📄 কিন্দার প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
কিন্দার প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
কিন্দা ইয়ামানের হাদরামাওত এলাকার একটি জনপদ যেখানে কিন্দী রাজবংশের রাজত্ব ছিল। নবী কারীম-এর যমানায় ঐ খানদানের আশ'আছ ইব্ন কায়স সেখান রাজত্ব করিতেন। দশম হিজরীতে ৮০ জন অশ্বারোহীসহ হীরার মূল্যবান রেশমী পাড়সম্বলিত চাদর গায়ে দিয়া তিনি নবী দরবারে উপস্থিত হন। তাহাদের চাদরে রেশমের এই বাহার দর্শনে রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করেন: তোমরা কি মুসলমান নও? তাঁহারা ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি বলিলেন: তাহা হইলে এই রেশমের বাহার কেন? তাঁহারা কালবিলম্ব না করিয়া চাদর গা হইতে নামাইয়া রেশমী পাড় ছিড়িয়া ফেলিয়া দেয়।
আশ'আছ ইব্ন কায়স নিজেদের পরিচয় দিয়া বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আকিলুল মারার-এর এবং বংশধর হিসাবে আপনার সমগোত্রীয়। তাহার এবম্বিধ পরিচয় প্রদানে রাসূলুল্লাহ মুচকি হাসিলেন। বলিলেন: এই পরিচয় রাবী'আ ইবনুল হারিছ এবং আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবকেই মানায়, আমরা আসলে নাদর ইন্ন কিনানার বংশধর।
ইমাম যুহরী এবং ইবন ইসহাক বলেন, রাবী'আ ও 'আব্বাস ব্যবসা ব্যাপদেশে ঐ দেশে নিজদিগকে আকিলুল মারার-এর বংশধর বলিয়া প্রচার করিয়া আরবদের নিকট সম্মান লাভের প্রয়াস পাইতেন। আসলে আকিলুল মারার-এর বংশধরগণ ছিলেন রাজ-রাজড়া। আকিলুল মারার নাম নহে, তাহার পদবী ছিল। আসল নাম ছিল হারিছ। বংশলতিকা এইরূপ ছিল: হারিছ ইব্ন আমর ইবন হুজর ইন্ন আমর ইবন্ন মু'আবিয়া ইন্ন কিন্দা। রাসূলুল্লাহ-এর এক দাদী ঐ খান্দানের ছিলেন বলিয়া হারিছ এবং আব্বাস নিজদিগকে ঐ বংশের সন্তান বলিয়া পরিচয় দিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ইহার পক্ষপাতী ছিলেন না। আকিলুল মুররা শব্দের অর্থ তিক্ত ভোজী। কোন এক যুদ্ধাবস্থায় তাহার তিক্ত উদ্ভিদের পাতা ভক্ষণ করিতে হইয়াছিল বলিয়া তাঁহার এইরূপ খ্যাতি হয় (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ২৫১)।
📄 সাক্ষাতকালীন কিছু বিবরণ
কিন্দা প্রতিনিধি দলের ৮০, মতান্তরে ৬০ জন সদস্যের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আশ'আছ ইব্ন কায়সও ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ -এর জনৈকা সম্ভ্রান্ত পিতামহী তাঁহাদের বংশের ছিলেন। তাহারা অত্যন্ত পরিপাটি করিয়া চুল বিন্যস্ত করিয়া চক্ষুতে সুর্মা লাগাইয়া শিষ্টাচারের সহিত নবী কারীম -এর খিদমতে উপস্থিত হন। তাঁহারা জাহিলিয়াতের পদ্ধতিতে ‘লাইয়্যা ইন্আম’ বলিয়া তাঁহাকে অভিবাদন জানান। জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেন: আমি কোন রাজা-বাদশাহ নহি। আমি আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ।
প্রতিনিধি দলের সদস্যগণ বলেন: আমরা আপনাকে নাম ধরিয়া সম্বোধন করিতে পারিব না। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, ঠিক আছে, আমার উপনাম আবুল কাসিম। এই নামেই তোমরা সম্বোধন করিবে।
তাঁহারা বলিলেন, হে আবুল কাসিম! আমরা আপনার নিকট একটি ব্যাপার গোপন রাখিয়াছি। বলুন তো তাহা কি? আসলে তাহারা একটি ঘৃত পাত্রে একটি ছোট ফড়িং-এর চক্ষু লুকাইয়া রাখিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সুবহানাল্লাহ্! এই সব তো জ্যোতিষীদের পরীক্ষার জন্য প্রচলিত পদ্ধতি। অথচ জ্যোতিষিগণ এবং তাহাদের প্রতি আস্থা জ্ঞাপনকারী সকলেই জাহান্নামী।
তাহারা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি সত্যসত্যই আল্লাহ্র রাসূল কিনা তাহা আমরা কীভাবে পরীক্ষা করিব? এতদশ্রবণে নবী কারীম মাটি হইতে কয়েকটি কঙ্কর উঠাইয়া লইলেন, তারপর বলিলেন: আমার হস্তস্থিত এই কঙ্করগুলি যদি আমার নবুওয়াতের সাক্ষ্য প্রদান করে, তাহা হইলে তো বিশ্বাস করিবে।
এই সময় সত্য সত্যই তাঁহার হস্তস্থিত কঙ্করগুলি তাস্বীহ পাঠ করিতে লাগিল। সবিস্ময়ে - তাহারা উহার শব্দ শুনিতে পাইয়া বলিল, আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি সত্য সত্যই আল্লাহ্র রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: আল্লাহ তা'আলা আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন। তিনি আমার নিকট একখানি কিতাবও নাযিল করিয়াছেন যাহার সম্মুখে বাতিল বা অসত্য টিকিতে পারে না।
📄 কুরআন তিলাওয়াত : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর ইহার প্রভাব
বনূ কিন্দার প্রতিনিধি দল তখন কুরআন শারীফের তিলাওয়াত শুনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলে রাসূলুল্লাহ তিলাওয়াত করিলেন: وَالصَّفَاتِ صَفًّا فَالزَّاجِرَاتِ زَجْرًا ، فَالتَّلِيتِ ذِكْرًا. إِنَّ إِلَهَكُمْ لِوَاحِدٌ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَرَبُّ الْمَشَارِقِ.
“শপথ তাহাদের অর্থাৎ সেই ফেরেশতাদের যাহারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান ও যাহারা কঠোর পরিচালক এবং যাহারা যিকির আবৃত্তিতে রত- নিশ্চয়ই তোমাদের ইলাহ এক, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছুর প্রভু এবং প্রভু সকল উদয়স্থলের” (৩৭:১-৫)।
এতটুকু তিলাওয়াত করিয়াই রাসূলুল্লাহ এতই নীরব নিস্তব্ধ হইয়া গেলেন যেন তাঁহার গোটা দেহই নিথর নিস্পন্দ। অশ্রু গণ্ডযুগল বাহিয়া শ্মশ্রু ভিজাইয়া তুলিল। তখন তাহারা বলিতে
লাগিল, আমরা আপনাকে ক্রন্দন করিতে দেখিতে পাইতেছি। এই ক্রন্দন কি সেই মহান সত্তার ভয়ে যিনি আপনাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সেই পবিত্র সত্তার ভয়ে আমি ক্রন্দন করিতেছি যিনি আমাকে তরবারির চেয়ে তীক্ষ্ণ সীরাতুল মুস্তাকীমের উপর প্রেরণ করিয়াছেন। ইহা হইতে সামান্যতম বিচ্যুতি আমার ধ্বংসের কারণ হইতে পারে। তারপর তিনি আবার তিলাওয়াত করিলেন:
وَلَئِنْ شِئْنَا لَنَذْهَبَنَّ بِالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ ثُمَّ لَا تَجِدُلَكَ بِهِ عَلَيْنَا وَكِيلاً. الا رَحْمَةً مِّنْ رَبِّكَ إِنَّ فَضْلَهُ كَانَ عَلَيْكَ كَثِيرًا.
"ইচ্ছা করিলে আমি তোমার প্রতি যাহা ওহী করিয়াছি তাহা অবশ্যই প্রত্যাহার করিতে পারিতাম। তাহা হইলে এই বিষয়ে তুমি আমার বিরুদ্ধে কোন কর্মবিধায়ক পাইতে না। ইহা প্রত্যাহার না করা তোমার প্রতিপালকের দয়া; তোমার প্রতি আছে তাঁহার মহা অনুগ্রহ" (১৭: ৮৬-৮৭; সীরাতে হালাবিয়্যা, উর্দু ৩৯তম কিস্তি, পৃ. ৬৩)।
📄 হিময়ারী প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
হিময়ারী প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন।
হিময়ারে তখন আর শান-শওকতপূর্ণ রাজত্ব ছিল না। হিময়ার রাজদের সন্তানগণ ছোট ছোট সামন্ত রাজ্য কায়েম করিয়া রাখিয়াছিলেন এবং তাহারা তখন নামেমাত্র রাজা ছিলেন। আরবী ভাষায় তাহাদেরকে কায়ল (قيل) বলা হইত। বহুবচনে একসাথে তাহাদেরকে আক্যাল বলিয়া অভিহিত করা হইত। তাহাদের প্রতিনিধি পাঠাইয়া তাহারা তাহাদের ইসলাম গ্রহণের কথা নবী কারীম -কে অবহিত করেন। বাহা ও বনূ বাকা প্রতিনিধি দল এই সময়েই নবী দরবারে আগমন করেন। ইবন সা'দ বলেন: আবদুল্লাহ্ খাওলানী হিময়ারী এমন এক ব্যক্তির বরাতে রিওয়ায়াত করিয়াছেন, যিনি নবী কারীম -এর সাক্ষাৎ পাইয়াছেন। তিনি বলেন:
قدم على رسول الله ﷺ مالك بن مرارة الرهاوى رسول ملوك حمير بكتابهم وإسلامهم وذلك في شهر رمضان سنة تسع فأمر بلالا أن ينزله ويكرمه ويضيفه.
"হিময়ার রাজগণের পত্র শিরক বর্জন ও ইসলাম গ্রহণের বার্তাসহ মালিক ইব্ন মুরারা আর-রাহাবী নবী কারীম -এর দরবারে আগমন করেন। আর উহা ছিল নবম হিজরীর রমযান মাসের কথা। রাসূলুল্লাহ বিলালকে তাহাদিগকে অভ্যর্থনা ও সম্মানজনক আদর-আপ্যায়নের জন্য আদেশ দান করেন"।
ইবন হিশাম ঐ রাজন্যবর্গের নামও উল্লেখ করিয়াছেন- যাহাদের পক্ষ হইতে প্রতিনিধিরূপে মালিক ইবন মুরারা নবী দরবারে আগমন করিয়াছিলেন। তাহারা হইতেছেন: হারিছ ইব্ন আবদে কুলাল, নু'আয়ম ইব্ন আবদে কুলাল, যু-রুআয়নপতি নু'মান, মাআকাব ও হামদান (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩৫৫)।
ইমাম আহমাদ (র) বলেন, হাসান (র) আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, যু-য়াধানের দূত মালিক রাসূলুল্লাহ -কে একজোড়া বস্ত্র উপঢৌকনস্বরূপ দিয়াছিলেন- যাহা তেত্রিশটি বড় বড় উট ও ৩৩টি বড় বড় উটনীর বিনিময়ে ক্রয় করা হইয়াছিল। আবূ দাউদ (র) ও
আমর ইব্ন আওন আল-ওয়াসিতীর বরাতে হযরত আনاس (রা) হইতে ঐ হাদীছখানা রিওয়ায়াত করিয়াছেন। উক্ত হাদীছ হইতে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ-কে প্রদত্ত বস্ত্র অত্যন্ত মূল্যবান ছিল- যাহা তাঁহার প্রতি হিময়ার রাজদের অতি ভক্তিরই নিদর্শন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৬৭-৬৮)। যতদূর মনে হয় রাসূলুল্লাহ-কে প্রদত্ত বস্ত্রজোড়া তেত্রিশটি উট ও তেত্রিশটি উটনীর বিনিময়ে ক্রয়ের বক্তব্য সঠিক নহে বরং সঠিক হইল:
قد اخذها بثلاثة وثلاثين يعيرا او ثلاثه وثلاثين ناقة "উহা তিনি গ্রহণ করিয়াছিলেন ৩৩টি উট অথবা ৩৩টি উটনীর বিনিময়ে"। হাফিজ ইব্ন কাছীর লিখিত আস্-সীরাতু'ন-নাবাবিয়্যা গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উহাই লিখিত আছে। পূর্বোক্ত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থখানিও তাঁহারই রচিত। এ ব্যাপারে তিনি য়ে সনদে হাদীছ উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাও অভিন্ন। সুতরাং প্রথমোক্ত উদ্ধৃতিতে। (অথবা) শব্দটির আলিফ পড়িয়া গিয়া (এবং) হইয়া গিয়াছে তাহা বলাই বাহুল্য (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ: ১৪৭, বৈরূত মুদ্রণ ১৩৯৫/১৯৮৬)।