📄 বনূ ছাকীফ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১১. বনু ছাকীফ প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন
বনু ছাকীফ হইতেছে সেই গোত্র যাহারা ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে নিজ ঘরের ছাদের উপর দণ্ডায়মান তাহাদের বরেণ্য প্রাজ্ঞ নেতা 'উরওয়া ইব্ন মাস'উদকে চতুর্দিক হইতে সমবেতভাবে তীর নিক্ষেপে হত্যা করিয়াছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪০৫-৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৬-২৭)।
মক্কা বিজয় ও হুনায়ন যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ তাইফের উক্ত গোত্রকে দীর্ঘ ১৮ দিন বা কুড়ি দিন অবরোধ করিয়া যখন প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন, তখন সাহাবীগণ আরয করিয়াছিলেন, ইয় রাসূলাল্লাহ! ছাকীফ গোত্রীয়দের জন্য বদদু'আ করুন! জবাবে তিনি বদdu'আ না করিয়া বলিলেন :
اللهم اهد ثقيفا وأت بهم مسلمين.
“হে আল্লাহ! তুমি ছাকীফ গোত্রকে হিদায়াত দান কর এবং মুসলমান বানাইয়া তাহাদেরকে আমার নিকট পৌঁছাইয়া দাও" (ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১৫৯; সীরাতুন নবী, ইব্ন হিশামের বাংলা ভাষ্য, ৪খ., পৃ. ১৪৯)। তিরমিযী এই রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়া উহাকে হাসান বলিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ-এর এই দু'আ আল্লাহ্র দরবারে কবুল হয় এবং 'উরওয়া হত্যার আট মাস পর রাসূলুল্লাহ-এর তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পরেই উক্ত গোত্রের প্রতিনিধিদল মদীনায় তাঁহার দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করে।
যে গোত্রটি মাত্র আট মাস পূর্বে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে নিজেদের প্রিয় গোত্রপতিকে হত্যা করিতে দ্বিধাবোধ করিল না, তাহারা নিজেরাই নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিবে, উহা ছিল অনেকটা অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সীরাতবিদগণ তাঁহাদের গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে আগত হাওয়াযিন প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে খবর পাইয়া মালিক ইব্ন 'আওফ যখন নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে তাঁহার কওমের নও মুসলিমগণের সাথে সাথে ছুমালা, সালিমা ও সাহম গোত্রের উপরও তাঁহাকে নেতা নিযুক্ত করিয়াছিলেন (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫/৩৬১, ২য় মুদ্রণ ১৯৭৮ খৃ.)।
ইব্ন ইসহাক বলেন, উক্ত কবীলাগুলিকে সঙ্গে লইয়া তিনি ছাকীফদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে থাকেন। তাহাদের কোন উট ভেড়া বাহির হইলেই তিনি আক্রমণ করিতেন। এইভাবে তিনি তাহাদেরকে কোণঠাসা করিয়া ফেলেন। আবূ মিহজান ইব্ন হাবীব ছাকাফী এইজন্য আক্ষেপ করিয়া তাহার কবিতায় বলিয়াছিলেন: চিরকাল দুশমন ভয় করেছে আমাদের আর এখন বনূ সালিমা আমাদের আক্রমণ করে! মালিক ওদের চাপাইয়াছে আমাদের উপর চুক্তি ভেঙেছে সে ওয়াদা খেলাফ করেছে, আমরা কোনদিন শোধ না নিয়ে ক্ষান্ত হইনি সীরাত রাসূলুল্লাহ, ইব্ন ইসহাক-এর বাংলা ভাষ্য, ৩খ., পৃ. ৫৬৩, ই.ফা. ১৯৯২ খৃ.)। আল্লামা ইব্ন কাছীর (র)-এর ভাষায়:
فكان مالك بن عوف يغزو بلاد ثقيف ويضيق عليهم حتى الجاهم الى الدخول في الاسلام وتقدم ايضا فيما رواه أبو داود عن صخرين العيلة الاحمسي انه لم يزل بثقيف حتى انزلهم من حصنهم على حكم رسول الله ﷺ فاقبل بهم الى المدينة النبوية باذن رسول الله ﷺ له في ذلك.
"মালিক ইব্ন আওফ ছাকীফ জনপদে যুদ্ধযাত্রা করিয়া তাহাদেরকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিতেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত তাহাদেরকে তিনি ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেন। আবূ দাউদের বর্ণনায় আছে, দুর্গ হইতে অবতরণ করিয়া রাসূলুল্লাহ-এর সিদ্ধান্তের নিকট তাহাদের আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত তিনি তাহাদের পিছনে লাগিয়াই থাকেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ২৯)।
ইব্ন ইসহাক বলেন, উরওয়ার নিহত হওয়ার পর ছাকীফরা কয়েক মাস ঐ অবস্থায়ই অতিবাহিত করিল। তারপর পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে তাহারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইল
যে, আশেপাশের আরব গোত্রগুলির সহিত সংঘর্ষে টিকিয়া থাকার শক্তি এখন আর তাহাদের নাই—যাহারা ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ -এর হাতে বায়'আত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে। তাই তাহারা বনূ ইলাজের অন্যতম নেতা আমর ইবন উমায়্যার প্রস্তাবক্রমে পুনরায় পরামর্শ সভায় মিলিত হইল। এই সভায় একজন প্রতিনিধি নবী দরবারে পাঠাইবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
আব্দ ইয়ালীল ইব্ন আমর ইবন উমায়রকে তাহারা প্রতিনিধিরূপে মনোনীত করে। কিন্তু পূর্বসূরী উরওয়া ইবন মাস'উদের করুণ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়া আবদে ইয়ালীল একাকী এই দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। অগত্যা তাঁহারা তাহাদের মিত্র কবীলাসমূহ হইতে, দুইজন এবং বনূ মালিক হইতে তিনজনকে তাহার সাথীরূপে মনোনীত করে। সেই পাঁচ ব্যক্তি হইলেন মিত্র গোত্রসমূহের হাকাম ইবন উমার ইব্ন ওয়াহাব, শুরাহবীল ইব্ন গায়লান, বন্ মালিকের উছমান ইব্ন আবিল আস, আওস ইব্ন আওফ এবং নুমায়র ইবন খারাশা ইবন রাবী'আ; আসাহ্হুস-সিয়ারের বর্ণনানুসারে তাঁহার নাম ছিল বাহ্য ইবন খারাশা (আসাহ্হুস-সিয়ার পৃ. ৪০৬; ইব্ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ১৯৫; বাংলা ভাষ্য)। উল্লেখ্য, উক্ত মিত্রগোত্রসমূহ ছিল আবদুদ-দার, জুমাহ, মাখযূম, আদী, কা'ব ও সাহম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ৪২৫)।
মূসা ইব্ন 'উক্সা (র) প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা দশেরও অধিক হওয়ার কথা বলিয়াছেন। তাঁহার মতে দলনেতা ছিলেন কিনানা ইবন 'আবদ ইয়ালীল, আর তাঁহাদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন উছমান ইব্ন আবিল-আস (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৩০)।
'আবদ ইয়ালীল উপরিউক্ত প্রতিনিধি দলসহ নবম হিজরীর রমযান মাসে যাত্রা শুরু করিলেন। তিনিই ছিলেন তাহাদের মুখপাত্র এবং সিদ্ধান্তদাতা। তাহারা যখন মদীনার নিকটবর্তী হইলেন এবং কানাতে বিরাম নিলেন তখন মুগীরা ইবন শু'বার সহিত তাহাদের দেখা হইল। এই দিন তাঁহার রাসূলুল্লাহ -এর উট চরাইবার পালা ছিল। তিনি এই সুসংবাদটি প্রদানের জন্য উটগুলি তাহাদের নিকট রাখিয়া পরম উল্লাসে নবী দরবারের দিকে ছুটিলেন। পথিমধ্যে হযরত আবু বকর (রা)-এর সহিত দেখা হইলে তিনি তাঁহাকে জানাইলেন যে, বনূ ছাকীফের একটি প্রতিনিধি দল বশ্যতা স্বীকার ও ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছে। তাহারা রাসূলুল্লাহ -এর সমস্ত শর্ত মানিয়া লইবে। তবে এইজন্য তাহারা তাহাদের সম্প্রদায়, দেশ ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তার পক্ষে একটি নিশ্চয়তা পত্র প্রাপ্তির আশা করে।
হযরত আবূ বকর (রা) এই সুসংবাদটি যেন তিনিই রাসূলুল্লাহ -কে সর্বাগ্রে অবগত করিতে পারেন এইজন্য মুগীরাকে আল্লাহ্ দোহাই দিয়া অনুরোধ জ্ঞাপন করেন যে, তিনি যেন উহার পূর্বে তাহা প্রকাশ না করেন। মুগীরা (রা) তাঁহার অনুরোধ রক্ষা করেন। তিনি কাফেলার নিকট ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকে নবী দরবারে আগমনের এবং তাঁহাকে অভিবাদনের আদব-কায়দা সম্পর্কে অবহিত করিতে লাগিলেন। এইভাবে যুহর হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় তিনি তাহাদের সহিতই কাটাইলেন।
এদিকে আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ -এর সহিত সাক্ষাত করিয়া তাঁহাকে ছাকীফ প্রতিনিধি দলের আগমনবার্তা অবহিত করিলেন। খালিদ ইবন সা'ঈদ ইবন 'আস (রা)-এর মাধ্যমে তাহারা নবী দরবারে উপস্থিত হয়। তাহারা কিন্তু তাহাদের জাহিলিয়াতের যুগে
আচরিত পদ্ধতি অনুসারেই তাঁহাকে অভিবাদন জানাইল। রাসূলুল্লাহ মসজিদের এক পাশে তাহাদের জন্য একটি তাঁবু খাটাইয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ তাহাদের জন্য যে আহার্য দ্রব্যাদি প্রেরণ করিতেন তাহা হইতে খালিদ ইবন সা'ঈদ (রা) কিছুটা খাইয়া না দিলে তাহারা উহা স্পর্শ করিত না। তাহাদের ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এইরূপই চলিতে থাকে।
ইব্ন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর সহিত আলাপ-আলোচনাকালে তাহারা শর্ত আরোপ করে যে, আগামী তিন বৎসরের জন্য তাহাদের পূজ্য লাত দেবীকে অক্ষত থাকিতে দিতে হইবে। রাসূলুল্লাহ তাহাতে সম্মত না হইলে তাহারা এক বৎসরের কথা বলে। তিনি তাহাতেও সম্মত না হইলে তাহারা এক মাসের অব্যাহতি প্রার্থনা করে যাহাতে নিজ সম্প্রদায়ের মূর্খ লোকদের কাছে তাহাদের মুখ রক্ষা হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ইহার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বাঁধিয়া দিতে সম্মত হন নাই। তবে তিনি তাহাদেরকে তাহাদের আবদারে এতটুকু ছাড় দিতে রাজী হন যে, তাহারা তাহাদের নিজের হাতে ঐ মুর্তিটি ভাঙ্গিবে না, আবূ সুফয়ান ও মুগীরা এই মূর্তিটি ভাঙ্গিবে। সালাতের বিধান হইতেও তাহারা অব্যাহতি প্রার্থনা করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ বলেন:
اما كسر اصنامكم بايديكم فسنعفيكم من ذلك واما الصلوة فلا خير في دين لا صلوة فيه.
"তোমাদের নিজ হাতে মূর্তি ধ্বংসের ব্যাপারটি হইতে তোমাদেরকে অব্যাহতি দিব, কিন্তু সালাতের ব্যাপারটি ভিন্ন। যে দীনে সালাত নাই, তাহাতে কোন কল্যাণ নাই।"
তাহারা বলিল, ইহা রীতিমত অপমানজনক হইলেও আপনার খাতিরে আমরা তাহা মানিয়া লইতেছি। ইমাম আহমাদ (র)-এর উদ্ধৃত উছমান ইব্ন আবুল আস (রা)-এর বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ অন্য একটি মসজিদে ছাকীফ প্রতিনিধি দলের অবস্থানের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন যাহাতে তাহাদের অন্তরে কোমলতার সঞ্চার হয়। তিনি তাহাদের আরোপিত শর্তাবলীর বিবরণ দিয়াছেন এইভাবে:
فاشترطوا على رسول الله ﷺ ان لا يحشروا ولا يعشروا ولا يحبوا ولا يستعمل عليهم غيرهم ولا خير في دين لا ركوع فيه.
"তাহারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের উপর শর্ত আরোপ করে যে, (১) তাহাদেরকে সৈন্যবাহিনীতে যোগদানে বা যুদ্ধ যাত্রায় বাধ্য করা হইবে না, (২) তাহাদের উপর 'উশর ধার্য করা হইবে না, (৩) তাহাদের উপর কর ধার্য করা হইবে না, (৪) তাহাদের উপর তাহাদের ব্যতীত অন্য কাহাকেও নেতা নিযুক্ত করা হইবে না। (৫) ঐ ধর্মে কোন কল্যাণ নাই যে ধর্মে রুকূ নাই"। রাসূলুল্লাহ তাহাদের ঐ শর্তগুলি সাময়িকভাবে মঞ্জুরও করেন। হযরত জাবির (রা) বর্ণিত রিওয়ায়াতে আছে, তাহারা রাসূলুল্লাহ -এর নিকটে শর্ত আরোপ করিয়াছিল যে,
সাদাকা ও জিহাদের বিধি তাহাদের জন্য প্রযোজ্য হইবে না। তাহার ঐ রিওয়ায়াতেই শেষের দিকে আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ-কে পরবর্তী কালে বলিতে শুনিয়াছেন:
سيصدقون ويجاهدون اذا اسلموا .
"অচিরেই তাহারা সাদাকা-যাকাতও দিবে এবং জিহাদও করিবে -যখন তাহারা মুসলমান হইয়া যাইবে” (আবূ দাউদ, কিতাবুল খারাজ ওয়াল ইমারা, বাবু মা জাআ ফী খাবারিত-তায়েফ)।
অতঃপর তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আবু বকর (রা) যখন লক্ষ্য করিলেন যে, প্রতিনিধি দলের কনিষ্ঠতম সদস্য 'উছমান ইব্ন আবুল-আস কুরআন শিক্ষায় অধিকতর আগ্রহী এবং ইতোমধ্যে তিনি দীনের ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন তখন তিনি তাঁহাকেই তাঁহার গোত্রের ইমাম নিযুক্ত করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ -এর নিকট সুপারিশ করেন। তাঁহার এই সুপারিশের যুক্তিসংগত কারণও ছিল। মূসা ইব্ন উকবার বরাতে ইব্ন কাছীর সেই কারণটি বর্ণনা করিয়াছেন এইভাবে:
ان وفدهم كانوا اذا اتوا رسول الله له خلفوا عثمان بن ابي العاص في رحاهم فاذا رجعوا وسط النهار جاء هو الى رسول الله الله فسأله عن العلم فاستقرأه القرآن فان وجده نائما ذهب الى ابى بكر الصديق فلم يزل دأبه حتى فقه في الاسلام واحبه رسول الله له حبا شديدا .
"যখন তাহাদের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আসিত তখন 'উছমান ইব্ন আবিল আসকে তাহাদের তাঁবু পাহারায় রাখিয়া আসিত। অতঃপর দ্বিপ্রহরে যখন তাহারা তাঁবুতে ফিরিয়া যাইত তখন তিনি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আসিতেন এবং ইল্ল্ম সংক্রান্ত প্রশ্ন করিতেন, তাঁহার নিকট কুরআন শিক্ষাদানের আবেদন জানাইতেন। কোন সময় আসিয়া তাঁহাকে বিশ্রামরত দেখিলে তিনি চলিয়া যাইতেন আবূ বকর সিদ্দীকের নিকট। তাঁহার এইরূপ অভ্যাসের দরুণ তিনি দীনের জ্ঞান অর্জন করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ এই জন্য তাহাকে খুব ভালবাসিতেন"।
এই বর্ণনা হইতে কয়েকটি বিষয় জানা গেল: (১) বনূ ছাকীফ মদীনায় অবস্থানকালে সকাল হইতে দ্বিপ্রহরকাল পর্যন্ত নবী-এর দরবারে উপস্থিত থাকিয়া নবী কারীম-এর অবস্থাদি প্রত্যক্ষ করিয়া দীন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিত।
(২) তাহাদের তাঁবুতে ফিরিয়া যাওয়ার পর তাঁবুতে প্রহরারত তাঁহাদের কনিষ্ঠতম সদস্য উছমান ইবন আবিল-আস নবী দরবারে আসিয়া দীনী শিক্ষা অর্জন এবং কুরআন মজীদের তিলাওয়াত শিক্ষা করিতেন।
(৩) ধর্ম সম্পর্কে তিনি নবী কারীম-কে খুটিয়া খুটিয়া প্রশ্ন করিয়া তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে সমর্থ হন। এমনকি তিনি রাসূলুল্লাহ-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হইয়া উঠেন।
(৪) প্রতিনিধি দলের সহিত দীর্ঘ সময় কাটাইবার পর বালক 'উছমান ইব্ন আবিল-আস আসিবার পরও কিন্তু রাসূলুল্লাহ-এর অবসর ছিল না। উহাদের বিদায়ের পরও এই তরুণ শিক্ষার্থীর জন্য তাঁহাকে সময় দিতে হইত এবং তিনি প্রসন্ন বদনে তাহা দিতেনও।
(৫) কখনও ক্লান্তিবশত রাসূলুল্লাহ বিশ্রামে থাকিলেও তরুণ শিক্ষার্থীটির বিদ্যাভ্যাসে ছেদ পড়িত না। তিনি তখন ছুটিতেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের নিকট এবং যথারীতি তাহার জ্ঞানান্বেষণ চালাইয়া যাইতেন।
(৬) তাঁহার এই প্রশংসনীয় অভ্যাসের দরুণ তিনি যেমন একদিকে দীনের বুৎপত্তি অর্জনে সক্ষম হন, তেমনি আল্লাহর রাসূল এবং তাঁহার প্রধান ও বিশ্বস্ততম সাহাবীর নজরেও তিনি তাঁহার স্বগোত্রের সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি বলিয়া বিবেচিত হন এবং আবূ বকর (রা) তাঁহাকে তাহাদের ইমাম নিযুক্ত করিবার জন্য নবী দরবারে সুপারিশ করেন।
বলা বাহুল্য, হযরত আবূ বকর (রা)-এর এই সুপারিশ নবী দরবারে মঞ্জুরও হয় এবং তিনি এই সর্বকনিষ্ঠ সদস্যকেই তাহাদের ইমাম নিযুক্ত করেন। ইমাম আহমাদ (র) স্বয়ং উক্ত 'উছমান ইব্ন আবুল-আসের বরাতে বর্ণনা করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে আমার কওমের ইমাম নিযুক্ত করুন! সেমতে রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে ইমাম নিযুক্ত করিতে গিয়া বলেন:
انت امامهم فاقتد باضعفهم واتخذ مؤذنا لا يأخذ على اذانه اجرا.
"তুমিই তাহাদের ইমাম; তাহাদের দুর্বলতম ব্যক্তির পরিমাপে ইমামত করিবে; আর এমন একজন মুআযযিন নিযুক্ত করিয়া লইবে, যে তাহার আযানের জন্য মজুরী নিবে না।” আবূ দাউদ এবং তিরমিযী ইন্ন মাজাও ভিন্ন ভিন্ন সনদে উক্ত হাদীছখানা রিওয়ায়াত করিয়াছেন।
ইন্ন ইসহাকের উদ্ধৃত রাসূলুল্লাহ-এর ঐ সময় তাঁহাকে প্রদত্ত উপদেশবাণীটি ছিল এইরূপ:
يا عثمانه تجوز بالصلوة واقدر الناس باضعفهم فان فيهم الكبيرو الصغير والضعيف وذا الحاجة.
'হে' উছমান! সালাত সংক্ষিপ্ত করিবে, সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটিকে দিয়া তাহাদের ধৈর্যের পরিমাপ করিবে। কেননা তাহাদের মধ্যে থাকিবে বয়োবৃদ্ধ, শিশু, দুর্বল এবং প্রয়োজন ব্যস্ত মানুষ।"
ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে বিদায় দানকালে সর্বশেষ যে উপদেশটি দেন তাহা হইল:
فاذا صليت بقوم فخفف بهم حتى وقت لي اقرأ باسم ربك الذي خلق واشباهها من القرآن.
"যখন তুমি কোন সালাতে জামা'আতের ইমামত করিবে তখন তাহাদের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া সহজ করিবে, এমনকি তিনি আমাকে ইকরা বিস্মি রব্বিকাললাযী খালাকা ও উহার অনুরূপ সূরাগুলির কিরাআত নির্ধারিত করিয়া দেন।" মুসলিমও এই রিওয়ায়াত ভিন্ন সূত্রে গ্রহণ করিয়াছেন।
আহমাদ (র) ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ মূসা ইব্ন তালহা সূত্রে ঐ হাদীছের শেষের দিকে অতিরিক্ত রিওয়ায়াত করিয়াছেন: فاذا صلى وحده فليصل كيف يشاء "সে (ইমাম) যখন একাকী নামায পড়িবে তখন তাহার ইচ্ছামত (দীর্ঘ) পড়িবে।”
বনূ ছাকীফের উক্ত প্রতিনিধি দল এবং তাহাদের ইমাম 'উছমান ইব্ন আবিল-আসের কল্যাণে গোটা উম্মতের ইমামগণ এই মহান শিক্ষা লাভ করিলেন এবং এইভাবে এই উম্মতের দুর্বলগণ এক বিরাট রহমত ও ইহসান লাভ করেন।
মূসা ইব্ন উকবার বর্ণনা হইতে জানা যায়, ছাকীফ প্রতিনিধি দল বিশেষত তাহাদের অন্যতম নেতা কিনানা ইব্ন আবদ ইয়ালীল সূদ, ব্যাভিচার এবং মদ সম্পর্কে ছাড় চাহিলে রাসূলুল্লাহ এগুলির প্রত্যেকটিই হারাম এবং জঘন্য বলিয়া জানান। অবশেষে সবকিছুই মানিয়া লইয়া তাহারা ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ খালিদ ইবন সা'ঈদের মাধ্যমে তাহাদেরকে একটি নিরাপত্তা পত্র লিখাইয়া দেন-যাহার বর্ণনা রাসূলুল্লাহ -এর পত্রাবলী অধ্যায়ে দেওয়া হইয়াছে।
মূর্তি ধ্বংস সম্পর্কে প্রতিনিধ দল আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, উহাকে ধ্বংসের পরিকল্পনার কথা আঁচ করিতে পারিলে সে সর্বনাশী রূপ পরিগ্রহ করিয়া সকলকে ধ্বংস করিয়া ফেলিবে। হযরত উমার (রা) এই মূর্খতাব্যঞ্জক কথার জন্য গোত্রপতি আবদে ইয়ালীলকে তিরস্কার করেন। তাহারা ইহার প্রতিবাদ করিয়া বলে, খাত্তাব তনয়! আমরা তোমার কাছে আসি নাই। তাহারা রাসূলুল্লাহ -কে বলে, আপনিই বরং ইহার ধ্বংসের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, ঠিক আছে, আমি এইজন্য লোক পাঠাইব। সেমতে হযরত মুগীরা তথায় গমনপূর্বক গাইতি দিয়া মূর্তিটি সম্পূর্ণ ধ্বংসের পর উহার ভিত পর্যন্ত মাটি খুঁড়িয়া উপড়াইয়া ফেলিয়া দেন। আবূ সুফ্যানকেও রাসূলুল্লাহ তাঁহার সাথে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ঐ মূর্তি হইতে প্রাপ্ত সোনাদানা ও মূল্যবান বস্তু হইতে ছাকীফ গোত্রের প্রথম শহীদ হযরত উরওয়া ইবন মাসউদ (রা) ও তাঁহার মৃত পুত্রের ঋণ শোধ করা হয়।
প্রতিনিধি দল স্বগোত্রে ফিরিয়া গিয়া সমস্ত সংবাদ তাহাদেরকে অবহিত করিলে প্রথমে উহারা তাহা মানিয়া লইতে না পারিয়া কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিলেও শেষ পর্যন্ত সকলেই চুপ হইয়া যায়। ধীরে ধীরে সমস্ত গোত্রই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ খ., পৃ. ২৭-৩১)।
📄 ছাকীফ প্রতিনিধি দলের পিছনে তাবলীগী মেহনত
ছাকীফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণের পিছনে যে কেবল রাজনৈতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক অবরোধ ও চাপই সক্রিয় ছিল এমনটি নহে। তাহাদের পিছনে রাসূলুল্লাহ -এর তাবলীগী মেহনত ও ঐকান্তিকতারও বিশেষ অবদান ছিল। তাহাদেরকে মসজিদ বা মসজিদেরই পাশে অবস্থান করান, দ্বিপ্রহর পর্যন্ত তাহাদেরকে নিজের সহিত রাখিয়া কথাবার্তা বলা এবং ইসলামের সৌন্দর্য প্রদর্শন, এমনকি দ্বিপ্রহরের পর যখন সাধারণত তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করিতেন সেই সময়টুকুতেই ছাকীফের কনিষ্ঠতম সদস্যকে কুরআন ও মাসআলাদি শিক্ষাদান ইত্যাদি তাহারই প্রমাণ বহন করে। আবূ দাউদ শরীফের এক বর্ণনা হইতে জানা যায়, তিনি 'ইশার নামাযান্তে-যাহা সাধারণত তাঁহার নিদ্রার সময় ছিল-ছাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দলের অবস্থানস্থলে গিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাহাদের সহিত আলাপ করিতেন। মক্কী জীবনে নবী কারীম কুরায়শদের হাতে যে সমস্ত ক্লেশ ভোগ করিয়াছেন এবং মদনী জীধনে বাধ্য হইয়া যে সমস্ত যুদ্ধ করিয়াছেন ঐগুলির অবস্থা বর্ণনা করিতেন এবং সুযোগমত তাবলীগী কথা-বার্তাও বলিতেন (ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, শায়খ মুহাম্মদ ইসমাঈল পানিপথী, পৃ. ৩৪৯, ই.ফা. প্রকাশিত, ২০০৪ খৃ.)।
ইসলাম ও ইসলামের নবী সম্পর্কে তাহাদের মনে কোনরূপ ভুল বুঝাবুঝি থাকিয়া থাকিলে তাহা দূর করিয়া ইসলাম গ্রহণের জন্য তাহাদেরকে উদ্বুদ্ধ করাই যে তাঁহার এই সমস্ত ক্লেশ বরণের পিছনে সক্রিয় ছিল তাহা সহজেই বোধগম্য। কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে পরাজিত করিয়া বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করাই যদি উদ্দেশ্য হইত, তাহা হইলে তাহাদের পিছনে এত শ্রমদানের কোনই প্রয়োজন ছিল না।
আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, মসজিদ প্রাঙ্গণেই তাঁবু গাড়িয়া অবস্থানকারী উক্ত ছাকীফ প্রতিনিধি দলের মধ্যে যখন বলাবলি হইতে লাগিল, মুহাম্মাদ তো আমাদেরকে তাঁহার রিসালাতের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আহ্বান জানান, কিন্তু নিজের খুতবায় তাহা উল্লেখ করেন না, তখন রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করেন: "আমি সর্বাগ্রে সাক্ষ্য দিতেছি যে, আমি আল্লাহর রাসূল।" অর্থাৎ তিনি তাহাদের এইরূপ খুঁটিনাটি আপত্তিকেও গুরুত্ব প্রদান করিয়াছেন এবং যথারীতি উহা নিরসনের মাধ্যমে তাহাদের ধ্যান-ধারণাকে স্পষ্ট করিয়া তোলার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য বা বে-পরোয়া মনোভাব পোষণ করেন নাই—ছাকীফ প্রতিনিধি দলের সহিত তাঁহার নবী ও রাসূল পরিচিতিই স্বরূপে উদ্ভাসিত হইয়াছে—ইহাতে শাসক বা প্রভুসুলভ কঠোরতা বা উন্নাসিকতার বিন্দুমাত্র স্থান ছিল না।
📄 আহকাম
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (র) ছাকীফ প্রতিনিধি দলের আগমনের বর্ণনা হইতে প্রাপ্ত শিক্ষাবলী ও শরীয়তের বিধান সম্পর্কে লিখেন। ছাকীফ প্রতিনিধি দলের আগমনের বর্ণনায় শরীয়তের অনেক আহকাম নিহিত। সেইগুলি হইল: (১) দারুল হারবের কোন অধিবাসী যদি তাহার স্ব-জাতির প্রতি বিদ্রোহী হইয়া ধন-সম্পদসহ মুসলমানদের সহিত আসিয়া মিলিত হয় তাহা হইলে মুসলমানদের নেতা তথা ইসলামী সরকার সেই ধন-সম্পদে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করিবে না। সেই ধন-সম্পদ বিনষ্ট হইয়া গেলেও তাহাকে এইজন্য দায়ী করা হইবে না। রাসূলুল্লাহ মুগীরা ইব্ন শু'বাকে বলিয়া দিয়াছিলেন, তোমার ইসলাম তো আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য, তোমার সম্পদে আমাদের কোন কাজ নাই। (২) কাফিরদেরকে মসজিদে অবস্থান করিতে দেওয়া যায় যদি তাহাদের ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা থাকে এবং তাহাদেরকে কুরআন শারীফ শুনান এবং ইসলামী ইবাদতের সৌন্দর্য প্রদর্শন উদ্দিষ্ট হয়। (৩) দাওয়াতের উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করা যাইতে পারে। (৪) কোন সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের অধিকতর উপযুক্ত সে-ই হইবে যে ব্যক্তি আল্লাহ্ কিতাব সম্পর্কে অধিকতর অবগত। (৫) শিরকের স্থানসমূহ ধ্বংস করা জায়েয। কবরের উপর নির্মিত দর্শনীয় ইমারতসমূহের ব্যাপারেও ইহা প্রযোজ্য। (৬) পরিত্যক্ত মন্দির ভাঙ্গিয়া ঐ স্থানে মসজিদ নির্মাণ জায়েয। (৭) তা'আব্বুষ তথা আউযুবিল্লাহ পাঠপূর্বক শয়তানের কুমন্ত্রণা হইতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা এবং থুক দেওয়াতে নামায ভঙ্গ হয় না, বরং ইহা নামাযের পূর্ণতা বিধায়ক (যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪১৪-১৫, মুফতী আযীযুর রহমান অনূদিত উর্দু ভাষ্য)।
📄 বনূ আসাদ গোত্রের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১২. বনূ আসাদ গোত্রের নবী -এর দরবারে আগমন
নবম হিজরীর প্রথমভাগে দশ সদস্যের বনু আসাদ প্রতিনিধি দল মদীনায় নবী -এর দরবারে আগমন করে। কুরায়শদের সহিত মিলিত হইয়া উহারা মুসলমানদের উপর আক্রমণ চালাইত। হাদরামী ইবন আমির, দিরার ইবনুল আযওয়ার, ওয়াবিসা ইবন মা'বাদ, কাতাদা ইবনুল কায়িফ, সালামা ইবন হুবায়শ, তুলায়হা ইব্ন খুওয়ায়লিদ, নাফাদাহ্ ইব্ন আবদিল্লাহ্ প্রমুখ দশ সদস্যবিশিষ্ট এই প্রতিনিধি দলটি আগমনের পূর্বেই তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। কিন্তু আরবদের মজ্জাগত অহংকার তখনও তাহাদের মধ্যে সক্রিয় ছিল। তাই নবী -এর দরবারে পৌঁছিয়াই দলপতি হাদরামী ইব্ন আমির রাসূলুল্লাহ -কে শুনাইয়া দিলেন:
يا رسول الله انا اتيناك نتدرع الليل البهيم فى سنة شهباء ولم تبعث علينا بعثا .
"ইয়া রাসূলাল্লাহ! বিভীষিকাময় কাল রাত্রির বর্ম পরিহিত অবস্থায় এক খরা পীড়িত বৎসরে আমরা আপনার দরবারে উপস্থিত হইয়াছি। আমাদের বিরুদ্ধে আপনার কোন বাহিনী প্রেরণ করা হয় নাই"।
অর্থাৎ আমাদের এই আগমন একান্তই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, কোন বাহিনীর তাড়া খাইয়া ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় আমরা আসি নাই- যাহা অন্যদের ক্ষেত্রে ঘটিয়াছে। তাহার ভাবখানা যেন ছিল, আমাদের এই আগমনে আপনি ধন্য হইয়া গিয়াছেন। ইমাম ইবনুল কায়্যিম (র) বলেন, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কুরাযী বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাহাদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তি সম্পর্কেই মাযিল করেন:
يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لا تَمُنُّوا عَلَى إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيْمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ..
"উহারা আত্মসমর্পণ করিয়া তোমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করে। বল, তোমাদের আত্মসমর্পণ আমাকে ধন্য করিয়াছে মনে করিও না, বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করিয়া তোমাদেরকে ধন্য করিয়াছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও” (৪৯: ১৭)।
বানুর-রাতিয়্যা নামক শাখা কবীলার লোকজনও তাহাদের সাথে ছিল। উহাতে রুক্ষতা বা কঠোরতার অর্থ নিহিত থাকায় নবী কারীম বনূ রুশদা (সুমতিপ্রাপ্ত গোত্র) নামে তাহাদের নামকরণ করিয়া দেন। 'তাবাকাতে' বানুর রাতিয়্যা স্থলে 'বানুষ যানিয়্যা' শব্দ রহিয়াছে। অনুরূপ পূর্বোক্ত প্রতিনিধি দলের নামে 'নাফাদাহ্' স্থলে নাকাদাহ্ বলিয়া উক্ত হইয়াছে।
নবী কারীম নাফাদাহ্-এর নিকট এমন একটি উস্ত্রী লইয়া আসিতে বলেন যাহা সহজে আরোহণীয় এবং শাবক ছাড়াই সহজে দোহনযোগ্য। কিন্তু নাফাদাহ অনেক খোঁজাখুজি করিয়াও তাহা যোগাড় করিতে পারিতেছিলেন না। অবশেষে সিনান ইব্ন যুহায়র নামক তাঁহার এক চাচাত ভাইয়ের নিকট এইরূপ একটি উস্ত্রী পাওয়া গেল। নাফাদাহ্ তাহাই আনিয়া রাসূলুল্লাহ
-এর খিদমতে উপস্থিত করিলেন। তিনি তাঁহাকে উহা দোহন করিতে বলিলেন। নাফাদাহ সেই মতে দুধ দোহন করিয়া রাসূলুল্লাহ -এর খিদমতে পেশ করিলে তিনি নিজে উহা পান করিয়া দোহনকারী নাফাদাহকে উহার অবশিষ্টাংশ পান করিতে দিলেন এবং দু'আ করিলেন: “হে আল্লাহ! আপনি উহাতে বরকত দিন এবং যে উহা দান করিয়াছে তাহাকেও বরকত দান করুন!”
তখন নাফাদাহ বলিলেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এবং যে উহা লইয়া আসিয়াছে তাহাকেও।” তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন, “এবং যে উহা লইয়া আসিয়াছে তাহাকেও” (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৭৯; তাবাকাত, ২খ., ১ম স., পৃ. ২৯২)।
ঐ প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ -কে তিনটি ব্যাপারে প্রশ্ন করে: (১) 'ইয়াফাহ পক্ষীয় মাধ্যমে ভালমন্দ নির্ধারণ, (২) কুহানাহ্ – গণকের গণনার মাধ্যমে ভবিষ্যত সম্পর্কে ধারণা অর্জন, (৩) কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়- ইহাতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের বিনিময়ে অনেকগুলি বস্তুর মধ্যে কোন একটি বস্তু কঙ্কর নিক্ষেপের দ্বারা নির্ধারিত করিয়া লওয়া, অর্থাৎ যে বস্তুটির উপর কঙ্কর পড়িবে ক্রেতা তাহারই মালিক হইয়া যাইবে। অথবা একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে ক্রেতা তাহার কঙ্কর ছুড়িয়া মারিবে। যতদূর পর্যন্ত উহা যাইবে, ততটুকু জায়গার মালিক সে হইয়া যাইবে। ঐগুলি জাহিলী যুগে প্রচলিত ছিল।
রাসূলুল্লাহ এইগুলি হইতে তাহাদেরকে বারণ করেন। তাহারা রামাল বিদ্যা সম্পর্কেও তাঁহাকে প্রশ্ন করিলে তিনি বলেন, উহা কোন এক নবীর শিক্ষা ছিল। ইহার সুযোগ এখন আর নাই (উয়ূনুল আছার, ৬খ., পৃ. ২৫০-১; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৩৮-৯)।
উক্ত প্রতিনিধি দলের সদস্য তুলায়হা হযরত আবু বকরের আমলে নবুওয়ত দাবি করিয়াছিল, অবশ্য তওবা করিয়া সে পুনরায় ইসলামে ফিরিয়া আসে।