📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনূ তামীম প্রতিনিধি দলের নবী কারীম (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 বনূ তামীম প্রতিনিধি দলের নবী কারীম (সা)-এর দরবারে আগমন


২. বনূ তামীম প্রতিনিধি দলের নবী কারীম -এর দরবারে আগমন
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে আরব গোত্রীয় প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের ধারা শুরু হইলে বনূ তামীমের একটি বিশাল দলও তাহাদের শীর্ষস্থানীয় অভিজাত ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্বে তাঁহার দরবারে আসিয়া উপস্থিত হয়। তাহাদের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন উতারিদ ইবন হাজিব, আকরা' ইবন হাবিস, যিবিরকান ইন্ন বদর, আমর ইবনুল আহতাম, আল-হাতহাত ইব্‌ন য়াযীদ, নু'আয়ম ইব্‌ন ইয়াযীদ, কায়স ইবনুল হারিছ, কায়স ইবন আসিম, উয়ায়না ইন্ন হিস্স, ইবন হুযায়ফা প্রমুখ। আকরা' ইন্ন হাবিস এবং উয়ায়না (রা) মক্কা বিজয় এবং হুনায়ন ও তাইফের অভিযানসমূহে রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে ছিলেন। তামীমীগণ মসজিদে প্রবেশ করিয়া "হে মুহাম্মাদ! হুজরা হইতে আমাদের দিকে বাহির হইয়া আসুন” বলিয়া চীৎকার করিয়া ডাকাডাকি করিতে থাকে। তাহাদের এইরূপ চীৎকারে তিনি বিরক্ত হন। তিনি বাহির হইয়া আসিলে তাহারা বলিল, হে মুহাম্মাদ! আমরা আপনার সহিত বংশগৌরবের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে চাই। আমাদের কবি ও বাগ্মীকে আপনি অনুমতি দান করুন!
তিনি অনুমতি দান করিলে তাহাদের বাগ্মী কবি উতারিদ দাঁড়াইয়া বলিতে শুরু করিল: الحمد لله الذى له علينا الفضل والمن وهو أهله الذي جعلنا ملوكا ووهب لنا أموالا عظاما نفعل فيها المعروف وجعلنا أعزة أهل المشرق وأكثره عددا وأيسره عدة فمن مثلنا في الناس ألسنا برؤس الناس وأولى فضلهم فمن فاخرنا فليعدد مثل ما عددنا وإنا لو نشاء لا كثرنا الكلام ولكن نخشى من الاكثار فيما أعطانا وإنا نعرف (بذلك) أقول هذا لأن تأتوا بمثل قولنا ، وأمر أفضل من أمرنا .
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে তাঁহার অশেষ করুণা ও অনুগ্রহ দ্বারা ধন্য করিয়াছেন। আর তিনি ইহার যথার্থ অধিকারীও। তিনি আমাদেরকে রাজা বানাইয়াছেন এবং
বিশাল সম্পদ-সম্ভার দান করিয়াছেন যদ্বারা আমরা বদান্যতা প্রদর্শন করিয়া থাকি। তিনি আমাদেরকে প্রাচ্যে প্রতাপ-প্রতিপত্তিশালী, ধনে-জনে বলীয়ান এবং সহজলভ্য জীবনোপকরণের অধিকারী করিয়াছেন। সুতরাং মানবজাতির মধ্যে কে আমাদের সমকক্ষতার দাবি করিতে পারে! আমরাই কি লোক সমাজের নেতৃস্থানীয় এবং সেরা নহি? সুতরাং কেহ আমাদের সহিত গৌরব প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে আগ্রহী হইলে আমাদের সমতুল্য গৌরবগাথা সে পেশ করুক! ইচ্ছা করিলে আমরা আরও অনেক কথা বলিতে পারি, কিন্তু আল্লাহ্ প্রদত্ত অঢেল নিয়ামতের কথা লিয়া বেড়াইতে আমরা সংকোচ বোধ করি। এরূপ বিনয়ের জন্য আমরা সুবিদিত। আমরা র হার কৃপার কথা স্বীকার করি। এইভাবে আমাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দানের উদ্দেশ্য হইতেছে, স্বারাও এমনটি করিবেন এবং আমাদের তুলনায় অধিক মর্যাদার কোন ব্যাপার উল্লেখ ▼" (বিদায়া, ৫খ., পৃ. ৪২)।
পর্যন্ত বলিয়া উতারিদ বসিয়া পড়িলে রাসূলুল্লাহ খাযরাজের শাখাগোত্র বানুল ছাবিত ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন শাম্মাস (রা)-কে উহার সমুচিত জবাব দানের জন্য দাঁড়াইতে 'ইমতে ছাবিত ইব্‌ন কায়স (রা) দাঁড়াইয়া বলিতে শুরু করিলেন:
والارض خلقه فقضى فيهن أمره ووسع كرسيه علمه ولم يك شد فضله ثم كان من قدرته أن جعلنا ملوكا واصطفى من خيرته رسم وأصدقه حديثا وأفضله حسبا فانزل عليه كتابا وأئتمنه على من العالمين ثم دعا الناس إلى الايمان به فآمن برسول الله وذوى رحمه أكرم الناس احسابا وأحسن الناس وجوها وخير الخلق إجابة واستجاب لله حين دعاه رسول الله ﷺ رسـوله فقاتل الناس حتى يؤمنوا فمن آمن بالله وجاهدنا في الله أبدا وكان قتله علينا يسيرا أقول : وللمؤمنين والمؤمنات والسلام عليكم.
দর সমকক্ষ নয়
গোশত লোকেরে ছুটে আসে নেতারা
/ আপ্যায়ন পায় যে
মোদের হেরিবে কর্তিত সনে পরিচয় নিয়া নেই
। কানে" (আল-বিদায়া, দল যাঁহার সৃষ্টি। এইগুলির উপর তিনি তাঁহার বিধান থা সৃষ্টি চরাচরের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। তাঁহার অনুগ্রহ
৩তু গৌরবে মোরা সর্বদাই 'র তাঁহার নিজ শক্তিবলে তিনি আমাদেরকে আপন রাসূলরূপে মনোনীত করিয়াছেন।
ব গাঁথা শুনাইতে উদ্যত হয়, ন এবং সর্বাধিক সত্যবাদী বানাইয়াছেন, এর দিয়া তাঁহাকে আনাইলে কবি তার সৃষ্টি চরাচরের উপর দায়িত্বশীল আল্লাহ্র রাসূলের প্রতি সর্বপ্রথম
নাজায় হাসসানকে তাহার সমচিত 'ঘ সত্তা। তারপর তিনি তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছেন, মার্জিত এবং কাজেকর্মে সবার শুরু করিলেন এইভাবে: হ্বান করিলেন তখন আমরাই সর্বপ্রথম
"সুতরাং আমরা আল্লাহ্ (দীনের) আনসার (সাহায্যকারী) এবং রাসূলুল্লাহ-এর সহযোগীবৃন্দ ঈমান না আনা পর্যন্ত আমরা লোকজনের সহিত যুদ্ধ করিয়া যাইব। আর যে ব্যক্তি ঈমান আনিবে আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি, সে তাহার জানমালকে নিরাপদ করিয়া লইল। আর যে ব্যক্তি অগ্রাহ্য করিবে আমরা তাহার বিরুদ্ধে অনন্তকাল ধরিয়া জিহাদ করিব। তাহাকে হত্যা করা আমাদের জন্য নিতান্তই সহজ। ইহাই হইতেছে আমার বক্তব্য। আমি আমার নিজের জন্য, তোমাদের জন্য এবং সমস্ত মুমিন নর-নারীর জন্য আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক" (বিদায়া, ২/৫খ., পৃ. ৪২)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ-এর অনুমতি লইয়া বনূ তামীমের কাব যিবিরকান ইন্ন বদ কবিতায় তাহাদের আভিজাত্যগাঁথা বর্ণনা করেন এইভাবেঃ
نحن الكرام فلا حي يعادلنا منا الملوك وفينا تنصب البيع كم قسرنا من الأحياء كلهم عند النهاب وفضل العز يتبع نحن يطعم عند القحط مطعمنا من الشواء إذا لم يؤنس الفزع ا ترى الناس تأتينا سراتهم من كل أرض هويا ثم نصطنع حر الكوم عبطا في أرومتنا للنازلين إذا ما أنزلوا شبعوا ترانا إلى حي نفاخرهم إلا استفادوا وكانوا الرأس تقتطع بفاخرنا في ذلك تعرفه فيرجع القوم والاخبار تستمع ينا ولم يأبى لنا أحر إنا كذلك عند الفخر ترتفع
"আমরাই মর্যাদাবান/ কোন গোত্র বংশ না/সমান মোদের, কোন গোত্র/ আমা'ে রাজা-বাদশাহ্ আমাদেরই উপাসনায় সেও নির্মিত মোদের যুদ্ধবিগ্রহে মোরা/ব নিপাত মর্যাদা মাহাত্ম শ্রেয় সর্বদাই 'পায় প্রণিপাত। মহাসমারোহে মোরা/ভূনা খাওয়াই। অথচ দুর্ভিক্ষকাল/ আকাশে মেঘের চিহ্ন নাই। দিক-দিগন্ত হতে/গ লোকের আমাদের পানে। পায় তারা সৌজন্য মোদের বঞ্চিত হয় না কেউ বিস্তর। আমাদের মরু নিবাসে/ জবাই হতে থাকে সুস্থ সবল নিরোগ উট যখন তারা আসে পরিতৃপ্ত হয়। যে বংশের সাথে বাঁধে কৌলিন্যের লড়াই। শির ঝরিতেছে সতত তাদের। এ ক্ষেত্রে যারাই আসে লড়িবারে আমাদের (ফিরে ওরা ব্যর্থকাম হয়ে)। ওদের করুণ গাঁথা/ প্রচারিত হয় কানে ২/৫খ., পৃ. ৪২-৪৩)।
উন্নাসিকতা দেখাই মোরাই/কেউ তা দেখায় না মোদের। কৃতি রই উচ্চাসনে।
ইবন ইসহাক বলেন, বনূ তামীমের কবি যখন তাহার গৌর খব তখন হাসান সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ যিবিরকান তাহার গৌরবগাঁথা আবৃত্তি করিলেন। রাসূলুল্লাহ জবাব দানের আদেশ দিলে হাসান (রা) তাহার কবিতা আবৃত্তি
إن الذوائب من فهر وأخوهم قد بينوا سنة للناس تتبع يرضى بها كل من كانت سريرته تقوى الإله ولك الخير يصطنع قوم إذا حاربوا ضروا عدوهم أو حاولوا النفع في أشياعهم ففعوا سجية تلك منهم غير محدثة إن الخلائق فاعلم شرها البدع إن كان في الناس سباقون بعدهم فكل سبق لأدنى سبقهم تبع لا يرفع الناس ما أوهت أكفهم عند الدفاع ولا يوهون ما رفعوا إن سابقوا الناس يوما ظاز سبقهم أو وازنوا أهل مجد بالندى منعوا أعفة ذكرت في الوحى عفيهم لا يطمعون ولا يرد بهم طمع لا يبخلون على جار بفضلهم ولا يمسهم من مطمع طبع إذا نصبنا لحى لم ندب لهم كا يكتب الى الوحشية الذرة نسموا إذا الحرب نالتنا مخالها إذا الزعاتف من أظفارها خشما لا يفخرون إذا نالوا عدوهم وإن أصيبوا فلا خور ولا مع كأنهم في الوغى والموت مكتنع أسد يحلية في أرساعاع خذ منهم ما أتوا عفوا إذا غضبوا ولا يكن همك الأمر الذهوا فإن في حربهم فاترك عداوتهم شرا يخاض عليه السلع أكرم بقوم رسول الله شيعتهم إذا تفاوتت الأهواء واسع أهدى لهم مذحتى قلب يؤازره فيما أحب لسان حائضع فإنهم أفضل الإحياء كلهم إن جد في الناس جد القواوا
"শির নেতৃ/আর মাতৃস্থানীয়রা দেখিয়েছে আদর্শ এক/অনুসরণীয় চিত্ত যার বিত্তময়/ভূণ্ডিত তার কাছে অনিন্দ্য ইহা/চির বরণীয়। এমন গোষ্ঠি ওরা যুদ্ধে নামে আরি স্বজনেসে অতীব যতনে এ জেনো অতি পুরাতন নবীত/অনুপরিণ। ওছেউ হলে অগ্রগামী নিশ্চিত পূর্বসূরীদের (ছায়াফায়ার সমান বয়ে যাবে চিরদিন/অগ্র-পশ্চাতে ব্যবধান।) রণে প্রাত ওদের কিছু লোকের র সাধিতে আবার ওন্দয় হাড়ী গার জয়ের মাল পা উহাদের সাথে জয়ের মাল ওয়াটাই গলাতে। } তে
লোভী নয় ওরা কভু/নারে লোভ ওদের নাশিতে। প্রতিবেশী তরে দানে/কভু নয় বখিল কৃপণ লালসার ছোঁয়া স্পর্শ/ করে না ওদের পূত মন। যখন যুদ্ধের তরে ধ্বজা মোরা করি উত্তোলন ছলনার ধারিনা ধার বুনো গাইর বাছুর-যতন (যেমন শিকারী পাতে পশু দিয়ে ছলনার জাল প্রলুব্ধ শিকার এলে ধরে/ খাদ্য লিপ্সা হয় তার কাল।)
যুদ্ধের প্রখর থাবা যবে/ আমাদের পানে অগ্রসর উঠিয়া দাঁড়াই মোরা/ভয়ে কভু হই না কাতর। ভীতি বিহবল যবে কাপুরুষ/ হেরিয়া যুদ্ধের নখর। শত্রুরে হারিয়ে রণে/ করে নাকো ওরা আস্ফালন হামলার মুখেও ওরা করে না মাতম/দিশাহারা হয় নাখনো। কঠিন আহ্বান কালে যবে/শুরু হয় মৃত্যুন র্নাচন ওরা তখন হালেয়া বনের সিংহ/বক্র থাবা রক্ত পেশী। (নেই কোন ভয়ের কারণ)।
ক্রুদ্ধকালে যা-ই তারা দেয়/কষ্ট চিতে তাই নিয়ে নাও, যা না দেয়/ভুলেও যেন/ যেদিক পানে ফিরে আও। তাদের সাথে লড়তে যাওয়া গরল পান সর্বনাশা ওদের সাথে বৈরিতার তাই ছেড়ে দাও সকল আশা সেই জাতিটা কতই মহান রাসূল যাদের দলপতি যখন থাকে অন্যরা সব শত মুখ শত মতি। তাদের তরে স্তুতি গাঁথা এমনি এক হৃদয় হতে রসনা যার সিক্ত রসে কুশলী এক শিল্পী হতে। গোত্রকূলের ওরাই সেরা তত্ত্বজ্ঞানী সবাই বলে সেরা সে তো সেরাই রবে বলুক না কেউ ঠাট্টা ছলে"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তামীম প্রতিনিধি দলের আগমনের হেতু

📄 তামীম প্রতিনিধি দলের আগমনের হেতু


ইবন ইসহাক বলেন, হাসানের কবিতা পাঠ শেষ হওয়ামাত্র আন বিস দাঁড়াইয়া বাগ্মীর চেয়ে বলিলেন, আমার পিতার শপথ! ইনি তো আল্লাহ্ প্রদত্ত শক্তিশাল বলার হাদের কণ্ঠস্বর তাঁহার বাগ্মী উত্তম। আমাদের কবির চেয়ে অধিকতর প্রতিভার ণ করেন এবং আমাদের কণ্ঠস্বরের তুলনায় বলিষ্ঠতর। অতঃপর গোত্রের সকলে বার উকিয়ার রাসূলুল্লাহ্ তাহাদেরকে উত্তম পারিতোষিকে পুরস্কৃত।
ওয়াকিদীর বর্ণনানুসারে রাসূলুল্লাহ ঐ সময় প্রতি তাকনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে আহভামকে তাহার বর্ষস্বল্পতার কারণে পাঁচ উঠ আমার সময়সানীধ (প্রায় পাঁচ শত দিরহাম) হায়েল উপঢৌকনরূপে দান করিয়াছিলে লেই ব্লয়োকনিষ্ঠ আমর ইব্‌ন আচ্ছামকে কায়স ইব্‌ন আসিম সুনজ কারুণ তা সম্পর্কে মন্তব্য দলের সামানপত্রের তত্তাবধানে থাকায় মজলিসে এর পহরায় বহরা পিয়াছে। করিতে গিয়া বলেন, রাসূলাল্লাহ! আমাদের
রাসূলুল্লাহ তাহাকে প্রতিনিধি দলের অন্যান্যদের মত পুরস্কৃত করেন (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৫খ., পৃ. ৪০-৪৫; বৈরূত মুদ্রণ, ১৯৯৬ খৃ.)।
নবী কারীম-এর দরবারে যে শুধু শুষ্ক নিরস ধর্মালোচনা ও পরকালের চর্চাই হইত না রীতিমত কাব্য-সাহিত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বাগ্মিতার প্রতিযোগিতাও হইত এবং এই সমস্ত মাধ্যম ব্যবহার করিয়াও ইসলামের সত্যতা প্রমাণের প্রচেষ্টা চলিত। শত শত হাজার হাজার শ্রোতা উহা উপভোগও করিত, বনূ তামীম প্রতিনিধি দলের আগমনকালীন উক্ত বর্ণনা হইতে উহার একটা সুস্পষ্ট ধারণা আমরা লাভ করিলাম। শুধু মুসলিম-অমুসলিম কবি-সাহিত্যিক ও বাগ্মী বীরদের প্রতিযোগিতাই নহে, এই ঘটনার পরবর্তী অংশে উক্ত প্রতিনিধি দলে আগত দুই ব্যক্তির আকর্ষণীয় বাকযুদ্ধও যে আল্লাহ্র রাসূল উপভোগ করিয়াছেন এবং উহার উপর একটা স্মরণীয় চটকদার মন্তব্যও করিয়াছেন উহার বিস্তারিত বর্ণনা প্রদানেও আমাদের ঐতিহাসিকগণ ত্রুটি করেন নাই। সেই তামীম প্রতিনিধি দলের ঘটনার বর্ণনায়ই ঐ ব্যাপারটি পরিলক্ষিত হয়।
আমর ইব্‌ন আহতাম যখন শুনিতে পান কায়স ইবন আসিম রাসূলুল্লাহ-এর নিকট তাহার কথা বর্ণনা করিতে অনেকটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব প্রকাশ করিয়াছেন, তখন তিনিও তাহার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ করিয়া বলিলেন:
ظللت مفقرس الهلباء تشيمني عند الرسول فلم تصدق ولم تصب سدناكم سودوا زهوا و سوددكم بادنوا جذه مقع على الذنب
"অলস নিতম্ব বিছিয়ে/ কাটিয়ে দিলে সারা দিনক্ষণ রাসূলের দরবারে/আমারে ছোট করে/দিয়েছ অসত্য ভাষণ আমরা তো করিয়াছি দীর্ঘকাল তোমাদের শাসন আর তোমাদের নেতৃত্ব লেজেগোবরে অকারণে দণ্ড ব্যাদন"।
হাফিয বায়হাকীর বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ-এর নিকট যিবিরকান ইব্‌ন বদর, কায়স ইব্‌ন আসিম এবং 'আমর ইবনুল আহতাম প্রমুখ আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ 'আমর ইবনুল আহতামকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, যিবিরকান সম্পর্কে তোমার মতামত আমাকে একটু বল, আর এই লোক (কায়স) সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নাই। রাবী বলেন, সম্ভবত তাহার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ পূর্বেই অবগত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর জবাবে 'আমর ইন আহতাম বলিলেন: সম্মুখে সকলেই তাহার অনুগত, প্রতিপালককে জব্দ করিতে পারঙ্গম; পিছনে কী হইতে পারে সেই ব্যাপারে খুবই হুঁশিয়ার-তীক্ষ্ণদর্শী।
যিবিরকান বলিয়া উঠিলেন, সে যাহা বলিয়াছে তাহা তো বলিয়াছেই, কিন্তু সে সম্যক জানে, আমি তাহার প্রদত্ত উক্ত বিবরণ হইতেও উত্তম।
'আমর চটিয়া গিয়া বলিয়া উঠিলেন, আমি তোমার সম্পর্কে যাহা জানি তাহা হইল, তুমি বিশাল বপু, সংকীর্ণমনা, নির্বোধ পিতার সন্তান ও ইতর মামার ভাগিনা।
অতঃপর 'আমর বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রত্যেকবারই সত্য মন্তব্য করিয়াছি। অর্থাৎ আমার বর্ণিত সবগুলি ব্যাপারই তাহার মধ্যে বিদ্যমান। প্রথমে সে আমাকে সন্তুষ্ট রাখায় আমি আমার জ্ঞাত তাহার সদগুণাবলীর উল্লেখ করিয়াছি। অতঃপর সে আমাকে চটাইয়া দেওয়ায় তাহার চরিত্রের মন্দ দিকগুলি তুলিয়া ধরিয়াছি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আল্লাহ্র রাসূল বলিলেন:
وان من البيان سحرا. "কোন কোন বক্তৃতা যাদুকরী প্রভাবসম্পন্ন হইয়া থাকে।"
এই বর্ণনাটি মুরসাল পর্যায়ের। বায়হাকীর এই সংক্রান্ত মুত্তাসিল বর্ণনাটি আরও বিস্তৃত। তাহাতে আছে, তামীম গোত্রের কায়স ইবন আসিম, যিবিরকান ইবন বদর এবং 'আমর ইবনুল আহতাম নবী দরবারে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন যিবিরকান আত্মগরিমা বর্ণনা করিয়া বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হইতেছি তামীম কুলের নেতা তাদের মধ্যে বরেণ্য ও অনুসরণীয়। আমি তাহাদের উপর হইতে যুলুম প্রতিরোধ করি এবং অন্যদের নিকট হইতে তাহাদের অধিকার আদায় করিয়া দেই। সেও (আমর ইব্‌ন আহতাম) উহা জ্ঞাত আছে।
'আমর ইব্‌ন আহতাম তখন বলিলেন, সে প্রতিপক্ষকে কাবু করিতে অত্যন্ত পারঙ্গম, অগ্র-পশ্চাত সংরক্ষণকারী এবং তাহার সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বরেণ্য।
তখন যিবিরকান বলিলেন, আল্লাহ্র কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহার চাইতে অনেক ভাল কথা সে আমার সম্পর্কে জ্ঞাত আছে, কেবল হিংসাবশে সেগুলি বলা হইতে বিরত রহিয়াছে।
তখন 'আমর ইব্‌ন আহতাম বলিলেন, আমি কি তোমাকে হিংসা করিব? আল্লাহর কসম! মাতৃকুলের দিক হইতে তুমি একটা আস্ত ইতর, নূতন বিত্তশালী, নির্বোধ পিতার সন্তান এবং সমাজের নিম্নস্তরের লোক। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রথমে যাহা বলিয়াছি তাহাই সত্য, আবার পরে যাহা বলিযাছি তাহাও মিথ্যা নহে। আমি এমন এক ব্যক্তি যখন হৃষ্টমনে থাকি তখন আমার জানামতে সর্বোত্তমটাই বলি। আর ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হই তখন আমার জানামতে সর্বনিকৃষ্টটাই বলি। আমি পূর্বাপর সবই সত্য বলিয়াছি— ক্রোধের বশে সত্যের অপলাপ করি নাই। তখন রাসূলুল্লাহ মন্তব্য করিলেন:
"নিশ্চয় কোন কোন বক্তব্য যাদুকরী প্রভাবসম্পন্ন।" লক্ষণীয়, দুইজন আগন্তুকের বাকযুদ্ধও রাসূলুল্লাহ ان من البيان سحرا. পূর্ণভাবে উপভোগ করিলেন এবং তাঁহার সাহাবীগণকেও উপভোগ করিতে দিলেন। সাথে সাথে একজন বাগ্মী বাকপটু ব্যক্তির প্রশংসার মাধ্যমে পৃথিবীর তাবৎ বাগ্মী, বাকপটু ব্যক্তি ও কথা সাহিত্যিকের প্রেরণার উৎসরূপে একটি উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় ভূমিকাও তিনি রাখিয়া গেলেন।
তামীম প্রতিনিধি দলের আগমনের হেতু
ওয়াকিদীর বর্ণনা অনুসারে তামীম প্রতিনিধি দলের আগমনের হেতু এই যে, উহারা খুযা'ঈদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাঁয়তারা করিতেছে এবং অস্ত্র শানাইতেছে, এই সংবাদ পাইয়া রাসূলুল্লাহ উয়ায়না ইব্‌ন বদর (রা)-কে এমন পঞ্চাশজন মুজাহিদের নেতৃত্বে সেদিকে প্রেরণ করিলেন যাহাদের মধ্যে একজনও মুহাজির বা আনসার ছিলেন না। ঐ বাহিনী তামীম গোত্রের এগারজন পুরুষ, এগার জন নারী এবং তিনজন শিশু-কিশোরকে বন্দী করিয়া আনে। ঐ বন্দীদের মুক্তির উদ্দেশ্যে উতারিদ, যিবিরকান, কায়স ইব্‌ন 'আসিম, কায়স ইবনুল হারিছ, নু'আয়ম ইব্‌ন সা'দ, আকরা 'ইব্‌ন হাবিস, রাবাহ ইবনুল হারিছ এবং 'আমর ইবনুল আহতাম প্রমুখ নব্বইজন, মতান্তরে ৮০ জন রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে আগমন করেন। তাহারা মসজিদে আসিয়া প্রবেশ করেন। তখন বিলাল (রা) যুহরের নামাযের আযান দেন। লোকজন রাসূলুল্লাহ -এর আগমনের প্রতীক্ষায় ছিল। তখন ঐ আগন্তুকগণ রাসূলুল্লাহ -এর হুজরার নিকট দাঁড়াইয়া
•তাঁহাকে ডাকিতে থাকিলে তাঁহাদের ব্যাপারে আল-কুরআনের আয়াত নাযিল হয়—যাহার বিবরণ ইতোপূর্বেই দেওয়া হইয়াছে।
ইন জারীর সনদসহ বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -কে ঐভাবে ডাকাডাকি করিতেছিল তিনি হইলেন আক্রা'- ইবন হাবিস (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৪৪-৪৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বনূ সা'দ প্রতিনিধি দিমাম ইব্‌ন ছা'লাবার আগমন

📄 বনূ সা'দ প্রতিনিধি দিমাম ইব্‌ন ছা'লাবার আগমন


৩. বনূ সা'দ প্রতিনিধি দিমাম ইব্‌ন ছা'লাবার আগমন
বনূ সা'দ দিমাম ইব্‌ন ছা'লাবাকে তাহাদের প্রতিনিধিস্বরূপ নবী দরবারে প্রেরণ করে। আল্লামা শিবলী নু'মানীর ভাষায়, তিনি যেভাবে নবী কারীম -এর দরবারে তাঁহার দূতিয়ালীর দায়িত্ব পালন করেন তাহা ছিল বেদুঈন আরবদের সরলতা ও স্বাধীনচেতা বেপরোয়া চরিত্রের এক মূর্তিমান প্রকাশ। সহীহ বুখারীর বিভিন্ন অধ্যায়ে উহার আলোচনা স্থান পাইয়াছে। তন্মধ্যে উক্ত গ্রন্থের কিতাবুল ইল্মের বর্ণনা এইরূপ: হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, একদা আমরা নবী দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি উষ্ট্রে আরোহণ করিয়া মসজিদে নববীর সম্মুখে তাহার উট থামাইয়া উপস্থিত লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করিল, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে? সাহাবীগণ বলিলেন, "ঐ যে তাকিয়ায় হেলান দিয়া উপবিষ্ট গৌরবর্ণবিশিষ্ট পুরুষ।"
আল্লামা ইবন কাছীর (র) ইবন ইসহাক, মুহাম্মদ ইবনুল ওয়ালীদ ইব্‌ন নু'আয়ফি কুরায়ব ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে উহার যে বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতে ঐ ব্যক্তির বর্ণনা ও প্রশ্নের ভাষা এইরূপ:
وكان ضمام رجلا جلدا اشعر ذا غديرتين فاقبل حتى وقف على رسول الله ﷺ جالس في اصحابه فقال ايكم ابن عبد المطلب ؟
"আর দিমাম ছিলেন এক বিশালবপু সুদীর্ঘ কেশধারী, মাথার দুই পাশে দুইটি গুচ্ছবিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনি অগ্রসর হইয়া সাহাবীগণ পরিবেষ্টিত অবস্থায় উপবিষ্ট রাসূলুল্লাহ -এর দিকে অগ্রসর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের সন্তান কে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৫খ., পৃ. ৬০)?
অবশিষ্ট বর্ণনা প্রায় একই। তাই আমরা আল্লামা শিবলী উদ্ধৃত সেই বর্ণনায়ই ফিরিয়া যাইতেছি "তখন ঐ আগন্তুক ব্যক্তি বলিল, হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তান! রাসূলুল্লাহ বলিলেন, আমি ইতোমধ্যে তোমার আহ্বানে সাড়া দিয়াছি। সেই ব্যক্তি বলিল, আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করিব এবং আমার প্রশ্ন হইবে অতি কঠোর, কাঠখোট্টা। কিছু মনে করিবেন না। রাসূলুল্লাহ বলিলেনঃ তুমি নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করিতে পার। সেই ব্যক্তি বলিল, আপন প্রতিপালকের শপথ করিয়া বলুন তো দেখি, আল্লাহ্ তা'আলা কি সত্যসত্যই আপনাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রাসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছেন? তিনি জবাব দিলেন, হাঁ, অবশ্যই। আবার সে কসম দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তিনি কি আপনাকে পাঞ্জেগানা নামাযের আদেশ করিয়াছেন? অনুরূপভাবে সে যাকাত, রোযা ও হজ্জ সম্পর্কেও প্রশ্ন করিলে রাসূলুল্লাহ তাহার প্রত্যেকটি প্রশ্নের জবাবে বলিলেন, হাঁ। সমস্ত প্রশ্নের জবাব পাওয়ার পর সেই ব্যক্তি তাহার নিজ পরিচয় ব্যক্ত
করিয়া বলিল, আমার নাম দিমাম ইব্‌ন ছা'লাবা। আমার সম্প্রদায় আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছে। এখন আমি চলিলাম। আপনি আমাকে যাহা যাহা বলিলেন আমি উহাতে বিন্দুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি করিব না। তাঁহার প্রস্থানমাত্র রাসূলুল্লাহ বললেন, "লোকটির ঐ বক্তব্যে যদি যথার্থ হইয়া থাকে, তবে সে সাফল্যমণ্ডিত" (সীরাতুন্নবী, উর্দু, ২খ., পৃ. ২৯)।
আল্লামা 'ইন্ন কাছীর তদীয় কিতাবে ইব্‌ন আব্বাসের যে রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতে যিমামের প্রস্থানের সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ তাঁহার সম্পর্কে যে উক্তি করিয়াছিলেন বলিয়া বিবৃত হইয়াছে তাহা হইল:
ان صدق ذو العقيصتين دخل الجنة.
"দুই ঝুঁটিধারী লোকটি যাহা বলিয়াছে তাহা যথার্থ হইয়া থাকিলে অবশ্যই সে জান্নাতী।" উক্ত বলনায় রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি দিমামের প্রশ্নসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল:
فان شدك الله الهك واله من كان قبل واله من هو كائن بعدك الله امرك ان تأمرنا ان نعبده وحده ولا نشرك به شيئا وان نخلع هذه الانداد التي كان اباؤنا يعبدون ؟
"আমি আপনাকে কসম দিতেছি সেই আল্লাহ্র যিনি আপনার প্রভু, আপনার পূর্ববর্তীদের প্রভু, আপনার পরে আগমনকারীদের প্রভু-আল্লাহই কি আপনাকে আদেশ করিয়াছেন আমাদিগকে একমাত্র তাঁহারই ইবাদত করিতে, তাঁহার সহিত আর কাহাকেও শরীক না করিতে এবং আমাদের পিতৃপুরুষের পূজ্য ঐসব দেবদেবীকে পরিহার করিতে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৫খ., পৃ. ৬১)?
ইসলামের প্রথম মৌলিক বিশ্বাসের কথাটি এই প্রশ্নে নিহিত বিধায় এই প্রশ্নটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করিয়া সর্বপ্রথম এই ব্যাপারেই তিনি মুখ খুলিয়াছিলেন। যেমনটি বর্ণনা করিয়াছেন ইব্‌ন আব্বাস (রা)ঃ
فاتی بعیره فاطلق عقاله ثم خرج حتى قدم على قومه فاجتمعوا اليه وكان اول ما تكلمه ان قال بئست اللات والعزى.
"অতঃপর দিমাম তাঁহার উটের নিকট পৌঁছিয়া উহার বন্ধন খুলিয়া বাহির হইয়া পড়িলেন। তিনি গিয়া তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট উপনীত হইলেন। লোকজন তাঁহার নিকট আসিয়া জমায়েত হইল। তখন সর্বপ্রথম তিনি যে বাক্যটি বলিলেন তাহা ছিলঃ লাত ও উয্যারা কতই না মন্দ! তাঁহার সম্প্রদায়ের লোকজনের নিকট তাহা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তাঁহারা তাহার অনিষ্ট হইবে ভাবিয়া বলিল:
مه يا ضمام اتق البرص اتق الجذام اتق الجنون.
"চুপ কর হে দিমাম! শ্বেত, কুষ্ঠ ও উম্মাদনা জ্ঞাপক হওয়াকে ভয় কর" !!!
কিন্তু দিমাম তো ঐ দেবদেবীকে বিসর্জন দিয়া ঐ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করিয়া নবী দরবার হইতে ঈমানের তেজে বলীয়ান হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছেন। তিনি ঐসবে কর্ণপাত করিবেন কেন? তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দিলেন:
ওয়েলকাম আন্হুমা ওয়াল্লাহ লা ইয়াযুররান ওয়ালা ইয়ানফান আনাল্লাহ ক্বাদ বা'আছা রাসুলান ওয়া আন্যলা আলাইহি কিতাবা ইস্তান্ফিকুম বিহি মিম্মা কুন্তুম ফিহি ওয়ানি আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহْدাহু লা শারীকা লাহু ওয়ান্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহূ ওয়া ক্বাদ জু'ইতুকুম মিন ইনদিহি বিমা ইয়ামরুকুম বিহী ওয়ামা ইয়ানহাকুম আনহু.
"তোমাদের সর্বনাশ হউক! আল্লাহ্র কসম, ঐ দুইটি দেবদেবী, তোমাদের কোন ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহ্ তা'আলা একজন রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন এবং তাঁহার প্রতি একটি কিতাব নাযিল করিয়াছেন যাহাতে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের প্রাচীন কুসংস্কারাদি হইতে মুক্ত করিতে সক্ষম হন। আমি সাক্ষ্য দিতেছি- ঘোষণা করিতেছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তিনি একক, তাঁহার কোন শরীক নাই এবং মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল। আমি এইমাত্র তোমাদের প্রতি তাঁহার আদেশ-নিষেধের বিধানসহ তাঁহার নিকট হইতে আসিয়াছি।"
উহার ফলও ফলিল চমৎকার। রাবীর ভাষায়:
ফাউ আল্লাহ মা আমসা মিন যালিকাল ইয়াওমি ওয়াফি হাদরতি রাজুলান ওয়ালা আমরা'আতান ইল্লা মুসলিম.
"আল্লাহ্র কসম! সেই দিনই উপস্থিত পুরুষ ও মহিলা সকলে ইসলাম গ্রহণ করিলেন।" তাই ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন:
ফামা সামি'না বিওয়াফিদি কওমিন কানা আফযালু মিন দ্বিমাম ইবনি সা'লাবা.
"দিমাম ইব্‌ন ছা'লাবা-এর চেয়ে উত্তম কোন গোত্রপ্রতিনিধির কথা আমরা কোন দিনও শুনি নাই।"
আহমদ ও আবূ দাউদও ভিন্ন ভিন্ন সনদে উক্ত হাদীছখানা বর্ণনা করিয়াছেন। উক্ত বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনাটি ছিল মক্কা বিজয়ের পূর্বেকার। কেননা মক্কা বিজয়কালেই খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ উয্যা মূর্তি ধ্বংস করিয়াছিলেন। উক্ত হাদীছ হইতে আরও একটি বিষয় প্রমাস্তি হইল যে, কোন আলিম বা কোন বরেণ্য ব্যক্তির জন্য মজলিসে তাকিয়া বা সোফা জাতীয় আসনে হেলান দিয়া বসা বৈধ (ফাতহুল-বারী, ১খ., পৃ. ১৩৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন

📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের নবী (সা)-এর দরবারে আগমন


৪. হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের নবী-এর দরবারে আগমন
মক্কা বিজয়ের পর সর্বপ্রথম যে প্রতিনিধি দলটি নবী (স) দরবারে উপস্থিত হয় তাহারা ছিল নয় সদস্যবিশিষ্ট হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধি দল। রাসূলুল্লাহ তখন মক্কা বিজয় ও তায়েফ অবরোধ সমাপ্ত করিয়া বিপুল গনীমত সম্ভারসহ জি'ইররানায় আসিয়া তাঁবু গাড়িয়াছেন। ছয় হাজার বন্দী, চব্বিশ হাজার উট, চল্লিশ হাজার মেষ, ছাগল, চার হাজার উকিয়া রৌপ্য তখন তাঁহার বিজিত গনীমত-সম্ভারে মওজুদ। ১০-১২ দিন পর্যন্ত তিনি সেখানে পরাজিত হাওয়াযিন গোত্রের লোকদিগকে মুক্ত করিবার জন্য লোক আসিবে ভাবিয়া অপেক্ষা করিলেন। কিন্তু তাহাদের কেহই আর আসিল না। অবশেষে তিনি ঐ গনীমত সম্ভার বিধি মুতাবিক যোদ্ধৃগণের মধ্যে বিতরণ করিয়া দিলেন (ফাতহুল-বারী, ৮খ., পৃ. ৩৮; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৯৩)।
উল্লেখ্য, রাসূলুল্লাহ-এর ধাত্রীমাতা হালীমা সা'দিয়া উক্ত গোত্রের মহিলা ছিলেন। হাওয়াযিন গোত্রের উক্ত প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন যুহায়র ইবন সুরাদ সা'দী জুশামী এবং
তাহার অপর এক সঙ্গী ঐ হিসাবে ছিলেন রাসূলুল্লাহ-এর দুগ্ধ-চাচা। দলপতি দাঁড়াইয়া করুণ কণ্ঠে আহ্বান জানাইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ বন্দীদের মধ্যে আপনার খালা-ফুফু প্রতিপালনকারীনিগণ রহিয়াছেন, যাহারা একসময় আপনাকে কোলে-পিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছেন। আমরা যদি হারিছ গাস্সানী বা নু'মান ইব্‌ন মুনযিরকেও দুগ্ধ পান করাইয়া থাকিতাম তবে তাহাদের নিকটও এমন বিপদের সময় মঙ্গলের আশা করিতে পারিতাম। আপনি তো মানবকুল শ্রেষ্ঠ! আপনার নিকট আমাদের প্রত্যাশা অনেক বড়। এই সময় তাঁহার করুণাদৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া কবিতার ছন্দে তাহারা নিবেদন করেন। যে বাঞ্ছিত অপরূপ ভাষা লালিত্যের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তদীয় শ্রেষ্ঠ নবীকে ঐ বংশে শৈশবে লালন-পালনের কুদরতী ব্যবস্থা করিয়াছিলেন তাহাদের অনবদ্য কবিতার বঙ্গানুবাদ কাব্যে করা সুকঠিন। তবুও সাহসে বুক বাধিয়া এই দীন লেখক নিচে তাহার কাব্যানুবাদ পেশ করিল।
امتن علينا رسول الله في كرم فانك المرأ نرجوه ومنتظر امنن على بيضة قد عاقها قدر ممزق شملها في دهرها غير ابقت لنا الدهر هتانا على خوف على قلوبهم الغماء والمغمر ان لم تداركهم نعماء تنشرها يا ارجح الناس حلما حين تختبر امين على نسوة قد كنت ترضعها اذ فوك تملوها من كضها الدرر لا تجعلنا كمن سالت نعامته واستبق منا فانا معسر زهر انا لنشكر للنعماء اذ كفرت وعندنا بعد هذا اليوم مدخر فالبس العفو ترضعه من امهاتك ان العفو مشتهر عند الهياج اذا ما استوقد الشرر يا خير من مرحت كمت الجياد به انا نؤمل عفوا منك تلبسه هدى البرية اذ تعفوا وتنتصر يوم القيامة اذ يهوى لك الظفر فاغفر عفا الله عما انت راهبه
আমাদের প্রতি সদয় হোন হে রাসূল আল্লাহ্! আশার আধার! অবসান হোক মোদের প্রতীক্ষার। ভাগ্য বঞ্চনা যে কওমেরে করিয়াছে বঞ্চিত হতাশ যুগচক্র আবর্তনে সবকিছু যার হয়েছে বিনাশ তাদেরে করুন দয়া (পায় যেন বাঁচার আশ্বাস) কালচক্র আমাদের করিয়াছে শিকার হতাশার, অন্তরে ছড়িয়ে আছে, বিষাদ বিদ্বেষ হাহাকার। বিশ্ব-শিশুকুলে তুমি সর্বশ্রেষ্ট পসন্দের জন মানব কুলের তুমি নির্যাস (কুসুমের সুগন্ধি যেমন)। সহিষ্ণুতা পরীক্ষিত যার সেই শ্রেষ্ঠ সুজন দয়া তব সহায় না হলে আমাদের নিশ্চিত মরণ। যেসব নারীর শিরা/সিঞ্চিত দুধে ভরিয়াছে মুখ আপনার
শৈশবে। তাদের প্রতি সদয় হোন হে সাগর দয়ার। ধ্বংস যারা হয়ে গেছে আমাদের করিও না তাদের মতন বাঁচিয়ে রাখুন মোদের নহি মোরা কৃতজ্ঞ কুজন। আমরা স্মরণ রাখি লোকে যবে করে বিস্মরণ আজকের পরেও মোরা/মহত্ত্বের কথা তব/করিব কীর্তন। যে মায়েরা একদিন আপনারে করেছে স্তন্য দান মুছে দিক তাদের দুঃখ আপনার ক্ষমা অফুরান দিক দিগন্তে প্রচারিত যে ক্ষমার সুনাম-বাখান। যুদ্ধের জ্বলন্ত শিখা প্রজ্বলিত যবে রণাঙ্গণে 'কামীত' অশ্বেরা চাঙ্গা হয় যার স্পর্শ-আরোহণে হে সেই মহান সত্তা তব কাছে আমাদের আশা ক্ষমা ও সাহায্য পাবো দূর হবে তাবৎ হতাশা সনির্বন্ধ অনুরোধ/নিজ গুণে আমাদেরে করুন মার্জনা ভয়ঙ্কর কিয়ামতে আপনারে ক্ষমিবেন আল্লাহ্ রব্বানা আপনার সাফল্যে আমরা করিব প্রার্থনা।
(আর-রাওদুল উনুফ, ২খ., পৃ. ৩০৬; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ.১৯৬; যুরকানী, ৪খ., পৃ. ৩)।
আল্লাহ্র রাসূল তাহাদের জবাবে বলিলেন, আমি তোমাদের জন্য অনেক অপেক্ষা করিয়াছি। এখন তো সমস্ত গণীমত-সম্ভার ভাগবণ্টন হইয়া গিয়াছে। দুইটি বিষয়ের একটি তোমাদেরকে মানিয়া লইতে হইবে। হয় তোমরা বন্দীদিগকে ফেরত লও, নতুবা অন্যান্য ধন-সম্পদ। এখন তোমরাই বল, কোনটাকে তোমরা অগ্রাধিকার দিবে। তাহারা জবাব দিলেন, আমরা আমাদের বন্দীদিগকেই ফেরত চাই, উট-বকরী পশুপালের দাবি আমরা করিব না।
রাসূলুল্লাহ বলিলেন, আমার এবং বনু হাশিম, বনূ মুত্তালিবের অংশে যেসব বন্দী পড়িয়াছে সেগুলি তোমরা লইয়া যাও। কিন্তু অন্যান্য মুসলমানের ভাগের বন্দীদের ব্যাপারে আগামীকাল যুহরের নামাযের পর তোমরা দাঁড়াইয়া আবেদন জানাইবে। আমি তোমাদের পক্ষে সুপারিশ করিব (অর্থাৎ সুপারিশের দ্বারা যাহারা খুশীমনে নিজেদের ভাগের বন্দীদেরকে ছাড়িয়া দিবে তাহাদেরকে তোমরা ফেরত লইয়া যাইতে পারিবে। বলপূর্বক কাহারও নিকট হইতে বন্দী কাড়িয়া লইয়া দেওয়ার দায়িত্ব আমি গ্রহণ করিব না)।
পর দিন সত্যসত্যই বনূ হাওয়াযিন গোত্রের বক্তাগণ প্রাঞ্জল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তাহাদের বন্দীদিগকে ফেরত দানের ফরিয়াদ জানাইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ খুতবা দিতে দণ্ডায়মান হইয়া বলিলেন,
"তোমাদের এই ভাই হাওয়াযিনগণ মুসলমান হইয়া তোমাদের নিকট উপস্থিত। আমি আমার নিজের এবং নিজবংশ (বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিব)-এর ভাগের বন্দীদিগকে ইতোমধ্যেই মুক্ত করিয়া দিয়াছি। আমি মনে করি, অন্যান্য মুসলমানদেরও উচিত তাহাদের বন্দীদিগকে মুক্ত করিয়া দেওয়া। যে ব্যক্তি খুশীমনে তাহা করিবে, তাহা তাহার জন্য উত্তম হইবে। নতুবা পরবর্তী কালে আমি উহার বিনিময় দান করিতে প্রস্তুত।"
সকলেই খুশীমনে নিজ নিজ অধিকারভুক্ত বন্দীদিগকে মুক্ত করিয়া দিলেন। এইভাবে দেখিতে দেখিতে ছয় হাজার বন্দী মুক্ত হইয়া গেলেন (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ২৬)।
হাওয়াযিন প্রতিনিধিগণ যে বলিয়াছিলেন, এই বন্দীদের মধ্যে আপনাকে কোলে-পিঠে করিয়া যেসব মহিলা শৈশবে প্রতিপালন করিয়াছিলেন তাহারাও রহিয়াছেন, উহা মিথ্যা ছিল না। রাসূলুল্লাহ -এর দুধবোন অর্থাৎ ধাত্রীমাতা হালীমার কন্যা শায়মাও ঐ বন্দীদের মধ্যে ছিলেন। সাধারণ বন্দীদের মত আচরণ করিয়া মুসলমানগণ যখন তাহাকে টানিয়া হেঁচড়াইয়া লইয়া যাইতেছিল, তখন তিনি আপন পরিচয় ব্যক্ত করিয়া বলিলেন, ওহে! আমি কিন্তু তোমাদের নবীর ভগ্নি! অর্থাৎ আমার সহিত যেনতেন আচরণ মোটেই শোভনীয় নহে। তখন লোকজন তাহাকে নবী-দরবারে নিয়া উপস্থিত করিল।
শায়মা অগ্রসর হইয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি তোমার দুধ-বোন শায়মা। রাসূলুল্লাহ তাহাকে উহার কোন প্রমাণ দিতে বলিলে তিনি বলিলেন, প্রমাণ আছে বৈকি! ঐ দেখ, শৈশবে তুমি আমাকে কামড় দিয়া দাঁত বসাইয়া দিয়াছিলে, এখনও উহার চিহ্ন রহিয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ তাহা সনাক্ত করিতে পারিলেন এবং মারহাবা বলিয়া তাহাকে স্বাগতম জানাইলেন। নিজের গায়ের চাদর তাহার সম্মানার্থে বিছাইয়া দিলেন। আনন্দে তাঁহার চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। শৈশবের কত স্মৃতি তাঁহার পবিত্র মনে জাগরুক হইয়া উঠিয়াছিল কে জানে! হাঁ, এই শায়মাই তো তাঁহাকে ছড়া কাটিয়া ঘুম পাড়াইতেন। কোলে দুলাইয়া আদর করিতেন। তিনিই তো মাতৃস্নেহে ভগ্নিস্নেহে তাঁহাকে দীর্ঘ কয়েকটি বৎসর লালন-পালন করিয়াছেন। মুহূর্তে তাঁহার অন্তর উদ্বেলিত হইয়া উঠিল।
আল্লাহ্র রাসূল অতীব সম্ভ্রমের সহিত তাঁহার দুধ-ভগ্নিকে বলিলেন, বুবুজান! আপনি যদি আমার সহিত থাকিতে চান আপনাকে পরম যত্নে ও সম্মানে রাখা হইবে। আর যদি নিজ সম্প্রদায়ের নিকটই চলিয়া যাইতে চান, তবে তাহাও আপনার মর্জি। শায়মা নিজ সম্প্রদায়ের নিকট চলিয়া যাইবার আগ্রহ ব্যক্ত করিলেন। তিনি এই সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ তাঁহাকে কয়েকটি উট-বকরী, তিনটি দাস এবং একটি দাসী উপঢৌকনস্বরূপ দান করিয়া সসম্মানে তাঁহাকে বিদায় করিলেন। প্রায় ষাট বৎসর পূর্বের মধুর স্মৃতি মন্থন করিতে করিতে শায়মা আবার তাঁহার মরু প্রান্তরের আবাসে ফিরিয়া গেলেন। দুধ-ভগ্নির প্রতি আল্লাহ্র রাসূলের ভক্তি ও প্রীতিপূর্ণ আচরণ বিশ্বমানবের জন্য এক অনুপম আদর্শরূপে চিরভাস্বর হইয়া রহিল (আল-ইসাবা, ৪খ., পৃ. ৩৪৪; শায়মা প্রসঙ্গের আলোচনা)।
এইভাবে হাওয়াযিন প্রতিনিধিগণ সকল দৌত্যকর্ম সম্পাদন করিয়া নিজেদের বন্দী পুত্র-কন্যাগণকে লইয়া স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করিলেন। নবী কারীম অনুরোধে যাহারা বিনিময় প্রাপ্তির আশায় বন্দীমুক্তি করিয়াছিলেন, তাহাদেরকে প্রতিটি বন্দীর মুকাবিলায় পূর্ণ প্রতিশ্রুতি অনুসারে ছয়জন করিয়া দাস-দাসী দেওয়া হইয়াছিল।
নবী -এর দরবারে হাওয়াযিন-নেতা মালিক ইব্‌ন আওফের আগমন ও উপঢৌকন লাভ: হাওয়াযিন গোত্রের নবী দরবারে আগমনের বর্ণনায় আল্লামা ইব্‌ন কাছীর হুনায়ন যুদ্ধের কাফির পক্ষের নায়ক হাওয়াযিন-নেতা মালিক ইবন 'আওফ নাস্ত্রীর ইসলাম গ্রহণ ও নবী কারীম -এর নিকট হইতে প্রচুর উপঢৌকন লাভের বিবরণ বিবৃত করিয়াছেন। ইব্‌ন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ হাওয়াযিন প্রতিনিধিদের নিকট জিজ্ঞাসা করেন, মালিক ইব্‌ন আওফ কী করিতেছে? তাহারা জানান, সে তায়েফে ছাকীফ গোত্রের সহিত অবস্থান করিতেছে।
তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: তাহাকে সংবাদ দাও, সে যদি ইসলাম গ্রহণ করিয়া আমার নিকট আসে তবে তাহার হৃত পরিবারবর্গ ও ধন-সম্পদ তাহাকে প্রত্যর্পণ করা হইবে। অতিরিক্ত আরও এক শতটি উট তাহাকে দান করা হইবে।
এই সংবাদ পাওয়ামাত্র মালিক ইব্‌ন আওফ দ্রুত ছাকীফ গোত্র হইতে বাহির হইয়া জিইরানায় বা মক্কায় রাসূলুল্লাহ-এর নিকট উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ তাহার পরিবারের বন্দীগণকে এবং তাঁহার ধন-সম্পদ ফিরাইয়া দিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলমানের জীবনই অতিবাহিত করেন। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ ঐ সময় তাহাকে তাহার কওমের নওমুসলিমগণের এবং পার্শ্ববর্তী ছুমালা, সালমা ও ফার্ম গোত্রের নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ যখন তাহাকে এক শত উট দান করিলেন তখন তিনি কবিতায় তাঁহার প্রশংসা করেন এই ভাবে:
ما ان رأيت ولا سمعت بمثله في الناس كلهم بمثل محمد ومتى تشاء يخبرك عما في غد اوفى واعطى للجزيل اذا جبدى واذا الكتيبة عردت انيابها بالسموى وضرب كل مهند فكانه ليث على اشباعه وسط الهباءة خادر في مرصد
"দেখি নাই কভু শুনি নাই কভু তাঁর মত কেউ হয় মানব জাতিতে তুল্য কেহই মুহাম্মাদের নয় দানের হস্ত প্রসারিত তাঁর করেন পূর্ণ দান ভবিষ্যতের খবর দেবেন যদি কেউ তাহা চান যখন পূর্ণ সৈন্যবাহিনী বর্শা ও তলোয়ারে সজ্জিত হয়ে উট-ঘোড়া চড়ে দাপট মহড়া করে সিংহসম দাঁড়ান তখন শাবকের হেফাযতে বিবরের মুখে কেশর দুলিয়ে (হটেন না কোন মতে)। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ.৩৬০, হাওয়াযিন প্রতিনিধি দলের আলোচনা প্রসঙ্গে)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00