📄 বনুল বাক্কা প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
নবম হিজরীতে বানুল বাক্কার তিন সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল নবী-এর দরবারে উপস্থিত হয়। এই দলে ছিলেন (১) মু'আবিয়া ইন্ন ছাওর। তিনি ছিলেন শতায়ু, সঙ্গে ছিল তাঁহার পুত্র বিশর; (২) ফুজায়' ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন জুনদাহ্ ইবনুল বাক্কা। তাঁহাদের অপর সঙ্গী ছিলেন (৩) 'আব্দ 'আমর আল-বাক্বায়ী। রাসূলুল্লাহ তাঁহাদের আদর-আপ্যায়নের নির্দেশ দেন এবং প্রত্যাবর্তনকালে তাহাদেরকে উপঢৌকন প্রদান করেন।
মু'আবিয়া নবী কারীম-কে বলেন, আমি আপনার পরশের বরকত হাসিল করিতে আগ্রহী। আমি বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছি, আর আমার ঐ পুত্রটি অত্যন্ত পিতৃভক্ত। আপনি উহার চেহারায় আপনার পবিত্র হস্তের পরশ দান করুন! তখন রাসূলুল্লাহ সস্নেহে তাহার মুখমণ্ডলে পবিত্র হস্ত বুলাইয়া দিলেন। তিনি তাঁহাকে কয়েকটি মেটে রঙের ছাগী দান করিলেন এবং ঐগুলিতে বরকতের জন্য দু'আও করিয়া দিলেন। রাবী জা'দ বলেন, অতঃপর বানুল বাক্কা গোত্রে কখনও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলেও ঐ পরিবারে দুর্ভিক্ষ দেখা দিত না। বিশরের পুত্র মুহাম্মাদ এই প্রসঙ্গে কবিতা রচনা করেন। তাহাতে তিনি বলেন:
وإبي الذي مسح الرسول برأسه ودعا له بالخير والبركات أعطاه أحمد إذ أتاه أعنزا عفرا نواجل ليس باللجنات يملأن وفد الحي كل عشية ويعود ذاك الملء بالغدوات بوركن من منح ويورك مانحا وعليه منى ما حبيت صلاتي
"সেই সে আমার পিতা রাসূলুল্লাহর স্পর্শ লভিয়া ধন্য যাহার মাথা। দু'আ দিয়ে তারে দানিলেন তিনি মেটো বরণের ছাগী শীর্ণ হরিণসম সেইগুলি, কিন্তু যে ধীরগামী লোমশ ওগুলো ছিল না কো কভু, ছিল না কো কদাকার সকাল বিকাল পুরো তল্লাটে বিলাইত দুধ তার সে দুধে ভরিয়া উঠিত বস্তির পাত্র যে বেশুমার বরকতময় ছিল সেই দান, বরকতময় দাতা তার
যতদিন বাঁচি দরূদ ভেজিব তাঁর পরে অনিবার” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩০৪: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ১৬৮-৬৯; ইফা প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য)।
📄 কুশায়র ইব্ন কা'ব গোত্রের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
ইবন সা'দ বলেন, হিশাম ইব্ন মুহাম্মাদ বনূ আকীলের এক ব্যক্তির বরাতে এবং আলী ইন্ন মুহাম্মাদ আল-কারশী এই দুই ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেন, হুনায়ন যুদ্ধের পর এবং বিদায় হজ্জের পূর্বে কুশায়র প্রতিনিধি দল নবী কারীম-এর সহিত সাক্ষাত করিতে মদীনায় আগমন করে। ছাওর ইন্ন উরওয়া ইব্ন আবদিল্লাহ ইব্ন সালামা ইব্ন কুশায়র ঐ দলে ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে একটি জায়গীর বরাদ্দ দেন এবং তাঁহাকে একটি পত্রও লিখিয়া দেন। তাঁহাদের ঐ দলে হাযদা ইবন মু'আবিয়াও ছিলেন। এই দলে আরও ছিলেন কুরাহ ইব্ন হুবায়রা ইবন সালামা আল-খায়র ইব্ন কুশায়র। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে উপহার সামগ্রী দান করেন। তিনি তাহাকে বিশেষভাবে একটি ডোরা কাটা চাদর দান করেন এবং তাঁহার সম্প্রদায়ের যাকাত উশুলের যিম্মাদার বানাইয়া তাহাদের আমীর নিযুক্ত করিয়া দেন। প্রত্যাবর্তনকালে ঐ কুররাহ্ একটি কবিতা রচনা করেন। তাহাতে তিনি বলেন:
حباها رسول الله إذ نزلت به وأمكنها من نائل غير منفد فأضحت يروض الخضر وهى حثيثة وقد أنجحت حاجاتها من محمد عليها فتى لا يردف الذم رحلة تروك الأمر العاجز المتردد
"যখন উটনীটি মোর অবতরণ করলো নবীজীর কাছে তখন তিনি তাকে ধন্য করলেন অফুরন্ত দানে 'সবুজ শ্যামল ভূমি সে অতিক্রম করছে ত্রস্ত গতিতে মুহাম্মাদ পূরণ করে দিয়েছেন তার সকল প্রয়োজন তার উপর আরূঢ় এমন এক যুবক দুর্নাম যার সহযাত্রী হয় না কখনো নিরুপায় দুঃস্থদের সেবায় সে সদা আত্মনিবেদিত” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩০৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৬৮, বাংলা ভাষ্য)।
📄 নবী (সা)-এর দরবারে জা'দা প্রতিনিধি
ইবন সা'দ বলেন, 'উকায়লের এক ব্যক্তির বরাতে হিশাম ইবন মুহাম্মাদ আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, আর-রাক্কাদ ইবন আমর ইবন রাবী'আ ইব্ন জা'দা ইব্ন কা'ব নবী দরবারে আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ তাহাকে উপঢৌকন প্রদান করেন এবং তাহার স্বপক্ষে একটি পত্রও লিখিয়া দেন। পত্রখানি ঐ গোত্রে সংরক্ষিত রহিয়াছে (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩০৩)।
📄 খাওলান প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
দশম হিজরীর শা'বান মাসে খাওলানের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে উপস্থিত হন। এই দলে দশজন সদস্য ছিলেন। তাঁহারা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা মহান আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছি। তদীয় রাসূলের সত্যতার প্রতি আমরা বিশ্বাস স্থাপন
করিয়াছি। আমরা কেবল আপনার দর্শন লাভের উদ্দেশ্যে উটের পিঠে চড়িয়া দুস্তর মরু অতিক্রম করিয়া অনেক কষ্টে আপনার খিদমতে উপস্থিত হইয়াছি। আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের ইহসানই বলিতে হইবে যে, আমরা সেই তওফীক লাভ করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
واما ما ذكرتم من مسيركم الى فان لكم بكل خطوة خطاها بعير أحدكم حسنة واما قولكم زائرين لك فانه من زارني جوارى يوم القيامة. "তোমরা সফরের যে কষ্টের কথা উল্লেখ করিয়াছ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উটের প্রতিটি পদক্ষেপে একটি করিয়া ছওয়াব দান করিয়াছেন। আর আমাকে দর্শনের যে উল্লেখ তোমরা করিয়াছ তাহার ছওয়াব বা প্রতিদান হইল: যে ব্যক্তি মদীনায় আমার যিরায়ত করিবে, কিয়ামতের দিন সে আমার প্রতিবেশীরূপে থাকিবে"। পর রাসূলুল্লাহ তাহাদেরকে আম্মে আনাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। উহা ছিল ঐ গোত্রের পূজিত দেবমূর্তি। তাহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি জানিয়া খুশী হইবেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে উহার উত্তম বিকল্প অর্থাৎ ইসলাম দান করিয়াছেন। আমাদের এক বৃদ্ধ ও এক বৃদ্ধা মাত্র উহাকে আকড়াইয়া রহিয়াছে। দেশে ফিরিয়া ইনশাআল্লাহ্ আমরা উহা ধ্বংস করিয়া ফেলিব। তাঁহারা আরও বলেন, আম্মে আনাস আমাদেরকে মহা সমস্যায় ফেলিয়া দিয়াছিল ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই বৎসর ভীষণ খরা পড়িয়াছিল। আমরা সাধ্যানুসারে অর্থ সংগ্রহ করিয়া এক শতটি ষাঁড় খরিদ করি এবং আম্মে আনাসের জন্য উহার সবকয়টি এক দিনে বলি দিয়া ফেলিয়া রাখি। হিংস্র জন্তুরা আসিয়া ঐগুলি উদরস্থ করিতে থাকে, অথচ আমরাই ছিলাম ঐ হিংস্র জন্তুগুলির তুলনায় অধিকতর হকদার। এই ঘটনার পরের দিনই বৃষ্টিপাত হইলে লোকে বলাবলি করিতে থাকে যে, ইহা হইতেছে আম্মে আনাসেরই অনুগ্রহের ফল। তাহারা আরও বলেন, আমাদের লোকজন নিজেদের পশুপাল ও ক্ষেতখামারের একাংশ আম্মে আনাসের জন্য এবং একাংশ আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করিয়া রাখিত। আম্মে আনাসের জন্য নির্দিষ্ট অংশে ফসল ভাল না হইলে আল্লাহ্ জন্য নির্দিষ্ট অংশ হইতে তাহা পূরণ করা হইত। কিন্তু আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট অংশের ফসল নষ্ট হইলে দেবতার জন্য নির্দিষ্ট অংশ হইতে কোন দিন তাহার ক্ষতিপূরণ করা হইত না। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: এই ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা আমার নিকট ওহী নাযিল করিয়াছেন।
وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا دَرَءَ مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيبًا فَقَالُوا هَذَا لِلَّهِ مِنْ زَعْمِهِمْ وَهَذَا لِشُرَكَائِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلا يَصِلُ إِلَى اللهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَى شُرَكَائِهِمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ. "আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করিয়াছেন, তন্মধ্য হইতে তাহারা আল্লাহ্ জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলে, ইহা আল্লাহর জন্য এবং ইহা আমাদের দেবতার জন্য। যাহা তাহাদের দেবতাদের অংশ তাহা আল্লাহর কাছে পৌছায় না এবং যাহা আল্লাহর অংশ তাহা তাহাদের দেবতাদের কাছে পৌঁছায়। তাহারা যাহা মীমাংসা করে তাহা নিকৃষ্ট” (৬ঃ ১৩৬)।
প্রতিনিধি দলের সদস্যগণ আরও বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আমাদের ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসার জন্য আম্মে আনাসকে সালিশ মানিতাম। সে রীতিমত কথাবার্তা বলিয়া আমাদের বিবাদ মীমাংসা করিয়া দিত। রাসূলুল্লাহ বলিলেন : মূলে শয়তানই উহার মধ্য হইতে তোমাদের সহিত কথাবার্তা বলিত। তারপর তাহারা শারী'আতের অবশ্য করণীয় বিষয়সমূহ শিক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ কয়েকটি ব্যাপারে তাহাদেরকে তাকীদ দেন। তিনি বলেন, ওয়াদা করিলে তাহা পূরণ করিবে, আমানত রক্ষা করিবে, প্রতিবেশীদের প্রতি লক্ষ্য রাখিবে। কাহারও প্রতি কোনরূপ অত্যাচার করিবে না।
والظلم ظلمات يوم القيامة. "আর যুলুম হইতেছে কিয়ামতের অন্ধকাররাশি"।
বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ তাহাদেরকে পাথেয় দেন এবং তাহারা দেশে পৌঁছিয়াই আম্মে আনাস দেবতাটি ধ্বংস করিয়া ফেলেন (আসাহহুস সিয়ার, বাংলা ভাষ্য, পৃ. ৪৮৩-৮৪; উয়ুনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৩; যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ১৫৪-৬, উর্দুভাষ্য)।
ইবন সা'দ বলেন, তাহাদেরকে প্রদত্ত উপঢৌকন ছিল বার উকিয়া ও এক নাম্। উটের পালান খোলার পূর্বেই তাঁহারা দেবমূর্তি ধ্বংস করিয়াছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ নির্দেশিত হালালকে হালাল-রূপে এবং হারামকে হারামরূপে গ্রহণ করিয়া লইয়াছিলেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৪)।