📄 তাহাদের আগমনের প্রেক্ষাপট
তাহাদের আগমনের প্রেক্ষাপট
ইব্ন সা'দ, হিশাম ইব্ন মুহাম্মাদ 'আমর ইব্ন মালিক লাঈ আরহাবী আল-হামদানীর প্রমুখাৎ তাঁহাদের প্রবীণদের বরাতে নবী দরবারে হামদানের প্রতিনিধি দলের আগমনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করিয়াছেন এইভাবে: কায়স ইব্ন মালিক ইব্ন সা'দ ইব্ন লাঈ আল-আরহাবী মক্কায় নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিত হন। তিনি নবী কারীম-কে লক্ষ্য করিয়া বলেন:
يا رسول الله أتيتك لأومن بك وأنصرك
"ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার প্রতি ঈমান আনয়ন ও আপনাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে আপনার খিদমতে উপস্থিত হইয়াছি"। জবাবে তিনি বলেন:
مرحبا بك أتأخذوني بما في يا معشر همدان "তোমাকে স্বাগতম। হে হামদানবাসী! আমার সহিত যাহা আছে (অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম) তাহাসহ কি আমাকে গ্রহণ করিবে? প্রত্যুত্তরে আগন্তুক কায়স ইন্ন মালিক হামদানী বলেন:
نعم بأبي أنت وأمى.
"হাঁ। আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হউন!" রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
فاذهب إلى قومك فإن فعلوا فارجع أذهب معك.
"তাহা হইলে তোমার সম্প্রদায়ের নিকট যাও। তাহারা যদি সত্যসত্যই তাহা করে, তাহা হইলে তুমি ফিরিয়া আসিবে। আমি তোমার সহিত যাইব।" সেইমতে কায়স তাঁহার সম্প্রদায়ে ফিরিয়া তাহাদেরকে ইসলামের দা'ওয়াত দেন। তাহারা যথারীতি ইসলাম গ্রহণ করিলে তিনি নবী দরবারে ফিরিয়া আসিয়া জানান:
قد أسلم قومي وأمروني ان آخذك..
"আমার সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে এবং আপনাকে লইয়া যাইবার জন্য তাহারা আমাকে প্রেরণ করিয়াছে"। তখন নবী কারীম খুশী হইয়া বলেন : نعم وفد القوم قيس "কায়স তাহার গোত্রের কী উত্তম প্রতিনিধি” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪০-১)।
ইবন হিশাম বলেন, আমি যাহাকে বিশ্বাস করি এমন এক ব্যক্তি 'আমর ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন উয়ায়না হইতে এবং তিনি আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: হামদানের প্রতিনিধি দল নবী দরবারে আগমন করে। তাহাদের সদস্যরূপে ছিলেন মালিক ইব্ন নামাত, আবূ ছাওর যুল-মিশা'আর, মালিক ইব্ন আনফা, যিমাম ইবন মালিক ও উমায়র ইবন মালিক খারিকী। তাবুক হইতে রাসূলুল্লাহ -এর প্রত্যাবর্তনের পথে তাহারা তাঁহার সহিত সাক্ষাত করেন। তাহাদের পরিধানে ছিল ইয়ামানী কারুকার্যখচিত ছোট ছোট চাদর এবং মাথায় ছিল আদানী পাগড়ী। মাহরী ও আরহাবী উটে চড়িয়া তাহারা আগমন করেন। মালিক ইব্ن নামাত তাহাদের সম্প্রদায়ের গৌরবসূচক )رجز( কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
৪২৮ همدان خیر سوقة وأقبال ليس لها في العالمين أمثال محلها الهضب ومنها الأبطال لها إطابات بها وأكال
"হামদান তো সেরা নবাব ও সামন্ত বিশ্বজোড়া কোথাও নেই তুলনা তাদের তাদের রয়েছে অতি উচ্চ মর্যাদা বড় বড় বীর যে কারণে তারা পায় বিপুল নজরানা দেদার খাজনা" অপর জন বলছিল :
إليك جاوزن سواد الريف في هبوات الصيف والخريف مخطمات بحبال الليف.
“দেখ দেখ, খর্জুর বাকলের রশির লাগাম আঁটা উটগুলো সব করছে অতিক্রম শীত ও গ্রীষ্মের ধূলো মেঘের তলে জলের ধারে সবুজ শ্যামল গ্রাম”। তারপর মালিক ইব্ন নামাত রাসূলুল্লাহ-এর সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হামদান সম্প্রদায়ের শহর ও পল্লীর সেরা লোকগুলি বেগবান নবীন উটে আরোহণ করিয়া আপনার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। তাহারা ইসলামের রশিতে বাঁধা। আল্লাহ্র ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দা তাহাদেরকে স্পর্শ করে না। তাহারা আসিয়াছে খারিফ, ইয়াম ও শাকিরের বিভিন্ন জনপদ হইতে। তাহারা উট ও ঘোড়ার মালিক। রাসূলের আহ্বানে তাহারা সাড়া দিয়াছে এবং সকল দেবদেবী ও প্রতিমা বর্জন করিয়াছে। যতদিন পাহাড় স্থির থাকিবে, সালা' পাহাড়ে হরিণ শাবক যতদিন ছুটাছুটি করিবে ততদিন পর্যন্ত তাহাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ হওয়ার নহে। তখন রাসূলুল্লাহ খারিফ সম্প্রদায়ের শহর ও উচ্চ মালভূমি ও বালুময় অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য ঐ এলাকার বরাদ্দপত্র এবং আল্লাহ্ ও রাসূলের যিম্মা গ্রহণের অঙ্গীকার পত্র তাহাদের জন্য লিখাইয়া দেন। এই সম্বন্ধে মালিক ইব্ন নামাত বলেন :
ذكرت رسول الله في فحمة الدحى ونحن باعلى رحرحان وصلدد وهن بنا خوص طلائح تغتلى ركباتها في لاحب متمدد على كل فتلاء الدراعين جسرة تمر بنا مر الهجف الخفيده حلقت برب الراقصات إلى منى صواد ربالركبان من هضب قردد بأن رسول الله فينا مصدق رسول أتى من عند ذي العرش مهتدى فما حملت من ناقة فوق رحلها أشد على أعدائه من محمد وأعطى إذا ما طالب العرف جاءه وأمضى محد المشرفي المهند
"আমি কয়লা কালো আধারের মধ্যে স্মরণ করেছি আল্লাহ্র রাসূলকে যখন আমরা চলেছিলাম বাহরাহান
ও সালদাদের উচু পথ দিয়ে। সুদীর্ঘ রাজপথ বেয়ে আমাদের নিয়ে চলেছিল উষ্ট্ররাজি অবিরাম পথ পরিক্রমায় তাদের চোখ ছিল কোটরাগত দেহ ছিল ক্ষতবিক্ষত। এমন সব উষ্ট্রীর পিঠে আরূঢ় ছিলাম আমরা যাদের পা ছিল চওড়া গতি বেগবান ওরা ধابিত হচ্ছিল আমাদের নিয়ে মোটাতাজা নর উট পাখীর মত।
৪২৯ আমি মিনার পানে ধাবিত সেই উস্ট্রীগুলোর প্রতিপালকের শপথ করেছি যেগুলো তাদের আরোহী পিঠে সমুচ্চ ভূমি হতে হয়েছে উদিত। আল্লাহ্র রাসূল আমাদের মাঝে প্রত্যায়িত সুনিশ্চিত। আরশের অধিপতির নিকট হতে এসেছেন তিনি সরল পথ প্রাপ্ত হয়ে। কোন উষ্ট্রী তার হাওদার উপর করেনি বহন মুহাম্মাদ অপেক্ষা শত্রুর উপর তীব্রতর আঘাতকারীকে কিংবা এমন কোন ব্যক্তিকে যে তার চাইতে বেশী মুক্তহস্ত আগত কৃপাপ্রার্থীর প্রতি অথবা সুতীক্ষ্ণ ভারতীয় তরবারি চালনায় অধিকতর সিদ্ধহস্ত" (রাওদুল-উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪২৪-৫; ইব্ن হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ২৬৫-৬, ইফা. প্রকাশিত, ১৯৯৬ খৃ.)।
রাসূলুল্লাহ উক্ত প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য মালিক ইব্ন নামাতকে হামদানের মুসলমানদের আমীর মনোনীত করিয়া দেন। এই প্রতিনিধি দলে ১২০ জন সদস্য ছিলেন (যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩৪-৩৭)। ইবন হাজার (র) বলেন, নামাত ইব্ন বুসর ইবন মালিক-এর আলোচনা হইতে জানা যায়, তিনি উক্ত প্রতিনিধি দলে ছিলেন। আবার কোন কোন রিওয়ায়াতে বলা হইয়াছে যে, তাঁহার পিতা কায়স ইবন মালিক এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন। অধিক বর্ণনামতে, তাঁহাদের সকলেই উক্ত দলে ছিলেন। হাসান ইবন ইয়াকূব হামদানী উক্ত প্রতিনিধি দলে ১২০ জন সদস্য থাকার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। উক্ত রিওয়ায়াতে বর্ণিত ছাকীফদের বিরুদ্ধে তাহাদেরকে যুদ্ধ পরিচালনার নির্দেশ সম্পর্কে ইবনুল কায়্যিম সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন। কেননা হামদানীগণ ছিলেন ইয়ামানের অধিবাসী, পক্ষান্তরে ছাকীফগণ ছিলেন তাইফের অধিবাসী (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৬২; বাংলা ভাষ্য, ইফা)।
কিন্তু ইব্ن হাজর আল-ইসাবায় লিখেন: রাসূলুল্লাহ মালিক ইব্ن নামাতকে তাহার কওমের আমীর নিযুক্ত করিয়া তাঁহাদেরকে ছাকীফদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিয়াছিলেন এবং সেই মতে তাহারা ছাকীফ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্তও হইয়াছিলেন। ছাকীফের কোন কাফেলা বাহির হইলেই তাহারা হামলা করিতেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬২)।
📄 সালামান প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
সাত সদস্যবিশিষ্ট সালামান প্রতিনিধি দল দশম হিজরীর শাওয়াল মাসে মদীনায় উপস্থিত হইয়া রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। হাবীব ইবন 'উমার (রা) ছিলেন উক্ত প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য। তিনি বলেন, প্রতিনিধি দলে আমরা ছিলাম সাতজন সদস্য। রাসূলুল্লাহ
যখন একটি জানাযায় আমন্ত্রিত হইয়া মসজিদ হইতে বাহির হইলেন তখন আমরা ঐ সুযোগে তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিলাম। আমরা বলিলাম, আস্সালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তিনি জবাব দিলেন : ওয়া আলায়কুম। তোমরা কাহারা? আমরা জবাব দিলাম, আমরা সালামান গোত্রের লোক। আমরা আপনার নিকট ইসলামের বায়'আত হওয়ার জন্য আগমন করিয়াছি। তিনি তখন তাহার গোলাম ছাওবানের দিকে তাকাইয়া নির্দেশ দিলেন : প্রতিনিধি দলের জন্য নির্ধারিত স্থানে উহাদেরকে অবতরণ করাও।
অতঃপর যুহরের নামাযান্তে তিনি মিম্বর এবং তদীয় গৃহের মধ্যবর্তী স্থানে বসিলেন এবং আমরা তাঁহাকে নিকটে বসিয়া সালাত এবং শারীআতের নিয়ম-নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করিলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করিলাম। তিনি আমাদের প্রত্যেককে পাঁচ উকিয়া হিসাবে উপঢৌকন প্রদান করেন। তারপর আমরা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করি (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৩২-৩)।
যাদুল-মা'আদ ও আসাহহুস-সিয়ারের বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত প্রতিনিধি দল ঐ দিন রাসূলুল্লাহ-এর সহিত যুহর ও 'আসর উভয় নামায আদায় করিয়াছিলেন। আসরের নামায যুহরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত ছিল। বর্ণনাকারী প্রতিনিধি দলের সদস্য হাবীব ইব্ন 'উমার বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সর্বোত্তম আমল কী? তিনি বলেন: নির্ধারিত সময়ে নামায আদায় করা।
অতঃপর প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর নিকট তাঁহাদের দেশে অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের অনুযোগ করিলে তিনি দুই হাত উঠাইয়া তাহাদের দেশে বৃষ্টিপাতের জন্য দু'আ করেন। রাবী হাবীব ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পবিত্র হস্তদ্বয় আরও ঊর্ধ্বে উঠাইয়া দু'আ করুন যাহাতে বৃষ্টি অধিক পরিমাণে ও মুষলধারায় হয়। রাসূলুল্লাহ মুচকি হাসিয়া হস্তদ্বয় এতই ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিলেন যে, তাহার বগলের শুভ্রতা স্পষ্টভাবে দেখা গেল। অতঃপর তিনি দাঁড়াইয়া যান এবং আমরা সেখান হইতে প্রস্থান করি। আমরা তিন দিন পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করিয়া তাহার আতিথ্য গ্রহণ করি। অতঃপর আমরা বিদায় চাহিলে তিনি উপঢৌকস্বরূপ আমাদের প্রত্যেকটে পাঁচ উকিয়া হারে প্রদান করেন। তারপরও বিলাল বিনয়সহ দুঃখ করিয়া বলেন, আজ আমার কাছে আর অতিরিক্ত কোন অর্থ নাই। আমরা বলিলাম, ইহাই তো প্রচুর। অতঃপর আমরা দেশে চলিয়া আসিয়াই শুনিতে পাই, যেদিন রাসূলুল্লাহ যে সময়ে আমাদের দেশে বৃষ্টিপাতের জন্য দু'আ করিয়াছিলেন ঠিক ঐ সময়েই সেখানে বৃষ্টিপাত হইয়াছিল (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪৩৪; রঈস আহমদ জাফরীকৃত উর্দু ভাষ্য, নফীস একাডেমী করাচী, ১ম সং ১৯৬২; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪৮৯, বাংলা ভাষ্য; মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, ২খ., পৃ. ৪৪৪, আবদুল জব্বার আসিনী অনূদিত উর্দুভাষ্য, করাচী, তা. বি.)।
📄 জুহায়না প্রতিনিধি দলের আগমন
ইবন সা'দ, হিশাম ইবন মুহাম্মাদ ইবনিস সাইব আল-কালবী আবু আবদির রাহমান আল-মাদানী সূত্রে বর্ণনা করেন, যখন নবী কারীম মদীনায় পদার্পণ করেন, তখন বনূর রাব'আ ইবন রামাদান ইবন কায়স ইন্ন জুহায়না গোত্রের দুই সহোদর ভাই আবদুল উয্যা ইন্ন বদর এবং আবূ রাও'আ নবী দরবারে আসিয়া উপস্থিত হন। দ্বিতীয়োক্ত আবূ রাও'আ প্রথমোক্ত বদরের চাচার ঔরসজাত সন্তান হইলেও উভয়ে একই মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের নাম জিজ্ঞাসা করিলে প্রথমজন বলিলেন, 'আবদুল-উয্যা এবং দ্বিতীয়জন বলিলেন, আবূ রাও'আন। রাসূলুল্লাহ্ প্রথমজনকে বলিলেন: ا أنت عبد الله أنت رعت العدو إن شاء الله : IRROR GAYER চাহেন তো তুমি শত্রুদিগকে ভীতিগ্রস্ত করিয়া তুলিবে।" কেননা রাও'উন শব্দের অভিধানিক অর্থ ভীতি। তারপর তাহাদের গোত্র পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা যখন বনূ গায়্যান (بنو غيان) বলিয়া পরিচয় দিলেন, তখন তিনি বলিলেন أنتم بنو رشدان তোমরা বনু রাম্দান। তাহাদের এলাকার নাম ছিল غوی "গাওয়া” বা বিভ্রান্তি। সম্ভবত ঐ এলাকার লোকজন প্রায়ই পথ হারাইত, তাই ঐ গোত্রকে বনূ গায়্যান গোত্র বলা হইত। রাসূলুল্লাহ তাঁহার চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী ঐ মন্দ অর্থের নাম পরিবর্তন করিয়া ভ্রান্তির স্থলে রুশদ শব্দ ব্যবহার করিয়া উক্ত গোত্রের ঐরূপ উত্তম অর্থের নামকরণ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ্ ঐ সময় জুহায়নীদের আল-আশ'আর ও আল-আজরাদ নামক পাহাড়দ্বয় সম্পর্কে বলেন : هما من جبال الجنة لا تطؤهما فتنة "ঐ দুইটি বেহেশতী পাহাড়; ঐগুলিকে পদদলিত করিও না, বিপদ হইবে।” রাসূলুল্লাহ্ ঐ আবদুল্লাহ ইব্ন বদরকে মক্কা বিজয়ের দিন একটি পতাকা দিয়া গৌরবান্বিত করিয়াছিলেন এবং তাহাদের জন্য একটি মসজিদের ভূমি বরাদ্দ করিয়া দিয়াছিলেন এবং উহাই ছিল আল-মদীনার প্রথম মসজিদ যাহার জন্য ভূমি বরাদ্দ করা হয়।
وأعطى اللواء يوم الفتح عبد الله بن بدر وخط لهم مسجدهم وهو أول مسجد خط بالمدينة.
ইব্ন সা'দ, হিশাম ইব্ن মুহাম্মাদ—খালিদ ইব্ن সা'ঈদ সূত্রে জুহায়না গোত্রের দুহমান-এর বরাতে তাহার সেই পুত্রের বর্ণনা উদ্ধৃত করেন, যিনি নবী কারীম -এর সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছিলেন। তিনি বলেন, আমর ইব্ن মুররাহ আল-জুহানী বলেন, আমাদের একটি দেবমূর্তি ছিল। আমরা উহার খুব সম্মান করিতাম এবং আমিই ছিলাম ইহার সেবায়েত। যখন নবী কারীম -এর আবির্ভাবের কথা শুনিতে পাইলাম তখন উহা ভাঙ্গিয়া চুরমার করিয়া দিয়া সোজা মদীনার পথে রওয়ানা হইলাম। তাঁহার দরবারে উপস্থিত হইয়া আমি কলেমা শাহাদাত উচ্চারণ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলাম এবং তিনি যে হালাল-হারামের বিধান লইয়া আসিয়াছেন তাহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিলাম। ঐ সময় কবিতায় আমি বলিলাম:
شهدت بأن الله حق وإني لآلهة الأحجار أول تارك وشمرت عن ساقى الإزار مهاجرا إليك أجوب الوعث بعد الدكادك لأصحب خير الناس نفسا ووالدا رسول مليك الناس فوق الحبائك
"সাক্ষ্য দিয়েছি হক শুধু এক আল্লাহ্ অন্তর্যামী পাথুরে দেবতা অসার না-হক তাজিনু সেগুলো আমি ঘৃণাভরে আমি ঐসব ছাড়ি করিয়াছি হিজরত দুর্গম পথ পাড়ি দিয়া আমি সাড়া দিনু হযরত! সেরা মানুষের সঙ্গ লভিতে সহিনু যে কত জ্বালা আল্লাহ্র রাসূলের দেখা পেতে পথ ভাঙ্গিনু কাঁকর ঘেরা"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে তাহার গোত্রের নিকট ইসলামের দাওয়াত দানের দায়িত্ব দিয়া প্রেরণ করেন। কেবল এক হতভাগ্য ব্যক্তি ছাড়া সকলেই তাঁহার ডাকে সাড়া দিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত 'আমর ইব্ن মুররাহ তাহার প্রতি বদদু'আ দিলে ঐ ব্যক্তি বাকশক্তি রহিত ও অন্ধ হইয়া অন্যদের গলগ্রহ হইয়া পড়ে (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৩৩-৪)।
📄 আস্লাম গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন
'উমায়রা ইব্ن আসফা আস্লাম গোত্রের একদল লোকসহ নবী -এর দরবারে আসিয়া উপস্থিত হন। তাহারা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট আরয করেন, আমরা আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছি। আপনি আমাদেরকে এমন একটি মর্যাদায় ভূষিত করুন যাহাতে আরবগণ আমাদের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
اسلم سالها الله والغفار غفر الله لها . "আসলাম গোত্রকে আল্লাহ নিরাপদ রাখুন এবং গিফার গোত্রকে ক্ষমা করিয়া দিন"।
অতঃপর তিনি আসলাম গোত্র, এর সমুদ্রোপকূল ও সমভূমিতে বসবাসকারী আরব গোত্রসমূহের জন্য সাদাকা এবং পশু সম্পদের উপর নির্ধারিত ফারাইয (অবশ্য প্রদেয়) হারের একটি তালিকা সম্বলিত পত্র দান করেন। পত্রখানি লিখেন ছাবিত ইন্ন কায়স ইব্ن শাম্মাস এবং উহার সাক্ষীরূপে থাকেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ও 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৪৫)।