📄 দুইখানা জাল চিঠি
উপরিউক্ত পত্রখানিতে বানান বিভ্রাট, অতিশয়োক্তি, ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া একই কথা বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা এবং ইহার বিশাল কলেবর দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, উহা একটি বানোয়াট পত্র— যাহা মহানবী -এর নামে চালাইয়া দেওয়া হইয়াছে। তাই রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্র বিশেষজ্ঞ আলী ইবন হুসায়ন আলী আল-আহ্মাদী তদীয় কিতাবে المغتلة الكتب বা বানোয়াট পত্র শিরোনামে এই পত্রখানা উদ্ধৃত করিয়াছেন (প্রাগুক্ত)।
দুইখানা জাল চিঠি
আল্লামা ইব্ন কাছীর বর্ণনা করেন, খায়বারের ইয়াহুদীগণ দুইটি পত্র নিজেরা রচনা করিয়া ঐগুলি রাসূলুল্লাহ -এর পত্র বলিয়া চালাইয়া দিবার প্রয়াস পায়। তিনি বলেন,
قد ادعى يهود خيبر في ازمان متأخرة بعد الثلاث مائة ان بايديهم كتابا من رسول الله ﷺ فيه وضع الجزية عنهم وقد اغتر بهذا الكتاب بعض العلماء حتى قال باسقاط الجزية عنهم من الشافعية ابو على بن خيرون وهو كتاب مزور مكذوب مفتحل لا اصل له.
“খায়বারের ইয়াহুদীগণ পরবর্তী যুগ হিজরী তিন শতক অতিবাহিত হওয়ার পর দাবি করে যে, তাহাদের নিকট রাসূলুল্লাহ্ -এর একখানা পত্র রহিয়াছে যাহাতে তাহাদের উপর হইতে জিয়া রহিত করা হইয়াছে। এই পত্রখানা দ্বারা কোন কোন আলিম প্রতারণা ও বিভ্রান্তির শিকার হইয়াছেন। এমনকি তাহারা উহার প্রেক্ষিতে ইয়াহুদীদের উপর হইতে জিয়া রহিত হওয়ার পক্ষে মতামত পর্যন্ত ব্যক্ত করিয়াছেন। শাফিঈ মাযহাবের আবূ আলী ইব্ন খায়রূন তাহাদের অন্যতম। অথচ উক্ত পত্রখানা কৃত্রিম, মিথ্যা এবং রটনামাত্র, উহার কোন ভিত্তি নাই” (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ২১৯)।
কেবল একটি পত্রের মধ্যেই কতিপয় কারণ দর্শাইয়া উহাকে মিথ্যা ও বাতিল প্রতিপন্ন করা হইয়াছে। উহার বর্ণনা দিতে গিয়া যাহারা উহাকে বাতিল প্রতিপন্ন করিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে রহিয়াছেন ইবনুস সাব্বা। তিনি তদীয় মাসাইল গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আলোচনা করিয়াছেন। আরও আছেন শায়খ আবূ হামিদ, তিনি তদীয় ‘তা’লীক’-এ এই সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন। ইবনুল মাসলামা এই ব্যাপারে একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা রচনা করিয়াছেন।
হিজরী সপ্তম শতাব্দীর পর তাহারা আরও একটি পত্র লইয়া তোলপাড় সৃষ্টি করেন। উপরিউক্ত মনীষিগণ তাঁহাদের আলোচনায় ঐ পত্রটির উল্লেখ করিয়াছেন। এই পত্রটিও একটি মিথ্যা
কারসাজি। কেননা উহাতে সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর শরীক থাকার কথা বলা হইয়াছে। অথচ তিনি খায়বার অভিযানের পূর্বেই ইনতিকাল করিয়াছেন। উহাতে হযরত মু'আবিয়া ইব্ন আবী সুফ্যানের শামিল থাকার কথা উল্লিখিত হইয়াছে। অথচ তিনি তখনও মুসলমান হন নাই। উহার লেখকরূপে হযরত আলী ইব্ন আবী তালিবের কথা রহিয়াছে, অথচ উহা সত্য নহে। উহাতে জিয়া মওকূফের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, অথচ তখনও জিযয়ার বিধান নাযিলি হয় নাই। উহার বিধান প্রথম যখন নাযিল হয় তখন নাজরানের খৃস্টানগণের নিকট হইতে উহা আদায়ও করা হয়। তাহারা তাহাদের প্রতিবিধানসহ নবম হিজরীতে নবী-এর দরবারে আসিয়াছিল বলিয়া ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. মাকাতীবুর রাসূল, ৩খ., পৃ. ৬২৬)।
আলী ইব্ন হুসায়ন আলী আল-আহমাদী বলেন, এই পর্যন্ত আমি উক্ত দুইটি মিথ্যা জাল পত্রের সন্ধান লাভে সক্ষম হইয়াছি। আমি সাতটি জাল পত্র উদ্ধারে সমর্থ হইয়াছি। তন্মধ্যে চারিখানা খৃস্টানদের উদ্দেশ্যে এবং অপর দুইখানা পত্র মাকান্নার ইয়াহুদীদের উদ্দেশ্যে লিখিত। ইব্ন কাছীর (র)-এর উপর্যুক্ত পত্র দুইখানা মিলাইয়া দেখা যায়, জাল পত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় সর্বসাকুল্যে নয়খানা। তিনি আরও লিখেন :
والذي اظن ان افتعال هذه الكتب لا يحتاج الى بيان لان المتدبر المتبع الذي له ادنى المام يكتب رسول الله الله يعلم خروج هذه الكتب عن اسلوب كتبه وان اتارا الكلفة والمتصنع فيها جلية واضحة.
"আমার ধারণা, উক্ত পত্রগুলির জালিয়াতিপূর্ণ হওয়ার ব্যাপারে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। কেননা রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রাবলী সম্পর্কে যাহাদের সাধারণ ধারণা রহিয়াছে এমন যে কোন গবেষক ও অনুসন্ধানকারী ঐ জাল পত্রগুলির বর্ণনাভঙ্গি হইতেই আঁচ করিতে পারিবেন যে, কৃত্রিমতা ও জালিয়াতির প্রচেষ্টা তাহাতে অত্যন্ত স্পষ্ট" (মাকাতীবুর রাসূল, ৩খ., পৃ. ৬২৬-৭)। গ্রন্থপঞ্জী : বরাত নিবন্ধগর্ভে উল্লিখিত।