📄 জু'ফী গোত্রের প্রতিনিধিদের নবী কারীম (সা)-এর দরবারে আগমন
জু'ফী গোত্রের প্রতিনিধিদের নবী কারীম -এর দরবারে আগমন
ইবন সা'د (ر) বলেন, হিশام ইব্ن মুহাম্মাদ ইবনুস সা'ইব ইব্ن কায়س আল-জু'ফীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, তাহারা উভয়ে বলিয়াছেন, জাহিলিয়াতের যুগে জু'ফী গোত্রীয় লোকজন কলিজা খাওয়া হারাম মনে করিত। তাহাদের মধ্যকার বনূ মুররান ইব্ن জু'ফী-এর কায়স ইব্ن সালামা ইবন শারাহীল এবং তাহার বৈপিত্রেয় সহোদর সালামা ইবন ইয়াযীদ ইব্ن মাশজা'আ ইবনুল মুজাম্মি নবী দরবারে আগমন করে। তাহাদের মাতা ছিল বনূ হারীম ইন্ন জু'ফী গোত্রের হুলউ ইবন মালিক-এর কন্যা। তাহার নাম ছিল মুলায়কা। তাহারা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
بلغني انكم لا تأكلون القلب.
"আমি জানিতে পারিয়াছি যে, তোমরা নাকি কলিজা খাও না"? তাহারা ইহার সত্যতা স্বীকার করিল। রাসূলুল্লাহ বলিলেন : فانه لا يكمل اسلامكم الا بأكله "তাহা খাওয়া ব্যতীত তো তোমাদের ইসলামই পূর্ণতা লাভ করিবে না।"
রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের জন্য ভূনা কলিজা আনাইলেন। সালামা ইবন ইয়াযীদ কম্পিত হস্তে উহা গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বারবার তাহাকে বলিতেছিলেন, খাও! খাও!! সে উহা খাইল এবং এই সম্পর্কে কবিতায় বলিলঃ
على اني اكلت القلب كرها - وترعد حين مسته نبانی
"অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদিও আমি কলিজা খাইয়াছি, আমি যখন উহা স্পর্শ করি তখন কিন্তু আমার হাতের আঙ্গুলগুলি রীতিমত কাঁপিতেছিল।"
এই সময় রাসূলুল্লাহ্ কায়س ইব্ন সালামা ইবন শারাহীলের নামে একটি পত্রে তাহাকে মুরران, হুরায়ম ও কিলাব এইগুলির আশপাশের এলাকাসমূহের শাসন ক্ষমতা মানিত, কায়েম ও যাকাত আদায়ের শর্ত সাপেক্ষে দান করেন। বর্ণনাকারী বলেন, আওد, যুবায়দ, জুয ইبن সা'د উশায়রার একাংশ, যায়دullah ইব্ن সা'দ, আইযুল্লাহ্ ইব্ن সা'দ, বানুল হারিছ ইব্ن কা'বের বানু সুলাআত, ঐ সবগুলিই আল-কুলাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাবী বলেন, অতঃপর তাহারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট প্রশ্ন করে, "ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাদের মাতা মুলায়কা মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় সাহায্যের হাত প্রসারিত করিতেন, বন্দীদিগকে মুক্ত করিতেন, অভুক্তকে আহার্য দান করিতেন, নিঃস্বদের প্রতি দয়াপরবশ থাকিতেন। তিনি এখন মৃত। তিনি তাহার একটি শিশুকন্যাকে জীবন্ত মাটির নীচে প্রোথিত করিয়াছিলেন। তাহার (পরকালীন) অবস্থা কী? রাসূলুল্লাহ্ জবাব দিলেন:
الوائدة والموؤودات في النار .
"প্রোথিতকারিনী ও প্রোথিত উভয়েই জাহান্নামী।" রাসূলুল্লাহ্-এর এই জবাব শুনিয়া তাহারা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং প্রস্থানের জন্য উদ্যত হইল। তিনি তখন বলিলেন:
الى فارجعا وامى مع امكما. আমার দিকে ফিরিয়া আইস! আমার মাতাও তোমাদের মাতার সহিত রহিয়াছে"।
ইহার প্রতি তাহারা কর্ণপাত করিল না এবং এই কথা বলিতে বলিতে চলিয়া গেলঃ والله ان رجلا اطعمنا القلب وزعم ان اقينا في النار لأهل أن لا يتبع.
"আল্লাহ্র কসম! যে ব্যক্তি আমাদিগকে কলিজা খাওয়াইয়াছে এবং মাতা জাহান্নামী বলিয়া ধারণা করে, সে অনুকরণের যোগ্য পাত্র নহে”।
পথে রাসূলুল্লাহ্-এর একজন সাহাবীর সহিত তাহাদের দেখা হইল। তাঁহার সহিত ছিল একটি যাকাতের উট। ঐ দুইজন তাঁহাকে খুব কষিয়া বাঁধিয়া ফেলে এবং উটটি হাঁকাইয়া লইয়া যায়। নবী কারীম-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিলে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হইয়া তাহাদের জন্য বদদু'আ করেন এইভাবে:
لعن الله رعلا وذكوان وعصية ولحيان وابنى مليكة بن حرثم ومران. “হে আল্লাহ্! রি'ل, যাকওয়ান, উসায়্যা, লিহয়ান এবং হারছাম ও মুরান খান্দানের মুলায়কার পুত্রদ্বয়ের প্রতি লা'নত বর্ষণ করুন"।
ওয়ালীদ ইবন 'আবদুল্লাহ্ আল-জু'ফী তদীয় পিতার বরাতে এবং তিনি তাঁহার বংশের প্রবীণদের বরাতে বলেন, জু'ফী বংশের প্রতিনিধিরূপেই য়াযীদ ইবন মালিক-যিনি আবূ সাবুরা নামে বিখ্যাত ছিলেন-নবী দরবারে আগমন করেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁহার দুই পুত্র সাবুরা ও 'আযীয। রাসূলুল্লাহ্ 'আযীযকে তাহার নাম কি জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন, 'আযীয। রাসূলুল্লাহ্র বলিলেন, 'আযীয বা প্রবল পরাক্রান্ত একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কেহই হইতে পারে না। তোমার নাম আবদুর রহমান। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করেন।
আবূ সাবুরা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার হাতের পিঠে স্নায়ুগ্রন্থি দেখা দিয়াছে যদ্দরুন আমার বাহনের লাগাম কষিয়া ধরিতে অসুবিধা হয়। রাসূলুল্লাহ্ একটি পেয়ালা আনাইলেন। তিনি উহা দ্বারা ঐ ক্ষতস্থানে আঘাত করিতে লাগিলেন এবং সাথে সাথে ঐ স্থানে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিলেন। ফলে উহা দূর হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার সন্তানদ্বয়ের জন্যও দু'আ করিলেন। আবূ সাবূরা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে আমার স্বগোত্রের ইয়ামান উপত্যকা জায়গীরস্বরূপ বরাদ্দ করুন। রাসূলুল্লাহ্ উহা তাঁহাকে জায়গীরস্বরূপ লিখিয়া দিলেন। উহার নাম ছিল হুরদান উপত্যকা। ইবন সা'দ (র) বলেন, আর আবদুর রহমান বলিতে এখানে আবূ খায়ছামা ইব্ن আবদুর রহমানকে বুঝান হইয়াছে (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৪-২৬; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩১৪-৫)।
📄 হারিছ ইব্ন হাসান আল-বাস্ত্রী-এর নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
হারিছ ইব্ন হাসান আল-বাস্ত্রীর নবী-এর দরবারে আগমন
ইমাম আহমদ (র) পূর্ণ সনদ সহ হারিছ আল-বাকরী হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, 'আলা ইব্দুল হাদরামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারের উদ্দেশ্যে আমি রওয়ানা হইলাম। আমি যখন রাবাযা অতিক্রম করিতেছিলাম তখন এক
তামীম বংশীয় বৃদ্ধার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। সে ছিল একান্তই একাকিনী এবং বাহন বিহীনা।
আমাকে লক্ষ্য করিয়া বৃদ্ধাটি বলিলঃ হে আল্লাহ্র বান্দা! আমি আমার এক প্রয়োজনে নবী দরবারে পৌঁছিতে চাই। তুমি কি আমাকে তাঁহার দরবার পর্যন্ত লইয়া যাইবে?
আমি তাহাকে আমার বাহনের উপর উঠাইয়া লইলাম। আমরা মদীনায় পৌঁছিলাম। মসজিদে তখন প্রচুর ভিড়। একটি কাল বড় পতাকা পতপত করিয়া হাওয়ায় দুলিতেছে। তরবারি সজ্জিত অবস্থায় বিলাল রাসূলুল্লাহ্-এর সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলামঃ কী ব্যাপার! এত লোকের ভিড় কেন? লোকজন জানাইল, রাসূলুল্লাহ্ আমর ইবনুল 'আসকে একটি অভিযানে প্রেরণ করিতেছেন।
রাবী হারিছ আল-বাক্রী বলেন, আমি তখন বসিয়া রহিলাম। অতঃপর এক পর্যায়ে নবী কারীম মসজিদে প্রবেশ করিয়া তাঁহার বসার স্থানে আসন গ্রহণ করিলেন। আমি দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করিলে তিনি অনুমতি দিলেন। আমি তাঁহার নিকট গিয়া সালাম দিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেনঃ আচ্ছা, তোমাদের ও তামীমীদের মধ্যে কোন সমস্যা দেখা দিয়াছে কি? আমি বলিলামঃ জ্বী হাঁ। কিন্তু ফলাফল তাহাদের বিরুদ্ধেই গিয়াছে। পথে এক দলছুট তামীমী বৃদ্ধার সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। সে আপনার নিকট পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্য তাহাকে আমার বাহনে উঠাইয়া লইতে অনুরোধ করে। এখন সে আপনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া আছে। রাসূলুল্লাহ্ তখন তাহাকেও প্রবেশের অনুমতি দিলেন এবং সেও দরবারে প্রবেশ করিল। আমি বলিলাম, আপনি যদি আমাদের ও তামীমীদের মধ্যে একটি অন্তরায় সৃষ্টিতে আগ্রহী হন তাহা হইলে এই তেলচিটে বৃদ্ধাটিকেই অন্তরায়রূপে গ্রহণ করিতে পারেন। বৃদ্ধাটি আমার কথায় উত্তেজিত হইয়া উঠিল। সে গর গর করিয়া বলিতে লাগিলঃ
یا رسول الله این يضطر مضرك ؟
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার মুদারীরা কোথায় তড়পাইয়া মরিবে? অর্থাৎ তাহাদের পিঠ তো দেওয়ালে ঠেকিয়া গিয়াছে।"
হারিছ আল-বাস্ত্রী বলেন, আমি তখন বলিয়া উঠিলাম, ইহাতো দেখিতেছি পূর্ববর্তী মহাজন উক্তি : معزی حملت حتفها 'ছাগী তাহার মৃত্যুকে নিজে ডাকিয়া আনিল' আমার ব্যাপারে প্রযোজ্য হইয়া পড়িয়াছে। আমি তাহাকে বহন করিয়া লইয়া আসিলাম, অথচ এখন দেখিতেছি সেই আমার প্রতিপক্ষ ছিল।
اعوذ بالله ورسوله ان اكون كوافد عاد.
আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের আশ্রয় কামনা করি 'আদ জাতির প্রতিনিধি হওয়ার পরিণাম হইতে? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, সে আবার কী? 'আদ জাতির প্রতিনিধির ব্যাপারটি কী না যেন ছিল? তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকা সত্ত্বেও আমার মুখে শুনিয়া উহা উপভোগ করিতে চাহিতেছিলেন।
আমি বলিলামঃ একবার 'আদ জাতির মধ্যে দারুণ আকাল দেখা দিল। তখন তাহারা তাহাদের প্রতিনিধিরূপ 'কারণ' বলিয়া অভিহিত একব্যক্তিকে প্রেরণ করিল। সে মু'আবিয়া ইব্ন বকর-এর নিকট উপস্থিত হইল। সে তাহাকে একমাস নিজের নিকট রাখিয়া মদ্য
৪৫১ পরিবেশন এবং দুই দাসী যাহাদের নাম ছিল জাবাদাতান, তাহারা নাচগানে মোহিত করিয়া রাখিল। অতঃপর এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেই ব্যক্তি মারা পাহাড়ের নিকট পৌঁছিয়া দু'আচ্ছলে বলিল:
اللهم انك تعلم لم اجئ الى مريض فاداويه ولا الى اسيرنا فاديه اللهم اسق عادا ما لنت تسقيه.
'হে আল্লাহ্! তুমি তো জান যে, কোন রুগ্ন ব্যক্তির চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বা কোন বন্দীকে মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে আমি আসি নাই। হে আল্লাহ্! 'আদ জাতিকে বৃষ্টিসিক্ত কর যেমনটি তুমি পূর্বে করিতে।' এমন সময় তাহার মাথার উপর দিয়া কয়েক খণ্ড কাল মেঘ ভাসিয়া যাইতে লাগিল। মেঘমালার ভিতর হইতে ঘোষণা দেওয়া হইল:
তুমি একখণ্ড বাছিয়া লও! সে এক খণ্ড কাল মেঘের দিকে ইঙ্গিত করিলে উহার ভিতর হইতে আওয়ায আসিল:
خذها رمادا رمادا - لا تبقى من عاد احدا .
"ভস্ম ও ভস্ম ভাণ্ডাররূপে উহা লইয়া লও। 'আদ-এর একটি প্রাণীকেও ইহা অবশিষ্ট রাখিবে না।” হারিছ বলেনঃ
فما بلغني انه ارسل عليهم من الريح الا بقدر ما يجرى في خاتمي هذا حتى هلكوا .
"আমি যতদূর জানিতে পারিয়াছি, তাহাদের উপর এই এতটুকু মাত্র বায়ু ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল যতটুকু আমার এই আংটির ফাঁক দিয়া চলিতে পারে। ইহাতেই 'আদ জাতি ধংস হইয়া যায়।"
আবূ ওয়া'ইল বলেন, তিনি যথার্থই বলিয়াছেন এবং এ জন্যই লোকজন কাহাকেও কোথায়ও প্রতিনিধিরূপে প্রেরণের সময় কোন পুরুষ বা নারী তাহাকে সাবধান করিয়া দিয়া বলিত: ওহে সাবধান! 'আদ প্রতিনিধির মত প্রতিনিধিত্ব যেন না কর।'
তিরমিযী, নাসাঈ, ইবন মাজা ও আহমাদ বিভিন্ন সূত্রে ও সনদে এই ঘটনাই বর্ণনা করিয়াছেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৭৫-৭৬; সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩১৮-১৯)।
📄 বনূ তাগলিব গোত্রের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
বনূ তাগলিব গোত্রের নবী-এর দরবারে আগমন
কথিত আছে, মুসলমান ও খৃস্টان উভয় সম্প্রদায়ের ষোল সদস্য বিশিষ্ট বনূ তাগলিবের প্রতিনিধি দল নবী কারীম-এর দরবারে আগমন করে। খৃস্টান সদস্যদের বুকের উপর সোনার হরিণ-মূর্তি সম্বলিত ক্রুশ সাঁটান ছিল। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট আগত প্রতিনিধি দলের অবতরণস্থল রামালা বিনতুল হারিছের বাড়ীতে আসিয়া উঠেন। রাসূলুল্লাহ্ প্রতিনিধি রূপে আগত মুসলমান সদস্যগণকে উপঢৌকনাদি প্রদান করেন এবং খৃস্টান সদস্যগণকে এই শর্তে নিরাপত্তা প্রদান করেন যে, তাহারা তাহাদের সন্তানদিগকে খৃস্টধর্মে দীক্ষা দান করিয়া নষ্ট করিবে না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., মূল আরবী, পৃ. ৮৩-৮৪)।
📄 মুহিজ গোত্রের রাহাবিয়্যীন প্রতিনিধি দলের আগমন
যায়দ ইব্ন তাল্হা আত্-তায়মী হইতে বর্ণিত, দশম হিজরীতে রাহাবিয়্যীদের মধ্যকার মাহিজ গোত্রের পনের সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল নবী-দরবারে আগমন করেন। তাঁহারা মদীনায় কামলা বিন্ত হারিছের বাড়ীতে উঠেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদের নিকট আগমন করিয়া তাঁহাদের সহিত দীর্ঘ সময় আলাপ-আলোচনা করেন। তাঁহারা নবী কারীম -এর খিদমতে কয়েকটি উপঢৌকন দ্রব্য পেশ করেন। তন্মধ্যে মিরওয়াহ্ নামক একটি ঘোড়াও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ ঘোড়াটিকে কয়েকবার তাঁহার সম্মুখে হাঁকাইয়া দেখেন এবং খুবই পসন্দ করেন।
প্রতিনিধি দলের সদস্যগণ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁহারা কুরআন এবং ফারাইয শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাঁহাদিগকেও উপঢৌকন প্রদান করেন। প্রতিনিধি দলের সর্দারকে সাড়ে বার উকিয়া হিসাবে রৌপ্য এবং নিম্ন পর্যায়ের লোকদিগকে পাঁচ উকিয়া প্রদান করেন। তাহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
ইঁহাদের মধ্যে কয়েকজন রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত মক্কায় আগমন করিয়া তাঁহার সহিত হজ্জ করেন। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-এর ওফাত কাল পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করেন। তিনি তাঁহাদের জন্য খায়বরের সম্পদের একটি অংশও দান করেন। উহার পরিমাণ ছিল ১০০ ওয়াসাক। তিনি এই মর্মে তাহাদের জন্য একটি ফরমানও লিখাইয়া দেন। হযরত মু'আবিয়ার শাসনকালে তাঁহারা উহা বিক্রয় করিয়াছেন। "আমর ইব্ن সুবায়' নামক তাঁহাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি ঐ দলে ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাহার জন্য একটি পতাকা বাঁধিয়া দেন। এই পতাকা হাতে তিনি সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা) বাহিনীর বিরুদ্ধে হযরত মু'আবিয়ার পক্ষে লড়াই করেন। নবী দরবারে উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি কবিতায় বলেন:
اليك رسول الله أعملت نصها تجوب الفيافي سملتا بعد سملق تخب برحلى مرة ثم تعفق على ذات الواح اكلهما السرى بباب النبي الهاشمي الموفق فما لك عندى راحة أو يلحلجي وقطع دياسيم وهم مورق.
عتقت رذا من رحلة ثم رحلة
"ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আমার সওয়ারীকে আপনার অভিমুখী করিয়া দিয়াছি। সে একের পর এক মরু পথ অতিক্রম করিয়া চলিয়াছে।
"বাহনটির উপর রহিয়াছে কাঠের পালন। আমি তাহাকে নৈশ ভ্রমণের কষ্ট বরণে বাধ্য করিতেছি। মালপত্রের ভারে কখনও সে ঝুঁকিয়া পড়ে, আবার কখনও গ্রীবা উঁচু করে।
"হে আমার বাহন! ততক্ষণ পর্যন্ত আমার নিকট তোমার রেহাই নাই, যতক্ষণ না হাশিমী নবীর দ্বারপ্রান্তে তুমি আমাকে পৌঁছাইয়া দাও।
"তারপর সফরের পর সফর হইতে তুমি মুক্তি লাভ করিবে। তারপর আর তোমার কঠিন পথ অতিক্রম করিতে হইবে না, রাত্রি জাগরণ করিতে হইবে না" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৪-৪৫; সুবুলুল হুদা, ৬খ., পৃ. ৩৩৯)।