📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জাবালা ইব্‌ন আয়হামের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র

📄 জাবালা ইব্‌ন আয়হামের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র


হযরত শুজা-এর প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই মুরী তাহাকে তাহার নিজ বাটীতে লইয়া গিয়া আপ্যায়িত করেন এবং তাঁহাকে উপঢৌকনাদি দিয়া বলেন, নবী কারীম -কে আমার সালাম বলিবেন এবং তাহাকে জানাইবেন যে, আমি তাঁহার দীনের অনুসারী।
হারিছের পত্র যখন হিরাক্লিয়াসের নিকট পৌঁছিল তখন দূত দিয়া আল-কালবী (রা) রাসূলুল্লাহ -এর পত্রসহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন (ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ১০৮)। হিরাক্লিয়াসের পক্ষ হইতে নবী কারীম -এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রার বিরুদ্ধে হারিছের প্রতি নিষেধাজ্ঞাসূচক পত্র আসার পর হারিছ দূতকে ডাকিয়া বলিল, আপনি কবে দেশে ফিরিতেছেন? হযরত শুজা' বলিলেন, আগামী কাল। তখন হারিছ তাহাকে এক শত মিছকাল মুদ্রা প্রদানের নির্দেশ দেন। হযরত শুজা' (রা) বলেন, আমি যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া হারিছের জবাব ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -কে অবহিত করিলাম তখন তিনি বলিলেন, তাহার রাজত্ব অচিরেই ধ্বংস হইবে। মূরীর সালাম গ্রহণ করিয়া তিনি বলেন, সে সত্য সত্যই ঈমান আনিয়াছে (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৬৫-৬৬)।
হারিছের নির্দেশক্রমে মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে যে বাহিনী প্রস্তুত করা হয়, মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরীতে (৬৩০ খৃ.) স্বয়ং হিরাক্লিয়াসের নেতৃত্বে ঐ বাহিনীই যুদ্ধের পায়তারা শুরু করে। গাস্সানী বাদশাহর হুংকার এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি মদীনার জন্য যে কত বড় হুমকির সৃষ্টি করিয়াছিল তাহার বিবরণ পাওয়া যায় হযরত উমার (রা)-এর একটি উক্তি হইতে। বুখারী শরীফের কিতাবুত তাফসীর, সূরা তাহরীমের তাফসীর প্রসঙ্গে এবং মুসলিম শরীফের কিতাবু'ত-তালাকে (باب بیان آن تخیره امرأة لا يكون طلاقا) হাদীছটি উদ্ধৃত হইয়াছে। তাহাতে হযরত উমার (রা) বলেন:
كان لى صاحب من الانصار اذا غبت اتانى بالخير واذا غاب كنت اتيه بالخير ونحن حينئذ نتخوف ملكا من ملوك غسان ذكر لنا انه يسير الينا فقد امتلئت صدورنا منه فاتى صاحبى الانصار ويدق الباب وقال افتح افتح فقلت جاء الغساني ؟ "আমার একজন আনসারী বন্ধু ছিলেন। আমি যখন নবী কারীম -এর দরবারে অনুপস্থিত থাকিতাম তখন তিনি আমাকে আসিয়া ঐ সময়ে নবী দরবারে কী কী ব্যাপার ঘটিয়াছে বা কী কথাবার্তা হইয়াছে তাহার সংবাদ আমাকে অবহিত করিতেন। আর যখন তিনি অনুপস্থিত থাকিতেন তখন আমি আসিয়া তাহাকে তাহা অবহিত করিতাম। ঐ সময় আমরা জনৈক গাস্সানী বাদশাহর ভয়ে অস্থির ছিলাম যাহার সম্পর্কে আমরা শুনিয়াছিলাম যে, সে আমাদের দেশে হামলা করিবে। একদা আমার সেই আনসারী বন্ধুটি আসিয়া দরজায় করাঘাত করিতে করিতে বলিতেছিলেন, খুলুন, খুলুন। আমি বলিলাম, গাস্সানী কি আসিয়া পড়িয়াছে (সীরাতুন নবী, নদভী, পৃ. ৩১৫)।
উক্ত পাঠ হইতে উহা একদিনের ঘটনা বলিয়া প্রতিভাত হয়, কিন্তু التاج الجامع للاصول -এ বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযীর বরাতে উদ্ধৃত পাঠ হইতে প্রতীয়মান হয় যে, যখনই ঐ আনসারী বন্ধুটি আসিয়া তাঁহাকে দরজা খুলিতে বলিতেন, তখনই হযরত উমার বলিতেন, গাস্সানীরা কি আসিয়া পড়িল (আত-তাজুল জামি লিল-উসূল, ৪খ., পৃ. ২৬৯)।
অবশেষে ১৪হি/৬৩৫ খৃ. সালে সিরিয়ায় গাস্সানী শাসনের অবসান ঘটে (বালাগে মুবীন, পৃ. ১৬৯; মকতৃবাতে নববী, পৃ. ১৮১)। হালাবী লিখেন:
وفي كلام بعض ان الحارث اسلم ولكن قال اخاف ان اظهر اسلامی فيقتلني قيصر. “কেহ কেহ বলিয়াছেন, হারিছ ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু সাথে সাথে বলেন, আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ প্রকাশ পাইলে রোম সম্রাট আমাকে প্রাণে বধ করিবেন"।
কিন্তু যতদূর মনে হয় ওয়াকিদীর বর্ণনায় একটি ভুলের জন্য এই ভ্রম প্রমাদের সৃষ্টি। কেননা ووصلني صرا স্থলে তিনি ووصلنی سرا লিখিয়াছেন। যাহারা হারিছ গাস্সানীর ইসলাম গ্রহণের কথা লিখিয়াছেন, তাহারা এইজন্যই ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। হারিছ গাস্সানীর মত ইসলামের এমন একটি প্রবল শত্রু যদি সত্যসত্যই ইসলাম গ্রহণ করিত, তাহা হইলে ইতিহাসে তাহার ইসলাম- উত্তর যুগের গৌরবময় কীর্তিগাথা অবশ্যই স্থান পাইত।
জাবালা ইব্‌ন আয়হামের নিকট রাসূলুল্লাহ -এর পত্র
পরবর্তী গাস্সানী রাজা জাবালা ইব্‌ন আওহামের নিকটও রাসূলুল্লাহ একখানা পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই পত্র মারফত ইসলামের দাওয়াত পাইয়া তিনি ইসলাম গ্রহণও করেন এবং রাসূলুল্লাহ -এর জন্য উপঢৌকনও প্রেরণ করেন বলিয়া জানা যায়। কিন্তু এই পত্রখানার পাঠ বা বিশদ বিবরণ জানা যায় নাই (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬৫; মা'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৯৮)।
আর-রাওদুল উনুফ গ্রন্থে (২খ., পৃ. ৩৫৭) বর্ণিত শুজা' ইব্‌ন ওয়াহব (রা), হারিছ ইব্‌ন আবী উমারের পুত্র জাবালা ইব্‌ন আওহামের নিকট গমন করেন। সে ছিল ছয় হাত দীর্ঘকায় এক বিশালাকার ব্যক্তি। সে বাহনে আরোহিত অবস্থায় তাহার পদযুগল মাটি স্পর্শ করিত। তারপর তিনি তাহাকে ইসলামের প্রতি যে কৌশলপূর্ণ ও মর্মস্পশী ভাষায় দাওয়াত দেন তাহার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়া বলেন, এক পর্যায়ে জাবালা ইসলামের নবীর দা'ওয়াতের প্রশংসা করে এবং বলে, এই জন্য রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অনুরোধ সত্ত্বেও আমি মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে সম্মত হই নাই। আমি ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখিব।
অতঃপর হযরত উমার (রা)-এর শাসনামলে তাহার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ আমীরুল মুমিনীনকে অবগত করিয়া তাহাকে মদীনায় আগমনের অনুমতি প্রার্থনা করিয়া সে তাহাকে পত্র দেয়। সে তাহার পরিবারবর্গের আড়াই শত লোক পরিবেষ্টিত অবস্থায় অত্যন্ত শান-শওকতের সহিত মদীনায় আগমন করে। আমীরুল মুমিনীন মদীনায় তাহাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাঁহার নিজের পাশেই বসিতে দিয়া সম্মানিত করেন।
অতঃপর হজ্জের সময় জাবালার চাদরের আঁচলে একজন সাধারণ নাগরিকের পা পড়িলে জাবালা প্রচণ্ড ঘুষিতে তাহার নাক ভাঙ্গিয়া দেওয়ার প্রেক্ষিতে হযরত উমার (রা)-এর কাছে বিচারপ্রার্থী উক্ত নাগরিকের ও তাহার নাক ভাঙ্গিয়া দেওয়ার অধিকার রহিয়াছে শুনিয়া জাবালা বলে, আমি একজন বাদশাহ আর বাদী একজন সাধারণ মানুষ। এমতাবস্থায় তাহার আর আমার মর্যাদা কি এক?

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বালকার শাসক ফারওয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র

📄 বালকার শাসক ফারওয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র


জবাবে আমীরুল মুমিনীন বলেন, ইসলাম তোমাকে ও তাহাকে একই সমতলে দাঁড় করাইয়া দিয়াছে। সুতরাং একমাত্র তাকওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী হওয়া ভিন্ন মর্যাদার দিক হইতে কেহ কাহারও অপেক্ষা বড় বা ছোট নহে।
জাবালা বলিল, আমি তো ভাবিয়াছিলাম, ইসলাম আমাকে আমার জাহিলিয়াত-আমলের মর্যাদার তুলনায় অধিকতর মর্যাদার আসনে আসীন করিবে। জবাবে উমার (রা) বলেন, সেইসব জাহিলী যুগের অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার কথা ভুলিয়া যাও।
জাবালা বলিল, তাহা হইলে তো আমি আবার আমার খৃস্টীয় ধর্মে ফিরিয়া যাইব। জবাবে আমীরুল মুমিনীন জানাইলেন, তাহা হইলে আমি তোমার গর্দান উড়াইয়া দিব। কেননা ইসলাম গ্রহণের পর ধর্মত্যাগীর ইহাই শাস্তি।
জাবালা যখন হযরত উমারের দৃঢ়তা লক্ষ্য করিল তখন একটি রাতের অবকাশ চাহিয়া তাঁহার অনুমতিক্রমে তাঁহার সম্মুখ হইতে নিষ্ক্রান্ত হয় এবং ঐ রাত্রিতেই পাঁচ সাত জন সঙ্গী-সাথী লইয়া মক্কা হইয়া সিরিয়ায়, ইহার পর কনস্টান্টিনোপলে হিরাক্লিয়াসের দরবারে উপস্থিত হয় এবং পুনরায় খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। সম্রাট ইহাকে তাহার বিরাট বিজয় মনে করেন এবং তাহার নামে বিরাট ভূভাগের বরাদ্দ দিয়া তাহার নিকট নিজের মেয়ে বিবাহ দেন। সেখানে ধন-দৌলত, মণিমাণিক্য ও প্রভূত সম্মানের অধিকারী হইলেও পরবর্তীতে হিরাক্লিয়াসের দরবারে প্রেরিত হযরত উমারের এক দূতের নিকট সে তাহার তীব্র অনুশোচনার কথা ব্যক্ত করিয়া অশ্রুপাত পর্যন্ত করে (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৫১-৩৫৬)।
বালকা নামক রোমক সাম্রাজ্যের একটি সীমান্তবর্তী প্রদেশের গভর্নর ছিলেন ফারওয়া ইব্‌ন আম্র আল-জুযামী। রোমক সম্রাটের পক্ষ হইতে মা'আনে তিনি গভর্নর নিয়োজিত ছিলেন। মা'আন ছিল আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। রোম-সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী বাল্কা প্রদেশের রাজধানী। আকাবা হইতে ৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী এই এলাকাটি এখন পূর্ব জর্দানের অন্তর্ভুক্ত। মা'আন শহরটির নামকরণ করা হয় একটি পাহাড়ের নামে।
রাসূলুল্লাহ বিশ্বের সেরা রাজ-রাজড়াগণের নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্রসহ দূত প্রেরণ করিয়াছেন সংবাদ পাইয়া তাঁহার মধ্যে এই নূতন ধর্ম এবং উহার নবী সম্পর্কে জানার পরম কৌতূহল সৃষ্টি হয়। লোক মারফত এই নূতন নবীর চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে খোঁজখবর লইয়া ফারওয়া নিশ্চিত হন যে, সত্যসত্যই তিনি আল্লাহর প্রেরিত শেষ রাসূল। সাথে সাথে তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলে কারীম -এর প্রতি তাহার গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা জ্ঞাপন করিয়া মাস'উদ ইবন সা'দ নামক তাহার এক দূতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে একখানি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রখানির পাঠ ছিল এইরূপ:
لمحمد رسول الله انى مقر بالاسلام مصدق به اشهد ان لا اله الا الله وان محمدا رسول الله انت الذي بشر بك عيسى بن مريم عليه الصلوة والسلام. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ-এর প্রতি। আমি সর্বান্তকরণে ঈমান আনয়ন করিয়াছি এবং ইসলামের সত্যতার প্রত্যয়ন করিতেছি। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন নাই

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দূমাতুল জান্দালের শাসক উকায়দিরের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র

📄 দূমাতুল জান্দালের শাসক উকায়দিরের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র


এবং মুহাম্মাদ নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র রাসূল। আপনিই সেই পবিত্র সত্তা যাঁহার শুভাগমনের সুসমাচার ঈসা ইবন মারয়াম আলায়হিস সালাতু ওয়াস-সালাম দিয়া গিয়াছেন।"
পত্রের সহিত ফারওয়া রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি তাঁহার শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ নিম্নলিখিত উপঢৌকনাদিও দূত মারফত প্রেরণ করেন: (১) একটি মাদী খচ্চর- উহার নাম ছিল ফিদদা (فضة) (২) একটি গাধা- যাহা নাম ছিল ইয়া'ফুর। কথিত আছে যে, উহা এতই বুদ্ধিমান ছিল যে, রাসূলুল্লাহ-এর বার্তাবাহীরূপে গভীর রাতেও সাহাবীগণের বাড়ীতে গিয়া দরজায় ঢুশ দিয়া তাহাদেরকে নবী কারীম-এর নিকট লইয়া আসিত। উহা নবী কারীম-এর এতই অনুরক্ত ছিল যে, তাঁহার ইনতিকালে শোকাভিভূত হইয়া একটি কূপে পড়িয়া জীবন বিসর্জন দেয় (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৭৮-৭৯)। (৩) একটি ঘোড়া- উহার নাম ছিল আজ-জারব (الظرب) (৪) কিছু বস্তুসামগ্রী- এইগুলির মধ্যে স্বর্ণখচিত একটি কিংখাবের কাবাও (পরিচ্ছদ) ছিল। ইহা হইতেছে হিজরী দশম সনের ঘটনা (আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১১৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ৮৬; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইকিস সিয়াসিয়া, পৃ. ৯৬-৭)। রাসূলুল্লাহ-এর দূতকে বারটি উকিয়া ও একটি নাশ্ প্রদানের জন্য বিলালকে নির্দেশ দেন।
জাওহারী বলেন, নাশ হইতেছে কুড়ি দিরহাম, উহা এক উকিয়ার অর্ধেক। তাবাকাতে আছে, উহা হইতেছে পাঁচ শত দিরহাম (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৫৪; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৮১)। ফারওয়ার উক্ত ভক্তিপূর্ণ পত্রের জবাবে রাসূলুল্লাহ তাহার প্রতি যে জবাবী পত্র প্রেরণ করেন তাহা ছিল এইরূপ:
من محمد رسول الله الى فروة بن عمرو اما بعد فقد قدا علينا رسولك وبلغ ما ارسلت به وخبر عمار قبلكم واتانا باسلامك وان الله هداك بهداه ان اصلحت واطعت الله ورسوله واقمت الصلوة واتيت الزكاة. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ -এর পক্ষ হইতে ফারওয়া ইব্‌ন 'আমর-এর প্রতি। অতঃপর আপনার দূত আপনার প্রেরিত দ্রব্যাদিসহ আমার নিকট পৌঁছিয়াছে এবং আপনার পক্ষ হইতে যাবতীয় সংবাদ আমাকে সম্যক অবহিত করিয়াছে। আপনার ইসলাম গ্রহণের বার্তা আমার নিকট পৌঁছিয়াছে। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে তাঁহার হিদায়াতের পথে পরিচালিত করিয়াছেন। যদি আপনি সঠিকভাবে চলেন, আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের আনুগত্য করিয়া যান, সালাত কায়েম করেন এবং যাকাত দিতে থাকেন (তবে এই হিদায়াতের ধারা অব্যাহত থাকিবে)” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৮১; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৬৮)।
রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট যখন ফারওয়ার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ পৌঁছিল, তখন গাস্সানী গভর্নর হারিছ ইব্‌ন আবী উমার তাহাকে এই কথা বলিয়া আরও উত্তেজিত করিয়া তোলে। হিরাক্লিয়াস তখন তাঁহাকে তাহার রাজধানীতে ডাকাইয়া পাঠাইলেন এবং এই অপরাধে তাঁহাকে কারাগারে নিক্ষেপ করিলেন। ঐ কারাবন্দী অবস্থায়ই ফারওয়া কবিতায় তাঁহার মনের যে ভাব প্রকাশ করিলেন তাহা এইরূপ:
طرفت سلمى موهنا اصحابي - والروم بين الباب والقروان و همت ان اغفى رقد ابکانی صد الخيال وساكه ما قد رأى سلمى ولا تدنن للاتيان لا تكلحن العين بعدى اثمرا ولقد علمت ابا كبشة انني - وسط الاعزة لا يحصى لساني فلئن هلكت لنففدن اخاكم - ولئن بقيت لتعرفن مكاني من جودة وشجاعة وبيان. ولقد جمعت اجل ما جمع الفتى "রোমকরা যখন ঘোরাফেরা করছিল কারাগারের ফটকে আর জানোয়ারদের পানপাত্রগুলোর মধ্যখানে প্রিয়সী সুলমা তখন বন্ধুদের নিকট হাযির হল রাতের এক প্রহর অতিক্রান্ত হতেই।
যে দৃশ্যটি সে দেখতে পেল তাতে সে হলো ব্যথিত মর্মাহত চেয়েছিলাম একটু হালকা ঘুমিয়ে নিতে, কিন্তু কে কাঁদালো মোরে। ঘুমোতে আর পারলাম কই? আমার পর আর চোখকে সুর্মা-কাজল করো না হে প্রিয়সী সুলমা! নিজেকে আর সমর্পণ করো না কারো সহবাসে! আবূ কুবায়শা! বন্ধুদের মাঝে যায় না কাটা আমার রসনা তা তো তুমি সম্যক অবগত! আমি মরে গেলে তোমরা হারাবে তোমাদের এক ভাইকে আর যদি বেঁচে যাই তবে দেখবে আমার মর্যাদা কত! তেজস্বিতা, বীরত্ব ও আখি তার যতটুকু অর্জন করতে পারে কোন যুবক তার সর্বোত্তম সবকিছুর সমাহারই তো ঘটিয়েছিলাম নিজের মধ্যে।"
অতঃপর সম্রাট পুনরায় তাঁহাকে দরবারে হাযির করাইয়া বলিলেন, মুহাম্মাদের ধর্ম ত্যাগ করিয়া আবার স্বধর্মে ফিরিয়া আস, আমি তোমাকে তোমার রাজত্ব ফিরাইয়া দিব। জবাবে তিনি বলিলেন, আমি কস্মিনকালেও মুহাম্মাদর-এর দীন হইতে বিচ্যুত হইব না। আপনি সম্যক জানেন যে, ঈসা (আ) তাঁহার সু-সমাচার দিয়া গিয়াছেন, কিন্তু রাজত্ব হারাইবার ভয়ে আপনি তাহা মানিয়া লইতে পারিতেছেন না। কোনক্রমেই তাঁহাকে ধর্মচ্যুত করিতে পারিবে না বলিয়া যখন তাহারা নিশ্চিত হইল তখন তাহাকে শূলিবিদ্ধ করিয়া হত্যা করিতে মনস্থ করিল এবং ফিলিস্তীনের ইব্রা জলাশয়ের তীরে তাহাকে লইয়া গেল। তিনি গাহিয়া উঠিলেন:
الاهل اتي سلمى بان حليلها على ماء عفرى فوق احد الرواحل على ناقة لم يضرب الفحل امها - مشذبة اطرافها بالمناجل. "সুলমার নিকট কি পৌঁছেছে এই বার্তা যে, তার স্বামী ইব্রা জলাশয়ের তীরে এমন একটি উটনীর পিঠে সওয়ার

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাকনাবাসীদের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অভয়পত্র

📄 মাকনাবাসীদের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অভয়পত্র


যার মায়ের উপর কোনদিন উপগত হয়নি কোন নর উট আর তার হস্তপদ এক এক করে কেটে ফেলা হয়েছে কাস্তের দ্বারা" (মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৭৮-৭৯)।
কী নৃশংসভাবে হাত-পা কাটিয়া তাঁহাকে শূলে চড়ানো হয়, তাহার মর্মস্পশী বর্ণনা রহিয়াছে তাঁহার এই অন্তিম কবিতায়। শূলে আরোহণের পর মৃত্যুর ঠিক পূর্বক্ষণে পরম আবেগ সহকারে তিনি বলেন:
بلغ مراة المسلمين بانني سلم لربی اعظمی و مقامی "মুসলমানদের সর্দারদের পৌছে দিও বার্তা আমার। মাওলার তরে দিনু সঁপি অস্থি এবং হাস্তি আমার" (পৃ. গ্র.)।
দূমাতুল জান্দাল আরব উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থিত মদীনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি জনপদ। তায় পাহাড় সন্নিহিত এই এলাকাটি একটি প্রাচীর দ্বারা সংরক্ষিত। বনূ কিনানা নামক আরব গোত্রের বসবাসস্থল ছিল এই অঞ্চলটি। দূমা শব্দের উচ্চারণ এবং দূমাতুল জান্দালের নামকরণ সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। মাকাতীবুর রাসূল গ্রন্থে (২খ., পৃ. ২৮৮) উহার বর্ণনা রহিয়াছে এইভাবে :
دومة بضم الدال وفتحها وقد انكر ابن الدريد الفتح وعده من اغلاط المحدثين. "দূমা দাল-অক্ষরের পেশযোগে এবং দাওমা- দাল-এর উপর যবরযোগে উভয় রূপেই প্রচলিত রহিয়াছে। ইব্‌ন দুরায়দ দুমা-ই শুদ্ধ উচ্চারণ বলিয়াছেন, দাওমা উচ্চারণকে তিনি হাদীছ-বেত্তাগণের ভুল বলিয়া গণ্য করিয়াছেন।"
দুমাতুল জান্দাল ছিল আরব বাণিজ্যিক কাফেলাগুলির গমনাগমন পথসমূহের সঙ্গমস্থল। রোমানদের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া এখানকার আরবগণ খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে। বর্তমানে ঐ এলাকাটি আল-জাওফ (الجوف) নামে পরিচিত।
জান্দাল অর্থ পাথর বা শিলা। কথিত আছে যে, উকায়দির এবং তদীয় ভ্রাতৃবৃন্দ তাহাদের মাতুলের সহিত সাক্ষাত মানসে হীরায় যাতায়াত করিত। একদা তাহারা শিকারের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া এমন একটি স্থানে গিয়া উপনীত হইল যেখানে কয়েকটি পাথর নির্মিত প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ ব্যতীত আর কিছুই তাহারা দেখিতে পাইল না। তাহারা সেখানে কয়েকটি যায়তুন গাছ এবং অন্যান্য গাছ রোপণ করিয়া উহার নামকরণ করিল দূমাতুল জান্দাল (ফুতুহুল বুলদান, ইফা. প্রকাশিত বাংলা ভাষ্য পৃ. ৫৯; মু'জামুল বুলদান, ২খ., পৃ. ৪৮৮; দুমাতুল জান্দাল শব্দ)।
উকায়দির ছিল এই দূমাতুল জান্দালের শাসক এবং সে ছিল রোম-সম্রাটের করদ রাজা। নবী করীম তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দিবার জন্য হযরত খালিদ ইব্‌ন ওলীদকে প্রেরণ করেন এবং তাঁহাকে বলিয়া দেন, ইসলাম গ্রহণে সে সম্মত না হইলে তাহাকে জিযয়া দানের বিকল্প প্রস্তাব দিবে।
হযরত খালিদ (রা) দূমাতুল জান্দালে পৌঁছিয়া যথারীতি তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ তো করিলই না, উপরন্তু খালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইল। যুদ্ধ যেহেতু
উদ্দিষ্ট ছিল না, তাই হযরত খালিদ (রা) তেমন কোন বাহিনীও সাথে লইয়াই যান নাই। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া ঐ অল্প সংখ্যক লোক লইয়া তিনিও যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। যুদ্ধে উকায়দিরের ভাই মালিক নিহত হয় এবং তাহার স্বর্ণ খচিত বহুমূল্য জুব্বা মুসলমানদের হস্তগত হয়। উকায়দির বন্দী অবস্থায় মদীনায় নবী (স)-এর দরবারে নীত হয়। বন্দী হইলেও সে তাহার শাহী লেবাসেই সেখানে উপনীত হয়। নবী কারীম সসম্মানে তাহাকে মজলিসে বসাইয়া ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাঁহার উদার ব্যবহার ও মধুর বাণীতে অভিভূত হইয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে ইসলাম গ্রহণ করে। মদীনা হইতে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে নবী কারীম -এর নিকট হইতে সে একটি অভয়পত্র লিখাইয়া নেয়। রাসূলুল্লাহ-এর সেই ফরমানটি ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد رسول الله لاكيدر حين أجاب إلى الاسلام وخلع الانداد والأصنام مع خالد بن الوليد سيف الله في دومة الجندل وأكنافها أن له الضاحية من الضحل والبور والمعامى واغفال الأرض والحلفة والسلاح والحافر والحيصن ولكم الضامنة من النخل والمعين من المعمور وبعد الخمس لا تعدل سارحتكم ولا تعد فاردتكم ولا يحظر عليكم النبات ولا يؤخد منكم إلا عشر الثبات تقيمون الصلاة لوقتها وتؤتون الزكاة بحقها عليكم بذاك العهد والميثاق ولكم بذکک الصدق والوفاء شهد الله ومن حضر من المسلمين. "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। ইহা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ -এর পক্ষ হইতে দূমার উকায়দিরের জন্য (লিখিত), যখন সে প্রতিমা পূজা ত্যাগ করিয়া ইসলামের ডাকে সাড়া দিয়া খালিদ সায়ফুল্লাহ্র সহিত আসিয়াছিল। উহা দূমা ও আশেপাশের অধিবাসীদের উদ্দেশ্যেও বটে। তোমাদের আবাদী জমি বহির্ভূত জমি (পানি স্বল্পতাগ্রস্ত উচু ভূমি), অনাবাদী জমি, অজ্ঞাত ভূমিসমূহ, চিহ্নহীন ভূমিসমূহ, লৌহবর্ম, অস্ত্র-শস্ত্র, খুরবিশিষ্ট পশুসমূহ এবং তোমাদের দুর্গসমূহ আমাদের অধিকারে থাকিবে। আর তোমাদের অধিকারে থাকিবে শহর সংলগ্ন খেজুরবাগানসমূহ এবং আবাদভূমির প্রবহমান ঝর্ণাসমূহ। (যাকাত আদায়ের উদ্দেশ্যে) মাঠে বিচরণরত তোমাদের পশু (আদায়কারীর নিকট) একত্র করা যাইবে না এবং আলাদা পশুকে ইহার সহিত শামিলও হইবে না। চারণভূমি হইতে তোমাদের পশুসমূহকে বারণ করা হইবে না। নির্দিষ্ট সময়ে তোমরা সালাত আদায় করিবে, যাকাত প্রদান করিবে। এই বিষয়ে তোমাদেরকে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে অঙ্গীকার ও চুক্তিনামা প্রদান করা হইতেছে। তোমাদের পক্ষ হইতে সততা ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করিবে। আল্লাহ এবং উপস্থিত মুসলমানগণ ইহার সাক্ষী রহিলেন” (ফুতুহুল বুলদান, আরবী, বৈরূত ১৯৮৩ খৃ.) পৃ. ৭২-৩; ঐ বাংলা ভাষ্য পৃ. ৫৮; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৮৮; আল-ইকদুল ফারীদ, ১খ., প্রতিনিধিদল অধ্যায়; মু'জামুল বুলদান, আহমাদ জাবিরকৃত কিতাবুল ফুতূহ-এর বরাতে দূমা শব্দ দ্র. ই'লামুস-সাইলীন, প. ৪১; মুসনাদ আহমদ, ৩খ., পৃ. ১৩২; রাওদুল উনুফ, ২খ., পৃ. ৩১৯; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ৩খ., পৃ. ৪১৪; কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ১৯৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৬; ইমতাউল আসমা (মাকরিযী কৃত), ১খ., পৃ. ৪৬৬ ইসাবা, ১খ., পৃ. ১২৪; আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১০৭; আত-তানবীহ ওয়াল-ইশরাফ, পৃ. ২৩৬)।
উল্লেখ্য, উক্ত উৎসসমূহের মধ্যে পত্রের পাঠে ঈষৎ শব্দগত পরিবর্তন রহিয়াছে। তবে বক্তব্য অভিন্ন। আবূ উবায়দ বলেন, একটি ব্যাপার প্রণিধানযোগ্য যে, ছাকীফগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করে তখন রাসূলুল্লাহ কিছু অতিরিক্ত বস্তু তাহাদেরকে দান করিয়াছিলেন, অথচ দৃমাতুল জান্দাল বাসিগণের ইসলাম গ্রহণের পর তাহাদের কিছু কিছু বস্তু যাকাত হিসাবে গ্রহণ করিলেন। আমার ধারণায় ইহার তাৎপর্য এই যে, ছাকীফগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেরাই ইসলাম গ্রহণ করিতে আগাইয়া আসিয়াছিল, তাহারা বাধ্য হইয়া আসে নাই। তাহাদের অঞ্চলের কোন স্থানের উপর যুদ্ধের দ্বারা বিজয় আসে নাই। পক্ষান্তরে দূমাবাসীরা মুসলিম আধিপত্য ও বিজয় প্রতিষ্ঠার পর ইসলাম গ্রহণ করিতে আসিয়াছিল। অস্ত্রশস্ত্র পরিবহনের জন্য ব্যবহারযোগ্য পশু বা সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের কেল্লাসমূহ যদি তাহাদের হাতে রাখা হয়, তাহা হইলে তাহারা যে সুযোগ পাইলেই বিদ্রোহ বা বিশ্বাসঘাতকতা করিবে না, তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? তাই ইহাদের দখল হইতে এইগুলি না নেওয়া পর্যন্ত তাহাদের বাহ্যিক ইসলাম গ্রহণ পার্থিব ও বস্তুগত দিক হইতে ততটুকু নির্ভরযোগ্য গণ্য হইতে পারে না। হযরত আবূ বকর (রা) তদীয় খিলাফত আমলে কোন ইসলামত্যাগী ব্যক্তি পুনরায় ইসলামে ফিরিয়া আসিলে তাহার প্রতি এই নীতিই অবলম্বন করিতেন (কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ১৮৯, কায়রো ১৯৮১ খৃ.)।
উকায়দির অতঃপর বেশ কয়েক বৎসর মুসলমানদের সহিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিয়া চলে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ-এর ইনতিকালের পরপরই সে যাকাত বন্ধ করিয়া দেয়। প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করিয়া সে হীরায় চলিয়া যায়। সেখানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করিয়া দূমাতুল জান্দালের নামানুসারে সে উহার নামকরণ করে দূমা। তাহার ভ্রাতৃপুত্র হুরায়ছ ইব্‌ন আবদুল মালিক ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উকায়দিরের অধিকারে যেসব সম্পত্তি ছিল সেইগুলির অধিকারী হন। হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর পুত্র য়াযীদ এই হুরায়ছের কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। কবি সুওয়ায়দ ইব্‌ন শাবীব কালবী উকায়দিরের ঘটনা হইতে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানাইয়া বলেন:
لا يأمنن قوم عثار جدودهم كما زال من خبث ظعائن اكيدرا. "কোন সম্প্রদায়েরই তাহার নেতৃবৃন্দের অপকর্ম হইতে নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নহে। উকায়দির যেভাবে তাহার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া গিয়াছে তাহার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে” (বালাযুরী, ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৬১-৬২)।
রাসূলুল্লাহ বার-তের দিন তাবুকে অবস্থান করিয়া যখন নিশ্চিত হইলেন যে, শত্রুপক্ষের আর যুদ্ধে ফিরিবার সম্ভাবনা নাই, তখন তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে গুরুত্বপূর্ণ আকাবা অঞ্চলের গোত্রীয় নেতৃবর্গের নামে একটি অভয় পত্র লিখেন। ইতোমধ্যে আশেপাশের গোত্রসমূহের প্রধানগণ রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে অভয়পত্র হাসিল করিয়া লইয়াছিলেন। এইবার আকাবার সর্দারগণও তাহা লাভ করিলেন। রাসূলুল্লাহ-এর সেই অভয়পত্রটি ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذه أمنة من الله ومحمد النبي رسول الله ليوحنة بن روبة وأهل أيلة لسفنهم وسيارتهم في البر والبحر لهم ذمة الله وذمة محمد رسول الله ولمن كان معهم من أهل الشام وأهل اليمن
وأهل البحر ومن أحدث حدثا فإنه لا يحول ماله دون نفسه وأنه طيبة لمن أخذه من الناس وأنه لا يحل أن يمنعوا ماء يردونه ولا طريقا يريدونه من بر بحر هذا كتاب جهيم بن الصلت وشرحبيل بن حسنة بإذن رسول الله. "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। ইহা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ আন-নাবী-এর পক্ষ হইতে য়ূহান্না ইব্‌ন রূবা, আয়লাবাসিগণ এবং তাহাদের জাহাজসমূহ, কাফেলাসমূহ, তাহাদের জল ও স্থল সকলের জন্য নিরাপত্তা পত্র। তাহাদের সহিত পথচারীরূপে শাম ও ইয়ামানের অধিবাসী এবং সমুদ্র পথযাত্রী, আরও যাহারা রহিয়াছে তাহাদের সকলের জন্য আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ-এর যিম্মা রহিল। কেহ যদি কোন সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তবে তাহার সম্পদ তাহার রক্ষা প্রাচীর হইবে না। এমতাবস্থায় কেহ তাহাদের সম্পদ হস্তগত করিলে তাহা তাহার জন্য বৈধ হইবে। পানির ঘাটে (অর্থাৎ জলাশয়ে) এবং চলার পথে পথ চলিতে তাহারা কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি করিতে পারিবে না। পত্রটি জুহায়ম ইবনুস সালতের দ্বারা লিখিত"।
যূহান্না ও আয়লার সর্দারদের নামে লিখিত রাসূলুল্লাহ-এর আরেকখানি বিস্তারিত পত্র ছিল এইরূপ:
الي يوحنة بن دوبة وسروات اهل ايلة انتم فاني احمد اليكم الله الذي لا اله هو فاني لم اكن لاقا تلكم حتي اكتب اليكم فاسلم واعط الجزية واطع الله ورسوله ورسل رسوله واكرمهم واكسهم كسوة حسنة فمهما رضيت رسلي فاني قد رضيت وقد علم الجزية فان اردتم ان يأمن البحر والبر فاطع الله ورسوله ويمنع عنكم كل حق كان للعرب والعجم الا حق الله و حق رسوله وانك ان رددتهم ولم ترضهم لا اخذ منكم شيئا حتي اقاتلكم فاسبي الصغير واقتل الكبير فاني رسول الله بالحق اومن بالله وكتبه ورسله و بالمسيح ابن . مريم انه كلمة الله واني او من به انه رسول الله وات قبل ان يمسكم الشر فاني قد اوصيت رسلي بكم واعط الحرمة ثلاثة اوسق شعير. وان حرملة شفع لكم واني لولا الله وذلك لم اراسلكم شيئا حتى تري الجيش وانكم ان اطعتم رسلى فان الله لكم جار ومحمد ومن يكون منه وان رسلی شرحبیل وابی و حرملة وحريث بن زيد الطائي فانهم مهما قضوا عليه فقد ضيته وان لكم ذمة الله وذمة محمد رسول الله السلام عليكم ان اطعتم وجهزوا اهل مقنا الى ارضهم. "ইউহান্না ইন্ন দূবা এবং আয়লা-সর্দারগণের প্রতি। আপনারা শান্তিতে থাকুন। আমি আপনাদের নিকট সেই আল্লাহ্র প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। আমার এই লিপি আপনাদের নিকট না পৌঁছা পর্যন্ত আমি আপনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের ইচ্ছা পোষণ
করিব না। আপনারা ইসলাম গ্রহণ করুন অথবা জিযয়া দান করুন, আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের এবং রাসূলের দূতদের আনুগত্য করুন, তাহাদেরকে সম্মান প্রদর্শন করুন এবং রেশমী গাযযা বস্ত্র ছাড়া অন্য বস্ত্রে তাহাদেরকে সম্মানিত করিবেন, বিশেষত যায়দকে উত্তম বস্ত্র দান করিবেন"।
"আমার দূতগণ আপনাদের আচরণে খুশী হইলেই আমি খুশী। তাহাদেরকে জিয়ার বিধান শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে। আপনারা যদি জলে-স্থলে নিরাপদ থাকিতে চাহেন তাহা হইলে আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের আনুগত্য করুন। তাহা হইলে আরব-আজমের সকল শক্তির কবল হইতে আপনাদের প্রতিরক্ষা ও হেফাজতের ব্যবস্থা করা হইবে। তবে আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের হক মাফ হইবার নহে, তাহা অবশ্যই আদায় করিতে হইবে। আপনারা যদি এইসব ব্যাপার অগ্রাহ্য করেন এবং তাহাদের সন্তুষ্টি বিধান না করেন তাহা হইলে আপনাদের উপহার-উপঢৌকন আমরা গ্রহণ করিব না। আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে হইবে। ফলে আপনাদের পূর্ণ বয়স্কগণ নিহত এবং অপ্রাপ্তরা বন্দী হইবে।
"আমি নিশ্চিতভাবে আল্লাহ্র রাসূল। আমি আল্লাহর প্রতি, তাঁহার কিতাবসমূহ, তাঁহার রাসূলগণ এবং মরিয়ম তনয় মসীহ্-এর প্রতি ঈমান পোষণ করি এবং বিশ্বাস করি যে, তিনি আল্লাহর কলেমা এবং আমি বিশ্বাস করি যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। আপনাদেরকে কোন অনিষ্ট স্পর্শ করিবার পূর্বেই আপনারা অনুগত হইয়া আসুন। আমার দূতগণকে আমি আপনাদের ব্যাপারে (প্রয়োজনীয়) উপদেশ দান করিয়াছি। হারমালাকে তিন ওয়াসাক গম দিবেন। হারমালা আপনাদের জন্য সুপারিশ করিয়াছেন। যদি আল্লাহ্র (হুকুম তামিলের) ও হারমালার সুপারিশের ব্যাপারটি না হইত তাহা হইলে আপনাদেরকে আর পত্র লিখিবার প্রয়োজন বোধ করিতাম না। আপনারা আমার বাহিনীকে (সক্রিয়) দেখিতে পাইতেন। আপনারা যদি আমার দূতদের আনুগত্য করেন তাহা হইলে মুহাম্মাদ ও তাঁহার লোকজন সকলেই আপনাদের সঙ্গে রহিয়াছেন। নিশ্চয় আমার দূত শুরাহবীল, উবায়্যি, হারমালা, হুরায়ছ ইব্‌ন্ন যায়দ আত-তাঈ আপনাদের ব্যাপারে যে ফয়সালা করিবেন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন তাহাতে আমার সম্মতি থাকিবে। আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে আপনাদের জন্য নিরাপত্তা রহিল। আনুগত্যের শর্তসাপেক্ষে আপনাদের প্রতি সালাম। মাকনাবাসী (ইয়াহুদীদের) তাহাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করুন। তাহাদের জন্য পাথেয় দিয়া দিবেন” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৭-৮; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৪০৬-৭)।
পত্রখানা পাওয়ামাত্র ইউহান্না তাহাতে সাড়া দেন এবং নবী (স) দরবারে উপস্থিত হইয়া জিয়া দানের শর্তে আনুগত্যের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হন। উল্লেখ্য, সুদীর্ঘ কাল পর্যন্ত মায়াকান্নায় ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলিতেছে, ইয়াহুদীরা খৃস্টানদের হাতে পরাস্ত হইলে রহমতের নবী ইয়াহুদীদেরকে তাহাদের মাতৃভূমি হইতে উচ্ছেদ না করিয়া তাহাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাইবার ব্যবস্থা করার জন্য তাঁহার সহিত চুক্তিবদ্ধ আকাবার খৃস্টানদেরকে নির্দেশ দিলেন। আনুগত্যের শপথ গ্রহণের পর ইউহান্নার প্রতি রাসূলুল্লাহ-এর পূর্ববর্ণিত অভয়নামাটি প্রদত্ত হইয়াছিল।
ফুতূহুল বুলদানের বিবরণ হইতে জানা যায়, এই এলাকায় বসবাসকারী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপর মাথাপ্রতি এক দীনার হারে কর ধার্য করা হইয়াছিল এবং প্রতি বৎসর এই এলাকা
হইতে তিন শত দীনার আদায় হইত। এই চুক্তির শর্তানুসারে তাহারা ঐ এলাকা দিয়া অতিক্রমকারী মুসলমানদের আতিথ্য প্রদানে বাধ্য ছিল। বিনিময়ে তাহাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব মুসলমানগণ তথা ইসলামী রাষ্ট্র গ্রহণ করিয়াছিল (ফুতুহুল বুলদান, আরবী, পৃ. ৭১; ঐ বাংলা ভাষ্য, ইফা, প্রকাশিত, পৃ. ৫৭)।
এই অভয়পত্রখানিকে চুক্তিবদ্ধতার ব্যাপারে ইসলামী আক্কামের এক রিশদ বিবরণ বলা যাইতে পারে। তাই ইহার ঐতিহাসিক মূল্য রহিয়াছে। চুক্তিপত্রের মাধ্যমে একদিকে যেমন ঐ এলাকাবাসিগণ এবং তাহাদের জল ও স্থলপথসমূহ নিরাপদ হইয়া গেল, তেমনি মুসলমানগণও ঐ এলাকা অতিক্রমকালে তাহাদের সহযোগিতা ও আতিথ্যের হকদার হইলেন। এই চুক্তিটি না হইলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথে অবস্থানের সুবিধাভোগী এই এলাকাটির জনগণ নিশ্চিতভাবেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়িয়া যাইত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00