📄 নবী (সা)-এর দরবারে দাওস প্রতিনিধি দলের আগমন
৬. নবী-এর দরবারে দাওস প্রতিনিধি দলের আগমন
দাওস আরবের একটি বিখ্যাত গোত্র। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ঐ গোত্রেরই লোক ছিলেন। ঐ গোত্রের বিখ্যাত কবি তুফায়ল আদ-দাওসী আবু তালিব গিরিসংকট হইতে রাসূলুল্লাহ ও তদীয় বংশের লোকজনের মুক্তিলাভের অব্যবহিত পরেই মক্কায় রাসূলুল্লাহ-এর সহিত সাক্ষাত করিতে আসেন। তিনি বর্ণনা করেন:
"আমি মক্কায় পদার্পণ করিলে কুরায়শগণ আমাকে এই বলিয়া ভীতি প্রদর্শন করে যে, রাসূলুল্লাহ একজন জাদুকর, তাঁহার কথা শ্রবণমাত্র লোক দিগ্বিদিক জ্ঞান হারাইয়া পাগল হইয়া যায়। আমি তাহাতে এতই ভীত হইলাম যে, কানে বস্ত্রখণ্ড ঢুকাইয়া মসজিদে প্রবেশ করিলাম যাহাতে তাঁহার কোন কথা আমি শুনিতে না পাই। অবশেষে প্রাতঃকালে যখন রাসূলুল্লাহ সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করিলেন তখন তাহা আমার নিকট অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক মনে হইল। আমি মনে মনে বলিলাম, এ কেমন নির্বুদ্ধিতা! আমি একজন জ্ঞানী কবি, কোন কাব্যের ভাল-মন্দ মান বিচারের ক্ষমতা আমার রহিয়াছে। এমতাবস্থায় তাঁহার বাক্যালাপ শুনিতে বাধা কোথায়? ভাল হইলে গ্রহণ করিব, মন্দ হইলে প্রত্যাখ্যান করিব। তাই সালাতশেষে আমি তাঁহার সাথে সাথে রওয়ানা হইলাম। তাঁহার ঘরে পৌছিয়া আমি বলিলাম, আপনার সম্প্রদায়ের লোকজন আমাকে এমন এমন কথা বলিয়াছে। কিন্তু আল্লাহর মর্জি ছিল যে, আমি আপনার কালাম শুনি, তাই কতকটা ইতোমধ্যেই শ্রবণ করিয়াছি। এখন আপনি আমাকে আপনার কথা শুনান। নবী কারীম তাহাকে ইসলামের দা'ওয়াত পেশ করিলে তিনি সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার উর্দু, পৃ. ৫২)।
স্ব-সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া তুফায়ল (রা) তাহাদেরকে ইসলামের দা'ওয়াত দিলেন। কিন্তু তাহাদের মধ্যে যেনা ব্যভিচারের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তাহারা ধারণা করিল যে, ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহারা সেই স্বাধীনতা হারাইবে। এইজন্য তাহারা সংকোচবোধ করিতেছিল। হযরত তুফায়ল (রা) নবী কারীম-এর নিকট উপস্থিত হইয়া ইহা বর্ণনা করিলে তিনি দু'আ-করিলেন : হে আল্লাহ্! দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান করুন। অতঃপর তিনি তুফায়ল (রা)-কে পুনরায় নিজ সম্প্রদায়ে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকে নম্র ভাষায় ইসলামের দা'ওয়াত দানের নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর দু'আ এবং হযরত তুফায়লের উৎসাহদানে উৎসাহিত হইয়া তাঁহার সম্প্রদায়ের লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবূ হুরায়রাসহ ঐ গোত্রের আশি ব্যক্তি হিজরত করিয়া মদীনায় চলিয়া আসেন (বুখারী, বাদউল খাল্ক অধ্যায়; সীরাতুন নবী, শিবলী, ২খ., পৃ. ৪১)।
ইবন সা'দ বলেন, তুফায়ল দাওসীর সহিত তাহাদের সত্তর বা আশি ঘর লোক (سبعون او ثمانون اهل بيت) মদীনায় আসেন। আবূ হুরায়রা ও আবদুল্লাহ ইব্ন উযায়হির আদ-
দাওসী তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ তখন খায়বারে ছিলেন। তাঁহারা সেখানে তাঁহার সহিত সাক্ষাত করেন। আমাদের নিকট বর্ণনা করা হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ তাঁহাদেরকে খায়বারের গনীমতের অংশ প্রদান করেন। অতঃপর সেখান হইতে তাঁহারা তাঁহার সহিত মদীনায় চলিয়া আসেন। তুফায়ল ইবন 'উমায়র তখন বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে ও আমার সম্প্রদায়ের লোকজনকে বিচ্ছিন্ন করিবেন না (অর্থাৎ একত্রে যেন বসবাস করিতে পারি সেভাবে অভিবাসিত করুন)। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহাদেরকে আদ-দাজ্জাক-এর কঙ্করময় প্রান্তরে অভিবাসিত করেন।
আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার স্ব-সম্প্রদায় হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া হিজরতের উদ্দেশ্যে গৃহ ত্যাগকালে বলিয়াছিলেন: يا طولها من ليلة وعناءها + على انها من بلدة الكفر نجت "কী দীর্ঘ সে রৌশনী ও তার যন্ত্রণা তবুও ভাল কুফরের দেশ থেকে জুটেছে নিষ্কৃতি
আর আবদুল্লাহ ইব্ন উযায়হির বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সম্প্রদায়ে আমার একটি বিশেষ অবস্থান ও মর্যাদা রহিয়াছে। আপনি আমাকে তাহাদের নেতা নিযুক্ত করুন। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন: وقال عبد الله بن أزيهر يا رسول الله إن لى فى قومى سطة ومكانا فاجعلني عليهم فقال رسول الله ﷺ يا أخا دوس إن الإسلام بدأ غربيا وسيعود غريبا فمن صدق الله نجا ومن آل إلى غير ذلك هلك إن أعظم قومك ثوابا أعظمهم صدقا ويوشك الحق أن يغلب الباطل.
"হে দাওসী ভাই! ইসলামের যাত্রা শুরু হইয়াছে নিঃস্বভাবে এবং অচিরেই আবার তাহা নিঃস্বতায় প্রত্যাবর্তন করিবে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে (আল্লাহর দীনকে) সত্য বলিয়া প্রত্যয়ন করিবে, সে নিষ্কৃতি পাইবে, আর যে অন্যদিকে ধাবিত হইবে বা ঝুঁকিয়া পড়িবে, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। তোমার সম্প্রদায়ের সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ প্রতিদান লাভ করিবে, যে সত্য সাধনায় শ্রেষ্ঠ হইবে। অচিরেই হক বাতিলকে পরাস্ত করিবে (তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৫৩)।
উক্ত প্রতিনিধিদলের আগমন কাহিনী হইতে প্রাপ্ত আহকাম : (১) এতদ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, মুসলমানদের রীতি বা অভ্যাস ছিল, কাহারও ইসলামে প্রবেশ করার পূর্বে তাহারা তাহাকে গোসল করাইতেন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ-এর নির্দেশও রহিয়াছে। এই ব্যাপারে বিশুদ্ধতম মত হইতেছে, কুফরী অবস্থায় জুনুবী হউক বা না হউক তাহার উপর গোসল করা ওয়াজিব।
(২) মুসলিম বাহিনীর সাহায্য যদি যুদ্ধ সমাপ্তির পূর্বে কোথা হইতেও আসে, তাহা হইলে উক্ত সাহায্যকারিগণও গনীমতের অংশ লাভ করিবে, যেমনটি অন্য গাযীরা লাভ করিবেন।
(৩) আওলিয়ায়ে কিরামের কারামত সত্য। দীনী প্রয়োজনে মুসলানদের উপকারার্থে এবং কুফর ও শয়তানের প্রভাবকে নষ্ট করার জন্য তাহা হইয়া থাকে।
(৪) আল্লাহ্ দিকে দা'ওয়াত প্রদানকালে ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে। নাফরমানদের বিরুদ্ধে বদদু'আ করার ব্যাপারে বিলম্ব করা উচিত।
প্রথমোক্ত হুকুমটি ইমাম শাফি'ঈ (র)-এর অভিমত অনুযায়ী। কেননা ইমাম শাফি'ঈর মতে গোসলের নিয়ত করা ফরয, আর কুফরী অবস্থায় নিয়তের কোনই মূল্য নাই। হানাফী মতে, গোসলের জন্য নিয়ত ফরয নহে। এইজন্য কোন ব্যক্তি যদি ইসলাম গ্রহণকালে গোসল ফরয না হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার ক্ষেত্রে গোসল মুস্তাহাব - ফরয নহে (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪১৩-৪ ও পাদটীকা উর্দুভাষা, মুফতী আযীযুর রহমান, দিল্লী ১৯৭৮ খৃ.)।
📄 বনূ আমির ইবন সা'সা'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
৭. বনূ আমির ইবন সা'সা'আ প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন
বনূ আমির গোত্রটি আসলে আরবের বিখ্যাত কায়স 'আয়লান গোত্রেরই একটি শাখাগোত্র। ঐ গোত্রে ঐ সময় তিনজন নেতা ছিল: (১) 'আমির ইব্ন তুফায়ল, (২) ইরবাদ ইবন কায়স ও (৩) জাব্বার ইব্ সুন্না। প্রথমোক্ত দুইজন ছিল নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের পাগল। আমির ইতোপূর্বেই একাধিক বিশৃংখলার হেতু হইয়াছিল এবং এইবারও কুমতলবেই নবী দরবারে আসিয়াছিল। জাব্বার এবং গোত্রের সাধারণ লোকজন একান্তই সত্যের সন্ধানে আসিয়াছিল। 'আমির মদীনায় আসিয়া সুলূল পরিবারের এক মহিলার বাড়ীতে উঠে। জাব্বার এবং বিখ্যাত সাহাবী কা'ব ইবন মালিকের মধ্যে পূর্বেই সখ্যতা ছিল। তাই তিনি তেরজন সঙ্গী-সাথীসহ তাঁহার বাড়ীতেই মেহমান হন। কা'ব (রা)-ই তাহাদেরকে লইয়া নবী-এর দরবারে উপস্থিত হন (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৩৭)।
রাসূলুল্লাহ-এর তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পর এই প্রতিনিধি দলটি আগমন করিয়াছিল। আগমনকারী আমির ও ইরবাদের উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আমির ইরবাদকে বলিয়া রাখিয়াছিল, আমরা নানা কথায় যখন মুহাম্মাদকে ভুলাইয়া রাখিব তখন সুযোগ বুঝিয়া তুমি তরবারি দ্বারা তাঁহার দফা রফা করিবে। সে মতে আবদুল্লাহ আশ-শাখায়র আবূ মুতাররিফ নামক এক ব্যক্তি কথা বলিতে শুরু করিল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে (يا سیدی) হে মনির) বলিয়া সম্বোধন করিল এবং সাথে সাথে বলিল, انت ذو الطول علينا "আপনি আমাদের মধ্যে মহাসম্মানের অধিকারী, দানবীর"। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
السيد الله لا يستهونكم الشيطان. "মনিব একমাত্র আল্লাহ্। শয়তান যেন তোমাদেরকে এইরূপ চাটুকারিতা দ্বারা উপহাসের পাত্র বানাইয়া না ফেলে” (সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ৩৭)।
'আমির কথা বলিতে গিয়া বলে, হে মুহাম্মাদ! আমাকে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ জবাবে বলিলেন: যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাহা কখন সম্ভব নহে। সে আবার বলিল, আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করি তাহা হইলে আমি কী পাইব? জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
لك ما للمسلمين وعليك ما على المسلمين "অন্য দশ মুসলমানের অধিকার ও কর্তব্য তোমার জন্যও বর্তাইবে।"
৩৫৭ সে অবার আবদার করিলঃ তাহা হইলে আপনার পরবর্তী নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব আমার জন্য নির্ধারিত করিয়া দিন! রাসূলুল্লাহ (স) জবাব দিলেন:
ليس ذاك لك ولا يقومك . "তোমাকে বা তোমার সম্প্রদায়কে তাহা দান করা সম্ভব নহে।"
এবার আমির প্রস্তাব করিল, "তাহা হইলে আপনি কি মরু এলাকা লইয়া সন্তুষ্ট থাকিবেন এবং নগরসমূহের কর্তৃত্ব আমাকে দান করিবেন" )اتجعل لى الوبر ولك المدر( ? রাসূলুল্লাহ তাহাতেও সম্মত হইলেন না। সে হুমকি দিল কী, আমাকে তাহা দিবেন না? আমি আপনার উপর চড়াও হওয়ার উদ্দেশ্যে অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর দ্বারা এই জনপদ ভরিয়া তুলিব। মদীনার প্রতিটি খেজুর গাছের সহিত একটি করিয়া ঘোড়া বাঁধিব।
জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেনঃ আল্লাহ তোমাকে সেই শক্তি দিবেন না। বর্ণনান্তরে আছে, তিনি আরও বলিয়াছিলেন: আল্লাহ্ তোমাকে প্রতিহত করিবেন )الله ينعك এইভাবে হুমকি দিয়া ঐ অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত ব্যক্তিদ্বয় প্রস্থান করিল। তখন রাসূলুল্লাহ আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন।
اللهم اكفينهما اللهم اهو بني عامر واغن الأسلام عن عامر يعني ابن الطفيل. "প্রভু! ঐ দুই বদলোকের বিরুদ্ধে আপনিই আমার জন্য যথেষ্ট হইয়া যান (পৃষ্ঠপোষকতা করুন)। হে আল্লাহ্! 'আমির গোত্রকে হিদায়াত দান করুন এবং আমির (ইব্ন তুফায়ল) হইতে ইসলামকে মুক্ত রাখুন"।
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়ার বিশদ বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ-এর সহিত আলাপ-আলোচনাকালে 'আমির এক পর্যায়ে ধূর্ততার সহিত বলে, হে মুহাম্মাদ! চলুন আমরা দুই জনে একটু একান্তে কথা বলি। এইভাবে সে বেশ কিছুক্ষণ একটু দূরে এক প্রাচীরের নিকট দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাঁহার সহিত কথা বলিতে বলিতে আরবাদ এই সুযোগে নবী করীম-কে হত্যা করিয়া ফেলিবে, এই প্রতীক্ষায় ছিল। ইরবাদ এই সুযোগটির সদ্ব্যবহার করিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য নবী-এর দরবার হইতে প্রতিনিধি দলের প্রস্থানের পর 'আমির ইরবাদকে দোষারোপ করিতে থাকে। জবাবে ইরবাদ বলিল, আল্লাহ্র কসম, যতবারই আমি তোমার নির্দেশানুসারে কাজ করিতে উদ্যত হইয়াছি, ততবারই তুমি আমার এবং ঐ লোকটির মধ্যস্থলে ঢুকিয়া পড়িয়া বাধ সাধিয়াছ। তুমি ব্যতীত অন্য কোন লোক তখন আমার দৃষ্টিগোচর হইতেছিল না। এমতাবস্থায় আমি কি তোমাকেই তরবারি দ্বারা আঘাত হানিতাম?
আরেকবার তরবারি তাক করিলাম। সাথে সাথে দেখি একটি লৌহ প্রাচীর সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে। আরেক বার তাহা করিতে গিয়া দেখি, একটি উট বিশাল হা-করিয়া আমার মস্তক গ্রাসে উদ্যত। বলাবাহুল্য, উহা ছিল রাসূলুল্লাহ-এর স্পষ্ট মু'জিযা যাহা আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণকে দিয়া থাকেন। প্রতিনিধি দলটি বাহির হইয়া গেলে 'আমির ইব্ন তুফায়ল প্লেগে আক্রান্ত হইয়া সেই সালূলী মহিলার বাড়ীতে গিয়া উঠিল। তাহার জিহ্বা ফুলিয়া ছাগীর স্তনের ন্যায় ঝুলিয়া পড়িল। শয্যাগত মৃত্যু যেহেতু আরবে নিন্দনীয় বিবেচিত হইত এইজন্য সে বলিল, আমাকে একটি অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া দাও! তারপর একটি বল্লম হস্তে অশ্বারোহী অবস্থায় সে হাক দিল:
يا ملك الموت ابرز لي.
"হে মৃত্যুদূত ফেরেশতা! আমার সহিত মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হও।” এইরূপ বলিতে বলিতে সে অশ্বপৃষ্ঠ হইতে ভূ-পাতিত হইল এবং তৎক্ষণাত মৃত্যুমুখে পতিত হইল। ঐ স্থানেই তাহাকে মাটিচাপা দেওয়া হয় (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৩৭; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১০৯-১০)।
প্রতিনিধি দলটি বনূ 'আমির ইবন সাসা'আ গোত্রে প্রত্যাবর্তন করিলে লোকজন অপর নেতা ইরবাদকে হালচাল জিজ্ঞাসা করিল। সে বলিল, মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণযোগ্য নহে। এই মুহূর্তে সম্মুখে পাইলে তীরবিদ্ধ করিয়া আমি তাঁহাকে হত্যা করিতাম। অতঃপর মাত্র দুইটি দিন অতিবাহিত না হইতেই সে যখন বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে সাথে লওয়া একটি উষ্ট্রের পিঠে আরোহণ করিয়া পথে নামিল অমনি বজ্রাঘাতে তাহার এবং বাহন উষ্ট্রের এক সাথেই দফা রফা হইল। হতভাগ্য 'আমির ও ইরবাদ তাহাদের বদ মতলবের জন্য হিদায়াত হইতে বঞ্চিতাবস্থায় ফিরিয়া স্বল্পকালের মধ্যেই নরকবাসী হইল। পক্ষান্তরে সত্য সন্ধিৎসু বনু আমির কবীলা ইসলাম গ্রহণে ধন্য হইল। এইভাবে আল্লাহ্র রাসূলের বহুল উচ্চারিত বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হইল:
من يهده الله فلا مضل له ومن يضلله فلا هادي له.
"আল্লাহ যাহাকে হিদায়াত দান করেন কেহই তাহাকে পথভ্রষ্ট করিতে পারে না, আর আল্লাহ যাহাকে পথভ্রষ্ট করেন কেহ তাহাকে হিদায়াত দিতে পারে না" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ২৯; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১০-১১)।
তাবাকাতের এই প্রসঙ্গের বর্ণনায় অতিরিক্ত আরও দুইটি রিওয়ায়াতের মাধ্যমে নাম উল্লেখ পূর্বক অপর কয়েকজনের নবী দরবারের আগমনের কথা বিবৃত হইয়াছে- যাহা সাধারণত অন্যান্য পুস্তুকে পাওয়া যায় না। সেগুলিও নিম্নে প্রদত্ত হইল:
আলকামা ইন্ন উলাছা ইব্ন আওফ (ইবনুল আরওয়াস ইব্ন জা'ফার ইন কিলাব) এবং হাওযা ইব্ন খালিদ ইবন রাবী'আ ও তাঁহার পুত্র একদা নবী দরবারে উপস্থিত হইলেন। হযরত উমার (রা) তখন তাহার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে বলিলেন, একটু সরিয়া আল-কামাকে বসিতে দাও। হযরত উমার (রা) একটু নড়িয়া চড়িয়া আলকামাকে বসাইলেন। তিনি তাহার পাশে আসন গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহার নিকট ইসলামী শারীআতের বিধানসমূহ বর্ণনা করিলেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেন। তখন আলকামা বলিয়া উঠিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রভু অত্যন্ত মহৎ সদাশয়। আমি আপনার প্রতি ঈমান আনয়ন করিলাম। আমি কায়স বংশীয় ইকরিমা ইন্ন খাসাফার শর্তে আপনার নিকট বায়'আত হইতেছি। হাওযা এবং তাঁহার পুত্রও অনুরূপ শর্তে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইবন সা'দ আরও বলেন: হিশাম ইব্ন মুহাম্মাদ, ইবরাহীম ইবন ইসহাক আল-আবদী, হাজ্জাজ ইব্ন আরতাত, আওন ইব্ন আবী জুহায়ফা আস-সাওয়াঈ তদীয় পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন: বনূ আমির প্রতিনিধি দল যখন নবী দরবারে আগমন করে, তখন আমিও তাহাদের সহিত ছিলাম। আমরা তাহাকে আবতাহ প্রান্তরে একটি লাল বর্ণের গম্বুজাকৃতির
তাঁবুর মধ্যে গিয়া পাইলাম এবং সালাম দিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কাহারা হে? আমরা জবার দিলাম, আমরা 'আমির ইবন সা'সা'আ গোত্রের লোক। তিনি বলিলেন : مرحبا بكم انتم مني وانا منكم.
"তোমাদিগকে স্বাগতম! তোমরা আমারই লোক এবং আমি তোমাদেরই লোক।"
এমন সময় নামাযের ওয়াক্ত হইলে বিলাল (রা) ঘুরিয়া ঘুরিয়া আযান দিতে শুরু করিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য একটি পাত্রে করিয়া উযূর পানি লইয়া আসিলেন। তিনি উযূ সারিলেন। তাঁহার অবশিষ্ট পানির দ্বারা আমরাও উযূ করিলাম। বিলাল (রা) ইকামত দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদিগকে লইয়া দুই রাকআত সালাত আদায় করিলেন। তারপর আসরের ওয়াক্ত হইলে পুনরায় বি Bilal (রা) ঘুরিয়া ঘুরিয়া আযান দিতে লাগিলেন। আবার রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদিগকে লইয়া দুই রাকআত সালাত আদায় করিলেন (বলা বাহুল্য, ঐ সময় ঐ সালাত দুই রাকাত পড়ারই বিধান ছিল। পরবর্তী কালে আরও বর্ধিত দুই রাকআতসহ চার রাকআত করিয়া ঐ নামাযসমূহ আদায়ের বিধান প্রবর্তিত হয় (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১১)।
ইব্ন খালদুন বনূ আমিরের প্রতিনিধিদলের সদস্যসংখ্যা ১০ জন ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন এবং তাহাদের নবী ﷺ দরবারে উপস্থিতির সময় নির্ধারণ করিয়াছেন দশম হিজরীর রমযান মাস- যেই মাসে বনূ গাস্সানের প্রতিনিধিদলও নবী ﷺ-এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল (তারীখ ইব্ন খালদুন, ২খ., ৩য় ভাগ, পৃ. ২৩০; শায়খ মুহাম্মাদ ইসমাঈল পানিপথী, ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, পৃ. ২৫৮)।
📄 বনূ আমিরের অভিশপ্ত নেতাদের ব্যাপারে আল-কুরআনের আয়াত নাযিল হয়
আল্লাহ্র রাসূলের প্রাণ সংহারের মত মারাত্মক উদ্যোগ আদৌ কোন উপেক্ষণীয় ব্যাপার ছিল না। বনূ 'আমিরের ঐ দুর্বৃত্ত নেতাদের সম্পর্কে তাই আল-কুরআনের আয়াত নাযিল হইয়াছে। ইবন হিশাম বলেন, যায়দ ইব্ন আসলাম বর্ণনা করেন 'আতা ইব্ন য়াসার হইতে, তিনি বর্ণনা করেন হযরত ইব্ন আব্বাস (র) হইতে। তিনি বলেন: আল্লাহ তা'আলা 'আমির ও ইরবাদ সম্পর্কে নাযিল করিয়াছেন:
اللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَحْمِلُ كُلُّ أُنْثَى وَمَا تَغِيضُ الْأَرْحَامُ وَمَا تَزْدَادُ وَكُلُّ شَيْءٍ عِنْدَهُ بِمِقْدَارٍ، عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ الكَبِيرُ الْمُتَعَالِ. سَوَاءٌ مِّنْكُمْ مِّنْ أَسَرَّ الْقَوْلَ وَمَنْ جَهَرَبِهِ وَمَنْ هُوَ مُسْتَخْفِ بِالَّلْيِلِ وَسَارِبُ بِالنَّهَارِ. لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللهِ.
"প্রত্যেক নারী যাহা গর্ভে ধারণ করে এবং জরায়ুতে যাহা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ্ তাহা জানেন এবং তাঁহার বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে। যাহা অদৃশ্য ও যাহা দৃশ্যমান তিনি তাহা অবগত; তিনি মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান। তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন রাখে অথবা যে উহা প্রকাশ করে, রাত্রিতে যে আত্মগোপন করে এবং দিবসে যে প্রকাশ্যে বিচরণ
করে, তাহারা সমভাবে আল্লাহ্ জ্ঞানগোচর। মানুষের জন্য তাহার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে। উহারা আল্লাহ্র আদেশে তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করে" (১৩:১১-১২)।
এখানে তাহার জন্য বলিতে মুহাম্মাদের জন্য প্রহরী থাকা এবং তাহার রক্ষাণাবেক্ষণের কথা বুঝানো হইয়াছে। তারপর ইরবাদ ও তাহার নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করিয়া বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَاِذَا اَرَادَ اللهُ بِقَوْمٍ سُوْمًا فَلاَ مَرَدَلَهُ وَمَا لَهُمْ مِنْ دُوْنِهِ مِنْ وَّالَ: هُوَ الَّذِيْ يُرِيْكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثَّقَالَ. وَيُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيْفَتِهِ وَيُرْسِلُ الصَّوَاعِقَ فَيُصِيْبُ بِهَا مَنْ يَّشَاءُ وَهُمْ يُجَادِلُوْنَ فِى اللهِ وَهُوَ شَدِيْدُ الْمِحَالِ.
"কোন সম্প্রদায়ের সম্পর্কে যদি আল্লাহ্ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন তবে তাহা রদ হইবার নহে এবং তিনি ব্যতীত উহাদের কোন অভিভাবক নাই। তিনিই তোমাদেরকে দেখান বিজলী ভয় ও ভরসা সঞ্চার করান এবং তিনিই সৃষ্টি করেন ভারী মেঘ। বজ্রধ্বনি তাঁহার সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে, ফেরেশতাগণও করে তাঁহার ভয়ে। তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা উহা দ্বারা আঘাত করেন। আর উহারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতণ্ডা করে, অথচ তিনি মহাশক্তিশালী" (১৩ : ১১-১৩)।
আল্লামা ইব্ন কাছীর আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে 'আমির ও ইরবাদের নবী দরবারে হাযির হওয়ার প্রসঙ্গে আলোচনায় সনদসহ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে তাঁহার তাফসীর গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করিয়াছেন যে, ঐ আয়াতগুলি ঐ প্রসঙ্গেই নাযিল হয়।
ঐ প্রসঙ্গে বাড়তি আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, নবী দরবার হইতে বাহির হইয়া তাহারা যখন হারাতুল ওয়াকিম প্রান্তরে উপস্থিত হইল এবং পূর্বোক্তরূপ বলাবলি করিতেছিল তখন সাহাবী সা'দ ইব্ন মু'আয ও উসায়দ ইব্ন হুদায়র (রা) তাহাদের পরে পরেই সেখানে উপস্থিত হইয়া তাহাদেরকে আল্লাহ্ শত্রু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া তাহাদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করেন। তারপর যখন তাহারা সেখান হইতে রওয়ানা হইল তখন পথিমধ্যেই ইরবাদ বজ্রপাতে এবং 'আমির কণ্ঠনালীতে টিউমার বা গলগণ্ডে আক্রান্ত হইয়া নরকবাসী হয়। কিন্তু তাহাদের সম্প্রদায় নবী কারীম -এর দু'আর বরকতে হিদায়াতপ্রাপ্ত হইয়াছিল—যাহার বর্ণনা পূর্বেই দেওয়া হইয়াছে (আল-বিদয়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫৮-৬০)।
📄 বনূ হারিছ ইব্ন কা'বের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন
৮. বনু হারিছ ইব্ন কা'বের নবী -এর দরবারে আগমন
ইহা নাজরানের একটি গণ্যমান্য গোত্র ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ নবম হিজরীর রবীউল আখির বা জুমাদাল উলা মাসে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-কে চারিশত সঙ্গীসহ নাজরানের বনূ হারিছ ইব্ন কা'বের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তিনি তাহাকে নির্দেশ দেন যে, যুদ্ধের পূর্বে তিনি তিনবার তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবেন। ইহাতে যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ কর তবে তুমি তাহা মানিয়া লইও, অন্যথায় তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে।
হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ নাজরানে পৌছিয়া তাঁহার পক্ষ হইতে দুইজন অশ্বারোহীকে এই বলিয়া গোত্রের মধ্যে প্রেরণ করিলেন যে, লোক সকল! ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপত্তা লাভ করিবে। ইহাতে ফলোদয় হইল। গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল। হযরত খালিদ তাহাদের মধ্যে অবস্থান করিয়া তাহাদেরকে ইসলামের বিধান এবং কুরআন-সুন্নাহ্ শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করিলেন এবং বিলাল ইবনুল হারিছ আল-মুযানীকে বানূল হারিছ গোত্রীয়দের তাৎক্ষণিকভাবে ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিয়া নবী দরবারে মদীনায় প্রেরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ জবাবে তাহাকে লোকজনের মদ্যে ঘৃণার উদ্রেক না করিয়া তাহাদেরকে ইসলামের সুফল ব্যাখ্যা করিয়া সুসংবাদ দান করার এবং তাহাদের একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিবার জন্য নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর আদেশটি ছিল এইরূপ:
فبشرهم وانذرهم واقبل وليقبل معك وفدهم.
"তাহাদেরকে সুসংবাদ দিবে, সতর্ক করিবে, তারপর চলিয়া আসিবে এবং তাহাদের একটি প্রতিনিধি দল তোমার সাথে আসিবে" (দ্র. তাবারী, তারীখ, ৩খ., পৃ. ১২৭)।
সেমতে হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ তাহাদের একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে লইয়া নবী কারীম-এর দরবারে উপস্থিত হন। তাবাকাতে ইবন সা'দে তাঁহাদের আগমন দশম হিজরীর রাবীউল আওয়াল মাসে হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে (ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, পৃ. ৩৬২, ই. ফা., ২০০৪ খৃ.)।
কায়স ইবন হুসায়ন যুল-গুস্সা, ইয়াযীদ ইব্ন মুহাজ্জাল, ইয়াযীদ ইব্ন আবদিল মাদান, শাদ্দাদ ইব্ন আবদুল্লাহ প্রমুখ গোত্রীয় নেতাগণ ঐ প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তাহাদেরকে দেখিয়াই রাসূলুল্লাহ বলিলেন:
من هؤلاء القوم الذين كأنهم رجال الهند ؟
"ইহারা কোন গোত্রের লোক? ইহাদেরকে যে ভারতীয় বলিয়া মনে হইতেছে"।
জবাবে তাহারা বলিলেন, আমরা বানূল হারিছ গোত্রীয় ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই।
বানূল হারিছ গোত্র ছিল আরবের একটি অপরাজেয় গোত্র। অন্যান্য গোত্রের সহিত যুদ্ধবিগ্রহে প্রায়ই তাহাদের জয় হইত। তাই নবী কারীম তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের এই দুর্দম শক্তির উৎস কি? জবাবে তাহারা বলিলেন: * আমরা সর্বদা একতাবদ্ধ থাকি- দলাদলি ও আত্মকলহে লিপ্ত হই না। * পরস্পর হিংসাবিদ্বেষে লিপ্ত হই না। * কাহারও প্রতি অত্যাচার করি না বা গায়ে পড়িয়া যুদ্ধের সূত্রপাত করি না। * সংকটকালে ধৈর্য ধারণ করি।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন: "তোমাদের বক্তব্য যথার্থ।” তিনি কায়স ইব্ন হুসায়নকে তাহাদের নেতারূপে মনোনীত করেন এবং তাহাদের প্রস্থানের পর তাহাদেরকে শিক্ষাদান এবং ঐ অঞ্চলের যাকাত-সাদাকাত উগুলের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তাঁহাকে প্রেরণকালে তিনি যাকাতের
বিধান সম্বলিত একটি দীর্ঘ পত্রও সাথে দেন- রাসূলুল্লাহ-এর পত্রাবলীর আলোচনায় তাহা দেখা যাইতে পারে।
উক্ত প্রতিনিধি দলটি শাওয়াল বা যী-কা'দা মাসে স্ব-গোত্রে প্রত্যাবর্তনের পর চার মাস অতিক্রান্ত না হইতেই নবী কারীম ইন্তিকাল করেন। তাঁহার উপর আল্লাহ্র অফুরন্ত রহমত বর্ষিত হউক (যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩৩; সীরাতুন্নবী, ইব্ন হিশামের বাংলা ভাষ্য, ই. ফা., ১৯৯৬ খৃ., ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫৮-৬১)।