📄 খৃস্টীয় ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের প্রয়াস
নাজরান প্রতিনিধি দলটি যেহেতু খৃস্টান জাতির প্রতিনিধিত্ব করিতেছিল, তাই ঈসা (আ) আল্লাহ্র পুত্র নহেন- ইসলামের এই বক্তব্য তাহারা সহজে মানিয়া লইতে রাজী হয় নাই। এই সম্পর্কে তাহারা রীতিমত বিতর্ক জুড়িয়া দেয়। তাহারা নবী কারীম-কে প্রশ্ন করে, ঈসা (আ) যদি আল্লাহ্র পুত্রই না হন, তবে তিনি কাহার পুত্র? রাসূলুল্লাহ বলিলেন: এই কথা তো অনবহিত নয় যে, পুত্র পিতারই মত আকৃতিসম্পন্ন হয়। নাজরান প্রতিনিধিদল- না হইবে কেন? অবশ্যই এইরূপই হইয়া থাকে।
ইহার ফল দাঁড়ায় এই যে, ঈসা (আ) যদি আল্লাহ্ পুত্রই হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাঁহারও আল্লাহ্ তা'আলার আকৃতিসম্পন্ন হইতে হয়। অথচ এই কথা সর্বজনবিদিত যে, আল্লাহ্ তা'আলা নিরাকার সত্তা; তাঁহার সদৃশ বা সমকক্ষ কেহ নাই:
রাসূলুল্লাহ বলেন, "তোমরা কি জ্ঞাত নও যে, আমাদের উপাস্য প্রতিপালক حى لا ليس كمثله شيئ ولم يكن له كفوا احد . يموت وان عيسى يأتي عليه الفناء. না? অথচ ঈসা (আ)-এর উপর লয় কার্যকরী হইবে"।
নাজরান প্রতিনিধি দল-যথার্থই বলিয়াছেন। এখানে একটি ব্যাপার লক্ষণীয়: আল্লাহর রাসূল বলিলেন: "ঈসা (আ)-এর লয় কার্যকর হইবে।" ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি এখনও জীবিত, এখনও তাঁহার মৃত্যু হয় নাই। রাসূলুল্লাহ বলেন, তোমরা অবগত রহিয়াছ যে, আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুর রক্ষক ও নিগাহ্বান, সকলের রিযিকদাতা। ঈসা (আ)-ও কি এই সমস্ত গুণের অধিকারী? নাজরান প্রতিনিধিদল বলিল, না, তাহা নহে। রাসূলুল্লাহ বলেন, তোমরা একথাও অবগত রহিয়াছ যে, ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ তা'আলা যেরূপ ইচ্ছা সেইরূপ আকৃতি দান করিয়া মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করিয়াছেন। তোমরা ইহা জান যে, আল্লাহ তাআলা পানাহার করেন না, মলমুত্র ত্যাগেরও তাঁহার প্রয়োজন হয় না।
নাজরান প্রতিনিধি দল: যথার্থই বলিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ : তোমরা সম্যক অবগত আছ যে, হযরত মারয়াম (আ) অন্য দশ মহিলার মত ঈসা (আ)-কে গর্ভে ধারণ করিয়াছেন। তিনি তাঁহাকে এরূপই প্রসব করিয়াছেন যেভাবে অন্য মহিলাগণ সন্তান প্রসব করিয়া থাকেন। অন্য দশ নবজাতকের মত শিশু ঈসার মুখেও খাবার দেওয়া হইয়াছে। তিনি স্বাভাবিক নিয়মে মলমূত্রও ত্যাগ করিতেন। নাজরান প্রতিনিধিদল বলিল, যথার্থ।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তাহা হইলে তিনি কেমন করিয়া ঈশ্বর হইয়া গেলেন? অর্থাৎ মাতৃগর্ভে যাহার অবয়ব সৃষ্টি হইল, মাতার প্রসবের পরই যিনি রীতিমত খাদ্য গ্রহণ করিলেন, যাঁহার মলমূত্র ত্যাগেরও প্রয়োজন হয় এমন একজন মানুষ কী করিয়া আল্লাহ্ হইয়া যাইতে পারেন?
নাজরান প্রতিনিধি দলের নিকট সত্য দিবালোকের মত স্পষ্ট হইয়া উঠিল, কিন্তু তবুও তাহারা উহা মানিয়া লইতে সমর্থ হইল না। আল্লাহ্ তা'আলা এই সম্পর্কেই আয়াত নাযিল করিলেন:
ٱللهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْحَىُّ ٱلْقَيُّومُ نَزَّلَ عَلَيْكَ ٱلْكِتَٰبَ بِٱلْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنزَلَ ٱلتَّوْرَاةَ وَٱلْإِنجِيلَ مِن قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَأَنزَلَ ٱلْفُرْقَانَ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَٱللَّهُ عَزِيزٌ ذُو ٱنتِقَامٍ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَخْفَىٰ عَلَيْهِ شَىْءٌ فِى ٱلْأَرْضِ وَلَا فِى ٱلسَّمَٓاءِ هُوَ ٱلَّذِى يُصَوِّرُكُمْ فِى ٱلْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَآءُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ
“আলিফ লা---ম মী---ম। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই, তিনি চিরঞ্জীব সর্বসত্তার ধারক। তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করিয়াছেন, যাহা উহার পূর্বের কিতাবের সমর্থক আর তিনি নাযিল করিয়াছিলেন তাওরাত ও ইনজীল, ইতোপূর্বে মানবজাতির সৎপথ প্রদর্শনের জন্য, আর তিনি ফুরকান নাযিল করিয়াছেন। যাহারা আল্লাহ্ নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে তাহাদের জন্য কঠোর শাস্তি আছে। আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী, দণ্ডদাতা। আল্লাহ্, নিশ্চয় আসমান ও যমীনে কিছুই তাঁহার নিকট গোপন থাকে না।
"তিনি মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই; তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৩: ১-৬; তাফসীর দুররে মানছুর, ২খ., পৃ. ৩; ইবন জারীর ও ইন্ন আবী হাতিম-এর বরাতে)।
রাসূলুল্লাহ যখন এবম্বিধ বক্তব্য প্রদানের পর তাহাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইলেন তখন তাহারা জবাব দিল, আমরা তো পূর্ব হইতেই মুসলমান। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তোমাদের ইসলাম কীভাবে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হইতে পারে যেখানে তোমরা ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র সাব্যস্ত করিয়া থাক, ক্রুশের পূজা কর, শূকর মাংস ভক্ষণ কর?
নাজরানের প্রতিনিধি দল পাল্টা প্রশ্ন করে, আপনি যে ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র বান্দা বলেন, তাঁহার অনুরূপ অন্য কাহাকেও কি আপনি দেখিয়াছেন? ইহার জবাবে নাযিল হয় أَنَّ مَثَلَ عِيسَى
৩৯২ সীরাত বিশ্বকোষ عِنْدَ اللَّهُ كَمَثَلِ أَدَمَ আয়াত (যাহার পূর্ণ পাঠ ও অনুবাদ ইতোপূর্বেই প্রদত্ত হইয়াছে (সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১২০-৪)।
📄 নাজরানবাসীদের উপর যুগপৎভাবে জিযয়া ও সাদাকাত নির্ধারণের তাৎপর্য
নাজরান প্রতিনিধি দলকে নিরাপত্তাপত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাহাদের উপর নির্দিষ্ট পরিমাণ জিযিয়া ধার্য করিয়াছিলেন—যাহার বিবরণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পত্রাবলী ও ফরমানসমূহের আলোচনায় বিস্তৃতভাবে আসিয়াছে। সহীহ বুখারীতে সাহাবী হযরত হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে : جاء العاقب والسيد صاحبا نجران الى رسول الله ﷺ يريدان ان يلاعنه قال فقال احدهما لصاحبه لا تفعل فو الله لئن كان نبيا فلا عناه لا تفلح نحن ولا عقبنا من بعدنا قال انا نعطيك ما سألتنا وابعث معنا رجلا امينا ولا تبعث معنا الا رجلا امينا فقال بعثن معكم رجلا امينا حق امين فاستصرف لما اصحاب رسول الله ﷺ وقال قم یا ابا عبيدة ابن الجراح فلما قام قال هذا أمين هذه الامة.
“নাজরানের দুই নেতা আল-'আকিব ও আস-সায়্যিদ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহিত মুবাহালা করার উদ্দেশ্যে তাঁহার নিকট আসে। সাথীদ্বয়ের একজন অপরজনকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, এই কাজটি করিতে যাইও না। কেননা প্রকৃতই তিনি যদি নবী হইয়া থাকেন আর ইহার পরেও আমরা তাঁহার সহিত মুবাহালায় অবতীর্ণ হই, তাহা হইলে আমরা এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সাফল্য লাভে সমর্থ হইবে না। তাই তাহারা দুইজনে বলিল, আমরা আপনার জিযিয়া প্রদানের দাবি পূরণে সম্মত আছি। আপনি আমাদের সহিত একজন বিশ্বস্ত লোক পাঠাইয়া দিন অবিশ্বস্ত কোন ব্যক্তিকে নহে। জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলিলেন : আমি তোমাদের সহিত অবশ্যই একজন বিশ্বস্ত লোককে প্রেরণ করিব যে আমানতদারীর হক আদায়ে সমর্থ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীগণ তখন পরম উৎসুক্যভরে তাকাইয়া রহিলেন। নবী কারীম ﷺ বলিলেন, উঠ হে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ! তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলে তিনি বলিলেন, এই হইল এই উম্মতের বিশ্বস্ততম ব্যক্তি” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৫৩; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪৩০)।
সহীহ মুসলিমে হযরত মুগীরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। ইউনুস ইন বুকায়র (র) ইবন ইসহাক হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী ইব্ন আবূ তালিবকে সাদাকাত ও জিযয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে নাজরানে প্রেরণ করেন।
আবদুর রউফ দানাপুরী বলেন, কোন কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি এই ব্যাপারে প্রশ্ন তুলিয়াছেন যে, তাহা কেমন করিয়া হইতে পারে যে, নাজরানবাসীদের নিকট হইতে যুগপৎভাবে সাদাকা (যাকাত) ও জিয়া উভয়টাই গ্রহণ করা হইবে? সাদাকা বা যাকাত আদায় করা হইয়া থাকে মুসলমানদের নিকট হইতে, আর জিযিয়া লওয়া হয় বিধর্মী যিম্মীদের নিকট হইতে। নাজরানবাসীদের সহিত কৃত চুক্তিতে তাহাদের নিকট হইতে বার্ষিক দুই হাজার জোড়া বস্ত্র লওয়ার কথাই সাব্যস্ত হইয়াছিল। সেখানে আবার যাকাত আদায়ের অবকাশ কোথায়? যাকাত তো বিধর্মীদের নিকট হইতে লওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আর যদি ধরিয়াই লওয়া হয় যে, তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল
৩৯৩ তাই যাকাত আদায় করা হইয়াছিল, তাহা হইলে প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহা হইল তো জিয়া তাহাদের উপর হইতে রহিত হইয়া যাওয়ার কথা। জিযয়া আদায়ের জন্য একাধিক সাহাবীকে প্রেরণের কী অর্থ হইতে পারে?
ইহার জবাব হইর, রাসূলুল্লাহ হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (র)-কে নাজরানে প্রেরণ করিয়াছিলেন বানুল হারিছ ইবন কা'বের নিকট। তখন তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহাদের প্রতিনিধি দলও যথারীতি মদীনায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ -এর সহিত সাক্ষাত করিয়াছিল এবং তিনি হযরত কায়স ইবন হাসানকে তাহাদের আমীর নিযুক্ত করিয়াছিলেন।
আসল কথা হইতেছে, নাজরানে দুই শ্রেণীর লোক বসবাস করিত। তাহাদের একদল ছিল খৃষ্টান —যাহারা জিয়া কবুল করিয়া সন্ধি করিয়া লয়, কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করে নাই। অপর দল ছিল উম্মিয়্যীন, তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়া লয়। তাই একদলের (মুসলমানদের) নিকট হইতে সাদাকা এবং অপর দল খৃস্টানদের নিকট হইতে জিয়া গ্রহণ করা হইত (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৩০-৩২)।/
📄 সুদী কারবার যিম্মা (নিরাপত্তা) বাতিলকারী
নাজরান প্রতিনিধি দলকে প্রদত্ত অভয় পত্রের একটি ধারা ছিল, তোমাদের মধ্যকার কোন ব্যক্তি যদি সূদ খায় তবে তাহার ব্যাপারে আমার কোন যিম্মা থাকিবে না। ইহা হইতে জানা গেল যে, যিম্মীগণ অমুসলিম হইলেও সূদের সমাজবিধ্বংসী ও মানবতা বিরোধী কার্যকলাপের অধিকার ইসলামী রাষ্ট্র তাহাদেরকে কোনমতে দিতে পারে না। নাজরান চুক্তির মাধ্যমে এই সত্যটি বিশ্ববাসী সর্বপ্রথম জানিতে পারে। ইহা সর্বধর্মের পরিপন্থী কাজ (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৩২)।
📄 নাজরান প্রতিনিধি দল আগমনের বিবরণ হইতে প্রাপ্ত শর'ঈ আহকাম
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (র) ১২টি শর'ঈ হুকুম (বিধান) এই ঘটনা হইতে পাওয়া যায় বলিয়া লিখিয়াছেন। ঐ গুলি হইল: (১) আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী খৃস্টানগণ মুসলমানদের মসজিদে প্রবেশ করিতে এবং তাহাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে উহাতে প্রার্থনাও করিতে পারেন। ইহাতে কাহারও দ্বিমত নাই। (২) কাফির কেবল এই স্বীকারোক্তি দ্বারা যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল, ইসলামে দাখিল হইতে পারিবে না। এই ব্যাপারে ইমাম আহমাদ (র) হইতে তিনটি রিওয়ায়াত পাওয়া যায়- (ক) তাহাকে মুসলমান সাব্যস্ত করা হইবে। (খ) তাহাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলমান বলা যাইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর স্বীকারোক্তি করিবে। (গ) আমরা ইহা এইজন্য বলিয়াছি যে, আহলে কিতাব সর্বসম্মতিক্রমে এই কথা স্বীকার করে যে, আখেরী যমানায় আখেরী নবীর আবির্ভাব ঘটিবে এবং তাহাদের পণ্ডিতগণের ইহাতেও দিদ্বমত ছিল না যে, আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ -ই আখেরী যমানার নবী। কেবল রাজ্য লিন্সার জন্য অর্থাৎ তাহাদের রাজ্যক্ষমতা হারাইবার ভয়েই তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে পারে নাই। (৩) আহলে কিতাবদের সহিত বাহাছ-মুনাযারা বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা জায়েয বরং উহা মুস্তাহাব ও ওয়াজিব। অবশ্য এই শর্তে যে, তাহাদের ঈমান আনয়নের আশা ও সম্ভাবনা থাকে। আমি (ইবনুল কায়্যিম) তাহাদের সহিত অনেক বাহাছ করিয়াছি।
(৪) আল্লাহ্ মাখলুক বা সৃষ্টি কিছুকে তাঁহার স্তরের ঊর্ধ্বে স্থান দিবে, সে শিরকের অপরাধে অপরাধী হইবে। উহা রাসূলুল্লাহ -এর দাওয়াতের পরিপন্থী কাজ। আর রাসূলুল্লাহ باسم الرب ابراهيم واسحاق বলিয়া তাহাদেরকে পত্র লিখিয়াছেন, বলা হইয়াছে উহা সঠিক নহে। বরং হিরাক্লিয়াসকে পত্র প্রেরণকালে তিনি লিখিয়াছিলেন, بسم الله الرحمن الرحيم ইহাই তাঁহার সুন্নাত বা চিরাচরিত রীতি।
(৫) এই ঘটনা হইতে জানা গেল, কাফিরদের দূতের সালামের জবাব না দেওয়া বা পত্রের উত্তর না দিয়া তাহাদের অবমাননা করা জায়েয আছে। বিশেষত যখন তাহারা অহংকারী বেশে আগমন করে।
(৬) আহলে বাতিল বা বাতিলপন্থিগণ যখন বিতর্ককালে জিদ ও হঠকারিতার পরিচয় দেয় তখন তাহাদের সহিত বিতর্ক করা জায়েয।
(৭) আহলে কিতাবের সহিত মালের বিনিময়ে সন্ধি করা জায়েয। উহাকে জিযয়ার মাল বলা হইবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ যখন ইয়ামানবাসীদের সহিত সন্ধি করেন তখন তাহাদের প্রত্যেক বালেগ ব্যক্তির উপর এক দীনার হিসাবে ধার্য করিয়াছিলেন। উভয় ঘটনায় পার্থক্য ছিল এই যে, নাজরানবাসীদের মধ্যকার কেহই মুসলমান ছিল না, পক্ষান্তরে ইয়ামান ছিল দারুল ইসলাম। সেখানে ইয়াহুদীরাও বাস করিত। তাহাদের উপর রাসূলুল্লাহ জিযয়া ধার্য করিয়াছিলেন। উভয় ক্ষেত্রেই কাফিরদের নিকট হইতে প্রাপ্ত মাল জিযয়া বলা হইবে।
(৮) মুসলমানদের ইমাম বা নেতার পক্ষে কাফিরদের উপর এইরূপ শর্ত আরোপ করা বৈধ যে, তাহারা মুসলমান দূতদের ব্যয়ভার বহন করিবে।
(৯) সন্ধির পর অস্ত্রসম্ভার প্রভৃতি সন্ধিবদ্ধ কাফিরদের নিকট হইতে ধার লওয়া জায়েয।
(১০) ইমামের জন্য কাফিরদের সূদী কারবার বন্ধ করা জায়েয। কেননা উহা তাহাদের ধর্মেও নিষিদ্ধ।
(১১) চুক্তিকালে কাফিরদিগকে নসীহত করা জায়েয—যাহাতে তাহাদের আত্মশুদ্ধি হইতে পারে।
(১২) চুক্তির পর ইসলামের স্বার্থে কোন 'আলিমকে কাফিরদের এলাকায় ইসলাম প্রচারার্থে প্রেরণ জায়েয (যাদুল-মা'আদ ২খ., পৃ. ৪১৮-২০ উর্দু সং-মুফতী আযীযুর রহমান অনুদিত, মাকতাবায়ে বুরহান, জামে মসজিদ, দিল্লী ১৩৯৮/ ১৯৭৮)।