📄 বনূ আমিরের অভিশপ্ত নেতাদের ব্যাপারে আল-কুরআনের আয়াত নাযিল হয়
আল্লাহ্র রাসূলের প্রাণ সংহারের মত মারাত্মক উদ্যোগ আদৌ কোন উপেক্ষণীয় ব্যাপার ছিল না। বনূ 'আমিরের ঐ দুর্বৃত্ত নেতাদের সম্পর্কে তাই আল-কুরআনের আয়াত নাযিল হইয়াছে। ইবন হিশাম বলেন, যায়দ ইব্ন আসলাম বর্ণনা করেন 'আতা ইব্ন য়াসার হইতে, তিনি বর্ণনা করেন হযরত ইব্ন আব্বাস (র) হইতে। তিনি বলেন: আল্লাহ তা'আলা 'আমির ও ইরবাদ সম্পর্কে নাযিল করিয়াছেন:
اللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَحْمِلُ كُلُّ أُنْثَى وَمَا تَغِيضُ الْأَرْحَامُ وَمَا تَزْدَادُ وَكُلُّ شَيْءٍ عِنْدَهُ بِمِقْدَارٍ، عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ الكَبِيرُ الْمُتَعَالِ. سَوَاءٌ مِّنْكُمْ مِّنْ أَسَرَّ الْقَوْلَ وَمَنْ جَهَرَبِهِ وَمَنْ هُوَ مُسْتَخْفِ بِالَّلْيِلِ وَسَارِبُ بِالنَّهَارِ. لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللهِ.
"প্রত্যেক নারী যাহা গর্ভে ধারণ করে এবং জরায়ুতে যাহা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ্ তাহা জানেন এবং তাঁহার বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে। যাহা অদৃশ্য ও যাহা দৃশ্যমান তিনি তাহা অবগত; তিনি মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান। তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন রাখে অথবা যে উহা প্রকাশ করে, রাত্রিতে যে আত্মগোপন করে এবং দিবসে যে প্রকাশ্যে বিচরণ
করে, তাহারা সমভাবে আল্লাহ্ জ্ঞানগোচর। মানুষের জন্য তাহার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে। উহারা আল্লাহ্র আদেশে তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করে" (১৩:১১-১২)।
এখানে তাহার জন্য বলিতে মুহাম্মাদের জন্য প্রহরী থাকা এবং তাহার রক্ষাণাবেক্ষণের কথা বুঝানো হইয়াছে। তারপর ইরবাদ ও তাহার নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করিয়া বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَاِذَا اَرَادَ اللهُ بِقَوْمٍ سُوْمًا فَلاَ مَرَدَلَهُ وَمَا لَهُمْ مِنْ دُوْنِهِ مِنْ وَّالَ: هُوَ الَّذِيْ يُرِيْكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثَّقَالَ. وَيُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيْفَتِهِ وَيُرْسِلُ الصَّوَاعِقَ فَيُصِيْبُ بِهَا مَنْ يَّشَاءُ وَهُمْ يُجَادِلُوْنَ فِى اللهِ وَهُوَ شَدِيْدُ الْمِحَالِ.
"কোন সম্প্রদায়ের সম্পর্কে যদি আল্লাহ্ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন তবে তাহা রদ হইবার নহে এবং তিনি ব্যতীত উহাদের কোন অভিভাবক নাই। তিনিই তোমাদেরকে দেখান বিজলী ভয় ও ভরসা সঞ্চার করান এবং তিনিই সৃষ্টি করেন ভারী মেঘ। বজ্রধ্বনি তাঁহার সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে, ফেরেশতাগণও করে তাঁহার ভয়ে। তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা উহা দ্বারা আঘাত করেন। আর উহারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতণ্ডা করে, অথচ তিনি মহাশক্তিশালী" (১৩ : ১১-১৩)।
আল্লামা ইব্ন কাছীর আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে 'আমির ও ইরবাদের নবী দরবারে হাযির হওয়ার প্রসঙ্গে আলোচনায় সনদসহ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে তাঁহার তাফসীর গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করিয়াছেন যে, ঐ আয়াতগুলি ঐ প্রসঙ্গেই নাযিল হয়।
ঐ প্রসঙ্গে বাড়তি আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, নবী দরবার হইতে বাহির হইয়া তাহারা যখন হারাতুল ওয়াকিম প্রান্তরে উপস্থিত হইল এবং পূর্বোক্তরূপ বলাবলি করিতেছিল তখন সাহাবী সা'দ ইব্ন মু'আয ও উসায়দ ইব্ন হুদায়র (রা) তাহাদের পরে পরেই সেখানে উপস্থিত হইয়া তাহাদেরকে আল্লাহ্ শত্রু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া তাহাদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করেন। তারপর যখন তাহারা সেখান হইতে রওয়ানা হইল তখন পথিমধ্যেই ইরবাদ বজ্রপাতে এবং 'আমির কণ্ঠনালীতে টিউমার বা গলগণ্ডে আক্রান্ত হইয়া নরকবাসী হয়। কিন্তু তাহাদের সম্প্রদায় নবী কারীম -এর দু'আর বরকতে হিদায়াতপ্রাপ্ত হইয়াছিল—যাহার বর্ণনা পূর্বেই দেওয়া হইয়াছে (আল-বিদয়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫৮-৬০)।
📄 বনূ হারিছ ইব্ন কা'বের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
৮. বনু হারিছ ইব্ন কা'বের নবী -এর দরবারে আগমন
ইহা নাজরানের একটি গণ্যমান্য গোত্র ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ নবম হিজরীর রবীউল আখির বা জুমাদাল উলা মাসে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে চারিশত সঙ্গীসহ নাজরানের বনূ হারিছ ইব্ন কা'বের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তিনি তাহাকে নির্দেশ দেন যে, যুদ্ধের পূর্বে তিনি তিনবার তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবেন। ইহাতে যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ কর তবে তুমি তাহা মানিয়া লইও, অন্যথায় তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে।
হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ নাজরানে পৌছিয়া তাঁহার পক্ষ হইতে দুইজন অশ্বারোহীকে এই বলিয়া গোত্রের মধ্যে প্রেরণ করিলেন যে, লোক সকল! ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপত্তা লাভ করিবে। ইহাতে ফলোদয় হইল। গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল। হযরত খালিদ তাহাদের মধ্যে অবস্থান করিয়া তাহাদেরকে ইসলামের বিধান এবং কুরআন-সুন্নাহ্ শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করিলেন এবং বিলাল ইবনুল হারিছ আল-মুযানীকে বানূল হারিছ গোত্রীয়দের তাৎক্ষণিকভাবে ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিয়া নবী দরবারে মদীনায় প্রেরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ জবাবে তাহাকে লোকজনের মদ্যে ঘৃণার উদ্রেক না করিয়া তাহাদেরকে ইসলামের সুফল ব্যাখ্যা করিয়া সুসংবাদ দান করার এবং তাহাদের একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিবার জন্য নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর আদেশটি ছিল এইরূপ:
فبشرهم وانذرهم واقبل وليقبل معك وفدهم.
"তাহাদেরকে সুসংবাদ দিবে, সতর্ক করিবে, তারপর চলিয়া আসিবে এবং তাহাদের একটি প্রতিনিধি দল তোমার সাথে আসিবে" (দ্র. তাবারী, তারীখ, ৩খ., পৃ. ১২৭)।
সেমতে হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ তাহাদের একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে লইয়া নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিত হন। তাবাকাতে ইবন সা'দে তাঁহাদের আগমন দশম হিজরীর রাবীউল আওয়াল মাসে হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে (ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, পৃ. ৩৬২, ই. ফা., ২০০৪ খৃ.)।
কায়স ইবন হুসায়ন যুল-গুস্সা, ইয়াযীদ ইব্ন মুহাজ্জাল, ইয়াযীদ ইব্ন আবদিল মাদান, শাদ্দাদ ইব্ন আবদুল্লাহ প্রমুখ গোত্রীয় নেতাগণ ঐ প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তাহাদেরকে দেখিয়াই রাসূলুল্লাহ বলিলেন:
من هؤلاء القوم الذين كأنهم رجال الهند ؟
"ইহারা কোন গোত্রের লোক? ইহাদেরকে যে ভারতীয় বলিয়া মনে হইতেছে"।
জবাবে তাহারা বলিলেন, আমরা বানূল হারিছ গোত্রীয় ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই।
বানূল হারিছ গোত্র ছিল আরবের একটি অপরাজেয় গোত্র। অন্যান্য গোত্রের সহিত যুদ্ধবিগ্রহে প্রায়ই তাহাদের জয় হইত। তাই নবী কারীম তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের এই দুর্দম শক্তির উৎস কি? জবাবে তাহারা বলিলেন: * আমরা সর্বদা একতাবদ্ধ থাকি- দলাদলি ও আত্মকলহে লিপ্ত হই না। * পরস্পর হিংসাবিদ্বেষে লিপ্ত হই না। * কাহারও প্রতি অত্যাচার করি না বা গায়ে পড়িয়া যুদ্ধের সূত্রপাত করি না। * সংকটকালে ধৈর্য ধারণ করি।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন: "তোমাদের বক্তব্য যথার্থ।” তিনি কায়স ইব্ন হুসায়নকে তাহাদের নেতারূপে মনোনীত করেন এবং তাহাদের প্রস্থানের পর তাহাদেরকে শিক্ষাদান এবং ঐ অঞ্চলের যাকাত-সাদাকাত উগুলের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তাঁহাকে প্রেরণকালে তিনি যাকাতের
বিধান সম্বলিত একটি দীর্ঘ পত্রও সাথে দেন- রাসূলুল্লাহ-এর পত্রাবলীর আলোচনায় তাহা দেখা যাইতে পারে।
উক্ত প্রতিনিধি দলটি শাওয়াল বা যী-কা'দা মাসে স্ব-গোত্রে প্রত্যাবর্তনের পর চার মাস অতিক্রান্ত না হইতেই নবী কারীম ইন্তিকাল করেন। তাঁহার উপর আল্লাহ্র অফুরন্ত রহমত বর্ষিত হউক (যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩৩; সীরাতুন্নবী, ইব্ন হিশামের বাংলা ভাষ্য, ই. ফা., ১৯৯৬ খৃ., ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫৮-৬১)।
📄 তায়্যি প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
৯. তায়্যি প্রতিনিধিদলের নবী-এর দরবারে আগমন
বনূ তায়্যি ছিল ইয়ামানের খুবই প্রসিদ্ধ কবীলা। এই কবীলার রঈস ছিলেন যায়দ আল-খায়ল ও আদী ইব্ন হাতিম। উভয়ের রাজ্যসীমা পৃথক ছিল। যায়দ আল-খায়ল ছিলেন প্রখ্যাত কবি, উচ্চ পর্যায়ের বক্তা এবং অতি সুশ্রী কান্তির মানুষ হিসলাম প্রচারের ইতিহাস, ইসমাঈল পানিপথীকৃত ও ইফা, প্রকাশিত, পৃ. ৩৫১]। উক্ত গ্রন্থের বক্তব্য হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তায়্যি প্রতিনিধি দল দুইবার নবী দরবারে আগমন করে: একবার যায়দ আল-খায়লের নেতৃত্বে, দ্বিতীয় বার হাতিম তাঈ-এর নেতৃত্বে। সীরাত গ্রন্থাদিতে ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ দৃষ্টেই তাঁহার এইরূপ ধারণা জন্মাইয়া থাকিবে। উহার স্বপক্ষে কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তিনি উপস্থাপিত করিতে পারেন নাই। মওলানা আবদুর রউফ দানাপুরী এইরূপ সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করিতে দ্বিধা প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি লিখেন:
كتاب المغازى مين عدى بن حاتم طائی کی وفد کا ذکر ھو چکا هے لیکن زید الخیل کے وفد کے آنے کا حال تمام اهل السير سنة الوفود مين لکهتے هين - یه صحیح طور پر ثابت نه هو سکا که به دونون عليحدہ عليحدہ تھے یا زید الخیل بھی عدی بن حاتم کے ساتھ ھی آئے تھے .
"যুদ্ধ সংক্রান্ত অধ্যায়ে হাতিম তাঈ-এর প্রতিনিধি দলের বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু যায়দ আল-খায়লের প্রতিনিধি দলের আগমনের বর্ণনা সকল সীরাতবিদই প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের বৎসরের বর্ণনায় লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। বিশুদ্ধভাবে ইহা প্রমাণিত হয় নাই যে, উক্ত দুইজন পৃথক পৃথক ছিলেন, নাকি হাতিম তাঈ-এর সাথেই যায়দ আল-খায়লও আসিয়াছিলেন" (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৪১৭)।
ইবন ইসহাক বলেন, তায়্যি প্রতিনিধি দল নবী কারীম-এর দরবারে আগমন করে। তাহাদের মধ্যে যায়দ আল-খায়লও ছিলেন। তিনি তাহাদের নেতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর সহিত আলাপ-আলোচনায় মুগ্ধ হইয়া তাহারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরম নিষ্ঠা সহকারে ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করেন। যায়দ আল-খায়ল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়া বলেন:
ما ذكر لى رجل من العرب الا رأيته دون الا ما كان من زيد فانه لم يبلغ كل مافيه.
৩৬৩ "আরবের এমন কোন ব্যক্তি নাই যাহার প্রশংসা যায়দের চেয়ে বেশী করা হইয়াছে, তবে যায়দ আল-খায়লের কথা স্বতন্ত্র, তাহার যত গুণের কথা বলা হইয়াছে তাহার সমতুল্য অন্য কোন লোক পাওয়া যায় নাই" (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২১)।
রাসূলুল্লাহ তাহার নাম পরিবর্তন করিয়া নূতন নামকরণ করেন যায়দ আল-খায়র, এবং তিনি তাঁহার নামে একটি ভূমির বরাদ্দপত্র লিখিয়া দেন। তিনি তাহার সম্পর্কে এই মন্তব্যও করেন, 'সে যদি মদীনার জ্বর হইতে নিষ্কৃতি পাইত! নবী দরবার হইতে প্রস্থান করিয়া নাজদের ফারদা নামক জলাশয়ের নিকট পৌছিলে সত্য সত্যই জ্বরাক্রান্ত হইয়া তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যু আসন্ন টের পাইয়া তিনি আপনমনে গাহিয়া উঠেন:
امر تحل قومى المشارق غدوة واترك في بيت بفردة منجد الا رب يوم لو مرضت لعادني عوائد من لم يبر منهن يجهد
আগামী প্রত্যুষে বুঝি/পূর্ব দিকে পাড়ি দেবে আমার স্বজন নাজদের ফারদা ভূমে/নিভৃতে একাকী রেখে মোরে/ যবে মোর হইবে মরণ? এমনও তো কত দিন গেছে/আমি রুগ্ন হলে/আসিয়াছে কত নারী সেবা দিতে দূর দুরান্ত হতে/ ক্লান্তি মোটে স্পর্শেনি তাদের। (সহিয়াছে কষ্ট অযাচিতে)।
তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার স্ত্রী নিজের অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং ধর্মচেতনার স্বল্পতার দরুন নবী করীম প্রদত্ত ভূমির বরাদ্দপত্র অগ্নি সংযোগে ভস্মীভূত করিয়া ফেলেন। সহীহ বুখারীতে আবূ সা'ঈদ (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আলী (রা) ইয়ামান হইতে যে অপরশোধিত স্বর্ণ প্রেরণ করিয়াছিলেন, রাসূলুল্লাহ উহা উপস্থিত যে চারিজনকে বিলাইয়া দিয়াছিলেন যায়দ আল-খায়ল ছিলেন তাহাদের অন্যতম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৬খ., পৃ. ৫৭)।
উল্লেখ্য, উক্ত যায়দ আল-খায়লের মুকনিফ ও হুবায়স নামক দুইজন পুত্র ছিলেন, যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ -এর সহিত সাক্ষাতলাভে ধন্য হইয়াছিলেন। হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফত আমলে রিদ্দার যুদ্ধে তাহারা উভয়ে শহীদ হন (যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬১৬-৭; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৫৭৭-৮)। উক্ত প্রতিনিধি দলের সদস্যগণের নামও তাবাকাতে ইবন সা'দ উল্লেখিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ তাহাদের নিকট ইসলাম পেশ করিলে তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়া প্রত্যেকে পাঁচ উকিয়া হারে রৌপ্য উপঢৌকনস্বরূপ লাভ করেন। যায়দ আল-খায়ল পান বার উকিয়া এবং এক নাশ (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩২১)।
📄 আদী ইব্ন হাতিম তাঈ-এর প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
১০. আদী ইবন হাতিম তাঈ-এর প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন
বুখারী শরীফে হাতিম তাঈর প্রতিনিধিরূপে নবী -এর দরবারে আগমনের বিস্তারিত বর্ণনা রহিয়াছে। দীর্ঘ সনদসহ ইমাম বুখারী (র) স্বয়ং হাতিম তাঈ-এর প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একদা আমরা একটি প্রতিনিধি দলরূপে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি আমাদের দলের এক একজন করিয়া নাম ধরিয়া ডাকিতে লাগিলেন। আমি বলিলাম, আমীরুল মু'মিনীন! আপনি কি আমাকে চিনিতে পারেন নাই? তিনি বলিলেন:
بلی اسلمت اذ كفروا واقبلت اذ أدبروا ووفيت اذ غدروا وعرفت اذا انكروا .
"হাঁ, তুমি তো তখন ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ যখন লোকজন কুফরী করিয়াছে, তুমি তখনই আগাইয়া আসিয়াছ যখন লোকজন পিছাইয়া গিয়াছে, তুমি বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করিয়াছ যখন লোকে বিশ্বাস ভঙ্গ করিয়াছে, আর তুমি সত্য চিনিয়া লইয়াছ যখন তাহারা উহা চিনিতে ব্যর্থ হইয়াছে"।
আদী বলিলেন, لا ابالی اذا "তাহা হইলে আমার কোন পরোয়া নাই"। ইন্ন ইসহাক বর্ণনা করেন, আদী ইবন হাতিম সম্পর্কে আমার কাছে যে তথ্য পৌছিয়াছে, তিনি বলিতেন, গোটা আরবে আমার চেয়ে রাসূলুল্লাহ-কে বেশী ঘৃণাকারী আর কেহই ছিল না। আমি ছিলাম একজন শরীফ সম্ভ্রান্ত লোক, ধর্মে আমি ছিলাম খৃস্টান। নিজ সম্প্রদায়ের চোখ আদায় করিয়া বেড়াইতাম। আমার মনে মনে আমি ছিলাম একটা ধর্মের অনুসারী, আমার সম্প্রদায়ের আচার-আচরণে আমি ছিলাম রাজা। যখন রাসূলুল্লাহ-এর আবির্ভাবের সংবাদ শুনিলাম তখন উহা আমি খুবই অপসন্দ করিলাম। আমার এক আরব উটপালক গোলামকে ডাকিয়া বলিলাম, ওরে পোড়া কপাল! আমার উটপাল হইতে বাছিয়া সুন্দর সুন্দর, মোটা তাজা কয়েকটি উট আমার জন্য প্রস্তুত রাখিবে এবং আমার ধারে কাছে রাখিবে। আর যখন শুনিবে যে, মুহাম্মাদের বাহিনী আমাদের এই দেশের দিকে অগ্রসর হইতেছে, তখনই আমাকে সেই সংবাদটি অবগত করিবে। গোলামটি সেমতে কাজ করিল। একদিন প্রত্যুষে আসিয়া সে আমাকে বলিল, হে আদী! আপনার যাহা করার এখনই করুন, মুহাম্মাদের বাহিনী আপনাকে ঘেরাও করিতে আগাইয়া আসিতেছে। আমি কতকগুলি পতাকা দেখিতে পাইয়াছি। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, ইহারা মুহাম্মাদের বাহিনী; তাহারা এই দেশ পদানত করিয়া ফেলিয়াছে।
'আদী বলেন, তখন আমি বলিলাম, তাহা হইলে তাড়াতাড়ি আমার ঐ উটগুলি আমার নিকট লইয়া আস। সে উটগুলি লইয়া আসিলে আমি বলিলাম, আমি সিরিয়ায় গিয়া আমার স্বধর্মানুসারী খৃস্টানদের সহিত মিলিত হইব। এই বলিয়া আমি হাওশিয়ার (ইবন হিশামের ভাষ্যমতে জাওশিয়ার) পথে আগাইয়া চলিলাম। হাতিমের এক কন্যাকে আমি 'হাদিরে' রাখিয়া আসিলাম।
"সিরিয়ায় পৌঁছিয়া আমি সেইখানেই অবস্থান করিতে লাগিলাম। রাসূলুল্লাহ-এর অশ্বারোহী বাহিনী আমার প্রস্থানের অব্যহিত পরেই আমাদের গোত্রের উপর চড়াও হইল। অন্যান্যদের সহিত হাতিম কন্যাও বন্দী হইয়া নবী দরবারে নীত হইল। আমার সিরিয়ায় পলাইয়া যাওয়ার সংবাদ যথাসময়েই রাসূলুল্লাহ-এর নিকট পৌঁছিয়া গিয়াছিল।"
মসজিদের দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত বন্দীশিবিরে হাতিম তনয়াও অবস্থান করিতেছিল। রাসূলুল্লাহ সেদিক দিয়া অতিক্রমকালে সে তাহার পিতৃহারা হওয়ার এবং আশ্রয়স্থলটির পলায়নের অনুযোগ করিয়া তাঁহার নিকট দয়াভিক্ষা করিল। রাসূলুল্লাহ-এর জিজ্ঞাসার জবাবে সে তাঁহাকে জানাইল যে, তাহার ভাইটিই তাহার আশ্রয়স্থল ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন :
"আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূল হইতে পলায়নকারী ?"
আর কোনরূপ বাক্যালাপ না করিয়াই তিনি তাঁহার পথে চলিয়া গেলেন। পরের দিন আবার তাঁহার ঐ পথ অতিক্রমকালে আমি পুনরায় তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস পাইলাম। তিনি তাঁহার পূর্ব বাক্যের পুনরাবৃত্তি করিয়া চলিয়া গেলেন। তৃতীয় দিন যখন তিনি আমার নিকট দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন, তখন আমি রীতিমত হতাশাগ্রস্থ। তাঁহার পশ্চাতে দণ্ডায়মান এক ব্যক্তি আমাকে দাঁড়াইয়া তাঁহার সহিত কথা বলিতে ইঙ্গিত করিলেন। আমি দাঁড়াইয়া আরয করিলাম, পিতা গত হইয়াছেন, আশ্রয়দাতা অভিভাবক নিরুদ্দেশ, আমি অভাগিনীর প্রতি দয়া করুন। তিনি বলিলেন: "আমি সদয় হইয়াছি, বাহির হইয়া যাইবার জন্য ত্বরা করিও না, যাবৎ না নিরাপদে তোমার স্ব-সম্প্রদায়ের নিকট তোমাকে পৌঁছাইয়া দেওয়ার মত কাহাকেও পাওয়া যায়। যখন এরূপ কাহারও সন্ধান পাইবে, তখন আমাকে অবহিত করিবে, আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করিব।” আমি তখন জিজ্ঞাসা করিলাম, যে ব্যক্তি আমাকে রাসূলুল্লাহ -এর সহিত কথা বলিবার জন্য ইঙ্গিত করিলেন, ইনি কে? আমাকে জানান হইল যে, তিনি ছিলেন আলী ইব্ন আবী তালিব (রা)।
আমি সেখানে অবস্থান করিতেছিলাম। এমন সময় একদিন বালী বা কুদা'আ গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল আগমন করিল। আর আমি সিরিয়ায় আমার ভাইয়ের কাছে চলিয়া যাইবার ইচ্ছা পোষণ করিতেছিলাম। তাই নবী কারীম -এর নিকট আরয করিলাম, আমার স্বজাতির একটি দল আসিয়াছে। তাহারা নির্ভরযোগ্য এবং আমাকে পৌছাইয়া দিতে সক্ষম। হাতিম তনয়া বলেন, তখন তিনি আমাকে পরিধেয় বস্ত্র, বাহন এবং পাথেয় দান করিলেন। আমি বাহির হইয়া পড়িলাম এবং সিরিয়ায় উপস্থিত হইলাম।
আদী বলেন, একদিন আমি আমার পরিবার-পরিজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় বসিয়াছিলাম। এমন সময় লক্ষ্য করিলাম, একটি হাওদা দ্রুত আমাদের দিকে আগাইয়া আসিতেছে। আমি বলিলাম, নিশ্চয়ই হাতিম-তনয়া, আমার ভগ্নি। কাছে আসিতেই দেখি, সত্যিই সে হাতিম কন্যা! হাওদা হইতে অবতরণ করিয়াই সে বলিতে শুরু করিল, সম্পর্কচ্ছেদকারী! জালিম! নিজের স্ত্রী-পুত্রকে তো উঠাইয়া লইয়া আসিলে আর আপন পিতার কন্যাকে, অসহায়া ভগ্নিকে দুশমনের দয়ামায়ার উপর ছাড়িয়া আসিতে বিবেকে বাধিল না!
আমি বলিলাম, বোনটি আমার! অপরাধ স্বীকার করিতেছি, মন্দ কথা বলিয়া আর মুখ খারাপ করিও না। তোমার তিরস্কারের কোন জবাব আমার কাছে নাই। তারপর সে আমার নিকটেই অবস্থান করিতে লাগিল। সে ছিল অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও বুদ্ধিমতি। একদিন আমি তাহাকে বলিলাম, ঐ লোকটি সম্পর্কে তুমি কী বল? সে বলিল, তাহার ব্যাপারে আমার অভিমত হইল, কাল বিলম্ব না করিয়া তুমি তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিবে। তিনি যদি সত্যসত্যই নবী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে যত আগে দেখা করিবে ততই মঙ্গল। আর যদি রাজা-বাদশাহ হন, তাহা হইলেও তোমার মর্যাদার হানি হইবে না। কেননা ইয়ামানে তো তুমি তুমিই, অর্থাৎ তোমার কোন বিকল্প নাই। তিনি তাঁহার পক্ষ হইতে তোমাকেই সেখানে শাসক নিযুক্ত করিবেন। আমি মনে মনে বলিলাম, যথার্থ অভিমত।
তারপর সত্যসত্যই আমি নির্গত হইয়া পড়িলাম এবং মদীনায় গিয়া উপনীত হইলাম। রাসূলুল্লাহ তখন মসজিদে অবস্থান করিতেছিলেন। আমি তাঁহাকে সালাম দিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে হে? আমি বলিলাম, হাতিম পুত্র আদী। রাসূলুল্লাহ তৎক্ষণাত উঠিয়া
দাঁড়াইলেন এবং আমাকে লইয়া তাঁহার ঘরের দিকে ছুটিয়া চলিলেন। এমন সময় এক অতি দুর্বল বৃদ্ধা তাঁহাকে একটু দাঁড়াইতে বলিল। তিনি দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত বৃদ্ধাটির কি একটি প্রয়োজনের ব্যাপারে তাহার সহিত আলাপ করিলেন। তখন আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহর কসম! ইনি রাজা-বাদশাহ হইতে পারেন না। তারপর তিনি আমাকে তাঁহার ঘরে লইয়া গেলেন। ঘরে প্রবেশ করিয়াই তিনি খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার নির্মিত একটি আসন তুলিয়া আমার দিকে ছুড়িয়া মারিয়া বলিলেন, উহার উপর বস! আমি বলিলাম, না, বরং আপনিই উহাতে বসুন! তিনি বলিলেন, না, তুমিই বস। আমি উহাতে বসিলাম, আর আল্লাহ্র রাসূল মাটিতেই বসিয়া পড়িলেন। তখন আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! ইহা কোন রাজার কাজ হইতে পারে না।
. তারপর তিনি আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে হাতিম তনয় আদী! তুমি না রাকৃসিয়া ধর্মমতের অনুসারী ছিলে? (উল্লেখ্য, রাকৃসী ধর্মমতটি ছিল খৃষ্ট ধর্ম ও সাবি'ঈ ধর্মমতের মাঝামাঝি একটি ধর্মমত)। আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেনঃ তুমি না তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট হইতে চারণভূমির কর উশুল করিতে? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন: তোমার ধর্মে তো তাহা বৈধ ছিল না। আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! যথার্থই বলিয়াছেন। আমি তখন উপলব্ধি করিতে পারিলাম, তিনি একজন প্রেরিত নবী। সাধারণত মানুষ যাহা জানে না তাহা তিনি জানেন। তখন তিনি বলিলেন:
"হে আদী! সম্ভবত এই ধর্মের অনুসারীদের যে অভাব-অনটন দেখিতে পাইতেছ উহাই তোমার এই ধর্মে প্রবেশে অন্তরায় হইয়াছে। আল্লাহর কসম! অচিরেই ইহাদের মধ্যে সম্পদের এমন প্রাচুর্য আসিবে যে, তাহা গ্রহণ করার মত লোক পাওয়া যাইবে না। ইহাও হয়ত এই ধর্মে প্রবেশে তোমার বাধার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, সংখ্যায় ইহারা কম ও শত্রুদের সংখ্যা বেশী। অচিরেই তুমি তাহাদের মধ্যে এমন মহিলার কথা শুনিতে পাইবে যে, কাদেসিয়া হইতে তাহার উষ্ট্র পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া নির্ভয়ে এই পবিত্র ঘরের যিয়ারত করিয়া যাইবে। এই ব্যাপারটিও হয়ত এই ধর্মে প্রবেশে তোমার অন্তরায় হইয়া থাকিবে যে, রাজ্য ও শাসন ক্ষমতার দাপট তুমি অন্যদের মধ্যে দেখিতে পাইতেছ। আল্লাহ্র কসম! অচিরেই তুমি শুনিতে পাইবে যে, ব্যাবিলনের রাজপ্রসাদসমূহ তাহাদের পদানত হইয়াছে।” আদী বলেন, তখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম।
পরবর্তীতে আদী প্রায়ই বলিতেন, প্রথম দুইটি ব্যাপারের বাস্তবায়ন তো আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তৃতীয় ব্যাপারটি এখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। আল্লাহ্র কসম! তাহাও অবশ্যই ঘটিবে। ব্যাবিলনের রাজপ্রসাদসমূহ আমি বিজিত হইয়াছে দেখিয়াছি, কাদিসিয়া হইতে নিজের উষ্ট্রপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া নির্ভয়ে এই ঘরের হজ্জ পালনকারিণী মহিলাও দেখিতে পাইয়াছি। আল্লাহ্র কসম! তৃতীয়টিও অচিরেই ঘটিবে। সম্পদের এতই প্রাচুর্য হইবে যে, কোন গ্রহণকারী খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।
আল্লামা ইন্ন কাছীর আদী ইবন হাতিমের নবী দরবারে আগমন সংক্রান্ত অনুরূপ বিভিন্ন হাদীছ ও রিওয়ায়াত ইমাম আহমাদ, তিরমিযী ও বায়হাকীকে উদ্ধৃত করিয়া দীর্ঘ আলোচনা করিয়াছেন যাহাতে রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, পারস্য সম্রাটের রত্নভাণ্ডার তাহাদের হাতে আসিবে এবং ইসলাম এতই পূর্ণতা লাভ করিবে যে, সুদূর হীরা হইতে হাওদানশীনা মহিলা
নির্ভয়ে মক্কায় আসিয়া কাহারও আশ্রয় ও অভয়দান ব্যতীত হজ্জ সম্পন্ন করিয়া যাইবে বলিয়া আল্লাহ্র কসম দিয়া বলিয়াছিলেন ঃ
فوالذي نفسي بيده ليتمن الله هذا الأمر حتى تخرج الظعينة من الحيرة، حتى تطوف بالبيت في غير جوار احد وليفتحن كنوز کسری بن هرمز
আদী বলেন, তখন আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাস! করিয়াছিলাম, সম্রাট হুরমুযের পুত্র পারস্য সম্রাট কিস্সার ধনাগার? তিনি বলেন :
نعم كسرى بن هرمز وليبذلن المال حتى لا يقبله أحد.
"হাঁ হাঁ, হুরমুয তনয় কিস্সার কথাই বলিতেছি। আর সম্পদের এত ছড়াছড়ি হইবে যে, তাহা গ্রহণ করিবার মত অভাবগ্রস্ত কোন লোক খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।” আদী বলেনঃ
فهذه الظعينة ( تأتى) من الحيرة تطوف بالبيت في غير جوار ولقد كنت فيمن فتح كنوز كسرى والذي نفسي بيده لتكونن الثالثة لان رسول الله ﷺ قالها .
“এই তো আমি দেখিতে পাইতেছি, হাওদানশীন তাওয়াফকারিণী নিঃশঙ্কভাবে ও অন্যের আশ্রয় গ্রহণ না করিয়াই হীরা হইতে আসিয়া আল্লাহ্ ঘরের তাওয়াফ করিয়া যাইতেছে, আর কিস্সার ধন ভাণ্ডার যাহারা জয় করে, আমি নিজেও তাহাদের মধ্যে ছিলাম। যাঁহার হাতে আমার প্রাণ সেই পবিত্র সত্তার কসম! তৃতীয় ব্যাপারটিও অব্যশই ঘটিবে। কেননা আল্লাহর রাসূল তাহা বলিয়াছেন”।
মোটকথা, 'আদী ইব্ন হাতিম-এর নবী দরবারে আগমন, তাঁহার ইসলাম গ্রহণ, নবী করীম -এর ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন এবং আজীবন সেগুলি বর্ণনা করিয়া ইসলামের প্রচার-প্রসারে বিরাট ভূমিকা রাখিয়াছেন (তাবাকাত ইব্ন সা'দ, ২খ., প্রথমাংশ, পৃ. ৩২১-২)।