📄 ছুমামা ইব্ন উছালের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
হইতে যাহাকে চাহেন তাহাকে তাহা দান করেন। শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য" (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮৭; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৮১)।
নবী কারীম এই পত্রখানা হাবীব ইব্ন যায়দ ইব্ন আসিম (রা)-কে অর্পণ করিয়া উহা মুসায়লামার নিকট পৌছাইবার নির্দেশ দান করেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন ওয়াহব আসলামী এবং হযরত সাইব ইবন আল-'আওয়াম (রা)-কে তাঁহার সঙ্গীরূপে দেওয়া হয়। পত্র পাইয়া মুসায়লামা অগ্নিশর্মা হইয়া উঠে এবং পত্রবাহক হাবীব (রা)-এর হাত-পা কাটিয়া ফেলে। অপর দুইজন নবী কারীম -এর খিদমতে পৌছিয়া যখন দূতের প্রতি মুসায়লামার এই পৈশাচিক আচরণ সম্পর্কে তাঁহাকে অবহিত করিলেন তখন তিনি অত্যধিক মর্মাহত হইলেন এবং আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রহিলেন।
অবশেষে হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত আমলের সূচনাকালেই এই ভণ্ডনবীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। মুসলিম পক্ষেও প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকারের পর সতের হাজার ধর্মত্যাগী মুরতাদ অনুসারীসহ এই ভণ্ড মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়। শহীদ শ্রেষ্ঠ হযরত হামযা (রা)-এর ঘাতক ওয়াশী ঠিক ঐ বল্লমটি দ্বারা মুসায়লামাকে হত্যা করিয়া তাঁহার পূর্ব পাপের কাফফারা আদায় করেন— যাহা দ্বারা উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি হামযাকে শহীদ করিয়াছিলেন। ইয়ামামাবাসীরা অতঃপর পুনরায় ইসলামের ছায়াতলে ফিরিয়া আসে (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮৭-৮; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৩)।
তুমামা ইব্ন উছালের প্রতি রাসূলুল্লাহ-এর পত্র
ان رسول الله ﷺ كتب الى ثمامة بن اثال وهوذة بن على ملكى اليمامة وكذا ابن الاثير في اسد الغابة في ترجمة سليط بن عمر. "রাসূলুল্লাহ ছুমামা ইব্ন উছাল এবং হাওযা ইবন 'আলী ইয়ামামার এই উভয় রাজাকেই পত্র লিখেন। উসদুল গাবায় সালীত ইবন 'আমর প্রসঙ্গে আলোচনায় অনুরূপ লিখিয়াছেন” (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৯)।
লক্ষণীয়, হাওযার পূর্বেই এখানে ছুমামার নাম উল্লিখিত হইয়াছে এবং উভয়ই যে ইয়ামামার বাদশাহ ছিলেন তাহাও ব্যক্ত করা হইয়াছে। কালের আবর্তে রাসূলুল্লাহ-এর ছুমামাকে লিখিত পত্রখানা হারাইয়া গেলেও ধরিয়া লইতে হইবে, পত্রবাহক ও পত্রের বক্তব্য অভিন্ন।
উল্লেখ্য, আল-ইসাবায় বুখারীর বরাতে এবং সহীহ মুসলিম, ৫খ., পৃ. ১৫৮; কিতাবুল জিহাদ, সুনানে বায়হাকী, ৬খ., পৃ. ৩১৯ ও ৯খ., পৃ. ৬৫-৬৬; মুসনাদ ২খ., পৃ. ২৪৬; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৩১৫-তে আবু হুরায়রা (রা)-এর একটি এই মর্মের বর্ণনা রহিয়াছে যে, ছুমামা একটি মুসলিম অভিযানকালে বন্দী হইয়া নবী দরবারে আনীত হন। উসদুল গাবায় ইবন ইসহাক আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীছে এই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, ছুমামা উমরা করিতে আসিয়া মদীনায় প্রবেশ করিয়াছিলেন এবং এই সময়ে গ্রেফতার হইয়াছিলেন। সীরাতকার হালাবী বলেন, ছুমামা যেহেতু ইতোপূর্বেই সালীতের হাতে সপ্তম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, সুতরাং তাহাকে ঐ মর্মের পত্র দেওয়ার প্রেক্ষিত ছিল না তাহা ঠিক নহে। কেননা পত্র প্রেরণের ঘটনাটি একেবারে সপ্তম হিজরীর শুরুতে মুহাররাম মাসে কিংবা ৬ষ্ঠ হিজরীর একেবারে শেষ প্রান্তে
📄 সিরিয়ার গভর্নর হারিছ ইব্ন আবী শামির আল-গাস্সানীর নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
যিলহজ্জ মাসে ঘটিয়াছিল। আর তাহার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি ঘটে পত্র প্রেরণের পরে সপ্তম হিজরীর মুহাররাম মাসে। কেননা আবূ হুরায়রা (রা) নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন ৭ম হিজরীতে এবং খায়বারে রাসূলুল্লাহ-এর সহিত আসিয়া সাক্ষাত করেন। আর খায়বার যুদ্ধ ঘটে ৭ম হিজরীর মুহাররাম মাসে। সুতরাং তাহার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাহাকে এইরূপ পত্র প্রেরণের মধ্যে কোন অসঙ্গতি নাই। পত্র পাওয়ার পর অন্য অনেকের মত ছুমামার মনেও হয়ত প্রথমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইয়াছিল। তাহার ইসলাম গ্রহণের বিবরণ হইতে জানা যায়, তিনি নবী কারীম-কে হত্যার উদ্দেশ্যেই মদীনায় প্রবেশ করিয়া মুসলিম বাহিনীর হাতে ধরা পড়িয়াছিলেন। সীরাতে হালাবিয়্যার পাদটীকায় (২খ., পৃ. ১৬৩) মুদ্রিত দাহলানের এই তথ্যও আশ্চৰ্যজনক ও বিভ্রান্তিকর যে, রাসূলুল্লাহ ষষ্ঠ হিজরীর মুহাররাম মাসের দশ তারিখ গত হইলে কার্তা অভিমুখে একটি অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং তাহারাই ছুমামাকে বন্দী করিয়া আনিয়াছিলেন।
রাওদাতুল কাফী গ্রন্থে (পৃ. ২৯৯) আবূ জা'ফার বাকির (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম প্রেরিত বাহিনীর হাতে ছুমামা বন্দী হন। ইতোপূর্বে রাসূলুল্লাহ তাঁহার ব্যাপার দু'আ করিয়াছিলেন "হে আল্লাহ! ছুমামাকে আমার বশে আনিয়া দিন।" রাসূলুল্লাহ বন্দি ছুমামাকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, আমি তোমাকে তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি দিতেছি: হয় আমি তোমাকে হত্যা করিব। সাথে সাথে বন্দী ছুমামা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি একটি মহা শত্রুকেই নিপাত করিবেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, অথবা পণ গ্রহণ করিয়া তোমাকে মুক্ত করিয়া দিব। ছুমামা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি ইহার চড়া মূল্য লাভ করিবেন। অথবা তোমাকে নিরাপত্তা দিয়া মুক্ত করিয়া দিব। সাথে সাথে ছুমামা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি আমাকে কৃতজ্ঞ দেখিতে পাইবেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, আমি তোমার প্রতি অবশ্যই বদান্যতা প্রদর্শন করিয়াছি। ছুমামা বলিলেন, রাসূলুল্লাহ শেষপর্যন্ত তাহাকে নিঃশর্ত মুক্তি দান করিয়াছেন। সাথে সাথে এই সময় ছুমামা বলিয়াছিলেন :
فاني اشهد ان لا اله الا الله وانك محمد رسول الله وقد والله علمت انك رسول الله حيث رأيتك وما كنت لاشهد بها وانا في الوثاق "আমি সাক্ষ্য প্রদান করিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, আর নিশ্চয় আপনি হে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
"আল্লাহর কসম! প্রথম দর্শনেই আমি নিশ্চিত হইয়াছিলাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল কিন্তু বন্দী অবস্থায় উহা স্বীকার করা আমি শোভনীয় বিবেচনা করি না" (ইস্তীআব, আল-ইসাবার পাদটীকা, ১খ., পৃ. ২০৩; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৯-৪০)।
সিরিয়ার গভর্নর হারিছ ইবন আবী শামির আল-গাস্সানীর নিকট রাসূলুল্লাহ-এর পত্র
রাসূলুল্লাহ রাজ-রাজড়াদের উদ্দেশ্যে পত্র প্রেরণ করার সময় দূত শুজা' ইব্ন ওয়াহ্ আল-আসাদীর মাধ্যমে হারিছের নিকটও একখানি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রটির পাঠ ছিল নিম্নরূপ:
বিস্মিল্লাহির রহমানির রহীম। মিন মুহাম্মাদ রাসূলিল্লাহ ইলাল হারিস ইব্ন আবী শামির। সালামুন আলা মানিত্তাবা'আল হুদা ওয়া আমানা বিহী ওয়া সাদ্দাকা ওয়া ইন্নি আদউকা আন তু'মিনা বিল্লাহি ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু ইয়াবকা মুলকুক. "পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু আল্লাহ্র নামে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর পক্ষ হইতে হারিছ ইব্ন আবী শামিরকে। সালাম তাহার প্রতি যে হিদায়াতের অনুসারী হইয়াছে এবং তাহার প্রতি ঈমান আনিয়াছে এবং আস্থা প্রকাশ করিয়াছে। আমি আপনাকে সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের দা'ওয়াত দিতেছি যিনি একক, যাঁহার কোন অংশীদার নাই। (ঈমান আনয়নের ফলে) আপনার রাজত্ব টিকিয়া থাকিবে" (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৪-৩৫)।
পত্রবাহক শুজা' দামিশকে পৌঁছিয়া জানিতে পারিলেন, হারিছ সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অভ্যর্থনা উপলক্ষে বায়তুল মুকাদ্দাসে রহিয়াছে। পারস্যের উপর বিজয়লাভ এবং পারসিকদের ছিনাইয়া লওয়া পবিত্র ক্রুশ পুনরুদ্ধারের পর উহার পুনঃস্থাপন উৎসবে যোগদানের উদ্দেশ্যে হিরাক্লিয়াস তখন পদব্রজে হিমস হইতে ঈলিয়ায় আগমন করিয়াছিলেন। অগত্যা দূত শুজাকে কয়েক দিন দামিশকে তাহার প্রতীক্ষায় থাকিতে হয়।
হারিছ দামিশকে প্রত্যাবর্তন করিলে দূত রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা তাহার নিকট হস্তান্তর করিলেন। পত্রপাঠে হারিছ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিল। নূতন নবীর প্রতি ঈমান আনয়ন না করিলে রাজত্ব হারাইতে হইবে এমন একটা প্রচ্ছন্ন হুমকিকে সে কোনমতেই সহজভাবে গ্রহণ করিতে পারিল না। সে পত্রখানি ছুঁড়িয়া মারিয়া গর্জিয়া উঠিল, আমার রাজ্য আবার কে ছিনাইয়া লইবে? সাথে সাথে তাহার উযীরকে অবিলম্বে মদীনা আক্রমণের জন্য সৈন্য-সামন্ত প্রস্তুত করিতে নির্দেশ দিল, অপরদিকে যুদ্ধের অনুমতি প্রার্থনা করিয়া এই ব্যাপারে রোমক সম্রাটের সম্মতি আদায়ের জন্যও সচেষ্ট হইল। হিরাক্লিয়াস এই ব্যাপারে তাহাকে বারণ করায় সে যুদ্ধযাত্রা হইতে বিরত থাকে (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৫)।
হযরত শুজা' বর্ণনা করেন, দামিশকে অবস্থানকালে বাদশাহর অভ্যর্থনা কক্ষের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মুরীর সহিত আমার কয়েক দিনের সহঅবস্থানের ফলে অনেকটা ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। লোকটি ছিল রোমান বংশোদ্ভূত। একদিন সে আমার নিকট আমাদের নবী কারীম সম্পর্কে জানিতে আগ্রহ প্রকাশ করিল। আমি তাহাকে তাঁহার বিবরণ শুনাইলে তাহার মনে বিরাট এক পরিবর্তন সূচিত হইল। আবেগভরা কণ্ঠে সে আমাকে বলিল :
"তুমি আমাকে তাঁহার সম্পর্কে যাহা যাহা বলিলে, ইনজীল কিতাবে আগমনকারী নবীর লক্ষণাদির সহিত তাঁহার অদ্ভুত মিল রহিয়াছে। আমরা তো তাঁহারই প্রতীক্ষায় রহিয়াছি। আমি সর্বান্তকরণে তাঁহার প্রতি ঈমান আনিয়াছি এবং তাঁহার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেছি। কিন্তু আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে কাহাকেও ঘূর্ণাক্ষরেও কিছু বলিতে যাইও না। আমার আশংকা হয়, হারিছ তাহা আঁচ করিতে পারিলে আমাকে সে প্রাণে বধ করিবে। এমনিতে কিন্তু সে আমার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল এবং তাহার মেযাজের উপর আমার বেশ দখল আছে।"
একদিন হারিছ অত্যন্ত শান-শওকতের সহিত দরবার অনুষ্ঠান করিল। মুরী সেখানে আমার আগমন সংবাদ তাহাকে অবগত করিলে সে আমাকে তাহার দরবারে ডাকাইল এবং পত্রখানা আমার হাত হইতে গ্রহণ করিয়া পাঠ করাইয়া শুনিল এবং ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিল।
📄 জাবালা ইব্ন আয়হামের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
হযরত শুজা-এর প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই মুরী তাহাকে তাহার নিজ বাটীতে লইয়া গিয়া আপ্যায়িত করেন এবং তাঁহাকে উপঢৌকনাদি দিয়া বলেন, নবী কারীম -কে আমার সালাম বলিবেন এবং তাহাকে জানাইবেন যে, আমি তাঁহার দীনের অনুসারী।
হারিছের পত্র যখন হিরাক্লিয়াসের নিকট পৌঁছিল তখন দূত দিয়া আল-কালবী (রা) রাসূলুল্লাহ -এর পত্রসহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন (ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ১০৮)। হিরাক্লিয়াসের পক্ষ হইতে নবী কারীম -এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রার বিরুদ্ধে হারিছের প্রতি নিষেধাজ্ঞাসূচক পত্র আসার পর হারিছ দূতকে ডাকিয়া বলিল, আপনি কবে দেশে ফিরিতেছেন? হযরত শুজা' বলিলেন, আগামী কাল। তখন হারিছ তাহাকে এক শত মিছকাল মুদ্রা প্রদানের নির্দেশ দেন। হযরত শুজা' (রা) বলেন, আমি যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া হারিছের জবাব ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -কে অবহিত করিলাম তখন তিনি বলিলেন, তাহার রাজত্ব অচিরেই ধ্বংস হইবে। মূরীর সালাম গ্রহণ করিয়া তিনি বলেন, সে সত্য সত্যই ঈমান আনিয়াছে (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৬৫-৬৬)।
হারিছের নির্দেশক্রমে মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে যে বাহিনী প্রস্তুত করা হয়, মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরীতে (৬৩০ খৃ.) স্বয়ং হিরাক্লিয়াসের নেতৃত্বে ঐ বাহিনীই যুদ্ধের পায়তারা শুরু করে। গাস্সানী বাদশাহর হুংকার এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি মদীনার জন্য যে কত বড় হুমকির সৃষ্টি করিয়াছিল তাহার বিবরণ পাওয়া যায় হযরত উমার (রা)-এর একটি উক্তি হইতে। বুখারী শরীফের কিতাবুত তাফসীর, সূরা তাহরীমের তাফসীর প্রসঙ্গে এবং মুসলিম শরীফের কিতাবু'ত-তালাকে (باب بیان آن تخیره امرأة لا يكون طلاقا) হাদীছটি উদ্ধৃত হইয়াছে। তাহাতে হযরত উমার (রা) বলেন:
كان لى صاحب من الانصار اذا غبت اتانى بالخير واذا غاب كنت اتيه بالخير ونحن حينئذ نتخوف ملكا من ملوك غسان ذكر لنا انه يسير الينا فقد امتلئت صدورنا منه فاتى صاحبى الانصار ويدق الباب وقال افتح افتح فقلت جاء الغساني ؟ "আমার একজন আনসারী বন্ধু ছিলেন। আমি যখন নবী কারীম -এর দরবারে অনুপস্থিত থাকিতাম তখন তিনি আমাকে আসিয়া ঐ সময়ে নবী দরবারে কী কী ব্যাপার ঘটিয়াছে বা কী কথাবার্তা হইয়াছে তাহার সংবাদ আমাকে অবহিত করিতেন। আর যখন তিনি অনুপস্থিত থাকিতেন তখন আমি আসিয়া তাহাকে তাহা অবহিত করিতাম। ঐ সময় আমরা জনৈক গাস্সানী বাদশাহর ভয়ে অস্থির ছিলাম যাহার সম্পর্কে আমরা শুনিয়াছিলাম যে, সে আমাদের দেশে হামলা করিবে। একদা আমার সেই আনসারী বন্ধুটি আসিয়া দরজায় করাঘাত করিতে করিতে বলিতেছিলেন, খুলুন, খুলুন। আমি বলিলাম, গাস্সানী কি আসিয়া পড়িয়াছে (সীরাতুন নবী, নদভী, পৃ. ৩১৫)।
উক্ত পাঠ হইতে উহা একদিনের ঘটনা বলিয়া প্রতিভাত হয়, কিন্তু التاج الجامع للاصول -এ বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযীর বরাতে উদ্ধৃত পাঠ হইতে প্রতীয়মান হয় যে, যখনই ঐ আনসারী বন্ধুটি আসিয়া তাঁহাকে দরজা খুলিতে বলিতেন, তখনই হযরত উমার বলিতেন, গাস্সানীরা কি আসিয়া পড়িল (আত-তাজুল জামি লিল-উসূল, ৪খ., পৃ. ২৬৯)।
অবশেষে ১৪হি/৬৩৫ খৃ. সালে সিরিয়ায় গাস্সানী শাসনের অবসান ঘটে (বালাগে মুবীন, পৃ. ১৬৯; মকতৃবাতে নববী, পৃ. ১৮১)। হালাবী লিখেন:
وفي كلام بعض ان الحارث اسلم ولكن قال اخاف ان اظهر اسلامی فيقتلني قيصر. “কেহ কেহ বলিয়াছেন, হারিছ ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু সাথে সাথে বলেন, আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ প্রকাশ পাইলে রোম সম্রাট আমাকে প্রাণে বধ করিবেন"।
কিন্তু যতদূর মনে হয় ওয়াকিদীর বর্ণনায় একটি ভুলের জন্য এই ভ্রম প্রমাদের সৃষ্টি। কেননা ووصلني صرا স্থলে তিনি ووصلنی سرا লিখিয়াছেন। যাহারা হারিছ গাস্সানীর ইসলাম গ্রহণের কথা লিখিয়াছেন, তাহারা এইজন্যই ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। হারিছ গাস্সানীর মত ইসলামের এমন একটি প্রবল শত্রু যদি সত্যসত্যই ইসলাম গ্রহণ করিত, তাহা হইলে ইতিহাসে তাহার ইসলাম- উত্তর যুগের গৌরবময় কীর্তিগাথা অবশ্যই স্থান পাইত।
জাবালা ইব্ন আয়হামের নিকট রাসূলুল্লাহ -এর পত্র
পরবর্তী গাস্সানী রাজা জাবালা ইব্ন আওহামের নিকটও রাসূলুল্লাহ একখানা পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই পত্র মারফত ইসলামের দাওয়াত পাইয়া তিনি ইসলাম গ্রহণও করেন এবং রাসূলুল্লাহ -এর জন্য উপঢৌকনও প্রেরণ করেন বলিয়া জানা যায়। কিন্তু এই পত্রখানার পাঠ বা বিশদ বিবরণ জানা যায় নাই (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬৫; মা'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ৯৮)।
আর-রাওদুল উনুফ গ্রন্থে (২খ., পৃ. ৩৫৭) বর্ণিত শুজা' ইব্ন ওয়াহব (রা), হারিছ ইব্ন আবী উমারের পুত্র জাবালা ইব্ন আওহামের নিকট গমন করেন। সে ছিল ছয় হাত দীর্ঘকায় এক বিশালাকার ব্যক্তি। সে বাহনে আরোহিত অবস্থায় তাহার পদযুগল মাটি স্পর্শ করিত। তারপর তিনি তাহাকে ইসলামের প্রতি যে কৌশলপূর্ণ ও মর্মস্পশী ভাষায় দাওয়াত দেন তাহার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়া বলেন, এক পর্যায়ে জাবালা ইসলামের নবীর দা'ওয়াতের প্রশংসা করে এবং বলে, এই জন্য রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অনুরোধ সত্ত্বেও আমি মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে সম্মত হই নাই। আমি ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখিব।
অতঃপর হযরত উমার (রা)-এর শাসনামলে তাহার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ আমীরুল মুমিনীনকে অবগত করিয়া তাহাকে মদীনায় আগমনের অনুমতি প্রার্থনা করিয়া সে তাহাকে পত্র দেয়। সে তাহার পরিবারবর্গের আড়াই শত লোক পরিবেষ্টিত অবস্থায় অত্যন্ত শান-শওকতের সহিত মদীনায় আগমন করে। আমীরুল মুমিনীন মদীনায় তাহাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাঁহার নিজের পাশেই বসিতে দিয়া সম্মানিত করেন।
অতঃপর হজ্জের সময় জাবালার চাদরের আঁচলে একজন সাধারণ নাগরিকের পা পড়িলে জাবালা প্রচণ্ড ঘুষিতে তাহার নাক ভাঙ্গিয়া দেওয়ার প্রেক্ষিতে হযরত উমার (রা)-এর কাছে বিচারপ্রার্থী উক্ত নাগরিকের ও তাহার নাক ভাঙ্গিয়া দেওয়ার অধিকার রহিয়াছে শুনিয়া জাবালা বলে, আমি একজন বাদশাহ আর বাদী একজন সাধারণ মানুষ। এমতাবস্থায় তাহার আর আমার মর্যাদা কি এক?
📄 বালকার শাসক ফারওয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
জবাবে আমীরুল মুমিনীন বলেন, ইসলাম তোমাকে ও তাহাকে একই সমতলে দাঁড় করাইয়া দিয়াছে। সুতরাং একমাত্র তাকওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী হওয়া ভিন্ন মর্যাদার দিক হইতে কেহ কাহারও অপেক্ষা বড় বা ছোট নহে।
জাবালা বলিল, আমি তো ভাবিয়াছিলাম, ইসলাম আমাকে আমার জাহিলিয়াত-আমলের মর্যাদার তুলনায় অধিকতর মর্যাদার আসনে আসীন করিবে। জবাবে উমার (রা) বলেন, সেইসব জাহিলী যুগের অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার কথা ভুলিয়া যাও।
জাবালা বলিল, তাহা হইলে তো আমি আবার আমার খৃস্টীয় ধর্মে ফিরিয়া যাইব। জবাবে আমীরুল মুমিনীন জানাইলেন, তাহা হইলে আমি তোমার গর্দান উড়াইয়া দিব। কেননা ইসলাম গ্রহণের পর ধর্মত্যাগীর ইহাই শাস্তি।
জাবালা যখন হযরত উমারের দৃঢ়তা লক্ষ্য করিল তখন একটি রাতের অবকাশ চাহিয়া তাঁহার অনুমতিক্রমে তাঁহার সম্মুখ হইতে নিষ্ক্রান্ত হয় এবং ঐ রাত্রিতেই পাঁচ সাত জন সঙ্গী-সাথী লইয়া মক্কা হইয়া সিরিয়ায়, ইহার পর কনস্টান্টিনোপলে হিরাক্লিয়াসের দরবারে উপস্থিত হয় এবং পুনরায় খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। সম্রাট ইহাকে তাহার বিরাট বিজয় মনে করেন এবং তাহার নামে বিরাট ভূভাগের বরাদ্দ দিয়া তাহার নিকট নিজের মেয়ে বিবাহ দেন। সেখানে ধন-দৌলত, মণিমাণিক্য ও প্রভূত সম্মানের অধিকারী হইলেও পরবর্তীতে হিরাক্লিয়াসের দরবারে প্রেরিত হযরত উমারের এক দূতের নিকট সে তাহার তীব্র অনুশোচনার কথা ব্যক্ত করিয়া অশ্রুপাত পর্যন্ত করে (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৫১-৩৫৬)।
বালকা নামক রোমক সাম্রাজ্যের একটি সীমান্তবর্তী প্রদেশের গভর্নর ছিলেন ফারওয়া ইব্ন আম্র আল-জুযামী। রোমক সম্রাটের পক্ষ হইতে মা'আনে তিনি গভর্নর নিয়োজিত ছিলেন। মা'আন ছিল আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। রোম-সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী বাল্কা প্রদেশের রাজধানী। আকাবা হইতে ৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী এই এলাকাটি এখন পূর্ব জর্দানের অন্তর্ভুক্ত। মা'আন শহরটির নামকরণ করা হয় একটি পাহাড়ের নামে।
রাসূলুল্লাহ বিশ্বের সেরা রাজ-রাজড়াগণের নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্রসহ দূত প্রেরণ করিয়াছেন সংবাদ পাইয়া তাঁহার মধ্যে এই নূতন ধর্ম এবং উহার নবী সম্পর্কে জানার পরম কৌতূহল সৃষ্টি হয়। লোক মারফত এই নূতন নবীর চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে খোঁজখবর লইয়া ফারওয়া নিশ্চিত হন যে, সত্যসত্যই তিনি আল্লাহর প্রেরিত শেষ রাসূল। সাথে সাথে তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া রাসূলে কারীম -এর প্রতি তাহার গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা জ্ঞাপন করিয়া মাস'উদ ইবন সা'দ নামক তাহার এক দূতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ -এর খেদমতে একখানি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রখানির পাঠ ছিল এইরূপ:
لمحمد رسول الله انى مقر بالاسلام مصدق به اشهد ان لا اله الا الله وان محمدا رسول الله انت الذي بشر بك عيسى بن مريم عليه الصلوة والسلام. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ-এর প্রতি। আমি সর্বান্তকরণে ঈমান আনয়ন করিয়াছি এবং ইসলামের সত্যতার প্রত্যয়ন করিতেছি। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন নাই