📄 হযরত সালমান ফারসীর দাসত্ব মুক্তি বিষয়ক রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
মাকাতীবুর রাসূল গ্রন্থের ১৮১ নং পত্ররূপে উদ্ধৃত উক্ত শিরোনামের পত্রে অতিরিক্ত আরও আছে:
ان الله تعالى يحب الخير الحليم المتعفف ويبغض الفاحش (العينين) البذاء السائل الملحف ان الحياء من الايمان والايمان في الجنة وان الفحش من البذاء والبذاء في النار.
"নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলা ভালবাসেন মঙ্গল, সহিষ্ণু, সংযমী ও পূত চরিত্র ব্যক্তিকে এবং তিনি অপছন্দ করেন অশ্লীলতাপ্রিয় (চক্ষুর অনাচারে অভ্যস্ত) ব্যক্তিকে এবং নাছোড়বান্দা যাজ্ঞাকারীকে। লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ এবং ঈমানের পরিণাম হইতেছে জান্নাত। আর অশ্লীলতা হইল নির্লজ্জতা এবং নির্লজ্জতার পরিণাম হইতেছে জাহান্নাম" (সাফীনাতুল বিহার, ৩খ., حدث শব্দের আলোচনায়, পৃ. ২২৯)।
লেখক বলেন, আবূ জা'ফার তাবারী তদীয় আদ-দালাইলে ইবন মাসউদ (রা)-এর সনদে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একদা এক ব্যক্তি হযরত ফাতিমা (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিল, হে রাসূল নন্দিনী! রাসূলুল্লাহ্ কি আপনার নিকট কিছু রাখিয়া গিয়াছেন? আপনি উহা আমার গলায় পরাইয়া দিন। তখন তিনি তাঁহার বাঁদীকে ডাকিয়া বলিলেন, হে বালিকা! ঐ চিরকুটটা লইয়া আস। সে উহা খুঁজিল, কিন্তু পাইল না। তিনি বলিলেন, হে হতভাগিনী! খুঁজিয়া দেখ। কেননা উহা আমার নিকট আমার হাসান-হুসায়নতুল্য প্রিয় ও মূল্যবান। তারপর সে উহা খুঁজিয়া বাহির করিল, সে উহা ঝাড়ু দিয়া একটি মটকার মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছিল। উহাতে উক্ত বাণী লিখিত ছিল" (মুহাদ্দিছ আন্-নূরী সঙ্কলিত আল-মুসতাদরাক, ২খ., পৃ. ৩৩৯; কিতাবুল জিহাদ অধ্যায় ৭১, 'অশ্লীলতা হারাম' শীর্ষক পরিচ্ছেদে, ইবন মাস'উদ (রা) পর্যন্ত পরিপূর্ণ সনদসহ বর্ণিত; মাকাতীবুর রাসূল, ৩খ., পৃ. ৬০৮)।
হযরত সালমান ফারসীর দাসত্ব মুক্তি বিষয়ক রাসূলুল্লাহ-এর পত্র
বিখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা)-র জন্ম হয় পারস্যের রামহুরমুষের এক অগ্নি উপাসক পরিবারে। সত্যান্বেষী সালমান তদীয় পিতৃধর্মে সন্তুষ্ট থাকিতে পারেন নাই। সত্যের সন্ধানে তিনি দেশে দেশে ঘুরিয়া বেড়াইতে থাকেন। তিনি খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হন, কিন্তু ঐ ধর্ম তাঁহার অতৃপ্ত আত্মার তৃপ্তি বিধানে ব্যর্থ হয়। অবশেষে মদীনার উপকণ্ঠে জনৈক ইয়াহূদীর দাসত্ব শৃঙ্খল আবদ্ধ অবস্থায় একদিন তিনি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়া তাঁহার পরম আরাধ্য বস্তু লাভ করেন এবং প্রাণের ও আত্মার শান্তি খুঁজিয়া পান। এমন একজন
সত্যান্বেষী গুণী ব্যক্তি এক ইয়াহুদীর দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকুন তাহা আল্লাহ্র রাসূলের মনঃপূত ছিল না। এদিকে তাঁহাকে মুক্ত করার মত প্রচুর অর্থ তাঁহার হাতে ছিল না। অগত্যা তাঁহাকে ৪০ উকিয়া স্বর্ণ এবং ৩০০ টি খেজুর চারা রোপণের বিনিময়ে তিনি মুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ঐ চারাগাছগুলিকে উপযুক্ত সেবাযত্ন দিয়া ফলজ গাছে পরিণত হইলেই সালমান সম্পূর্ণ স্বাধীন হইয়া যাইবেন, এইরূপ শর্ত সাব্যস্ত করা হইয়াছিল। হযরত সালমানের মুক্তি বিষয়ক রাসূলুল্লাহ্ -এর ঐ পত্রখানা সম্পর্কে তাঁহার পৌত্র আবদুর রহমান ইবন আবদুল্লাহ্র বর্ণনা এইরূপ:
ان النبي له املى هذا الكتاب على على ابن ابي طالب رضى الله عنه. هذا ما فادى محمد بن عبد الله رسول الله فدى سلمان الفارسي من عثمان بن الاشهل اليهودي ثم القرظي بغرس ثلاثة مائة نخلة واربعين أوقية ذهب فقد برئ محمد بن عبد الله رسول الله لثمن سلمان الفارسي ولاؤه لمحمد بن عبد الله رسول الله واهل بيته فليس لاحد على سلمان سبيل شهد على ذلك ابو بكر الصديق وعمر بن الخطاب وعلى بن ابى طالب وحذيفة بن اليمان وابو ذر الغفاري والمقداد بن الاسود وبلال مولى ابي بكر وعبد الرحمن بن عوف رضى الله عنهم وكتب على بن ابي طالب يوم الاثنين في جمادى الأولى ( من سنة ) مهاجر محمد بن عبد الله رسول الله ﷺ.
"নবী কারীম হযরত আলী (রা)-এর মাধ্যমে নিম্নরূপ সনদ লিখাইয়া লন: আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ ইব্ন আবদিল্লাহ্ যিনি উছমান ইবনুল আশহাল য়াহুদী আল-কুরাযীকে সালমান আল-ফারিসীর মুক্তিপণ বাবদ যাহা দান করিয়াছেন এই পত্রটি হইতেছে তাহার বিবরণ। তিনি ৩০০ খেজুরের চারা রোপণ এবং ৪০ উকিয়া স্বর্ণকে তাহার মুক্তিপণ সাব্যস্ত করিয়া উহা আদায় করিয়া সালমান ফারিসীর মুক্তিপণের দায় হইতে মুক্ত হইয়াছেন। আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ ইব্ন আবদিল্লাহ্ ও তদীয় পরিবারবর্গের সহিত তাঁহার মাওলা (অভিভাবক) সম্পর্ক স্থাপিত হইল। তাহার উপর অন্য কাহারও কোন অধিকার থাকিবে না। আবূ বকর সিদ্দীক, উমার ইবনুল খাত্তাব, আলী ইবন আবী তালিব, হুযায়ফা ইবনুল য়ামান, আবূ যার আল-গিফারী, আবূ বকরের মুক্তদাস বিলাল ও আবদুর রহমান ইবন 'আওফ উহার সাক্ষী রহিলেন। আল্লাহ তাহাদের প্রতি প্রসন্ন হউন! 'আলী ইবন আবী তালিব জুমাদাল উলা মাসের সোমবার দিন আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ইব্ন আবদিল্লাহর হিজরতের বৎসর উহা লিপিবদ্ধ করেন" (মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ২৭৮; তারীখ বাগদাদ, ১খ., পৃ. ১৭০)।
উল্লেখ্য, নবী কারীম তাঁহার সাহাবীগণকে সালমানের মুক্তিপণস্বরূপ দেয় খেজুর চারা সরবরাহের জন্য উৎসাহ প্রদান করিলে অনেকেই পাঁচ-দশটা করিয়া চারা লইয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর হাতে তুলিয়া দেন এবং স্বয়ং নবী কারীম নিজের পবিত্র হাতে ঐগুলি রোপণ করিয়া দেন। নবী কারীম-এর পবিত্র হাতের বরকতে ঐ বৎসরই গাছগুলি ফলদান করে এবং এইভাবে সালমান ফারসী (রা) মুক্ত হইয়া ইসলামের সেবায় পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন। আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণ তাঁহাকে লইয়া কাড়াকাড়ি করিয়া প্রত্যেক দলই বলিতেন যে,
সালমান তাঁহাদেরই একজন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে তাঁহার নিজ পরিবারের সহিত সংশ্লিষ্ট করিয়া সেই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটান। সালমান (রা) নিজেকে সালমান ইব্ন ইসলাম ইব্ন ইসলাম বলিয়া অভিহিত করিতেন (ইমামাতে ইসলাম, ১খ., পৃ. ৩৬)।
📄 আবূ রাফে' আসলামীর মুক্তির ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
بسم الله الرحمن الرحيم كتاب محمد رسول الله لفتاه اسلم اني اعتقك لله عتقا مبتولا الله اعتقك وله المن على وعليك فانت حر لاسبيل لاحد عليك الا سبيل الاسلام وعصمة الايمان شهد بذلك ابو بكر وشهد عثمان وشهد على وكتب معاوية ابن ابی سفیان
"পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে তাঁহার আসলামী যুবক-এর জন্য লিখিত পত্র। আমি তোমাকে আল্লাহ্ (সন্তুষ্টির) জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন করিয়া দিলাম। আল্লাহই তোমাকে মুক্ত করিয়াছেন। তাঁহার অসীম করুণা আমার প্রতি এবং তোমার প্রতিও। তুমি সম্পূর্ণ স্বাধীন। ইসলাম ও ঈমানের হক ছাড়া তোমার উপর কাহারও কোন কর্তৃত্বের অধিকার নাই। উহার সাক্ষীস্বরূপ রহিলেন আবূ বকর, 'উছমান ও আলী। আর উহা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন মু'আবিয়া ইব্ন আবী সুফ্যান" (মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ২৬৭; আত-তারাতীবুল ইদারিয়া, ১খ., পৃ. ২৭৪)।
ইবন হিশামের বর্ণনা হইতে জানা যায়, মূলত আবু রাফে' ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর পিতৃব্য হযরত 'আব্বাসের পরিবারের দাস। হযরত 'আব্বাস (রা) গোপনে ইসলাম গ্রহণ করিলে আবু রাফে'ও ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ উক্ত পত্রের মাধ্যমে তাঁহাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করিয়া দেন (দ্র. সীরাত ইব্ন হিশাম, ১/২খ., পৃ. ৬৪৬)।
📄 মক্কাবাসীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
لا يجوز شرطان في بيع واحد وبيع وسلف جميعا وبيع ما لم يضمن ومن كان مكاتبا على مأة درهم فقضاها كلها الا درهم فهو عبد أو على مأة اوقية فقضاها كلها الا أوقية فهو عبد.
"একই বিক্রয়ে দুইটি শর্ত আরোপ বৈধ নহে। ক্রয় ও কর্জ একসাথে বৈধ নহে। এমন বস্তুর ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নহে যাহার নিশ্চয়তা নাই। যে ব্যক্তি এক শত দিরহাম প্রদানের অঙ্গীকারে স্বাধীন হওয়ার চুক্তি করে, এক দিরহাম বাকী থাকিতেও সে আযাদ হইবে না, গোলামই থাকিয়া যাইবে। অথবা কোন ব্যক্তি এক শত উকিয়া প্রদানের শর্তে আযাদ হওয়ার চুক্তি করিয়া থাকিলে এক উকিয়া ব্যতীত সবই আদায় করিয়া দিলেও সেই ব্যক্তি গোলামই থাকিয়া যাইবে" (কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ২২৯; নং ৪৯১৯, মাকাতীবুর রাসূল, ৩খ., পৃ. ৬১২)।
📄 প্রশাসকবৃন্দের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
اذا ابردتم الى بريدا فابردوه فابعثوه حسن الوجه حسن الاسم.
"যখন তোমরা আমার নিকট কোন বার্তাবাহী প্রেরণ করিবে তখন উত্তম চেহারা ও উত্তম নামবিশিষ্ট দূত প্রেরণ করিবে” (কানযুল উম্মাল, ৩খ., পৃ. ১৯৬, নং ২৯৬৭)। কানযুল 'উম্মালের ২৯৬৬ নং রিওয়ায়াতের পাঠে আছে:
اذا بعثتم الى رجلا فابعثوه حسن الوجه حسن الاسم.
আবার উক্ত কিতাবের ২৯৬৮ নং রিওয়াতের পাঠে আছে:
اذا بعثت الى بريدا فاجعله جسيما وسيما .
অর্থ প্রায় অভিন্ন, তবে সর্বশেষে উক্ত শব্দদ্বয় جسيما وسيما এর অর্থ হইতেছে "বলিষ্ঠ সুপুরুষ এবং সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট লোক।"
কানযুল উম্মালে এই বক্তব্য পত্রের মাধ্যমে প্রদান করা হইয়াছিল বলিয়া সুস্পষ্ট উল্লেখ নাই। তবে আল্লামা শারাফুদ্দীন তদীয় "আন-নাসু ওয়াল-ইজতিহাদ” গ্রন্থে (পৃ. ১৭৭) মালিক ও বাযযারের বরাতে উহাকে পত্র বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছেন। পত্রের মূল পাঠ তাঁহার গ্রন্থ হইতেই গৃহীত হইয়াছে এবং বন্ধনীর মধ্যে উক্ত শব্দটি কানযুল উম্মালের (মাকাতীবুর রাসূল, ৩খ., পৃ. ৬১৫)।