📄 বালকার শাসক ফারওয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
জবাবে আমীরুল মুমিনীন বলেন, ইসলাম তোমাকে ও তাহাকে একই সমতলে দাঁড় করাইয়া দিয়াছে। সুতরাং একমাত্র তাকওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী হওয়া ভিন্ন মর্যাদার দিক হইতে কেহ কাহারও অপেক্ষা বড় বা ছোট নহে।
জাবালা বলিল, আমি তো ভাবিয়াছিলাম, ইসলাম আমাকে আমার জাহিলিয়াত-আমলের মর্যাদার তুলনায় অধিকতর মর্যাদার আসনে আসীন করিবে। জবাবে উমার (রা) বলেন, সেইসব জাহিলী যুগের অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার কথা ভুলিয়া যাও।
জাবালা বলিল, তাহা হইলে তো আমি আবার আমার খৃস্টীয় ধর্মে ফিরিয়া যাইব। জবাবে আমীরুল মুমিনীন জানাইলেন, তাহা হইলে আমি তোমার গর্দান উড়াইয়া দিব। কেননা ইসলাম গ্রহণের পর ধর্মত্যাগীর ইহাই শাস্তি।
জাবালা যখন হযরত উমারের দৃঢ়তা লক্ষ্য করিল তখন একটি রাতের অবকাশ চাহিয়া তাঁহার অনুমতিক্রমে তাঁহার সম্মুখ হইতে নিষ্ক্রান্ত হয় এবং ঐ রাত্রিতেই পাঁচ সাত জন সঙ্গী-সাথী লইয়া মক্কা হইয়া সিরিয়ায়, ইহার পর কনস্টান্টিনোপলে হিরাক্লিয়াসের দরবারে উপস্থিত হয় এবং পুনরায় খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। সম্রাট ইহাকে তাহার বিরাট বিজয় মনে করেন এবং তাহার নামে বিরাট ভূভাগের বরাদ্দ দিয়া তাহার নিকট নিজের মেয়ে বিবাহ দেন। সেখানে ধন-দৌলত, মণিমাণিক্য ও প্রভূত সম্মানের অধিকারী হইলেও পরবর্তীতে হিরাক্লিয়াসের দরবারে প্রেরিত হযরত উমারের এক দূতের নিকট সে তাহার তীব্র অনুশোচনার কথা ব্যক্ত করিয়া অশ্রুপাত পর্যন্ত করে (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৫১-৩৫৬)।
বালকা নামক রোমক সাম্রাজ্যের একটি সীমান্তবর্তী প্রদেশের গভর্নর ছিলেন ফারওয়া ইব্ন আম্র আল-জুযামী। রোমক সম্রাটের পক্ষ হইতে মা'আনে তিনি গভর্নর নিয়োজিত ছিলেন। মা'আন ছিল আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। রোম-সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী বাল্কা প্রদেশের রাজধানী। আকাবা হইতে ৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী এই এলাকাটি এখন পূর্ব জর্দানের অন্তর্ভুক্ত। মা'আন শহরটির নামকরণ করা হয় একটি পাহাড়ের নামে।
রাসূলুল্লাহ বিশ্বের সেরা রাজ-রাজড়াগণের নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্রসহ দূত প্রেরণ করিয়াছেন সংবাদ পাইয়া তাঁহার মধ্যে এই নূতন ধর্ম এবং উহার নবী সম্পর্কে জানার পরম কৌতূহল সৃষ্টি হয়। লোক মারফত এই নূতন নবীর চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে খোঁজখবর লইয়া ফারওয়া নিশ্চিত হন যে, সত্যসত্যই তিনি আল্লাহর প্রেরিত শেষ রাসূল। সাথে সাথে তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলে কারীম -এর প্রতি তাহার গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা জ্ঞাপন করিয়া মাস'উদ ইবন সা'দ নামক তাহার এক দূতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে একখানি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রখানির পাঠ ছিল এইরূপ:
لمحمد رسول الله انى مقر بالاسلام مصدق به اشهد ان لا اله الا الله وان محمدا رسول الله انت الذي بشر بك عيسى بن مريم عليه الصلوة والسلام. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ-এর প্রতি। আমি সর্বান্তকরণে ঈমান আনয়ন করিয়াছি এবং ইসলামের সত্যতার প্রত্যয়ন করিতেছি। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন নাই
📄 দূমাতুল জান্দালের শাসক উকায়দিরের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
এবং মুহাম্মাদ নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র রাসূল। আপনিই সেই পবিত্র সত্তা যাঁহার শুভাগমনের সুসমাচার ঈসা ইবন মারয়াম আলায়হিস সালাতু ওয়াস-সালাম দিয়া গিয়াছেন।"
পত্রের সহিত ফারওয়া রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি তাঁহার শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ নিম্নলিখিত উপঢৌকনাদিও দূত মারফত প্রেরণ করেন: (১) একটি মাদী খচ্চর- উহার নাম ছিল ফিদদা (فضة) (২) একটি গাধা- যাহা নাম ছিল ইয়া'ফুর। কথিত আছে যে, উহা এতই বুদ্ধিমান ছিল যে, রাসূলুল্লাহ-এর বার্তাবাহীরূপে গভীর রাতেও সাহাবীগণের বাড়ীতে গিয়া দরজায় ঢুশ দিয়া তাহাদেরকে নবী কারীম-এর নিকট লইয়া আসিত। উহা নবী কারীম-এর এতই অনুরক্ত ছিল যে, তাঁহার ইনতিকালে শোকাভিভূত হইয়া একটি কূপে পড়িয়া জীবন বিসর্জন দেয় (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৭৮-৭৯)। (৩) একটি ঘোড়া- উহার নাম ছিল আজ-জারব (الظرب) (৪) কিছু বস্তুসামগ্রী- এইগুলির মধ্যে স্বর্ণখচিত একটি কিংখাবের কাবাও (পরিচ্ছদ) ছিল। ইহা হইতেছে হিজরী দশম সনের ঘটনা (আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১১৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৮৬; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইকিস সিয়াসিয়া, পৃ. ৯৬-৭)। রাসূলুল্লাহ-এর দূতকে বারটি উকিয়া ও একটি নাশ্ প্রদানের জন্য বিলালকে নির্দেশ দেন।
জাওহারী বলেন, নাশ হইতেছে কুড়ি দিরহাম, উহা এক উকিয়ার অর্ধেক। তাবাকাতে আছে, উহা হইতেছে পাঁচ শত দিরহাম (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৫৪; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৮১)। ফারওয়ার উক্ত ভক্তিপূর্ণ পত্রের জবাবে রাসূলুল্লাহ তাহার প্রতি যে জবাবী পত্র প্রেরণ করেন তাহা ছিল এইরূপ:
من محمد رسول الله الى فروة بن عمرو اما بعد فقد قدا علينا رسولك وبلغ ما ارسلت به وخبر عمار قبلكم واتانا باسلامك وان الله هداك بهداه ان اصلحت واطعت الله ورسوله واقمت الصلوة واتيت الزكاة. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ -এর পক্ষ হইতে ফারওয়া ইব্ন 'আমর-এর প্রতি। অতঃপর আপনার দূত আপনার প্রেরিত দ্রব্যাদিসহ আমার নিকট পৌঁছিয়াছে এবং আপনার পক্ষ হইতে যাবতীয় সংবাদ আমাকে সম্যক অবহিত করিয়াছে। আপনার ইসলাম গ্রহণের বার্তা আমার নিকট পৌঁছিয়াছে। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে তাঁহার হিদায়াতের পথে পরিচালিত করিয়াছেন। যদি আপনি সঠিকভাবে চলেন, আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের আনুগত্য করিয়া যান, সালাত কায়েম করেন এবং যাকাত দিতে থাকেন (তবে এই হিদায়াতের ধারা অব্যাহত থাকিবে)” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৮১; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৬৮)।
রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট যখন ফারওয়ার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ পৌঁছিল, তখন গাস্সানী গভর্নর হারিছ ইব্ন আবী উমার তাহাকে এই কথা বলিয়া আরও উত্তেজিত করিয়া তোলে। হিরাক্লিয়াস তখন তাঁহাকে তাহার রাজধানীতে ডাকাইয়া পাঠাইলেন এবং এই অপরাধে তাঁহাকে কারাগারে নিক্ষেপ করিলেন। ঐ কারাবন্দী অবস্থায়ই ফারওয়া কবিতায় তাঁহার মনের যে ভাব প্রকাশ করিলেন তাহা এইরূপ:
طرفت سلمى موهنا اصحابي - والروم بين الباب والقروان و همت ان اغفى رقد ابکانی صد الخيال وساكه ما قد رأى سلمى ولا تدنن للاتيان لا تكلحن العين بعدى اثمرا ولقد علمت ابا كبشة انني - وسط الاعزة لا يحصى لساني فلئن هلكت لنففدن اخاكم - ولئن بقيت لتعرفن مكاني من جودة وشجاعة وبيان. ولقد جمعت اجل ما جمع الفتى "রোমকরা যখন ঘোরাফেরা করছিল কারাগারের ফটকে আর জানোয়ারদের পানপাত্রগুলোর মধ্যখানে প্রিয়সী সুলমা তখন বন্ধুদের নিকট হাযির হল রাতের এক প্রহর অতিক্রান্ত হতেই।
যে দৃশ্যটি সে দেখতে পেল তাতে সে হলো ব্যথিত মর্মাহত চেয়েছিলাম একটু হালকা ঘুমিয়ে নিতে, কিন্তু কে কাঁদালো মোরে। ঘুমোতে আর পারলাম কই? আমার পর আর চোখকে সুর্মা-কাজল করো না হে প্রিয়সী সুলমা! নিজেকে আর সমর্পণ করো না কারো সহবাসে! আবূ কুবায়শা! বন্ধুদের মাঝে যায় না কাটা আমার রসনা তা তো তুমি সম্যক অবগত! আমি মরে গেলে তোমরা হারাবে তোমাদের এক ভাইকে আর যদি বেঁচে যাই তবে দেখবে আমার মর্যাদা কত! তেজস্বিতা, বীরত্ব ও আখি তার যতটুকু অর্জন করতে পারে কোন যুবক তার সর্বোত্তম সবকিছুর সমাহারই তো ঘটিয়েছিলাম নিজের মধ্যে।"
অতঃপর সম্রাট পুনরায় তাঁহাকে দরবারে হাযির করাইয়া বলিলেন, মুহাম্মাদের ধর্ম ত্যাগ করিয়া আবার স্বধর্মে ফিরিয়া আস, আমি তোমাকে তোমার রাজত্ব ফিরাইয়া দিব। জবাবে তিনি বলিলেন, আমি কস্মিনকালেও মুহাম্মাদর-এর দীন হইতে বিচ্যুত হইব না। আপনি সম্যক জানেন যে, ঈসা (আ) তাঁহার সু-সমাচার দিয়া গিয়াছেন, কিন্তু রাজত্ব হারাইবার ভয়ে আপনি তাহা মানিয়া লইতে পারিতেছেন না। কোনক্রমেই তাঁহাকে ধর্মচ্যুত করিতে পারিবে না বলিয়া যখন তাহারা নিশ্চিত হইল তখন তাহাকে শূলিবিদ্ধ করিয়া হত্যা করিতে মনস্থ করিল এবং ফিলিস্তীনের ইব্রা জলাশয়ের তীরে তাহাকে লইয়া গেল। তিনি গাহিয়া উঠিলেন:
الاهل اتي سلمى بان حليلها على ماء عفرى فوق احد الرواحل على ناقة لم يضرب الفحل امها - مشذبة اطرافها بالمناجل. "সুলমার নিকট কি পৌঁছেছে এই বার্তা যে, তার স্বামী ইব্রা জলাশয়ের তীরে এমন একটি উটনীর পিঠে সওয়ার
📄 মাকনাবাসীদের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অভয়পত্র
যার মায়ের উপর কোনদিন উপগত হয়নি কোন নর উট আর তার হস্তপদ এক এক করে কেটে ফেলা হয়েছে কাস্তের দ্বারা" (মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৭৮-৭৯)।
কী নৃশংসভাবে হাত-পা কাটিয়া তাঁহাকে শূলে চড়ানো হয়, তাহার মর্মস্পশী বর্ণনা রহিয়াছে তাঁহার এই অন্তিম কবিতায়। শূলে আরোহণের পর মৃত্যুর ঠিক পূর্বক্ষণে পরম আবেগ সহকারে তিনি বলেন:
بلغ مراة المسلمين بانني سلم لربی اعظمی و مقامی "মুসলমানদের সর্দারদের পৌছে দিও বার্তা আমার। মাওলার তরে দিনু সঁপি অস্থি এবং হাস্তি আমার" (পৃ. গ্র.)।
দূমাতুল জান্দাল আরব উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থিত মদীনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি জনপদ। তায় পাহাড় সন্নিহিত এই এলাকাটি একটি প্রাচীর দ্বারা সংরক্ষিত। বনূ কিনানা নামক আরব গোত্রের বসবাসস্থল ছিল এই অঞ্চলটি। দূমা শব্দের উচ্চারণ এবং দূমাতুল জান্দালের নামকরণ সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। মাকাতীবুর রাসূল গ্রন্থে (২খ., পৃ. ২৮৮) উহার বর্ণনা রহিয়াছে এইভাবে :
دومة بضم الدال وفتحها وقد انكر ابن الدريد الفتح وعده من اغلاط المحدثين. "দূমা দাল-অক্ষরের পেশযোগে এবং দাওমা- দাল-এর উপর যবরযোগে উভয় রূপেই প্রচলিত রহিয়াছে। ইব্ন দুরায়দ দুমা-ই শুদ্ধ উচ্চারণ বলিয়াছেন, দাওমা উচ্চারণকে তিনি হাদীছ-বেত্তাগণের ভুল বলিয়া গণ্য করিয়াছেন।"
দুমাতুল জান্দাল ছিল আরব বাণিজ্যিক কাফেলাগুলির গমনাগমন পথসমূহের সঙ্গমস্থল। রোমানদের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া এখানকার আরবগণ খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে। বর্তমানে ঐ এলাকাটি আল-জাওফ (الجوف) নামে পরিচিত।
জান্দাল অর্থ পাথর বা শিলা। কথিত আছে যে, উকায়দির এবং তদীয় ভ্রাতৃবৃন্দ তাহাদের মাতুলের সহিত সাক্ষাত মানসে হীরায় যাতায়াত করিত। একদা তাহারা শিকারের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া এমন একটি স্থানে গিয়া উপনীত হইল যেখানে কয়েকটি পাথর নির্মিত প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ ব্যতীত আর কিছুই তাহারা দেখিতে পাইল না। তাহারা সেখানে কয়েকটি যায়তুন গাছ এবং অন্যান্য গাছ রোপণ করিয়া উহার নামকরণ করিল দূমাতুল জান্দাল (ফুতুহুল বুলদান, ইফা. প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য পৃ. ৫৯; মু'জামুল বুলদান, ২খ., পৃ. ৪৮৮; দুমাতুল জান্দাল শব্দ)।
উকায়দির ছিল এই দূমাতুল জান্দালের শাসক এবং সে ছিল রোম-সম্রাটের করদ রাজা। নবী করীম তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দিবার জন্য হযরত খালিদ ইব্ন ওলীদকে প্রেরণ করেন এবং তাঁহাকে বলিয়া দেন, ইসলাম গ্রহণে সে সম্মত না হইলে তাহাকে জিযয়া দানের বিকল্প প্রস্তাব দিবে।
হযরত খালিদ (রা) দূমাতুল জান্দালে পৌঁছিয়া যথারীতি তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ তো করিলই না, উপরন্তু খালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইল। যুদ্ধ যেহেতু
উদ্দিষ্ট ছিল না, তাই হযরত খালিদ (রা) তেমন কোন বাহিনীও সাথে লইয়াই যান নাই। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া ঐ অল্প সংখ্যক লোক লইয়া তিনিও যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। যুদ্ধে উকায়দিরের ভাই মালিক নিহত হয় এবং তাহার স্বর্ণ খচিত বহুমূল্য জুব্বা মুসলমানদের হস্তগত হয়। উকায়দির বন্দী অবস্থায় মদীনায় নবী (স)-এর দরবারে নীত হয়। বন্দী হইলেও সে তাহার শাহী লেবাসেই সেখানে উপনীত হয়। নবী কারীম সসম্মানে তাহাকে মজলিসে বসাইয়া ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাঁহার উদার ব্যবহার ও মধুর বাণীতে অভিভূত হইয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে ইসলাম গ্রহণ করে। মদীনা হইতে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে নবী কারীম -এর নিকট হইতে সে একটি অভয়পত্র লিখাইয়া নেয়। রাসূলুল্লাহ-এর সেই ফরমানটি ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد رسول الله لاكيدر حين أجاب إلى الاسلام وخلع الانداد والأصنام مع خالد بن الوليد سيف الله في دومة الجندل وأكنافها أن له الضاحية من الضحل والبور والمعامى واغفال الأرض والحلفة والسلاح والحافر والحيصن ولكم الضامنة من النخل والمعين من المعمور وبعد الخمس لا تعدل سارحتكم ولا تعد فاردتكم ولا يحظر عليكم النبات ولا يؤخد منكم إلا عشر الثبات تقيمون الصلاة لوقتها وتؤتون الزكاة بحقها عليكم بذاك العهد والميثاق ولكم بذکک الصدق والوفاء شهد الله ومن حضر من المسلمين. "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। ইহা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ -এর পক্ষ হইতে দূমার উকায়দিরের জন্য (লিখিত), যখন সে প্রতিমা পূজা ত্যাগ করিয়া ইসলামের ডাকে সাড়া দিয়া খালিদ সায়ফুল্লাহ্র সহিত আসিয়াছিল। উহা দূমা ও আশেপাশের অধিবাসীদের উদ্দেশ্যেও বটে। তোমাদের আবাদী জমি বহির্ভূত জমি (পানি স্বল্পতাগ্রস্ত উচু ভূমি), অনাবাদী জমি, অজ্ঞাত ভূমিসমূহ, চিহ্নহীন ভূমিসমূহ, লৌহবর্ম, অস্ত্র-শস্ত্র, খুরবিশিষ্ট পশুসমূহ এবং তোমাদের দুর্গসমূহ আমাদের অধিকারে থাকিবে। আর তোমাদের অধিকারে থাকিবে শহর সংলগ্ন খেজুরবাগানসমূহ এবং আবাদভূমির প্রবহমান ঝর্ণাসমূহ। (যাকাত আদায়ের উদ্দেশ্যে) মাঠে বিচরণরত তোমাদের পশু (আদায়কারীর নিকট) একত্র করা যাইবে না এবং আলাদা পশুকে ইহার সহিত শামিলও হইবে না। চারণভূমি হইতে তোমাদের পশুসমূহকে বারণ করা হইবে না। নির্দিষ্ট সময়ে তোমরা সালাত আদায় করিবে, যাকাত প্রদান করিবে। এই বিষয়ে তোমাদেরকে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে অঙ্গীকার ও চুক্তিনামা প্রদান করা হইতেছে। তোমাদের পক্ষ হইতে সততা ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করিবে। আল্লাহ এবং উপস্থিত মুসলমানগণ ইহার সাক্ষী রহিলেন” (ফুতুহুল বুলদান, আরবী, বৈরূত ১৯৮৩ খৃ.) পৃ. ৭২-৩; ঐ বাংলা ভাষ্য পৃ. ৫৮; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৮৮; আল-ইকদুল ফারীদ, ১খ., প্রতিনিধিদল অধ্যায়; মু'জামুল বুলদান, আহমাদ জাবিরকৃত কিতাবুল ফুতূহ-এর বরাতে দূমা শব্দ দ্র. ই'লামুস-সাইলীন, প. ৪১; মুসনাদ আহমদ, ৩খ., পৃ. ১৩২; রাওদুল উনুফ, ২খ., পৃ. ৩১৯; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ৩খ., পৃ. ৪১৪; কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ১৯৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৬; ইমতাউল আসমা (মাকরিযী কৃত), ১খ., পৃ. ৪৬৬ ইসাবা, ১খ., পৃ. ১২৪; আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১০৭; আত-তানবীহ ওয়াল-ইশরাফ, পৃ. ২৩৬)।
উল্লেখ্য, উক্ত উৎসসমূহের মধ্যে পত্রের পাঠে ঈষৎ শব্দগত পরিবর্তন রহিয়াছে। তবে বক্তব্য অভিন্ন। আবূ উবায়দ বলেন, একটি ব্যাপার প্রণিধানযোগ্য যে, ছাকীফগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করে তখন রাসূলুল্লাহ কিছু অতিরিক্ত বস্তু তাহাদেরকে দান করিয়াছিলেন, অথচ দৃমাতুল জান্দাল বাসিগণের ইসলাম গ্রহণের পর তাহাদের কিছু কিছু বস্তু যাকাত হিসাবে গ্রহণ করিলেন। আমার ধারণায় ইহার তাৎপর্য এই যে, ছাকীফগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেরাই ইসলাম গ্রহণ করিতে আগাইয়া আসিয়াছিল, তাহারা বাধ্য হইয়া আসে নাই। তাহাদের অঞ্চলের কোন স্থানের উপর যুদ্ধের দ্বারা বিজয় আসে নাই। পক্ষান্তরে দূমাবাসীরা মুসলিম আধিপত্য ও বিজয় প্রতিষ্ঠার পর ইসলাম গ্রহণ করিতে আসিয়াছিল। অস্ত্রশস্ত্র পরিবহনের জন্য ব্যবহারযোগ্য পশু বা সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের কেল্লাসমূহ যদি তাহাদের হাতে রাখা হয়, তাহা হইলে তাহারা যে সুযোগ পাইলেই বিদ্রোহ বা বিশ্বাসঘাতকতা করিবে না, তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? তাই ইহাদের দখল হইতে এইগুলি না নেওয়া পর্যন্ত তাহাদের বাহ্যিক ইসলাম গ্রহণ পার্থিব ও বস্তুগত দিক হইতে ততটুকু নির্ভরযোগ্য গণ্য হইতে পারে না। হযরত আবূ বকর (রা) তদীয় খিলাফত আমলে কোন ইসলামত্যাগী ব্যক্তি পুনরায় ইসলামে ফিরিয়া আসিলে তাহার প্রতি এই নীতিই অবলম্বন করিতেন (কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ১৮৯, কায়রো ১৯৮১ খৃ.)।
উকায়দির অতঃপর বেশ কয়েক বৎসর মুসলমানদের সহিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিয়া চলে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ-এর ইনতিকালের পরপরই সে যাকাত বন্ধ করিয়া দেয়। প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করিয়া সে হীরায় চলিয়া যায়। সেখানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করিয়া দূমাতুল জান্দালের নামানুসারে সে উহার নামকরণ করে দূমা। তাহার ভ্রাতৃপুত্র হুরায়ছ ইব্ন আবদুল মালিক ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উকায়দিরের অধিকারে যেসব সম্পত্তি ছিল সেইগুলির অধিকারী হন। হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর পুত্র য়াযীদ এই হুরায়ছের কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। কবি সুওয়ায়দ ইব্ন শাবীব কালবী উকায়দিরের ঘটনা হইতে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানাইয়া বলেন:
لا يأمنن قوم عثار جدودهم كما زال من خبث ظعائن اكيدرا. "কোন সম্প্রদায়েরই তাহার নেতৃবৃন্দের অপকর্ম হইতে নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নহে। উকায়দির যেভাবে তাহার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া গিয়াছে তাহার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে” (বালাযুরী, ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৬১-৬২)।
রাসূলুল্লাহ বার-তের দিন তাবুকে অবস্থান করিয়া যখন নিশ্চিত হইলেন যে, শত্রুপক্ষের আর যুদ্ধে ফিরিবার সম্ভাবনা নাই, তখন তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে গুরুত্বপূর্ণ আকাবা অঞ্চলের গোত্রীয় নেতৃবর্গের নামে একটি অভয় পত্র লিখেন। ইতোমধ্যে আশেপাশের গোত্রসমূহের প্রধানগণ রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে অভয়পত্র হাসিল করিয়া লইয়াছিলেন। এইবার আকাবার সর্দারগণও তাহা লাভ করিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর সেই অভয়পত্রটি ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذه أمنة من الله ومحمد النبي رسول الله ليوحنة بن روبة وأهل أيلة لسفنهم وسيارتهم في البر والبحر لهم ذمة الله وذمة محمد رسول الله ولمن كان معهم من أهل الشام وأهل اليمن
وأهل البحر ومن أحدث حدثا فإنه لا يحول ماله دون نفسه وأنه طيبة لمن أخذه من الناس وأنه لا يحل أن يمنعوا ماء يردونه ولا طريقا يريدونه من بر بحر هذا كتاب جهيم بن الصلت وشرحبيل بن حسنة بإذن رسول الله. "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। ইহা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ আন-নাবী-এর পক্ষ হইতে য়ূহান্না ইব্ন রূবা, আয়লাবাসিগণ এবং তাহাদের জাহাজসমূহ, কাফেলাসমূহ, তাহাদের জল ও স্থল সকলের জন্য নিরাপত্তা পত্র। তাহাদের সহিত পথচারীরূপে শাম ও ইয়ামানের অধিবাসী এবং সমুদ্র পথযাত্রী, আরও যাহারা রহিয়াছে তাহাদের সকলের জন্য আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ-এর যিম্মা রহিল। কেহ যদি কোন সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তবে তাহার সম্পদ তাহার রক্ষা প্রাচীর হইবে না। এমতাবস্থায় কেহ তাহাদের সম্পদ হস্তগত করিলে তাহা তাহার জন্য বৈধ হইবে। পানির ঘাটে (অর্থাৎ জলাশয়ে) এবং চলার পথে পথ চলিতে তাহারা কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি করিতে পারিবে না। পত্রটি জুহায়ম ইবনুস সালতের দ্বারা লিখিত"।
যূহান্না ও আয়লার সর্দারদের নামে লিখিত রাসূলুল্লাহ-এর আরেকখানি বিস্তারিত পত্র ছিল এইরূপ:
الي يوحنة بن دوبة وسروات اهل ايلة انتم فاني احمد اليكم الله الذي لا اله هو فاني لم اكن لاقا تلكم حتي اكتب اليكم فاسلم واعط الجزية واطع الله ورسوله ورسل رسوله واكرمهم واكسهم كسوة حسنة فمهما رضيت رسلي فاني قد رضيت وقد علم الجزية فان اردتم ان يأمن البحر والبر فاطع الله ورسوله ويمنع عنكم كل حق كان للعرب والعجم الا حق الله و حق رسوله وانك ان رددتهم ولم ترضهم لا اخذ منكم شيئا حتي اقاتلكم فاسبي الصغير واقتل الكبير فاني رسول الله بالحق اومن بالله وكتبه ورسله و بالمسيح ابن . مريم انه كلمة الله واني او من به انه رسول الله وات قبل ان يمسكم الشر فاني قد اوصيت رسلي بكم واعط الحرمة ثلاثة اوسق شعير. وان حرملة شفع لكم واني لولا الله وذلك لم اراسلكم شيئا حتى تري الجيش وانكم ان اطعتم رسلى فان الله لكم جار ومحمد ومن يكون منه وان رسلی شرحبیل وابی و حرملة وحريث بن زيد الطائي فانهم مهما قضوا عليه فقد ضيته وان لكم ذمة الله وذمة محمد رسول الله السلام عليكم ان اطعتم وجهزوا اهل مقنا الى ارضهم. "ইউহান্না ইন্ন দূবা এবং আয়লা-সর্দারগণের প্রতি। আপনারা শান্তিতে থাকুন। আমি আপনাদের নিকট সেই আল্লাহ্র প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। আমার এই লিপি আপনাদের নিকট না পৌঁছা পর্যন্ত আমি আপনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের ইচ্ছা পোষণ
করিব না। আপনারা ইসলাম গ্রহণ করুন অথবা জিযয়া দান করুন, আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের এবং রাসূলের দূতদের আনুগত্য করুন, তাহাদেরকে সম্মান প্রদর্শন করুন এবং রেশমী গাযযা বস্ত্র ছাড়া অন্য বস্ত্রে তাহাদেরকে সম্মানিত করিবেন, বিশেষত যায়দকে উত্তম বস্ত্র দান করিবেন"।
"আমার দূতগণ আপনাদের আচরণে খুশী হইলেই আমি খুশী। তাহাদেরকে জিয়ার বিধান শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে। আপনারা যদি জলে-স্থলে নিরাপদ থাকিতে চাহেন তাহা হইলে আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের আনুগত্য করুন। তাহা হইলে আরব-আজমের সকল শক্তির কবল হইতে আপনাদের প্রতিরক্ষা ও হেফাজতের ব্যবস্থা করা হইবে। তবে আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের হক মাফ হইবার নহে, তাহা অবশ্যই আদায় করিতে হইবে। আপনারা যদি এইসব ব্যাপার অগ্রাহ্য করেন এবং তাহাদের সন্তুষ্টি বিধান না করেন তাহা হইলে আপনাদের উপহার-উপঢৌকন আমরা গ্রহণ করিব না। আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে হইবে। ফলে আপনাদের পূর্ণ বয়স্কগণ নিহত এবং অপ্রাপ্তরা বন্দী হইবে।
"আমি নিশ্চিতভাবে আল্লাহ্র রাসূল। আমি আল্লাহর প্রতি, তাঁহার কিতাবসমূহ, তাঁহার রাসূলগণ এবং মরিয়ম তনয় মসীহ্-এর প্রতি ঈমান পোষণ করি এবং বিশ্বাস করি যে, তিনি আল্লাহর কলেমা এবং আমি বিশ্বাস করি যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। আপনাদেরকে কোন অনিষ্ট স্পর্শ করিবার পূর্বেই আপনারা অনুগত হইয়া আসুন। আমার দূতগণকে আমি আপনাদের ব্যাপারে (প্রয়োজনীয়) উপদেশ দান করিয়াছি। হারমালাকে তিন ওয়াসাক গম দিবেন। হারমালা আপনাদের জন্য সুপারিশ করিয়াছেন। যদি আল্লাহ্র (হুকুম তামিলের) ও হারমালার সুপারিশের ব্যাপারটি না হইত তাহা হইলে আপনাদেরকে আর পত্র লিখিবার প্রয়োজন বোধ করিতাম না। আপনারা আমার বাহিনীকে (সক্রিয়) দেখিতে পাইতেন। আপনারা যদি আমার দূতদের আনুগত্য করেন তাহা হইলে মুহাম্মাদ ও তাঁহার লোকজন সকলেই আপনাদের সঙ্গে রহিয়াছেন। নিশ্চয় আমার দূত শুরাহবীল, উবায়্যি, হারমালা, হুরায়ছ ইব্ন্ন যায়দ আত-তাঈ আপনাদের ব্যাপারে যে ফয়সালা করিবেন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন তাহাতে আমার সম্মতি থাকিবে। আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে আপনাদের জন্য নিরাপত্তা রহিল। আনুগত্যের শর্তসাপেক্ষে আপনাদের প্রতি সালাম। মাকনাবাসী (ইয়াহুদীদের) তাহাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করুন। তাহাদের জন্য পাথেয় দিয়া দিবেন” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৭-৮; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৪০৬-৭)।
পত্রখানা পাওয়ামাত্র ইউহান্না তাহাতে সাড়া দেন এবং নবী (স) দরবারে উপস্থিত হইয়া জিয়া দানের শর্তে আনুগত্যের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হন। উল্লেখ্য, সুদীর্ঘ কাল পর্যন্ত মায়াকান্নায় ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলিতেছে, ইয়াহুদীরা খৃস্টানদের হাতে পরাস্ত হইলে রহমতের নবী ইয়াহুদীদেরকে তাহাদের মাতৃভূমি হইতে উচ্ছেদ না করিয়া তাহাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাইবার ব্যবস্থা করার জন্য তাঁহার সহিত চুক্তিবদ্ধ আকাবার খৃস্টানদেরকে নির্দেশ দিলেন। আনুগত্যের শপথ গ্রহণের পর ইউহান্নার প্রতি রাসূলুল্লাহ-এর পূর্ববর্ণিত অভয়নামাটি প্রদত্ত হইয়াছিল।
ফুতূহুল বুলদানের বিবরণ হইতে জানা যায়, এই এলাকায় বসবাসকারী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপর মাথাপ্রতি এক দীনার হারে কর ধার্য করা হইয়াছিল এবং প্রতি বৎসর এই এলাকা
হইতে তিন শত দীনার আদায় হইত। এই চুক্তির শর্তানুসারে তাহারা ঐ এলাকা দিয়া অতিক্রমকারী মুসলমানদের আতিথ্য প্রদানে বাধ্য ছিল। বিনিময়ে তাহাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব মুসলমানগণ তথা ইসলামী রাষ্ট্র গ্রহণ করিয়াছিল (ফুতুহুল বুলদান, আরবী, পৃ. ৭১; ঐ বাংলা ভাষ্য, ইফা, প্রকাশিত, পৃ. ৫৭)।
এই অভয়পত্রখানিকে চুক্তিবদ্ধতার ব্যাপারে ইসলামী আক্কামের এক রিশদ বিবরণ বলা যাইতে পারে। তাই ইহার ঐতিহাসিক মূল্য রহিয়াছে। চুক্তিপত্রের মাধ্যমে একদিকে যেমন ঐ এলাকাবাসিগণ এবং তাহাদের জল ও স্থলপথসমূহ নিরাপদ হইয়া গেল, তেমনি মুসলমানগণও ঐ এলাকা অতিক্রমকালে তাহাদের সহযোগিতা ও আতিথ্যের হকদার হইলেন। এই চুক্তিটি না হইলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথে অবস্থানের সুবিধাভোগী এই এলাকাটির জনগণ নিশ্চিতভাবেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়িয়া যাইত।
📄 জনৈক মূক ও বধির ব্যক্তির নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
মাকনাও আকাবা উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিল। ইহা ছিল আয়লার নিকটবর্তী একটি ইয়াহুদী বসতি। তাহাদের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ্-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া আনুগত্য প্রকাশ করে এবং তাহাদের জন্য একটি নিরাপত্তাপত্র রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট প্রার্থনা করে। তাহাদেরকে প্রদত্ত অভয়নামাটির পাঠ ছিল এইরূপ: মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে জাম্বাবাসী ও মাকনাবাসীদের প্রতি। اما بعد فقد نزل على أيتكم راجعين إلى قريتكم فإذا جاءكم كتابي هذا فإنكم آمنون لكم ذمة الله وذمة رسوله وإن رسول الله غافر لكم سيئاتكم وكل ذنوبكم وإن لكم ذمة الله وذمة رسوله لا ظلم عليكم ولا عدى وإن رسول الله جاركم مما منع منه نفسه فإن لرسول الله بزكم وكل رقيق فيكم والكراع والحلقة إلا ما عفا عنه رسول الله أو رسول رسول الله وإن عليكم بعد ذلك ربع ما أخرجت نخلكم وربع ما صادت عروككم وربع ما اغتزل نساؤكم وإنكم برئتم بعد من كل جزية أو سخرة فإن سمعتم وأطعتم فإن على رسول الله أن يكرم كريمكم ويعفو عن مسيئكم أما بعد فإلى المؤمنين والمسلمين من أطلع أهل مقنا بخير فهو خير له ومن اطلعهم بشر فهو شر له وأن ليس عليكم أمير إلا من أنفسكم أو من أهل رسول الله والسلام. "অতঃপর তোমাদের দূতগণ দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় আমার নিকট আগমন করিয়াছেন। আমার এই পত্রপ্রাপ্তির সাথে সাথে তোমরা নিরাপদ; তোমাদের জন্য আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের যিম্মা (আশ্রয় বা নিরাপত্তা) রহিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওসাল্লাম তোমাদের সমস্ত অসদাচরণ ও অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। (এখন) তোমাদের জন্য আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের আশ্রয় রহিল। না তোমাদের উপর কোন জুলুম হইবে, না কোনরূপ বাড়াবাড়ি। স্বয়ং আল্লাহ্ রাসূল তোমাদের সেইরূপ রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন যেমনটি নিজের জন্য করেন। আল্লাহ্র রাসূল বা
তদীয় দূতগণ তোমাদের হাতে যেসব বস্তু ছাড়িয়া দিয়াছেন সেগুলি ব্যতীত তোমাদের বস্ত্রাদি, তথা গৃহসামগ্রী, ক্রীতদাস, তোমাদের ঘোড়াসমূহ ও তোমাদের বর্মসমূহ রাসূলুল্লাহ্-এর অথবা রাসূলুল্লাহ্-এর প্রতিনিধির মালিকানাধীন থাকিবে। ইহার পর তোমাদের খেজুর বাগানের উৎপন্নজাত ফসলের এক-চতুর্থাংশ, তোমাদের শিকারকৃত মৎস্যাদি এবং তোমাদের মহিলাদের বুননের আয়ের এক-চতুর্থাংশ (রাজস্ব স্বরূপ) দেওয়া তোমাদের জন্য জরুরী হইবে। অতঃপর জিযয়া এবং অনিচ্ছাকৃত দানের/দৈহিক শ্রম দানের সকল দায়িত্ব হইতে তোমরা মুক্ত থাকিবে।
"তোমরা যদি শ্রবণ কর ও আনুগত্য কর তাহা হইলে আল্লাহ্র রাসূলের দায়িত্ব হইবে তোমাদের সম্মানিতদেরকে সম্মান করা এবং তোমাদের অপরাধীদেরকে ক্ষমা করা।
"অতঃপর মুমিন এবং মুসলমানদের যাহারা মাকনাবাসীদের প্রতি ভাল ব্যবহার করিবে তাহাদের জন্য মঙ্গল এবং যাহারা খারাপ ব্যবহার করিবে তাহা তাহাদের জন্য অমঙ্গলজনক হইবে। তোমাদের নেতা হয় তোমাদেরই মধ্য হইতে হইবে নতুবা রাসূল পরিবারের কেহ হইবে। আবূ তালিব-পুত্র আলী উহা নবম হিজরীতে লিখিয়াছেন” (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮১-২; আল-ওয়াছাইকুস সিয়াসিয়া, পৃ. ৯১-২; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৭; ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৭১; মাকাতীবুর রাসূল, ২খ., পৃ. ২৮৮-৯০)।
হাদারামাওতের নেতৃবৃন্দের নামে রাসূলুল্লাহ্-এর পত্র হাদারামাওত আরব উপদ্বীপের সর্বদক্ষিণস্থ ভূ-ভাগ- যাহা আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত। ইহার উত্তরে ভারত মহাসাগর, দক্ষিণে আহকাফ ও পশ্চিমে সানা অবস্থিত। ইহা বৃহত্তর ইয়ামানের একটি প্রদেশ। কথিত আছে যে, কাহ্তানের এক অধস্তন বংশধরের নাম ছিল হাদারামাওত। তাহার নামানুসারেই এই ভূভাগের এইরূপ নামকরণ করা হইয়াছে। ইহহি ছিল 'আদ ও ছামূদ জাতির বাসস্থান। প্রাচীন কালে এখানকার লোকজন নিজেদের একটি স্বাধীন রাজ্য গড়িয়া তুলিয়াছিল। তাহাদের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি কোন অংশেই ইয়ামানের তুব্বাদের চেয়ে কম ছিল না।
হাদারামাওতের শেষ স্বাধীন রাজা ছিলেন হুজর। তাহার আমলেই শাহী দাপটের অবসান ঘটে। অতঃপর তদীয় পুত্র ওয়াইল ইব্ন হুজরের মর্যাদা একজন সামন্ত রাজার পর্যায়ে নামিয়া আসে, যাহাকে আরবীতে কায়ল (قيل) বলে। হাদারামাওত রাজ্যটি তখন একাধিক খণ্ডে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রাজার রাজত্ব ছিল। এমনি পরিস্থিতিতে হিজরী দশম সনে রাসূলুল্লাহ্ সেই দেশের যে নেতৃবৃন্দের নামে ইসলামের দাওয়াতসম্বলিত পত্র দেন তাহাদের নাম হইতেছেঃ (১) ফাহদ, (২) আল-বুহায়রী, (৩) রাবী'আ, (৪) আলবসী, (৫) আব্দ কুলাল, (৬) হুজর, (৭) যুর'আ।
দশম হিজরীতে নবী কারীম ইয়ামানের হাদারামাওত, আহকাফ, সান'আ, নাজরান ও 'আসীর প্রদেশসমূহের নেতৃবৃন্দের দাওয়াত পৌছাইবার উদ্দেশ্যে হযরত আলী ইব্ন আবী তালিব, মু'আয ইব্ন জাবাল এবং হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা)-কে নিযুক্ত করেন। ফলে আল্লাহ্ ফযলে এক বৎসরের মধ্যে গোটা ইয়ামান ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
এই সময়ের দাওয়াতপ্রাপ্তগণের অন্যতম ছিলেন হাদারামাওতের শেষ স্বাধীন ও প্রতিপত্তিশালী হুজরের পুত্র ওয়া'ইল। তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া যখন মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন রাসূলুল্লাহ্ তখন সাহাবীগণকে এই সংবাদ পরিবেশন করিলেন যে, দূরবর্তী দেশ হাদারামাওতের সর্দার
ওয়া'ইল আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রেমে মদীনায় আসিতেছেন। তিনি হাদারামাওতের রাজা হুজরের পুত্র।
সত্যসত্যই ইহার কয়েক দিন পরে ওয়াইল যখন মদীনায় পৌঁছিয়া নবী -এর দরবারে উপনীত হইলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাইলেন। নিজের নিকটবর্তী আসনে তাঁহাকে উপবিষ্ট করাইয়া তিনি তাঁহাকে সম্মানিত করিলেন। তাঁহার মর্যাদাবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিজের গায়ের চাদরখানা তাহার বসার জন্য বিছাইয়া দিলেন। তিনি তাহার জন্য প্রাণ ভরিয়া দু'আ করিলেন যেন আল্লাহ ধনে-জনে বরকত দিয়া তাহাকে সমৃদ্ধ করেন।
কয়েক দিন রাসূলুল্লাহ্ -এর খেদমতে অবস্থানের পর তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি লইয়া যখন প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ তাহাকে খুশী মনে বিদায় দেন এবং হাদারামাওতের নেতৃবৃন্দের উপর তাঁহার নেতৃত্ব বহাল রাখেন। ওয়া'ইল (রা) তাহাতে অত্যন্ত প্রীত ও সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহার স্বদেশবাসীর জন্য একটি লিখিত উপদেশাবলী প্রার্থনা করেন। হযরত মু'আয ইব্ন জাবাল (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর নির্দেশ মুতাবিক হাদারামাওতের ভাষা-স্বাতন্ত্র্যের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া অনেকটা হেজায ও হাদারামাওতের মিশ্রিত ভাষায় যাহা লিখিয়া দিলেন, তাহা ছিল এইরূপ:
من محمد رسول الله الى اقيال العباهلة والارواع المسابيب في التبعة لا مقورة الالباط ولا خناك وانطوا الشبجة وفى السبوب الخمس ومن زنامم بكر فـاصـقـعـوه مـأه واستــــوفـقـوه عـامـا ومـن زنـاصم الشيب نضرحوه بالاضاميم واستولا توفى الدين. ইবন সা'দ এই পত্রখানির বিশুদ্ধ আরবী রূপ উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে:
من محمد رسول الله الى اقبال العباهلة ليقيموا الصلوة ويؤتوا الزكوة والصدقة على التسعة السائمة كصاحبها السيمة لاخلاط ذلا وراط ولا شغار ولا جلب ولا خنب ولا شناق وعليهم العون لسرابا المسلمين وعلى كل عشرة ما تحمل العراب من اجبي فقد اربي "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ -এর পক্ষ হইতে আবাহেলা নেতৃবৃন্দের নামে। তাহারা যেন সালাত কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে। প্রত্যেক নিসাবধারী পশু মালিকদের জন্য তাহাদের ঐ সকল পশুর যাকাত আদায় করা অপরিহার্য, যেগুলি বৎসরের অধিকাংশ সময় চারণক্ষেত্রসমূহে চরিয়া বেড়ায়। যাকাত প্রদানের ব্যাপারে খিলাত, ওরাত, শেগার, জালাব, জানাব ও শিনাক নিষিদ্ধ। তাহাদের দায়িত্ব হইবে ইসলামী বাহিনীকে রসদ দিয়া সাহায্য করা। প্রতি দশ ব্যক্তির উপর একটি উট বোঝাই শস্যদান জরুরী হইবে। যে ব্যক্তি প্রকৃত অবস্থা গোপন করিবে, সে সুদখোরতূল্য হইবে” (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৯৬-৪০৫; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৮৭)।
এই পত্রখানিতে ব্যবহৃত গবাদিপশুর যাকাত সংক্রান্ত পারিভাষিক শব্দের ব্যাখ্যা নিম্নে প্রদত্ত হইল:
খিলাত: যাকাত হইতে বাঁচিবার জন্য চালাকি করিয়া কয়েকজনের পশুকে একত্র করিয়া তাহার উপর যাকাত ধার্য করাকে খিলাত বলে। যেমন, কাহারও ছাগল-ভেড়া চল্লিশটি হইতে এক শত কুড়িটি পর্যন্ত থাকিলে তাহাকে উহা হইতে কেবল একটি যাকাতস্বরূপ দিতে হয়। দুইজনের যদি চল্লিশটি করিয়া থাকে, তবে দুইটি পৃথক পৃথক ছাগল বা ভেড়া যাকাতস্বরূপ দিতে হইবে। কিন্তু দুইজনের মালিকানাধীন আশিটিকে চালাকি করিয়া এক মালিকের মালিকানাধীন বলিয়া দেখাইলে কেবল একটিই যাকাতস্বরূপ দিতে হইবে। আল্লাহ্র বিধানকে এইভাবে চাতুর্য অবলম্বন করিয়া ফাঁকি দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ-হারাম। অনুরূপ একজনের গবাদিপশুগুলিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখাইয়া তাহার উপর অতিরিক্ত যাকাত ধার্য করাও আদায়কারীদের জন্য বৈধ নহে।
বিরাত: যাকাত ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের কিছু পশুকে অন্যত্র সরাইয়া রাখা বা অন্য কেহ যাকাতের নিসাব পরিমাণ পশুসম্পদের মালিক না হওয়া সত্ত্বেও তাহাকে ফাঁসাইবার উদ্দেশ্যে সেও নিসাব পরিমাণ গবাদি পশুর মালিক বলিয়া আদায়কারিগণকে ভ্রান্ত ধারণা দেওয়া। উহাও নিষিদ্ধ।
শানাক ও শিগার- যাকাত ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের গবাদি পশুর একাংশকে অন্যের পশুর সহিত মিলাইয়া দেওয়া। যেমন পাঁচটি উটের জন্য একটি ছাগল যাকাত দিতে হয়। আবার পঁচিশটি ও ত্রিশটি উটের ও একই যাকাত। তাই অন্যের পঁচিশটি উটের সহিত নিজের পাঁচটি মিলাইয়া দিলে আলাদা আর কোন যাকাতই দিতে হয় না। এইভাবে ফাঁকি দিয়া একটি ছাগল বা ভেড়া দানের দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি পাওয়া যায়।
জালাব- যাকাত আদায়ের স্থান হইতে যাকাত আদায়কারীর তাঁবু দূরে রাখিয়া পশুপালের মালিককে সেখান পর্যন্ত যাইতে বাধ্য করা।
জানাব- যাকাত দাতাদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে পশুপালকে কয়েক মাইল দূরত্বে সরাইয়া দেওয়া যাহাতে যাকাতে আদায়ে বিঘ্ন হয়।
উক্ত প্রতিটি কাজই প্রবঞ্চনামূলক। আল্লাহ্ আইনকে ফাঁকি দিবার এই প্রবণতা হইতে মুক্ত থাকিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ এই পত্রে তাহাদেরকে সাবধান করিয়া দেন।
ওয়াইল ইবন হুজর ও হযরত মুআবিয়া (রা)
রাসূলুল্লাহ্ হাদারামাউত-সর্দার ওয়াইল ইব্ন হুজরকে পত্র লিখিয়া দিয়া তাহাতে মোহরাঙ্কিত করিয়া তাহার হাতে অর্পণ করিলেন। এই সময় তিনি হযরত মুআবিয়াকে তাহার সহিত একত্রে রওয়ানা করিয়া দিলেন। ওয়াইল উষ্ট্র পৃষ্ঠে আর মুআবিয়া (রা) পদব্রজে পথ চলিতেছিলেন। মরুভূমির উষ্ণ হাওয়ায় উত্তপ্ত বালিরাশির উপর দিয়া পথ চলা যখন মুআবিয়ার পক্ষে অসহ্য হইয়া উঠিল, তখন তিনি ওয়াইলকে অনুরোধ করিলেন যেন তাহাকেও তিনি উষ্ট্রপৃষ্ঠে বসিবার অনুমতি দেন। কিন্তু ওয়াইল তাহা গ্রাহ্য করিলেন না। তিনি স্পষ্ট বলিয়া দিলেন, বাদশাহ্ সহিত একই আসনে বসিবার তুমি যোগ্য নহ। তিনি বলিলেন, তাহা হইলে দয়া করিয়া আপনার পাদুকাযুগলই না হয় আমাকে ব্যবহার করিতে দিন- যাহাতে উত্তপ্ত বালিরাশির অসহনীয় স্পর্শ হইতে আমি আত্মরক্ষা করিতে পারি। কিন্তু তাহাতেও হাদারামাওত সর্দারের মন গলিল না। তিনি বলিলেন, উষ্ট্রের ছায়ায় ছায়ায় পথ চলিতে থাক। মুআবিয়া (রা) বলিলেন, এই ছায়া আর আমাকে কতটুকু রক্ষা করিবে? এই বলিয়াই তিনি চুপ হইয়া গেলেন।
ইসলামের প্রভাবে অল্প কিছুদিন পরেই হাদারামাওত সর্দারের সম্বিৎ ফিরিয়া আসে। তাহার পূর্বের শাহী ঠাঁট-ঠমকেরও অবসান ঘটে। হাদারামাওত ছাড়াইয়া কৃষ্ণায় আসিয়া তিনি বসবাস করিতে থাকেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-এর শাসনামল পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন।
একবার তিনি হযরত আমীর মুআবিয়ার দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহাকে প্রভুত সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাঁহার নিজ আসনের পার্শ্বেই তাঁহাকে বসিতে দেন। কথা প্রসঙ্গে সেই দিনের সেই পথ চলার প্রসঙ্গটিও উঠিল। হযরত ওয়াইল (রা) তাঁহার সেই দিনের সেইরূপ ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করিলেন এবং বলিলেন, হায়! সেদিন কেন যে আমি আপনাকে উষ্ট্রপৃষ্ঠে বসিতে দিলাম না।
যাহা হউক, ওয়াইল বাদশাহী ছাড়িয়া মহানবীর খেদমতকেই সম্মানের পথ বলিয়া বাছিয়া নেন এবং শেষ পর্যন্ত একজন উঁচুদরের সাহাবীর মর্যাদায় ভূষিত হন (বালাগে মুবীন, পৃ. ২১১-২; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৯৬-৪০৫)।