📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফারওয়া ইব্‌ন মুসায়ক (রা)-এর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আগমন

📄 ফারওয়া ইব্‌ন মুসায়ক (রা)-এর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আগমন


ফারওয়া ইন্ন মুসায়ক (রা)-এর রাসূলুল্লাহ খেদমতে আগমন
ফারওয়া ইন্ন মুসায়ক আল-মুরাদী (রা) কিন্দার রাজন্যবর্গের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া তাহাদের প্রতি বিরাগভাজন ও বিদ্বেষভাবাপন্ন হইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আগমন করেন। ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে তাঁহার স্বগোত্র মুরাদ এবং পার্শ্ববর্তী হামদান গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে। হামদানীরা তাহাদের নেতা আজদা' ইবন মালিকের নেতৃত্বে মুরাদ গোত্রের উপর হামলা চালাইয়া তাহাদেরকে হতাহত করে। ঐ যুদ্ধটিকে রাদম-এর যুদ্ধ বলা হইয়া থাকে। মুরাদ গোত্রের সেই দিনের সেই শোচনীয় পরাজয় সম্পর্কে ফারওয়া ইন্ন মুসায়ক কবিতার ছন্দে বলেন:
مررن على لفات وهن خوص ينازعن الأعنة ينتحينا فإن نغلب فغلابون قدما وإن نغلب فغير مغلبينا وما إن طبنا جين ولكن منايانا ودولة آخرينا كذاك الدهر دولته سجال تكر صروفه حينا فحينا فبينا ما نسر به ونرضى ولو لبست غضارته سنينا إذ انقلبت به کرات دهر فألفيت الألى غبطوا طحينا فمن يغبط بريب الدهر منهم يجد ريب الزمان له خؤونا فلو خلد الملوك إذا خلدنا ولو بقى الكرام إذا بقينا فأفنى ذلكم سروات قومی كما أفنى القرون الأولينا.
"ওরা লিফাত পার হল, চক্ষু কোটরাগত, একদিকে কাত করে ধরে রেখেছিলাম লাগাম। যদি জয়ী হই আমরা, আমরা তো বহুদিনের পুরনো বিজয়ী, আর বিজিত হলে, প্রায়শই বিজিত হইনি আমরা। কাপুরুষতা আমাদের রক্তে নেই। আছে আমাদের দুর্গতি আর ওদের সৌভাগ্য। এমনি করে ঘোরে ভাগ্যের চাকা মানুষের এই তার পক্ষে যায়, এই বিপক্ষে। আমরা তাতে খুশী হই, আনন্দ উৎসব করি
বছরের পর বছর হঠাৎ এখন ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে পদের হিংসা করত মানুষ তারা বিধ্বস্ত এখন আর ভাগ্য যাদের প্রতি প্রসন্ন একদিন দেখবে সময়ের পরিবর্তন সে এক প্রবঞ্চণা রাজারা যদি অমর হয়, আমরা তা হলে তাই সত্যের যদি জয় হয় আমাদেরও হবে। কিন্তু আমাদের সব সর্দার ধুয়ে-মুছে শেষ হয়ে গেছে আমাদের আগের প্রজন্মের মত” (সুবুলুল হুদা, ৬খ., পৃ. ৩৯২-৩; আল-বিদায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৬৩-৬৪)।
তাঁহার নবী দরবারে আগমন সম্পর্কে ফারওয়া বলেন: لنا رأيت ملوك كندة أعرضت كالرجل خان الرجل عزق نسائها قربت راحلتى أؤم محمدا أرجو فواضلها وحسن ثرائها
“যখন দেখলাম কিন্দার রাজারা সৎপথ বিমুখ পায়ের পেশীতন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া লোকদের মত তখন মুহাম্মাদের উদ্দেশ্যে চাপলাম বাহন পিঠে তাদের মঙ্গলের জন্য তাদের সরস চারণভূমির জন্য”। রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে তাঁহার উপস্থিতি সম্পর্কে ইবন ইসহাকের বর্ণনা হইল: ثم خرج حتى أتى المدينة وكان رجلا له شرف فأنزله سعد بن عبادة عليه ثم غدا إلى رسول الله وهو جالس في المسجد فسلم عليه ثم قال يا رسول الله أنا لمن ورائى من قومي قال أين نزلت يا فروة قال على سعد بن عبادة وكان يحضر مجلس رسول الله كلما جلس ويتعلم القرآن وفرائض الإسلام وشرائعه.
“অতঃপর তিনি বাহির হইয়া পড়িলেন এবং মদীনায় আসিয়া পৌছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। সা’দ ইবন উবাদা (রা) তাহাকে নিজ বাড়ীতে উঠাইলেন। তিনি তাঁহাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকটে যান। তিনি তখন মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। ফারওয়া তাঁহাকে সালাম দিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আমার স্বগোত্রের প্রতিনিধিরূপে আসিয়াছি। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন: তুমি কোথায় উঠিয়াছ হে ফারওয়া? তিনি বলিলেন, সা’দ ইবন উবাদার বাড়িতে। তিনি যখনই রাসূলুল্লাহ্ -এর মজলিসে বসিতেন তখনই তাঁহার নিকটে বসিতেন এবং আল-কুরআন এবং ইসলামের ফরয-ওয়াজিব বিধানসমূহ সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করিতেন”। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন:
يا فروة هل ساءك ما أصاب قومك يوم الردم ؟
৪৩৩ "হে ফারওয়া! রাদমের যুদ্ধে তোমার স্বগোত্রের শোচনীয় অবস্থা বুঝি তোমার নিকট খুবই খারাপ লাগিয়াছে"? তিনি জবাব দিলেন:
يا رسول الله من ذا يصيب قومه مثل ما أصاب قومى يوم الردم ولا يسوءه ذلك ؟
"এমন কে আছে ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যে তাহার স্বজাতি রাদমের যুদ্ধের মত শোচনীয় অবস্থায় পড়িবে আর তাহার কাছে উহা খারাপ লাগিবে না"? রাসূলুল্লাহ্ বলিলেনঃ
أما إن ذلك لم يزد قومك في الإسلام إلا خيرا.
"তাহা হইলে ইসলাম তোমার কওমের জন্য মঙ্গল বৈ অন্য কিছু বৃদ্ধি করিবে না” (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩৯২-৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৭০)। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে সমগ্র মুরাদ, যুবায়দ ও মাযহিজ এলাকায় প্রশাসক নিযুক্ত করিলেন এবং খালিদ ইবন সা'ঈদ ইবন 'আসকে যাকাত উশুলকারীরূপে তাহার সহিত প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে অবস্থানকালেই রাসূলুল্লাহ্ ইনতিকাল করেন (তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৩৪-৬; ইব্‌ن কাছীর, আস-সীরা আন্-নাবাবিয়া, ৪খ., পৃ. ১৩৬-৩৮; সবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩৯২-৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনূ যুবায়দের প্রতিনিধিরূপে আমর ইবন মা'দীকারিবের আগমন

📄 বনূ যুবায়দের প্রতিনিধিরূপে আমর ইবন মা'দীকারিবের আগমন


বনূ যুবায়দের প্রতিনিধিরূপে আমর ইবন মা'দীকারিবের আগমন
বনূ যুবায়দের অধিক সংখ্যক লোকজনসহ আমর ইবন মা'দীকারিব নবী -এর দরবারে আগমন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর আবির্ভাবের সংবাদ তাহাদের গোত্রে পৌঁছিলে এই আমর ইবন মা'দীকারিব গোত্রপাতি কায়স ইব্‌ن মাকশূহকে বলেন, হে কায়স! আপনি আজ আমাদের গোত্রপতি। আমাদের নিকট সংবাদ পৌছিয়াছে যে, কুরায়শের মুহাম্মাদ নামক এক ব্যক্তি হিজাযে নবৃওয়াতের দাবি করিয়াছেন। আমাদিগকে সঙ্গে লইয়া চলুন, আমরা ব্যাপারটি পরীক্ষা করিয়া দেখি। সত্য সত্যই যদি তিনি নবী হইয়া থাকেন, যেমনটি তিনি দাবি করিতেছেন, তবে উহা আপনার নিকট গোপন থাকিবে না। তাহা হইলে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎকালে আমরা তাঁহার অনুসারী হইব, অন্যথায় তাঁহার ব্যাপারটি আমাদের নিকট পরিষ্কার হইয়া যাইবে। কায়স ইব্‌ন মাকশূহ তাহাতে সম্মত হইল না, বরং উহাকে তাহার একটি নির্বুদ্ধিতা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিল।
"আমর ইবন মা'দীকারিব বাহনে চাপিয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে উপস্থিত হন এবং তাঁহাকে সত্যবাদী বলিয়া অনুমোদন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সংবাদ কায়সের গোচরীভূত হইলে সে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠে এবং তাহার বিরুদ্ধাচরণ ও তাহার মতকে অগ্রাহ্য করার দরুন কঠোরভাবে শাসাইয়া দেয়। এই সম্পর্কে 'আমর ইবন মা'দীকারিব কবিতায় বলেন:
أمرتك يوم ذي صنعا أمرا باديا رشده والمعروف تتعده أمرتك باتقاء الله
خرجت من المنى مثل - الحمير غره وتده تمناني على فرس - عليه جالسا أسده على مفاضة كالنهى - أخلص ماءه جدده يرد الرمح منثنى السننان - عوائرا قصده فلو لا قيتني للقيت - ليئا فوقه لبده تلاقی شنبا ششن - برائن ناشزا کنده بسامي القرن إن قيرن - تيممه فيعتضده فيأخذه فيرفعه - فيخفضه فيقتصده فيدمغه فيحطمه - في خضمه فیز درده ظلوم الشرك فيما أح - رزت أنيابه ويده
“যু-সানআর দিনে তোমাকে একটা পরামর্শ দিয়েছিলাম স্পষ্টতই একটা ন্যায্য পরামর্শ ছিল সেটা
তোমাকে বলে দিলাম ভয় করতে আল্লাহকে আর প্রস্তুতি নিতে সৎকর্মের
তুমি চলে গেলে কামনা-বাসনার পথে প্রবৃত্তি তাড়িত জোয়ান গাধার মত যাকে বিভ্রান্ত করেছে তার খুঁটি।
তুমি চেয়েছিলে আমাকে দেখতে আরূঢ় সেই অশ্বের পিঠ যার পিঠে চেপে বসেছে তার বীর কেশরী সিংহ।
আর আমার উপর বিশাল বর্ম স্বচ্ছ স্ফটিক পানিপূর্ণ হ্রদের মত যার তলায় রয়েছে ভীষণ শক্ত মাটি।
তার প্রতিঘাতে ফিরে যায় বর্শা ফলক বাঁকা হয়ে আর তার ভাঙ্গা টুকরোগুলি উড়ে যায় এদিক সেদিক তুমি যদি মুখোমুখি হও আমার
তাহলে মুখোমুখি হবে এমন এক সিংহের যার উপর দুলছে তার কেশররাজি।
ভীষণ মযবুত আর থাবা, উন্নত তার গ্রীবাদেশ সম পর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বীকে সে জব্দ করে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী তাকে হামলা করতে উদ্যত হয় তবে টুটি ধরে সে তাকে উপরে উঠিয়ে
ছুঁড়ে ফেলে দেয় নীচে। সাবাড় করে দেয় তার কর্ম। তারপর তার মগজ বের করে দেয় করে তাকে ছিন্ন ভিন্ন। এরপর তাকে ভক্ষণ করে তারপর দণ্ড ও থাবায় দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে মাংস অপর কেউ না অংশ বসায় তাতে এই আশংকায়"।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, 'আমর ইবন মা'দীকারিব তদীয় গোত্র বনূ যুবায়দের উপর ফারওয়া ইন্ন মুসায়কের শাসনামলে ঐ গোত্রেই অবস্থান করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্-এর ইনতিকালের সংবাদ পাইয়া সে বিদ্রোহী হইয়া ফারওয়া ইব্‌ن মুসাইককে বিদ্রূপ করিয়া 'কবিতায় বলে:
وجدنا ملك فروة شر ملك حمار ساف منخره بشفر وكنت إذا رأيت أبا عمير ترى الحولاء من خبث وغدر.
"ফারওয়ার শাসনকে পেয়েছি নিকৃষ্ট শাসনরূপে, যেমন গর্দভ শুকে নিতম্ব গর্দভীর। আবূ উমায়রকে দেখলেই তোমার মনে হবে তুমি দেখছো এক বিশ্রী ভ্রূণকে তার আবর্জনাযুক্ত ঝিল্লীসহ” (তারীখ-তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৩২-১৩৪; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ ফী সীরাতি খায়রিল ইবাদ, ৬খ., পৃ. ৩৮৬-৭; বৈরূত ১৪১৪/১৯৯৩; রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪০৭-৯, বৈরূত তা. বি.; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৬৪-৬৫)।
ইন কাছীর (র) বলেন:
ثم رجع الى الاسلام وحسن اسلامه وشهد فتوحات كثيرة في ايام الصديق وعمر الفاروق رضى الله عنهما وكان من الشجعان المذكورين والابطال المشون والشعراء المجيدين.
"অতঃপর তিনি পুনরায় ইসলামে প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিষ্ঠার সহিত ইসলামী জীবন-যাপন করেন। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) এবং উমার আল-ফারূক (রা)-এর শাসনামলে অনেক বিজয় অভিযানেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য বীরপুরুষ, বিখ্যাত যোদ্ধা এবং প্রথম শ্রেণীর কবি"। নিহাওয়ান্দ যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ২১ হিজরী সনে তিনি ইনতিকাল করেন। কেহ কেহ বলেন, কাদিসিয়ার যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং ঐদিনই শহীদ হন।
আবূ 'উমার ইব্‌ن আবদুল বার বলেন, নবম হিজরীতে তিনি নবী দরবারে পৌছিয়াছিলেন, কিন্তু ইবন ইসহাক ও ওয়াকিদী প্রমুখ দশম হিজরীর কথা বলিয়াছেন।
ইউনুস ইব্‌ن বুকায়র ইবন ইসহাক হইতে বর্ণনা করেন, কেহ কেহ বলিয়াছেন, আমর ইব্‌ 'দীকারিব নবী দরবারে কখনও উপস্থিত হন নাই। সেই সম্পর্কে তিনি কবিতায় বলিয়াছেন:
اقني بالنبي موقينة نفس - يوان لم ار النبي عيانا سيد العالمين طرا وادنا - هم الى الله حين بان مكانا جاء بالناموس من لدن لله - وكان الأمين فيه المعانا حكمة بعد حكمة رضئياء - فاهتدينا بنورها من عمانا وركبنا السبيل حين ركبه - ناه جدیدا بكرهنا ورضانا وعبدنا الاله حقا وكنا - للجهالات نعبد الأوثانا وائتلفنا به وكنا عدوا - فرجعنا به معا واخوانا فعليه السلام والسلام منا - حيث كنا من البلاد وكانا إن نكن لم نرى النبي فانا - قد تبعنا سبيله ايمانا
"আমার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে নবীর প্রতি, যদিও হেরি নাই আমি নবীকে সাক্ষাতে। সমগ্র বিশ্বের নেতা তিনি এবং তাদের সকলের তুলনায় আল্লাহ্র নিকটতম তিনি। (তা বুঝা গেল) যখন তাঁর মর্যাদা জাহির হল। আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তিনি নিয়ে এলেন শরীয়ত, 'আমীন' হলেন তাঁর মঞ্জিল আধার। প্রজ্ঞার পর প্রজ্ঞা এবং জ্যোতি, আমাদের অন্ধত্ব বিদূরিত হলো, আমরা পেলাম হিদায়াত। আমরা যখন তা গ্রহণ করলাম, তখন নতুন করে চলার পথ পেয়ে গেলাম। তা আমাদের ইচ্ছায়ই হোক আর অনিচ্ছায়ই হোক। আমরা সত্যিকারের মা'বুদের উপাসক হয়ে গেলাম, অথচ জাহিলিয়াতের যুগে অর্চনা করতাম মিথ্যা দেব-দেবীর। তাঁর হক নষ্ট করেছি আমরা আর আমরা ছিলাম পরস্পর শত্রু। তারপর তাঁকে অবলম্বন করেই আমরা ফিরে এলাম, রাতারাতি হয়ে গেলাম পরস্পর ভাই ভাই। তাঁর প্রতি সালাম দরূদ, সালাম আমাদের পক্ষ থেকে, যেখানেই থাকি না কেন আমরা, যেখানেই থাকুন তিনি। যদিও আমি চর্মচক্ষে দেখে না থাকি নবীকে, তাঁর পন্থা কিন্তু অনুসরণ করে চলেছি ঈমান আনয়ন করে" (ইবন কাছীর, আস-সীরাহ আন-নাবabiyyah, ৪খ., পৃ. ১৩৯-৪০, বৈরূত ১৩৯৮/১৯৮৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৬৪-৩৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আ'শা ইব্‌ন মাযিন-এর নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 আ'শা ইব্‌ন মাযিন-এর নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


আ'শা ইব্‌ن মাযিন-এর নবী দরবারে আগমন
আবদুল্লাহ ইব্‌ن ইমাম আহমাদ সনদসহ আল-হিরমাযী বংশের জনৈক ব্যক্তির বরাতে বর্ণনা করেন যে, তাহাদের বংশের আবদুল্লাহ্ ইব্‌ن আ'ওয়ার উরফে আল-আ'শা নামক এক ব্যক্তির মু'আযা নাম্নী এক স্ত্রী ছিল। একদা স্বামীর গৃহে অনুপস্থিতির সুযোগে মহিলাটি পলাইয়া যায় এবং তাহাদেরই স্বগোত্রের মুতারিফ ইব্‌ন নাহসাল আল-মাযিনীর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে। বাড়িতে ফিরিয়া সেই ব্যক্তি তাহার স্ত্রীকে ঘরে না'পাইয়া ব্যাপারটি জানিতে পারে। তখন সে মুতাররিফের নিকট বলে, হে আমার জ্ঞাতি ভাই! আমার স্ত্রী মু'আযা কি তোমার গৃহে রহিয়াছে? সে যদি তোমার নিকট থাকিয়া থাকে, তবে তাহাকে ফেরত দাও। জবাবে মুতাররিফ বলে, সে আমার নিকটে নাই। আর যদি থাকিয়া থাকে, তবুও আমি তোমার নিকট তাহাকে প্রত্যর্পণ করিব না।
447 আর উক্ত দুইজনের মধ্যে মুতাররিফই ছিল অধিকতর সম্মান ও প্রতিপত্তির অধিকারী। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আ'শা নবী কারীম-এর দরবারে উপনীত হইয়া তাঁহার শরণ ও সাহায্য প্রার্থনা করিয়া কবিতায় বলেন:
يا مالك الناس وديان العرب - اليك اشكو ذربة من الذرب كالذئبة العنساء في ظل السرب - خرجت ابغيها التطعام في رجب اخلفت الوعد ولطت بالذنب فخلفتني بنزاع وهرب وقد فتنى بين عصر مؤتشب وهن شر غالب لمن غلب.
“হে মানবকুল শ্রেষ্ঠ! হে আরবের শ্রেষ্ঠ বিচারক! এক মুখরা নারীর বিরুদ্ধে নালিশ আপনার সকাশে। এক বাঘের ছায়ায় সে এক অবাধ্যা বাঘিনী। রজব মাসে তার জন্য যখন আমি খাদ্যান্বেষণে বেরিয়েছি অমনি সে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসেছে। সে আমাকে ফেলে গিয়েছে বিষম বিপাকে। সে পালিয়েছে, (দাম্পত্য বন্ধনের) ওয়াদা সে ভঙ্গ করেছে। এ জাতটা এমনই মন্দ যে, কল্যাণের প্রতিযোগিতায় ওরা অজেয়, বিজয়ীর পক্ষপুটাশ্রিতা"।
নবী কারীম তখন তাহার এ শেষোক্ত উক্তিটির পুনরুক্তি করিয়া বলিলেন: উহারা অজেয় অকল্যাণ, বিজয়ীর পক্ষপুটাশ্রিতা। এইভাবে আ'শা ইব্‌ن মাযিন তদীয় স্ত্রীর বিরুদ্ধে নালিশ করিলেন এবং সে যে অপকর্ম করিয়াছে তাহার বিবরণ দিলেন। সাথে সাথে জানাইলেন, সে এখন তাহাদেরই গোত্রের একজন মুতাররিফ ইব্‌ নাহ্শালের নিকট রহিয়াছে। নবী কারীম তখন মুতাররিফকে পত্রে আ'শার স্ত্রী মুআযাকে ফেরৎ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আ'শা সেই পত্র লইয়া মুতাররিফের নিকট গেলেন এবং তাহার নিকট উহা হস্তান্তর করিলেন।
নবী কারীম-এর পত্র প্রাপ্তির পর মুতাররিফ মহিলাটিকে ডাকিয়া বলিলেন, হে মু'আযা! এই দেখ নবী কারীম-এর পত্র, তিনি তোমার সম্পর্কে লিখিয়াছেন। এখন আমি তোমাকে তাহার হাতে তুলিয়া দিব। জবাবে সে বলিল, তুমি আমার জন্য নবী কারীম-এর অঙ্গীকার ও অভয় প্রতিশ্রুতি লও যে, আমার অতীত কর্মের জন্য তিনি আমাকে কোনরূপ শাস্তি দিবেন না। সেই মতে মুতাররিফ সেই অভয় অঙ্গীকার লইয়া তাহাকে আ'শার হাতে তুলিয়া দিলেন। এই সম্পর্কেও আ'শা কবিতায় তাহার বক্তব্য প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহাতে তিনি বলেন:
بغيره الواشي ولا قدم العهد لعمرك ما حبى معاذة بالذي ولا سوء ما جائت به اذا ازلها - غواة الرجال اذ ينا جونها بعدى.
"মু'আযার প্রতি আমার অনুরাগ এমন নহে যে, চোগলখোরদের ফুসলানি তাহাতে ভাঙ্গন ধরাইবে কিংবা কালের প্রলম্বিত হওয়ায় তাহাতে ভাটা পড়িবে। এবং আমার অনুপস্থিতিতে মন্দ পুরুষ তাহাকে কানমন্ত্র দিয়া যে ফুসলাইয়াছিল, তাহার সেই কুকর্মের জন্য নহে” (ইব্‌ন কাছীর, আস-সীরাহ আন-নাবabiyyah, ৪খ., পৃ. ১৪২-৩; ঐ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ই.ফা.বা., বাংলা ভাষ্য, ৫খ.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জু'ফী গোত্রের প্রতিনিধিদের নবী কারীম (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 জু'ফী গোত্রের প্রতিনিধিদের নবী কারীম (সা)-এর দরবারে আগমন


জু'ফী গোত্রের প্রতিনিধিদের নবী কারীম -এর দরবারে আগমন
ইবন সা'د (ر) বলেন, হিশام ইব্‌ن মুহাম্মাদ ইবনুস সা'ইব ইব্‌ن কায়س আল-জু'ফীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, তাহারা উভয়ে বলিয়াছেন, জাহিলিয়াতের যুগে জু'ফী গোত্রীয় লোকজন কলিজা খাওয়া হারাম মনে করিত। তাহাদের মধ্যকার বনূ মুররান ইব্‌ن জু'ফী-এর কায়স ইব্‌ن সালামা ইবন শারাহীল এবং তাহার বৈপিত্রেয় সহোদর সালামা ইবন ইয়াযীদ ইব্‌ن মাশজা'আ ইবনুল মুজাম্মি নবী দরবারে আগমন করে। তাহাদের মাতা ছিল বনূ হারীম ইন্ন জু'ফী গোত্রের হুলউ ইবন মালিক-এর কন্যা। তাহার নাম ছিল মুলায়কা। তাহারা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
بلغني انكم لا تأكلون القلب.
"আমি জানিতে পারিয়াছি যে, তোমরা নাকি কলিজা খাও না"? তাহারা ইহার সত্যতা স্বীকার করিল। রাসূলুল্লাহ বলিলেন : فانه لا يكمل اسلامكم الا بأكله "তাহা খাওয়া ব্যতীত তো তোমাদের ইসলামই পূর্ণতা লাভ করিবে না।"
রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের জন্য ভূনা কলিজা আনাইলেন। সালামা ইবন ইয়াযীদ কম্পিত হস্তে উহা গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ বারবার তাহাকে বলিতেছিলেন, খাও! খাও!! সে উহা খাইল এবং এই সম্পর্কে কবিতায় বলিলঃ
على اني اكلت القلب كرها - وترعد حين مسته نبانی
"অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদিও আমি কলিজা খাইয়াছি, আমি যখন উহা স্পর্শ করি তখন কিন্তু আমার হাতের আঙ্গুলগুলি রীতিমত কাঁপিতেছিল।"
এই সময় রাসূলুল্লাহ্ কায়س ইব্‌ন সালামা ইবন শারাহীলের নামে একটি পত্রে তাহাকে মুরران, হুরায়ম ও কিলাব এইগুলির আশপাশের এলাকাসমূহের শাসন ক্ষমতা মানিত, কায়েম ও যাকাত আদায়ের শর্ত সাপেক্ষে দান করেন। বর্ণনাকারী বলেন, আওد, যুবায়দ, জুয ইبن সা'د উশায়রার একাংশ, যায়دullah ইব্‌ن সা'দ, আইযুল্লাহ্ ইব্‌ن সা'দ, বানুল হারিছ ইব্‌ن কা'বের বানু সুলাআত, ঐ সবগুলিই আল-কুলাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাবী বলেন, অতঃপর তাহারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট প্রশ্ন করে, "ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাদের মাতা মুলায়কা মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় সাহায্যের হাত প্রসারিত করিতেন, বন্দীদিগকে মুক্ত করিতেন, অভুক্তকে আহার্য দান করিতেন, নিঃস্বদের প্রতি দয়াপরবশ থাকিতেন। তিনি এখন মৃত। তিনি তাহার একটি শিশুকন্যাকে জীবন্ত মাটির নীচে প্রোথিত করিয়াছিলেন। তাহার (পরকালীন) অবস্থা কী? রাসূলুল্লাহ্ জবাব দিলেন:
الوائدة والموؤودات في النار .
"প্রোথিতকারিনী ও প্রোথিত উভয়েই জাহান্নামী।" রাসূলুল্লাহ্-এর এই জবাব শুনিয়া তাহারা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং প্রস্থানের জন্য উদ্যত হইল। তিনি তখন বলিলেন:
الى فارجعا وامى مع امكما. আমার দিকে ফিরিয়া আইস! আমার মাতাও তোমাদের মাতার সহিত রহিয়াছে"।
ইহার প্রতি তাহারা কর্ণপাত করিল না এবং এই কথা বলিতে বলিতে চলিয়া গেলঃ والله ان رجلا اطعمنا القلب وزعم ان اقينا في النار لأهل أن لا يتبع.
"আল্লাহ্র কসম! যে ব্যক্তি আমাদিগকে কলিজা খাওয়াইয়াছে এবং মাতা জাহান্নামী বলিয়া ধারণা করে, সে অনুকরণের যোগ্য পাত্র নহে”।
পথে রাসূলুল্লাহ্-এর একজন সাহাবীর সহিত তাহাদের দেখা হইল। তাঁহার সহিত ছিল একটি যাকাতের উট। ঐ দুইজন তাঁহাকে খুব কষিয়া বাঁধিয়া ফেলে এবং উটটি হাঁকাইয়া লইয়া যায়। নবী কারীম-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিলে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হইয়া তাহাদের জন্য বদদু'আ করেন এইভাবে:
لعن الله رعلا وذكوان وعصية ولحيان وابنى مليكة بن حرثم ومران. “হে আল্লাহ্! রি'ل, যাকওয়ান, উসায়্যা, লিহয়ান এবং হারছাম ও মুরান খান্দানের মুলায়কার পুত্রদ্বয়ের প্রতি লা'নত বর্ষণ করুন"।
ওয়ালীদ ইবন 'আবদুল্লাহ্ আল-জু'ফী তদীয় পিতার বরাতে এবং তিনি তাঁহার বংশের প্রবীণদের বরাতে বলেন, জু'ফী বংশের প্রতিনিধিরূপেই য়াযীদ ইবন মালিক-যিনি আবূ সাবুরা নামে বিখ্যাত ছিলেন-নবী দরবারে আগমন করেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁহার দুই পুত্র সাবুরা ও 'আযীয। রাসূলুল্লাহ্ 'আযীযকে তাহার নাম কি জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন, 'আযীয। রাসূলুল্লাহ্র বলিলেন, 'আযীয বা প্রবল পরাক্রান্ত একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কেহই হইতে পারে না। তোমার নাম আবদুর রহমান। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করেন।
আবূ সাবুরা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার হাতের পিঠে স্নায়ুগ্রন্থি দেখা দিয়াছে যদ্দরুন আমার বাহনের লাগাম কষিয়া ধরিতে অসুবিধা হয়। রাসূলুল্লাহ্ একটি পেয়ালা আনাইলেন। তিনি উহা দ্বারা ঐ ক্ষতস্থানে আঘাত করিতে লাগিলেন এবং সাথে সাথে ঐ স্থানে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিলেন। ফলে উহা দূর হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার সন্তানদ্বয়ের জন্যও দু'আ করিলেন। আবূ সাবূরা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে আমার স্বগোত্রের ইয়ামান উপত্যকা জায়গীরস্বরূপ বরাদ্দ করুন। রাসূলুল্লাহ্ উহা তাঁহাকে জায়গীরস্বরূপ লিখিয়া দিলেন। উহার নাম ছিল হুরদান উপত্যকা। ইবন সা'দ (র) বলেন, আর আবদুর রহমান বলিতে এখানে আবূ খায়ছামা ইব্‌ن আবদুর রহমানকে বুঝান হইয়াছে (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৪-২৬; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৬খ., পৃ. ৩১৪-৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00