📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে মুহারিব প্রতিনিধি দল
রাসূলুল্লাহ সমীপে মুহারিব প্রতিনিধি দল
১০ম হিজরীর বিদায় হজ্জের বৎসর মুহারিব গোত্রের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে আসিয়া উপস্থিত হয়। গোটা আরবে ইহারা ছিল অত্যন্ত বদমিযাজ ও রুক্ষ-কর্কশ স্বভাবের লোক। প্রথম প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ বিভিন্ন গোত্রের নিকট উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণের আহ্বান করিতেন, তখন তাহারা তাঁহার সহিত অতন্ত দুর্ব্যবহার করে।
উক্ত প্রতিনিধি দলে দশজন সদস্য ছিল। তাহারা তাহাদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরূপে আসিয়াছিল। একদিন যুহর হইতে আসর পর্যন্ত তাহারা নবী দরবারে হাযির ছিল। তাহাদের মধ্যকার একজনকে রাসূলুল্লাহ চিনিতে পারেন এবং দীর্ঘক্ষণ ধরিয়া তাহাকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করিতে থাকেন। ঐ মুহারিবী ব্যক্তিটি উহা লক্ষ্য করিয়া বলিয়া উঠিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সম্ভবত আপনি আমার সম্পর্কে কিছু একটা ভাবিতেছেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন, হাঁ তোমাকে কোথায় যেন আমি ইতোপূর্বে দেখিয়াছি। ঐ মুহারিবী ব্যক্তিটি বলিল, হাঁ, আল্লাহ্ কসম! আপনি আমাকে দেখিয়াছেন এবং আপনার সহিত আমার বাক্যালাপও হইয়াছে। সেদিন আমি আপনার সহিত অত্যন্ত রুক্ষ ভাষায় কথাবার্তা বলিয়াছিলাম। আমি আপনাকে উকাযের মেলায় অত্যন্ত রুক্ষভাবেই প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম। ইহা হইতেছে ঐ যুগের কথা যখন আপনি গোত্রে গোত্রে ঘুরিয়া ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিতেন।
লোকটা নিজেই বলিল, সেদিন আমার বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কেহই আমার চেয়ে আপনার প্রতি অধিকতর বৈরী ছিল না। الحمد لله الذي ابقانى حتى صدقت بك "আল্লাহর শোকর যে, তিনি আমাকে আজ পর্যন্ত বাঁচাইয়া রাখিয়াছেন এবং আজ আমি আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছি"। আমার সেদিনের সকল সঙ্গীই তাহাদের সেই পুরাতন বাতিল ধর্মের প্রতি বিশ্বস্ত ও অবিচল থাকিয়াই মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: ان هذه القلوب بيد الله عز وجل "এই অন্তরসমূহ নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলারই হাতে রহিয়াছে।” তারপর তাহারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন।
তখন ঐ মুহারিবী ব্যক্তিটি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার জন্য দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি সেদিনের দুর্ব্যবহারের গুনাহ মাফ করেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, ইসলাম গ্রহণে পূর্বেকার গুনাহসমূহ মোচন হইয়া যায়। তারপর তাঁহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪৮৪-৫, বাংলা অনুবাদ)।
তাবাকাতের বর্ণনায় এই প্রতিনিধি সংক্রান্ত বিবরণে প্রাপ্ত অতিরিক্ত তথ্য হইল, ঐ প্রতিনিধি দল সাওয়া ইবনুল হারিছ এবং তাঁহার পুত্র খুযায়মা ইব্ن সাওয়াও ছিলেন। তাঁহারা রামলা বিনতুল হারিছ-এর বাড়ীতে উঠিয়াছিলেন। বিলাল সকাল-সন্ধ্যায় তাহাদের আহার্য নিয়া আসিতেন। তাবাকাতের ঐ প্রসঙ্গের সর্বশেষ বাক্যে বলা হইয়াছে:
ومسح وجه خزمية بن سواء فصارت له عرة بيضاء واجارهم كما يجبير الوفد.
"রাসূলুল্লাহ খুযায়মা ইবন সাওয়ার চেহারায় পবিত্র হস্ত বুলাইয়া দেন, ফলে তাহা উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় হইয়া উঠে। রাসূলুল্লাহ অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাহাদেরকেও উপঢৌকনাদি প্রদান করেন" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৯৯, ঐ, ভিন্ন সংস্করণ, ৩খ., পৃ. ৪৩; ইন্ন
কাছীর, আস্-সীরাতুন নাবابিয়্যা, ৪খ., পৃ. ১৭২-৩; বৈরূত মুদ্রণ, ১৩৯৫/১৯৮৬; ঐ লৈখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৬৬-৭; ইফা প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য, ইবনুল-কাইয়্যিম, যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ ৫০; ঐ, উর্দু ভাষ্য, পৃ. ১৫৭-৮; ইব্ন সায়্যিদিন্নাস, উযূনুল-আছার, ২খ., পৃ. ২৫৩, বৈরূত ১৯৭৭ খৃ.)।
📄 গাস্সানী প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরবারে আগমন
গাস্সানী প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে আগমন
গাস্সান ছিল আরবদের একটি বড় ও শক্তিমালী কবীলা। ধর্মত ইহারা সকলেই খৃস্টান ছিল। রোমক সম্রাটের পক্ষ হইতে আরবের এক বিরাট এলাকা জুড়িয়া তাহাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। দশম হিজরীর রমযান মাসে গাস্সানের তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁহারা বলেন, আমাদের জাতির লোকজন ইহা গ্রহণ করিবে কি না তাহা আমাদের জানা নাই। কেননা তাহারা তাহাদের রাজত্ব রক্ষা ও রোমক সম্রাটের নৈকট্যের জন্যই লালায়িত। রাসূলুল্লাহ অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাহাদেরকেও পাথেয় উপঢৌকনাদি দিয়া বিদায় দেন।
তাহাদের স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তনের পর কেহই তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিল না। কেহ ইসলামও গ্রহণ করিল না। তাহারা তাহাদের নিজেদের ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখিলেন। তাহাদের মধ্যকার দুইজন মুসলমান অবস্থায়ই ইনতিকাল করেন। তৃতীয়জন হযরত উমার (রা)-এর খিলাফত আমলে ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় হযরত আবু উবায়দা (রা)-এর সহিত আসিয়া মিলিত হন। তিনি তাহাদের ইসলাম গ্রহণের কথা আবূ উবায়দাকে অবগত করেন। হযরত আবূ উবায়দা (রা) তাহাকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন (আসাহহুস সিয়ার, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৪৮৯; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১৩৮; যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ১৬১; উর্দুভাষা, রইস আহমদ জাফরী, মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, উর্দু ভাষ্যা ২খ., পৃ. ৪৪৮)।
📄 কিনানা প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আগমন
কিনানা প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে আগমন
ওয়াছিলা ইবনুল আসকা' আল-লায়ছী এমন সময় রাসূলুল্লাহ -এর খিদমতে উপস্থিত হন যখন তিনি তাবুক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ -এর সহিত জামা'আতে ফজরের নামায আদায় করিয়াই তাঁহার সহিত দেখা করেন। রাসূলুল্লাহ তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন : ما أنت وما جاء بك وما حاجتك ؟
"তুমি কে? কী বস্তু তোমাকে এখানে আসিতে বাধ্য করিল? কী তোমার প্রয়োজন"? জবাবে ওয়াছিলা তাঁহার বংশপরিচয় ব্যক্ত করিলেন। তিনি বলিলেন, أتيتك لاؤمن بالله ورسوله فبايعني على ما أحببت وكرهت. আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নের জন্য আমি আপনার নিকট উপস্থিত হইয়াছি। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
তাহা হইলে আমার পসন্দ অপসন্দকে প্রাধান্য দিবে এই শর্তে বায়'আত গ্রহণ কর। তিনি সেইমতে রাসূলুল্লাহ -এর পবিত্র হস্তে বায়'আত গ্রহণ করিলেন এবং স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করিয়া উহা তাহাদেরকে অবহিত করিলেন। তাঁহার পিতা এই কথা শুনিয়া চিরতরে তাহার সহিত বাক্যালাপ বন্ধের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু তাহার ভগ্নি এই সংবাদে প্রীত ও মোহিত হইলেন। তিনি
ইসলাম গ্রহণ করিলেন এবং তাহার ভাইয়ের যুদ্ধযাত্রার জন্য তাঁহাকে প্রস্তুত করিয়া দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ -এর সহিত মিলিত হইবার উদ্দেশ্যে মদীনায় ফিরিয়া গেলেন, কিন্তু ততক্ষণে আল্লাহ্র রাসূল তাবুকের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়িয়াছেন। তখন তিনি ঘোষণা দিলেন:
من يحملني عقبه وله سهمی "যে আমাকে তাহার উটের সহ-আরোহী করিবে তাহাকে আমি আমার প্রাপ্য গনীমত প্রদান করিব"।
হযরত কা'ব ইব্ن উজরা (রা) তাঁহাকে সহযাত্রীরূপে গ্রহণ করিলেন এবং তাঁহারা তাবুকের রাসূলুল্লাহ-এর সহিত গিয়া মিলিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ খালিদ ইব্ন ওয়ালীদকে উকায়দির অভিযানে প্রেরণকালে তাহাকেও তাঁহার সঙ্গে প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি প্রচুর গনীমত-সম্ভার লাভ করেন এবং পূর্ব ঘোষণামত হযরত কা'ব ইব্ن উজরাকে অংশ দিতে তাহার নিকট গিয়া উপস্থিত হন। কিন্তু কা'ব (রা) এই বলিয়া উহা ফিরাইয়া দেন, আমি কেবল আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আপনাকে সহ-আরোহীরূপে গ্রহণ করিয়াছিলাম (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩০৫-৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৬৯, ইফা প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য)।
📄 আশজা গোত্রীয় প্রতিনিধিদলের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আগমন
আশজা' গোত্রীয় প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ-এর খেদমতে আগমন
আশজা' গোত্রের প্রতিনিধিদল খন্দকের যুদ্ধের বৎসর রাসূলুল্লাহ-এর খেদমতে হাযির হয়। সংখ্যায় তাহারা ছিল এক শতজন এবং দলপতি ছিলেন মাস'উদ ইব্ن রুখায়লা। তাহারা সালা' পর্বতের গিরিপথে আসিয়া অবতরণ করে। রাসূলুল্লাহ তাঁহাদেরকে কয়েক থলে খেজুর প্রদান করেন। তাহারা অনুযোগ করিয়া বলে:
يا محمد لا نعلم أحدا من قومنا أقرب داراً منك منا ولا أقل عددا وقد ضقنا بحربك وبحرب قومك فجئنا نوادعك. “হে মুহাম্মাদ! আমাদের চেয়ে নিকট প্রতিবেশী এবং স্বল্পসংখ্যক প্রতিবেশী আপনার আর কোন গোত্র আছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। আপনার এবং আপ্নার জাতির যুদ্ধ-বিগ্রহে আমরা অতিষ্ঠ হইয়া পড়িয়াছি। তাই আপনার সহিত একটা সমঝোতায় উপনীত হওয়ার উদ্দেশ্যে আপনার সমীপে আসিয়াছি।"
সেমতে রাসূলুল্লাহ তাহাদের সহিত একটি সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন। কেহ কেহ বলেন বরং বনু কুরায়যার যুদ্ধের পর আশজা' প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর খেদমতে আগমন করিয়াছিল। আর সংখ্যায় তাহারা ছিল ভিন্নমতে সাত শত জন। রাসূলুল্লাহ তাহাদের সহিত সমঝোতায় উপনীত হইয়াছিলেন। পরবর্তীতে তাহারা ইসলাম গ্রহণ করেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩০৬; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৬৯, বাংলা ভাষ্য; ঐ, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ১৭৬, বৈরূত ১৯৭৬ খৃ.)।