📄 বাক্স ইব্ন ওয়াইল গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন
বাক্স ইন ওয়াইল গোত্রের প্রতিনিধি দল নবী -এর দরবারে আগমন করিলে তাহাদের মধ্যকার একজন রাসূলুল্লাহ -কে প্রশ্ন করে, আপনি কি কুস ইব্ن সা'ইদা সম্পর্কে অবগত আছেন? রাসূলুল্লাহ জবাবে বলিলেন:
ليس هو منكم هذا رجل من إياد تحنف في الجاهلية فوافي عكاظ والناس مجتمعون فيكلمهم بكلامه الذي حفظ عنه.
"তিনি তোমাদের মধ্যকার ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইয়াদ গোত্রের লোক। জাহিলিয়াতের যুগে তিনি হানীফ ধর্মমতের অনুসারী হন এবং 'উকায মেলায় সমবেত জনতার মধ্যে ঐ ধর্মের যতটুকু সংরক্ষিত ছিল উহা দ্বারা লোকজনের সহিত আলাপ আলোচনা করিতেন।"
রাবী বলেন, উক্ত প্রদিনিধি দলের মধ্যে বাশীর ইবনুল খাসাসিয়্যা, আবদুল্লাহ ইব্ن মারছাদ এবং হাসান ইব্ن খাওত প্রমুখও ছিলেন। হাসানের বংশের একজন ইহার স্মৃতিচারণ করিয়াছেন কবিতার ছন্দে:
أنا ابن حسان بن حوط وأبى - رسول بكر كلها إلى النبي. "হাসানের পুত্র আমি খাওতের নাতি দূত ছিনু দরবারে নবীর পক্ষে হতে গোটা বাক্রের" (সে তো ছিল সম্মান দুর্লভ)।
৪৩৩ ঐ প্রতিনিধি দলের একজনরূপে আবদুল্লাহ্ ইব্ن আসওয়াদ ইব্ন শিহাব ইব্ن আওফ ইব্ن 'আমর ইবনিল হারিছ ইব্ن সাদৃস রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে আসিয়াছিলেন। তিনি ইয়ামামায় গমনপূর্বক সংগৃহীত পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করিতেন। তিনি এক থলে খেজুর লইয়া নবী কারীম -এর দরবারে আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাহার জন্য বরকতের দু'আ করেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১৫; ইব্ন কাছীর, সীরাতুন নাবabiyyah, ৪খ., পৃ. ১৭৮; ঐ, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫ খ., পৃ. ১৭১, বাংলা ভাষ্য)।
📄 গামিদ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
দশম হিজরীতে দশ সদস্যবিশিষ্ট ইয়ামানের গামিদ প্রতিনিধি দল মদীনায় আসিয়া বাকী' আল-গারকাদে পৌছিয়া যাত্রা বিরতি করে। সেইখান হইতে তাঁহারা সকলে একত্র হইয়া রাসূলুল্লাহ্-এর খিদমতে উপস্থিত হন। তাহাদের মালপত্রের কাছে তাহারা একটি বালককে রাখিয়া গিয়াছিলেন। ঘটনাক্রমে ছেলেটি ঘুমাইয়া পড়িলে এক চোর আসিয়া একজনের থলে লইয়া পালাইয়া যায়। উক্ত থলেতে তাহার কাপড়-চোপড় রক্ষিত ছিল।
তাহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। তিনি তাহাদেরকে শারী'আতের বিধানসম্বলিত একখানা লিপি প্রদান করিলেন। অতঃপর তিনি তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মালপত্রের নিকট কাহাকে রাখিয়া আসিয়াছ? জবাবে তাহারা বলিলেন, আমাদের মধ্যকার সর্বকনিষ্ঠ একটি বালককে আমরা সেখানে রাখিয়া আসিয়াছি, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তিনি বলিলেন: সে তো ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি আসিয়া একটি থলে চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে।
তখন প্রতিনিধি দলের একজন বলিল: আমি ছাড়া আর কাহারও তো কোন থলে ছিল না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাহা হইলে তো আমার সর্বনাশ হইয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন : চিন্তার কোন কারণ নাই, আবার তাহা পাওয়া গিয়াছে এবং স্ব-স্থানে ফেরত আসিয়াছে। লোকজন তাড়াহুড়া করিয়া সেখানে ছুটিয়া গেলেন। ছেলেটিকে তাহারা ঘটনা কী জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল, আমি নিদ্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছিলাম। নিদ্রা হইতে জাগিয়াই দেখি থলেটি নাই। উহার খোঁজে অল্পদূর যাইতেই দেখি একটি লোক বসা অবস্থায় রহিয়াছে। আমি সেদিকে অগ্রসর হইতেই লোকটি তাড়াতাড়ি পালাইয়া যায়। সে যেখানে বসা ছিল সেদিকে অগ্রসর হইতেই দেখি সেখানে মাটি খোঁড়া অবস্থায় রহিয়াছে। একটু খুঁজিতেই থলেটি বাহির হইয়া আসিল। আমি উহা উঠাইয়া লইয়া আসিলাম। প্রতিনিধি দলের সকলেই তখন বলিলেন, নিশ্চয় তিনি আল্লাহ্র রাসূল। বালকটিও তখন ইসলাম গ্রহণ করিল। রাসূলুল্লাহ্ হযরত উবায় ইব্ন কা'বকে তাহাদেরকে কুরআন শিক্ষা দানের নির্দেশ দেন অতঃপর অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাহাদেরকেও পাথেয় প্রদান করা হয় এবং তাহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৩; যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৬৩; আসাহ্হুস-সিয়ার, পৃ. ৪৫০)।
📄 আদ-দারী গোত্রের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আগমন
সীরাত গ্রন্থসমূহ পাঠে প্রতীয়মান হয় যে, দারী প্রতিনিধি দল দুই বা ততোধিকবার নবী দরবারে আগমন করিয়াছে। আল্লামা আলী ইব্ن বুরহানুদ্দীন হালাবী প্রথম প্রতিনিধি দলের বর্ণনা
দিয়াছেন এইভাবে: হিজরতের আগে দারী গোত্রের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে হাযির হয়। ঐ দলে আবূ হিন্দ আদ-দারী, তামীম আদ-দারী, তদীয় ভ্রাতা নু'আয়ম আদ-দারী এবং অপর চার ব্যক্তি ছিলেন। তাহারা নবী কারীম-এর নিকট আবেদন জানান যেন তাহাদেরকে সিরিয়ার কিছু ভূ-সম্পদ বরাদ্দ দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ্ বলেন: যেখান হইতে ইচ্ছা আবেদন জানাও।
আবূ হিন্দ বলেন, আমরা কিছু দূরে গিয়া নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করিলাম। তামীম আদ-দারী বলিলেন, আমাদের বায়তুল মুকাদ্দাস এবং উহার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আবেদন জানান উচিত। সাথে সাথে আবূ হিন্দ প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, উহা এখন আজমী (অনারব) নৃপতিদের কেন্দ্র, অচিরেই আরব নৃপতিদের কেন্দ্রে পরিণত হইবে। এইজন্য আমার আশঙ্কা হয়, আমাদেরকে ঐ এলাকা ছাড়িয়া দেওয়া হইবে না। শেষপর্যন্ত অন্যত্র সরিয়া যাইতে হইবে। তামীম আদ-দারী বলিলেন, আমরা বায়ত হারূন এবং উহার আশেপাশের এলাকা চাহিয়া লইব।
অবশেষে আমরা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট ঐ এলাকা আমাদের নামে বরাদ্দ করার আবেদন জানাইলাম। রাসূলুল্লাহ্ সেমতে একটি চর্মগাত্রে আমাদেরকে বরাদ্দপত্র লিখিয়া দিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে আঠার মাইল দূরবর্তী ঐ স্থানটি এখন আল-খালীল নামে পরিচিত (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৩-৪৪)। উক্ত বরাদ্দপত্রের সাক্ষীরূপে ছিলেন হযরত 'আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব, খুযায়মা ইন্ন কায়স এবং শুরাহবীল ইন্ন হাসানা (রা)। অতঃপর উহা আমাদের হাতে অর্পণ করিয়া বলিলেন: আপাতত যাও! অতঃপর আমার হিজরতের কথা শোনা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
আবূ হিন্দ বলেন, অতঃপর আমরা সেখান হইতে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলাম। তারপর তিনি যখন মদীনায় হিজরত করিলেন তখন আমরা পুনরায় রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে হাযির হইয়া পূর্ববর্তী বরাদ্দপত্রের নবায়ন এবং নূতন একটি বরাদ্দপত্র লিখিয়া দেওয়ার জন্য তাঁহাকে অনুরোধ জানাইলাম। এবারকার নূতন বরাদ্দপত্রে তিনি আমাদেরকে বায়তে আয়নুন, হেব্রুন, মারতুম, বায়ত ইবরাহীমের গোটা এলাকা এবং ঐগুলিতে যাহাকিছু আছে সবকিছুই চিরদিনের জন্য আমাদের নামে বরাদ্দ করিয়া দিলেন। এবারকার এই বরাদ্দপত্রের সাক্ষীরূপে রহিলেন হযরত আবূ বকর ইব্ن আবু কুহাফা, হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব, হযরত উছমান ইব্ন আফফান, হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব এবং হযরত মুআবিয়া ইব্ن আবূ সুফ্যান (রা)। হালাবী বলেন, ঐ বরাদ্দপত্রখানা আল্লামা কাস্তাল্লানী তদীয় মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়াতে উদ্ধৃত করিয়াছেন। সাথে সাথে তিনি ঐ রিওয়ায়াতকে সহীহ বলিয়া প্রত্যয়নও করিয়াছেন (সীরাতে হালাবিয়্যা, পৃ. ১৩-১৪)।
তাবাকাত দারীইনগণের দ্বিতীয়বার নবী দরবারে আগমনের বিবরণ দিতে গিয়া দীর্ঘ সনদ উদ্ধৃত করিয়া লিখেন: রাসূলুল্লাহ্-এর তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পর আদ-দারীইন প্রতিনিধি দল নবী দরবারে উপস্থিত হয়। ঐ প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ১০। তিনি ঐ সদস্যগণের পূর্ণ পরিচয়ও দিয়াছেন এইভাবে: তামীম ও নু'আয়ম; তাঁহারা উভয়ে সহোদর ছিলেন। তাঁহাদের বংশলতিকা, তাহাদের পিতৃপুরুষের নাম তিনি উদ্ধৃত করিয়াছেন। তাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাইয়িবের নামকরণ করেন আবদুল্লাহ এবং আযীযের
৪৩৫ নাম রাখেন আবদুর রহমান। হানী ইন্ন হাবীব রাসূলুল্লাহ্ -কে হাদিয়া প্রদান করেন। ঐ উপহারসামগ্রীর মধ্যে ছিল (১) পানপাত্র )اورضا( , )২) কয়েকটি ঘোড়া এবং (৩) স্বর্ণের কারুকার্য খচিত একটি বহুমূল্য পরিধেয়। তিনি ঘোড়াগুলি ও পরিধেয় গ্রহণ করিলেন। পানপাত্রটি যেহেতু মদ্যপানের জন্য ছিল, সম্ভবত এই কারণে উহা গ্রহণ করেন নাই। পরিধেয় তিনি পিতৃব্য আব্বাসকে দান করিলে তিনি বলিলেন, উহা দিয়া আমি কী করিব? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন:
انتزع الذهب فتحليه نساءك أو تستنفقه ثم تبيع الديباج فتأخذ ثمنه فباعه العباس من رجل من يهود بثمانية آلاف درهم.
"উহা হইতে স্বর্ণ উঠাইয়া লইয়া আপনার পরিবারের স্ত্রীলোকদিগকে পরিতে দিবেন। বা উহা খুলিয়া রেশম বিক্রী করিয়া উহার মূল্য গ্রহণ করেন। আব্বাস (রা) জনৈক ইয়াহূদীর নিকট আট হাজার দিরহাম উহা মূল্যে বিক্রয় করিয়া দেন।”
তামীম বলিলেন, আমার প্রতিবেশী দুইটি রোমক কবলিত গ্রাম হইতেছে হিব্রা ও বায়ত আয়নূন। আল্লাহ যদি আপনাকে বিজয়ী করেন এবং সিরিয়া আপনার আয়ত্তে চলিয়া আসে তাহা হইলে ঐ দুইটি গ্রাম আমার যেন হয় তাহা নিশ্চিত করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: হাঁ, তখন ঐগুলি তোমারই হইবে। আবূ বকর (রা) খিলাফতের দায়িত্বে আসীন হইলে তিনি একটি বরাদ্দপত্রের মাধ্যমে উহা তাঁহাকে দান করেন। আদ-দারীদের উক্ত প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্ -এর ইন্তিকাল পর্যন্ত মদীনায়ই ছিল। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদেরকে এক শত ওয়াসাক খাদ্য শস্য প্রদানের ওয়াসিয়াত করিয়া যান (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪২-৪)।
📄 আল-আহমাস প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আগমন
আল-আহমাস প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে আগমন
ইবন সা'দ (র) বলেন, কায়স ইন্ন গারবাহ আল-আহ্মাসী তাহার সম্প্রদায়ের আড়াই শত সঙ্গী-সাথীসহ নবী দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাহাদেরকে তাহাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। তাহারা বলে, نحن احمس الله "আমরা আল্লাহ্র বীর দল"। জাহিলিয়াতের যুগে তাহারা এই নামেই অভিহিত হইত। তখন রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: انتم اليوم لله "আজ তোমরা আল্লাহ্র পক্ষের বীর দল"। রাসূলুল্লাহ্ বিলাল (রা)-কে বলেন : اعط ركب. بجيلة وابدأ بالاحمسيين "বাজীলা গোত্রের আরোহীদেরকে দান কর এবং এই দান প্রক্রিয়া আহমাসীদের দ্বারা শুরু করিবে”।