📄 বনূ হারিছ ইব্ন কা'বের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
৮. বনু হারিছ ইব্ন কা'বের নবী -এর দরবারে আগমন
ইহা নাজরানের একটি গণ্যমান্য গোত্র ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ নবম হিজরীর রবীউল আখির বা জুমাদাল উলা মাসে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে চারিশত সঙ্গীসহ নাজরানের বনূ হারিছ ইব্ন কা'বের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তিনি তাহাকে নির্দেশ দেন যে, যুদ্ধের পূর্বে তিনি তিনবার তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবেন। ইহাতে যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ কর তবে তুমি তাহা মানিয়া লইও, অন্যথায় তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে।
হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ নাজরানে পৌছিয়া তাঁহার পক্ষ হইতে দুইজন অশ্বারোহীকে এই বলিয়া গোত্রের মধ্যে প্রেরণ করিলেন যে, লোক সকল! ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপত্তা লাভ করিবে। ইহাতে ফলোদয় হইল। গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল। হযরত খালিদ তাহাদের মধ্যে অবস্থান করিয়া তাহাদেরকে ইসলামের বিধান এবং কুরআন-সুন্নাহ্ শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করিলেন এবং বিলাল ইবনুল হারিছ আল-মুযানীকে বানূল হারিছ গোত্রীয়দের তাৎক্ষণিকভাবে ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিয়া নবী দরবারে মদীনায় প্রেরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ জবাবে তাহাকে লোকজনের মদ্যে ঘৃণার উদ্রেক না করিয়া তাহাদেরকে ইসলামের সুফল ব্যাখ্যা করিয়া সুসংবাদ দান করার এবং তাহাদের একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিবার জন্য নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর আদেশটি ছিল এইরূপ:
فبشرهم وانذرهم واقبل وليقبل معك وفدهم.
"তাহাদেরকে সুসংবাদ দিবে, সতর্ক করিবে, তারপর চলিয়া আসিবে এবং তাহাদের একটি প্রতিনিধি দল তোমার সাথে আসিবে" (দ্র. তাবারী, তারীখ, ৩খ., পৃ. ১২৭)।
সেমতে হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ তাহাদের একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে লইয়া নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিত হন। তাবাকাতে ইবন সা'দে তাঁহাদের আগমন দশম হিজরীর রাবীউল আওয়াল মাসে হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে (ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, পৃ. ৩৬২, ই. ফা., ২০০৪ খৃ.)।
কায়স ইবন হুসায়ন যুল-গুস্সা, ইয়াযীদ ইব্ন মুহাজ্জাল, ইয়াযীদ ইব্ন আবদিল মাদান, শাদ্দাদ ইব্ন আবদুল্লাহ প্রমুখ গোত্রীয় নেতাগণ ঐ প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তাহাদেরকে দেখিয়াই রাসূলুল্লাহ বলিলেন:
من هؤلاء القوم الذين كأنهم رجال الهند ؟
"ইহারা কোন গোত্রের লোক? ইহাদেরকে যে ভারতীয় বলিয়া মনে হইতেছে"।
জবাবে তাহারা বলিলেন, আমরা বানূল হারিছ গোত্রীয় ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই।
বানূল হারিছ গোত্র ছিল আরবের একটি অপরাজেয় গোত্র। অন্যান্য গোত্রের সহিত যুদ্ধবিগ্রহে প্রায়ই তাহাদের জয় হইত। তাই নবী কারীম তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের এই দুর্দম শক্তির উৎস কি? জবাবে তাহারা বলিলেন: * আমরা সর্বদা একতাবদ্ধ থাকি- দলাদলি ও আত্মকলহে লিপ্ত হই না। * পরস্পর হিংসাবিদ্বেষে লিপ্ত হই না। * কাহারও প্রতি অত্যাচার করি না বা গায়ে পড়িয়া যুদ্ধের সূত্রপাত করি না। * সংকটকালে ধৈর্য ধারণ করি।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন: "তোমাদের বক্তব্য যথার্থ।” তিনি কায়স ইব্ন হুসায়নকে তাহাদের নেতারূপে মনোনীত করেন এবং তাহাদের প্রস্থানের পর তাহাদেরকে শিক্ষাদান এবং ঐ অঞ্চলের যাকাত-সাদাকাত উগুলের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তাঁহাকে প্রেরণকালে তিনি যাকাতের
বিধান সম্বলিত একটি দীর্ঘ পত্রও সাথে দেন- রাসূলুল্লাহ-এর পত্রাবলীর আলোচনায় তাহা দেখা যাইতে পারে।
উক্ত প্রতিনিধি দলটি শাওয়াল বা যী-কা'দা মাসে স্ব-গোত্রে প্রত্যাবর্তনের পর চার মাস অতিক্রান্ত না হইতেই নবী কারীম ইন্তিকাল করেন। তাঁহার উপর আল্লাহ্র অফুরন্ত রহমত বর্ষিত হউক (যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩৩; সীরাতুন্নবী, ইব্ন হিশামের বাংলা ভাষ্য, ই. ফা., ১৯৯৬ খৃ., ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫৮-৬১)।
📄 তায়্যি প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
৯. তায়্যি প্রতিনিধিদলের নবী-এর দরবারে আগমন
বনূ তায়্যি ছিল ইয়ামানের খুবই প্রসিদ্ধ কবীলা। এই কবীলার রঈস ছিলেন যায়দ আল-খায়ল ও আদী ইব্ন হাতিম। উভয়ের রাজ্যসীমা পৃথক ছিল। যায়দ আল-খায়ল ছিলেন প্রখ্যাত কবি, উচ্চ পর্যায়ের বক্তা এবং অতি সুশ্রী কান্তির মানুষ হিসলাম প্রচারের ইতিহাস, ইসমাঈল পানিপথীকৃত ও ইফা, প্রকাশিত, পৃ. ৩৫১]। উক্ত গ্রন্থের বক্তব্য হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তায়্যি প্রতিনিধি দল দুইবার নবী দরবারে আগমন করে: একবার যায়দ আল-খায়লের নেতৃত্বে, দ্বিতীয় বার হাতিম তাঈ-এর নেতৃত্বে। সীরাত গ্রন্থাদিতে ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ দৃষ্টেই তাঁহার এইরূপ ধারণা জন্মাইয়া থাকিবে। উহার স্বপক্ষে কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তিনি উপস্থাপিত করিতে পারেন নাই। মওলানা আবদুর রউফ দানাপুরী এইরূপ সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করিতে দ্বিধা প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি লিখেন:
كتاب المغازى مين عدى بن حاتم طائی کی وفد کا ذکر ھو چکا هے لیکن زید الخیل کے وفد کے آنے کا حال تمام اهل السير سنة الوفود مين لکهتے هين - یه صحیح طور پر ثابت نه هو سکا که به دونون عليحدہ عليحدہ تھے یا زید الخیل بھی عدی بن حاتم کے ساتھ ھی آئے تھے .
"যুদ্ধ সংক্রান্ত অধ্যায়ে হাতিম তাঈ-এর প্রতিনিধি দলের বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু যায়দ আল-খায়লের প্রতিনিধি দলের আগমনের বর্ণনা সকল সীরাতবিদই প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের বৎসরের বর্ণনায় লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। বিশুদ্ধভাবে ইহা প্রমাণিত হয় নাই যে, উক্ত দুইজন পৃথক পৃথক ছিলেন, নাকি হাতিম তাঈ-এর সাথেই যায়দ আল-খায়লও আসিয়াছিলেন" (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪১৭)।
ইবন ইসহাক বলেন, তায়্যি প্রতিনিধি দল নবী কারীম-এর দরবারে আগমন করে। তাহাদের মধ্যে যায়দ আল-খায়লও ছিলেন। তিনি তাহাদের নেতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর সহিত আলাপ-আলোচনায় মুগ্ধ হইয়া তাহারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরম নিষ্ঠা সহকারে ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করেন। যায়দ আল-খায়ল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়া বলেন:
ما ذكر لى رجل من العرب الا رأيته دون الا ما كان من زيد فانه لم يبلغ كل مافيه.
৩৬৩ "আরবের এমন কোন ব্যক্তি নাই যাহার প্রশংসা যায়দের চেয়ে বেশী করা হইয়াছে, তবে যায়দ আল-খায়লের কথা স্বতন্ত্র, তাহার যত গুণের কথা বলা হইয়াছে তাহার সমতুল্য অন্য কোন লোক পাওয়া যায় নাই" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২১)।
রাসূলুল্লাহ তাহার নাম পরিবর্তন করিয়া নূতন নামকরণ করেন যায়দ আল-খায়র, এবং তিনি তাঁহার নামে একটি ভূমির বরাদ্দপত্র লিখিয়া দেন। তিনি তাহার সম্পর্কে এই মন্তব্যও করেন, 'সে যদি মদীনার জ্বর হইতে নিষ্কৃতি পাইত! নবী দরবার হইতে প্রস্থান করিয়া নাজদের ফারদা নামক জলাশয়ের নিকট পৌছিলে সত্য সত্যই জ্বরাক্রান্ত হইয়া তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যু আসন্ন টের পাইয়া তিনি আপনমনে গাহিয়া উঠেন:
امر تحل قومى المشارق غدوة واترك في بيت بفردة منجد الا رب يوم لو مرضت لعادني عوائد من لم يبر منهن يجهد
আগামী প্রত্যুষে বুঝি/পূর্ব দিকে পাড়ি দেবে আমার স্বজন নাজদের ফারদা ভূমে/নিভৃতে একাকী রেখে মোরে/ যবে মোর হইবে মরণ? এমনও তো কত দিন গেছে/আমি রুগ্ন হলে/আসিয়াছে কত নারী সেবা দিতে দূর দুরান্ত হতে/ ক্লান্তি মোটে স্পর্শেনি তাদের। (সহিয়াছে কষ্ট অযাচিতে)।
তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার স্ত্রী নিজের অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং ধর্মচেতনার স্বল্পতার দরুন নবী করীম প্রদত্ত ভূমির বরাদ্দপত্র অগ্নি সংযোগে ভস্মীভূত করিয়া ফেলেন। সহীহ বুখারীতে আবূ সা'ঈদ (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আলী (রা) ইয়ামান হইতে যে অপরশোধিত স্বর্ণ প্রেরণ করিয়াছিলেন, রাসূলুল্লাহ উহা উপস্থিত যে চারিজনকে বিলাইয়া দিয়াছিলেন যায়দ আল-খায়ল ছিলেন তাহাদের অন্যতম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৬খ., পৃ. ৫৭)।
উল্লেখ্য, উক্ত যায়দ আল-খায়লের মুকনিফ ও হুবায়স নামক দুইজন পুত্র ছিলেন, যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ -এর সহিত সাক্ষাতলাভে ধন্য হইয়াছিলেন। হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফত আমলে রিদ্দার যুদ্ধে তাহারা উভয়ে শহীদ হন (যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬১৬-৭; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৫৭৭-৮)। উক্ত প্রতিনিধি দলের সদস্যগণের নামও তাবাকাতে ইবন সা'দ উল্লেখিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ তাহাদের নিকট ইসলাম পেশ করিলে তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়া প্রত্যেকে পাঁচ উকিয়া হারে রৌপ্য উপঢৌকনস্বরূপ লাভ করেন। যায়দ আল-খায়ল পান বার উকিয়া এবং এক নাশ (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২১)।
📄 আদী ইব্ন হাতিম তাঈ-এর প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১০. আদী ইবন হাতিম তাঈ-এর প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন
বুখারী শরীফে হাতিম তাঈর প্রতিনিধিরূপে নবী -এর দরবারে আগমনের বিস্তারিত বর্ণনা রহিয়াছে। দীর্ঘ সনদসহ ইমাম বুখারী (র) স্বয়ং হাতিম তাঈ-এর প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একদা আমরা একটি প্রতিনিধি দলরূপে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি আমাদের দলের এক একজন করিয়া নাম ধরিয়া ডাকিতে লাগিলেন। আমি বলিলাম, আমীরুল মু'মিনীন! আপনি কি আমাকে চিনিতে পারেন নাই? তিনি বলিলেন:
بلی اسلمت اذ كفروا واقبلت اذ أدبروا ووفيت اذ غدروا وعرفت اذا انكروا .
"হাঁ, তুমি তো তখন ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ যখন লোকজন কুফরী করিয়াছে, তুমি তখনই আগাইয়া আসিয়াছ যখন লোকজন পিছাইয়া গিয়াছে, তুমি বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করিয়াছ যখন লোকে বিশ্বাস ভঙ্গ করিয়াছে, আর তুমি সত্য চিনিয়া লইয়াছ যখন তাহারা উহা চিনিতে ব্যর্থ হইয়াছে"।
আদী বলিলেন, لا ابالی اذا "তাহা হইলে আমার কোন পরোয়া নাই"। ইন্ন ইসহাক বর্ণনা করেন, আদী ইবন হাতিম সম্পর্কে আমার কাছে যে তথ্য পৌছিয়াছে, তিনি বলিতেন, গোটা আরবে আমার চেয়ে রাসূলুল্লাহ-কে বেশী ঘৃণাকারী আর কেহই ছিল না। আমি ছিলাম একজন শরীফ সম্ভ্রান্ত লোক, ধর্মে আমি ছিলাম খৃস্টান। নিজ সম্প্রদায়ের চোখ আদায় করিয়া বেড়াইতাম। আমার মনে মনে আমি ছিলাম একটা ধর্মের অনুসারী, আমার সম্প্রদায়ের আচার-আচরণে আমি ছিলাম রাজা। যখন রাসূলুল্লাহ-এর আবির্ভাবের সংবাদ শুনিলাম তখন উহা আমি খুবই অপসন্দ করিলাম। আমার এক আরব উটপালক গোলামকে ডাকিয়া বলিলাম, ওরে পোড়া কপাল! আমার উটপাল হইতে বাছিয়া সুন্দর সুন্দর, মোটা তাজা কয়েকটি উট আমার জন্য প্রস্তুত রাখিবে এবং আমার ধারে কাছে রাখিবে। আর যখন শুনিবে যে, মুহাম্মাদের বাহিনী আমাদের এই দেশের দিকে অগ্রসর হইতেছে, তখনই আমাকে সেই সংবাদটি অবগত করিবে। গোলামটি সেমতে কাজ করিল। একদিন প্রত্যুষে আসিয়া সে আমাকে বলিল, হে আদী! আপনার যাহা করার এখনই করুন, মুহাম্মাদের বাহিনী আপনাকে ঘেরাও করিতে আগাইয়া আসিতেছে। আমি কতকগুলি পতাকা দেখিতে পাইয়াছি। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, ইহারা মুহাম্মাদের বাহিনী; তাহারা এই দেশ পদানত করিয়া ফেলিয়াছে।
'আদী বলেন, তখন আমি বলিলাম, তাহা হইলে তাড়াতাড়ি আমার ঐ উটগুলি আমার নিকট লইয়া আস। সে উটগুলি লইয়া আসিলে আমি বলিলাম, আমি সিরিয়ায় গিয়া আমার স্বধর্মানুসারী খৃস্টানদের সহিত মিলিত হইব। এই বলিয়া আমি হাওশিয়ার (ইবন হিশামের ভাষ্যমতে জাওশিয়ার) পথে আগাইয়া চলিলাম। হাতিমের এক কন্যাকে আমি 'হাদিরে' রাখিয়া আসিলাম।
"সিরিয়ায় পৌঁছিয়া আমি সেইখানেই অবস্থান করিতে লাগিলাম। রাসূলুল্লাহ-এর অশ্বারোহী বাহিনী আমার প্রস্থানের অব্যহিত পরেই আমাদের গোত্রের উপর চড়াও হইল। অন্যান্যদের সহিত হাতিম কন্যাও বন্দী হইয়া নবী দরবারে নীত হইল। আমার সিরিয়ায় পলাইয়া যাওয়ার সংবাদ যথাসময়েই রাসূলুল্লাহ-এর নিকট পৌঁছিয়া গিয়াছিল।"
মসজিদের দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত বন্দীশিবিরে হাতিম তনয়াও অবস্থান করিতেছিল। রাসূলুল্লাহ সেদিক দিয়া অতিক্রমকালে সে তাহার পিতৃহারা হওয়ার এবং আশ্রয়স্থলটির পলায়নের অনুযোগ করিয়া তাঁহার নিকট দয়াভিক্ষা করিল। রাসূলুল্লাহ-এর জিজ্ঞাসার জবাবে সে তাঁহাকে জানাইল যে, তাহার ভাইটিই তাহার আশ্রয়স্থল ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন :
"আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূল হইতে পলায়নকারী ?"
আর কোনরূপ বাক্যালাপ না করিয়াই তিনি তাঁহার পথে চলিয়া গেলেন। পরের দিন আবার তাঁহার ঐ পথ অতিক্রমকালে আমি পুনরায় তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস পাইলাম। তিনি তাঁহার পূর্ব বাক্যের পুনরাবৃত্তি করিয়া চলিয়া গেলেন। তৃতীয় দিন যখন তিনি আমার নিকট দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন, তখন আমি রীতিমত হতাশাগ্রস্থ। তাঁহার পশ্চাতে দণ্ডায়মান এক ব্যক্তি আমাকে দাঁড়াইয়া তাঁহার সহিত কথা বলিতে ইঙ্গিত করিলেন। আমি দাঁড়াইয়া আরয করিলাম, পিতা গত হইয়াছেন, আশ্রয়দাতা অভিভাবক নিরুদ্দেশ, আমি অভাগিনীর প্রতি দয়া করুন। তিনি বলিলেন: "আমি সদয় হইয়াছি, বাহির হইয়া যাইবার জন্য ত্বরা করিও না, যাবৎ না নিরাপদে তোমার স্ব-সম্প্রদায়ের নিকট তোমাকে পৌঁছাইয়া দেওয়ার মত কাহাকেও পাওয়া যায়। যখন এরূপ কাহারও সন্ধান পাইবে, তখন আমাকে অবহিত করিবে, আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করিব।” আমি তখন জিজ্ঞাসা করিলাম, যে ব্যক্তি আমাকে রাসূলুল্লাহ -এর সহিত কথা বলিবার জন্য ইঙ্গিত করিলেন, ইনি কে? আমাকে জানান হইল যে, তিনি ছিলেন আলী ইব্ন আবী তালিব (রা)।
আমি সেখানে অবস্থান করিতেছিলাম। এমন সময় একদিন বালী বা কুদা'আ গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল আগমন করিল। আর আমি সিরিয়ায় আমার ভাইয়ের কাছে চলিয়া যাইবার ইচ্ছা পোষণ করিতেছিলাম। তাই নবী কারীম -এর নিকট আরয করিলাম, আমার স্বজাতির একটি দল আসিয়াছে। তাহারা নির্ভরযোগ্য এবং আমাকে পৌছাইয়া দিতে সক্ষম। হাতিম তনয়া বলেন, তখন তিনি আমাকে পরিধেয় বস্ত্র, বাহন এবং পাথেয় দান করিলেন। আমি বাহির হইয়া পড়িলাম এবং সিরিয়ায় উপস্থিত হইলাম।
আদী বলেন, একদিন আমি আমার পরিবার-পরিজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় বসিয়াছিলাম। এমন সময় লক্ষ্য করিলাম, একটি হাওদা দ্রুত আমাদের দিকে আগাইয়া আসিতেছে। আমি বলিলাম, নিশ্চয়ই হাতিম-তনয়া, আমার ভগ্নি। কাছে আসিতেই দেখি, সত্যিই সে হাতিম কন্যা! হাওদা হইতে অবতরণ করিয়াই সে বলিতে শুরু করিল, সম্পর্কচ্ছেদকারী! জালিম! নিজের স্ত্রী-পুত্রকে তো উঠাইয়া লইয়া আসিলে আর আপন পিতার কন্যাকে, অসহায়া ভগ্নিকে দুশমনের দয়ামায়ার উপর ছাড়িয়া আসিতে বিবেকে বাধিল না!
আমি বলিলাম, বোনটি আমার! অপরাধ স্বীকার করিতেছি, মন্দ কথা বলিয়া আর মুখ খারাপ করিও না। তোমার তিরস্কারের কোন জবাব আমার কাছে নাই। তারপর সে আমার নিকটেই অবস্থান করিতে লাগিল। সে ছিল অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও বুদ্ধিমতি। একদিন আমি তাহাকে বলিলাম, ঐ লোকটি সম্পর্কে তুমি কী বল? সে বলিল, তাহার ব্যাপারে আমার অভিমত হইল, কাল বিলম্ব না করিয়া তুমি তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিবে। তিনি যদি সত্যসত্যই নবী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে যত আগে দেখা করিবে ততই মঙ্গল। আর যদি রাজা-বাদশাহ হন, তাহা হইলেও তোমার মর্যাদার হানি হইবে না। কেননা ইয়ামানে তো তুমি তুমিই, অর্থাৎ তোমার কোন বিকল্প নাই। তিনি তাঁহার পক্ষ হইতে তোমাকেই সেখানে শাসক নিযুক্ত করিবেন। আমি মনে মনে বলিলাম, যথার্থ অভিমত।
তারপর সত্যসত্যই আমি নির্গত হইয়া পড়িলাম এবং মদীনায় গিয়া উপনীত হইলাম। রাসূলুল্লাহ তখন মসজিদে অবস্থান করিতেছিলেন। আমি তাঁহাকে সালাম দিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে হে? আমি বলিলাম, হাতিম পুত্র আদী। রাসূলুল্লাহ তৎক্ষণাত উঠিয়া
দাঁড়াইলেন এবং আমাকে লইয়া তাঁহার ঘরের দিকে ছুটিয়া চলিলেন। এমন সময় এক অতি দুর্বল বৃদ্ধা তাঁহাকে একটু দাঁড়াইতে বলিল। তিনি দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত বৃদ্ধাটির কি একটি প্রয়োজনের ব্যাপারে তাহার সহিত আলাপ করিলেন। তখন আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহর কসম! ইনি রাজা-বাদশাহ হইতে পারেন না। তারপর তিনি আমাকে তাঁহার ঘরে লইয়া গেলেন। ঘরে প্রবেশ করিয়াই তিনি খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার নির্মিত একটি আসন তুলিয়া আমার দিকে ছুড়িয়া মারিয়া বলিলেন, উহার উপর বস! আমি বলিলাম, না, বরং আপনিই উহাতে বসুন! তিনি বলিলেন, না, তুমিই বস। আমি উহাতে বসিলাম, আর আল্লাহ্র রাসূল মাটিতেই বসিয়া পড়িলেন। তখন আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! ইহা কোন রাজার কাজ হইতে পারে না।
. তারপর তিনি আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে হাতিম তনয় আদী! তুমি না রাকৃসিয়া ধর্মমতের অনুসারী ছিলে? (উল্লেখ্য, রাকৃসী ধর্মমতটি ছিল খৃষ্ট ধর্ম ও সাবি'ঈ ধর্মমতের মাঝামাঝি একটি ধর্মমত)। আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেনঃ তুমি না তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট হইতে চারণভূমির কর উশুল করিতে? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন: তোমার ধর্মে তো তাহা বৈধ ছিল না। আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! যথার্থই বলিয়াছেন। আমি তখন উপলব্ধি করিতে পারিলাম, তিনি একজন প্রেরিত নবী। সাধারণত মানুষ যাহা জানে না তাহা তিনি জানেন। তখন তিনি বলিলেন:
"হে আদী! সম্ভবত এই ধর্মের অনুসারীদের যে অভাব-অনটন দেখিতে পাইতেছ উহাই তোমার এই ধর্মে প্রবেশে অন্তরায় হইয়াছে। আল্লাহর কসম! অচিরেই ইহাদের মধ্যে সম্পদের এমন প্রাচুর্য আসিবে যে, তাহা গ্রহণ করার মত লোক পাওয়া যাইবে না। ইহাও হয়ত এই ধর্মে প্রবেশে তোমার বাধার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, সংখ্যায় ইহারা কম ও শত্রুদের সংখ্যা বেশী। অচিরেই তুমি তাহাদের মধ্যে এমন মহিলার কথা শুনিতে পাইবে যে, কাদেসিয়া হইতে তাহার উষ্ট্র পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া নির্ভয়ে এই পবিত্র ঘরের যিয়ারত করিয়া যাইবে। এই ব্যাপারটিও হয়ত এই ধর্মে প্রবেশে তোমার অন্তরায় হইয়া থাকিবে যে, রাজ্য ও শাসন ক্ষমতার দাপট তুমি অন্যদের মধ্যে দেখিতে পাইতেছ। আল্লাহ্র কসম! অচিরেই তুমি শুনিতে পাইবে যে, ব্যাবিলনের রাজপ্রসাদসমূহ তাহাদের পদানত হইয়াছে।” আদী বলেন, তখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম।
পরবর্তীতে আদী প্রায়ই বলিতেন, প্রথম দুইটি ব্যাপারের বাস্তবায়ন তো আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তৃতীয় ব্যাপারটি এখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। আল্লাহ্র কসম! তাহাও অবশ্যই ঘটিবে। ব্যাবিলনের রাজপ্রসাদসমূহ আমি বিজিত হইয়াছে দেখিয়াছি, কাদিসিয়া হইতে নিজের উষ্ট্রপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া নির্ভয়ে এই ঘরের হজ্জ পালনকারিণী মহিলাও দেখিতে পাইয়াছি। আল্লাহ্র কসম! তৃতীয়টিও অচিরেই ঘটিবে। সম্পদের এতই প্রাচুর্য হইবে যে, কোন গ্রহণকারী খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।
আল্লামা ইন্ন কাছীর আদী ইবন হাতিমের নবী দরবারে আগমন সংক্রান্ত অনুরূপ বিভিন্ন হাদীছ ও রিওয়ায়াত ইমাম আহমাদ, তিরমিযী ও বায়হাকীকে উদ্ধৃত করিয়া দীর্ঘ আলোচনা করিয়াছেন যাহাতে রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, পারস্য সম্রাটের রত্নভাণ্ডার তাহাদের হাতে আসিবে এবং ইসলাম এতই পূর্ণতা লাভ করিবে যে, সুদূর হীরা হইতে হাওদানশীনা মহিলা
নির্ভয়ে মক্কায় আসিয়া কাহারও আশ্রয় ও অভয়দান ব্যতীত হজ্জ সম্পন্ন করিয়া যাইবে বলিয়া আল্লাহ্র কসম দিয়া বলিয়াছিলেন ঃ
فوالذي نفسي بيده ليتمن الله هذا الأمر حتى تخرج الظعينة من الحيرة، حتى تطوف بالبيت في غير جوار احد وليفتحن كنوز کسری بن هرمز
আদী বলেন, তখন আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাস! করিয়াছিলাম, সম্রাট হুরমুযের পুত্র পারস্য সম্রাট কিস্সার ধনাগার? তিনি বলেন :
نعم كسرى بن هرمز وليبذلن المال حتى لا يقبله أحد.
"হাঁ হাঁ, হুরমুয তনয় কিস্সার কথাই বলিতেছি। আর সম্পদের এত ছড়াছড়ি হইবে যে, তাহা গ্রহণ করিবার মত অভাবগ্রস্ত কোন লোক খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।” আদী বলেনঃ
فهذه الظعينة ( تأتى) من الحيرة تطوف بالبيت في غير جوار ولقد كنت فيمن فتح كنوز كسرى والذي نفسي بيده لتكونن الثالثة لان رسول الله ﷺ قالها .
“এই তো আমি দেখিতে পাইতেছি, হাওদানশীন তাওয়াফকারিণী নিঃশঙ্কভাবে ও অন্যের আশ্রয় গ্রহণ না করিয়াই হীরা হইতে আসিয়া আল্লাহ্ ঘরের তাওয়াফ করিয়া যাইতেছে, আর কিস্সার ধন ভাণ্ডার যাহারা জয় করে, আমি নিজেও তাহাদের মধ্যে ছিলাম। যাঁহার হাতে আমার প্রাণ সেই পবিত্র সত্তার কসম! তৃতীয় ব্যাপারটিও অব্যশই ঘটিবে। কেননা আল্লাহর রাসূল তাহা বলিয়াছেন”।
মোটকথা, 'আদী ইব্ন হাতিম-এর নবী দরবারে আগমন, তাঁহার ইসলাম গ্রহণ, নবী করীম -এর ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন এবং আজীবন সেগুলি বর্ণনা করিয়া ইসলামের প্রচার-প্রসারে বিরাট ভূমিকা রাখিয়াছেন (তাবাকাত ইব্ন সা'দ, ২খ., প্রথমাংশ, পৃ. ৩২১-২)।
📄 বনূ ছাকীফ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১১. বনু ছাকীফ প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন
বনু ছাকীফ হইতেছে সেই গোত্র যাহারা ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে নিজ ঘরের ছাদের উপর দণ্ডায়মান তাহাদের বরেণ্য প্রাজ্ঞ নেতা 'উরওয়া ইব্ন মাস'উদকে চতুর্দিক হইতে সমবেতভাবে তীর নিক্ষেপে হত্যা করিয়াছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪০৫-৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৬-২৭)।
মক্কা বিজয় ও হুনায়ন যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ তাইফের উক্ত গোত্রকে দীর্ঘ ১৮ দিন বা কুড়ি দিন অবরোধ করিয়া যখন প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন, তখন সাহাবীগণ আরয করিয়াছিলেন, ইয় রাসূলাল্লাহ! ছাকীফ গোত্রীয়দের জন্য বদদু'আ করুন! জবাবে তিনি বদdu'আ না করিয়া বলিলেন :
اللهم اهد ثقيفا وأت بهم مسلمين.
“হে আল্লাহ! তুমি ছাকীফ গোত্রকে হিদায়াত দান কর এবং মুসলমান বানাইয়া তাহাদেরকে আমার নিকট পৌঁছাইয়া দাও" (ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১৫৯; সীরাতুন নবী, ইব্ন হিশামের বাংলা ভাষ্য, ৪খ., পৃ. ১৪৯)। তিরমিযী এই রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়া উহাকে হাসান বলিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ-এর এই দু'আ আল্লাহ্র দরবারে কবুল হয় এবং 'উরওয়া হত্যার আট মাস পর রাসূলুল্লাহ-এর তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পরেই উক্ত গোত্রের প্রতিনিধিদল মদীনায় তাঁহার দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করে।
যে গোত্রটি মাত্র আট মাস পূর্বে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে নিজেদের প্রিয় গোত্রপতিকে হত্যা করিতে দ্বিধাবোধ করিল না, তাহারা নিজেরাই নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিবে, উহা ছিল অনেকটা অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সীরাতবিদগণ তাঁহাদের গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে আগত হাওয়াযিন প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে খবর পাইয়া মালিক ইব্ন 'আওফ যখন নবী দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে তাঁহার কওমের নও মুসলিমগণের সাথে সাথে ছুমালা, সালিমা ও সাহম গোত্রের উপরও তাঁহাকে নেতা নিযুক্ত করিয়াছিলেন (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫/৩৬১, ২য় মুদ্রণ ১৯৭৮ খৃ.)।
ইব্ন ইসহাক বলেন, উক্ত কবীলাগুলিকে সঙ্গে লইয়া তিনি ছাকীফদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে থাকেন। তাহাদের কোন উট ভেড়া বাহির হইলেই তিনি আক্রমণ করিতেন। এইভাবে তিনি তাহাদেরকে কোণঠাসা করিয়া ফেলেন। আবূ মিহজান ইব্ন হাবীব ছাকাফী এইজন্য আক্ষেপ করিয়া তাহার কবিতায় বলিয়াছিলেন: চিরকাল দুশমন ভয় করেছে আমাদের আর এখন বনূ সালিমা আমাদের আক্রমণ করে! মালিক ওদের চাপাইয়াছে আমাদের উপর চুক্তি ভেঙেছে সে ওয়াদা খেলাফ করেছে, আমরা কোনদিন শোধ না নিয়ে ক্ষান্ত হইনি সীরাত রাসূলুল্লাহ, ইব্ন ইসহাক-এর বাংলা ভাষ্য, ৩খ., পৃ. ৫৬৩, ই.ফা. ১৯৯২ খৃ.)। আল্লামা ইব্ন কাছীর (র)-এর ভাষায়:
فكان مالك بن عوف يغزو بلاد ثقيف ويضيق عليهم حتى الجاهم الى الدخول في الاسلام وتقدم ايضا فيما رواه أبو داود عن صخرين العيلة الاحمسي انه لم يزل بثقيف حتى انزلهم من حصنهم على حكم رسول الله ﷺ فاقبل بهم الى المدينة النبوية باذن رسول الله ﷺ له في ذلك.
"মালিক ইব্ন আওফ ছাকীফ জনপদে যুদ্ধযাত্রা করিয়া তাহাদেরকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিতেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত তাহাদেরকে তিনি ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেন। আবূ দাউদের বর্ণনায় আছে, দুর্গ হইতে অবতরণ করিয়া রাসূলুল্লাহ-এর সিদ্ধান্তের নিকট তাহাদের আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত তিনি তাহাদের পিছনে লাগিয়াই থাকেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ২৯)।
ইব্ন ইসহাক বলেন, উরওয়ার নিহত হওয়ার পর ছাকীফরা কয়েক মাস ঐ অবস্থায়ই অতিবাহিত করিল। তারপর পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে তাহারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইল
যে, আশেপাশের আরব গোত্রগুলির সহিত সংঘর্ষে টিকিয়া থাকার শক্তি এখন আর তাহাদের নাই—যাহারা ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ -এর হাতে বায়'আত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে। তাই তাহারা বনূ ইলাজের অন্যতম নেতা আমর ইবন উমায়্যার প্রস্তাবক্রমে পুনরায় পরামর্শ সভায় মিলিত হইল। এই সভায় একজন প্রতিনিধি নবী দরবারে পাঠাইবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
আব্দ ইয়ালীল ইব্ন আমর ইবন উমায়রকে তাহারা প্রতিনিধিরূপে মনোনীত করে। কিন্তু পূর্বসূরী উরওয়া ইবন মাস'উদের করুণ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়া আবদে ইয়ালীল একাকী এই দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। অগত্যা তাঁহারা তাহাদের মিত্র কবীলাসমূহ হইতে, দুইজন এবং বনূ মালিক হইতে তিনজনকে তাহার সাথীরূপে মনোনীত করে। সেই পাঁচ ব্যক্তি হইলেন মিত্র গোত্রসমূহের হাকাম ইবন উমার ইব্ন ওয়াহাব, শুরাহবীল ইব্ন গায়লান, বন্ মালিকের উছমান ইব্ন আবিল আস, আওস ইব্ন আওফ এবং নুমায়র ইবন খারাশা ইবন রাবী'আ; আসাহ্হুস-সিয়ারের বর্ণনানুসারে তাঁহার নাম ছিল বাহ্য ইবন খারাশা (আসাহ্হুস-সিয়ার পৃ. ৪০৬; ইব্ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ১৯৫; বাংলা ভাষ্য)। উল্লেখ্য, উক্ত মিত্রগোত্রসমূহ ছিল আবদুদ-দার, জুমাহ, মাখযূম, আদী, কা'ব ও সাহম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ৪২৫)।
মূসা ইব্ন 'উক্সা (র) প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা দশেরও অধিক হওয়ার কথা বলিয়াছেন। তাঁহার মতে দলনেতা ছিলেন কিনানা ইবন 'আবদ ইয়ালীল, আর তাঁহাদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন উছমান ইব্ন আবিল-আস (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫খ., পৃ. ৩০)।
'আবদ ইয়ালীল উপরিউক্ত প্রতিনিধি দলসহ নবম হিজরীর রমযান মাসে যাত্রা শুরু করিলেন। তিনিই ছিলেন তাহাদের মুখপাত্র এবং সিদ্ধান্তদাতা। তাহারা যখন মদীনার নিকটবর্তী হইলেন এবং কানাতে বিরাম নিলেন তখন মুগীরা ইবন শু'বার সহিত তাহাদের দেখা হইল। এই দিন তাঁহার রাসূলুল্লাহ -এর উট চরাইবার পালা ছিল। তিনি এই সুসংবাদটি প্রদানের জন্য উটগুলি তাহাদের নিকট রাখিয়া পরম উল্লাসে নবী দরবারের দিকে ছুটিলেন। পথিমধ্যে হযরত আবু বকর (রা)-এর সহিত দেখা হইলে তিনি তাঁহাকে জানাইলেন যে, বনূ ছাকীফের একটি প্রতিনিধি দল বশ্যতা স্বীকার ও ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছে। তাহারা রাসূলুল্লাহ -এর সমস্ত শর্ত মানিয়া লইবে। তবে এইজন্য তাহারা তাহাদের সম্প্রদায়, দেশ ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তার পক্ষে একটি নিশ্চয়তা পত্র প্রাপ্তির আশা করে।
হযরত আবূ বকর (রা) এই সুসংবাদটি যেন তিনিই রাসূলুল্লাহ -কে সর্বাগ্রে অবগত করিতে পারেন এইজন্য মুগীরাকে আল্লাহ্ দোহাই দিয়া অনুরোধ জ্ঞাপন করেন যে, তিনি যেন উহার পূর্বে তাহা প্রকাশ না করেন। মুগীরা (রা) তাঁহার অনুরোধ রক্ষা করেন। তিনি কাফেলার নিকট ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকে নবী দরবারে আগমনের এবং তাঁহাকে অভিবাদনের আদব-কায়দা সম্পর্কে অবহিত করিতে লাগিলেন। এইভাবে যুহর হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় তিনি তাহাদের সহিতই কাটাইলেন।
এদিকে আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ -এর সহিত সাক্ষাত করিয়া তাঁহাকে ছাকীফ প্রতিনিধি দলের আগমনবার্তা অবহিত করিলেন। খালিদ ইবন সা'ঈদ ইবন 'আস (রা)-এর মাধ্যমে তাহারা নবী দরবারে উপস্থিত হয়। তাহারা কিন্তু তাহাদের জাহিলিয়াতের যুগে
আচরিত পদ্ধতি অনুসারেই তাঁহাকে অভিবাদন জানাইল। রাসূলুল্লাহ মসজিদের এক পাশে তাহাদের জন্য একটি তাঁবু খাটাইয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ তাহাদের জন্য যে আহার্য দ্রব্যাদি প্রেরণ করিতেন তাহা হইতে খালিদ ইবন সা'ঈদ (রা) কিছুটা খাইয়া না দিলে তাহারা উহা স্পর্শ করিত না। তাহাদের ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এইরূপই চলিতে থাকে।
ইব্ন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর সহিত আলাপ-আলোচনাকালে তাহারা শর্ত আরোপ করে যে, আগামী তিন বৎসরের জন্য তাহাদের পূজ্য লাত দেবীকে অক্ষত থাকিতে দিতে হইবে। রাসূলুল্লাহ তাহাতে সম্মত না হইলে তাহারা এক বৎসরের কথা বলে। তিনি তাহাতেও সম্মত না হইলে তাহারা এক মাসের অব্যাহতি প্রার্থনা করে যাহাতে নিজ সম্প্রদায়ের মূর্খ লোকদের কাছে তাহাদের মুখ রক্ষা হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ইহার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বাঁধিয়া দিতে সম্মত হন নাই। তবে তিনি তাহাদেরকে তাহাদের আবদারে এতটুকু ছাড় দিতে রাজী হন যে, তাহারা তাহাদের নিজের হাতে ঐ মুর্তিটি ভাঙ্গিবে না, আবূ সুফয়ান ও মুগীরা এই মূর্তিটি ভাঙ্গিবে। সালাতের বিধান হইতেও তাহারা অব্যাহতি প্রার্থনা করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ বলেন:
اما كسر اصنامكم بايديكم فسنعفيكم من ذلك واما الصلوة فلا خير في دين لا صلوة فيه.
"তোমাদের নিজ হাতে মূর্তি ধ্বংসের ব্যাপারটি হইতে তোমাদেরকে অব্যাহতি দিব, কিন্তু সালাতের ব্যাপারটি ভিন্ন। যে দীনে সালাত নাই, তাহাতে কোন কল্যাণ নাই।"
তাহারা বলিল, ইহা রীতিমত অপমানজনক হইলেও আপনার খাতিরে আমরা তাহা মানিয়া লইতেছি। ইমাম আহমাদ (র)-এর উদ্ধৃত উছমান ইব্ন আবুল আস (রা)-এর বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ অন্য একটি মসজিদে ছাকীফ প্রতিনিধি দলের অবস্থানের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন যাহাতে তাহাদের অন্তরে কোমলতার সঞ্চার হয়। তিনি তাহাদের আরোপিত শর্তাবলীর বিবরণ দিয়াছেন এইভাবে:
فاشترطوا على رسول الله ﷺ ان لا يحشروا ولا يعشروا ولا يحبوا ولا يستعمل عليهم غيرهم ولا خير في دين لا ركوع فيه.
"তাহারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের উপর শর্ত আরোপ করে যে, (১) তাহাদেরকে সৈন্যবাহিনীতে যোগদানে বা যুদ্ধ যাত্রায় বাধ্য করা হইবে না, (২) তাহাদের উপর 'উশর ধার্য করা হইবে না, (৩) তাহাদের উপর কর ধার্য করা হইবে না, (৪) তাহাদের উপর তাহাদের ব্যতীত অন্য কাহাকেও নেতা নিযুক্ত করা হইবে না। (৫) ঐ ধর্মে কোন কল্যাণ নাই যে ধর্মে রুকূ নাই"। রাসূলুল্লাহ তাহাদের ঐ শর্তগুলি সাময়িকভাবে মঞ্জুরও করেন। হযরত জাবির (রা) বর্ণিত রিওয়ায়াতে আছে, তাহারা রাসূলুল্লাহ -এর নিকটে শর্ত আরোপ করিয়াছিল যে,
সাদাকা ও জিহাদের বিধি তাহাদের জন্য প্রযোজ্য হইবে না। তাহার ঐ রিওয়ায়াতেই শেষের দিকে আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ-কে পরবর্তী কালে বলিতে শুনিয়াছেন:
سيصدقون ويجاهدون اذا اسلموا .
"অচিরেই তাহারা সাদাকা-যাকাতও দিবে এবং জিহাদও করিবে -যখন তাহারা মুসলমান হইয়া যাইবে” (আবূ দাউদ, কিতাবুল খারাজ ওয়াল ইমারা, বাবু মা জাআ ফী খাবারিত-তায়েফ)।
অতঃপর তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আবু বকর (রা) যখন লক্ষ্য করিলেন যে, প্রতিনিধি দলের কনিষ্ঠতম সদস্য 'উছমান ইব্ন আবুল-আস কুরআন শিক্ষায় অধিকতর আগ্রহী এবং ইতোমধ্যে তিনি দীনের ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন তখন তিনি তাঁহাকেই তাঁহার গোত্রের ইমাম নিযুক্ত করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ -এর নিকট সুপারিশ করেন। তাঁহার এই সুপারিশের যুক্তিসংগত কারণও ছিল। মূসা ইব্ন উকবার বরাতে ইব্ন কাছীর সেই কারণটি বর্ণনা করিয়াছেন এইভাবে:
ان وفدهم كانوا اذا اتوا رسول الله له خلفوا عثمان بن ابي العاص في رحاهم فاذا رجعوا وسط النهار جاء هو الى رسول الله الله فسأله عن العلم فاستقرأه القرآن فان وجده نائما ذهب الى ابى بكر الصديق فلم يزل دأبه حتى فقه في الاسلام واحبه رسول الله له حبا شديدا .
"যখন তাহাদের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আসিত তখন 'উছমান ইব্ন আবিল আসকে তাহাদের তাঁবু পাহারায় রাখিয়া আসিত। অতঃপর দ্বিপ্রহরে যখন তাহারা তাঁবুতে ফিরিয়া যাইত তখন তিনি রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আসিতেন এবং ইল্ল্ম সংক্রান্ত প্রশ্ন করিতেন, তাঁহার নিকট কুরআন শিক্ষাদানের আবেদন জানাইতেন। কোন সময় আসিয়া তাঁহাকে বিশ্রামরত দেখিলে তিনি চলিয়া যাইতেন আবূ বকর সিদ্দীকের নিকট। তাঁহার এইরূপ অভ্যাসের দরুণ তিনি দীনের জ্ঞান অর্জন করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ এই জন্য তাহাকে খুব ভালবাসিতেন"।
এই বর্ণনা হইতে কয়েকটি বিষয় জানা গেল: (১) বনূ ছাকীফ মদীনায় অবস্থানকালে সকাল হইতে দ্বিপ্রহরকাল পর্যন্ত নবী-এর দরবারে উপস্থিত থাকিয়া নবী কারীম-এর অবস্থাদি প্রত্যক্ষ করিয়া দীন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিত।
(২) তাহাদের তাঁবুতে ফিরিয়া যাওয়ার পর তাঁবুতে প্রহরারত তাঁহাদের কনিষ্ঠতম সদস্য উছমান ইবন আবিল-আস নবী দরবারে আসিয়া দীনী শিক্ষা অর্জন এবং কুরআন মজীদের তিলাওয়াত শিক্ষা করিতেন।
(৩) ধর্ম সম্পর্কে তিনি নবী কারীম-কে খুটিয়া খুটিয়া প্রশ্ন করিয়া তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে সমর্থ হন। এমনকি তিনি রাসূলুল্লাহ-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হইয়া উঠেন।
(৪) প্রতিনিধি দলের সহিত দীর্ঘ সময় কাটাইবার পর বালক 'উছমান ইব্ন আবিল-আস আসিবার পরও কিন্তু রাসূলুল্লাহ-এর অবসর ছিল না। উহাদের বিদায়ের পরও এই তরুণ শিক্ষার্থীর জন্য তাঁহাকে সময় দিতে হইত এবং তিনি প্রসন্ন বদনে তাহা দিতেনও।
(৫) কখনও ক্লান্তিবশত রাসূলুল্লাহ বিশ্রামে থাকিলেও তরুণ শিক্ষার্থীটির বিদ্যাভ্যাসে ছেদ পড়িত না। তিনি তখন ছুটিতেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের নিকট এবং যথারীতি তাহার জ্ঞানান্বেষণ চালাইয়া যাইতেন।
(৬) তাঁহার এই প্রশংসনীয় অভ্যাসের দরুণ তিনি যেমন একদিকে দীনের বুৎপত্তি অর্জনে সক্ষম হন, তেমনি আল্লাহর রাসূল এবং তাঁহার প্রধান ও বিশ্বস্ততম সাহাবীর নজরেও তিনি তাঁহার স্বগোত্রের সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি বলিয়া বিবেচিত হন এবং আবূ বকর (রা) তাঁহাকে তাহাদের ইমাম নিযুক্ত করিবার জন্য নবী দরবারে সুপারিশ করেন।
বলা বাহুল্য, হযরত আবূ বকর (রা)-এর এই সুপারিশ নবী দরবারে মঞ্জুরও হয় এবং তিনি এই সর্বকনিষ্ঠ সদস্যকেই তাহাদের ইমাম নিযুক্ত করেন। ইমাম আহমাদ (র) স্বয়ং উক্ত 'উছমান ইব্ন আবুল-আসের বরাতে বর্ণনা করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে আমার কওমের ইমাম নিযুক্ত করুন! সেমতে রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে ইমাম নিযুক্ত করিতে গিয়া বলেন:
انت امامهم فاقتد باضعفهم واتخذ مؤذنا لا يأخذ على اذانه اجرا.
"তুমিই তাহাদের ইমাম; তাহাদের দুর্বলতম ব্যক্তির পরিমাপে ইমামত করিবে; আর এমন একজন মুআযযিন নিযুক্ত করিয়া লইবে, যে তাহার আযানের জন্য মজুরী নিবে না।” আবূ দাউদ এবং তিরমিযী ইন্ন মাজাও ভিন্ন ভিন্ন সনদে উক্ত হাদীছখানা রিওয়ায়াত করিয়াছেন।
ইন্ন ইসহাকের উদ্ধৃত রাসূলুল্লাহ-এর ঐ সময় তাঁহাকে প্রদত্ত উপদেশবাণীটি ছিল এইরূপ:
يا عثمانه تجوز بالصلوة واقدر الناس باضعفهم فان فيهم الكبيرو الصغير والضعيف وذا الحاجة.
'হে' উছমান! সালাত সংক্ষিপ্ত করিবে, সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটিকে দিয়া তাহাদের ধৈর্যের পরিমাপ করিবে। কেননা তাহাদের মধ্যে থাকিবে বয়োবৃদ্ধ, শিশু, দুর্বল এবং প্রয়োজন ব্যস্ত মানুষ।"
ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে বিদায় দানকালে সর্বশেষ যে উপদেশটি দেন তাহা হইল:
فاذا صليت بقوم فخفف بهم حتى وقت لي اقرأ باسم ربك الذي خلق واشباهها من القرآن.
"যখন তুমি কোন সালাতে জামা'আতের ইমামত করিবে তখন তাহাদের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া সহজ করিবে, এমনকি তিনি আমাকে ইকরা বিস্মি রব্বিকাললাযী খালাকা ও উহার অনুরূপ সূরাগুলির কিরাআত নির্ধারিত করিয়া দেন।" মুসলিমও এই রিওয়ায়াত ভিন্ন সূত্রে গ্রহণ করিয়াছেন।
আহমাদ (র) ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ মূসা ইব্ন তালহা সূত্রে ঐ হাদীছের শেষের দিকে অতিরিক্ত রিওয়ায়াত করিয়াছেন: فاذا صلى وحده فليصل كيف يشاء "সে (ইমাম) যখন একাকী নামায পড়িবে তখন তাহার ইচ্ছামত (দীর্ঘ) পড়িবে।”
বনূ ছাকীফের উক্ত প্রতিনিধি দল এবং তাহাদের ইমাম 'উছমান ইব্ন আবিল-আসের কল্যাণে গোটা উম্মতের ইমামগণ এই মহান শিক্ষা লাভ করিলেন এবং এইভাবে এই উম্মতের দুর্বলগণ এক বিরাট রহমত ও ইহসান লাভ করেন।
মূসা ইব্ন উকবার বর্ণনা হইতে জানা যায়, ছাকীফ প্রতিনিধি দল বিশেষত তাহাদের অন্যতম নেতা কিনানা ইব্ন আবদ ইয়ালীল সূদ, ব্যাভিচার এবং মদ সম্পর্কে ছাড় চাহিলে রাসূলুল্লাহ এগুলির প্রত্যেকটিই হারাম এবং জঘন্য বলিয়া জানান। অবশেষে সবকিছুই মানিয়া লইয়া তাহারা ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ খালিদ ইবন সা'ঈদের মাধ্যমে তাহাদেরকে একটি নিরাপত্তা পত্র লিখাইয়া দেন-যাহার বর্ণনা রাসূলুল্লাহ -এর পত্রাবলী অধ্যায়ে দেওয়া হইয়াছে।
মূর্তি ধ্বংস সম্পর্কে প্রতিনিধ দল আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, উহাকে ধ্বংসের পরিকল্পনার কথা আঁচ করিতে পারিলে সে সর্বনাশী রূপ পরিগ্রহ করিয়া সকলকে ধ্বংস করিয়া ফেলিবে। হযরত উমার (রা) এই মূর্খতাব্যঞ্জক কথার জন্য গোত্রপতি আবদে ইয়ালীলকে তিরস্কার করেন। তাহারা ইহার প্রতিবাদ করিয়া বলে, খাত্তাব তনয়! আমরা তোমার কাছে আসি নাই। তাহারা রাসূলুল্লাহ -কে বলে, আপনিই বরং ইহার ধ্বংসের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, ঠিক আছে, আমি এইজন্য লোক পাঠাইব। সেমতে হযরত মুগীরা তথায় গমনপূর্বক গাইতি দিয়া মূর্তিটি সম্পূর্ণ ধ্বংসের পর উহার ভিত পর্যন্ত মাটি খুঁড়িয়া উপড়াইয়া ফেলিয়া দেন। আবূ সুফ্যানকেও রাসূলুল্লাহ তাঁহার সাথে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ঐ মূর্তি হইতে প্রাপ্ত সোনাদানা ও মূল্যবান বস্তু হইতে ছাকীফ গোত্রের প্রথম শহীদ হযরত উরওয়া ইবন মাসউদ (রা) ও তাঁহার মৃত পুত্রের ঋণ শোধ করা হয়।
প্রতিনিধি দল স্বগোত্রে ফিরিয়া গিয়া সমস্ত সংবাদ তাহাদেরকে অবহিত করিলে প্রথমে উহারা তাহা মানিয়া লইতে না পারিয়া কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিলেও শেষ পর্যন্ত সকলেই চুপ হইয়া যায়। ধীরে ধীরে সমস্ত গোত্রই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ খ., পৃ. ২৭-৩১)।