📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


৪. হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
মক্কা বিজয়ের পর সর্বপ্রথম যে প্রতিনিধি দলটি নবী (স) দরবারে উপস্থিত হয় তাহারা ছিল নয় সদস্যবিশিষ্ট হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধি দল। রাসূলুল্লাহ তখন মক্কা বিজয় ও তায়েফ অবরোধ সমাপ্ত করিয়া বিপুল গনীমত সম্ভারসহ জি'ইররানায় আসিয়া তাঁবু গাড়িয়াছেন। ছয় হাজার বন্দী, চব্বিশ হাজার উট, চল্লিশ হাজার মেষ, ছাগল, চার হাজার উকিয়া রৌপ্য তখন তাঁহার বিজিত গনীমত-সম্ভারে মওজুদ। ১০-১২ দিন পর্যন্ত তিনি সেখানে পরাজিত হাওয়াযিন গোত্রের লোকদিগকে মুক্ত করিবার জন্য লোক আসিবে ভাবিয়া অপেক্ষা করিলেন। কিন্তু তাহাদের কেহই আর আসিল না। অবশেষে তিনি ঐ গনীমত সম্ভার বিধি মুতাবিক যোদ্ধৃগণের মধ্যে বিতরণ করিয়া দিলেন (ফাতহুল-বারী, ৮খ., পৃ. ৩৮; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৯৩)।
উল্লেখ্য, রাসূলুল্লাহ-এর ধাত্রীমাতা হালীমা সা'দিয়া উক্ত গোত্রের মহিলা ছিলেন। হাওয়াযিন গোত্রের উক্ত প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন যুহায়র ইবন সুরাদ সা'দী জুশামী এবং
তাহার অপর এক সঙ্গী ঐ হিসাবে ছিলেন রাসূলুল্লাহ-এর দুগ্ধ-চাচা। দলপতি দাঁড়াইয়া করুণ কণ্ঠে আহ্বান জানাইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ বন্দীদের মধ্যে আপনার খালা-ফুফু প্রতিপালনকারীনিগণ রহিয়াছেন, যাহারা একসময় আপনাকে কোলে-পিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছেন। আমরা যদি হারিছ গাস্সানী বা নু'মান ইব্‌ন মুনযিরকেও দুগ্ধ পান করাইয়া থাকিতাম তবে তাহাদের নিকটও এমন বিপদের সময় মঙ্গলের আশা করিতে পারিতাম। আপনি তো মানবকুল শ্রেষ্ঠ! আপনার নিকট আমাদের প্রত্যাশা অনেক বড়। এই সময় তাঁহার করুণাদৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া কবিতার ছন্দে তাহারা নিবেদন করেন। যে বাঞ্ছিত অপরূপ ভাষা লালিত্যের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তদীয় শ্রেষ্ঠ নবীকে ঐ বংশে শৈশবে লালন-পালনের কুদরতী ব্যবস্থা করিয়াছিলেন তাহাদের অনবদ্য কবিতার বঙ্গানুবাদ কাব্যে করা সুকঠিন। তবুও সাহসে বুক বাধিয়া এই দীন লেখক নিচে তাহার কাব্যানুবাদ পেশ করিল।
امتن علينا رسول الله في كرم فانك المرأ نرجوه ومنتظر امنن على بيضة قد عاقها قدر ممزق شملها في دهرها غير ابقت لنا الدهر هتانا على خوف على قلوبهم الغماء والمغمر ان لم تداركهم نعماء تنشرها يا ارجح الناس حلما حين تختبر امين على نسوة قد كنت ترضعها اذ فوك تملوها من كضها الدرر لا تجعلنا كمن سالت نعامته واستبق منا فانا معسر زهر انا لنشكر للنعماء اذ كفرت وعندنا بعد هذا اليوم مدخر فالبس العفو ترضعه من امهاتك ان العفو مشتهر عند الهياج اذا ما استوقد الشرر يا خير من مرحت كمت الجياد به انا نؤمل عفوا منك تلبسه هدى البرية اذ تعفوا وتنتصر يوم القيامة اذ يهوى لك الظفر فاغفر عفا الله عما انت راهبه
আমাদের প্রতি সদয় হোন হে রাসূল আল্লাহ্! আশার আধার! অবসান হোক মোদের প্রতীক্ষার। ভাগ্য বঞ্চনা যে কওমেরে করিয়াছে বঞ্চিত হতাশ যুগচক্র আবর্তনে সবকিছু যার হয়েছে বিনাশ তাদেরে করুন দয়া (পায় যেন বাঁচার আশ্বাস) কালচক্র আমাদের করিয়াছে শিকার হতাশার, অন্তরে ছড়িয়ে আছে, বিষাদ বিদ্বেষ হাহাকার। বিশ্ব-শিশুকুলে তুমি সর্বশ্রেষ্ট পসন্দের জন মানব কুলের তুমি নির্যাস (কুসুমের সুগন্ধি যেমন)। সহিষ্ণুতা পরীক্ষিত যার সেই শ্রেষ্ঠ সুজন দয়া তব সহায় না হলে আমাদের নিশ্চিত মরণ। যেসব নারীর শিরা/সিঞ্চিত দুধে ভরিয়াছে মুখ আপনার
শৈশবে। তাদের প্রতি সদয় হোন হে সাগর দয়ার। ধ্বংস যারা হয়ে গেছে আমাদের করিও না তাদের মতন বাঁচিয়ে রাখুন মোদের নহি মোরা কৃতজ্ঞ কুজন। আমরা স্মরণ রাখি লোকে যবে করে বিস্মরণ আজকের পরেও মোরা/মহত্ত্বের কথা তব/করিব কীর্তন। যে মায়েরা একদিন আপনারে করেছে স্তন্য দান মুছে দিক তাদের দুঃখ আপনার ক্ষমা অফুরান দিক দিগন্তে প্রচারিত যে ক্ষমার সুনাম-বাখান। যুদ্ধের জ্বলন্ত শিখা প্রজ্বলিত যবে রণাঙ্গণে 'কামীত' অশ্বেরা চাঙ্গা হয় যার স্পর্শ-আরোহণে হে সেই মহান সত্তা তব কাছে আমাদের আশা ক্ষমা ও সাহায্য পাবো দূর হবে তাবৎ হতাশা সনির্বন্ধ অনুরোধ/নিজ গুণে আমাদেরে করুন মার্জনা ভয়ঙ্কর কিয়ামতে আপনারে ক্ষমিবেন আল্লাহ্ রব্বানা আপনার সাফল্যে আমরা করিব প্রার্থনা।
(আর-রাওদুল উনুফ, ২খ., পৃ. ৩০৬; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ.১৯৬; যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩)।
আল্লাহ্র রাসূল তাহাদের জবাবে বলিলেন, আমি তোমাদের জন্য অনেক অপেক্ষা করিয়াছি। এখন তো সমস্ত গণীমত-সম্ভার ভাগবণ্টন হইয়া গিয়াছে। দুইটি বিষয়ের একটি তোমাদেরকে মানিয়া লইতে হইবে। হয় তোমরা বন্দীদিগকে ফেরত লও, নতুবা অন্যান্য ধন-সম্পদ। এখন তোমরাই বল, কোনটাকে তোমরা অগ্রাধিকার দিবে। তাহারা জবাব দিলেন, আমরা আমাদের বন্দীদিগকেই ফেরত চাই, উট-বকরী পশুপালের দাবি আমরা করিব না।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন, আমার এবং বনু হাশিম, বনূ মুত্তালিবের অংশে যেসব বন্দী পড়িয়াছে সেগুলি তোমরা লইয়া যাও। কিন্তু অন্যান্য মুসলমানের ভাগের বন্দীদের ব্যাপারে আগামীকাল যুহরের নামাযের পর তোমরা দাঁড়াইয়া আবেদন জানাইবে। আমি তোমাদের পক্ষে সুপারিশ করিব (অর্থাৎ সুপারিশের দ্বারা যাহারা খুশীমনে নিজেদের ভাগের বন্দীদেরকে ছাড়িয়া দিবে তাহাদেরকে তোমরা ফেরত লইয়া যাইতে পারিবে। বলপূর্বক কাহারও নিকট হইতে বন্দী কাড়িয়া লইয়া দেওয়ার দায়িত্ব আমি গ্রহণ করিব না)।
পর দিন সত্যসত্যই বনূ হাওয়াযিন গোত্রের বক্তাগণ প্রাঞ্জল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তাহাদের বন্দীদিগকে ফেরত দানের ফরিয়াদ জানাইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ খুতবা দিতে দণ্ডায়মান হইয়া বলিলেন,
"তোমাদের এই ভাই হাওয়াযিনগণ মুসলমান হইয়া তোমাদের নিকট উপস্থিত। আমি আমার নিজের এবং নিজবংশ (বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিব)-এর ভাগের বন্দীদিগকে ইতোমধ্যেই মুক্ত করিয়া দিয়াছি। আমি মনে করি, অন্যান্য মুসলমানদেরও উচিত তাহাদের বন্দীদিগকে মুক্ত করিয়া দেওয়া। যে ব্যক্তি খুশীমনে তাহা করিবে, তাহা তাহার জন্য উত্তম হইবে। নতুবা পরবর্তী কালে আমি উহার বিনিময় দান করিতে প্রস্তুত।"
সকলেই খুশীমনে নিজ নিজ অধিকারভুক্ত বন্দীদিগকে মুক্ত করিয়া দিলেন। এইভাবে দেখিতে দেখিতে ছয় হাজার বন্দী মুক্ত হইয়া গেলেন (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ২৬)।
হাওয়াযিন প্রতিনিধিগণ যে বলিয়াছিলেন, এই বন্দীদের মধ্যে আপনাকে কোলে-পিঠে করিয়া যেসব মহিলা শৈশবে প্রতিপালন করিয়াছিলেন তাহারাও রহিয়াছেন, উহা মিথ্যা ছিল না। রাসূলুল্লাহ -এর দুধবোন অর্থাৎ ধাত্রীমাতা হালীমার কন্যা শায়মাও ঐ বন্দীদের মধ্যে ছিলেন। সাধারণ বন্দীদের মত আচরণ করিয়া মুসলমানগণ যখন তাহাকে টানিয়া হেঁচড়াইয়া লইয়া যাইতেছিল, তখন তিনি আপন পরিচয় ব্যক্ত করিয়া বলিলেন, ওহে! আমি কিন্তু তোমাদের নবীর ভগ্নি! অর্থাৎ আমার সহিত যেনতেন আচরণ মোটেই শোভনীয় নহে। তখন লোকজন তাহাকে নবী-দরবারে নিয়া উপস্থিত করিল।
শায়মা অগ্রসর হইয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি তোমার দুধ-বোন শায়মা। রাসূলুল্লাহ তাহাকে উহার কোন প্রমাণ দিতে বলিলে তিনি বলিলেন, প্রমাণ আছে বৈকি! ঐ দেখ, শৈশবে তুমি আমাকে কামড় দিয়া দাঁত বসাইয়া দিয়াছিলে, এখনও উহার চিহ্ন রহিয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ তাহা সনাক্ত করিতে পারিলেন এবং মারহাবা বলিয়া তাহাকে স্বাগতম জানাইলেন। নিজের গায়ের চাদর তাহার সম্মানার্থে বিছাইয়া দিলেন। আনন্দে তাঁহার চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। শৈশবের কত স্মৃতি তাঁহার পবিত্র মনে জাগরুক হইয়া উঠিয়াছিল কে জানে! হাঁ, এই শায়মাই তো তাঁহাকে ছড়া কাটিয়া ঘুম পাড়াইতেন। কোলে দুলাইয়া আদর করিতেন। তিনিই তো মাতৃস্নেহে ভগ্নিস্নেহে তাঁহাকে দীর্ঘ কয়েকটি বৎসর লালন-পালন করিয়াছেন। মুহূর্তে তাঁহার অন্তর উদ্বেলিত হইয়া উঠিল।
আল্লাহ্র রাসূল অতীব সম্ভ্রমের সহিত তাঁহার দুধ-ভগ্নিকে বলিলেন, বুবুজান! আপনি যদি আমার সহিত থাকিতে চান আপনাকে পরম যত্নে ও সম্মানে রাখা হইবে। আর যদি নিজ সম্প্রদায়ের নিকটই চলিয়া যাইতে চান, তবে তাহাও আপনার মর্জি। শায়মা নিজ সম্প্রদায়ের নিকট চলিয়া যাইবার আগ্রহ ব্যক্ত করিলেন। তিনি এই সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে কয়েকটি উট-বকরী, তিনটি দাস এবং একটি দাসী উপঢৌকনস্বরূপ দান করিয়া সসম্মানে তাঁহাকে বিদায় করিলেন। প্রায় ষাট বৎসর পূর্বের মধুর স্মৃতি মন্থন করিতে করিতে শায়মা আবার তাঁহার মরু প্রান্তরের আবাসে ফিরিয়া গেলেন। দুধ-ভগ্নির প্রতি আল্লাহ্র রাসূলের ভক্তি ও প্রীতিপূর্ণ আচরণ বিশ্বমানবের জন্য এক অনুপম আদর্শরূপে চিরভাস্বর হইয়া রহিল (আল-ইসাবা, ৪খ., পৃ. ৩৪৪; শায়মা প্রসঙ্গের আলোচনা)।
এইভাবে হাওয়াযিন প্রতিনিধিগণ সকল দৌত্যকর্ম সম্পাদন করিয়া নিজেদের বন্দী পুত্র-কন্যাগণকে লইয়া স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করিলেন। নবী কারীম অনুরোধে যাহারা বিনিময় প্রাপ্তির আশায় বন্দীমুক্তি করিয়াছিলেন, তাহাদেরকে প্রতিটি বন্দীর মুকাবিলায় পূর্ণ প্রতিশ্রুতি অনুসারে ছয়জন করিয়া দাস-দাসী দেওয়া হইয়াছিল।
নবী -এর দরবারে হাওয়াযিন-নেতা মালিক ইব্‌ন আওফের আগমন ও উপঢৌকন লাভ: হাওয়াযিন গোত্রের নবী দরবারে আগমনের বর্ণনায় আল্লামা ইব্‌ন কাছীর হুনায়ন যুদ্ধের কাফির পক্ষের নায়ক হাওয়াযিন-নেতা মালিক ইবন 'আওফ নাস্ত্রীর ইসলাম গ্রহণ ও নবী কারীম -এর নিকট হইতে প্রচুর উপঢৌকন লাভের বিবরণ বিবৃত করিয়াছেন। ইব্‌ন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ হাওয়াযিন প্রতিনিধিদের নিকট জিজ্ঞাসা করেন, মালিক ইব্‌ন আওফ কী করিতেছে? তাহারা জানান, সে তায়েফে ছাকীফ গোত্রের সহিত অবস্থান করিতেছে।
তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: তাহাকে সংবাদ দাও, সে যদি ইসলাম গ্রহণ করিয়া আমার নিকট আসে তবে তাহার হৃত পরিবারবর্গ ও ধন-সম্পদ তাহাকে প্রত্যর্পণ করা হইবে। অতিরিক্ত আরও এক শতটি উট তাহাকে দান করা হইবে।
এই সংবাদ পাওয়ামাত্র মালিক ইব্‌ন আওফ দ্রুত ছাকীফ গোত্র হইতে বাহির হইয়া জিইরানায় বা মক্কায় রাসূলুল্লাহ-এর নিকট উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ তাহার পরিবারের বন্দীগণকে এবং তাঁহার ধন-সম্পদ ফিরাইয়া দিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলমানের জীবনই অতিবাহিত করেন। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ ঐ সময় তাহাকে তাহার কওমের নওমুসলিমগণের এবং পার্শ্ববর্তী ছুমালা, সালমা ও ফার্ম গোত্রের নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ যখন তাহাকে এক শত উট দান করিলেন তখন তিনি কবিতায় তাঁহার প্রশংসা করেন এই ভাবে:
ما ان رأيت ولا سمعت بمثله في الناس كلهم بمثل محمد ومتى تشاء يخبرك عما في غد اوفى واعطى للجزيل اذا جبدى واذا الكتيبة عردت انيابها بالسموى وضرب كل مهند فكانه ليث على اشباعه وسط الهباءة خادر في مرصد
"দেখি নাই কভু শুনি নাই কভু তাঁর মত কেউ হয় মানব জাতিতে তুল্য কেহই মুহাম্মাদের নয় দানের হস্ত প্রসারিত তাঁর করেন পূর্ণ দান ভবিষ্যতের খবর দেবেন যদি কেউ তাহা চান যখন পূর্ণ সৈন্যবাহিনী বর্শা ও তলোয়ারে সজ্জিত হয়ে উট-ঘোড়া চড়ে দাপট মহড়া করে সিংহসম দাঁড়ান তখন শাবকের হেফাযতে বিবরের মুখে কেশর দুলিয়ে (হটেন না কোন মতে)। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ.৩৬০, হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের আলোচনা প্রসঙ্গে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী (সা)-এর দরবারে আশ'আরী প্রতিনিধি দলের আগমন

📄 নবী (সা)-এর দরবারে আশ'আরী প্রতিনিধি দলের আগমন


৫. নবী-এর দরবারে আশআরী প্রতিনিধি দলের আগমন
আশ'আরীগণ ইয়ামানের সম্মানিত অভিজাত গোত্র। তাঁহাদের পূর্বপুরুষ আশ'আর প্রচুর লোমশ দেহসহ জন্মগ্রহণ করায় তাহার নাম রাখা হয় আশ'আর বা অতিরিক্ত লোমশ। আবূ মূসা আশ'আরী (রা) ঐ গোত্রের লোক ছিলেন (মওলানা ইদ্রীস কান্ধলভী, সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১১৫)।
রাসূলুল্লাহ-এর আবির্ভাবের সংবাদ পাইয়া উক্ত গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ইমাম বুখারী (র)-এর উদ্ধৃত হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা)-এর বর্ণনা এইরূপ: আমরা যখন ইয়ামানে ছিলাম তখন রাসূলুল্লাহ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সংবাদ আমাদের নিকট পৌঁছে। তাই আমরা তাঁহার নিকট গমনের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়ি। আমার আরও দুই ভাই ছিল। তাহাদের একজনের নাম আবূ বুরদা এবং অন্যজনের নাম আবূ রুহম।
আমি ছিলাম সকলের কনিষ্ঠ। আমরা ৫২ বা ৫৩ জন অভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক ছিলাম। আমরা নৌযানে আরোহণ করিলাম। নৌযানে আমরা হাবশার বাদশাহর দরবারে গিয়া পৌছিলাম। মওলানা শিবলী নু'মানী এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, প্রতিকূল বাতাসের দরুন তাহাদের জাহাজ আবিসিনিয়া উপকূলে গিয়া ভিড়িয়াছিল। অর্থাৎ আবিসিনিয়া তাহাদের উদ্দিষ্ট মনযিল ছিল না (মওলানা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ২খ., পৃ. ৪০)।
বুখারীর ঐ রিওয়ায়াতে আবূ মূসা (রা) আরও বলেন, আমরা নাজাশী বাদশাহর দরবারে গিয়া পৌঁছিলাম। জা'ফার ইবন আবী তালিবের সহিত দীর্ঘদিন আমরা সেখানে অবস্থান করিলাম। পরে আমরা সকলে একত্রে রওয়ানা হইয়া 'খায়বার বিজয়কালে রাসূলুল্লাহ -এর সহিত আসিয়া মিলিত হইলাম। কিছু সংখ্যক লোক আমাদের নৌযান আরোহিগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিল, আমরা তোমাদের পূর্বে হিজরত করিয়াছি। সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ-এর নিকট তোমাদের তুলনায় অধিক অগ্রগণ্য। এ বাক্যটি ছিল হযরত উমারের যাহা তিনি আসমা বিন্ত উমায়সকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন। আসমা ইহাতে অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হন এবং প্রতিবাদ করিয়া বলেন, কখনও তাহা হইতে পারে না। আল্লাহর কসম, আপনারা আল্লাহ্র রাসূলের সঙ্গে ছিলেন। তিনি আপনাদের মধ্যকার ক্ষুধার্তদিগকে আহার্য দান করিতেন। আপনাদের অজ্ঞদিগকে জ্ঞান দান করিতেন। পক্ষান্তরে আমরা ছিলাম সুদূর প্রবাসে অপরিচিত পরিবেশে। কেবল আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যই ছিল আমাদের সেই প্রবাসী জীবনের বিড়ম্বনা বরণ। আল্লাহ্র কসম, যতক্ষণ না আমি উহা রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে উত্থাপন করি ততক্ষণ আমি কোন কিছু পানাহার করিব না। যখন রাসূলুল্লাহ (স) তাশরীফ আনিলেন তখন তিনি তাহাদের উভয়ের বক্তব্য হুবহু তাঁহাকে অবহিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলে তাহাদের উভয়ের এইরূপ কথোপকথনের কথা স্বীকার করিলেন। তখন আল্লাহ্র রাসূল আসমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমাদের চেয়ে অন্য কেহই আমার নিকট অধিকতর প্রিয় বা অগ্রগণ্য নহে। তাহার (উমারের) এবং তাহার সাথিগণ একটি হিজরতের অধিকারী আর নৌযানে ভ্রমণকারী তোমরা হইতেছ দুই দুইটি হিজরতের অধিকারী।
আসমা (রা) বলেন, অতঃপর আবূ মূসা এবং অন্যান্য নৌযান ভ্রমণকারী প্রায়ই আমার নিকট আসিয়া এই কথোপকথন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতেন। তাহাদের নিকট পৃথিবীর অন্য কিছুই আল্লাহ্র রাসূল -এর ঐ উক্তির ন্যায় এত আনন্দদায়ক ও তাৎপর্যবহ ছিল না (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৪৪৩; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪৮৪-৭)।
অনুরূপ ইমাম মুসলিম (র)-ও আবূ উসামা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম বুখারী ইসহাক ইবন ইবরাহীম (র)-আবূ মূসা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, খায়বার বিজয়ের পর আমরা রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে উপস্থিত হইলাম। তিনি আমাদিগকে গনীমতের অংশ দান করিলেন। কিন্তু আমাদের ব্যতীত অন্য কাহাকেও তিনি এইরূপ (যুদ্ধে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও গনীমতের) অংশ প্রদান করেন নাই। আবূ দাউদ এবং তিরমিযীও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩৬৮-৬৯)।
সহীহ বুখারীতে হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর রিওয়ায়াতে বর্ণিত হইয়াছে, আশ'আরীদের আগমন উপলক্ষে রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন:
أتاكم اهل اليمن هم ارق أفئدة والين قلوبا .
৩৫৩ "তোমাদের নিকট ইয়ামানবাসিগণ আসিতেছেন। উহারা অত্যন্ত কোমল অন্তরের ও নরম হৃদয়ের অধিকারী।"
মুসনাদে আহমাদ ইবন হাম্বল গ্রন্থে হযরত আনাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে, আশ'আরী প্রতিনিধিদল আগমনের সময় পরম আনন্দে তাহারা গাহিয়া উঠিলেন:
غدا نلقى الاحبه محمدا وحزبه .
"আগামী কাল সাক্ষাত হবে আমাদের সনে, হেরিব আমরা মুহাম্মাদ ও তাঁহার সঙ্গীগণে"। নবী দরবারে উপনীত হইয়া তাহারা আরয করিলেন, আমরা আপনার দরবারে উপস্থিত হইয়াছি দীনের কিছু বিধান শিক্ষার এবং সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ বলিলেন: সর্বপ্রথম একমাত্র আল্লাহই ছিলেন, অন্য কিছুর অস্তিত্বই ছিল না। তাঁহার আসন ছিল পানির উপর" (সহীহ বুখারী)।
আবদুর রউফ দানাপুরী (র) বলেন: হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) তাঁহার সাথীবর্গসহ হযরত জা'ফার সমভিব্যাহারে খায়বারে নবী দরবারে আগমনের সময়টি ছিল সপ্তম হিজরী সন। কিন্তু নবম হিজরীতে প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের বৎসরে আশ'আরী প্রতিনিধি দলের আগমন এবং রাসূলুল্লাহ-এর তাঁহাদের প্রশংসা সূচক উক্তি الإيمان يمان والحكمة يمانية (ঈমান এবং হিকমত (প্রজ্ঞা) য়ামানের শক্তি ও সম্পদ) এবং প্রতিনিধি দলের তাঁহার দরবারে আগমনের কারণ ব্যাখ্যায় এইরূপ বলা যে, "দীনের বিধান শিক্ষা করা এবং সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে প্রশ্ন করিবার উদ্দেশ্যে আমরা আসিয়াছি" এবং নবী কারীম-এর তাহাদের জবাবদানের যে বিবরণ তাহা নবম হিজরীর নবী দরবারে আগমনকারী প্রতিনিধি দলের বিবরণ। আল্লামা ইবন হাজার তো উহাকে হিময়ারী য়ামানীদের আগমনের বিবরণ বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন (আসাস সিয়ার, পৃ. ৪৫৯-৬০)।
উক্ত বিবরণ হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আশ'আরী প্রতিনিধি দলের আগমনের ব্যাপারটি একাধিকবার ঘটিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ ঐ সময় আশ'আরীদের সম্পর্কে বলিয়াছিলেন:
الاشعرون في الناس كصرة فيها مسك.
"আশ'আরীরা হইতেছে একটি ফলের মধ্যে রক্ষিত মৃগনাভিতুল্য” (তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৪৯)।
মুসান্নাফ আবদুর রাবযাকে তাহাদের আগমনের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ তাহাদের জন্য দু'আ করিয়াছিলেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। ঐ বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয়, তাহাদের জাহাজ সমুদ্রে বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। তখন রাসূলুল্লাহ দু'আ করেন, اللهم انج السفينة “হে আল্লাহ্”! জাহাজবাসিগণকে নিষ্কৃতিদান করুন! তারপর অনেকক্ষণ চুপ থাকিবার পর বলিলেন, استمدت তারপর যখন তাহারা মদীনার নিকটবর্তী হইলেন তখন তিনি বলিলেন: قد جاؤا بقومهم رجل صالح "তাহারা আসিয়া পড়িয়াছে এবং তাহাদের নেতৃত্বে রহিয়াছে এক
পূণ্যবান ব্যক্তি"। তাহারা পৌঁছিলে দেখা গেল তাহারা আশ'আরী এবং তাহাদের নেতৃত্ব দিতেছেন আমর ইবনুল হাসিক আল-খুযা'ঈ (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হা. নং ১৯৮৯০)।
হযরত জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ বলিয়াছেন ইয়ামানবাসিগণ তোমাদের নিকট আগমন করে। তাহারা মেঘমালার মত কল্যাণকর এবং পৃথিবীবাসীদের মধ্যে পুণ্যবান (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪০৬ উর্দু)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী (সা)-এর দরবারে দাওস প্রতিনিধি দলের আগমন

📄 নবী (সা)-এর দরবারে দাওস প্রতিনিধি দলের আগমন


৬. নবী-এর দরবারে দাওস প্রতিনিধি দলের আগমন
দাওস আরবের একটি বিখ্যাত গোত্র। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ঐ গোত্রেরই লোক ছিলেন। ঐ গোত্রের বিখ্যাত কবি তুফায়ল আদ-দাওসী আবু তালিব গিরিসংকট হইতে রাসূলুল্লাহ ও তদীয় বংশের লোকজনের মুক্তিলাভের অব্যবহিত পরেই মক্কায় রাসূলুল্লাহ-এর সহিত সাক্ষাত করিতে আসেন। তিনি বর্ণনা করেন:
"আমি মক্কায় পদার্পণ করিলে কুরায়শগণ আমাকে এই বলিয়া ভীতি প্রদর্শন করে যে, রাসূলুল্লাহ একজন জাদুকর, তাঁহার কথা শ্রবণমাত্র লোক দিগ্বিদিক জ্ঞান হারাইয়া পাগল হইয়া যায়। আমি তাহাতে এতই ভীত হইলাম যে, কানে বস্ত্রখণ্ড ঢুকাইয়া মসজিদে প্রবেশ করিলাম যাহাতে তাঁহার কোন কথা আমি শুনিতে না পাই। অবশেষে প্রাতঃকালে যখন রাসূলুল্লাহ সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করিলেন তখন তাহা আমার নিকট অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক মনে হইল। আমি মনে মনে বলিলাম, এ কেমন নির্বুদ্ধিতা! আমি একজন জ্ঞানী কবি, কোন কাব্যের ভাল-মন্দ মান বিচারের ক্ষমতা আমার রহিয়াছে। এমতাবস্থায় তাঁহার বাক্যালাপ শুনিতে বাধা কোথায়? ভাল হইলে গ্রহণ করিব, মন্দ হইলে প্রত্যাখ্যান করিব। তাই সালাতশেষে আমি তাঁহার সাথে সাথে রওয়ানা হইলাম। তাঁহার ঘরে পৌছিয়া আমি বলিলাম, আপনার সম্প্রদায়ের লোকজন আমাকে এমন এমন কথা বলিয়াছে। কিন্তু আল্লাহর মর্জি ছিল যে, আমি আপনার কালাম শুনি, তাই কতকটা ইতোমধ্যেই শ্রবণ করিয়াছি। এখন আপনি আমাকে আপনার কথা শুনান। নবী কারীম তাহাকে ইসলামের দা'ওয়াত পেশ করিলে তিনি সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার উর্দু, পৃ. ৫২)।
স্ব-সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া তুফায়ল (রা) তাহাদেরকে ইসলামের দা'ওয়াত দিলেন। কিন্তু তাহাদের মধ্যে যেনা ব্যভিচারের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তাহারা ধারণা করিল যে, ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহারা সেই স্বাধীনতা হারাইবে। এইজন্য তাহারা সংকোচবোধ করিতেছিল। হযরত তুফায়ল (রা) নবী কারীম-এর নিকট উপস্থিত হইয়া ইহা বর্ণনা করিলে তিনি দু'আ-করিলেন : হে আল্লাহ্! দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান করুন। অতঃপর তিনি তুফায়ল (রা)-কে পুনরায় নিজ সম্প্রদায়ে ফিরিয়া গিয়া তাহাদেরকে নম্র ভাষায় ইসলামের দা'ওয়াত দানের নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর দু'আ এবং হযরত তুফায়লের উৎসাহদানে উৎসাহিত হইয়া তাঁহার সম্প্রদায়ের লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবূ হুরায়রাসহ ঐ গোত্রের আশি ব্যক্তি হিজরত করিয়া মদীনায় চলিয়া আসেন (বুখারী, বাদউল খাল্ক অধ্যায়; সীরাতুন নবী, শিবলী, ২খ., পৃ. ৪১)।
ইবন সা'দ বলেন, তুফায়ল দাওসীর সহিত তাহাদের সত্তর বা আশি ঘর লোক (سبعون او ثمانون اهل بيت) মদীনায় আসেন। আবূ হুরায়রা ও আবদুল্লাহ ইব্‌ন উযায়হির আদ-
দাওসী তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ তখন খায়বারে ছিলেন। তাঁহারা সেখানে তাঁহার সহিত সাক্ষাত করেন। আমাদের নিকট বর্ণনা করা হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ তাঁহাদেরকে খায়বারের গনীমতের অংশ প্রদান করেন। অতঃপর সেখান হইতে তাঁহারা তাঁহার সহিত মদীনায় চলিয়া আসেন। তুফায়ল ইবন 'উমায়র তখন বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে ও আমার সম্প্রদায়ের লোকজনকে বিচ্ছিন্ন করিবেন না (অর্থাৎ একত্রে যেন বসবাস করিতে পারি সেভাবে অভিবাসিত করুন)। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁহাদেরকে আদ-দাজ্জাক-এর কঙ্করময় প্রান্তরে অভিবাসিত করেন।
আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার স্ব-সম্প্রদায় হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া হিজরতের উদ্দেশ্যে গৃহ ত্যাগকালে বলিয়াছিলেন: يا طولها من ليلة وعناءها + على انها من بلدة الكفر نجت "কী দীর্ঘ সে রৌশনী ও তার যন্ত্রণা তবুও ভাল কুফরের দেশ থেকে জুটেছে নিষ্কৃতি
আর আবদুল্লাহ ইব্‌ন উযায়হির বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সম্প্রদায়ে আমার একটি বিশেষ অবস্থান ও মর্যাদা রহিয়াছে। আপনি আমাকে তাহাদের নেতা নিযুক্ত করুন। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন: وقال عبد الله بن أزيهر يا رسول الله إن لى فى قومى سطة ومكانا فاجعلني عليهم فقال رسول الله ﷺ يا أخا دوس إن الإسلام بدأ غربيا وسيعود غريبا فمن صدق الله نجا ومن آل إلى غير ذلك هلك إن أعظم قومك ثوابا أعظمهم صدقا ويوشك الحق أن يغلب الباطل.
"হে দাওসী ভাই! ইসলামের যাত্রা শুরু হইয়াছে নিঃস্বভাবে এবং অচিরেই আবার তাহা নিঃস্বতায় প্রত্যাবর্তন করিবে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে (আল্লাহর দীনকে) সত্য বলিয়া প্রত্যয়ন করিবে, সে নিষ্কৃতি পাইবে, আর যে অন্যদিকে ধাবিত হইবে বা ঝুঁকিয়া পড়িবে, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। তোমার সম্প্রদায়ের সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ প্রতিদান লাভ করিবে, যে সত্য সাধনায় শ্রেষ্ঠ হইবে। অচিরেই হক বাতিলকে পরাস্ত করিবে (তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৩৫৩)।
উক্ত প্রতিনিধিদলের আগমন কাহিনী হইতে প্রাপ্ত আহকাম : (১) এতদ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, মুসলমানদের রীতি বা অভ্যাস ছিল, কাহারও ইসলামে প্রবেশ করার পূর্বে তাহারা তাহাকে গোসল করাইতেন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ-এর নির্দেশও রহিয়াছে। এই ব্যাপারে বিশুদ্ধতম মত হইতেছে, কুফরী অবস্থায় জুনুবী হউক বা না হউক তাহার উপর গোসল করা ওয়াজিব।
(২) মুসলিম বাহিনীর সাহায্য যদি যুদ্ধ সমাপ্তির পূর্বে কোথা হইতেও আসে, তাহা হইলে উক্ত সাহায্যকারিগণও গনীমতের অংশ লাভ করিবে, যেমনটি অন্য গাযীরা লাভ করিবেন।
(৩) আওলিয়ায়ে কিরামের কারামত সত্য। দীনী প্রয়োজনে মুসলানদের উপকারার্থে এবং কুফর ও শয়তানের প্রভাবকে নষ্ট করার জন্য তাহা হইয়া থাকে।
(৪) আল্লাহ্ দিকে দা'ওয়াত প্রদানকালে ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে। নাফরমানদের বিরুদ্ধে বদদু'আ করার ব্যাপারে বিলম্ব করা উচিত।
প্রথমোক্ত হুকুমটি ইমাম শাফি'ঈ (র)-এর অভিমত অনুযায়ী। কেননা ইমাম শাফি'ঈর মতে গোসলের নিয়ত করা ফরয, আর কুফরী অবস্থায় নিয়তের কোনই মূল্য নাই। হানাফী মতে, গোসলের জন্য নিয়ত ফরয নহে। এইজন্য কোন ব্যক্তি যদি ইসলাম গ্রহণকালে গোসল ফরয না হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার ক্ষেত্রে গোসল মুস্তাহাব - ফরয নহে (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪১৩-৪ ও পাদটীকা উর্দুভাষা, মুফতী আযীযুর রহমান, দিল্লী ১৯৭৮ খৃ.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনূ আমির ইবন সা'সা'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 বনূ আমির ইবন সা'সা'আ প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


৭. বনূ আমির ইবন সা'সা'আ প্রতিনিধি দলের নবী -এর দরবারে আগমন
বনূ আমির গোত্রটি আসলে আরবের বিখ্যাত কায়স 'আয়লান গোত্রেরই একটি শাখাগোত্র। ঐ গোত্রে ঐ সময় তিনজন নেতা ছিল: (১) 'আমির ইব্‌ন তুফায়ল, (২) ইরবাদ ইবন কায়স ও (৩) জাব্বার ইব্‌ সুন্না। প্রথমোক্ত দুইজন ছিল নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের পাগল। আমির ইতোপূর্বেই একাধিক বিশৃংখলার হেতু হইয়াছিল এবং এইবারও কুমতলবেই নবী দরবারে আসিয়াছিল। জাব্বার এবং গোত্রের সাধারণ লোকজন একান্তই সত্যের সন্ধানে আসিয়াছিল। 'আমির মদীনায় আসিয়া সুলূল পরিবারের এক মহিলার বাড়ীতে উঠে। জাব্বার এবং বিখ্যাত সাহাবী কা'ব ইবন মালিকের মধ্যে পূর্বেই সখ্যতা ছিল। তাই তিনি তেরজন সঙ্গী-সাথীসহ তাঁহার বাড়ীতেই মেহমান হন। কা'ব (রা)-ই তাহাদেরকে লইয়া নবী-এর দরবারে উপস্থিত হন (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৩৭)।
রাসূলুল্লাহ-এর তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পর এই প্রতিনিধি দলটি আগমন করিয়াছিল। আগমনকারী আমির ও ইরবাদের উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আমির ইরবাদকে বলিয়া রাখিয়াছিল, আমরা নানা কথায় যখন মুহাম্মাদকে ভুলাইয়া রাখিব তখন সুযোগ বুঝিয়া তুমি তরবারি দ্বারা তাঁহার দফা রফা করিবে। সে মতে আবদুল্লাহ আশ-শাখায়র আবূ মুতাররিফ নামক এক ব্যক্তি কথা বলিতে শুরু করিল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে (يا سیدی) হে মনির) বলিয়া সম্বোধন করিল এবং সাথে সাথে বলিল, انت ذو الطول علينا "আপনি আমাদের মধ্যে মহাসম্মানের অধিকারী, দানবীর"। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
السيد الله لا يستهونكم الشيطان. "মনিব একমাত্র আল্লাহ্। শয়তান যেন তোমাদেরকে এইরূপ চাটুকারিতা দ্বারা উপহাসের পাত্র বানাইয়া না ফেলে” (সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ৩৭)।
'আমির কথা বলিতে গিয়া বলে, হে মুহাম্মাদ! আমাকে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ জবাবে বলিলেন: যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাহা কখন সম্ভব নহে। সে আবার বলিল, আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করি তাহা হইলে আমি কী পাইব? জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
لك ما للمسلمين وعليك ما على المسلمين "অন্য দশ মুসলমানের অধিকার ও কর্তব্য তোমার জন্যও বর্তাইবে।"
৩৫৭ সে অবার আবদার করিলঃ তাহা হইলে আপনার পরবর্তী নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব আমার জন্য নির্ধারিত করিয়া দিন! রাসূলুল্লাহ (স) জবাব দিলেন:
ليس ذاك لك ولا يقومك . "তোমাকে বা তোমার সম্প্রদায়কে তাহা দান করা সম্ভব নহে।"
এবার আমির প্রস্তাব করিল, "তাহা হইলে আপনি কি মরু এলাকা লইয়া সন্তুষ্ট থাকিবেন এবং নগরসমূহের কর্তৃত্ব আমাকে দান করিবেন" )اتجعل لى الوبر ولك المدر( ? রাসূলুল্লাহ তাহাতেও সম্মত হইলেন না। সে হুমকি দিল কী, আমাকে তাহা দিবেন না? আমি আপনার উপর চড়াও হওয়ার উদ্দেশ্যে অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর দ্বারা এই জনপদ ভরিয়া তুলিব। মদীনার প্রতিটি খেজুর গাছের সহিত একটি করিয়া ঘোড়া বাঁধিব।
জবাবে রাসূলুল্লাহ বলিলেনঃ আল্লাহ তোমাকে সেই শক্তি দিবেন না। বর্ণনান্তরে আছে, তিনি আরও বলিয়াছিলেন: আল্লাহ্ তোমাকে প্রতিহত করিবেন )الله ينعك এইভাবে হুমকি দিয়া ঐ অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত ব্যক্তিদ্বয় প্রস্থান করিল। তখন রাসূলুল্লাহ আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন।
اللهم اكفينهما اللهم اهو بني عامر واغن الأسلام عن عامر يعني ابن الطفيل. "প্রভু! ঐ দুই বদলোকের বিরুদ্ধে আপনিই আমার জন্য যথেষ্ট হইয়া যান (পৃষ্ঠপোষকতা করুন)। হে আল্লাহ্! 'আমির গোত্রকে হিদায়াত দান করুন এবং আমির (ইব্‌ন তুফায়ল) হইতে ইসলামকে মুক্ত রাখুন"।
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়ার বিশদ বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ-এর সহিত আলাপ-আলোচনাকালে 'আমির এক পর্যায়ে ধূর্ততার সহিত বলে, হে মুহাম্মাদ! চলুন আমরা দুই জনে একটু একান্তে কথা বলি। এইভাবে সে বেশ কিছুক্ষণ একটু দূরে এক প্রাচীরের নিকট দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাঁহার সহিত কথা বলিতে বলিতে আরবাদ এই সুযোগে নবী করীম-কে হত্যা করিয়া ফেলিবে, এই প্রতীক্ষায় ছিল। ইরবাদ এই সুযোগটির সদ্ব্যবহার করিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য নবী-এর দরবার হইতে প্রতিনিধি দলের প্রস্থানের পর 'আমির ইরবাদকে দোষারোপ করিতে থাকে। জবাবে ইরবাদ বলিল, আল্লাহ্র কসম, যতবারই আমি তোমার নির্দেশানুসারে কাজ করিতে উদ্যত হইয়াছি, ততবারই তুমি আমার এবং ঐ লোকটির মধ্যস্থলে ঢুকিয়া পড়িয়া বাধ সাধিয়াছ। তুমি ব্যতীত অন্য কোন লোক তখন আমার দৃষ্টিগোচর হইতেছিল না। এমতাবস্থায় আমি কি তোমাকেই তরবারি দ্বারা আঘাত হানিতাম?
আরেকবার তরবারি তাক করিলাম। সাথে সাথে দেখি একটি লৌহ প্রাচীর সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে। আরেক বার তাহা করিতে গিয়া দেখি, একটি উট বিশাল হা-করিয়া আমার মস্তক গ্রাসে উদ্যত। বলাবাহুল্য, উহা ছিল রাসূলুল্লাহ-এর স্পষ্ট মু'জিযা যাহা আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণকে দিয়া থাকেন। প্রতিনিধি দলটি বাহির হইয়া গেলে 'আমির ইব্‌ন তুফায়ল প্লেগে আক্রান্ত হইয়া সেই সালূলী মহিলার বাড়ীতে গিয়া উঠিল। তাহার জিহ্বা ফুলিয়া ছাগীর স্তনের ন্যায় ঝুলিয়া পড়িল। শয্যাগত মৃত্যু যেহেতু আরবে নিন্দনীয় বিবেচিত হইত এইজন্য সে বলিল, আমাকে একটি অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া দাও! তারপর একটি বল্লম হস্তে অশ্বারোহী অবস্থায় সে হাক দিল:
يا ملك الموت ابرز لي.
"হে মৃত্যুদূত ফেরেশতা! আমার সহিত মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হও।” এইরূপ বলিতে বলিতে সে অশ্বপৃষ্ঠ হইতে ভূ-পাতিত হইল এবং তৎক্ষণাত মৃত্যুমুখে পতিত হইল। ঐ স্থানেই তাহাকে মাটিচাপা দেওয়া হয় (সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৩৭; সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ১০৯-১০)।
প্রতিনিধি দলটি বনূ 'আমির ইবন সাসা'আ গোত্রে প্রত্যাবর্তন করিলে লোকজন অপর নেতা ইরবাদকে হালচাল জিজ্ঞাসা করিল। সে বলিল, মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণযোগ্য নহে। এই মুহূর্তে সম্মুখে পাইলে তীরবিদ্ধ করিয়া আমি তাঁহাকে হত্যা করিতাম। অতঃপর মাত্র দুইটি দিন অতিবাহিত না হইতেই সে যখন বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে সাথে লওয়া একটি উষ্ট্রের পিঠে আরোহণ করিয়া পথে নামিল অমনি বজ্রাঘাতে তাহার এবং বাহন উষ্ট্রের এক সাথেই দফা রফা হইল। হতভাগ্য 'আমির ও ইরবাদ তাহাদের বদ মতলবের জন্য হিদায়াত হইতে বঞ্চিতাবস্থায় ফিরিয়া স্বল্পকালের মধ্যেই নরকবাসী হইল। পক্ষান্তরে সত্য সন্ধিৎসু বনু আমির কবীলা ইসলাম গ্রহণে ধন্য হইল। এইভাবে আল্লাহ্র রাসূলের বহুল উচ্চারিত বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হইল:
من يهده الله فلا مضل له ومن يضلله فلا هادي له.
"আল্লাহ যাহাকে হিদায়াত দান করেন কেহই তাহাকে পথভ্রষ্ট করিতে পারে না, আর আল্লাহ যাহাকে পথভ্রষ্ট করেন কেহ তাহাকে হিদায়াত দিতে পারে না" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ২৯; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১০-১১)।
তাবাকাতের এই প্রসঙ্গের বর্ণনায় অতিরিক্ত আরও দুইটি রিওয়ায়াতের মাধ্যমে নাম উল্লেখ পূর্বক অপর কয়েকজনের নবী দরবারের আগমনের কথা বিবৃত হইয়াছে- যাহা সাধারণত অন্যান্য পুস্তুকে পাওয়া যায় না। সেগুলিও নিম্নে প্রদত্ত হইল:
আলকামা ইন্ন উলাছা ইব্‌ন আওফ (ইবনুল আরওয়াস ইব্‌ন জা'ফার ইন কিলাব) এবং হাওযা ইব্‌ন খালিদ ইবন রাবী'আ ও তাঁহার পুত্র একদা নবী দরবারে উপস্থিত হইলেন। হযরত উমার (রা) তখন তাহার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে বলিলেন, একটু সরিয়া আল-কামাকে বসিতে দাও। হযরত উমার (রা) একটু নড়িয়া চড়িয়া আলকামাকে বসাইলেন। তিনি তাহার পাশে আসন গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহার নিকট ইসলামী শারীআতের বিধানসমূহ বর্ণনা করিলেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেন। তখন আলকামা বলিয়া উঠিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রভু অত্যন্ত মহৎ সদাশয়। আমি আপনার প্রতি ঈমান আনয়ন করিলাম। আমি কায়স বংশীয় ইকরিমা ইন্ন খাসাফার শর্তে আপনার নিকট বায়'আত হইতেছি। হাওযা এবং তাঁহার পুত্রও অনুরূপ শর্তে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইবন সা'দ আরও বলেন: হিশাম ইব্‌ন মুহাম্মাদ, ইবরাহীম ইবন ইসহাক আল-আবদী, হাজ্জাজ ইব্‌ন আরতাত, আওন ইব্‌ন আবী জুহায়ফা আস-সাওয়াঈ তদীয় পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন: বনূ আমির প্রতিনিধি দল যখন নবী দরবারে আগমন করে, তখন আমিও তাহাদের সহিত ছিলাম। আমরা তাহাকে আবতাহ প্রান্তরে একটি লাল বর্ণের গম্বুজাকৃতির
তাঁবুর মধ্যে গিয়া পাইলাম এবং সালাম দিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কাহারা হে? আমরা জবার দিলাম, আমরা 'আমির ইবন সা'সা'আ গোত্রের লোক। তিনি বলিলেন : مرحبا بكم انتم مني وانا منكم.
"তোমাদিগকে স্বাগতম! তোমরা আমারই লোক এবং আমি তোমাদেরই লোক।"
এমন সময় নামাযের ওয়াক্ত হইলে বিলাল (রা) ঘুরিয়া ঘুরিয়া আযান দিতে শুরু করিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য একটি পাত্রে করিয়া উযূর পানি লইয়া আসিলেন। তিনি উযূ সারিলেন। তাঁহার অবশিষ্ট পানির দ্বারা আমরাও উযূ করিলাম। বিলাল (রা) ইকামত দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদিগকে লইয়া দুই রাকআত সালাত আদায় করিলেন। তারপর আসরের ওয়াক্ত হইলে পুনরায় বি Bilal (রা) ঘুরিয়া ঘুরিয়া আযান দিতে লাগিলেন। আবার রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদিগকে লইয়া দুই রাকআত সালাত আদায় করিলেন (বলা বাহুল্য, ঐ সময় ঐ সালাত দুই রাকাত পড়ারই বিধান ছিল। পরবর্তী কালে আরও বর্ধিত দুই রাকআতসহ চার রাকআত করিয়া ঐ নামাযসমূহ আদায়ের বিধান প্রবর্তিত হয় (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৩১১)।
ইব্‌ন খালদুন বনূ আমিরের প্রতিনিধিদলের সদস্যসংখ্যা ১০ জন ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন এবং তাহাদের নবী ﷺ দরবারে উপস্থিতির সময় নির্ধারণ করিয়াছেন দশম হিজরীর রমযান মাস- যেই মাসে বনূ গাস্সানের প্রতিনিধিদলও নবী ﷺ-এর দরবারে উপস্থিত হইয়াছিল (তারীখ ইব্‌ন খালদুন, ২খ., ৩য় ভাগ, পৃ. ২৩০; শায়খ মুহাম্মাদ ইসমাঈল পানিপথী, ইসলাম প্রচারের ইতিহাস, পৃ. ২৫৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00