📄 বনূ আবদিল কায়স প্রতিনিধি দলের আগমনের প্রেক্ষিত
মুসলিম শরীফের রিওয়ায়াতে বক্তব্য আরও আছে: তাহারা জিজ্ঞাসা করিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নকীর (কাণ্ডখোদিত পাত্র) বলিতে আপনি কী বুঝাইতেছেন? রাসূলুল্লাহ জবাব দেন: বাঁশ বা গাছের শিকড়ের দিকের ভিতরের অংশ খালি করিয়া তোমরা তাহাতে খেজুর রাখিয়া থাক, তারপর তাহাতে পানি ঢালিয়া দিয়া থাক। তারপর তাহা যখন ফেনা উদ্দ্গীরণ করিয়া স্থিতি লাভ করে তখন তোমরা তাহা পান করিয়া নেশাগ্রস্ত হইয়া আপন চাচাত ভাইয়ের উপর তরবারি প্রয়োগ কর। তাহারা পুনরায় প্রশ্ন করে, তাহা হইলে আমরা পানির পাত্ররূপে কী ব্যবহার করিব? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন, সূতা বা রশ্মি দ্বারা মুখ বন্ধ করা চর্ম নির্মিত পাত্র তোমরা ব্যবহার করিতে পার।
তাঁহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের দেশে ইঁদুরের উপদ্রব অত্যন্ত বেশী; চর্মনির্মিত পাদ্র মোটেই টিকে না। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, যদিও ইঁদুরে তাহা খাইয়া ফেলে! যদিও ইঁদুরে তাহা খাইয়া ফেলে!! যদিও ইঁদুরে তাহা খাইয়া ফেলে!!! (শারহে মুসলিম নববী, কাতাদা আবৃ নাদরা, আবু সা'ঈদ খুদরী সনদে বর্ণিত হাদীছ, কিতাবুল ঈমান, ১খ., পৃ. ৯৮-৯৯ ২য় সং, ইতিকাদ পাবলিশিং হাউস, দিল্লী ১৯৮৬ খৃ.)।
ইবন হিশাম আবদুল কায়স প্রতিনিধি দলের আগমন সম্পর্কে লিখিতে গিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ বাহরায়নবাসিগণকে এই মর্মে পত্র লিখেন যে, তোমাদের কুড়িজন লোক যেন আমার নিকট আসে। সেইমতে আবদুল্লাহ ইব্ন আওফ আল-আশাজ্জ-এর নেতৃত্বে তাহাদের কুড়িজন লোক নবী দরবারে উপস্থিত হয়। তাহাদের মধ্যে জারুফ এবং আশাজ্জের ভাগিনা মুনকিয ইবন হাইয়ানও ঐ প্রতিনিধি দলে ছিল। তাহাদের এই আগমন ঘটে বিজয়ের বৎসর অর্থাৎ অষ্টম হিজরীতে। যখন রাসূলুল্লাহকে বলা হইল, ইহারা হইতেছে আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধি দল তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন:
مرحبا بهم نعم القوم عبد القيس. "তাহাদিগকে স্বাগতম! কী উত্তম গোত্র আবদুল কায়স।" বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ ঐ দিনের ভোররাত্রিতেই পূর্ব দিগন্তের দিকে তাকাইয়া বলেন:
ليأتين ركب من المشركين لم يكرهوا على الإسلام قد أنضوا الركاب وأفنوا الزاد بصاحبهم علامة اللهم اغفر لعبد القيس أتوني لا يسسألوني مالا هم خير أهل المشرق.
"অচিরেই আমার নিকট মুশরিক গোত্রের একটি অশ্বরোহী দল আসিয়া পৌঁছিবে। তাহাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় নাই, তাহারা বাহনগুলিকে দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছে, পাথেয় শেষ করিয়া দিয়াছে, তাহাদের দলপতির মধ্যে চিহ্ন রহিয়াছে। হে আল্লাহ্! আবদুল কায়স গোত্রকে ক্ষমা কর। তাহারা আমার নিকট আগমন করিয়াছে, তাহারা আমার নিকট সম্পদ প্রার্থী নহে। পূর্বদেশীয়দের মধ্যে তাহারাই সর্বোত্তম” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১৪)।
ইমাম নববী সাহিবুল হারীর-এর বরাতে লিখেন, আবদুল কায়স প্রতিনিধি দলে ১৪ জন সদস্য ছিলেন: (১) দলপতি আল-আশাজ্জ আল-আসরী, (২) মাযীদা ইবন মালিক আল-মাহারিযী, (৩)
৩৯৭ উবায়দা ইব্ন হুমাম আল-মাহারিযী, (৪) সাহহার ইব্ন আব্বাস আল-মাযযী, (৫) আমর ইব্ন মাখযূম (অথবা আল-মারজুম) আল-আসরী, (৬) হারিছ ইব্ন শুআয়ব আল-আসরী, (৭) হারিছ ইন জুনদুব। অবশিস্ট সদস্যগণের নাম জানা যায় নাই (শারহু মুসলিম, নববী, ১খ., পৃ. ৯৪, উর্দু অনুবাদ, দিল্লী মুদ্রণ ২, ১৯৮৬)।
সহীহ্ বুখারী, মুসনাদে আহমাদ এবং আবূ দাউদ-এ রিওয়ায়াত বর্ণিত হইয়াছে যে, যখন এই প্রতিনিধি দলটি মদীনায় আসিয়া পৌঁছে তখন প্রতিনিধি দলের সদস্যগণ বাহন হইতে লাফাইয়া পড়িয়া নবী কারীম ﷺ-এর সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে পরম ঔৎসুক্যভরে তাড়াতাড়ি তাঁহার খেদমতে উপস্থিত হইয়া তাঁহার পবিত্র হস্ত চুম্বন করেন। তাহাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আশাজ্জ আবদুল কায়স প্রথমে উষ্ট্র হইতে অবতরণ করিয়া সবগুলি উটকে একত্র করিয়া বসাইয়া দেন, সকলের সামান পত্র একত্র করেন, তারপর নিজের থলিয়া হইতে দুইটি শ্বেত শুভ্র বস্ত্র বাহির করিয়া পরিধান করেন। তারপর নবী কারীম ﷺ-এর দরবারে গিয়া উপস্থিত হন। তাঁহার সহিত মুসাফাহা করেন এবং তাঁহার পবিত্র হস্ত চুম্বন করেন। তখন তাঁহার সহিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পূর্বোক্ত কথোপকথন হয় (বুখারী ১খ., পৃ. ১৩)।
ইবন হিশামের বর্ণনায় আছে, যখন প্রতিনিধি দলটি তাহাদের সফরের কাপড় পরিহিত অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহিত আসিয়া দেখা করিয়া তাঁহাকে সালাম দিল তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন : ايكم عبد الله الاشج "তোমাদের মধ্যে আল্লাহর বান্দা আশাজ্জ কে"? তিনি জবাব দেন, আমিই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি ছিলেন একজন কুৎসিত বিশ্রী অবয়বের লোক। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁহার দিকে তাকাইলে তিনি বলিয়া উঠেন: انه لا يستقى في مسوك الرجال انما يحتاج من الرجل الى اصغريه لسانه وقلبه.
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁহার সম্পর্কে পূর্বোক্ত প্রশংসাসূচক উক্তি করেন (তাবাকাত ১খ., পৃ. ৩১৪)।
ইবনুল কায়্যিম (র) ইবন ইসহাকের প্রমুখাৎ উদ্ধৃত করেন যে, আবদুল কায়স প্রতিনিধি দলের সহিত জারূদ ইবনুল 'আলাও আসেন। ধর্মت ইনি খৃষ্টান ছিলেন। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি একটি সত্য ধর্মের অনুসরণ করিয়া আসিতেছি। কিন্তু আপনার ধর্মের অনুকূলে এখন আমি আমার পূর্বের ধর্ম পরিত্যাগ করিতেছি। ঐ ধর্ম ত্যাগ করিয়া আপনার ধর্ম গ্রহণ যদি অন্যায় হয় তাহা হইলে আপনি কি দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলিলেন: نعم انا ضا من ان هراك الله الى ما معو خنيه منه.
"হাঁ, ইসলাম ধর্ম খৃষ্ট ধর্ম হইতে উত্তম। তাই আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারি।" তিনি তৎক্ষণাত ইসলাম গ্রহণ করিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার সঙ্গীগণও ইসলাম গ্রহণ করিলেন (ইবনুল কায়্যিম, যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৩৯৯, ইবুল হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবابিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫৭৫)।
৩৯৮ প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট বায়'আতের উদ্যোগ গ্রহণ করিলে রাসূলুল্লাহ তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা নিজেরাই কেবল নিজেদের পক্ষ হইতে বায়'আত গ্রহণ করিবে, নাকি নিজেদের গোত্রের সকলের পক্ষ হইতে বায়'আত গ্রহণ করিবে। জবাবে সকলে বলিলেন, আমাদের গোত্রের সকলের পক্ষ হইতেই বায়'আত গ্রহণ করিব। কিন্তু দলপতি আশাজ্জ এই ক্ষেত্রেও তাঁহার বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের পরিচয় দিলেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যাপারে আমি কেবল আমার নিজের দায়িত্বই গ্রহণ করিতে পারি। সমস্ত গোত্রের দায়িত্ব গ্রহণ আমার পক্ষে সম্ভব নহে। আমি আমার নিজের বায়'আতই গ্রহণ করিতেছি। আমার গোত্রে আপনি মুবাল্লিগ প্রেরণ করুন। যদি তাহারা মুবাল্লিগের আহ্বানে সাড়া দিয়া ইসলাম গ্রহণ করে তবে তো উত্তম, তাহারাও এই ক্ষেত্রে আমাদের সাথী হইয়া যাইবে। অন্যথায় তাহাদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হইব।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন: যথার্থ। তাঁহার এই জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শ্রবণে তিনি অত্যন্ত প্রীত হন এবং ইহারই প্রেক্ষিতে তিনি তাঁহার সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করেন (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪১১-৪১৫)
উক্ত বিবরণটি ছিল রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে আগত প্রথম প্রতিনিধি দলের। দ্বিতীয়বার 'আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধি দল আসে অষ্টম বা নবম হিজরীতে। দ্বিতীয়বার তাহাদের সদস্য সংখ্যা ছিল ৪০ জন। সহীহ ইবন হিব্বান-এর বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ তখন তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া বলেন : مالی اری الوانكم تغیرت “ব্যাপার কি! তোমাদের রঙ যে পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে দেখিতে পাইতেছি” (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৬৭; যুরকানী, ৪খ., পৃ. ১৩; সীরাতুল মুস্তাফা ৩খ., পৃ. ১১২)?
বনূ 'আবদিল কায়স প্রতিনিধি দলের আগমনের প্রেক্ষিত
উক্ত প্রতিনিধ দলের প্রথম আগমনের প্রেক্ষিত বর্ণনা করিয়া ইমাম আবূ যাকারিয়্যা য়াহয়া ইব্ 'শারাফ আন-নাবাবী (র) বলেন, বনূ গানাম ইব্ন ওয়াদী'আর এক ব্যক্তি মুনকিয ইবন হায়্যান জাহিলিয়াতের যুগে হাজার হইতে ইয়াছরিবে বাণিজ্য পণ্য আনয়ন করিতেন। হিজরতের পরেও তিনি ব্যবসা পণ্য লইয়া মদীনায় আসেন। তিনি একটি স্থানে উপবিষ্ট থাকা অবস্থায় ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ সেই পথ দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ আগমন করিতেছেন দেখিতে পাইয়া মুনকিয সসম্ভ্রমে দাঁড়াইয়া যান। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন : মুনকিয ইন্ন হায়্যান নাকি? তিনি তাঁহার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। ইহারপর নাম ধরিয়া তাঁহার সম্প্রদায়ের সম্ভ্রান্ত লোকদের কুশলাদিও জিজ্ঞাসা করিলেন। ইহাতে মুনকিয বিস্মিত হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি সূরা ফাতিহা এবং ইকরা বিস্মি রাব্বিকা (সূরা আলাক) শিক্ষা করেন। অতঃপর হাজার অভিমুখে রওয়ানা হন। রাসূলুল্লাহ তাঁহার হাতে 'আবদুল কায়স গোত্রের নামে লিখিত পত্র অর্পণ করেন।
মুনকিষ তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তনের পর কিছুদিন পর্যন্ত তাঁহার ইসলাম গ্রহণের কথা তাহাদের নিকট গোপন রাখেন। কিছুদিন পর তাঁহার সহধর্মিনী উহা টের পাইয়া যান। এই মহিলাটি ছিলেন মুনযির ইব্ন আয়ায ইবনিল হারিছ তথা মুনযির আল-আশাজ্জের কন্যা। তাঁহার
৩৯৯ কপালে কিছু বিশেষ বিশেষ চিহ্ন বিদ্যমান থাকায় রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে এই নামে অভিহিত করেন। এই নামেই তিনি খ্যাতিলাভ করেন। মুনকিয নামায পড়িতেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করিতেন। এই অভিনব কাজ দুইটি তাঁহার স্ত্রীর মনোপূত ছিল না। তিনি তাহার পিতার নিকট কথাটি বলিয়া দিলেন। তিনি বলিলেন, এইবার ইয়াছরিব হইতে ফিরিয়া আসিবার পর হইতেই আমি তাঁহার মধ্যে কি যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করিতেছি। হাত-পা ধৌত করিয়া কিবলামুখী হইয়া কি যেন সব অভিনব কাজ করেন। কখনও দাঁড়াইয়া থাকেন, কখনও ঝুকিয়া পড়েন, আবার কখনও ভূমিতে লুটাইয়া পড়েন। সব শুনিয়া আশাজ্জ জামাতার সহিত সাক্ষাত করিতে গেলেন। তাঁহার কথাবার্তা শুনিয়া তাহার মনও ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হইয়া পড়িল। তিনি তখন রাসূলুল্লাহ -এর পত্রখানা লইয়া তাঁহার স্বগোত্রীয় 'আসারা' ও মাহারিবী উপশাখার নেতাদিগকে তাহা দেখাইলেন ও পড়িয়া শুনাইলেন। তখন তাহাদের মনও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়ে এবং তাঁহারা সকলেই রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে হাযির হওয়ার সঙ্কল্প গ্রহণ করেন। (আসাহহুস-সিয়ার ৪১১-১২ মওলানা তাফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফাঃ সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮৬২-৩)।
📄 কিন্দার প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
কিন্দার প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
কিন্দা ইয়ামানের হাদরামাওত এলাকার একটি জনপদ যেখানে কিন্দী রাজবংশের রাজত্ব ছিল। নবী কারীম-এর যমানায় ঐ খানদানের আশ'আছ ইব্ন কায়স সেখান রাজত্ব করিতেন। দশম হিজরীতে ৮০ জন অশ্বারোহীসহ হীরার মূল্যবান রেশমী পাড়সম্বলিত চাদর গায়ে দিয়া তিনি নবী দরবারে উপস্থিত হন। তাহাদের চাদরে রেশমের এই বাহার দর্শনে রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করেন: তোমরা কি মুসলমান নও? তাঁহারা ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি বলিলেন: তাহা হইলে এই রেশমের বাহার কেন? তাঁহারা কালবিলম্ব না করিয়া চাদর গা হইতে নামাইয়া রেশমী পাড় ছিড়িয়া ফেলিয়া দেয়।
আশ'আছ ইব্ন কায়স নিজেদের পরিচয় দিয়া বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আকিলুল মারার-এর এবং বংশধর হিসাবে আপনার সমগোত্রীয়। তাহার এবম্বিধ পরিচয় প্রদানে রাসূলুল্লাহ মুচকি হাসিলেন। বলিলেন: এই পরিচয় রাবী'আ ইবনুল হারিছ এবং আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবকেই মানায়, আমরা আসলে নাদর ইন্ন কিনানার বংশধর।
ইমাম যুহরী এবং ইবন ইসহাক বলেন, রাবী'আ ও 'আব্বাস ব্যবসা ব্যাপদেশে ঐ দেশে নিজদিগকে আকিলুল মারার-এর বংশধর বলিয়া প্রচার করিয়া আরবদের নিকট সম্মান লাভের প্রয়াস পাইতেন। আসলে আকিলুল মারার-এর বংশধরগণ ছিলেন রাজ-রাজড়া। আকিলুল মারার নাম নহে, তাহার পদবী ছিল। আসল নাম ছিল হারিছ। বংশলতিকা এইরূপ ছিল: হারিছ ইব্ন আমর ইবন হুজর ইন্ন আমর ইবন্ন মু'আবিয়া ইন্ন কিন্দা। রাসূলুল্লাহ-এর এক দাদী ঐ খান্দানের ছিলেন বলিয়া হারিছ এবং আব্বাস নিজদিগকে ঐ বংশের সন্তান বলিয়া পরিচয় দিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ইহার পক্ষপাতী ছিলেন না। আকিলুল মুররা শব্দের অর্থ তিক্ত ভোজী। কোন এক যুদ্ধাবস্থায় তাহার তিক্ত উদ্ভিদের পাতা ভক্ষণ করিতে হইয়াছিল বলিয়া তাঁহার এইরূপ খ্যাতি হয় (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ২৫১)।
📄 সাক্ষাতকালীন কিছু বিবরণ
কিন্দা প্রতিনিধি দলের ৮০, মতান্তরে ৬০ জন সদস্যের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আশ'আছ ইব্ন কায়সও ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ -এর জনৈকা সম্ভ্রান্ত পিতামহী তাঁহাদের বংশের ছিলেন। তাহারা অত্যন্ত পরিপাটি করিয়া চুল বিন্যস্ত করিয়া চক্ষুতে সুর্মা লাগাইয়া শিষ্টাচারের সহিত নবী কারীম -এর খিদমতে উপস্থিত হন। তাঁহারা জাহিলিয়াতের পদ্ধতিতে ‘লাইয়্যা ইন্আম’ বলিয়া তাঁহাকে অভিবাদন জানান। জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেন: আমি কোন রাজা-বাদশাহ নহি। আমি আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ।
প্রতিনিধি দলের সদস্যগণ বলেন: আমরা আপনাকে নাম ধরিয়া সম্বোধন করিতে পারিব না। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, ঠিক আছে, আমার উপনাম আবুল কাসিম। এই নামেই তোমরা সম্বোধন করিবে।
তাঁহারা বলিলেন, হে আবুল কাসিম! আমরা আপনার নিকট একটি ব্যাপার গোপন রাখিয়াছি। বলুন তো তাহা কি? আসলে তাহারা একটি ঘৃত পাত্রে একটি ছোট ফড়িং-এর চক্ষু লুকাইয়া রাখিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সুবহানাল্লাহ্! এই সব তো জ্যোতিষীদের পরীক্ষার জন্য প্রচলিত পদ্ধতি। অথচ জ্যোতিষিগণ এবং তাহাদের প্রতি আস্থা জ্ঞাপনকারী সকলেই জাহান্নামী।
তাহারা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি সত্যসত্যই আল্লাহ্র রাসূল কিনা তাহা আমরা কীভাবে পরীক্ষা করিব? এতদশ্রবণে নবী কারীম মাটি হইতে কয়েকটি কঙ্কর উঠাইয়া লইলেন, তারপর বলিলেন: আমার হস্তস্থিত এই কঙ্করগুলি যদি আমার নবুওয়াতের সাক্ষ্য প্রদান করে, তাহা হইলে তো বিশ্বাস করিবে।
এই সময় সত্য সত্যই তাঁহার হস্তস্থিত কঙ্করগুলি তাস্বীহ পাঠ করিতে লাগিল। সবিস্ময়ে - তাহারা উহার শব্দ শুনিতে পাইয়া বলিল, আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি সত্য সত্যই আল্লাহ্র রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: আল্লাহ তা'আলা আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন। তিনি আমার নিকট একখানি কিতাবও নাযিল করিয়াছেন যাহার সম্মুখে বাতিল বা অসত্য টিকিতে পারে না।
📄 কুরআন তিলাওয়াত : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর ইহার প্রভাব
বনূ কিন্দার প্রতিনিধি দল তখন কুরআন শারীফের তিলাওয়াত শুনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলে রাসূলুল্লাহ তিলাওয়াত করিলেন: وَالصَّفَاتِ صَفًّا فَالزَّاجِرَاتِ زَجْرًا ، فَالتَّلِيتِ ذِكْرًا. إِنَّ إِلَهَكُمْ لِوَاحِدٌ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَرَبُّ الْمَشَارِقِ.
“শপথ তাহাদের অর্থাৎ সেই ফেরেশতাদের যাহারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান ও যাহারা কঠোর পরিচালক এবং যাহারা যিকির আবৃত্তিতে রত- নিশ্চয়ই তোমাদের ইলাহ এক, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছুর প্রভু এবং প্রভু সকল উদয়স্থলের” (৩৭:১-৫)।
এতটুকু তিলাওয়াত করিয়াই রাসূলুল্লাহ এতই নীরব নিস্তব্ধ হইয়া গেলেন যেন তাঁহার গোটা দেহই নিথর নিস্পন্দ। অশ্রু গণ্ডযুগল বাহিয়া শ্মশ্রু ভিজাইয়া তুলিল। তখন তাহারা বলিতে
লাগিল, আমরা আপনাকে ক্রন্দন করিতে দেখিতে পাইতেছি। এই ক্রন্দন কি সেই মহান সত্তার ভয়ে যিনি আপনাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সেই পবিত্র সত্তার ভয়ে আমি ক্রন্দন করিতেছি যিনি আমাকে তরবারির চেয়ে তীক্ষ্ণ সীরাতুল মুস্তাকীমের উপর প্রেরণ করিয়াছেন। ইহা হইতে সামান্যতম বিচ্যুতি আমার ধ্বংসের কারণ হইতে পারে। তারপর তিনি আবার তিলাওয়াত করিলেন:
وَلَئِنْ شِئْنَا لَنَذْهَبَنَّ بِالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ ثُمَّ لَا تَجِدُلَكَ بِهِ عَلَيْنَا وَكِيلاً. الا رَحْمَةً مِّنْ رَبِّكَ إِنَّ فَضْلَهُ كَانَ عَلَيْكَ كَثِيرًا.
"ইচ্ছা করিলে আমি তোমার প্রতি যাহা ওহী করিয়াছি তাহা অবশ্যই প্রত্যাহার করিতে পারিতাম। তাহা হইলে এই বিষয়ে তুমি আমার বিরুদ্ধে কোন কর্মবিধায়ক পাইতে না। ইহা প্রত্যাহার না করা তোমার প্রতিপালকের দয়া; তোমার প্রতি আছে তাঁহার মহা অনুগ্রহ" (১৭: ৮৬-৮৭; সীরাতে হালাবিয়্যা, উর্দু ৩৯তম কিস্তি, পৃ. ৬৩)।