📄 বনূ তাগলিব গোত্রের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
বনূ তাগলিব গোত্রের নবী-এর দরবারে আগমন
কথিত আছে, মুসলমান ও খৃস্টان উভয় সম্প্রদায়ের ষোল সদস্য বিশিষ্ট বনূ তাগলিবের প্রতিনিধি দল নবী কারীম-এর দরবারে আগমন করে। খৃস্টান সদস্যদের বুকের উপর সোনার হরিণ-মূর্তি সম্বলিত ক্রুশ সাঁটান ছিল। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগত প্রতিনিধি দলের অবতরণস্থল রামালা বিনতুল হারিছের বাড়ীতে আসিয়া উঠেন। রাসূলুল্লাহ্ প্রতিনিধি রূপে আগত মুসলমান সদস্যগণকে উপঢৌকনাদি প্রদান করেন এবং খৃস্টান সদস্যগণকে এই শর্তে নিরাপত্তা প্রদান করেন যে, তাহারা তাহাদের সন্তানদিগকে খৃস্টধর্মে দীক্ষা দান করিয়া নষ্ট করিবে না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., মূল আরবী, পৃ. ৮৩-৮৪)।
📄 মুহিজ গোত্রের রাহাবিয়্যীন প্রতিনিধি দলের আগমন
যায়দ ইব্ন তাল্হা আত্-তায়মী হইতে বর্ণিত, দশম হিজরীতে রাহাবিয়্যীদের মধ্যকার মাহিজ গোত্রের পনের সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল নবী-দরবারে আগমন করেন। তাঁহারা মদীনায় কামলা বিন্ত হারিছের বাড়ীতে উঠেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদের নিকট আগমন করিয়া তাঁহাদের সহিত দীর্ঘ সময় আলাপ-আলোচনা করেন। তাঁহারা নবী কারীম -এর খিদমতে কয়েকটি উপঢৌকন দ্রব্য পেশ করেন। তন্মধ্যে মিরওয়াহ্ নামক একটি ঘোড়াও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ ঘোড়াটিকে কয়েকবার তাঁহার সম্মুখে হাঁকাইয়া দেখেন এবং খুবই পসন্দ করেন।
প্রতিনিধি দলের সদস্যগণ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁহারা কুরআন এবং ফারাইয শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাঁহাদিগকেও উপঢৌকন প্রদান করেন। প্রতিনিধি দলের সর্দারকে সাড়ে বার উকিয়া হিসাবে রৌপ্য এবং নিম্ন পর্যায়ের লোকদিগকে পাঁচ উকিয়া প্রদান করেন। তাহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
ইঁহাদের মধ্যে কয়েকজন রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত মক্কায় আগমন করিয়া তাঁহার সহিত হজ্জ করেন। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-এর ওফাত কাল পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করেন। তিনি তাঁহাদের জন্য খায়বরের সম্পদের একটি অংশও দান করেন। উহার পরিমাণ ছিল ১০০ ওয়াসাক। তিনি এই মর্মে তাহাদের জন্য একটি ফরমানও লিখাইয়া দেন। হযরত মু'আবিয়ার শাসনকালে তাঁহারা উহা বিক্রয় করিয়াছেন। "আমর ইব্ن সুবায়' নামক তাঁহাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি ঐ দলে ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাহার জন্য একটি পতাকা বাঁধিয়া দেন। এই পতাকা হাতে তিনি সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা) বাহিনীর বিরুদ্ধে হযরত মু'আবিয়ার পক্ষে লড়াই করেন। নবী দরবারে উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি কবিতায় বলেন:
اليك رسول الله أعملت نصها تجوب الفيافي سملتا بعد سملق تخب برحلى مرة ثم تعفق على ذات الواح اكلهما السرى بباب النبي الهاشمي الموفق فما لك عندى راحة أو يلحلجي وقطع دياسيم وهم مورق.
عتقت رذا من رحلة ثم رحلة
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আমার সওয়ারীকে আপনার অভিমুখী করিয়া দিয়াছি। সে একের পর এক মরু পথ অতিক্রম করিয়া চলিয়াছে।
"বাহনটির উপর রহিয়াছে কাঠের পালন। আমি তাহাকে নৈশ ভ্রমণের কষ্ট বরণে বাধ্য করিতেছি। মালপত্রের ভারে কখনও সে ঝুঁকিয়া পড়ে, আবার কখনও গ্রীবা উঁচু করে।
"হে আমার বাহন! ততক্ষণ পর্যন্ত আমার নিকট তোমার রেহাই নাই, যতক্ষণ না হাশিমী নবীর দ্বারপ্রান্তে তুমি আমাকে পৌঁছাইয়া দাও।
"তারপর সফরের পর সফর হইতে তুমি মুক্তি লাভ করিবে। তারপর আর তোমার কঠিন পথ অতিক্রম করিতে হইবে না, রাত্রি জাগরণ করিতে হইবে না" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৪-৪৫; সুবুলুল হুদা, ৬খ., পৃ. ৩৩৯)।
📄 খাছ'আম গোত্রে নবী (সা) দরবারে আগমন
খাছ'আম গোত্রের নবী দরবারে আগমন
য়াযীদ ইব্ন রূমান প্রমুখাৎ বর্ণিত আছে যে, জারীর ইব্ন 'আবদুল্লাহ্ (রা)-এর যুল-খালাসাহ মূর্তি ধ্বংশের এবং খাছ'আম গ্রোত্রীয় কিছু লোককে হত্যার পর 'আছ'আছ ইব্ن যা এবং 'আশাম ইব্ন মুদরিক খাছ'আম গোত্রের কতিপয় লোকসহ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। তাঁহারা বলেনঃ
امنا بالله ورسوله وما جاء من عند الله فاكتب لنا كتابا نتبع ما فيه.
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা আল্লাহ্র প্রতি ও তদীয় রাসূলের প্রতি আর তিনি আল্লাহ্র পক্ষ হইতে যাহা লইয়া আসিয়াছেন সেই সমুদয়ের উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছি। আপনি আমাদের জন্য একটি লিপি লিখিয়া দিন; আমরা উহাতে যাহা থাকিবে তাহার অনুসরণ করিব।
"সেই মতে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদিগকে একটি লিপি প্রদান করেন। এতে জারীর ইন্ন আবদুল্লাহ এবং উপস্থিত সাহাবীগণকে উহাতে সাক্ষী রাখেন” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৮-৯০০০; সুবুলুল হুদা, ৬খ., পৃ. ৩৩১)।
📄 জুযাম প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
জুযাম প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
ইবন সা'দ (র) তাঁহার নিজস্ব সনদে এবং তাবারানী 'উমায়র ইবন যাবাদ আল-জুযামীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, রিকা'আ ইব্ন যায়দ ইব্ন উযায়র ইব্ন মা'বাদ আল-জুযামী, উপরন্তু বনূ দুবায়বের ও একজন খায়বরের পূর্বেকার শান্তিপূর্ণ সময়ে রাসূলুল্লাহ-এর নিকট প্রতিনিধি- রূপে আগমন করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ-কে উপঢৌকনস্বরূপ একটি গোলাম দান করেন এবং নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর এই মর্মে তাঁহাকে একটি পত্র লিখিয়া দেন যে, তিনিই তাঁহাকে তাঁহার স্বগোত্রের লোকজনকে ইসলাম গ্রহণ সাপেক্ষে পূর্ণ অভয় দানের জন্য এবং ইহাতে অনীহাগ্রস্তদিগকে দুই মাসের অবকাশ দেওয়ার জন্য পাঠাইয়াছেন। পত্রের পাঠ রাসূলুল্লাহ-এর পত্রাবলীর আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যাইতে পারে।
রিকা'আ ইবন যায়د আল-জুযামী স্ব-সম্প্রদায়ে ফিরিয়া যখন উক্ত বক্তব্য প্রচার করিলেন তখন উহার আশ্চর্য ফল ফলিল। গোত্রের সকলেই একবাক্যে ইসলাম গ্রহণ করিল।
তাবারানী বর্ধিত বর্ণনায় বলেন, তারপর রিকা'আ হারাতুর রাজলাআ নামক পাথুরে এলাকায় আসিয়া উপনীত হন। তিনি সেখানে অবস্থানরত থাকা অবস্থায়ই রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ-এর দূত দিয়া কালবী সেখানে আগমন করেন। তিনি যখন ঐ অঞ্চলের শানার প্রান্তরে উপনীত হন তখন তাঁহার সহিত কিছু বাণিজ্যিক প্রাণও ছিল। তখন দুলাইয়া গোত্রের হুনায়দ ইবন উস এবং তাহার পুত্র উস ইবনুল হুনায়د তাঁহার যথাসর্বস্ব লুট করিয়া লইয়া যায়। দুলাইয়া হইতেছে বনূ জুযামেরই একটি শাখাগোত্রে। এই সংবাদ যখন রিকা'আ এবং পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী তাঁহার গোত্রের নিকট পৌছিল তখন তাহারা উক্ত লুণ্ঠনকারীদের নিকট যায়। নু'মান ইব্ن আবূ জি'আল নামক যুবায়র বংশীয় এক ব্যক্তি তখন ঐ লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে ছিল। রিকা'আ ও তাঁহার বাহিনী ঐ স্থান পৌছিলে তাহাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়।
কুরা ইব্ن আঙ্কার আয-যুলাঈ নামক এক ব্যক্তি উপরিউক্ত নু'মানকে লক্ষ্য করিয়া তীর নিক্ষেপ করিলে উহা তাহার হাটুতে লাগে। ঐ তীর বিদ্ধ হওয়ার সময় সে বলে: লও, আর আমি হইতেছি লুবনার পুত্র। হাসান ইন্ন মিল্লাহ আয-যুবায়বী ইতোপূর্বে দিয়া কালবীর সাহচর্য লাভ করিয়াছিল। তিনি তাহাকে উম্মুল কুরআন তথা সূরা ফাতিহা শিক্ষা দিলেন।
রিকা'আ ও তাঁহার সঙ্গিগণ লুণ্ঠিত সমস্ত মাল তাহাদের নিকট হইতে উদ্ধার করিয়া দিয়া কালবীর হস্তে অর্পণ করেন। দিয়া ইन्न খালীক আল-কালবী (র) রাসূলুল্লাহ-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে পূর্ণ বৃত্তান্ত অবগত করিলেন এবং হুনায়د ও তাহার পুত্র উসের কু-কর্মের জন্য তাহাদের শাস্তির দাবী জানাইলেন। সে মতে রাসূলুল্লাহ যায়দ ইবন হারিছাকে একটি বাহিনীসহ উহাদের দমনের জন্য প্রেরণ করেন (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ৩৫৪-৩৫৫; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩০৭-৮)।