📄 বনূ ফাযারা প্রতিনিধি দলের আগমন
বনূ ফাযারা প্রতিনিধি দলের আগমন
এই গোত্রটি অত্যন্ত দুর্ধর্ষ, শক্তিশালী ও বিদ্রোহী প্রকৃতির ছিল। উয়ায়না ইব্ন হিস্ন (حِصْنٌ) এই গোত্রের লোক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ -এর তাবুক যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর উক্ত গোত্রের চৌদ্দ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল জীর্ণশীর্ণ সওয়ারীতে আরোহণ করিয়া তাঁহার দরবারে আসিয়া উপস্থিত হইলে তিনি তাহাদের দেশের অবস্থা জিজ্ঞাসা করেন (খুরকানী, ৪খ., পৃ. ৫২)। জবাবে তাহারা বলিল: يا رسول الله أسنتت بلادنا وهلكت مواشينا وأجدب جنابنا وغرت عيالنا فادع لنا ربك....
"ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের দেশ উজাড় হইয়া গিয়াছে। আমাদের পশু সম্পদ ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। আমাদের বাগ-বাগিচা বিরান হইয়া গিয়াছে। আমাদের পরিবারবর্গ শুকাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছে। সুতরাং আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের দরবারে দু'আ করুন"।
فصعد رسول الله صلى الله عليه وسلم المنبر ودعا فقال اللهم اسق بلادك وبهائمك وانشر رحمتك وأحي بلدك الميت اللهم اسقنا غيثا مغيثا مريئا مريعا مطبقا واسعا عاجلا غير آجل نافعا غير ضار اللهم اسقنا سقيا رحمة لا سقيا عذاب ولا هدم ولا غرق ولا محق اللهم اسقنا الغيث وانصرنا على الأعداء.
"অতএব রাসূলুল্লাহ মিম্বারে আরোহণ করিয়া দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! তোমার রহমতের বৃষ্টি, উপাদেয় বৃষ্টি বর্ষণ করিয়া তোমার জনপদকে সিক্ত কর, তোমার বান্দাদেরকে-আমাদেরকে ও পশু পাখীকে তৃপ্ত কর, বাগ-বাগিচাকে শস্যশ্যামল ও ফলবতী কর। আশু বৃষ্টি, অনেক পরে নহে। রহমতের বৃষ্টি— আযাব গযব বা ধ্বংসের প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টি নহে— যাহা ডুবাইয়া ভাসাইয়া লইয়া যায়। হে আল্লাহ্! আমাদের উপর বর্ষণ করুন এবং আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন"!
সীরাতবিদগণ বর্ণনা করেন:
فمطرت فما رأوا السماء ستا فصعد رسول الله ﷺ المنبر فدعا فقال اللهم حو الينا ولا علينا على الآكام والظراب وبطون الأودية.
"তারপর সেই যে মুষল ধারায় বৃষ্টিপাত শুরু হইল আর থামিতে চাহে না। ছয়দিন পর্যন্ত লোকজন আকাশ দেখিতে পাইল না। তখন রাসূলুল্লাহ পুনরায় মিম্বারে আরোহণ করিয়া দু'আ করিলেন: ইয়া আল্লাহ্! আমাদের আশেপাশে চতুর্দিকে বর্ষণ করুন, আমাদের উপর নহে। পাহাড়ে-পর্বতে, বনে-জঙ্গলে, পাথুরে ভূমি ও প্রান্তরে বর্ষণ করুন" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৯৮)।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম বলেন, রাসূলুল্লাহ কখনও দু'আতে হাত উঠাইতেন না, কিন্তু ইসতিসকার দু'আতে তিনি হাত এতই উর্ধ্বে তুলিয়া দু'আ করিলেন যে, তাঁহার বগলের শুভ্রতা স্পষ্ট দেখা যাইতেছিল (মুফতী আযীযুর রহমান অনূদিত গ্রন্থ, ইহার বরাত হইতেছে, ৩খ., পৃ. ৪২৬)।
উক্ত প্রতিনিধি দলটি নবম হিজরীতে আসিয়াছিল এবং ইসলামের স্বীকারোক্তিসহই তাহারা আগমন করিয়াছিল। দলে খারিজা ইন্ন হিসন এবং তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র হারিছ ইব্ন কায়স ইন হিসনও ছিলেন। ইহারা ছিলেন 'উয়ায়না ইবন হিসনের ভ্রাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র- যাহার কথা গাবার যুদ্ধ, খায়বার যুদ্ধ ও হুনায়ন যুদ্ধ প্রসঙ্গে বারবার আসিয়াছে। ইহারা সকলে বিনতুল হারিছের ঘরে আসিয়া উঠিয়াছিলেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৪৭৭-৮)।
উক্ত প্রতিনিধি দলের সদস্য কায়স ইন্ন হিসনের পুত্র হারিছ নামে আসাহহুস সিয়ারে উল্লিখিত হইলেও তাবাকাত-এ ইবন সা'দ তাঁহার নাম হুর ইবন কায়স উল্লেখ করিয়াছেন (তাবাকাত, ফাযারা প্রতিনিধি দল প্রসঙ্গ, ১খ., পৃ. ২৯৭)।
📄 বনূ মুরা প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১৪. বনূ মুররা প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন
ইবন সা'দ (র) ওয়াকিদীর বরাতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম -এর তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পরেই নবম হিজরীতে মুররা গোত্রের তের সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল তাঁহার দরবারে আসিয়া উপস্থিত হয়। হারিছ ইব্ন 'আওফ এই দলে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহাদের প্রত্যেককে দশ উকিয়া হিসাবে রৌপ্য উপঢৌকনস্বরূপ দান করেন। হারিছ ইব্ন আওফকে দান করেন বার উকিয়া। প্রতিনিধি দল তাহাদের এলাকায় খরা ও আকালের অনুযোগ করিলে তিনি তাহাদের জন্য দু'আ করিলেন: اللهم اسقهم الغيث “হে আল্লাহ! উহাদেরকে বৃষ্টিতে সিক্ত করুন"।
অতঃপর তাহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলে দেখিতে পাইলেন, সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হইয়াছে এবং ঐ বৃষ্টিপাত হইয়াছে ঠিক সেই দিন যেদিন আল্লাহ্র রাসূল দু'আ করিয়াছিলেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৮০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৮৯)।
তাবাকাতে সুনির্দিষ্টভাবে হযরত বিলাল (রা)-এর কথা উল্লেখ করিয়া বলা হইয়াছে: وامر بلالا أن يجزهم. "রাসূলুল্লাহ বিলালকে তাহাদেরকে উপঢৌকন দিতে আদেশ করিলেন"।
তখন তিনি তাহাদেরকে উপঢৌকন দিলেন। ঐ বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে আওফ-তনয় হারিছকে তাহাদের নেতারূপে উল্লেখ করিয়া তাহারা যে রাসূলুল্লাহ-এর কৃপা দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস পাইয়াছিলেন উত্তারও উল্লেখ করা হইয়াছে এইভাবে:
رأسهم الحارث بن عون فقالوا يا رسول الله انا قومك وعشيرتك ونحن قوم من بني لؤى بن غالب.
"তাহাদের নেতৃত্বে ছিলেন হারিছ ইব্ন আওফ। তাঁহারা বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনারই স্বজাতি, স্ববংশের লোক। আমরা বনূ লুওয়াই ইব্ন গালিবের বংশধর।"
তখন রাসূলুল্লাহ মুচকি হাসি দেন এবং তাহাদের পরিবারবর্গকে তাহারা কোথায় রাখিয়া আসিয়াছেন, তাহাদের কী অবস্থা ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করেন। তখন তাহারা তাহাদের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করিলে রাসূলুল্লাহ তাঁহাদের জন্য পূর্বোল্লেখিত দু'আ করেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৯৭-৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৮০)।
📄 বনূ উয়াহ্ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১৫. বনু উম্মাহ প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
ইয়ামানের উফ্রা গোত্রের বার সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল নবম হিজরীর সফর মাসে নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিত হয়। তিনি তাহাদেরকে আহলান ও মারহাবা বলিয়া স্বাগতম জানান। তাহারা জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কিসের দিকে আহ্বান জানাইয়া থাকেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেনঃ আমি এক লা-শরীক আল্লাহর ইবাদত এবং আমার রিসালাতের দিকে আহ্বান জানাইয়া থাকি। সমগ্র বিশ্বমানবের জন্য আল্লাহর রাসূলরূপে আমি প্রেরিত হইয়াছি। ইহার সাক্ষ্য তোমাদেরকে দিতে হইবে।
"এই গোত্রের 'লোকজনও রাসূলুল্লাহ-এর পূর্বপুরুষ কুসাই-এর বৈপিত্রেয় ভাইয়ের বংশধররূপে নিজেদের পরিচয় দিয়া তাঁহার নিকটাত্মীয় হিসাবে সহানুভূতি লাভের প্রয়াস পায়। জবাবে তিনি বলেন: আমি তো চিনিতে পারিলাম না, তবুও তোমাদেরকে স্বাগতম। তাহারা বলে, আমরাই কুসাই-এর সহিত মিলিত হইয়া খুয'আ ও বনূ বকর গোত্রকে মক্কাভূমি হইতে বহিষ্কার করিয়াছিলাম। এই দলে ছিলেন হামযা ইবন নু'মান আল-উযরী মালিকের দুই পুত্র সুলায়ম ও সা'দ, মালিক ইব্ন আবী রিবাহ প্রমুখ গোত্রপতি। তাহারা রামলা বিনত হারিছের ঘরে আসিয়া উঠেন, তারপরে রাসূলুল্লাহ-এর সহিত সাক্ষাত করিতে যান। সাক্ষাতকালে তাহারা জাহিলিয়াতের প্রদ্ধতি অনুসারে তাঁহাকে অভিবাদন জানায়। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ ইসলামী পদ্ধতিতে অভিবাদন জানাইতে তোমাদের বাধা কোথায়? জবাবে তাহারা জানায়, নিজেদের প্রথাপদ্ধতি হইতে বিমুখ হইয়াই তাহারা আসিয়াছে। তারপর রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত হইয়া তাহারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং কয়েক দিন মদীনায় বসবাস করিয়া স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করে। প্রত্যাবর্তনের পূর্বে তাহারা জানান যে, তাহারা মনেপ্রাণে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন এবং এখন হইতে সর্বদা তাঁহার সাহায্যকারীরূপেই থাকিবেন। এই সময় তাহারা আরও বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ব্যবসা-ব্যাপদেশে আমরা শামদেশে গিয়া থাকি- যেখানে সম্রাট হিরাক্লিয়াস বসবাস করেন। তাহার ব্যাপারে কি আপনার নিকট কোন ওহী নাযিল হইয়াছে?
জবাবে রাসূলুল্লাহ তাহাদেরকে জানান, শাম মুলুক তথা তদানীন্তন বৃহত্তর সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তীন অচিরেই মুসলমানদের হস্তগত হইবে এবং ঐ খৃস্টান সম্রাট সেখান হইতে পলায়ন করিবে। এই সময় ইসলামের অন্যান্য ফরয-ওয়াজিব সম্পর্কে তাহাদেরকে অবহিত করার সাথে সাথে গণকদের নিকট ভবিষ্যত সম্পর্কে প্রশ্ন করিতে এবং তাহাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাইতে বারণ করেন। তিনি জানান, একমাত্র ঈদুল আযহার কুরবানী ছাড়া আর কোনরূপ কুরবানী দিতে হইবে না। দেশে ফিরিবার সময় তিনি তাহাদেরকে যথারীতি উপঢৌকনাদি দিয়া বিদায় করেন (যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪৮-৯; আসাহ্হুস্ সিয়ার, ৪৪০-১; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১৩৪-৫; তাবাকাত, ১খ., প্রথমাংশ, পৃ. ৩৩১-৩২)।
📄 সুদা অঞ্চলের প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১৬. সুদা অঞ্চলের প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
অষ্টম হিজরীতে জি'ইররানা হইতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ মুহাজির ইব্ন উমায়্যাকে সান্'আর দিকে, যিয়াদ ইব্ন লাবীদকে হাদরামাওতের দিকে এবং কায়স ইবন সা'দ ইবন উবাদা খাযরাজীকে চারিশত সঙ্গীসহ কানাতের দিকে রওয়ানা করেন। শেষোক্ত কায়স ইন্ন সা'দেকে তিনি সাদা রঙের একটি বড় পতাকা ও কাল রঙের কয়েকটি ছোট ছোট পতাকা দিয়া এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, ইয়ামানের সুদা' এলাকা দিয়া যেন তিনি অবশ্যই অতিক্রম করেন (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৪)।
সুদাবাসী এক ব্যক্তি এই অভিযানকারী দলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করিলে তাহাকে তাহাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়। তখন ঐ ব্যক্তি দৌড়াইয়া রাসূলুল্লাহ-এর নিকট গিয়া হাযির হয় এবং আরয করে:
جئتك وافدا على من درائي فاردد الجيش وانا لك بقومي. "আমি আমার পশ্চাতে থাকা গোত্রের প্রতিনিধিরূপে আপনার খিদমতে উপস্থিত হইয়াছি। সুতরাং আপনি আপনার বাহিনীকে ফিরাইয়া আনুন। আমি আমার সম্প্রদায়ের যিম্মাদার রহিলাম। তাহাদেরকে লইয়া আমি আপনার খেদমতে উপস্থিত হইব"।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) ঐ বাহিনীকে ফিরাইয়া লইয়া আসেন। অতঃপর ঐ গোত্রের পনেরজন লোকসহ ঐ ব্যক্তি মদীনায় আসিয়া উপস্থিত হন। তাহারা হযরত সা'দ ইবন 'উবাদার এখানেই আসিয়া উঠেন। তারপর রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে হাযির হইয়া সকলে একযোগে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যখন তাহারা স্ব-সম্প্রদায়ে র কাছে ফিরিয়া গেলেন তখন সেখানে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং বিদায় হজ্জের সময় তাহাদের মধ্যকার এক শত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-এর সহিত শামিল হইয়াছিলেন।
সামরিক বাহিনীকে ফিরাইয়া লওয়ার জন্য অনুরোধকারী এবং পরবর্তীতে সুদা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বকারী উক্ত ব্যক্তিটি ছিলেন যিয়াদ ইবন হারিছ আস-সুদাঈ। প্রতিনিধি দলসহ তাঁহার নবী দরবারে উপস্থিতির সময় রাসূলুল্লাহ তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন:
يا اخا صداء انك مطاع في قومك.
"হে সুদাঈ ভাইটি! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের খুবই বরেণ্য ব্যক্তি।" ৩৮১ জবাবে তিনি বলেন, بلى من الله ورسوله, "ইহা আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের অনুগ্রহ"। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহার সম্মতি লইয়া তাহাকে তাহার গোত্রের আমীর নিযুক্ত করিয়া একখানি নিযুক্তি পত্র দান করেন। এই সময় তাহার আবেদনক্রমে তিনি তাহাকে তাহার কওমের যাকাতের একাংশ বরাদ্দের বরাদ্দপত্রও লিখিয়া দেন। সুদাঈর বর্ণনামতে, এই সমস্ত ঘটনা একটি সফরের মধ্যবর্তী মনবিলে ঘটিয়াছিল।
তিনি আরও বলেন, আমি ছিলাম একজন শক্ত সুঠাম পুরুষ। তাই অন্যান্যরা সফরকালে রাসূলুল্লাহ হইতে দূরে দূরে ছিটকাইয়া পড়িলেও আমি সর্বক্ষণ তাঁহার সাথে সাথে থাকিতাম। একবার সফরে পথ চলিতে চলিতে ভোর হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ তাহাকে আযান দিতে নির্দেশ দিলেন। আমি উটের উপর হইতেই আযান দিলাম। তারপর আবার পথ চলিতে লাগিলাম। এক স্থানে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ বাহন হইতে অবতরণ করিয়া প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলেন। তারপর ফিরিয়া আসিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন? তোমার নিকট পানি আছে কি? আমি বলিলাম, অল্প একটু পানি আছে। বলিলেন: লও দেখি। আমার নিকটে যাহা একটু পানি ছিল তাহার সবটুকুই তাঁহার পাত্রে ঢালিয়া দিলাম। ততক্ষণে অন্য সাথীরাও আসিয়া পৌঁছিয়া গেলেন। তিনি তাঁহার পবিত্র হস্ত সেই পানির উপর রাখিতেই, আমি লক্ষ্য করিলাম, তাঁহার পবিত্র আঙ্গুলগুলির ফাঁক দিয়া ঝর্ণাধারার মত অঝোর ধারায় পানি নির্গত হইতেছে। তিনি উযূ করিলেন এবং আমাকে বলিলেন, সকলকে ডাক এবং যাহাদের উযুর প্রয়োজন তাহারা যেন উযূ সারিয়া লয়। দেখিতে দেখিতে সকলেরই উযূ সম্পন্ন হইল, ইহার পর বিলাল আসিয়া ইকামত দিতে উদ্যত হইলেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন:
ان اخا صداء قد اذن ومن اذن فهو يقيم. "সুদাঈ ভাইটি আযান দিয়াছে। আর যে আযান দিয়াছে সেই ইকামত দিবে"। অতএব আমি ইকামত দিলাম আর রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে লইয়া জামা'আতে সালাত আদায় করিলেন।
ইহার পর তিনি একটি মনযিলে অবতরণ করিলে লোকজন তাহাদের উপর নিযুক্ত রাসূলুল্লাহ এর প্রশাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করিল যে, জাহিলিয়াতের যুগের তাঁহার ও আমাদের মধ্যকার একটি বিরোধের জের হিসাবে তিনি আমাদেরকে উৎপীড়ন করিতেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহার সাহাবীগণের দিকে তাকাইয়া বলিলেন: আমার তাহাদের মধ্যে বর্তমান থাকা অবস্থায়ই? তারপর তিনি বলিলেন:
لا خير في الامارة لرجل مؤمن... "মু'মিন ব্যক্তির জন্য আমীর হওয়ার মধ্যে কল্যাণ নাই।" তখন ঐ কথাটি আমি আমার মনে গাঁথিয়া লই। ইহার পর এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহার নিকট যাজ্ঞা করিলে তিনি বলিলেন:
من سئل الناس عن ظهر غنى فصداع في الرأس وداء في البطن. "যে ব্যক্তি প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও যাজ্ঞা করে তাহা তাহার জন্য মাথা ব্যথা ও পেটের পীড়া স্বরূপ"।
তখন সেই ব্যক্তি বলিল, সাদাকাত বা যাকাত হইতেই কিছু দান করুন। জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেনঃ
ان الله لم يرض في الصدقات يحكم نبى ولا غيره حتى حكم فيها فجزاها ثمانية أجزاء فان كنت من تلك الأجزاء اعطيتك.
"আল্লাহ তা'আলা যাকাতের ব্যাপারে তাঁহার নবী বা অন্য কেহ বিধান প্রদান করুক উহা পসন্দ করেন না। তিনি নিজে উহা আটটি খাতে বিভক্ত করিয়াছেন, তুমি যদি ঐ খাতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হও তাহা হইলে আমি তোমাকে উহা প্রদান করিব।"
সুদাঈ বলেন, এই কথাটিও আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করিল। কারণ আমি সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার নিকট সম্পদ প্রার্থনা করিয়াছিলাম। সুদাঈ, বলেন, অতঃপর নামাযান্তে আমি আমাকে প্রদত্ত রাসূলুল্লাহ-এর উপর্যুক্ত পত্র দুইখানি লইয়া আসিয়া আরয করিলাম, এই দুইটি ব্যাপারে আমাকে ক্ষমা করুন ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বলিলেন, কেন, তোমার আবার কী হইল? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে বলিতে শুনিয়াছি, মু'মিন ব্যক্তির জন্য আমীর হওয়ার মধ্যে মঙ্গল নাই। আর আমি আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করি। আমি আপনাকে যাজ্ঞাকারীর উদ্দেশ্যে বলিতে শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি অর্থবিত্ত থাকা সত্ত্বেও লোকের নিকট যাজ্ঞা করে উহা তাহার জন্য মাথাব্যথা ও পেটের পীড়াস্বরূপ। আর আমি বিত্তশালী হওয়া সত্ত্বেও আপনার নিকট যাঞ্চা করিয়াছি। তিনি বলিলেনঃ ব্যাপার এইরূপই। এখন তুমি ইচ্ছা করিলে গ্রহণ করিতে পার, ইচ্ছা করিলে ত্যাগও করিতে পার। আমি বলিলাম, আমি ত্যাগ করিতেছি।
তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: তাহা হইলে তুমি আমাকে এমন কোন লোকের সন্ধান দাও যাহাকে আমি তোমাদের আমীর মনোনীত করিতে পারি। আমি তাঁহাকে আগত প্রতিনিধি দলের একজনের কথা বলিলে তিনি তাহাকেই আমীর মনোনীত করিলেন। আমরা তাঁহাকে বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আমাদের একটি কূপ রহিয়াছে। শীতকালে আমরা উহাতে পর্যাপ্ত পানি পাই, ফলে আমরা সংঘবদ্ধভাবে থাকিতে পারি। কিন্তু গ্রীষ্মকালে উহার পানি হ্রাস পায়, ফলে আমাদের লোকজনকে চতুর্দিকে পানির সন্ধানে ছুটিয়া যাইতে হয়। আমরা তখন বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ি। ইসলাম গ্রহণের ফলে আমরা চতুর্দিক হইতে শত্রু পরিবেষ্টিত। আমাদের কূপটির জন্য আপনি দু'আ করুন যেন উহার পানিতেই আমাদের প্রয়োজন সংকুলান হইতে পারে এবং আমাদেরকে আর বিক্ষিপ্ত হইতে না হয়। তিনি আমাদেরকে সাতটি কঙ্কর লইয়া আসিতে বলেন। আমরা উহা আনিয়া দিলে তিনি ঐগুলি হাতে লইয়া ঘর্ষণ করিলেন এবং তাহাতে দু'আ পড়িয়া দিলেন। ইহার পর আমাদেরকে বলিলেন, কঙ্করগুলি লইয়া যাও। কূপের নিকট পৌছিয়া আল্লাহর নাম লইয়া একটি একটি করিয়া উহাতে নিক্ষেপ করিবে। আমরা সেইমতে কাজ করি আর এমনই সুফল লাভ করি যে, পানির প্রাচুর্যের দরুন কখনও আর উহার তলদেশ আমরা দেখিতে পাই নাই। সুনান আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবন মাজায় এই হাদীছের সমর্থক রিওয়ায়াত রহিয়াছে। ওয়াকিদীও এই প্রতিনিধি দলের আগমনের এই বিবরণ উদ্ধৃত করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ খ., পৃ. ৮৩-৪)।
৩৮৩ সুদা প্রতিনিধি দলের আগমনের ঘটনা এবং যিয়াদ ইবন হারিছ (রা)-এর 'উক্ত বর্ণনা হইতে বিশ্ববাসী যে অনেকগুলি শিক্ষালাভ করিয়াছে, মওলানা আবদুর রউফ দানাপুরী সেই সম্পর্কে বলেন:
উক্ত কাহিনী হইতে আমরা যে কতকগুলি মাসআলা জানিতে পারিলাম তাহা হইল: ১. বাহনের উপর হইতে আযান দেওয়া জায়েয। সুদাঈ সেইভাবেই আযান দিয়াছিলেন। ২. সেনাবাহিনীর পথ পরিক্রমাকালে এক স্থানে আযান দিয়া পথ পরিক্রমা অব্যাহত রাখিয়া অন্যত্র পৌঁছিয়া নামায আদায় করা বৈধ। ৩. আযান যে দিবে ইকামত তাহারই দেওয়া সুন্নাত। তাই রাসূলুল্লাহ বিলাল (রা)-কে ইকামত দিতে বারণ করেন এবং যে সুদাঈ আযান দিলেন তাহাকেই ইকামত দিতে বলেন এবং সাথে সাথে স্পষ্ট করিয়া দেন যে, আযান যে দেয়, ইকামতও সেই দিবে (অবশ্য ইহার অন্যথাও জায়েয আছে বলিয়া মুসনাদে আহমাদের এই মর্মে একটি রিওয়ায়াত হইতে জানা যায়, যাহাতে ইকামতের কথা বলা হইয়াছে, যাহাতে বিলাল আযান দিলেও আবদুল্লাহ ইব্ন যায়দ (রা) আগ্রহ প্রকাশ করায় নবী কারীম তাহাকে সেই অনুমতি দিয়াছিলেন)।
৪. কেহ আমীর হওয়ার জন্য আবেদন জানাইলে তাহাকে আমীর নিযুক্ত করা জায়েয। কেননা যায়দ ইব্ন হারিছ আস-সুদাঈ আমীর নিযুক্ত হওয়ার জন্য আগ্রহ ব্যক্ত করিলে তিনি তাঁহাকে মনোনীত করিয়াছিলেন। ইহা ঐ হাদীছের পরিপন্থী নহে যাহাতে রাসূলুল্লাহ বলিয়াছেন: "আমি ঐ ব্যক্তিকে আমীর নিযুক্ত করি না যে নিজে উহার আকাঙ্ক্ষী হয়। ইহার অর্থ হইল, যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির বশে আমীর নিযুক্ত হইতে চায় তাহাকে আমীর নিযুক্ত করা যায় না। কিন্তু জনসেবার উদ্দেশ্যে কেহ সেইরূপ আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করিলে নিশ্চয়ই তাহাকে নিযুক্ত করা যায়। এই ব্যাপারে নেতৃত্বপ্রার্থীদের কাহার কি মনোভাব ইমাম অবশ্যই তাহা অনুধাবন করিতে পারিবেন।
৫. জালিম প্রশাসকের বিরুদ্ধে ইমামের নিকট অভিযোগ উত্থাপন করা জায়েয। এই ঘটনায় এক ব্যক্তি এইরূপ করায় নবী কারীম তাহাকে বারণ করেন নাই বা এইজন্য তাহার প্রতি কোনরূপ অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করেন নাই।
৬. একজন মু'মিনের জন্য আমীর বা আমিল (প্রশাসক) নিযুক্তির সুযোগ গ্রহণ করার চেয়ে বর্জন করাই উত্তম। সুদাঈ তাহাই করিয়াছিলেন।
* ৭. সাদাকা বা যাকাত কাহাকেও প্রদানের পূর্বে গ্রহীতা যাকাত লাভের উপযুক্ত কিনা তাহা জানিয়া লওয়া উচিত। এইজন্যই রাসূলুল্লাহ আবেদনকারী ঐ পর্যায়ে পড়ে কিনা জানিতে চাহিয়াছিলেন।
৮. উক্ত কাহিনীতে একটি মু'জিযার উল্লেখ রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ-এর পবিত্র হস্তের আঙ্গুলসমূহের ফাঁক দিয়া অঝোর ধারায় পানি প্রবাহিত হইয়াছিল সামান্য একটু পানি হইতে। উহা দ্বারা গোটা বাহিনীর লোকজন উযূ সম্পন্ন করিয়াছিলেন। এই মু'জিযা রাসূলুল্লাহ-এর হাতে বহুবার প্রকাশিত হইয়াছে। অনেক স্থানে অনেক সাহাবীই তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। কিন্তু প্রত্যেক বারই পূর্ব হইতেই অল্প পানি বিদ্যমান ছিল, রাসূলুল্লাহ-এর পবিত্র হস্তের বরকতে উহা হইতে প্রচুর পানি উৎসারিত হইয়াছে। কখনও এমন হয় নাই যে, আদৌ পানির
অস্তিত্ব ছিল না, শুকনা পাত্র হাতে লইয়া উহা হইতে তিনি পানি প্রবাহিত করিয়াছেন (আসাহহুস্- সিয়ার, পৃ. ৪৪৭-৮)।