📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুইজন নওমুসলিমের আলোচনামূলক কথাবার্তা

📄 দুইজন নওমুসলিমের আলোচনামূলক কথাবার্তা


অধিকাংশ গোত্রীয় প্রতিনিধিদল মুসলমান হইয়া রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছে বা তাঁহার দরবারে পৌঁছিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে। নাজরান প্রতিনিধি দলটি খৃস্টান পরিচয়েই আসিয়াছিল এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাহারা ইসলাম গ্রহণও করে নাই, কিন্তু ঐ প্রতিনিধি দলের আগমনে অন্তত দুইজন লোকের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ নিশ্চিতভাবে জানা যায়। তাহাদের
একজন ছিলেন পাদ্রী হারিছা ইবন 'আলকামার ভ্রাতা কুরয ইবন 'আলকামা—যাহার কথা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে। অপর ইসলাম গ্রহণকারীও ঘটনাক্রমে নাজরানের সেই বড় পাদ্রীর বৈপিত্রেয় সহোদর এবং চাচাত ভাই। তাঁহার নাম ছিল বিশ্বর ইব্‌ন মু'আবিয়া।
নাজরান প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ -এর প্রদত্ত অভয়পত্রখানা লইয়া নাজরান অভিমুখে রওয়ানা হইলে সেখানকার বড় পাদ্রী এবং সম্ভ্রান্ত লোকজন এক দিনের পথ অগ্রসর হইয়া তাহাদেরকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করে। রাসূলুল্লাহ -এর পত্রখানা বড় পাদ্রীর হাতে দিলে সকলেই পত্রখানা দেখিতে পাইয়া ধীরে ধীরে আগাইয়া আসিতেছিলেন। বড় পাদ্রী ইহা দেখিতে এতই কৌতূহলী ছিলেন যে, পথ চলিতে চলিতে তিনি পত্রখানা পাঠ করিতেছিলেন। এমন সময় তাহার পাশেই বিশরের উষ্ট্রীটি তাহাকে পিঠ হইতে উপুড় করিয়া ফেলিয়া দিলে সে নবী কারীম -এর পত্রখানাকেই অলুক্ষণে মনে করিয়া তাহার নামে স্পষ্টত ধিক্কার ধ্বনি উচ্চারণ করে। তখন পাদ্রীটির মুখ হইতে সত্য কথাটি বাহির হইয়া পড়ে : قد والله تعست نبیا مرسلا
"আল্লাহর কসম! তুমি একজন প্রেরিত নবীকে ধিক্কার দিলে"! পাদ্রীর এই স্বীকারোক্তি বিশরের জীবনের মোড় ঘুরাইয়া দেয়। তিনি তখন বলিয়া উঠিলেন : لا جرم والله لا احل عنها عقدا حتى أتى رسول الله ﷺ.
"আল্লাহর কসম! তাহা হইলে আমি রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে উপনীত হওয়ার পূর্বে উষ্ট্রীটির গদির লাগামের একটি গিটও খুলিতেছি না।"
আর অমনি তিনি উষ্ট্রীর মুখ মদীনার দিকে ফিরাইয়া দিলেন। পাদ্রীটি তখন মরিয়া হইয়া তাহার পিছনে পিছনে নিজের উষ্ট্রীটিকেও ছুটাইলেন এবং তাহাকে ফিরাইয়া আনিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিলেন। কিন্তু সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হইল। কিছুতেই আর কিছু হইল না। বিশর তাহার উষ্ট্রীটিকে আঘাত করিতে করিতে আপন মনে গাহিয়া চলিলেন : اليك تغدوا قدما وضيتها معترضا في بطنها جنينها مخالفا دين النصارى دينها "তোমার পানেতে এগিয়ে চলেছে উস্ত্রী বাহন, চলার গতিতে কাঁপিতেছে তাহার হাওদা বাঁধন। গর্ভস্থিত বৎসটিও আর নাসারা নয়, খৃষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধেই সে বাঙময়"।
রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে পৌঁছিয়া তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একটি যুদ্ধে শহীদ না হওয়া পর্যন্ত জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁহার সহিত অবস্থান করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৪৯-৫০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গির্জায় অবস্থানরত যাজকের সত্য উপলব্ধি

📄 গির্জায় অবস্থানরত যাজকের সত্য উপলব্ধি


নাজরানের প্রতিনিধিদল মদীনা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া নাজরানের গীর্জার আর-রাহিব ইন আবূ শামার যুবায়দীর নিকট উপস্থিত হয়। গীর্জা চূড়ায় অবস্থানরত যাজককে লক্ষ্য করিয়া পাদ্রী বলিলেন, তিহামা অঞ্চলে একজন নবী প্রেরিত হইয়াছেন। ইহার পর ঐ পাদ্রী উক্ত যাজককে রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে নাজরানের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি, তাহাদের প্রতি তাঁহার মুবাহালার চ্যালেঞ্জ প্রদান এবং তাহাদের সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অস্বীকৃতির আনুপূর্বিক বর্ণনা দিলেন
এবং বিশর ইবন মু'আবিয়ার মদীনায় গমনপূর্বক ইসলাম গ্রহণের বিষয়ও অবহিত করিলেন। তখন যাজক বলিলেন, তোমরা আমাকে নামাইয়া দাও, অন্যথায় আমি গীর্জার এই উঁচু চূড়া হইতে লাফ দিয়া পড়িব। তাহারা তাহাকে নামাইয়া দিলে যাজক কিছু উপঢৌকন-সম্ভারসহ মদীনায় রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে উপস্থিত হন। বর্ণনাকারী ঐ উপহার সামগ্রীর বর্ণনা দেন এইভাবে:
منها هذا البرد الذى يلبسه الخلفاء وتعب وعصا .
"আজকাল খলীফাগণ যে চাদর পরিধান করেন উহাও ছিল সেই উপঢৌকন-সম্ভারের অন্তর্ভুক্ত। আর ছিল একটি বড় পেয়ালা ও একটি লাঠি"।
কিছুদিন রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে অবস্থান করিয়া তারপর যাজক স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তখনও তাহার ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য হইয়া উঠে নাই। আবার মদীনায় প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়া মদীনা ত্যাগ করিলেও রাসূলুল্লাহ-এর ইনতিকালের পূর্বে তাহার আর মদীনায় ফেরা হয় নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ খ., পৃ. ৫৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খৃস্টীয় ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের প্রয়াস

📄 খৃস্টীয় ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের প্রয়াস


নাজরান প্রতিনিধি দলটি যেহেতু খৃস্টান জাতির প্রতিনিধিত্ব করিতেছিল, তাই ঈসা (আ) আল্লাহ্র পুত্র নহেন- ইসলামের এই বক্তব্য তাহারা সহজে মানিয়া লইতে রাজী হয় নাই। এই সম্পর্কে তাহারা রীতিমত বিতর্ক জুড়িয়া দেয়। তাহারা নবী কারীম-কে প্রশ্ন করে, ঈসা (আ) যদি আল্লাহ্র পুত্রই না হন, তবে তিনি কাহার পুত্র? রাসূলুল্লাহ বলিলেন: এই কথা তো অনবহিত নয় যে, পুত্র পিতারই মত আকৃতিসম্পন্ন হয়। নাজরান প্রতিনিধিদল- না হইবে কেন? অবশ্যই এইরূপই হইয়া থাকে।
ইহার ফল দাঁড়ায় এই যে, ঈসা (আ) যদি আল্লাহ্ পুত্রই হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাঁহারও আল্লাহ্ তা'আলার আকৃতিসম্পন্ন হইতে হয়। অথচ এই কথা সর্বজনবিদিত যে, আল্লাহ্ তা'আলা নিরাকার সত্তা; তাঁহার সদৃশ বা সমকক্ষ কেহ নাই:
রাসূলুল্লাহ বলেন, "তোমরা কি জ্ঞাত নও যে, আমাদের উপাস্য প্রতিপালক حى لا ليس كمثله شيئ ولم يكن له كفوا احد . يموت وان عيسى يأتي عليه الفناء. না? অথচ ঈসা (আ)-এর উপর লয় কার্যকরী হইবে"।
নাজরান প্রতিনিধি দল-যথার্থই বলিয়াছেন। এখানে একটি ব্যাপার লক্ষণীয়: আল্লাহর রাসূল বলিলেন: "ঈসা (আ)-এর লয় কার্যকর হইবে।" ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি এখনও জীবিত, এখনও তাঁহার মৃত্যু হয় নাই। রাসূলুল্লাহ বলেন, তোমরা অবগত রহিয়াছ যে, আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুর রক্ষক ও নিগাহ্বান, সকলের রিযিকদাতা। ঈসা (আ)-ও কি এই সমস্ত গুণের অধিকারী? নাজরান প্রতিনিধিদল বলিল, না, তাহা নহে। রাসূলুল্লাহ বলেন, তোমরা একথাও অবগত রহিয়াছ যে, ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ তা'আলা যেরূপ ইচ্ছা সেইরূপ আকৃতি দান করিয়া মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করিয়াছেন। তোমরা ইহা জান যে, আল্লাহ তাআলা পানাহার করেন না, মলমুত্র ত্যাগেরও তাঁহার প্রয়োজন হয় না।
নাজরান প্রতিনিধি দল: যথার্থই বলিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ : তোমরা সম্যক অবগত আছ যে, হযরত মারয়াম (আ) অন্য দশ মহিলার মত ঈসা (আ)-কে গর্ভে ধারণ করিয়াছেন। তিনি তাঁহাকে এরূপই প্রসব করিয়াছেন যেভাবে অন্য মহিলাগণ সন্তান প্রসব করিয়া থাকেন। অন্য দশ নবজাতকের মত শিশু ঈসার মুখেও খাবার দেওয়া হইয়াছে। তিনি স্বাভাবিক নিয়মে মলমূত্রও ত্যাগ করিতেন। নাজরান প্রতিনিধিদল বলিল, যথার্থ।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তাহা হইলে তিনি কেমন করিয়া ঈশ্বর হইয়া গেলেন? অর্থাৎ মাতৃগর্ভে যাহার অবয়ব সৃষ্টি হইল, মাতার প্রসবের পরই যিনি রীতিমত খাদ্য গ্রহণ করিলেন, যাঁহার মলমূত্র ত্যাগেরও প্রয়োজন হয় এমন একজন মানুষ কী করিয়া আল্লাহ্ হইয়া যাইতে পারেন?
নাজরান প্রতিনিধি দলের নিকট সত্য দিবালোকের মত স্পষ্ট হইয়া উঠিল, কিন্তু তবুও তাহারা উহা মানিয়া লইতে সমর্থ হইল না। আল্লাহ্ তা'আলা এই সম্পর্কেই আয়াত নাযিল করিলেন:
ٱللهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْحَىُّ ٱلْقَيُّومُ نَزَّلَ عَلَيْكَ ٱلْكِتَٰبَ بِٱلْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنزَلَ ٱلتَّوْرَاةَ وَٱلْإِنجِيلَ مِن قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَأَنزَلَ ٱلْفُرْقَانَ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَٱللَّهُ عَزِيزٌ ذُو ٱنتِقَامٍ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَخْفَىٰ عَلَيْهِ شَىْءٌ فِى ٱلْأَرْضِ وَلَا فِى ٱلسَّمَٓاءِ هُوَ ٱلَّذِى يُصَوِّرُكُمْ فِى ٱلْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَآءُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ
“আলিফ লা---ম মী---ম। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই, তিনি চিরঞ্জীব সর্বসত্তার ধারক। তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করিয়াছেন, যাহা উহার পূর্বের কিতাবের সমর্থক আর তিনি নাযিল করিয়াছিলেন তাওরাত ও ইনজীল, ইতোপূর্বে মানবজাতির সৎপথ প্রদর্শনের জন্য, আর তিনি ফুরকান নাযিল করিয়াছেন। যাহারা আল্লাহ্ নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে তাহাদের জন্য কঠোর শাস্তি আছে। আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী, দণ্ডদাতা। আল্লাহ্, নিশ্চয় আসমান ও যমীনে কিছুই তাঁহার নিকট গোপন থাকে না।
"তিনি মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই; তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৩: ১-৬; তাফসীর দুররে মানছুর, ২খ., পৃ. ৩; ইবন জারীর ও ইন্ন আবী হাতিম-এর বরাতে)।
রাসূলুল্লাহ যখন এবম্বিধ বক্তব্য প্রদানের পর তাহাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইলেন তখন তাহারা জবাব দিল, আমরা তো পূর্ব হইতেই মুসলমান। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তোমাদের ইসলাম কীভাবে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হইতে পারে যেখানে তোমরা ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র সাব্যস্ত করিয়া থাক, ক্রুশের পূজা কর, শূকর মাংস ভক্ষণ কর?
নাজরানের প্রতিনিধি দল পাল্টা প্রশ্ন করে, আপনি যে ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র বান্দা বলেন, তাঁহার অনুরূপ অন্য কাহাকেও কি আপনি দেখিয়াছেন? ইহার জবাবে নাযিল হয় أَنَّ مَثَلَ عِيسَى
৩৯২ সীরাত বিশ্বকোষ عِنْدَ اللَّهُ كَمَثَلِ أَدَمَ আয়াত (যাহার পূর্ণ পাঠ ও অনুবাদ ইতোপূর্বেই প্রদত্ত হইয়াছে (সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১২০-৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাজরানবাসীদের উপর যুগপৎভাবে জিযয়া ও সাদাকাত নির্ধারণের তাৎপর্য

📄 নাজরানবাসীদের উপর যুগপৎভাবে জিযয়া ও সাদাকাত নির্ধারণের তাৎপর্য


নাজরান প্রতিনিধি দলকে নিরাপত্তাপত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাহাদের উপর নির্দিষ্ট পরিমাণ জিযিয়া ধার্য করিয়াছিলেন—যাহার বিবরণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পত্রাবলী ও ফরমানসমূহের আলোচনায় বিস্তৃতভাবে আসিয়াছে। সহীহ বুখারীতে সাহাবী হযরত হুযায়ফা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে : جاء العاقب والسيد صاحبا نجران الى رسول الله ﷺ يريدان ان يلاعنه قال فقال احدهما لصاحبه لا تفعل فو الله لئن كان نبيا فلا عناه لا تفلح نحن ولا عقبنا من بعدنا قال انا نعطيك ما سألتنا وابعث معنا رجلا امينا ولا تبعث معنا الا رجلا امينا فقال بعثن معكم رجلا امينا حق امين فاستصرف لما اصحاب رسول الله ﷺ وقال قم یا ابا عبيدة ابن الجراح فلما قام قال هذا أمين هذه الامة.
“নাজরানের দুই নেতা আল-'আকিব ও আস-সায়্যিদ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহিত মুবাহালা করার উদ্দেশ্যে তাঁহার নিকট আসে। সাথীদ্বয়ের একজন অপরজনকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, এই কাজটি করিতে যাইও না। কেননা প্রকৃতই তিনি যদি নবী হইয়া থাকেন আর ইহার পরেও আমরা তাঁহার সহিত মুবাহালায় অবতীর্ণ হই, তাহা হইলে আমরা এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সাফল্য লাভে সমর্থ হইবে না। তাই তাহারা দুইজনে বলিল, আমরা আপনার জিযিয়া প্রদানের দাবি পূরণে সম্মত আছি। আপনি আমাদের সহিত একজন বিশ্বস্ত লোক পাঠাইয়া দিন অবিশ্বস্ত কোন ব্যক্তিকে নহে। জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলিলেন : আমি তোমাদের সহিত অবশ্যই একজন বিশ্বস্ত লোককে প্রেরণ করিব যে আমানতদারীর হক আদায়ে সমর্থ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীগণ তখন পরম উৎসুক্যভরে তাকাইয়া রহিলেন। নবী কারীম ﷺ বলিলেন, উঠ হে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ! তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলে তিনি বলিলেন, এই হইল এই উম্মতের বিশ্বস্ততম ব্যক্তি” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৫৩; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪৩০)।
সহীহ মুসলিমে হযরত মুগীরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। ইউনুস ইন বুকায়র (র) ইবন ইসহাক হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী ইব্‌ন আবূ তালিবকে সাদাকাত ও জিযয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে নাজরানে প্রেরণ করেন।
আবদুর রউফ দানাপুরী বলেন, কোন কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি এই ব্যাপারে প্রশ্ন তুলিয়াছেন যে, তাহা কেমন করিয়া হইতে পারে যে, নাজরানবাসীদের নিকট হইতে যুগপৎভাবে সাদাকা (যাকাত) ও জিয়া উভয়টাই গ্রহণ করা হইবে? সাদাকা বা যাকাত আদায় করা হইয়া থাকে মুসলমানদের নিকট হইতে, আর জিযিয়া লওয়া হয় বিধর্মী যিম্মীদের নিকট হইতে। নাজরানবাসীদের সহিত কৃত চুক্তিতে তাহাদের নিকট হইতে বার্ষিক দুই হাজার জোড়া বস্ত্র লওয়ার কথাই সাব্যস্ত হইয়াছিল। সেখানে আবার যাকাত আদায়ের অবকাশ কোথায়? যাকাত তো বিধর্মীদের নিকট হইতে লওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আর যদি ধরিয়াই লওয়া হয় যে, তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল
৩৯৩ তাই যাকাত আদায় করা হইয়াছিল, তাহা হইলে প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহা হইল তো জিয়া তাহাদের উপর হইতে রহিত হইয়া যাওয়ার কথা। জিযয়া আদায়ের জন্য একাধিক সাহাবীকে প্রেরণের কী অর্থ হইতে পারে?
ইহার জবাব হইর, রাসূলুল্লাহ হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (র)-কে নাজরানে প্রেরণ করিয়াছিলেন বানুল হারিছ ইবন কা'বের নিকট। তখন তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহাদের প্রতিনিধি দলও যথারীতি মদীনায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ -এর সহিত সাক্ষাত করিয়াছিল এবং তিনি হযরত কায়স ইবন হাসানকে তাহাদের আমীর নিযুক্ত করিয়াছিলেন।
আসল কথা হইতেছে, নাজরানে দুই শ্রেণীর লোক বসবাস করিত। তাহাদের একদল ছিল খৃষ্টান —যাহারা জিয়া কবুল করিয়া সন্ধি করিয়া লয়, কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করে নাই। অপর দল ছিল উম্মিয়্যীন, তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়া লয়। তাই একদলের (মুসলমানদের) নিকট হইতে সাদাকা এবং অপর দল খৃস্টানদের নিকট হইতে জিয়া গ্রহণ করা হইত (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৩০-৩২)।/

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00