📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আযদ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 আযদ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


আব্দ প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
আবূ নু'আজ্জম (র) তদীয় মা'রিফাতুস সাহাবা' গ্রন্থে এবং হাফিয আবূ মূসা আল-মাদীনী সনদসহ সুওয়ায়দ ইবনুল হারিছ (রা)-এর প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন, আমি আমার সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের সাত ব্যক্তির সপ্তমজনরূপে রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে উপণীত হই। আমাদের কথা-বার্তা ও চাল-চলন দৃষ্টে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি আমাদেরকে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে আমরা জবাব দিলাম, আমরা মু'মিন। তিনি মৃদু হাসিয়া বলিলেন : প্রত্যেক জাতিরই তাহার নিজস্ব পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য থাকে, তোমাদের সেই বৈশিষ্ট্য ঈমান কী? আমরা জবাব দিলাম, এইরূপ পনেরটি আমল আমাদের মধ্যে রহিয়াছে, সেইগুলির পাঁচটি এমন যেইগুলির প্রতি বিশ্বাস রাখিতে এবং পাঁচটি এমন যেইগুলি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদির দ্বারা কার্যকর করিতে আপনার প্রেরিত দূতগণ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়াছেন। আর পাঁচটি এমন যেইগুলি জাহিলিয়াতের আমল হইতেই আমরা করিয়া আসিতেছি, যদি না কেহ ঐগুলি পরিত্যাগে আমাদেরকে বাধ্য করে।
(وخمس تخلصا بها في الجاهلية فنحن عليها الا انه تكره منهما شيئا ) রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার দূতগণ যে পাঁচটি ব্যাপারে ঈমান আনয়ন করিতে আদেশ করিয়াছে সেইগুলি কী? আমরা বলিলাম, তাঁহাদের নির্দেশিত সেই পাঁচটি আমল হইল, আমরা যেন ঈমান আনয়ন করি (১) আল্লাহ্র প্রতি, (২) তাঁহার ফেরেশতাগণের প্রতি, (৩) তাঁহার কিতাবসমূহের প্রতি, (৪) তাঁহার রাসূলগণের প্রতি এবং (৫) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তাহাদের নির্দেশিত সেই পাঁচটি 'আমল কী? আমরা বলিলাম, তাঁহাদের নির্দেশিত সেই পাঁচটি আমল হইল, (১) যেন আমরা বলিঃ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই, (২) সালাত কায়েম করি, (৩) যাকাত আদায় করি, (৪) রামাদান মাসের সিয়াম সাধনা করি এবং (৫) সামর্থ্য থাকিলে যেন হজ্জ করি। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন : জাহিলিয়াতের যুগ হইতে আচরিত তোমাদের সেই পূর্ব পাঁচটি অভ্যাস কী? আমরা বলিলাম:
الشكر عند الرخاء واصبر عند البلاء والرضا بالقضاء والصدق في مواطن اللقاء وترك شماتة بالاعداء.
(১) সচ্ছলতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, (২) বিপদে ধৈর্য ধারণ, (৩) অদৃষ্টের উপর সন্তুষ্ট থাকা, (৪) সমরাঙ্গনে শত্রুর মুকাবিলায় অটল থাকা ও (৫) শত্রুর দুর্গতি দর্শনে উল্লসিত না হওয়া। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: ইহারা প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞজন, তাহাদের বুৎপত্তি অনেকটা নবীসুলভ।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
انا ازيدكم خمسا فيتم لكم عشرون خصلة ان كنتم كما تقولون. فلا تجمعوا ما لا تأكلون ولا تبنوا ما لا تسكينون ولا تنافسوا في شيئ أنتم عنه غدا تزولون واتقوا الله الذى اليه ترجعون وعليه تعرضون وارعبوا فيما عليه تقدمون وفيه تخلدون
“আমি তোমাদের জন্য আরও পাঁচটি আমল বর্ধিত করিয়া দিতেছি যাহাতে তোমাদের পূর্ণ কুড়িটি প্রশংসনীয় অভ্যাস হইয়া যায়, যদি সত্যসত্যই তোমরা যেমনটি বলিলে তেমনটি হইয়া থাকঃ (১) যাহা খাইতে পারিবে না (ভোগ করিতে পারিবে না) তাহা সঞ্চয় করিবে না। (২) যেখানে বসবাস করিবে না এমন ইমারত বানাইবে না, (৩) এমন বস্তু লইয়া মারামারি হানাহানিতে মত্ত হইবে না যাহা ত্যাগ করিয়া আগামী কল্যই তোমাদের চলিয়া যাইতে হইবে (৪) সেই আল্লাহকে ভয় করিবে, যাঁহার নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হইবে এবং যাঁহার সম্মুখে তোমদেরকে পেশ করা হইবে। আর সেই বস্তুর জন্য লালায়িত হও যেখানে তোমদেরকে যাইতেই হইবে এবং যেখানে তোমরা চিরস্থায়ী হইবে"।
অতঃপর প্রতিনিধি দলটি প্রস্থান করেন এবং তাঁহারা সেইরূপই আমল করেন (আল-বিদায়া ওযান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৮৪-৮৫; ইব্‌ন কাছীর, আস্-সীরাতুন-নাবাবিয়‍্যা, ৪খ., পৃ. ১৮০-১, দারুল-মা'রিফা, বৈরূত, তা. বি.; কাস্তাল্লানী, মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়ার উর্দু ভাষ্য, সীরাতে মুহাম্মাদীয়া, ২খ., পৃ. ৪৫০-১, মাকতাবায়ে রাহমানিয়া, লাহোর তা.বি.)।
আব্দ প্রতিনিধি দলের সদস্যসংখ্যা কত ছিল তাহা লইয়া মতভেদ আছে। কাস্তাল্লানী ঐ দলের সদস্য সংখ্যা পনের ছিল বলিয়াছেন (যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩২)। পূর্বের বর্ণনায় সাত সংখ্যা আমরা লক্ষ্য করিয়াছি। ইবন সা'দ ঐ সংখ্যা بضع عشر দশের অধিক বলিয়াছেন। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেন নাই (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৩৭)। ইব্‌ন খালদুন ঐ সংখ্যা দশ ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (শায়খ মুহাম্মাদ ইসমাঈল পানিপথী, ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, পৃ. ৩৫৭, ইফা. প্রকাশিত ২০০৪)।
সুরাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ আযদী ঐ প্রতিনিধি দলে ছিলেন। মদীনায় তাহারা ফারওয়া ইব্‌ন আমর (রা)-এর বাড়ীতে উঠেন। তিনি তাহাদেরকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং যথারীতি তাহাদের আদর-আপ্যায়ন করেন। জ্ঞান-গরিমায় সুরাদ ইব্‌ন আবদুল্লাই ছিলেন দলের সর্বোত্তম ব্যক্তি। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করিয়া দশদিন মদীনায় অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ সুরাদকেই তাঁহাদের আমীর নিযুক্ত করেন এবং পার্শ্ববর্তী ইয়ামানের মুশরিক গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনার নির্দেশ দেন।
সেইমতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ن সুরাদ জুরাশ শহরে অভিযান চালান। শহরটি ছিল প্রাচীরবেষ্টিত ও সুরক্ষিত দুর্গবিশিষ্ট। ইয়ামানের বিভিন্ন গোত্রের লোকজন উহাতে দুর্গবদ্ধভাবে বসবাস করিত। তিনি অগ্রসর হইয়া তাহাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাইলেন। তাহারা ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করে এবং দুর্গের খিল আটকাইয়া দিয়া উহাতে অবরুদ্ধ হইয়া রহিল। দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত বিলম্ব করিয়া আবদুল্লাহ্ ইব্‌ن সুরাদ অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন। জুরাশবাসীরা ইহাতে মুসলমানদের পরাজয় ও পশ্চাদপসরণ ভাবিয়া তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন
করার উদ্দেশ্যে দুর্গ হইতে বাহির হইয়া পড়ে। তাহারা যখন শাকার পাহাড়ের নিকট উপনীত হইল তখন মুসলিম বাহিনী ফিরিয়া দাঁড়াইল। দিনভর যুদ্ধে জুরাশবাসীরা পরাজিত হয় এবং তাহাদের অনেক লোক হতাহত হয়। মুসলিম বাহিনী তাহাদের কুড়িটি ঘোড়া ছিনাইয়া লয়।
এদিকে জুরাশবাসিগণ ইতোপূর্বেই তাহাদের দুইজন প্রতিনিধিকে নবী দরবারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিয়া দিয়াছিল। আসরের পর সন্ধ্যার দিকে তাহারা যখন নবী দরবারে উপস্থিত হইল তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, শাকার নামক স্থানটি কোথায় অবস্থিত? জুরাশবাসী উক্ত দুই ব্যক্তি দাঁড়াইয়া আরয করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাদের দেশে কাশার নামক একটি পাহাড় আছে। তাহারা উক্ত পাহাড়কে এই নামেই অভিহিত করিত। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, ঐ পাহাড়টা আসলে কাশার নহে, শাকার। তাহারা বলিল, ঐ স্থানের কী অবস্থা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, ঐ পাহাড়ের পাদদেশে অচিরেই আল্লাহ্ কিছু বান্দার জীবন নাশ ঘটিবে। কথাটি তিনি রূপকভাবে বলিয়াছিলেন, এইভারে الان عنده لنحرن ان بدن الله )এখনই আল্লাহর বেশ কিছু উট ঐখানে যবেহ হইতেছে)।
রাবী বলেন, উক্ত দুই ব্যক্তি তখন দৌড়াইয়া হযরত আবূ বকর এবং হযরত উছমান (র)-এর নিকট গেল এবং এখন তাহাদের করণীয় কি জিজ্ঞাসা করিল। তাঁহারা বলিলেন, হতভাগারা! রাসূলুল্লাহ্ তো আসলে তোমাদের সম্প্রদায়ের বিপন্ন হওয়ারই সংবাদ দিতেছেন। তাড়াতাড়ি নবী দরবারে হাযির হইয়া তাঁহাকে তোমাদের সম্প্রদায়ের বিপদমুক্তির জন্য দু'আ করার আবেদন জানাও। তাহারা দৌড়াইয়া গিয়া নবী দরবারে উপস্থিত হইল এবং তাহাদের সম্প্রদায়ের বিপদমুক্তির জন্য দু'আ কামনা করিল। তিনি তাহাদের জন্য সেইরূপ দু'আ করিলেন। তিনি তখন বলেন : اللهم ارفع عنهم “হে আল্লাহ্! তাহাদেরকে বিপদমুক্ত করিয়া দিন”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনূ আক্স প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 বনূ আক্স প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


বনূ 'আক্স প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
ইসলামের প্রথম দিকে হিজরতকারী নয় সদস্যবিশিষ্ট বনূ 'আক্সের একটি প্রতিনিধি দল নবী দরবারে উপস্থিত হয়। তাঁহারা হইতেছেন: (১) মায়সারা ইবন মাসরূক, (২) হারিছ ইবনুর রবী, তিনি আল-কামিল নামেও অভিহিত হইতেন। (৩) কানান ইন্ন দারিম, (৪) বিশ্র ইবনুল হারিছ ইবন 'উবাদা, (৫) হিদম ইবন মাস'আদা, (৬) সিবা' ইবন যায়দ, (৭) আবুল হিস্স ইবুন লুকমান, (৮) 'আবদুল্লাহ ইবন মালিক ও (৯) ফারওয়া ইবনুল হুসায়ন ইব্‌ন ফুদালা। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদের জন্য দু'আ করেন এবং বলেন:
ابغوني رجلا يعشركم أعقد لكم لواء. "আমি এমন একজন লোকের সন্ধান করিতেছি যে তোমাদের সংখ্যা দশে উন্নীত করিবে এবং আমি তোমাদের জন্য একটি পতাকা তাহার হাতে তুলিয়া দিব।” এমন সময় তাল্হা ইবন 'উবায়দুল্লাহ্ আসিয়া প্রবেশ করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদের জন্য একটি পতাকা তুলিয়া নিজ হাতে বাধিয়া দিলেন এবং তাহাদের সামরিক সংকেতধ্বনি নির্ধারিত করিয়া দিলেন: يا عشرة (ইয়া আশারা)।
ইবন ইসহাক বলেন, মুহাম্মাদ ইবন উমার, আম্মার ইব্‌ন 'আবদুল্লাহ ইবন 'আবস আদ-দুয়ালী উরওয়া ইবন 'উযায়না আল-লায়ছী সূত্রে আমাকে বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট সংবাদ পৌছিল যে, একটি কুরায়শ কাফেলা সিরিয়া হইতে আসিতেছে। তখন তিনি বনূ আক্সের লোকদেরকে অভিযানে প্রেরণ করেন। তখন তাঁহারা প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা যদি। গনীমত লাভ করি, তাহা হইলে তাহা কীভাবে ভাগবন্টন করিব, আমরা তো সংখ্যায় নয়জন"। জবাবে তিনি বলিলেন : أنا عاشركم (আমি তোমাদের দশম সদস্য)।
মুহাম্মাদ ইবন 'উমার সনদসহ আরও উল্লেখ করেন, বনূ আক্স-এর তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া আরয করেন, আমাদের শিক্ষিত ব্যক্তিগণ আমাদের নিকট আসিয়া আমাদেরকে জানান যে, হিজরত করা ছাড়া কোন ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণযোগ্য নহে। যদি তাহা যথার্থই হইয়া থাকে তবে আমাদের কিছু ধনসম্পদ ও পশুপাল আছে, আমরা ঐগুলি বিক্রয় করিয়া সর্বস্বত্যাগী মুহাজির সাজি। নবী কারীম তাহাদেরকে বলেন:
اتقوا الله حيث كنتم فلن يلتكم من أعمالكم شيئا ولو كنتم بصمد وجازان. "তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহকে ভয় করিবে, তাহা হইল তোমাদের প্রতিফলে কোন কমতি হইবে না, যদি তোমরা সাম্দ ও জাযান-এও থাক" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৯৫-৬; যাদুল-মা'আদ, উর্দু সং, ৯৩, পৃ. ৪৩৫; সীরাতুর রাসূল, তখ., পৃ. ১৩৯)। আল্লামা ইব্‌ن কাছীর (র) উক্ত ঘটনা বর্ণনা করিয়া সিরিয়া হইতে আগত কাফেলার বিরুদ্ধে উক্ত দলকে প্রেরণের দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলেন:
وهذا يقتضى تقدم وفادتهم على الفتح. "এই বর্ণনার দাবি হইল, তাহাদের প্রতিনিধি দলের আগমন অবশ্যই মক্কা বিজয়ের পূর্বে ঘটিয়া ছিল" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৭৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তুজীব প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 তুজীব প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


তুজীব কবীলার তের ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ -এর খিদমতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিলেন তাহাদের পশুপাল ও সম্পদের যাকাত যাহা তাহাদের উপর ফরয হইয়াছিল। তাহারা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাদের সম্পদের উপর আল্লাহ্ যাহা নির্ধারিত হক তাহা আমরা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে লইয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ তাহাতে অত্যন্ত খুশী হইলেন এবং বলিলেন, তোমরা উহা ফিরাইয়া লইয়া যাও এবং তোমাদের দরিদ্রদের মধ্যে তাহা বণ্টন করিয়া দাও। তাঁহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সেইখানকার দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টনের পর যাহা অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাই আমরা আপনার খিদমতে আনিয়া হাযির করিয়াছি। তাঁহাদের এই জবাব শুনিয়া হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আরবের অন্য কোন গোত্রই তো এই তুজীব গোত্রের প্রতিনিধি দলের মত আসে নাই। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন : হিদায়াত হইতেছে আল্লাহর এখতিয়ারে। তিনি যাহার মঙ্গল কামনা করেন তাহার অন্তরকে তাঁহার হিদায়াতের জন্য প্রসারিত করিয়া দেন।
অতঃপর তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্ -কে কতিপয় প্রশ্ন করিলেন যাহার জবাব রাসূলুল্লাহ্ তাহাদের জন্য লিখিতভাবে দেন। তারপরও তাঁহারা কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে আরও কতিপয় প্রশ্ন করেন। তাহাতে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদের প্রতি আরো প্রীত হইলেন এবং হযরত বিলাল (রা)-কে তাঁহাদের উত্তম আতিথ্যের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। তাঁহারা স্বল্পকাল অবস্থানান্তে শীঘ্রই প্রস্থান করিবার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করিলেন। তাঁহাদেরকে এই তাড়াহুড়ার কারণ জিজ্ঞাস্য করা হইলে তাঁহারা জবাব দিলেন, শীঘ্রই নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরিয়া তাহাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাতের বিবরণ দিয়া তাঁহার মহান শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত করিতে চাই। যখন তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া প্রস্থান করিতেছিলেন তখন হযরত বিলাল (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নির্দেশক্রমে তাহাদেরকে অন্যান্য প্রতিনিধি দলের তুলনায় বেশী পাথেয় দিয়া বিদায় দেন।
বিদায়ের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিলেন : তোমাদের মধ্যকার কোন ব্যক্তি বাকী রহিয়া গেল না তো? তাঁহারা আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাদের মধ্যকার সর্বকনিষ্ঠ এক তরুণকে আমাদের বাহন ও আস্বাবপত্রের নিকট রাখিয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ তাহাকেও ডাকিয়া পাঠাইলেন। সে বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি হইতেছি রাহাত, মতান্তরে আবষা গোত্রের লোক। আমার সঙ্গীদের প্রয়োজন তো আপনি পূরণ করিয়া দিয়াছেন, এইবার আমার প্রয়োজনটাও পূরণ করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিলেন, বল, তোমার প্রয়োজনটা কি? তিনি বলিলেন, আমার প্রয়োজনের ধরন কিছুটা ভিন্ন ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার সাথীরা যদিও ইসলামের টানে আপনার খিদমতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন, তাঁহারা তাহাদের যাকাতও লইয়া আসিয়াছেন, কিন্তু আমি তো কেবল এইজন্য আপনার দরবারে হাযির হইয়াছি যে:
تَسْأَلُ اللهَ أَنْ يَغْفِرَ لِي وَيَرْحَمْنِي وَيَجْعَلْ غِنَايَ فِي قَلْبِي.
"আপনি আমার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করিবেন এবং আল্লাহ্র কাছে আমার জন্য প্রার্থনা করিবেন যাহাতে তিনি আমার প্রতি সদয় হন এবং আমার হৃদয়কে সম্পদশালী করিয়া দেন"।
৪১৩ তাহার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ তাহার দিকে মনোনিবেশ করিলেন এবং দু'আ করিলেন:
اللهم اغفر له وارحمه واجعل غناه في قلبه. “হে আল্লাহ্! তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিন! তাহার প্রতি সদয় হউন, উহার হৃদয়কে সম্পদশালী করিয়া দিন"।
অতঃপর তিনি তাঁহাকেও তাঁহার সাথীদের মত উপঢৌকনাদিসহ সকলকে একসঙ্গে বিদায় করিয়া দিলেন। বিদায় হজ্জের সময় বনী আবযার কতিপয় ব্যক্তি মিনায় রাসূলুল্লাহ্-এর সাথে সাক্ষাত করিলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাদের নিকট সেই ছেলেটির কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহারা জানাইলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা এমন স্বল্পে তুষ্ট ব্যক্তি আর দেখি নাই বা শুনি নাই। তাঁহার অবস্থা এই যে, তাঁহার চক্ষের সম্মুখে যদি গোটা পৃথিবীটা বণ্টন করিয়া দেওয়া হয়, তবুও সে একটি বার ফিরিয়া তাকাইবে না। কথিত আছে, রাসূলুল্লাহ-এর ওফাতের পর যখন ইয়ামানে মুরতাদ হইবার যেই হিড়িক পড়িয়াছিল তখন এই বালকটিই তাঁহার গোটা সম্প্রদায়কে উহা হইতে বাঁচাইয়া রাখিয়াছিল। ফলে তাহাদের একটি লোকও মুরতাদ হয় নাই। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)-ও সর্বদা ঐ ছেলেটির খবরাখবর লইতেন। পরবর্তী কালে তিনি যিয়াদ ইবন লাবীদকে লিখিয়াছিলেন, তাঁহার সাথে উত্তম আচরণ করিবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৩৫-৩৬; ইবন সা'দ, তারাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৩; কাস্তাল্লানী, মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়া, উর্দুভাষ্য, ২খ., পৃ. ৪৪১-২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনূ সা'দ হুযায়ম ইব্‌ন কুদা'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 বনূ সা'দ হুযায়ম ইব্‌ন কুদা'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


বনূ সা'দ হুযায়ম ইব্‌ন কুদা'আ প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
ওয়াকিদী আবূ নু'মানের প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন এবং তিনি তঙ্গীয় পিতার প্রমুখাৎ যিনি নিজে বনূ সা'দ হুযায়মের লোক ছিলেন, বর্ণনা করেন, আমি আমার সম্প্রদায়ের কতিপয় লোককে লইয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর খিদমতে উপস্থিত হই। তখন গোটা আরবে রাসূলুল্লাহ্-এর অপ্রতিহত প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। তখন দেশে দুই প্রকারের লোকই ছিল: (১) যাহারা স্বেচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল (২) এবং কিছু লোক পার্থিব কারণে আনুগত্য স্বীকার করিয়া লইয়াছিল।
আমরা মদীনায় পৌছিয়া শহরের উপকণ্ঠে অবতরণ করিলাম। অতঃপর আমরা মসজিদের দিকে অগ্রসর হইলাম। আমরা যখন মসজিদের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হইলাম তখন রাসূলুল্লাহ্ মসজিদের অভ্যন্তরে জানাযার নামায পড়াইতেছিলেন। আমরা ভাবিলাম, আমরা তো এখনও নবী কারীম-এর সহিত দেখা করি নাই, বায়'আতও হই নাই, এমতাবস্থায় আমাদের উহাতে যোগদান করাটা বোধহয় সমীচীন হইবে না।
সালাতান্তে তিনি যখন ঘরে ফিরিতেছিলেন তখন আমাদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: তোমরা কাহারা হে? আমরা বলিলাম: আমরা বনূ সা'দ হুযায়মের লোক ইয়া রাসূলাল্লাহ্। তিনি বলিলেন: তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযায় শামিল হও নাই? আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা তো মনে করিয়াছি আপনার হাতে বায়'আত হইয়া ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমরা বুঝি এগুলির যোগ্য নই। তিনি বলিলেন: না, তোমরা যেখানেই ইসলাম গ্রহণ করিয়া থাক না কেন, তোমরা মুসলমানই।
অতঃপর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে রাসূলুল্লাহ্-এর হাতে বায়'আত হইলাম এবং আমাদের অবতরণ স্থলে ফিরিয়া আসিলাম। কিন্তু আমাদের মালপত্রের হিফাযতের উদ্দেশ্যে একটি ছেলেকে আমরা সেখানে রাখিয়া গিয়াছিলাম, তাই রাসূলুল্লাহ্ আবার আমাদেরকে ডাকিলেন। এবার আমরা আমাদের সাথী ঐ ছেলেটিসহ নবী দরবারে হাযির হইলাম। তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁহারও বায়'আত গ্রহণ করিলেন। আমরা বলিলাম, সে তো আমাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, আমাদের খাদিম। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, কনিষ্ঠরাই দলের খাদিম হইয়া থাকে। اصغر القوم خادمهم بارك الله عليك
রাসূলুল্লাহ্-এর দু'আর বরকতে ঐ কনিষ্ঠ সদস্যই সর্বোত্তম প্রমাণিত হন এবং কুরআন শরীফের জ্ঞানও তিনিই সর্বাধিক লাভ করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকেই আমীররূপে গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়া বলেন : امروا عليكم اخوكم "তোমাদের মধ্যকার একজনকে আমীর মনোনীত করিয়া লও” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৯-৩০)।
যাদুল মা'আদের বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে তাহাদের আমীর মনোনীত করিয়া দেন। রাবী বলেন, অতএব ঐ ব্যক্তি আমাদের নামাযের ইমামতি করিতেন। অতঃপর আমরা দেশে প্রত্যাবর্তনে উদ্যত হইলে তিনি বিলালকে আমাদের প্রত্যেক সদস্যকে কয়েক উকিয়া করিয়া রৌপ্য উপঢৌকনস্বরূপ প্রদানের আদেশ দান করেন। তারপর আমরা যখন দেশে আমাদের সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলাম তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে ইসলাম গ্রহণের তওফীক দান করিলেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২৯৩০; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১৩২-৩; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ১৪৩-৪, নফীস একাডেমী, করাচী প্রকাশিত উর্দু ভাষ্য, রইস আহমদ জাফরী; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৩৬-৩৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00