📄 বনূ উয়াহ্ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১৫. বনু উম্মাহ প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
ইয়ামানের উফ্রা গোত্রের বার সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল নবম হিজরীর সফর মাসে নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিত হয়। তিনি তাহাদেরকে আহলান ও মারহাবা বলিয়া স্বাগতম জানান। তাহারা জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কিসের দিকে আহ্বান জানাইয়া থাকেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেনঃ আমি এক লা-শরীক আল্লাহর ইবাদত এবং আমার রিসালাতের দিকে আহ্বান জানাইয়া থাকি। সমগ্র বিশ্বমানবের জন্য আল্লাহর রাসূলরূপে আমি প্রেরিত হইয়াছি। ইহার সাক্ষ্য তোমাদেরকে দিতে হইবে।
"এই গোত্রের 'লোকজনও রাসূলুল্লাহ-এর পূর্বপুরুষ কুসাই-এর বৈপিত্রেয় ভাইয়ের বংশধররূপে নিজেদের পরিচয় দিয়া তাঁহার নিকটাত্মীয় হিসাবে সহানুভূতি লাভের প্রয়াস পায়। জবাবে তিনি বলেন: আমি তো চিনিতে পারিলাম না, তবুও তোমাদেরকে স্বাগতম। তাহারা বলে, আমরাই কুসাই-এর সহিত মিলিত হইয়া খুয'আ ও বনূ বকর গোত্রকে মক্কাভূমি হইতে বহিষ্কার করিয়াছিলাম। এই দলে ছিলেন হামযা ইবন নু'মান আল-উযরী মালিকের দুই পুত্র সুলায়ম ও সা'দ, মালিক ইব্ন আবী রিবাহ প্রমুখ গোত্রপতি। তাহারা রামলা বিনত হারিছের ঘরে আসিয়া উঠেন, তারপরে রাসূলুল্লাহ-এর সহিত সাক্ষাত করিতে যান। সাক্ষাতকালে তাহারা জাহিলিয়াতের প্রদ্ধতি অনুসারে তাঁহাকে অভিবাদন জানায়। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ ইসলামী পদ্ধতিতে অভিবাদন জানাইতে তোমাদের বাধা কোথায়? জবাবে তাহারা জানায়, নিজেদের প্রথাপদ্ধতি হইতে বিমুখ হইয়াই তাহারা আসিয়াছে। তারপর রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত হইয়া তাহারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং কয়েক দিন মদীনায় বসবাস করিয়া স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করে। প্রত্যাবর্তনের পূর্বে তাহারা জানান যে, তাহারা মনেপ্রাণে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন এবং এখন হইতে সর্বদা তাঁহার সাহায্যকারীরূপেই থাকিবেন। এই সময় তাহারা আরও বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ব্যবসা-ব্যাপদেশে আমরা শামদেশে গিয়া থাকি- যেখানে সম্রাট হিরাক্লিয়াস বসবাস করেন। তাহার ব্যাপারে কি আপনার নিকট কোন ওহী নাযিল হইয়াছে?
জবাবে রাসূলুল্লাহ তাহাদেরকে জানান, শাম মুলুক তথা তদানীন্তন বৃহত্তর সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তীন অচিরেই মুসলমানদের হস্তগত হইবে এবং ঐ খৃস্টান সম্রাট সেখান হইতে পলায়ন করিবে। এই সময় ইসলামের অন্যান্য ফরয-ওয়াজিব সম্পর্কে তাহাদেরকে অবহিত করার সাথে সাথে গণকদের নিকট ভবিষ্যত সম্পর্কে প্রশ্ন করিতে এবং তাহাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাইতে বারণ করেন। তিনি জানান, একমাত্র ঈদুল আযহার কুরবানী ছাড়া আর কোনরূপ কুরবানী দিতে হইবে না। দেশে ফিরিবার সময় তিনি তাহাদেরকে যথারীতি উপঢৌকনাদি দিয়া বিদায় করেন (যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪৮-৯; আসাহ্হুস্ সিয়ার, ৪৪০-১; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১৩৪-৫; তাবাকাত, ১খ., প্রথমাংশ, পৃ. ৩৩১-৩২)।
📄 সুদা অঞ্চলের প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১৬. সুদা অঞ্চলের প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
অষ্টম হিজরীতে জি'ইররানা হইতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ মুহাজির ইব্ন উমায়্যাকে সান্'আর দিকে, যিয়াদ ইব্ন লাবীদকে হাদরামাওতের দিকে এবং কায়স ইবন সা'দ ইবন উবাদা খাযরাজীকে চারিশত সঙ্গীসহ কানাতের দিকে রওয়ানা করেন। শেষোক্ত কায়স ইন্ন সা'দেকে তিনি সাদা রঙের একটি বড় পতাকা ও কাল রঙের কয়েকটি ছোট ছোট পতাকা দিয়া এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, ইয়ামানের সুদা' এলাকা দিয়া যেন তিনি অবশ্যই অতিক্রম করেন (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৪)।
সুদাবাসী এক ব্যক্তি এই অভিযানকারী দলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করিলে তাহাকে তাহাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়। তখন ঐ ব্যক্তি দৌড়াইয়া রাসূলুল্লাহ-এর নিকট গিয়া হাযির হয় এবং আরয করে:
جئتك وافدا على من درائي فاردد الجيش وانا لك بقومي. "আমি আমার পশ্চাতে থাকা গোত্রের প্রতিনিধিরূপে আপনার খিদমতে উপস্থিত হইয়াছি। সুতরাং আপনি আপনার বাহিনীকে ফিরাইয়া আনুন। আমি আমার সম্প্রদায়ের যিম্মাদার রহিলাম। তাহাদেরকে লইয়া আমি আপনার খেদমতে উপস্থিত হইব"।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) ঐ বাহিনীকে ফিরাইয়া লইয়া আসেন। অতঃপর ঐ গোত্রের পনেরজন লোকসহ ঐ ব্যক্তি মদীনায় আসিয়া উপস্থিত হন। তাহারা হযরত সা'দ ইবন 'উবাদার এখানেই আসিয়া উঠেন। তারপর রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে হাযির হইয়া সকলে একযোগে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যখন তাহারা স্ব-সম্প্রদায়ে র কাছে ফিরিয়া গেলেন তখন সেখানে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং বিদায় হজ্জের সময় তাহাদের মধ্যকার এক শত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-এর সহিত শামিল হইয়াছিলেন।
সামরিক বাহিনীকে ফিরাইয়া লওয়ার জন্য অনুরোধকারী এবং পরবর্তীতে সুদা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বকারী উক্ত ব্যক্তিটি ছিলেন যিয়াদ ইবন হারিছ আস-সুদাঈ। প্রতিনিধি দলসহ তাঁহার নবী দরবারে উপস্থিতির সময় রাসূলুল্লাহ তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন:
يا اخا صداء انك مطاع في قومك.
"হে সুদাঈ ভাইটি! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের খুবই বরেণ্য ব্যক্তি।" ৩৮১ জবাবে তিনি বলেন, بلى من الله ورسوله, "ইহা আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের অনুগ্রহ"। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহার সম্মতি লইয়া তাহাকে তাহার গোত্রের আমীর নিযুক্ত করিয়া একখানি নিযুক্তি পত্র দান করেন। এই সময় তাহার আবেদনক্রমে তিনি তাহাকে তাহার কওমের যাকাতের একাংশ বরাদ্দের বরাদ্দপত্রও লিখিয়া দেন। সুদাঈর বর্ণনামতে, এই সমস্ত ঘটনা একটি সফরের মধ্যবর্তী মনবিলে ঘটিয়াছিল।
তিনি আরও বলেন, আমি ছিলাম একজন শক্ত সুঠাম পুরুষ। তাই অন্যান্যরা সফরকালে রাসূলুল্লাহ হইতে দূরে দূরে ছিটকাইয়া পড়িলেও আমি সর্বক্ষণ তাঁহার সাথে সাথে থাকিতাম। একবার সফরে পথ চলিতে চলিতে ভোর হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ তাহাকে আযান দিতে নির্দেশ দিলেন। আমি উটের উপর হইতেই আযান দিলাম। তারপর আবার পথ চলিতে লাগিলাম। এক স্থানে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ বাহন হইতে অবতরণ করিয়া প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলেন। তারপর ফিরিয়া আসিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন? তোমার নিকট পানি আছে কি? আমি বলিলাম, অল্প একটু পানি আছে। বলিলেন: লও দেখি। আমার নিকটে যাহা একটু পানি ছিল তাহার সবটুকুই তাঁহার পাত্রে ঢালিয়া দিলাম। ততক্ষণে অন্য সাথীরাও আসিয়া পৌঁছিয়া গেলেন। তিনি তাঁহার পবিত্র হস্ত সেই পানির উপর রাখিতেই, আমি লক্ষ্য করিলাম, তাঁহার পবিত্র আঙ্গুলগুলির ফাঁক দিয়া ঝর্ণাধারার মত অঝোর ধারায় পানি নির্গত হইতেছে। তিনি উযূ করিলেন এবং আমাকে বলিলেন, সকলকে ডাক এবং যাহাদের উযুর প্রয়োজন তাহারা যেন উযূ সারিয়া লয়। দেখিতে দেখিতে সকলেরই উযূ সম্পন্ন হইল, ইহার পর বিলাল আসিয়া ইকামত দিতে উদ্যত হইলেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন:
ان اخا صداء قد اذن ومن اذن فهو يقيم. "সুদাঈ ভাইটি আযান দিয়াছে। আর যে আযান দিয়াছে সেই ইকামত দিবে"। অতএব আমি ইকামত দিলাম আর রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে লইয়া জামা'আতে সালাত আদায় করিলেন।
ইহার পর তিনি একটি মনযিলে অবতরণ করিলে লোকজন তাহাদের উপর নিযুক্ত রাসূলুল্লাহ এর প্রশাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করিল যে, জাহিলিয়াতের যুগের তাঁহার ও আমাদের মধ্যকার একটি বিরোধের জের হিসাবে তিনি আমাদেরকে উৎপীড়ন করিতেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহার সাহাবীগণের দিকে তাকাইয়া বলিলেন: আমার তাহাদের মধ্যে বর্তমান থাকা অবস্থায়ই? তারপর তিনি বলিলেন:
لا خير في الامارة لرجل مؤمن... "মু'মিন ব্যক্তির জন্য আমীর হওয়ার মধ্যে কল্যাণ নাই।" তখন ঐ কথাটি আমি আমার মনে গাঁথিয়া লই। ইহার পর এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার নিকট যাজ্ঞা করিলে তিনি বলিলেন:
من سئل الناس عن ظهر غنى فصداع في الرأس وداء في البطن. "যে ব্যক্তি প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও যাজ্ঞা করে তাহা তাহার জন্য মাথা ব্যথা ও পেটের পীড়া স্বরূপ"।
তখন সেই ব্যক্তি বলিল, সাদাকাত বা যাকাত হইতেই কিছু দান করুন। জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেনঃ
ان الله لم يرض في الصدقات يحكم نبى ولا غيره حتى حكم فيها فجزاها ثمانية أجزاء فان كنت من تلك الأجزاء اعطيتك.
"আল্লাহ তা'আলা যাকাতের ব্যাপারে তাঁহার নবী বা অন্য কেহ বিধান প্রদান করুক উহা পসন্দ করেন না। তিনি নিজে উহা আটটি খাতে বিভক্ত করিয়াছেন, তুমি যদি ঐ খাতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হও তাহা হইলে আমি তোমাকে উহা প্রদান করিব।"
সুদাঈ বলেন, এই কথাটিও আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করিল। কারণ আমি সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার নিকট সম্পদ প্রার্থনা করিয়াছিলাম। সুদাঈ, বলেন, অতঃপর নামাযান্তে আমি আমাকে প্রদত্ত রাসূলুল্লাহ-এর উপর্যুক্ত পত্র দুইখানি লইয়া আসিয়া আরয করিলাম, এই দুইটি ব্যাপারে আমাকে ক্ষমা করুন ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বলিলেন, কেন, তোমার আবার কী হইল? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে বলিতে শুনিয়াছি, মু'মিন ব্যক্তির জন্য আমীর হওয়ার মধ্যে মঙ্গল নাই। আর আমি আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করি। আমি আপনাকে যাজ্ঞাকারীর উদ্দেশ্যে বলিতে শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি অর্থবিত্ত থাকা সত্ত্বেও লোকের নিকট যাজ্ঞা করে উহা তাহার জন্য মাথাব্যথা ও পেটের পীড়াস্বরূপ। আর আমি বিত্তশালী হওয়া সত্ত্বেও আপনার নিকট যাঞ্চা করিয়াছি। তিনি বলিলেনঃ ব্যাপার এইরূপই। এখন তুমি ইচ্ছা করিলে গ্রহণ করিতে পার, ইচ্ছা করিলে ত্যাগও করিতে পার। আমি বলিলাম, আমি ত্যাগ করিতেছি।
তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: তাহা হইলে তুমি আমাকে এমন কোন লোকের সন্ধান দাও যাহাকে আমি তোমাদের আমীর মনোনীত করিতে পারি। আমি তাঁহাকে আগত প্রতিনিধি দলের একজনের কথা বলিলে তিনি তাহাকেই আমীর মনোনীত করিলেন। আমরা তাঁহাকে বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমাদের একটি কূপ রহিয়াছে। শীতকালে আমরা উহাতে পর্যাপ্ত পানি পাই, ফলে আমরা সংঘবদ্ধভাবে থাকিতে পারি। কিন্তু গ্রীষ্মকালে উহার পানি হ্রাস পায়, ফলে আমাদের লোকজনকে চতুর্দিকে পানির সন্ধানে ছুটিয়া যাইতে হয়। আমরা তখন বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ি। ইসলাম গ্রহণের ফলে আমরা চতুর্দিক হইতে শত্রু পরিবেষ্টিত। আমাদের কূপটির জন্য আপনি দু'আ করুন যেন উহার পানিতেই আমাদের প্রয়োজন সংকুলান হইতে পারে এবং আমাদেরকে আর বিক্ষিপ্ত হইতে না হয়। তিনি আমাদেরকে সাতটি কঙ্কর লইয়া আসিতে বলেন। আমরা উহা আনিয়া দিলে তিনি ঐগুলি হাতে লইয়া ঘর্ষণ করিলেন এবং তাহাতে দু'আ পড়িয়া দিলেন। ইহার পর আমাদেরকে বলিলেন, কঙ্করগুলি লইয়া যাও। কূপের নিকট পৌছিয়া আল্লাহর নাম লইয়া একটি একটি করিয়া উহাতে নিক্ষেপ করিবে। আমরা সেইমতে কাজ করি আর এমনই সুফল লাভ করি যে, পানির প্রাচুর্যের দরুন কখনও আর উহার তলদেশ আমরা দেখিতে পাই নাই। সুনান আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবন মাজায় এই হাদীছের সমর্থক রিওয়ায়াত রহিয়াছে। ওয়াকিদীও এই প্রতিনিধি দলের আগমনের এই বিবরণ উদ্ধৃত করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ খ., পৃ. ৮৩-৪)।
৩৮৩ সুদা প্রতিনিধি দলের আগমনের ঘটনা এবং যিয়াদ ইবন হারিছ (রা)-এর 'উক্ত বর্ণনা হইতে বিশ্ববাসী যে অনেকগুলি শিক্ষালাভ করিয়াছে, মওলানা আবদুর রউফ দানাপুরী সেই সম্পর্কে বলেন:
উক্ত কাহিনী হইতে আমরা যে কতকগুলি মাসআলা জানিতে পারিলাম তাহা হইল: ১. বাহনের উপর হইতে আযান দেওয়া জায়েয। সুদাঈ সেইভাবেই আযান দিয়াছিলেন। ২. সেনাবাহিনীর পথ পরিক্রমাকালে এক স্থানে আযান দিয়া পথ পরিক্রমা অব্যাহত রাখিয়া অন্যত্র পৌঁছিয়া নামায আদায় করা বৈধ। ৩. আযান যে দিবে ইকামত তাহারই দেওয়া সুন্নাত। তাই রাসূলুল্লাহ বিলাল (রা)-কে ইকামত দিতে বারণ করেন এবং যে সুদাঈ আযান দিলেন তাহাকেই ইকামত দিতে বলেন এবং সাথে সাথে স্পষ্ট করিয়া দেন যে, আযান যে দেয়, ইকামতও সেই দিবে (অবশ্য ইহার অন্যথাও জায়েয আছে বলিয়া মুসনাদে আহমাদের এই মর্মে একটি রিওয়ায়াত হইতে জানা যায়, যাহাতে ইকামতের কথা বলা হইয়াছে, যাহাতে বিলাল আযান দিলেও আবদুল্লাহ ইব্ন যায়দ (রা) আগ্রহ প্রকাশ করায় নবী কারীম তাহাকে সেই অনুমতি দিয়াছিলেন)।
৪. কেহ আমীর হওয়ার জন্য আবেদন জানাইলে তাহাকে আমীর নিযুক্ত করা জায়েয। কেননা যায়দ ইব্ন হারিছ আস-সুদাঈ আমীর নিযুক্ত হওয়ার জন্য আগ্রহ ব্যক্ত করিলে তিনি তাঁহাকে মনোনীত করিয়াছিলেন। ইহা ঐ হাদীছের পরিপন্থী নহে যাহাতে রাসূলুল্লাহ বলিয়াছেন: "আমি ঐ ব্যক্তিকে আমীর নিযুক্ত করি না যে নিজে উহার আকাঙ্ক্ষী হয়। ইহার অর্থ হইল, যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির বশে আমীর নিযুক্ত হইতে চায় তাহাকে আমীর নিযুক্ত করা যায় না। কিন্তু জনসেবার উদ্দেশ্যে কেহ সেইরূপ আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করিলে নিশ্চয়ই তাহাকে নিযুক্ত করা যায়। এই ব্যাপারে নেতৃত্বপ্রার্থীদের কাহার কি মনোভাব ইমাম অবশ্যই তাহা অনুধাবন করিতে পারিবেন।
৫. জালিম প্রশাসকের বিরুদ্ধে ইমামের নিকট অভিযোগ উত্থাপন করা জায়েয। এই ঘটনায় এক ব্যক্তি এইরূপ করায় নবী কারীম তাহাকে বারণ করেন নাই বা এইজন্য তাহার প্রতি কোনরূপ অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করেন নাই।
৬. একজন মু'মিনের জন্য আমীর বা আমিল (প্রশাসক) নিযুক্তির সুযোগ গ্রহণ করার চেয়ে বর্জন করাই উত্তম। সুদাঈ তাহাই করিয়াছিলেন।
* ৭. সাদাকা বা যাকাত কাহাকেও প্রদানের পূর্বে গ্রহীতা যাকাত লাভের উপযুক্ত কিনা তাহা জানিয়া লওয়া উচিত। এইজন্যই রাসূলুল্লাহ আবেদনকারী ঐ পর্যায়ে পড়ে কিনা জানিতে চাহিয়াছিলেন।
৮. উক্ত কাহিনীতে একটি মু'জিযার উল্লেখ রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ-এর পবিত্র হস্তের আঙ্গুলসমূহের ফাঁক দিয়া অঝোর ধারায় পানি প্রবাহিত হইয়াছিল সামান্য একটু পানি হইতে। উহা দ্বারা গোটা বাহিনীর লোকজন উযূ সম্পন্ন করিয়াছিলেন। এই মু'জিযা রাসূলুল্লাহ-এর হাতে বহুবার প্রকাশিত হইয়াছে। অনেক স্থানে অনেক সাহাবীই তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। কিন্তু প্রত্যেক বারই পূর্ব হইতেই অল্প পানি বিদ্যমান ছিল, রাসূলুল্লাহ-এর পবিত্র হস্তের বরকতে উহা হইতে প্রচুর পানি উৎসারিত হইয়াছে। কখনও এমন হয় নাই যে, আদৌ পানির
অস্তিত্ব ছিল না, শুকনা পাত্র হাতে লইয়া উহা হইতে তিনি পানি প্রবাহিত করিয়াছেন (আসাহহুস্- সিয়ার, পৃ. ৪৪৭-৮)।
📄 নাজরানের খৃস্টান প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১৭. নাজরানের খৃস্টান প্রতিনিধিদলের নবী-এর দরবারে আগমন
নাজরান হইতেছে মক্কা মুআজ্জামা হইতে ইয়ামানের পথে সাত মনযিল দূরে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ খৃস্টান অধ্যুষিত জেলা। সেখানে একটি বিশাল গীর্জা ছিল। উহাকে তাহারা কা'বা শরীফ তুল্য সম্মানিত এবং হারাম শারীফের মত মর্যাদাপূর্ণ স্থান বলিয়া বিবেচনা করিত। সেখানকার ধর্মযাজকগণকে 'সায়্যিদ' ও 'আকিব' উপাধিতে অভিহিত করা হইত। গোটা আরবে উহার সমমর্যাদার আর একটিও ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল না। তাহাদের উক্ত কা'বাটি তিন শত চর্ম দ্বারা গম্বুজাকৃতিতে নির্মিত ছিল। যে কোন ব্যক্তি উহার গণ্ডির মধ্যে প্রবেশ করিলে নিরাপদ বিবেচিত হইত। তাহাদের উক্ত গীর্জার বার্ষিক আয় ছিল দুই লক্ষ মুদ্রা (আল্লামা শিবলী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৪৮; মু'জামুল বুলদান ও ফাতহুল কাবীর, নাজরান প্রতিনিধি দল প্রসঙ্গের বরাতে)।
শারহে মাওয়াহিবুল্লাদুন্নিয়া (৪খ., পৃ. ৪১)-এর বরাতে আল্লামা ইদরীস কান্ধহলভী লিখেন, ৭৩টি কসবার সমষ্টি এই নাজরান। সর্বপ্রথম নাজরান ইব্ন যায়দ ইব্ন ইয়াশজুব ইবন ইয়া'রুব ইব্ন কাহতান এখানে আসিয়া বসবাস শুরু করেন। তাহারই নামে উহার এইরূপ নামকরণ করা হয়। আল-কুরআনের সূরা বুরূজে বর্ণিত আসহাবুল উখদূদের ঘটনা এই নাজরানেরই কোন একটি কসবায় সংঘটিত হইয়াছিল (সীরাতুল মুসতাফা, ৩খ., পৃ. ১২০, দারুল কিতাব দেওবন্দ, তা. বি.)।
নাজরানের খৃস্টান অধিবাসীদের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। তাহাদের প্রতিনিধি দলের আগমন সংক্রান্ত হাদীছসমূহ পর্যালোচনা করিলে বুঝা যায়, নবী দরবারে দুইবার তাহাদের আগমন ঘটিয়াছিল (শায়খুল হাদীছ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা : সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮৬৯)।
প্রথমবারের প্রতিনিধি দল সম্পর্কে ইউনুস ইব্ন বুকায়র বলেন, রাসূলুল্লাহ নাজরানবাসী খৃস্টানদেরকে একখানি পত্র লিখিয়া ইসলামের প্রতি আহ্বান জানান। গীর্জার প্রধান পাদ্রী (Lord Bishop) পত্রখানা পাঠ করিয়া ভয়ে কাঁপিতে লাগিলেন। তিনি তৎক্ষণাত শুরাহবীল হামাদানীকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। কারণ তাহার পরামর্শ না লইয়া এইখানকার কর্মকর্তাগণ কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেন না। শুরাহবীল উক্ত পত্রখানা পাঠ করিয়া নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন। বিশপের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলিলেন, জনাব! আপনি সম্যক অবগত আছেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালামকে হযরত ইসমাঈল বংশে নবী প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দিয়া রাখিয়াছেন। সম্ভবত ইনিই সেই নবী। নবী সম্বন্ধ যুক্তিতর্ক চলে না। কাজেই এই সম্পর্কে আমি কোন মত প্রকাশ করিতে পারিব না।
তৎপর লর্ড বিশপ আবদুল্লাহ ইবন শুরাহবীলকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। পত্র পাঠান্তে তিনিও শুরাহবীলের উত্তরের পুনরাবৃত্তি করিলেন। তারপর তিনি জাব্বার ইব্ন ফায়য়কে ডাকিয়া পাঠাইলেন। পত্র পাঠান্তে তিনিও পূর্ব বর্ণিত মনীষীদ্বয়ের ন্যায় উত্তর করিলেন। যাঁহাদের বুদ্ধিমত্তার উপর বিশপের পূর্ণ নির্ভর ছিল তাহাদের কোন মতামত না পাওয়ায় গীর্জা প্রধান গীর্জার ঘণ্টা
পিটাইতে এবং গীর্জার উপর চট লটকাইতে আদেশ দিলেন। কোন গুরুত্বপূর্ণ আকস্মিক প্রয়োজনে সর্বসাধারণকে আহ্বান করিতে তাহারা এই সঙ্কেতই ব্যবহার করিতেন। কিন্তু রাত্রিকালে চট লটকাইবার পরিবর্তে উচ্চস্থানে অগ্নি প্রজ্জ্বলনের নিয়ম ছিল।
গীর্জায় ঘন্টাধ্বনির শব্দ শুনিয়া নাজরানের খৃস্টানগণ আসিয়া সমবেত হইল। বিশপ তাহাদেরকে মহানবী-এর নিকট হইতে আগত পত্র সশব্দে পাঠ করিয়া শুনাইয়া তাহাদের মতামত জানিতে চাহিলেন। দীর্ঘ পরামর্শের পর তাহারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন যে, শুরাহবীল, আবদুল্লাহ্ ইব্ন শুরাবীল ও জাব্বার ইব্ন ফায়য এই তিনজনের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় প্রেরণ করিতে হইবে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬৯-৭০)। সেই মতে নবম হিজরীতে নাজরানের ষাটজন অশ্বারোহী গোত্র প্রতিনিধি মদীনায় নবী-এর দরবারে প্রথমবারের মত আগমন করিল। তন্মধ্যে ২৪ জন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এবং তিনজন অতি শক্তিমান প্রধান ব্যক্তি ছিলেন যাহাদের উপর গোটা এলাকার শাসনভার অর্পিত ছিল। তাহাদের একজন ছিলেন আকিব— যাহার আসল নাম ছিল আবদুল মাসীহ। তিনিই ছিলেন নাজরানের প্রধান নেতা—যাহার কথা সকলেই মান্য করিত।
তাহাদের দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন আয়হাম—দল বিন্যাস ও সওয়ারীর ব্যবস্থাপনা যাহার হাতে ন্যস্ত ছিল। আর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন তাহাদের পাদ্রী বা ধর্মগুরু আবূ হারিছ ইবন আলকামা। ইনি ছিলেন বকর ইব্ন ওয়াইল গোত্রের লোক। তিনি খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। খৃষ্ট ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে তাঁহার পারদর্শিতা ও ব্যুৎপত্তি লক্ষ্যে খৃস্টানগণ তাঁহাকে খুবই সম্মান করিত। তাহারা তাঁহার জন্য একটি গীর্জাও বানাইয়া দেয় (বিদায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৫১-৫২)।
ইবন ইসহাক বলেন, ৬০ সদস্যবিশিষ্ট নাজরান প্রতিনিধি দলের মধ্যে যে চৌদ্দজন বিশেষভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী ছিলেন তাহারা হইলেন :
১. আল-আকিব—যাহার আসল নাম ছিল আবদুল মাসীহ্, (২) আস্-সাইয়্যদ— যাহার আসল নাম ছিল আল-আতাহাম (মতান্তরে আল-আবহাম), (৩) আবূ হারিছা ইব্ন আলকামা, (৪) আওস ইব্ন হারিছ, (৫) যায়দ, (৬) কায়স, (৭) ইয়াযীদ, (৮) নাবীহ্, (৯) খুওয়ায়লিদ, (১০) 'আমর, (১১) খালিদ, (১২) আবদুল্লাহ্, (১৩) আবদুল্লাহ ও (১৪) ইয়াহ্হ্রাস। ঐ চৌদ্দজনের মধ্যেও প্রথমোক্ত তিনজন ছিলেন বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। বর্ণনান্তরে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সংখ্যা চৌদ্দজনের স্থলে চব্বিশজন রহিয়াছে।
প্রতিনিধি দলটি যখন মদীনায় গমন করিতেছিল তখন একটি খচ্চরের পিঠে পাদ্রী আল-হারিছ ইব্ন আলকামা ও অন্যটিতে তদীয় ভ্রাতা কুরয ইবন আলকামা পাশাপাশি পথ চলিতেছিলেন। আবূ হারিছার খচ্চরটি হোঁচট খাইলে তাহার ভাইটি বলিল, ঐ দূরের লোকটি। সে রাসূলুল্লাহ -এর নাম উল্লেখ না করিয়াই তাঁহার কথা বিরুক্তিসূচক শব্দে বুঝাইতেছিল। তখন আবু হারিছা বলিলেন, তুই-ই। কুরয বলিলেন, আমি এইরূপ কেন হইব হে ভাইজান! তখন পাদ্রী হারিছা তাহার ভাইকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! উনিই সেই প্রতীক্ষিত নবী যাঁহার প্রতীক্ষায় আমরা দিন-ক্ষণ গুনিতেছিলাম। কুরয বলিলেন, ব্যাপারটি যখন আপনি জানেনই তাহা হইলে আপনার জন্য তাঁহাকে মানিয়া লইতে বাধা কোথায়? পাদ্রী আবূ হারিছা ইব্ন আলকামা জবাব দিলেন :
মা صنع بنا هؤلاء القوم شرفونا ومولونا وخدمونا وقد ابوا الا خلافه ولو فعلت نزعوا منا كل ما ترى.
"এই লোকগুলি আমাদের জন্য কত কিছুই না করিয়াছে। তাহারা আমাদেরকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, আমাদেরকে ধন-সম্পদ দান করিয়াছে, আমাদের কত সেবাযত্ন করিয়াছে। তাহারা তাঁহার বিরোধিতায় অবিচল অবস্থান গ্রহণ করিয়াছে। এমতাবস্থায় আমি যদি তাহা করিতে যাই তাহা হইলে তাহারা সবকিছুই আমাদের নিকট হইতে কাড়িয়া লইবে।" এই কথাগুলি কুরয তাঁহার অন্তরে গাঁথিয়া রাখেন এবং ইহারই ভিত্তিতে মদীনায় পৌছিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন।
• ইবন ইসহাক বলেন, নাজরান প্রতিনিধি দল আসরের নামাযান্তে নবী-এর দরবারে উপস্থিত হয়। ইহা ছিল তাহাদের প্রার্থনার সময়। তাহারা নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রার্থনার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করিলে সাহাবীগণ তাহাতে বাধা দিতে উদ্যত হন। নবী করীম (স) বলিলেন : دعوهم "তাহাদেরকে তাহাদের অবস্থার উপর ছাড়িয়া দাও"।
তাহারা পূর্বদিকে মুখ করিয়া তাহাদের প্রার্থনা সম্পন্ন করিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৫১; ফাতহুল-বারী, ৮খ., পৃ. ৭০; শারহুল মাওয়াহিব, ৪খ., পৃ. ৪১; আসাহহুস সিয়ার, বাংলা ভাষ্য, পৃ. ৪৬৪)।
প্রতিনিধি দলটি মদীনায় পৌছিয়া তাহাদের সফরের পোশাক ছাড়িয়া আজানুলম্বিত রেশমী জামা ও স্বর্ণের আংটি পরিয়া নবী দরবারে হাযির হয়। তাহারা রাসূলুল্লাহ-কে সালাম দিল, কিন্তু তিনি তাহাদের সালামের কোন জবাব না দিয়া নিরুত্তর রহিলেন। তাহারা দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত দরবারে অবস্থান করা সত্ত্বেও তিনি তাহাদের সহিত একটি কথাও উচ্চারণ করিলেন না। ইহাতে তাহারা অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া পড়ে এবং মদীনায় তাহাদের পূর্ব-পরিচিত হযরত 'উছমান ইব্ন 'আফফান এবং 'আবদুর রহমান ইব্ন আওফের দ্বারস্থ হইয়া অনুযোগ করে যে, আপনাদের নবী আমাদেরকে পত্র দিয়া আনাইয়া এখন একটি শব্দও উচ্চারণ করিতেছেন না। তাঁহারা দুইজন জাহিলিয়াতের যুগে ব্যবসা ব্যাপদেশে নাজরানে যাতায়াত করিতেন। এই পরিচয়ের সুবাদেই তাঁহারা তাঁহাদের দ্বারস্থ হয়। তাঁহারা এই ব্যাপারে হযরত আলী (রা)-এর সহিত পরামর্শ করিলেন। তিনি বলিলেন, উহারা তাহাদের রেশমী পোশাক ও স্বর্ণের আংটি খুলিয়া রাখিয়া সফরের সাধারণ পোশাকে রাসূলুল্লাহ-এর সহিত সাক্ষাত করুক। তাহারা যখন সেই মতে নবী দরবারে পৌছিয়া সালাম দিল তখন তিনি ঠিকই তাহাদের সালামের জবাব দিলেন এবং যথারীতি তাহাদের সহিত কথাবার্তা বলিলেন। ঐ সময় তিনি বলেন, প্রথমবার শয়তান তাহাদের সঙ্গে আসিয়াছিল।
والذي بعثني بالحق لقد اتونى المرة الأولى وان ابليس لمعهم.
তাহারা রাসূলুল্লাহ-কে অনেক প্রশ্ন করেন। কথা প্রসঙ্গে তাহারা বলেন : ما تقول في عيسى فانا نرجع الى قومنا ونحن نصارى ليسرنا ان كنت نبيا ان نسمع ما تقول فيه.
৩৮৭ "ঈসা (আ) সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? আমরা তো আমাদের স্বজাতির নিকট ফিরিয়া যাইব। আর আমরা খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। আপনি যদি নবী হইয়া থাকেন তবে তাহার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য শ্রবণ আমাদেরকে আনন্দ দান করিবে।"
তিনি জবাব দিলেন: ما عندى فيه شيئ يومى هذا فاقيموا حتى اخبركم بما يقول الله في عيسى.
"আজ আমার নিকট তাঁহার সংক্রান্ত কোন সংবাদ নাই। আমার এখানে অবস্থান কর, যাবৎ না আমি তোমাদেরকে এই ব্যাপারে আল্লাহ্ বক্তব্য অবহিত করি।" পরদিন ভোরে তাহারা যখন আগমন করিল তখন তিনি তাঁহার নিকট ওহীপ্রাপ্ত আয়াতসমূহ তাহাদেরকে শুনাইয়াছিলেন: إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تَرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُوْنُ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِيْنَ. فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَائِنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ.
"আল্লাহ্র নিকট নিশ্চয় ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, 'হও', ফলে সে হইয়া গেল। সত্য তো তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে; সুতরাং তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হইও না। তোমার নিকট জ্ঞান আসিবার পর যে কেহ এই বিষয়ে তোমার সহিত তর্ক করে, তাহাকে বল, আইস, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারিগণকে ও তোমাদের নারিগণকে, আমাদের নিজদিগকে ও তোমাদের নিজদিগকে, অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দেই আল্লাহ্র লা'নত" (৩ঃ ৫৯-৬১)।
কিন্তু তাহারা তাহাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিল। রাসূলুল্লাহ্ ইহার পরের দিন ভোরেই হাসান ও হুসায়নকে একটি কম্বলে জড়াইয়া লইয়া বাহির হইয়া আসিলেন এবং ফাতিমা তখন তাঁহার পশ্চাতে পশ্চাতে মুবাহালা ও উভয় দলে পরস্পরে লানত প্রদানের উদ্দেশ্যে হাঁটিয়া চলিতেছিলেন। তখন তাঁহার কয়েকজন সহধর্মিনী ছিলেন। শুরাবীল তখন তাঁহার সঙ্গীদ্বয়কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: قد علمتما ان الوادى اذ اجتمع أعلاه واسفله لم يردوا ولم يصدروا الا عن رأى واني والله أرى امرا ثقيلا والله لئن كان هذا الرجل ملكا متوقويا فكنا أول العرب طعن في عيبته ورد عليه امره لا يذهب لنا من صدره ولا من صدور اصحابه حتى يصيبنا بجائحة وانا ادنى العرب منهم جوارا ولئن كان هذا الرجل نبيا مرسلا فلاعنناه لا يبقى على وجه الارض منا شعر ولا ظفر الا هلك.
৩৮৮ "হে আমার সঙ্গীদ্বয়! তোমরা সম্যক অবগত আছ যে, উপত্যকার চড়াই-উৎরাইয়ের সকল জনতা একত্র হইলেও তাহারা আমার মতের বাহিরে টু শব্দটি করে না। আল্লাহ্র কসম! আমি একটি কঠিন সঙ্কট দেখিতে পাইতেছি। আল্লাহ্র কসম! এই লোকটি যদি একজন শক্তিশালী সম্রাট হইয়া যান তাহা হইলে আমরাই হইব তাঁহার বিরাগের প্রথম শিকার। তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করার মর্মবেদনা তাঁহার বা তাঁহার সঙ্গীদের অন্তর হইতে তিরোহিত হইবে না। ফলে আমরা চরম বিপর্যয়ের মুখে পতিত হইব। অথচ আমরাই তাঁহার নিকটতম আরব প্রতিবেশী। আর যদি এই ব্যক্তি নবী হইয়া থাকেন আর আমরা তাঁহাকে অভিসম্পাত প্রদান করি, তাহা হইলে এই পৃথিবীর বুকে আমাদের চুল, নখ কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না অর্থাৎ আমরা সমূলে ধ্বংস হইয়া যাইব।"
সঙ্গীদ্বয় উহাতে বিচলিত হইয়া বলিল, আবূ মারয়াম! তাহা হইলে তুমি আমাদের কী করা উচিত মনে কর? তিনি জবাব দিলেন:
رأى ان احكمه فانى ارى رجلا لا يحكم شططا ابدا .
"আমার সুচিন্তিত অভিমত হইল, ফয়সালার ভার আমরা তাঁহার উপরই ছাড়িয়া দেই। কেননা আমার মনে হয়, তিনি কস্মিনকালেও অন্যায় অসমীচীন কোন সিদ্ধান্ত দিবেন না।"
ইহার পর তাহারা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট উপস্থিত হন। শুরাহবীল তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, আপনার সহিত মুবাহালার চেয়ে উত্তম প্রস্তাব আমার নিকট রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ তাহা কি জিজ্ঞাসা করিলে শুরাহবীল বলিলেন, আজ সকাল হইতে সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যা হইতে আগামী সকাল পর্যন্ত ভাবিয়া-চিন্তিয়া যে সুচিন্তিত ফয়সালা আপনি দান করিবেন, উহাই আমরা শিরোধার্য করিয়া লইব।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন: তোমার পিছনে এমন কোন ব্যক্তিও তো থাকিতে পারে যে, এইরূপ সিদ্ধান্তের জন্য তোমাকে দোষারোপ করিতে এবং উহা অগ্রাহ্য করিতে পারে। শুরাহবীল বলিলেন, আমার সঙ্গীদ্বয়কে এই ব্যাপারে আপনি জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিতে পারেন। তাহারা দুইজনে বলিলেন, গোটা নাজরান তল্লাটে এমন কোন ব্যক্তি নাই যে, শুরাহবীলের কথার উপর কথা বলিতে পারে।
অগত্যা রাসূলুল্লাহ মুবাহালা না করিয়াই ঘরে ফিরিলেন। পরদিন তিনি তাঁহার সুচিন্তিত ফয়সালা পত্রাকারে তাহাদের হাতে তুলিয়া দিলেন যাহার বিবরণ রাসূলুল্লাহ -এর পত্রাবলী অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে দেওয়া না। রাসূলুল্লাহ -এর ফয়সালারূপী উক্ত পত্রখানা লইয়া তাহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। উহাতে তাহাদের উপর নির্দিষ্ট কর ধার্য করিয়া তাহাদের জান-মাল-ধর্মের হিফাযতের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৪৯-৫; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪২-২৮)।
📄 দুইজন নওমুসলিমের আলোচনামূলক কথাবার্তা
অধিকাংশ গোত্রীয় প্রতিনিধিদল মুসলমান হইয়া রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছে বা তাঁহার দরবারে পৌঁছিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে। নাজরান প্রতিনিধি দলটি খৃস্টান পরিচয়েই আসিয়াছিল এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাহারা ইসলাম গ্রহণও করে নাই, কিন্তু ঐ প্রতিনিধি দলের আগমনে অন্তত দুইজন লোকের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ নিশ্চিতভাবে জানা যায়। তাহাদের
একজন ছিলেন পাদ্রী হারিছা ইবন 'আলকামার ভ্রাতা কুরয ইবন 'আলকামা—যাহার কথা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে। অপর ইসলাম গ্রহণকারীও ঘটনাক্রমে নাজরানের সেই বড় পাদ্রীর বৈপিত্রেয় সহোদর এবং চাচাত ভাই। তাঁহার নাম ছিল বিশ্বর ইব্ন মু'আবিয়া।
নাজরান প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ -এর প্রদত্ত অভয়পত্রখানা লইয়া নাজরান অভিমুখে রওয়ানা হইলে সেখানকার বড় পাদ্রী এবং সম্ভ্রান্ত লোকজন এক দিনের পথ অগ্রসর হইয়া তাহাদেরকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করে। রাসূলুল্লাহ -এর পত্রখানা বড় পাদ্রীর হাতে দিলে সকলেই পত্রখানা দেখিতে পাইয়া ধীরে ধীরে আগাইয়া আসিতেছিলেন। বড় পাদ্রী ইহা দেখিতে এতই কৌতূহলী ছিলেন যে, পথ চলিতে চলিতে তিনি পত্রখানা পাঠ করিতেছিলেন। এমন সময় তাহার পাশেই বিশরের উষ্ট্রীটি তাহাকে পিঠ হইতে উপুড় করিয়া ফেলিয়া দিলে সে নবী কারীম -এর পত্রখানাকেই অলুক্ষণে মনে করিয়া তাহার নামে স্পষ্টত ধিক্কার ধ্বনি উচ্চারণ করে। তখন পাদ্রীটির মুখ হইতে সত্য কথাটি বাহির হইয়া পড়ে : قد والله تعست نبیا مرسلا
"আল্লাহর কসম! তুমি একজন প্রেরিত নবীকে ধিক্কার দিলে"! পাদ্রীর এই স্বীকারোক্তি বিশরের জীবনের মোড় ঘুরাইয়া দেয়। তিনি তখন বলিয়া উঠিলেন : لا جرم والله لا احل عنها عقدا حتى أتى رسول الله ﷺ.
"আল্লাহর কসম! তাহা হইলে আমি রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে উপনীত হওয়ার পূর্বে উষ্ট্রীটির গদির লাগামের একটি গিটও খুলিতেছি না।"
আর অমনি তিনি উষ্ট্রীর মুখ মদীনার দিকে ফিরাইয়া দিলেন। পাদ্রীটি তখন মরিয়া হইয়া তাহার পিছনে পিছনে নিজের উষ্ট্রীটিকেও ছুটাইলেন এবং তাহাকে ফিরাইয়া আনিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিলেন। কিন্তু সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হইল। কিছুতেই আর কিছু হইল না। বিশর তাহার উষ্ট্রীটিকে আঘাত করিতে করিতে আপন মনে গাহিয়া চলিলেন : اليك تغدوا قدما وضيتها معترضا في بطنها جنينها مخالفا دين النصارى دينها "তোমার পানেতে এগিয়ে চলেছে উস্ত্রী বাহন, চলার গতিতে কাঁপিতেছে তাহার হাওদা বাঁধন। গর্ভস্থিত বৎসটিও আর নাসারা নয়, খৃষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধেই সে বাঙময়"।
রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে পৌঁছিয়া তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একটি যুদ্ধে শহীদ না হওয়া পর্যন্ত জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁহার সহিত অবস্থান করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৪৯-৫০)।