📄 বালিয়্যি প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
'রু'আয়ফি' ইন্ন ছাবিত আল-বালাবী (রা) বলেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকজন নৰম হিজরীর রাবীউল আওয়াল মাসে মদীনায় আগমন করিলে আমি বনূ জাদীলায় অবস্থিত আমার নিজ বাড়ীতে তাহাদেরকে উঠাই। অতঃপর তাঁহাদেরকে লইয়া নবী দরবারে উপস্থিত হই। নবী কারীম তখন আসহাব পরিবেষ্টিত অবস্থায় ছিলেন। তিনি আমাকে ও তাহাদেরকে স্বাগতম জানাইলেন। তাহাদের দলপতি আবুদ দিবাব (বর্ণনান্তরে আবুদ দাবীব) অগ্রসর হইয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর সম্মুখে বসিয়া কথোপকথন শুরু করিলেন। তাহারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করিলেন। বলিলেন: রাসূলুল্লাহ্ الحمد لله الذي هداكم للإسلام من مات على غير الاسلام فهو في النار.
"সেই আল্লাহ্ প্রশংসা যিমি তোমাদেরকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করিয়াছেন। যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ ব্যতীত মৃত্যুমুখে পতিত হয় সে জাহান্নামী।"
দলপতি রাসূলুল্লাহ্-কে বলেন, আমার মেহমান আপ্যায়নের বড় সখ। ইহাতে কি কোন ছওয়াব আছে? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: كل معروف صنعته الى غنى او فقير فهو صدقة.
"যে কোন উপকার, চাই তাহা ধনীর জন্য কর, চাই দরিদ্রের জন্য কর তাহা সাদাকাস্বরূপ।"
তখন প্রতিনিধি দলের নেতা আবার প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপ্যায়ন কয় দিন পর্যন্ত?
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ বলেন, অতিথি আপ্যায়ন তিন দিন, অতঃপর সাদাকা। মেহমানের জন্য তিন দিনের বেশী অবস্থান করিয়া মেযবানকে বিব্রত করা বৈধ নহে।
অতঃপর তিনি প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! বন-বাদাড়ে প্রান্তরে অনেক মালিক-বিহীন মেষ ছাগল ঘোরাফেরা করিতে দেখা যায়, এইগুলি সম্পর্কে শারী'আতের বিধান কী? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন, এইগুলি হয় তোমার, নতুবা তোমার কোন ভাইয়ের, না হয় নেকড়ের (আহার্য)। প্রশ্নকারী আবার প্রশ্ন করেন, যদি সেই মালিকবিহীন পশুগুলি উট হয়? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন: উহা ব্যবহার তোমার জন্য বৈধ নহে। ঐগুলিকে তাহাদের অবস্থার উপর ছাড়িয়া দাও। মালিক তাহা খুঁজিয়া লইবে বা নিজেরাই মালিকের নিকট পৌঁছিয়া যাইবে।
বর্ণনাকারী হযরত রুআয়ফি' (রা) বলেন, অতঃপর তাহারা নবী কারীম -এর দরবার হইতে উঠিয়া আমার বাড়ীতে চলিয়া আসেন। কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ্ বেশ কিছু খেজুরসহ আমার বাড়িতে আসিলেন এবং বলিলেন: ঐগুলি দ্বারা তাহাদেরকে আপ্যায়িত করিবে। তিনদিন অবস্থানের পর প্রতিনিধি দলটি মদীনা হইতে প্রস্থান করে (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৩০)।
📄 ছা'লাবা প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
ছা'লাবা প্রতিনিধি দলের নবী দরবারে আগমন
ইবন সা'দ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-ওয়াকিদী মূসা ইব্ন মুহাম্মাদ ইব্ন ইবরাহীম বন্ ছা'লাবার জনৈক ব্যক্তির বরাতে বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ৮ম হিজরীতে জি'ইররানা হইতে প্রত্যাগমনের পর আমরা চার ব্যক্তি তাঁহার খিদমতে হাযির হইয়া আরয করি, আমরা আমাদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরূপে আপনার সমীপে উপস্থিত হইয়াছি। আমরা এবং আমাদের সম্প্রদায় ইসলামে বিশ্বাসী এবং ইহা স্বীকার করিয়া থাকি। তখন তিনি আমাদের আদর-আপ্যায়নের নির্দেশ দিলেন। আমরা কিছুদিন মদীনায় অবস্থান করি। তারপর নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া বিদায়ের অনুমতি প্রার্থনা করি। তখন তিনি বিলালের প্রতি নির্দেশ দিলেন:
اجزهم كما تجيز الوفد. "অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত উহাদেরকেও উপঢৌকনাদি প্রদান কর"। সেমতে তিনি একটি খোদাইকৃত রৌপ্যখণ্ড আমাদেরকে দান করিলেন যাহাতে আমরা প্রত্যেকে পাঁচ উকিয়া পরিমাণ রৌপ্য লাভ করিলাম। তিনি বলিলেন: নগদ মুদ্রা এখন হাতে নাই, তাই ইহাই গ্রহণ কর। তারপর আমরা প্রস্থান করি (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৯৮)।
ঐ খোদাইকৃত রৌপ্য খণ্ডে কী খোদাই করা ছিল তাহা স্পষ্ট নহে। তবে আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৫খ., এবং আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা (৩খ., পৃ. ১৭২) গ্রন্থদ্বয়ে ইমাম ইবন কাছীর উক্ত ঘটনার বর্ণনায় نقر শব্দের স্থলে البقرة শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন যাহার অর্থ গাভী। তবে ইবনুল আছীর ঐ শব্দের ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন:
قدر كبيرة واسعة فسماها بقرة من التبقر وهو التوسع أو لانها تسع بقرة بتمامها .
"উহা ছিল একটি বিশাল ডেগ; এই বিশালত্বের জন্য উহাকে এই নামে অভিহিত করিয়াছেন। কেননা বিশালত্বের আরবী প্রতিশব্দ হইতেছে التبقر। অথবা এই কারণে উহাকে বাকার বলা হইয়াছে যে, উহাতে পূর্ণ একটি গাভীর স্থান সঙ্কুলান হইত" (আস্-সীরাতুন নাবابিয়্যা লিইবন কাছীর-এর মুস্তাফা আবদুল ওয়াহিদ কৃত টীকা, ৩খ., পৃ. ১৭২)।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে মুহারিব প্রতিনিধি দল
রাসূলুল্লাহ সমীপে মুহারিব প্রতিনিধি দল
১০ম হিজরীর বিদায় হজ্জের বৎসর মুহারিব গোত্রের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে আসিয়া উপস্থিত হয়। গোটা আরবে ইহারা ছিল অত্যন্ত বদমিযাজ ও রুক্ষ-কর্কশ স্বভাবের লোক। প্রথম প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ বিভিন্ন গোত্রের নিকট উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণের আহ্বান করিতেন, তখন তাহারা তাঁহার সহিত অতন্ত দুর্ব্যবহার করে।
উক্ত প্রতিনিধি দলে দশজন সদস্য ছিল। তাহারা তাহাদের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরূপে আসিয়াছিল। একদিন যুহর হইতে আসর পর্যন্ত তাহারা নবী দরবারে হাযির ছিল। তাহাদের মধ্যকার একজনকে রাসূলুল্লাহ চিনিতে পারেন এবং দীর্ঘক্ষণ ধরিয়া তাহাকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করিতে থাকেন। ঐ মুহারিবী ব্যক্তিটি উহা লক্ষ্য করিয়া বলিয়া উঠিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সম্ভবত আপনি আমার সম্পর্কে কিছু একটা ভাবিতেছেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন, হাঁ তোমাকে কোথায় যেন আমি ইতোপূর্বে দেখিয়াছি। ঐ মুহারিবী ব্যক্তিটি বলিল, হাঁ, আল্লাহ্ কসম! আপনি আমাকে দেখিয়াছেন এবং আপনার সহিত আমার বাক্যালাপও হইয়াছে। সেদিন আমি আপনার সহিত অত্যন্ত রুক্ষ ভাষায় কথাবার্তা বলিয়াছিলাম। আমি আপনাকে উকাযের মেলায় অত্যন্ত রুক্ষভাবেই প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম। ইহা হইতেছে ঐ যুগের কথা যখন আপনি গোত্রে গোত্রে ঘুরিয়া ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিতেন।
লোকটা নিজেই বলিল, সেদিন আমার বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কেহই আমার চেয়ে আপনার প্রতি অধিকতর বৈরী ছিল না। الحمد لله الذي ابقانى حتى صدقت بك "আল্লাহর শোকর যে, তিনি আমাকে আজ পর্যন্ত বাঁচাইয়া রাখিয়াছেন এবং আজ আমি আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছি"। আমার সেদিনের সকল সঙ্গীই তাহাদের সেই পুরাতন বাতিল ধর্মের প্রতি বিশ্বস্ত ও অবিচল থাকিয়াই মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: ان هذه القلوب بيد الله عز وجل "এই অন্তরসমূহ নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলারই হাতে রহিয়াছে।” তারপর তাহারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন।
তখন ঐ মুহারিবী ব্যক্তিটি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার জন্য দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি সেদিনের দুর্ব্যবহারের গুনাহ মাফ করেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, ইসলাম গ্রহণে পূর্বেকার গুনাহসমূহ মোচন হইয়া যায়। তারপর তাঁহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪৮৪-৫, বাংলা অনুবাদ)।
তাবাকাতের বর্ণনায় এই প্রতিনিধি সংক্রান্ত বিবরণে প্রাপ্ত অতিরিক্ত তথ্য হইল, ঐ প্রতিনিধি দল সাওয়া ইবনুল হারিছ এবং তাঁহার পুত্র খুযায়মা ইব্ن সাওয়াও ছিলেন। তাঁহারা রামলা বিনতুল হারিছ-এর বাড়ীতে উঠিয়াছিলেন। বিলাল সকাল-সন্ধ্যায় তাহাদের আহার্য নিয়া আসিতেন। তাবাকাতের ঐ প্রসঙ্গের সর্বশেষ বাক্যে বলা হইয়াছে:
ومسح وجه خزمية بن سواء فصارت له عرة بيضاء واجارهم كما يجبير الوفد.
"রাসূলুল্লাহ খুযায়মা ইবন সাওয়ার চেহারায় পবিত্র হস্ত বুলাইয়া দেন, ফলে তাহা উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় হইয়া উঠে। রাসূলুল্লাহ অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাহাদেরকেও উপঢৌকনাদি প্রদান করেন" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৯৯, ঐ, ভিন্ন সংস্করণ, ৩খ., পৃ. ৪৩; ইন্ন
কাছীর, আস্-সীরাতুন নাবابিয়্যা, ৪খ., পৃ. ১৭২-৩; বৈরূত মুদ্রণ, ১৩৯৫/১৯৮৬; ঐ লৈখক, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৬৬-৭; ইফা প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য, ইবনুল-কাইয়্যিম, যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ ৫০; ঐ, উর্দু ভাষ্য, পৃ. ১৫৭-৮; ইব্ন সায়্যিদিন্নাস, উযূনুল-আছার, ২খ., পৃ. ২৫৩, বৈরূত ১৯৭৭ খৃ.)।
📄 গাস্সানী প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরবারে আগমন
গাস্সানী প্রতিনিধি দলের রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে আগমন
গাস্সান ছিল আরবদের একটি বড় ও শক্তিমালী কবীলা। ধর্মত ইহারা সকলেই খৃস্টান ছিল। রোমক সম্রাটের পক্ষ হইতে আরবের এক বিরাট এলাকা জুড়িয়া তাহাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। দশম হিজরীর রমযান মাসে গাস্সানের তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁহারা বলেন, আমাদের জাতির লোকজন ইহা গ্রহণ করিবে কি না তাহা আমাদের জানা নাই। কেননা তাহারা তাহাদের রাজত্ব রক্ষা ও রোমক সম্রাটের নৈকট্যের জন্যই লালায়িত। রাসূলুল্লাহ অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মত তাহাদেরকেও পাথেয় উপঢৌকনাদি দিয়া বিদায় দেন।
তাহাদের স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তনের পর কেহই তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিল না। কেহ ইসলামও গ্রহণ করিল না। তাহারা তাহাদের নিজেদের ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখিলেন। তাহাদের মধ্যকার দুইজন মুসলমান অবস্থায়ই ইনতিকাল করেন। তৃতীয়জন হযরত উমার (রা)-এর খিলাফত আমলে ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় হযরত আবু উবায়দা (রা)-এর সহিত আসিয়া মিলিত হন। তিনি তাহাদের ইসলাম গ্রহণের কথা আবূ উবায়দাকে অবগত করেন। হযরত আবূ উবায়দা (রা) তাহাকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন (আসাহহুস সিয়ার, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৪৮৯; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১৩৮; যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ১৬১; উর্দুভাষা, রইস আহমদ জাফরী, মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, উর্দু ভাষ্যা ২খ., পৃ. ৪৪৮)।