنت راشد بن عبد ربه "তুমি রাশেد ইب্‌ন 'আবد রাব্বিহি তাহার প্রভুর গোলামের পুত্র সুপথ প্রাপ্ত।" তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সারা জীবন অত্যন্ত
৪৬২ নিষ্ঠার সহিত ইসলামের অনুশাসন মানিয়া চলেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে তাঁহার গোত্রের নেতা মনোনীত করিয়া তাঁহার জন্য পতাকা বাঁধিয়াছেন। তিনি মক্কা বিজয় কালে রাসূলুল্লাহ্ -এর একজন সঙ্গী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহারা প্রশংসা করেন :
خیر قرى عربية خيبر وخیر بی سلیم راشد. "সর্বোত্তম পল্লী খায়বর পল্লী এবং বনূ সুলায়মের সর্বোত্তম ব্যক্তি রাশেد" (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩৪৬-৪৭; তাবাকাত ১খ., পৃ. ৩০৭-৯)।
উক্ত বনূ সুলায়মের জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, আমাদের স্বগোত্রের কিদর ইবন 'আম্মার নামক এক ব্যক্তি প্রতিনিধিরূপে মদীনায় রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপনীত হন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁহার গোত্রের এক হাজার অশ্বারোহীকে নবী দরবারে লইয়া আসিবেন বলিয়া অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। মতান্তরে ঐ ব্যক্তির নাম ছিল কুদাদ ইব্‌ন আম্মার (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ ৬খ., পৃ. ৩৪৬)।
অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহাদিগকে এই সংবাদ অবগত করিলে নয়শত জন অশ্বারোহী তাঁহার সহিত নবী দরবারের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়েন। গোত্রের প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষার্থে ১০০ জন গোত্রেই রহিয়া যান। পথে কিদরের মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁহার দলের 'আব্বাস ইবন মিরদাস, জাব্বার ইনুল হাকাম এবং আখনাস ইবন ইয়াযীদ এই তিন ব্যক্তির নেতৃত্বের ভার দিয়া ঐ নয় শত ব্যক্তিকে তিনভাগে বিভক্ত করিয়া দেন এবং তাহদিগকে বলেনঃ
ائتوا هذا الرجل حتى تقضوا العهد الذي في عنقى. "তোমরা ঐ ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হইয়া আমার প্রতিশ্রুতির দায় হইতে তাহাকে মুক্ত করিবে।"
ইহার কিছুকাল পরেই তাঁহার মৃত্যু ঘটে। নেতার উপদেশ অনুসারে তাঁহারা মদীনায় নবী দরবারে গিয়া উপস্থিত হন। তিনি তখন তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন :
أين الرجل الحسن الوجه الطويل اللسان الصادق الإيمان. "তোমাদের ঐ সৌম্য চেহারা, দীর্ঘ রসনা ও সনিষ্ঠ ঈমানের অধিকারী ব্যক্তিটি কোথায়"? তাঁহারা জবাব দিলেন :
يا رسول الله دعاه الله فأجابه. "ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছেন; তাই তিনি তাঁহার ডাকে সাড়া দিয়া ইহধাম ত্যাগ করিয়াছেন।" রাসূলুল্লাহ্ তখন আবার জিজ্ঞাসা করিলেন :
أين تكملة الألف الذين عاهدني عليهم. "এক হাজারের বাকী এক শতজন কোথায় যাহার প্রতিশ্রুতি ঐ ব্যক্তি আমাকে দিয়াছিলেন"? তাঁহারা জবাব দিলেন :
৪৬৩ قد خلف مائة بالحي مخافة حرب كان بيننا وبين بني كنانة.
"তাহারা গোত্রে রহিয়া গিয়াছেন আমাদের ও বনূ কানানার মধ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে, তাহাদের আক্রমণের ভয়ে"।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
ابعثوا إليها فإنه لا يأتيكم فى عامكم هذا شيء تكرهونه.
"উহাদেরকেও আমার নিকট পাঠাইয়া দাও! কেননা এই বৎসর তোমাদের অবাঞ্ছিত কিছু ঘটিবে না।"
সেই মতে তাহারা স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করিয়া যথারীতি তাহাদিগকে নবী দরবারে প্রেরণ করিলেন। হুড় হুড় করিয়া তাহারা যখন মদীনায় আসিয়া পৌঁছিলেন তখন তাঁহাদের ঘোড়াসমূহের হেষাধ্বনি শ্রবণে মদীনাবাসিগণ আতঙ্কিত হইয়া বলিয়া উঠিলেন : يا رسول الله أتينا "ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমাদের উপর তো হামলা আসিয়া পড়িল"। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদিগকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন:
لا بل لكم لا عليكم هذه سليم بن منصور قد جاءت.
"না, বরং তোমাদের পক্ষে সুলায়م ইন্ন মনসূর বাহিনী আগমন করিয়াছে, উহারা তোমাদের বিরুদ্ধে আসে নাই।"
এই বাহিনীর নেতা ছিলেন মুনাক্কي' ইبن মালিক ইبن উমাইয়া ইবন আবদুল উম্বা ইন্ন 'আমাল ইব্‌ن কা'ব ইব্‌دول হারিছ ইব্‌ن বুহ্ছাহ্ ইبّن সুলায়ম। বলা বাহুল্য, তাঁহারা সকলেই নবী কারীম-এর হাতে বায়'আত হন। মক্কা বিজয় ও হুনায়নের যুদ্ধে তাঁহারা সকলেই নবী কারীম-এর সঙ্গীরূপে যুদ্ধ করেন। মুনাক্কি' সম্পর্কে সেনাপতি আব্বাস ইব্‌ن মিরদাস কবিতার ছন্দে বলেন:
القائد المائة التي وفي بها تسع المئين فم ألف اقرع.
"তিনি হইতেছেন সেই এক শত জনের বাহিনীর সিপাহসালার নয়শতের পর যাহাদের মাধ্যমে সহস্র সংখ্যা পূরণ হইয়াছিল" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩০৭-৯; সুবুলহুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩৪৬-৪৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00