📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন তিলাওয়াত : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর ইহার প্রভাব

📄 কুরআন তিলাওয়াত : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর ইহার প্রভাব


বনূ কিন্দার প্রতিনিধি দল তখন কুরআন শারীফের তিলাওয়াত শুনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলে রাসূলুল্লাহ তিলাওয়াত করিলেন: وَالصَّفَاتِ صَفًّا فَالزَّاجِرَاتِ زَجْرًا ، فَالتَّلِيتِ ذِكْرًا. إِنَّ إِلَهَكُمْ لِوَاحِدٌ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَرَبُّ الْمَشَارِقِ.
“শপথ তাহাদের অর্থাৎ সেই ফেরেশতাদের যাহারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান ও যাহারা কঠোর পরিচালক এবং যাহারা যিকির আবৃত্তিতে রত- নিশ্চয়ই তোমাদের ইলাহ এক, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছুর প্রভু এবং প্রভু সকল উদয়স্থলের” (৩৭:১-৫)।
এতটুকু তিলাওয়াত করিয়াই রাসূলুল্লাহ এতই নীরব নিস্তব্ধ হইয়া গেলেন যেন তাঁহার গোটা দেহই নিথর নিস্পন্দ। অশ্রু গণ্ডযুগল বাহিয়া শ্মশ্রু ভিজাইয়া তুলিল। তখন তাহারা বলিতে
লাগিল, আমরা আপনাকে ক্রন্দন করিতে দেখিতে পাইতেছি। এই ক্রন্দন কি সেই মহান সত্তার ভয়ে যিনি আপনাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সেই পবিত্র সত্তার ভয়ে আমি ক্রন্দন করিতেছি যিনি আমাকে তরবারির চেয়ে তীক্ষ্ণ সীরাতুল মুস্তাকীমের উপর প্রেরণ করিয়াছেন। ইহা হইতে সামান্যতম বিচ্যুতি আমার ধ্বংসের কারণ হইতে পারে। তারপর তিনি আবার তিলাওয়াত করিলেন:
وَلَئِنْ شِئْنَا لَنَذْهَبَنَّ بِالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ ثُمَّ لَا تَجِدُلَكَ بِهِ عَلَيْنَا وَكِيلاً. الا رَحْمَةً مِّنْ رَبِّكَ إِنَّ فَضْلَهُ كَانَ عَلَيْكَ كَثِيرًا.
"ইচ্ছা করিলে আমি তোমার প্রতি যাহা ওহী করিয়াছি তাহা অবশ্যই প্রত্যাহার করিতে পারিতাম। তাহা হইলে এই বিষয়ে তুমি আমার বিরুদ্ধে কোন কর্মবিধায়ক পাইতে না। ইহা প্রত্যাহার না করা তোমার প্রতিপালকের দয়া; তোমার প্রতি আছে তাঁহার মহা অনুগ্রহ" (১৭: ৮৬-৮৭; সীরাতে হালাবিয়্যা, উর্দু ৩৯তম কিস্তি, পৃ. ৬৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিময়ারী প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 হিময়ারী প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


হিময়ারী প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন।
হিময়ারে তখন আর শান-শওকতপূর্ণ রাজত্ব ছিল না। হিময়ার রাজদের সন্তানগণ ছোট ছোট সামন্ত রাজ্য কায়েম করিয়া রাখিয়াছিলেন এবং তাহারা তখন নামেমাত্র রাজা ছিলেন। আরবী ভাষায় তাহাদেরকে কায়ল (قيل) বলা হইত। বহুবচনে একসাথে তাহাদেরকে আক্যাল বলিয়া অভিহিত করা হইত। তাহাদের প্রতিনিধি পাঠাইয়া তাহারা তাহাদের ইসলাম গ্রহণের কথা নবী কারীম -কে অবহিত করেন। বাহা ও বনূ বাকা প্রতিনিধি দল এই সময়েই নবী দরবারে আগমন করেন। ইবন সা'দ বলেন: আবদুল্লাহ্ খাওলানী হিময়ারী এমন এক ব্যক্তির বরাতে রিওয়ায়াত করিয়াছেন, যিনি নবী কারীম -এর সাক্ষাৎ পাইয়াছেন। তিনি বলেন:
قدم على رسول الله ﷺ مالك بن مرارة الرهاوى رسول ملوك حمير بكتابهم وإسلامهم وذلك في شهر رمضان سنة تسع فأمر بلالا أن ينزله ويكرمه ويضيفه.
"হিময়ার রাজগণের পত্র শিরক বর্জন ও ইসলাম গ্রহণের বার্তাসহ মালিক ইব্‌ন মুরারা আর-রাহাবী নবী কারীম -এর দরবারে আগমন করেন। আর উহা ছিল নবম হিজরীর রমযান মাসের কথা। রাসূলুল্লাহ বিলালকে তাহাদিগকে অভ্যর্থনা ও সম্মানজনক আদর-আপ্যায়নের জন্য আদেশ দান করেন"।
ইবন হিশাম ঐ রাজন্যবর্গের নামও উল্লেখ করিয়াছেন- যাহাদের পক্ষ হইতে প্রতিনিধিরূপে মালিক ইবন মুরারা নবী দরবারে আগমন করিয়াছিলেন। তাহারা হইতেছেন: হারিছ ইব্‌ন আবদে কুলাল, নু'আয়ম ইব্‌ন আবদে কুলাল, যু-রুআয়নপতি নু'মান, মাআকাব ও হামদান (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৫৫)।
ইমাম আহমাদ (র) বলেন, হাসান (র) আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, যু-য়াধানের দূত মালিক রাসূলুল্লাহ -কে একজোড়া বস্ত্র উপঢৌকনস্বরূপ দিয়াছিলেন- যাহা তেত্রিশটি বড় বড় উট ও ৩৩টি বড় বড় উটনীর বিনিময়ে ক্রয় করা হইয়াছিল। আবূ দাউদ (র) ও
আমর ইব্‌ন আওন আল-ওয়াসিতীর বরাতে হযরত আনاس (রা) হইতে ঐ হাদীছখানা রিওয়ায়াত করিয়াছেন। উক্ত হাদীছ হইতে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ-কে প্রদত্ত বস্ত্র অত্যন্ত মূল্যবান ছিল- যাহা তাঁহার প্রতি হিময়ার রাজদের অতি ভক্তিরই নিদর্শন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৬৭-৬৮)। যতদূর মনে হয় রাসূলুল্লাহ-কে প্রদত্ত বস্ত্রজোড়া তেত্রিশটি উট ও তেত্রিশটি উটনীর বিনিময়ে ক্রয়ের বক্তব্য সঠিক নহে বরং সঠিক হইল:
قد اخذها بثلاثة وثلاثين يعيرا او ثلاثه وثلاثين ناقة "উহা তিনি গ্রহণ করিয়াছিলেন ৩৩টি উট অথবা ৩৩টি উটনীর বিনিময়ে"। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর লিখিত আস্-সীরাতু'ন-নাবাবিয়্যা গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উহাই লিখিত আছে। পূর্বোক্ত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থখানিও তাঁহারই রচিত। এ ব্যাপারে তিনি য়ে সনদে হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাও অভিন্ন। সুতরাং প্রথমোক্ত উদ্ধৃতিতে। (অথবা) শব্দটির আলিফ পড়িয়া গিয়া (এবং) হইয়া গিয়াছে তাহা বলাই বাহুল্য (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ: ১৪৭, বৈরূত মুদ্রণ ১৩৯৫/১৯৮৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনূ হানীফা গোত্রের প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 বনূ হানীফা গোত্রের প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


বনূ হানীফা গোত্রের প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
বনূ হানীফা ইয়ামামার অধিবাসী। ঐ ইয়ামামারই সর্দার ছুমামা মুসলিম সৈন্যদলের হস্তে বন্দী হইয়া মদীনায় আসেন এবং মুক্তি পাওয়ার পর স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করিয়া দেশে ফিরেন। তাঁহার প্রচেষ্টায় সেই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারিত হয়। সুতরাং বনূ হানীফা গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে হাযির হয়। তাফাজ্জল হোসাইন, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮৬৫)। মুসায়লামা ছিল অত্যন্ত দাম্ভিক। অহঙ্কারের কারণে সে নবী-এর দরবারে উপস্থিত হইতে বিরত থাকে (কান্দেহলবী, সীরাতুল মুস্তফা, ৩খ., পৃ. ১১২)।
বনূ হানীফার প্রতিনিধি দল যখন নবী কারীম-এর দরবারে আগমন করে তখন মুসায়লামা কাযযাবও ঐ দলে ছিল। তাহারা মদীনায় আসিয়া বনূ নাজ্জারের এক আনসারী মহিলার বাড়ীতে আসিয়া উঠে। ইবন আব্বাস (রা)-এর প্রমুখাৎ বুখারী বর্ণনা করেন :
قدم مسيلمة الكذاب على عهد رسول الله ﷺ فجعل يقول ان جعل لي محمد الأمر من بعده اتبعته وقدم في بشر كثير من قومه. "মুসায়লামা কায্যাব রাসূলুল্লাহ-এর আমলে মদীনায় আসে। সে বলিতে শুরু করে, মুহাম্মাদ যদি তাঁহার পরে আমাকে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়া যান তাহা হইলে আমি তাঁহার অনুসারী হইব। সে তাহার সম্প্রদায়ের প্রচুর লোকসহ আসিয়াছিল"।
فاقبل اليه رسول الله ﷺ ومعه ثابت بن قيس بن شماس وفي يد رسول الله ﷺ قطعة جريد حتى وقف على مسيلمة في اصحابه فقال لو سألتني هذه القطعة ما اعطيتكما ولن تعدوا امر الله فيك ولئن ادبرت يعقرنك الله واني لا رأك الذي رأيت فيه ما رأيته وهذا ثابت يجبك عنى.
"রাসূলুল্লাহ ছাবিত ইব্‌ন কায়স ইন শাম্মাস সমভিব্যাহারে তাহার দিকে ছুটিলেন। তখন তাঁহার হাতে ছিল খেজুর গাছের ডালের একটি ছড়ি। মুসায়লামা যেখানে তাহার দলবলসহ ছিল, সেখানে গিয়া তিনি থামিলেন। তখন তিনি ফরমাইলেন: তুমি যদি ঐ টুকরাটিও আমার নিকট চাও তবে তাহাও আমি তোমাকে দিব না। আর তোমার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার ফয়সালার অন্যথা করাও সম্ভব নহে। তুমি যদি পিছটান দাও তাহা হইলে আল্লাহ তোমাকে উৎখাত করিবেন। আমি তোমার ব্যাপারে স্বপ্নে যাহা দেখিয়াছি তাহাই তোমার মধ্যে প্রত্যক্ষ করিতেছি। আর এই ছাবিত তোমার বক্তব্যের জবাব দিবে" (মুসলিম, কিতাবুর রু'ইয়া, বাব ৪: ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা-বি আহওয়ালিল মুস্তাফা, পৃ. ৭৭1)।
বুখারীর অনুরূপ আরেকটি রিওয়ায়াক্ত উবায়দুল্লাহ ইব্‌ন আবদিল্লাহ ইবন উৎবা প্রমুখাৎ বর্ণিত হইয়াছে, তাহাতে ছাবিত ইবন কায়স ইব্‌ন শাম্মাস (রা)-এর সম্পর্কে তাঁহার নামের সাথে সাথে উক্ত হইয়াছে:
وهو الذي يقال له خطيب رسول الله ﷺ. "ইনি হইতেছেন সেই ব্যক্তি যাহাকে রাসূলুল্লাহ -এর খতীব বলিয়া অভিহিত করা হইত।"
পরবর্তী এই রিওয়ায়াতের বর্ণনা এইরূপ:
وفي يد رسول الله له قضيب فوقف عليه فكلمه فقال له مسيلمة ان شئت خليت بينك وبين الأمر ثم جعلته لنا بعدك فقال رسول الله الله لو سألتني هذا القضيب ما اعطيتكه واني لاراك الذى رأيت فيه ما رأيت وهذا ثابت بن قيس سيجبك عنى فانصرف رسول الله .
"রাসূলুল্লাহ -এর হাতে তখন একটি ছড়ি ছিল। তিনি তাহার নিকট গিয়া থামিলেন এবং তাহার সহিত কথোপকথন করিলেন। মুসায়লামা বলিল, আমি আপনার হাতে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ছাড়িয়া দিতে পারি যদি আপনার পরে আপনি আমাকে স্থলাভিষিক্ত করিতে সম্মত হন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: এমনকি আমার হাতের এই ছড়িটিও যদি তুমি আমার নিকট দাবি কর, তবে আমি তাহাও তোমাকে দিব না। আমি স্বপ্নে তোমাকে যেরূপ দেখিয়াছি তাহাই তোমার মধ্যে প্রত্যক্ষ করিতেছি। আর এই কায়স ইব্‌ন ছাবিত আমার পক্ষ হইতে তোমাকে জবাব দিবে" (বুখারী ৪খ., পৃ. ২৪৭, ৫খ., পৃ. ২১৫, ৯খ., পৃ. ১১৭; বায়হাকী, দালাইলুন নবুওয়া ১খ., পৃ. ৩৫৮, ৫খ., পৃ. ৩৩০)।
উক্ত রাবী উবায়দুল্লাহ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ বলেন, আমি ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে রাসূলুল্লাহ -এর উক্ত স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন, আমাকে বলা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ এই সম্পর্কে বলিয়াছেন:
بين انا نائم زيت انه وضع في يدى سوارن من ذهب فقطعتها وكرهتها فاذن لي فنفختهما قطارى قاولتهما كذابين يخرجان
404 "স্বপ্নে আমাকে দেখান হইয়াছে, আমার হাতে দুইটি স্বর্ণের কাকন পরান হইল। তাহাতে আমি অত্যন্ত বিব্রত ও বিরক্ত হই। তারপর আমাকে আদেশ করা হইলে আমি ঐ দুইটির উপর ফু দিলা, সাথে সাথে ঐগুলি উড়িয়া গেল। তখন আমি উহার ব্যাখ্যা করিলাম এইরূপ যে, দুইজন ঘোর মিথ্যাবাদী ভণ্ডের আবির্ভাব হইবে"।
রাবী 'উবায়দুল্লাহ বলেন, তাহাদের একজন হইতেছে আসওয়াদ আনাসী, যাহাকে ফীরূষ ইয়ামানে হত্যা করিয়াচিল আর অপরজন মুসায়লিমা কায়যাব।
মুহাম্মদ ইব্‌ ইসহাক বলেন, বনূ হানীফার প্রতিনিধি দল নবী-এরদরবারে আগমন করিল। তাহাদের মধ্যে মুসায়লিমা ইব্‌ন ছুমামা ইব্‌ন কাছীর ইব্‌ন হুবায়র ইবনিল হারিছ ইব্‌ন আবাদিল হারিছ ইবন হিফ্ফান ইব্‌ন যুহল ইবনুদ ফুওয়াল ইন্ন হানীফা ও ছিল। তাহার উপনাম ছিল আবু ছুমামা, মতান্তরে আবূ হারূন। বহমান নামেও তাহাকে অভিহিত করা হইত এবং যুহরীর বর্ণনামতে এইজন্য রাসূলুল্লাহ-এর পিতা আবদুল্লাহরও জন্মের পূর্বে তাহাকে রাহমানুল ইয়ামামা বলা হইত। নিহত হওয়ার সময় তাহার বয়স হইয়াছিল এক শত পঞ্চাশ বৎসর।
এইজন্যই (হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে) কুরায়শগণ যখন সর্বপ্রথম বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম শুনিতে পায় তখন বলে:
دق فوك انما تذكر مسيلمة رحمان اليمامة.
"তোমার মুখে ছাই পড়ুক! তুমি তো ইয়ামামার রহমান মুসায়লামার কথা বলিতেছ!"
মুসায়লামা অনেক রকম ভেল্কিবাজি জানিত। বোতলের মধ্যে সে ডিম ভরিয়া ফেলিত। এইরূপ ভেল্কিবাজির সে-ই ছিল উদ্ভাবক। পাখির পালক কাটিয়া সে পুনরায় উহা জোড়া লাগাইয়া দিত। সে দাবি করিত যে, পাহাড় হইতে একটি হরিণী তাহার নিকট আসে এবং সে উহা দোহন করিয়া থাকে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৪৬)।
ইয়ামামাবাসী জনৈক প্রবীণ ব্যক্তির বরাতে ইবন ইসহাক মুসায়লামার নবী-এর দরবারে উপস্থিতি সম্পর্কে অন্যরকম একটি বিবরণও লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। তাহাতে বলা হইয়াছে: বনূ হানীফার প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার সময় মুসায়লামাকে তাহাদের তাঁবুতে রাখিয়া আসিয়াছিল। তাহারা সকলে ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ-কে অবগত করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আমাদের একজন সঙ্গীকে বাহন দেখাশোনা করিবার জন্য তাঁবুতে রাখিয়া আসিয়াছি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ তাহাকেও দলের অন্যান্যদের সমপরিমাণ উপঢৌকন প্রদানের আদেশ দিয়া বলিলেন:
اما انه ليس بشركم مكانا .
"মর্যাদার দিক দিয়া সে তোমাদের চেয়ে নিকৃষ্ট পর্যায়ের নহে।"
অর্থাৎ তোমাদের মালপত্রের দেখাশোনা করার জন্য তাহার মর্যাদা কমিয়া যায় নাই, সেও তোমাদের দলেরই একজন বটে। তাহারা তখন সেই উপঢৌকন সামগ্রী লইয়া মুসায়লামার নিকট ফিরিয়া গেল। তারপর তাহারা মদীনা হইতে প্রস্থান করে। ইয়ামামায় ফিরিয়া গিয়া আল্লাহ্র দুশমন মুসায়লামা মুরতাদ হইয়া যায় এবং নবৃওয়াতের দাবিদার হইয়া স্বগোত্রের নিকট মহামিথ্যা ভাষণ দেয়। তাহার সঙ্গীদেরকে সাক্ষী করিয়া সে বলিল, তোমরা আমার কথা তাঁহার নিকট উল্লেখ
করিলে তিনি কি বলেন নাই যে, সে তোমাদের মধ্যকার নিকৃষ্ট ব্যক্তি নহে? ইহা এইজন্য যে, তিনি জানেন, নবুওয়াতীর ব্যাপারে আমিও তাঁহার অংশীদার। তারপর সে আল-কুরআনের বাকভঙ্গির সহিত সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া ছন্দোবদ্ধ বাক্যাদি রচনা শুরু করে। তাহার এইরূপ ছন্দোবদ্ধ রচনার নমুনা:
لقد انعم الله على الحبلى اخرج منها نسمة تسعى من بين صفاق وحشى واحل لهم الخمر والزنا ووضع عنهم الصلوة.
"আল্লাহ্ গর্ভবতীকে নিয়ামত দান করিয়াছেন। তাহার অভ্যন্তর হইতে তিনি উদগত করিয়াছেন স্পন্দনশীল প্রাণ অন্তঃত্বক ও নাড়িভুড়ির মধ্য হইতে। আর তাঁহাদের জন্য তিনি বৈধ করিয়াছেন মদ্য ও ব্যভিচার আর রহিত করিয়াছেন তাহাদের উপর হইতে সালাত।"
এতদসত্ত্বেও সে রাসূলুল্লাহ-এর নবী হওয়ার সাক্ষ্য দিত। বনূ হানীফা তাহার নবুওতের দাবির সত্যতা মানিয়া লইয়া তাহার সহিত একাত্মতা ঘোষণা করে। উক্ত দ্বিবিধ বর্ণনার কোন্টি যে সত্যসত্যই ঘটিয়াছিল তাহা আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।
হানীফা গোত্রের প্রতিনিধি দলের অপর এক সদস্য রাহহাল ইবন 'উনফুওয়া, মতান্তরে 'উনকুওয়া (তাহাকে নাহার ইব্‌ন উনকুওয়া বলা হইত) ইসলাম গ্রহণ করিয়া কুরআনের কিছু অংশ শিক্ষা করে। সে কিছুকাল নবী দরবারে অবস্থানও করে। একদিন ঐ ব্যক্তি যখন আবূ হুরায়রা এবং ফুরাত ইব্‌ন হায়‍্যান-এর সহিত একত্র বসিয়া কথাবার্তা বলিতেছিলেন এমন সময় রাসূলুল্লাহ তাহাদের পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম করিতে করিতে বলিলেন: ضرسي احدكم في النار مثل احد.
"তোমাদের একজনের মাড়ির দাঁত তো জাহান্নামে উহুদ পাহাড়ের মত বিরাটাকৃতির হইবে"।
ইহার নির্গলিতার্থ ছিল, তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি অবশ্যই জাহান্নামী হইবে। অবশেষে যখন রাহহাল ধর্মচ্যুত হইয়া মুসায়লামার দলভুক্ত হইল এবং তাহার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নবৃওয়াতের মধ্যে শরীক করিয়া লইয়াছেন, তারপর সে কুরআন মাজীদের যে সমস্ত অংশ শিখিয়া আসিয়াছিল সেগুলি মুসায়লামাকে শিক্ষা দিল। আর মুসায়লামা সেইগুলিকে তাহার উপর নাযিলকৃত বলিয়া লোকসমাজে প্রচার করিয়া বেড়াইতে লাগিল- যাহা হানীফা গোত্রের ধর্মচ্যুতির কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তখন পূর্বোক্ত সাহাবীদ্বয় হযরত আবূ হুরায়রা ও ফুরাত ইব্‌ন হায়‍্যান হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন যে, তাহাদের তিনজনের একজন জাহান্নামী যে কে তাহা জানা গিয়াছে।
ইয়ামামার যুদ্ধে উক্ত রাহহাল ইব্‌ন 'উন্‌কুওয়া হযরত যায়দ ইব্‌ন খাত্তাবের হাতে নিহত হয়। মুসায়লামা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাহার নবুওয়াতে শরীক হওয়ার দাবি জানাইয়া যে পত্র দেয় এবং রাসূলুল্লাহ (স) তাহার দাবিকে অগ্রাহ্য করিয়া তাহাকে কায্যাব বা ডাহা মিথ্যাবাদী বলিয়া অভিহিত করিয়া যে জবাব দেন তাহার বর্ণনা রাসূলুল্লাহ-এর পত্রাবলী অধ্যায়ে বর্ণনা দেখা যাইতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) এই পত্র পাইয়া এতই ক্রুদ্ধ হন যে, তাহার দূতদ্বয়কে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলেন:
406 اما والله لولا ان الرسل لا تقتل الضربت اعناقكما . "আল্লাহ্র কসম! যদি দূত হত্যা রীতি বিরুদ্ধ না হইত তাহা হইলে আমি অবশ্যই তোমাদের উভয়ের গর্দান উড়াইয়া দিতাম"।
وانتما تقولان مثل ما يقول : He is for free fa 2013 "তোমরাও কি তাহার মত বলিয়া থাক?" অর্থাৎ মুসায়লামাকে নবী বলিয়া বিশ্বাস কর? তাহারা ইহার ইতিবাচক জবাব দিয়াছিল। আবূ দাউদ তায়ালিসী সনদসহ আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন মাস'ঊদ (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, তিনি বলিয়াছেন:
جاء ابن النواحة وابن اثال رسولين المسيلمة الكذاب الى رسول الله ﷺ فقال لهما اتشهدان انى رسول الله الله فقالا ان مسيلمة رسول الله فقال رسول الله ﷺ امنت بالله ورسله ولو كنت قاتلا رسولا لقتلتكما . "মুসায়লামা কায্যাবের দুই দূত ইবনুন নাওয়াহা ও ইব্‌ন উছাল রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে আসিল। তিনি তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন: আমি যে আল্লাহ্র রাসূল এই সাক্ষ্য কি তোমরা দাও? তাহারা বলিল, মুসায়লামা আল্লাহ্র রাসূল। রাসূলুল্লাহ বলিলেনঃ আমি আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করিতেছি। আমি যদি কোন দূতকে হত্যা করিতাম তাহা হইলে অবশ্যই তোমাদের দুইজনকে হত্যা করিতাম" (আবূ দাউদ তায়ালিসী, মুসনাদ, ১খ., পৃ. ২৩৮, মিসরীয় মুদ্রণ, ১৩৮৯ হি.)।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, সেই অবধি দূত হত্যা নিষিদ্ধ বলিয়া গণ্য হইয়া আসিতেছে। হাফিয বায়হাকী বলেন, উসামা ইব্‌ন উছাল পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর ইবনুন নাওয়াহা সম্পর্কে আবূ যাকারিয়্যা ইব্‌ন আবূ ইসহাক আল-যুবানী কায়স ইবন আবী হাযিম-এর বরাতে বলেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একব্যক্তি আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদের নিকট আসিয়া বলিল, আমি বনূ হানীফা গোত্রের কোন এক মসজিদের পাশ দিয়া অতিক্রমকালে এমন তিলাওয়াত শুনিলাম যাহা আল্লাহ্ মুহাম্মাদ-এর প্রতি নাযিল করেন নাই। তাহা ছিল এইরূপ:
والطاحنات طحنا والعاجنات عجنا والخابزات خبزا والثاردات تردا وللاقمات لقما.
আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ তখন তাহাদেরকে ধরিয়া আনিতে লোক পাঠাইলেন। সাথে সাথে তাহাদের সত্তরজন লোককে ধরিয়া আনা হইল। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন নাওয়াহা ছিল তাহাদের দলপতি। আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের নির্দেশে তাহাকে হত্যা করা হইল। তখন ইবন মাস'উদ (রা) বলিলেনঃ
ما كنا بحرزين الشيطان من هؤلاء ولكن نحوزهم الى الشام لعل الله ان يكفينا هم
৪০৭ “উহাদের মাধ্যমে স্বার্থসিদ্ধির অবকাশ আমরা শয়তানকে দিতেছি না বরং উহাদেরকে আমি সিরিয়ায় বিতাড়িত করিতেছি। আশা করি আল্লাহ্ আমাদের পক্ষে তাহাদের জন্য যথেষ্ট হইবেন” (ইব্‌ন কাছীর, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ, পৃ. ৯২-১০০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৪৭; রাওদুল-উনুফ, ৭খ., পৃ. ৪৪২-৮, বৈরুত তা. বি., তারীখ তাবারী, ৩খ, পৃ. ১৩৭-৮, বৈরুত)।
পাপিষ্ঠ মুসায়লামা কায্যাব রাসূলুল্লাহ-এর দূত হাবীব ইব্‌ন যায়দ (রা)-এর হস্তপদ চতুষ্টয় কাটিয়া ফেলিয়া তাহাকে পঙ্গু করিয়া দিয়াছিল (বালাযুরী, ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৯৫. কায়রো ১৯৭৭ খৃ.)।
ওয়াকিদীর বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আগমনকারী বনূ হানীফার প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা ছিল بضع عشر رجلا (দশের অধিক)। সালমা ইব্‌ন হানযালা তাহাদের নেতা ছিল। এই দলে আরও ছিল রাহহাল ইব্‌ন 'উনফুওয়া, তাল্ক ইব্‌ন 'আলী, 'আলী ইব্‌ন সিনান, মুসায়লামা ইব্‌ন হুবায়ب আল-কায্যাذ প্রমুখ। মুসলিমা বিনতুল হারিছ-এর বাড়িতে তাহারা উঠিয়াছিল এবং তাহাদেরকে একবেলা গোশ্ত-রুটি এবং অপর বেলা দুধ-রুটি দ্বারা আপ্যায়ন করা হইত। আবার কখনও একবেলা শুধু রুটি; অপর বেলা রুটি-মাখন দেওয়া হইত। আবার খেজুরও কোন বেলা দেওয়া হইত। তাহাদের প্রত্যেককে নবী কারীম পাঁচ উকিয়া (দুই শত দিরহাম) হিসাবে উপঢৌকন দিয়াছিলেন।
হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদের নেতৃত্বে পরিচালিত ইয়ামামার যুদ্ধে ১১ হিজরীতে হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত আমলে চল্লিশ হাজার সৈন্যসহ যুদ্ধ করিয়া হযরত হামযার হন্তা ওয়াহ্শীর হাতে মুসায়লামা কায্যাব নিহত হয় (মওলানা আকবর শাহ নাজীবাবাদী, ইসলামের ইতিহাস, ১খ., পৃ. ২৮৫-৮৭)।
পরবর্তী কালে ওয়াহ্শী আনন্দ প্রকাশ করিয়া বলিতেন, কাফির থাকাকালে আমি সেরা মুসলমান হযরত আমীর হামযাকে হত্যা করিয়াছিলাম, আর মুসলমান হওয়ার পর সেই ত্রুটির ক্ষতিপূরণ স্বরূপ নিকৃষ্ট কাফির মিথ্যাবাদী মুসায়লামাকে হত্যা করিলাম (মওলানা তাফাজ্জল হোসাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮৬৭)।
ইব্‌ن সা'দ বলেন, বনূ হানীফা প্রতিনিধি দল হিজরী দশম সনে ইয়ামামা হইতে নবী দরবারে আসিয়াছিল এবং উক্ত প্রতিনিধি দলের সদস্যরূপে ছিলেন সালেমা ইব্‌ন হাম্বালা আস-সুহায়মী, তাল্ক ইব্‌ন আলী ইব্‌ন কায়স, 'আলী ইব্‌ন সিনান, আল-'আকউস ইব্‌ন মুসলিমা, যায়দ ইব্‌ন 'আবদ আমর প্রমুখ। প্রথমোক্ত জন দলপতি ছিলেন এবং তাহাদের মেযবান ছিলেন রামলাহ্ বিল-হারিছ। ঐ বর্ণনায় আছে াহ্হাল হযরত উবায়্যি ইব্‌ন কা'ব (রা)-এর নিকট কুরআন শিক্ষা করিয়াছিল। ঐ বর্ণনায় আরও আছে:
ورجعوا الى اليمامة واعطاهم رسول الله ﷺ ادارة من ماء فيها فضل طهور فقال اذا قدمتم بلدكم فاكسروا بيعتكم وانضحوا مكانها بهذا الماء واتخذوا مكانها مسجدا ففعلوا.
"তাহারা ইয়ামামায় ফিরিয়া যায় এবং রাসূলুল্লাহ তাহাদেরকে তাঁহার উযূতে ব্যবহৃত অবশিষ্ট পানিসহ একটি পাত্র দিয়া বলেন, যখন তোমরা তোমাদের দেশে ফিরিয়া যাইবে তখন
৪০৮ তোমাদের পূর্ববর্তী উপাসনালয় ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। অতঃপর ঐ স্থানে এই পানি ছিটাইয়া দিয়া উহাকে মসজিদে রূপান্তরিত করিয়া লইবে। তাহারা সেইরূপই করে"।
'ঐ বর্ণনায় আরও আছে, অতঃপর রাসূলুল্লাহ প্রদত্ত পাত্রটি আকউস ইব্‌ন মুস‌লিমার নিকট থাকে। মু'আযযিন হন তাল্‌ক ইব্‌ন 'আলী। তিনি যখন আযান দিলেন তখন উপাসনালয়ের সন্ন্যাসী উহা শুনিয়া বলিল, হক কালিমা! হক দাওয়াত!! তারপর সে সেখান হইতে পালাইয়া যায়। উহাই ছিল তাহার অন্তিম যাত্রা (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১৬-১৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আযদ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 আযদ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


আব্দ প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
আবূ নু'আজ্জম (র) তদীয় মা'রিফাতুস সাহাবা' গ্রন্থে এবং হাফিয আবূ মূসা আল-মাদীনী সনদসহ সুওয়ায়দ ইবনুল হারিছ (রা)-এর প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন, আমি আমার সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের সাত ব্যক্তির সপ্তমজনরূপে রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে উপণীত হই। আমাদের কথা-বার্তা ও চাল-চলন দৃষ্টে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি আমাদেরকে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে আমরা জবাব দিলাম, আমরা মু'মিন। তিনি মৃদু হাসিয়া বলিলেন : প্রত্যেক জাতিরই তাহার নিজস্ব পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য থাকে, তোমাদের সেই বৈশিষ্ট্য ঈমান কী? আমরা জবাব দিলাম, এইরূপ পনেরটি আমল আমাদের মধ্যে রহিয়াছে, সেইগুলির পাঁচটি এমন যেইগুলির প্রতি বিশ্বাস রাখিতে এবং পাঁচটি এমন যেইগুলি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদির দ্বারা কার্যকর করিতে আপনার প্রেরিত দূতগণ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়াছেন। আর পাঁচটি এমন যেইগুলি জাহিলিয়াতের আমল হইতেই আমরা করিয়া আসিতেছি, যদি না কেহ ঐগুলি পরিত্যাগে আমাদেরকে বাধ্য করে।
(وخمس تخلصا بها في الجاهلية فنحن عليها الا انه تكره منهما شيئا ) রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার দূতগণ যে পাঁচটি ব্যাপারে ঈমান আনয়ন করিতে আদেশ করিয়াছে সেইগুলি কী? আমরা বলিলাম, তাঁহাদের নির্দেশিত সেই পাঁচটি আমল হইল, আমরা যেন ঈমান আনয়ন করি (১) আল্লাহ্র প্রতি, (২) তাঁহার ফেরেশতাগণের প্রতি, (৩) তাঁহার কিতাবসমূহের প্রতি, (৪) তাঁহার রাসূলগণের প্রতি এবং (৫) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তাহাদের নির্দেশিত সেই পাঁচটি 'আমল কী? আমরা বলিলাম, তাঁহাদের নির্দেশিত সেই পাঁচটি আমল হইল, (১) যেন আমরা বলিঃ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই, (২) সালাত কায়েম করি, (৩) যাকাত আদায় করি, (৪) রামাদান মাসের সিয়াম সাধনা করি এবং (৫) সামর্থ্য থাকিলে যেন হজ্জ করি। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিলেন : জাহিলিয়াতের যুগ হইতে আচরিত তোমাদের সেই পূর্ব পাঁচটি অভ্যাস কী? আমরা বলিলাম:
الشكر عند الرخاء واصبر عند البلاء والرضا بالقضاء والصدق في مواطن اللقاء وترك شماتة بالاعداء.
(১) সচ্ছলতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, (২) বিপদে ধৈর্য ধারণ, (৩) অদৃষ্টের উপর সন্তুষ্ট থাকা, (৪) সমরাঙ্গনে শত্রুর মুকাবিলায় অটল থাকা ও (৫) শত্রুর দুর্গতি দর্শনে উল্লসিত না হওয়া। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: ইহারা প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞজন, তাহাদের বুৎপত্তি অনেকটা নবীসুলভ।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
انا ازيدكم خمسا فيتم لكم عشرون خصلة ان كنتم كما تقولون. فلا تجمعوا ما لا تأكلون ولا تبنوا ما لا تسكينون ولا تنافسوا في شيئ أنتم عنه غدا تزولون واتقوا الله الذى اليه ترجعون وعليه تعرضون وارعبوا فيما عليه تقدمون وفيه تخلدون
“আমি তোমাদের জন্য আরও পাঁচটি আমল বর্ধিত করিয়া দিতেছি যাহাতে তোমাদের পূর্ণ কুড়িটি প্রশংসনীয় অভ্যাস হইয়া যায়, যদি সত্যসত্যই তোমরা যেমনটি বলিলে তেমনটি হইয়া থাকঃ (১) যাহা খাইতে পারিবে না (ভোগ করিতে পারিবে না) তাহা সঞ্চয় করিবে না। (২) যেখানে বসবাস করিবে না এমন ইমারত বানাইবে না, (৩) এমন বস্তু লইয়া মারামারি হানাহানিতে মত্ত হইবে না যাহা ত্যাগ করিয়া আগামী কল্যই তোমাদের চলিয়া যাইতে হইবে (৪) সেই আল্লাহকে ভয় করিবে, যাঁহার নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হইবে এবং যাঁহার সম্মুখে তোমদেরকে পেশ করা হইবে। আর সেই বস্তুর জন্য লালায়িত হও যেখানে তোমদেরকে যাইতেই হইবে এবং যেখানে তোমরা চিরস্থায়ী হইবে"।
অতঃপর প্রতিনিধি দলটি প্রস্থান করেন এবং তাঁহারা সেইরূপই আমল করেন (আল-বিদায়া ওযান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৮৪-৮৫; ইব্‌ন কাছীর, আস্-সীরাতুন-নাবাবিয়‍্যা, ৪খ., পৃ. ১৮০-১, দারুল-মা'রিফা, বৈরূত, তা. বি.; কাস্তাল্লানী, মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়ার উর্দু ভাষ্য, সীরাতে মুহাম্মাদীয়া, ২খ., পৃ. ৪৫০-১, মাকতাবায়ে রাহমানিয়া, লাহোর তা.বি.)।
আব্দ প্রতিনিধি দলের সদস্যসংখ্যা কত ছিল তাহা লইয়া মতভেদ আছে। কাস্তাল্লানী ঐ দলের সদস্য সংখ্যা পনের ছিল বলিয়াছেন (যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩২)। পূর্বের বর্ণনায় সাত সংখ্যা আমরা লক্ষ্য করিয়াছি। ইবন সা'দ ঐ সংখ্যা بضع عشر দশের অধিক বলিয়াছেন। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেন নাই (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৩৭)। ইব্‌ন খালদুন ঐ সংখ্যা দশ ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (শায়খ মুহাম্মাদ ইসমাঈল পানিপথী, ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, পৃ. ৩৫৭, ইফা. প্রকাশিত ২০০৪)।
সুরাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ আযদী ঐ প্রতিনিধি দলে ছিলেন। মদীনায় তাহারা ফারওয়া ইব্‌ন আমর (রা)-এর বাড়ীতে উঠেন। তিনি তাহাদেরকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং যথারীতি তাহাদের আদর-আপ্যায়ন করেন। জ্ঞান-গরিমায় সুরাদ ইব্‌ন আবদুল্লাই ছিলেন দলের সর্বোত্তম ব্যক্তি। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করিয়া দশদিন মদীনায় অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ সুরাদকেই তাঁহাদের আমীর নিযুক্ত করেন এবং পার্শ্ববর্তী ইয়ামানের মুশরিক গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনার নির্দেশ দেন।
সেইমতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ن সুরাদ জুরাশ শহরে অভিযান চালান। শহরটি ছিল প্রাচীরবেষ্টিত ও সুরক্ষিত দুর্গবিশিষ্ট। ইয়ামানের বিভিন্ন গোত্রের লোকজন উহাতে দুর্গবদ্ধভাবে বসবাস করিত। তিনি অগ্রসর হইয়া তাহাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাইলেন। তাহারা ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করে এবং দুর্গের খিল আটকাইয়া দিয়া উহাতে অবরুদ্ধ হইয়া রহিল। দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত বিলম্ব করিয়া আবদুল্লাহ্ ইব্‌ن সুরাদ অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন। জুরাশবাসীরা ইহাতে মুসলমানদের পরাজয় ও পশ্চাদপসরণ ভাবিয়া তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন
করার উদ্দেশ্যে দুর্গ হইতে বাহির হইয়া পড়ে। তাহারা যখন শাকার পাহাড়ের নিকট উপনীত হইল তখন মুসলিম বাহিনী ফিরিয়া দাঁড়াইল। দিনভর যুদ্ধে জুরাশবাসীরা পরাজিত হয় এবং তাহাদের অনেক লোক হতাহত হয়। মুসলিম বাহিনী তাহাদের কুড়িটি ঘোড়া ছিনাইয়া লয়।
এদিকে জুরাশবাসিগণ ইতোপূর্বেই তাহাদের দুইজন প্রতিনিধিকে নবী দরবারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিয়া দিয়াছিল। আসরের পর সন্ধ্যার দিকে তাহারা যখন নবী দরবারে উপস্থিত হইল তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, শাকার নামক স্থানটি কোথায় অবস্থিত? জুরাশবাসী উক্ত দুই ব্যক্তি দাঁড়াইয়া আরয করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাদের দেশে কাশার নামক একটি পাহাড় আছে। তাহারা উক্ত পাহাড়কে এই নামেই অভিহিত করিত। রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, ঐ পাহাড়টা আসলে কাশার নহে, শাকার। তাহারা বলিল, ঐ স্থানের কী অবস্থা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাসূলুল্লাহ্ বলিলেন, ঐ পাহাড়ের পাদদেশে অচিরেই আল্লাহ্ কিছু বান্দার জীবন নাশ ঘটিবে। কথাটি তিনি রূপকভাবে বলিয়াছিলেন, এইভারে الان عنده لنحرن ان بدن الله )এখনই আল্লাহর বেশ কিছু উট ঐখানে যবেহ হইতেছে)।
রাবী বলেন, উক্ত দুই ব্যক্তি তখন দৌড়াইয়া হযরত আবূ বকর এবং হযরত উছমান (র)-এর নিকট গেল এবং এখন তাহাদের করণীয় কি জিজ্ঞাসা করিল। তাঁহারা বলিলেন, হতভাগারা! রাসূলুল্লাহ্ তো আসলে তোমাদের সম্প্রদায়ের বিপন্ন হওয়ারই সংবাদ দিতেছেন। তাড়াতাড়ি নবী দরবারে হাযির হইয়া তাঁহাকে তোমাদের সম্প্রদায়ের বিপদমুক্তির জন্য দু'আ করার আবেদন জানাও। তাহারা দৌড়াইয়া গিয়া নবী দরবারে উপস্থিত হইল এবং তাহাদের সম্প্রদায়ের বিপদমুক্তির জন্য দু'আ কামনা করিল। তিনি তাহাদের জন্য সেইরূপ দু'আ করিলেন। তিনি তখন বলেন : اللهم ارفع عنهم “হে আল্লাহ্! তাহাদেরকে বিপদমুক্ত করিয়া দিন”।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00