📄 প্রশাসকবৃন্দের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
اذا ابردتم الى بريدا فابردوه فابعثوه حسن الوجه حسن الاسم.
"যখন তোমরা আমার নিকট কোন বার্তাবাহী প্রেরণ করিবে তখন উত্তম চেহারা ও উত্তম নামবিশিষ্ট দূত প্রেরণ করিবে” (কানযুল উম্মাল, ৩খ., পৃ. ১৯৬, নং ২৯৬৭)। কানযুল 'উম্মালের ২৯৬৬ নং রিওয়ায়াতের পাঠে আছে:
اذا بعثتم الى رجلا فابعثوه حسن الوجه حسن الاسم.
আবার উক্ত কিতাবের ২৯৬৮ নং রিওয়াতের পাঠে আছে:
اذا بعثت الى بريدا فاجعله جسيما وسيما .
অর্থ প্রায় অভিন্ন, তবে সর্বশেষে উক্ত শব্দদ্বয় جسيما وسيما এর অর্থ হইতেছে "বলিষ্ঠ সুপুরুষ এবং সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট লোক।"
কানযুল উম্মালে এই বক্তব্য পত্রের মাধ্যমে প্রদান করা হইয়াছিল বলিয়া সুস্পষ্ট উল্লেখ নাই। তবে আল্লামা শারাফুদ্দীন তদীয় "আন-নাসু ওয়াল-ইজতিহাদ” গ্রন্থে (পৃ. ১৭৭) মালিক ও বাযযারের বরাতে উহাকে পত্র বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছেন। পত্রের মূল পাঠ তাঁহার গ্রন্থ হইতেই গৃহীত হইয়াছে এবং বন্ধনীর মধ্যে উক্ত শব্দটি কানযুল উম্মালের (মাকাতীবুর রাসূল, ৩খ., পৃ. ৬১৫)।
📄 আত্তাব ইবন উসায়দ (রা)-এর নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ أَن رضوا والا فأذنهم بحرب.
"হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যাহা বকেয়া আছে তাহা ছাড়িয়া দাও, যদি তোমরা মুমিন হইয়া থাক। তাহারা সম্মত হইলে তো ভাল, অন্যথায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও” (দূররে মানছুর, ১খ., পৃ. ৩৬৬)।
উক্ত পুত্রখানা মূলত আল-কুরআনের ২৭৮ ও ২৭৯ নং আয়াতদ্বয়ের বক্তব্য, ঈষৎ শাব্দিক পার্থক্য রহিয়াছে। পত্রে উল্লিখিত ان رضوا والا فاذنهم بحرب অংশটুকুর বক্তব্য আয়াতে আছে এইরূপ:
فَإِنْ لَّمْ تَفْعَلُوا فَأَذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ.
"যদি তোমরা তাহা না কর (সূদ না ছাড়) তবে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের সহিত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।"
আয়াতের শেষাংশে আছে:
وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ.
"কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। ইহাতে তোমরা অত্যাচার করিবে না, আবার অত্যাচারিতও হইবে না"।
📄 পত্রের প্রেক্ষাপট
তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআনে মুফতী মুহাম্মাদ শফী' (র) এই সম্পর্কে যে বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছেন উক্ত পত্রের প্রেক্ষাপটস্বরূপ নিম্নে তাহার কিয়দংশ পাঠকবর্গের অবগতির
জন্য উদ্ধৃত করা হইল: “সূদ হারাম হওয়া সংক্রান্ত বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে আরবে ব্যাপকভাবে সূদী কারবারের প্রচলন ছিল। সূদের নিষেধাজ্ঞা নাযিল হইলে মুসলমানগণ যথারীতি সূদের কারবার ত্যাগ করেন। বনূ মাখযূম ও বনূ ছাকীফের মধ্যে পরস্পর যে সূদের কারবার ছিল বনূ মাখযূম গোত্রের ইসলাম গ্রহণের পর তাহারা সূদের দেনা পরিশোধকে অবৈধ জ্ঞান করে, কিন্তু বনূ ছাকীফ গোত্রীয়গণ তাহাদের প্রাপ্য সূদের দাবি ছাড়িতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ তাহারা তখনও মুসলমান ছিল না, অবশ্য মুসলমানদের সহিত শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। বনূ মাখযূম সম্প্রদায়ের বক্তব্য ছিল, মুসলমান হওয়ার পর ধর্মের বিধান লঙ্ঘন করিয়া আমরা আমাদের বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ হইতে অবৈধ সূদ পরিশোধ করিতে পারিব না।
এই মতবিরোধের ঘটনাস্থল ছিল মক্কা মুকাররামা। তখন মক্কা বিজিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ -এর পক্ষ হইতে মক্কার প্রশাসক ছিলেন আত্তাব ইবন উসায়দ (রা), মতান্তরে মু'আয (রা)। তিনি এই ব্যাপারে নির্দেশ লাভের জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট পত্র লিখেন। ইহার প্রেক্ষিতেই আল-কুরআনের সূদের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত উক্ত আয়াতসমূহ নাযিল হয়। ইহার সারকথা ছিল, ইসলাম গ্রহণ করার পর সূদের পূর্ববর্তী সকল লেনদেন অবিলম্বে মওকুফ করিয়া দিতে হইবে। অতীত সূদ গ্রহণ না করিয়া শুধু মূলধন আদায় করিতে হইবে।
উক্ত ইসলামী আইন কার্যকর হইলে মুসলমানরা তো তাহা মানিতে বাধ্য ছিলই, শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়া যাহারা ইসলামী আইনের প্রাধান্য স্বীকার করিয়া লইয়াছিল, তাহারাও সেই আইন মানিয়া লইতে বাধ্য ছিল। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ যখন বিদায় হজ্জের দিন প্রদত্ত তাঁহার ঐতিহাসিক ভাষণে পুনর্বার উক্ত আইন ঘোষণা করিলেন তখন এই কথাও প্রকাশ করিলেন যে, এই আইন ব্যক্তিবিশেষ, সম্প্রদায় বিশেষ কিংবা মুসলমানদের আর্থিক স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য করিয়া নহে, বরং সমগ্র মানবজাতির উন্নতি ও কল্যাণের স্বার্থেই প্রবর্তন করা হইয়াছে। তাই আমি সর্বপ্রথম অমুসলিমদের কাছে মুসলমানদের আমার সর্বঘনিষ্ঠ আত্মীয়-পরিজনদের প্রাপ্য বিরাট অঙ্কের সূদের বকেয়া মওকুফ করিয়া দিলাম। এখন অন্যদেরও বকেয়া সূদের দাবি নির্দেশটি পালন কষ্টসাধ্য ছিল বিধায় নির্দেশের পূর্বে اِتقوا الله (আল্লাহকে ভয় কর) এবং পরে إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (যদি তোমরা মু'মিন হইয়া থাক) যুক্ত করা হইয়াছে। তারপর পরবর্তী আয়াতে এই নির্দেশ অমান্যকারীদেরকে কঠোর শাস্তির কথা শুনান হইয়াছে। অর্থাৎ তোমরা যদি সূদ পরিহার না কর তবে আল্লাহ্ তা'আলা ও তদীয় রাসূলের পক্ষ হইতে যুদ্ধের ঘোষণা শুনিয়া লও। কুফর ব্যতীত অন্য কোন জঘন্য গোনার কারণে আল-কুরআনে এতবড় কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয় নাই। এই আয়াতের শেষে বলা হইয়াছে:
وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ.
"যদি তোমরা তওবা করিয়া ভবিষ্যতের জন্য বকেয়া সূদের দাবি পরিত্যাগে কৃতসঙ্কল্প হও, তবে তোমরা আসল মূলধন ফেরত পাইবে। মূলের অতিরিক্ত আদায় করিয়া তোমরা কাহারও উপর জুলুম করিতে পার না এবং কেহ মূলধনের চেয়ে কম দিয়া বা পরিশোধ বিলম্বিত করিয়া তোমাদের উপরও জুলুম করিতে পারিবে না।"
আয়াতে মূলধন প্রাপ্তিকে তওবার সহিত শর্তযুক্ত করা হইয়াছে। অর্থাৎ যদি তোমরা তওবা কর এবং ভবিষ্যতে সূদ ছাড়িয়া দিতে কৃতসংকল্প হও, তবেই তোমরা মূলধন ফেরত
পাইবে। ইহা হইতে স্পষ্টত ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সূদ পরিত্যাগের সংকল্প ঘোষণা করিয়া তওবা না করিলে মূলধনও ফেরত পাইবে না (তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারার ২৭৮-২৭৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গ, সংক্ষিপ্ত সৌদী সং., পৃ. ১৫১-২; মওলানা মহীউদ্দিন খান অনূদিত)।
সীরাত ইব্ন হিশামের বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ্ মক্কা হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনকালে মু'আয (রা)-কে ধর্ম শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে এবং আত্তাব ইব্ন উসায়দকে মক্কার প্রশাসকরূপে রাখিয়া যান। আত্তাব (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ইনতিকাল অবধি সেখানেই নিযুক্ত ছিলেন। হযরত আবূ বকর (রা)-এর ইনতিকালের দিন তিনি ইনতিকাল করেন (ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ.৬৯ এবং ১৪৮; আল-ইসাবা, ২খ., নং-৫৩৯৩; উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ৩৫৮; ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৫৫)।
📄 চাচা আব্বাস ইব্ন আবদিল মুত্তালিব (রা)-কে লিখিত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
তিনি হিজরতের আদেশ প্রার্থনা করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট পত্র লিখিলে জবাবে তিনি লিখেন:
اقم في مكانك يا عم الذي انت به فان الله ختم بك الهجرة كما ختم بي النبوة.
"হে পিতৃব্য! আপনি যে স্থানে আছেন সেখানেই অবস্থান করুন। কেননা আল্লাহ তা'আলা আপনার মাধ্যমে হিজরতের পরিসমাপ্তি ঘটাইবেন যেমন ঘটাইয়াছেন আমার দ্বারা নবুওয়াতের পরিসমাপ্তি" (কানযুল উম্মাল, ৭খ., পৃ. ৬৯; মাকাতীবুর রাসূল, ৩খ., পৃ. ৬১৬-৭)।