📄 জুযাম প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
জুযাম প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
ইবন সা'দ (র) তাঁহার নিজস্ব সনদে এবং তাবারানী 'উমায়র ইবন যাবাদ আল-জুযামীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, রিকা'আ ইব্ন যায়দ ইব্ন উযায়র ইব্ন মা'বাদ আল-জুযামী, উপরন্তু বনূ দুবায়বের ও একজন খায়বরের পূর্বেকার শান্তিপূর্ণ সময়ে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট প্রতিনিধি- রূপে আগমন করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ-কে উপঢৌকনস্বরূপ একটি গোলাম দান করেন এবং নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর এই মর্মে তাঁহাকে একটি পত্র লিখিয়া দেন যে, তিনিই তাঁহাকে তাঁহার স্বগোত্রের লোকজনকে ইসলাম গ্রহণ সাপেক্ষে পূর্ণ অভয় দানের জন্য এবং ইহাতে অনীহাগ্রস্তদিগকে দুই মাসের অবকাশ দেওয়ার জন্য পাঠাইয়াছেন। পত্রের পাঠ রাসূলুল্লাহ-এর পত্রাবলীর আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যাইতে পারে।
রিকা'আ ইবন যায়د আল-জুযামী স্ব-সম্প্রদায়ে ফিরিয়া যখন উক্ত বক্তব্য প্রচার করিলেন তখন উহার আশ্চর্য ফল ফলিল। গোত্রের সকলেই একবাক্যে ইসলাম গ্রহণ করিল।
তাবারানী বর্ধিত বর্ণনায় বলেন, তারপর রিকা'আ হারাতুর রাজলাআ নামক পাথুরে এলাকায় আসিয়া উপনীত হন। তিনি সেখানে অবস্থানরত থাকা অবস্থায়ই রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ-এর দূত দিয়া কালবী সেখানে আগমন করেন। তিনি যখন ঐ অঞ্চলের শানার প্রান্তরে উপনীত হন তখন তাঁহার সহিত কিছু বাণিজ্যিক প্রাণও ছিল। তখন দুলাইয়া গোত্রের হুনায়দ ইবন উস এবং তাহার পুত্র উস ইবনুল হুনায়د তাঁহার যথাসর্বস্ব লুট করিয়া লইয়া যায়। দুলাইয়া হইতেছে বনূ জুযামেরই একটি শাখাগোত্রে। এই সংবাদ যখন রিকা'আ এবং পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী তাঁহার গোত্রের নিকট পৌছিল তখন তাহারা উক্ত লুণ্ঠনকারীদের নিকট যায়। নু'মান ইব্ن আবূ জি'আল নামক যুবায়র বংশীয় এক ব্যক্তি তখন ঐ লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে ছিল। রিকা'আ ও তাঁহার বাহিনী ঐ স্থান পৌছিলে তাহাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়।
কুরা ইব্ن আঙ্কার আয-যুলাঈ নামক এক ব্যক্তি উপরিউক্ত নু'মানকে লক্ষ্য করিয়া তীর নিক্ষেপ করিলে উহা তাহার হাটুতে লাগে। ঐ তীর বিদ্ধ হওয়ার সময় সে বলে: লও, আর আমি হইতেছি লুবনার পুত্র। হাসান ইন্ন মিল্লাহ আয-যুবায়বী ইতোপূর্বে দিয়া কালবীর সাহচর্য লাভ করিয়াছিল। তিনি তাহাকে উম্মুল কুরআন তথা সূরা ফাতিহা শিক্ষা দিলেন।
রিকা'আ ও তাঁহার সঙ্গিগণ লুণ্ঠিত সমস্ত মাল তাহাদের নিকট হইতে উদ্ধার করিয়া দিয়া কালবীর হস্তে অর্পণ করেন। দিয়া ইन्न খালীক আল-কালবী (র) রাসূলুল্লাহ-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে পূর্ণ বৃত্তান্ত অবগত করিলেন এবং হুনায়د ও তাহার পুত্র উসের কু-কর্মের জন্য তাহাদের শাস্তির দাবী জানাইলেন। সে মতে রাসূলুল্লাহ যায়দ ইবন হারিছাকে একটি বাহিনীসহ উহাদের দমনের জন্য প্রেরণ করেন (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ৩৫৪-৩৫৫; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩০৭-৮)।
📄 বাজীলা গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন
বাজীলা গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন
ইবন সা'দ (র) আবদুল হামীদ ইব্ن জাফার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, জারীর ইব্ن আবদুল্লাহ বাজালী দশম হিজরীতে নবী কারীম-এর দরবারে মদীনায় আগমন করেন। তাঁহার সঙ্গে তাঁহার দেড়শত সাথী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে আগমনের পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন:
يطلع عليكم من هذا الفج من خير ذى يمن على وجهه مسحة ملك. "এই প্রশস্ত রাজপথে এমন এক বরকতময় চেহারার ব্যক্তিকে তোমরা উদিত হইতে দেখিবে যাহার ললাটে রাজটীকা অঙ্কিত থাকিবে।”
এমন সময় জারীরকে বাহনপৃষ্ঠে সওয়ার অবস্থায় আসিতে দেখা গেল। সঙ্গে তাঁহার গোত্রের লোকজন। তাঁহারা সকলে ইসলাম দীক্ষিত হইলেন এবং বায়াত গ্রহণ করিলেন। জারীর ইبن আবদুল্লাহ বাজালী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁহার পবিত্র হস্ত প্রসারিত করিলেন এবং আমাকে বায়'আত করিলেন এই বলিয়া:
على ان تشهد ان لا اله الا الله وانى رسول الله وتقيم الصلوة وتؤتي الزكاة وتصوم رمضان وتنصح المسلم وتطيع الولى وان كان عبدا حبشيا. "তুমি সাক্ষ্য দিবে এইমর্মে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই এবং এই মর্মে যে, আমি আল্লাহ্র রাসূল, সালাত কায়েম করিবে, যাকাত দিবে, রমযান মাসের রোষা রাখিবে, মুসলমানের মঙ্গল কামনা করিবে এবং শাসকের আনুগত্য করিবে যদি সে কাফ্রী গোলামও হয়"।
তিনি তখন বলেন: হাঁ এবং বায়'আত গ্রহণ করেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৭)। জারীর ইব্ن আবদুল্লাহ্ (রা) কারওয়া ইব্ن আযর আল-বায়াবীর নিকট উঠিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে তাঁহার দেশের ও সম্প্রদায়ের লোকদের অবস্থা কী জিজ্ঞাসা করেন। তিনি জবাব দেন:
৪৫৫ يا رسول الله قد اظهر الله الاسلام واظهر الاذان في مساجدهم وساحتهم وهدمت القبائل اصنامها التي كانت تعبد.
“ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ তা'আলা তাঁহার দীন ইসলামকে জয়যুক্ত করিয়াছেন এবং তাহাদের মসজিদে ও প্রাঙ্গণসমূহে এখন আযানের জয়জয়কার চলিতেছে। গোত্রগুলি তাহাদের দেবমূর্তি- সমূহকে ভাঙ্গিয়া চুরমার করিয়া ফেলিয়াছে যেগুলির এতকাল পূজা হইত”। রাসূলুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিলেন : فما فعل ذو الخلصة "যুল-খালাসা মূর্তির কী হইল"?
জবাবে জারীর ইব্ن আবদুল্লাহ বাজালী (রা) বলিলেন, উহা পূর্বাবস্থায়ই আছে। শীঘ্রই আল্লাহ্ উহার উৎপাত হইতেও শান্তি দান করিবেন ইনশা আল্লাহ্। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকেই উহা ধ্বংশের জন্য প্রেরণ করিলেন এবং নিজহাতে পতাকা বাঁধিয়া দিলেন। এই সময় তিনি আহ্বান করিলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অশ্বপৃষ্ঠে স্থির হইয়া থাকিতে পারি না (অসুবিধা হয়) তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহার বুকে হাত বুলাইয়া বলিলেন: اللهم اجعله هاديا مهديا.
“হে আল্লাহ্! তুমি তাহাকে হিদায়াতকারী ও হিদায়াতপ্রাপ্ত কর”! তখন তিনি তাঁহার গোত্রের লোকজনসহ রওয়ানা হইয়া পড়িলেন। তাঁহাদের সংখ্যা ছিল দুইশত। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁহারা ফিরিয়া আসিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) জিজ্ঞাসা করিলেন: ধ্বংসপর্ব সমাপ্ত করিয়াছ তো? তিনি জবাব দিলেন : জ্বী হুঁ! যে পবিত্র সত্তা আপানাকে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করিয়াছেন আমরা উহার সবকিছু লইয়া আসিয়াছি এবং অগ্নি সংযোগে উহা ভস্মীভূত করিয়া দিয়াছি। যাঁহারা উহাকে ভালবাসিত তাহাদের মনোকষ্ট হইয়া থাকিবে, কিন্তু কেহ আমাদিগকে বাধা দেয় নাই। তখন রাসূলুল্লাহ (س) আহমাসীদের অশ্বারোহী ও পদাতিকদের জন্য বরকতের দু'আ করিলেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৭-৮)।
ইবন সা'দ যে শিরোনামের অধীনে 'যুল-খালাসা' মূর্তি ধ্বংশের বর্ণনা দিয়াছেন তাহাতে উহা বাযীলা গোত্রের কৃতিত্ব ছিল বলিয়া ধারণা করা হয়, কিন্তু শেষ বাক্যে রাসূলুল্লাহ যাহাদের জন্য দু'আ করিলেন বলিয়া বলা হইল, তাহাতে প্রতীয়মান হয় ঐ কাজটি সম্পাদন করিয়াছিলেন আহমাসীগণই। কিন্তু ইমাম মুহাম্মদ ইব্ن ইউসুফ আস-সালিহী শামী তদীয় সুবুলুল হুদা কিতাবে আহ্মাসী প্রতিনিধিদলের আগমন সংক্রান্ত স্বতন্ত্র শিরোনাম ব্যবহার করিলেও তাহাতে আত্মাসী প্রতিনিধিদলের এই কৃতিত্বের কোন উল্লেখ নাই। জারীর ইবন আবদুল্লাহ আল-বাজালীর আগমনের ঘটনায়ও তিনি এই ব্যাপারে নিশ্চুপ (সুবুলল হুদা, তৃতীয় অধ্যায়, আহমাসী প্রতিনিধিদলের নবী দরবারে আগমন, ৬খ., পৃ. ২৬; ঐ, ২৮ তম অধ্যায়, জারীর ইবন আবদুল্লাহ বাজালীর আগমন, পৃ. ৩১১)। আসলে বাজালী ও আত্মাসীগণের একই সময়ে নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিতির কারণটি এইরূপ তালগোল পাকাইয়া গিয়াছে। তবে বাজীলা গোত্রের নবীদের পরে আগমন সম্পর্কে সুবুলুল হুদার বর্ণনা হইতে আমরা আরও বিশদ তথ্য জানিতে পারি। বর্ণিত সেই তথ্যগুলি এইরূপ :
৪৫৬ তাবারানী, বায়হাকী ও ইবন সা'দ (র) জারীর ইব্ن আবদুল্লাহ আল-বাজালীকে এর প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ আমার নিকট লোক প্রেরণ করেন। আমি তাঁহার দরবারে আসি তিনি আমার আগমনের হেতু কী জিজ্ঞাসা করিলে আমি বলিলাম, جئت لأسلم "আমি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্য আসিয়াছি"। তিনি তাঁহার চাদরখানি (কসাঅ ) আমার দিকে ছুঁড়িয়া মারিয়া বলিলেন: اذا اتاكم كريم قوم فأكرموه
"তোমাদের নিকট যখন কোন বংশের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আগমন করেন তখন তোমরা তাহাকে সম্মান করিবে।" রাসূলুল্লাহ তখন আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: ادعوك الى شهادة الا اله الا الله اني رسول الله وان تؤمن بالله واليوم الآخر والقدر خيره وشره وتصلى الصلاة المكتوبة وتؤدى الزكوة المفروضة وتصوم شهر رمضان وتنصح لكل مسلم وتطيع الولى وان كان عبدا حبشيا.
তাবাকাতের উদ্ধৃতিতে পূর্ব বর্ণিত এই হাদীছের মধ্যে এখানে অতিরিক্ত আরও দুইটি কথা বলা যাইতেছে: রাসূলুল্লাহ তাঁহার আখিরাত এবং তাকদীরের ভাল-মন্দ যে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে নির্ধারিত তাহাও বিশ্বাস করিতে উপদেশ দিলেন (সুবুলুল হুদা, ৬খ., পৃ. ৩১১)।
ইমাম আহমাদ বায়হাকী এবং তাবারানী বিশ্বস্ত রাবীদের প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন, জারীর ইন আবদুল্লাহ বাজালী (রা) বলেন: لما دنوت من مدينة انخت راحلتى وحللت عيبتي ولبست حلى ودخلت المسجد والنبي يخطب فسلمت على رسول الله رماني الندس بالحدق فقلت لجليسي يا عبد الله هل ذكر رسول الله عن امرى شيئا قال نعم ذكرك با حسن الذكر.
"আমি যখন মদীনার নিকটবর্তী হইলাম, তখন আমার থলে খুলিয়া দামী বস্তুকে পরিধান করিলাম, তারপর মসজিদ প্রবেশ করিলাম। নবী কারীম তখন খুৎবা দিতেছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহকে সালাম দিলাম। লোকজন তখন আমার দিকে জানার উদ্দেশ্যে তাকাইতেছিল। আমি আমার নিকটে বসা লোককে জিজ্ঞাসা করিলাম, আল্লাহর বান্দা! রাসূলুল্লাহ কি আমার কথা কিছু বলিয়াছেন'? সেই ব্যক্তি বলিল, হাঁ, খুৰ উত্তম বাক্যে তোমার কথা উল্লেখ করিয়াছেন"।
তখন সকলেই আকাঙ্ক্ষা করিতেছিল যেন উক্ত প্রশংসিত আগন্তুক তাহারই পরিবারের বা বংশের লোক হয়। এমন সময় একজন অশ্বারোহী আগমন করিল।
রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে তাঁহায় নিজের পাশে বসাইলেন। তাঁহার মাথা হইতে শুরু করিয়া চেহারা বুক ও পেট পর্যন্ত তিনি পবিত্র হস্ত বুলাইলেন। বর্ণনার শেষ বাক্যে রাবী বলেন:
৪৫৭ حتى انحنى جرير حياء ان يدخل يده تحت ازاره وهو يدعوا بالبركة ولذريته ثم مسح رأسه وظهره وهو يدعو له ثم بسط له عرض ردائه وقال له على هذا يا جرير فاقعد فقعد معهم مليا ثم قام وانصرف.
"এমনকি জারীর লজ্জায় এই ভাবিয়া মাথা নত করিয়া দিলেন যে, তিনি তাহার লুঙ্গির ভিতরে না তাঁহার পবিত্র হস্ত ঢুকাইয়া দেন। তিনি (রাসূলুল্লাহ) তখন তাহার জন্য দু'আ করিতেছিলেন। তারপর তাহার জন্য নিজের পবিত্র চাদরের আঁচল বিছাইয়া দিয়া তাঁহাকে বসিতে বলিলেন। অতঃপর উঠিয়া প্রস্থান করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমাদের নিকট কোন সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তি আসিলে তোমরা তাহাকে সম্মান করিবে" (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ ৬খ., পৃ. ৩১১)।
📄 সাদিক গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন
সাদিপ গোত্রের একদল লোকের বর্ণনা আমাদের তের হইতে উনিশের মধ্যবর্তী সংখ্যার একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ -এর বাসস্থান এবং তাঁহার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করেন। তাঁহারা উটে আরোহণ করিয়া লুঙ্গি ও চাদর গায়ে তাঁহার নিকট গিয়াছিলেন। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ -কে সালাম না দিয়াই মজলিসে বসিয়া পড়িয়াছিলেন। তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন: কী হে! তোমরা কি মুসলমান নও? তাঁহারা বলিলেন: জ্বী, হাঁ। তিনি আবার বলিলেন: তাহা হইলে তোমরা সালাম দিলে না কেন? তখন তাঁহারা দাঁড়াইয়া বলিলেন:
السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته. "আপনার প্রতি সালাম, রহমত ও বরকত নাযিল হউক হে নবী "! জবাবে নবী কারীম বলিলেন: وعلیکم السلام اجلسوا .
"তোমাদের প্রতিও সালাম (শান্তি) বর্ষিত হউক! তোমরা বসিয়া পড়!" তখন তাঁহারা বসিয়া পড়িলেন এবং রাসূলুল্লাহ -কে সালাতের ওয়াজসমূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করিলেন। তিনি তাঁহাদেগকে সেই ব্যাপারে অবহিত করিলেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩৫২)।
📄 নাখ'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
না'আ প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
সর্বশেষ যে প্রতিনিধি দলটি নবী কারীম -এর দরবারে উপস্থিত হয় তাহা হইল একাদশ হিজরীর মুহাররম মাসের মাঝামাঝি সময়ে আগত-মাখ'আ গোত্রের প্রতিনিধিদল। উহাতে দুইশত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহারা প্রতিনিধিদলসমূহের জন্য নির্ধারিত মেহমানখানায় অবতরণ করেন। অতঃপর ইসলামের স্বীকারোক্তিকারী রূপে নষী দরবারে উপস্থিত হন। কেননা ইতোপূর্বেই তাঁহারা মু'আয ইবন জাবালের হাতে বায়'আতের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন।
তাঁহাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি যুরারা ইব্ন আমর বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ? আমি এই সফরে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিয়াছি। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন: কী দেখিলে? তিনি
৪৫৮ বলিলেন: আমি একটি গর্দভী বাড়ীতে রাখিয়া আসিয়াছি। দেখিলাম সে একটি লোহিতাভ ও সবুজাভ কাল বর্ণের ছাগল ছানা প্রসব করিয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: তুমি কি বাড়ি হইতে আসার সময় কোন প্রসবাসন্না বাঁদী রাখিয়া আসিয়াছ? তিনি বলিলেন, জ্বী হাঁ। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সে তোমার একটি পুত্র সন্তান প্রসব করিয়াছে। তখন তিনি বলিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহার লোহিতাভ কাল হওয়ার ব্যাপারটি কী? বলিলেন: তুমি আমার নিকটে আইস। নিকটে আসিলে তিনি বলিলেন: তোমার কি শ্বেতকুষ্ঠ রহিয়াছে যাহা তুমি গোপন করিয়া আসিতেছ?
যুরারা বলিয়া উঠিলেন: আপনাকে যে পবিত্র সত্তা নবীরূপে প্রেরণ করিয়াছেন তাঁহার কসম! আপনি ছাড়া এই পৃথিবীর একটি প্রাণীকেও তাহা অবগত করি নাই। বলিলেন: ইহাই হইতেছে উহার কারণ (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৪২৩-২৪)।
যুরারা বলিলেন: নু'মান ইব্ন মুনযিরকে দেখিলাম, তিনি কানে দুল, বাহুতে বাযুবন্দ এবং হাতে কঙ্কন পরিয়া থাকেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: তিনি ছিলেন একজন আরব নৃপতি, উত্তম পোশাক ও সাজসজ্জায় সজ্জিত হইয়া দাপটে রাজ ক্ষমতায় পুনঃ অধিষ্ঠিত হইয়াছেন।
অতঃপর যুরারা আবার বলিলেন: আমি স্বপ্নে একটি বৃদ্ধাকে দেখিলাম যাহার শ্বেত শুভ্র চুলের মধ্যে কিছু কিছু কাল চুলেরও সংমিশ্রণ রহিয়াছে। সে মাটি ফুড়িয়া বাহির হইয়া আসিল। তাঁহার শ্বেত শুভ্র চুলরাশির মধ্যে কিছু কিছু কাল চুলেরও সংমিশ্রণ ছিল।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন: উহা হইতেছে দুনিয়ার অবশিষ্ট দিনগুলি। অতঃপর যুরারাহ্ বলিলেন: যমীন হইতে একটি অগ্নিশলাকা নির্গত হইয়া আমার ও আমার পুত্র আমরের মধ্যে অন্তরায় হইয়া গেল। সেই অগ্নিশলাকা ডাকিয়া ডাকিয়া বলিতেছিল: আমি আগুন! আমি আগুন! আমাকে চক্ষুষ্মান ও চক্ষুহীন শন্ধ-খাইতে দাও! আমি তোমাদিগকে গ্রাস করিব। তোমাদের পরিবার পরিজন ও ধন-সম্পদকে গ্রাস করিব!
রাসূলুল্লাহ উহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বলিলেন: ইহা একটি ফিৎনার ইঙ্গিত যাহা আখেরী যামানায় সংঘটিত হইবে।
যুরারাহ্ জিজ্ঞাসা করিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ ফিৎনাটি কী?
জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন: লোকজন তাহাদের খলীফাকে হত্যা করিবে। বড় বড় লোক সেই ফিৎনায় জড়াইয়া পড়িবে। এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহার হাতের আঙ্গুলগুলিকে অপর হাতের আঙ্গুলগুলির মধ্যে ঢুকাইয়া দিলেন।
তখন একজন মু'মিনের কাছে অন্য মু'মিনের রক্ত ঠাণ্ডা পানির চাইতেও অধিক লোভনীয় মনে হইবে। তোমার পুত্রের যদি আগে মৃত্যু ঘটে তবে তুমি তাহা দেখিতে পাইবে, আর যদি তুমি আগে মৃত্যুমুখে পতিত হও তাহা হইলে সে তাহা দেখিতে পাইবে।
এই কথা শ্রবণে যুরারা বলিয়া উঠিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্, দু'আ করুন, আমি যেন এই ফিৎনার যুগটা না পাই। রাসূলুল্লাহ্, দু'আ করিলেন: اللهم لا يدركها "হে আল্লাহ্! সে যেন এই ফিৎনা না পায়" সত্যসত্যই তিনি ইন্তেকাল করেন এবং তাঁহার পুত্র আমর বাঁচিয়া ছিল এবং সে হযরত উছমান (রা)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৪২৩-২৪)।
৪৫৯ এক রিওয়ায়াতে আছে যে, নাখ'আ গোত্রের লোকজন প্রথম তাহাদের কেবল দুই ব্যক্তিকে তাহাদের প্রতিনিধিরূপে প্রেরণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিতি হইয়াই তাহারা তাহাদের গোটা সম্প্রদায়ের পক্ষ হইতে তাঁহার নিকট বায়'আত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁহাদের দুইজনের একজন ছিলেন আরতাত ইন্ন শারাহীল যিনি বনূ বকরের সদস্য ছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৩ তা. বি)।
বনু নাখ'আর উক্ত সুবেশধারী লোকের ইসলাম গ্রহণের যায় তাহাদের এই ছিমছাম বেশভূষার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া রাসূলুল্লাহ্ তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের পশ্চাতে থাকা তোমাদের গোত্রের সকলেই কি তোমদেরই মত?
তাঁহারা জবাব দিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা আমাদের সম্প্রদায়ের যে সত্তর জন লোককে পিছনে রাখিয়া আসিয়াছি তাঁহাদের প্রত্যেকেই আমাদের চাইতে উত্তম এবং ক্ষমতাবান। তাঁহারা যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি তাঁহাদের দুই জনের জন্য এবং তাঁহাদের সম্প্রদায়ের জন্য দু'আ করিলেন:
اللهم بارك في النخع. “হে আল্লাহ্! না'আ গোষ্ঠীকে তুমি বরকত দান কর।"
তিনি হযরত আরতাত (রা)-এর হাতে তাঁহাদের সম্প্রদায়ের জন্য একটি পতাকা তুলিয়া দেন। মক্কা বিজয়ের দিন এই পতাকা তাঁহার হাতে ছিল। ঐ পতাকা হাতে তিনি কাদেসিয়ার যুদ্ধেও যোগদান করেন এবং ঐ দিনই শাহাদত বরণ করেন। আল্লাহ্ তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হউন! এখানে প্রশ্ন উঠিতে পারে, যেখানে নাখ'আ প্রতিনিধি দল ১১ হিজরীতে নবী দরবারে আসার কথা পূর্বে বলা হইয়াছে, অথচ মক্কা বিজয় উহার তিন বৎসর পূর্বের অষ্টম হিজরীর কথা। তখন ঐ পতাকা তাঁহার হাতে আসিল কী করিয়া? উহার জবাব হইল, ঐ দুই ব্যক্তির প্রতিনিধি দলটি মক্কা বিজয়ের পূর্বেই নবী দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল। তখন তাঁহাদের নিকট ঐ পতাকা দেওয়া হয়। ১৯ হিজরীতে আগত প্রতিনিধি দলে দুইশত সদস্য ছিলেন। অতএব তাঁহাদের প্রতিনিধি দল যারা নবী দরবারে আসিয়া ছিল।
ইবন সা'د নাখা প্রতিনিধি দলের বর্ণনার পর হিশাম ইবন মুহাম্মাদের বরাতে বলেন: যুরারা ইন কায়সের কি ছিলেন হারিছ এবং তাঁহার প্রপিতামহের নাম ছিল আদা তিনি খ্রিষ্টান ছিলেন (তাবাকা, খ, ১, পৃ. ৩৪৬)।