📄 হাওয়ার প্রতি খৃস্টান ধর্মযাজকের সতর্কবাণী
পত্র প্রাপ্তির পর হাওযা দূতকে সাদরে বরণ করেন, তাঁহাকে সম্মান প্রদর্শন করিয়া নিজের পাশেই আসন দান করেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬২)। অতপর তিনি রাসূলুল্লাহ-এর পত্রের জবাব দিলেন এইভাবে:
ما احسن ما تدعوا اليه واجمله وانا شاعر قومى وخطيبهم واعرب تهاب مكاني فاجعل لي بعض الامر اتبعك. হাওযার প্রতিক্রিয়া এবং তাহার পত্রের বর্ণনা মওলানা মুহাম্মদ ছায়ীদের সহজ সরল ভাষায় বিধৃত হইয়াছে এইভাবে:
পত্র পাইয়া হাওযা তাযিম করিল। ছলীতোর আপনার কাছে বসাইল। এনাম খেলাত দান করিল তাহারে। পত্রের উত্তর দিল লিখিয়া তা পরে। যে দীনের দিকে তুমি বোলাও আমায়। সত্যই তা ভাল দীন শোবা নাহি তায়। কিন্তু এক শর্ত আমি করি খেদমতে। মঞ্জুর করিলে তাহা আসিব দীনেতে। প্রসিদ্ধ শায়ের আমি কৌমের খতিব। ডরায় আমাকে সবে ধনী কি গরীব। রাষ্ট্র ক্ষমতার কিছু অংশ আমাকে দান করিলে আমি আপনার অনুগত হইব (দ্র. তাওয়ারীখে মুহাম্মাদী, ৭খ., পৃ. ২৮)।
সাথে সাথে সে সালীতকে মূল্যবান উপঢৌকন, হাজারের মূল্যবান রেশমী বস্ত্র এবং কারকাবা নামক একটি গোলামও দান করেন (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬২; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৮)।
ইবনুল আছীরের বর্ণনায় আছে, সাথে সাথে সে একটি প্রতিনিধি দলও রাসূলুল্লাহ-এর সমীপে প্রেরণ করে এই বক্তব্য দিয়া যে, তিনি যদি তাঁহার পরবর্তী শাসক তাহাকে নিযুক্ত করিয়া যান তাহা হইলে সে ইসলাম গ্রহণ করিবে এবং তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইবে। তাঁহাকে সাহায্য-সহযোগিতাও করিবে। নতুবা সে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। এই প্রতিনিধি দলে মুজা'আ ইব্ন মুরারা এবং রাজ্জাল ইব্ন উনফুযাও ছিলেন। এই মুজা'আ মুসায়লামার পড়নের পরবর্তী কালে হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদকে কন্যা দান করেন। রাসূলুল্লাহ-এর পক্ষ হইতে তিনি জমির বরাদ্দ লাভেও ধন্য হন। দুইজনই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। এমনকি রাজ্জাল নবী দরবারে কিছুদিন অবস্থান করিয়া সূরা বাকারা এবং আরও কতিপয় দুআ শিক্ষা করে। কিন্তু পরবর্তীতে ইয়ামামায় ফিরিয়া এই নরাধম মুরতাদ হইয়া ভণ্ডনবী মুসায়লামাকে নবী কারীম উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করিয়াছেন বলিয়া মারাত্মক অপপ্রচারে লিপ্ত হয় যাহা ইসলামের জন্য খুবই ক্ষতিকর হইয়াছিল (আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮২; ইব্ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫০৩; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ২৬২)।
ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, হাওযার দরবারে একজন খৃস্টান পাদ্রী থাকিতেন। তিনি হাওযাকে রাসূলুল্লাহ -এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিলে সে জবাব দেয়, হাঁ, আমার নিকট তাঁহার পত্র আসিয়াছিল। তিনি আমাকে তাঁহার ধর্ম গ্রহণের দাওয়াত দিয়াছিলেন, কিন্তু আমি তাঁহার সেই আহ্বানে সাড়া দেই নাই। উক্ত পাদ্রী তাহাকে ইহার কারণ কী জিজ্ঞাসা করিলে সে জানায়, আমার স্ব-ধর্মের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে। এতদ্ব্যতীত আমি আমার সম্প্রদায়ের সর্দার, তাঁহার ধর্ম গ্রহণে শেষ পর্যন্ত যদি আমার রাজত্বই হাতছাড়া হইয়া যায় এই আশঙ্কায়ই শঙ্কিত ছিলাম।
খৃস্টীয় পণ্ডিত বলিলেন, আপনি যদি তাঁহার আনুগত্য করিতেন, তাহা হইলে তিনি কস্মিনকালেও আপনার রাজত্ব হইতে আপনাকে অপসারিত করিতেন না। তিনি আরবের নবী। হযরত 'ঈসা (আ) ইনজীলে তাঁহার সু-সমাচার দিয়া গিয়াছেন। এই পাদ্রীর নাম ছিল আরকুন। ইনি দামিশকবাসী রোমান ক্যাথলিক ছিলেন এবং হযরত আবু বকর (রা)-এর আমলে হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৮)।
দৌত্যকার্য সম্পন্ন করিয়া হযরত সালীত (রা) হাওযার জবাবী পত্র ও তাহার প্রদত্ত উপঢৌকনাদিসহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। হাওযার জবাব পাঠ করিয়া রাসূলুল্লাহ বলিলেন:
لو سألتي سيابة من الارض ما فعلت بادوباد ما في يديه. পুঁথিকার মওলানা মুহাম্মদ ছায়ীদ পুঁথির ভাষায় উহার চমৎকার অনুবাদ করিয়াছেন এবং সাথে সাথে ব্যাখ্যামূলক মন্তব্যও সংযোজন করিয়াছেন:
পত্র পড়ে কহিলেন নবী মোস্তফায়। "বিন্দুমাত্র জমিও না দিব আমি তায়। শীঘ্রই সে নিজে আর সর্ব ধন তার। বিনষ্ট হইয়া যাবে গযবে খোদার।"
ইসলাম সস্তার মাল নহে কোন কালে। বেচাকেনা হইবে যে রাজ্যের বদলে। দুনিয়ার লোভে যেবা হয় মোছলমান। কচুর পাতার জল তাহার ঈমান। (তাওয়ারিখে মোহাম্মদী, ৭খ., পৃ. ২৮; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬২)।
এক বৎসর পর যখন নবী কারীম মক্কা বিজয় করিয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন, তখন জিবরাঈল আসিয়া সংবাদ দিলেন যে, বেদীন হাওযা মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। নবী কারীম সাহাবীগণকে তাহা অবগত করিলেন। সাথে সাথে মন্তব্য করিলেন, অতঃপর হাওয়ার স্থলে ঐ দেশে এমন এক মহা মিথ্যুকের আবির্ভাব ঘটিবে যে নবী হওয়ার দাবি করিবে। সত্যসত্যই ইহার কিছুদিন পরেই ইয়ামামায় ভণ্ডনবী মুসায়লামার অভ্যুদয় ঘটে (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬২; সীরাত হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৮৬; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৯)।
📄 মুসায়লামা কায্যাবকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
দশম হিজরীতে ইয়ামামার প্রতিনিধি দলের সহিত রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে আগমনকারী • মুসায়লামা ইব্ন হাবীব কথা প্রসঙ্গে নবী কারীম -এর নিকট প্রস্তাব দেয়, আপনি যদি
নবুওয়াতে আমাকেও আপনার সহিত অংশীদার করিয়া লন এবং আপনার ইনতিকালের পর আমাকে যদি আপনার স্থলাভিষিক্ত করার প্রতিশ্রুতি দান করেন, তাহা হইলে আমি ঈমান আনয়ন করিতে পারি। সাহাবী কায়েস ইব্ন সাম্মাশ (রা) তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর পার্শ্বেই ছিলেন। নবী কারীম তাঁর জবাবে বলেন: “আমার হস্তস্থিত এই ক্ষুদ্র কাষ্ঠখণ্ডও আমি তোমাকে দিব না” (لو سألتني هذا العسيب ما اعطيتكه) (সীরাত হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৫২; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২৪৪)।
সাথে সাথে তিনি আরও বলেন, আমাকে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তোমার অন্তর্নিহিত মতলব এবং ইহার পরিণতি দেখানো হইয়াছে।
উক্ত প্রতিনিধি দলের ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তনের পর হাওযার মৃত্যু হয় এবং মুসায়লামা তাহার স্থলাভিষিক্ত হয়। মুসায়লামা নবুওয়াতের দাবি করিয়া বসে। প্রতিনিধিদল তাহার অন্যতম সাথী, রাজ্জাল ইব্ন উনফুয়া নবী দরবারে বাহ্যত ইসলাম গ্রহণ করিলেও ঐ সময় মুসায়লামার পক্ষে মিছামছি প্রচারণা চালায় যে, বাক্যালাপকালে নবী কারীম মুসায়লামাকে তাহার সহ-নবীরূপে স্বীকৃতি দিয়াছেন। ফলে গোটা ইয়ামামায় ধর্মত্যাগের হিড়িক পড়িয়া যায়। দলে দলে লোক মুসায়লামার দলে ভিড়িতে থাকে। এই সময় রাসূলুল্লাহ আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরীর মাধ্যমে মুসায়লামাকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাইয়া একখানা পত্র প্রেরণ করেন। উক্ত পত্রখানার পাঠ পাওয়া যায় না (মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ২৫৬-৭)।
মুসায়লামা ছুমামা ইব্ন উছাল এবং আবদুল্লাহ ইবনুন নাওয়াহা নামক দুই ব্যক্তিকে পত্রসহ তাঁহার দূতরূপে রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে প্রেরণ করে। তিনি মুসায়লামার নবুয়াত দাবি সম্পর্কে তাহাদের মতামত জানিতে চাহিলে তাহারা এই ব্যাপারে মুসায়লামার প্রতি তাহাদের সমর্থনের কথা ব্যক্ত করে। তখন তিনি বলিলেন: দূত হত্যা কূটনৈতিক রীতির পরিপন্থী না হইলে আমি তাহাদের গর্দান উড়াইয়া দিতাম (আল-কামিল, ২খ., পৃ. ২০৪; মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮৭)। মুসায়লামার পত্রের পাঠ এইরূপ:
من مسيلمة رسول الله الى محمد رسول الله سلام عليك اما بعد واني قد اشركت فى الامر معك وانا لنا نصف الارض ولقريش نصف الارض ولكن قريشا قوم يعتدون. "আল্লাহ্র রাসূল মুসায়লামার পক্ষ হইতে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ-এর প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক। অতঃপর রাষ্ট্রশক্তিতে আমি আপনার সাথে অংশীদার; অর্ধেক ভূখণ্ড আমার এবং অর্ধেক কুরায়শদের। কুরায়শরা বৈরী ভাবাপন্ন জাতি” (মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ২৫৭; মিসবাহুল মুদী, ২খ., প. ৩৮৭)।
তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উবায় ইব্ন কা'ব (রা)-এর হস্তে ইহার জবাব লিখাইলেন:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى مسيلمة الكذاب سلام على من اتبع الهدى اما بعد فان الارض لله يورث من يشاء من عباده والعاقبة للمتقين. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে মিথ্যাবাদী মুসায়লামার প্রতি। সালাম হিদায়াতের অনুসারী যে তাহার প্রতি। অতঃপর তাবৎ ভূমি আল্লাহ্র মালিকানাধীন। তিনি তদীয় বান্দাদের মধ্য
📄 ছুমামা ইব্ন উছালের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
হইতে যাহাকে চাহেন তাহাকে তাহা দান করেন। শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য" (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮৭; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৮১)।
নবী কারীম এই পত্রখানা হাবীব ইব্ন যায়দ ইব্ন আসিম (রা)-কে অর্পণ করিয়া উহা মুসায়লামার নিকট পৌছাইবার নির্দেশ দান করেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন ওয়াহব আসলামী এবং হযরত সাইব ইবন আল-'আওয়াম (রা)-কে তাঁহার সঙ্গীরূপে দেওয়া হয়। পত্র পাইয়া মুসায়লামা অগ্নিশর্মা হইয়া উঠে এবং পত্রবাহক হাবীব (রা)-এর হাত-পা কাটিয়া ফেলে। অপর দুইজন নবী কারীম -এর খিদমতে পৌছিয়া যখন দূতের প্রতি মুসায়লামার এই পৈশাচিক আচরণ সম্পর্কে তাঁহাকে অবহিত করিলেন তখন তিনি অত্যধিক মর্মাহত হইলেন এবং আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রহিলেন।
অবশেষে হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত আমলের সূচনাকালেই এই ভণ্ডনবীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। মুসলিম পক্ষেও প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকারের পর সতের হাজার ধর্মত্যাগী মুরতাদ অনুসারীসহ এই ভণ্ড মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়। শহীদ শ্রেষ্ঠ হযরত হামযা (রা)-এর ঘাতক ওয়াশী ঠিক ঐ বল্লমটি দ্বারা মুসায়লামাকে হত্যা করিয়া তাঁহার পূর্ব পাপের কাফফারা আদায় করেন— যাহা দ্বারা উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি হামযাকে শহীদ করিয়াছিলেন। ইয়ামামাবাসীরা অতঃপর পুনরায় ইসলামের ছায়াতলে ফিরিয়া আসে (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮৭-৮; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৩)।
তুমামা ইব্ন উছালের প্রতি রাসূলুল্লাহ-এর পত্র
ان رسول الله ﷺ كتب الى ثمامة بن اثال وهوذة بن على ملكى اليمامة وكذا ابن الاثير في اسد الغابة في ترجمة سليط بن عمر. "রাসূলুল্লাহ ছুমামা ইব্ন উছাল এবং হাওযা ইবন 'আলী ইয়ামামার এই উভয় রাজাকেই পত্র লিখেন। উসদুল গাবায় সালীত ইবন 'আমর প্রসঙ্গে আলোচনায় অনুরূপ লিখিয়াছেন” (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৯)।
লক্ষণীয়, হাওযার পূর্বেই এখানে ছুমামার নাম উল্লিখিত হইয়াছে এবং উভয়ই যে ইয়ামামার বাদশাহ ছিলেন তাহাও ব্যক্ত করা হইয়াছে। কালের আবর্তে রাসূলুল্লাহ-এর ছুমামাকে লিখিত পত্রখানা হারাইয়া গেলেও ধরিয়া লইতে হইবে, পত্রবাহক ও পত্রের বক্তব্য অভিন্ন।
উল্লেখ্য, আল-ইসাবায় বুখারীর বরাতে এবং সহীহ মুসলিম, ৫খ., পৃ. ১৫৮; কিতাবুল জিহাদ, সুনানে বায়হাকী, ৬খ., পৃ. ৩১৯ ও ৯খ., পৃ. ৬৫-৬৬; মুসনাদ ২খ., পৃ. ২৪৬; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৩১৫-তে আবু হুরায়রা (রা)-এর একটি এই মর্মের বর্ণনা রহিয়াছে যে, ছুমামা একটি মুসলিম অভিযানকালে বন্দী হইয়া নবী দরবারে আনীত হন। উসদুল গাবায় ইবন ইসহাক আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীছে এই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, ছুমামা উমরা করিতে আসিয়া মদীনায় প্রবেশ করিয়াছিলেন এবং এই সময়ে গ্রেফতার হইয়াছিলেন। সীরাতকার হালাবী বলেন, ছুমামা যেহেতু ইতোপূর্বেই সালীতের হাতে সপ্তম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, সুতরাং তাহাকে ঐ মর্মের পত্র দেওয়ার প্রেক্ষিত ছিল না তাহা ঠিক নহে। কেননা পত্র প্রেরণের ঘটনাটি একেবারে সপ্তম হিজরীর শুরুতে মুহাররাম মাসে কিংবা ৬ষ্ঠ হিজরীর একেবারে শেষ প্রান্তে
📄 সিরিয়ার গভর্নর হারিছ ইব্ন আবী শামির আল-গাস্সানীর নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
যিলহজ্জ মাসে ঘটিয়াছিল। আর তাহার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি ঘটে পত্র প্রেরণের পরে সপ্তম হিজরীর মুহাররাম মাসে। কেননা আবূ হুরায়রা (রা) নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন ৭ম হিজরীতে এবং খায়বারে রাসূলুল্লাহ-এর সহিত আসিয়া সাক্ষাত করেন। আর খায়বার যুদ্ধ ঘটে ৭ম হিজরীর মুহাররাম মাসে। সুতরাং তাহার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাহাকে এইরূপ পত্র প্রেরণের মধ্যে কোন অসঙ্গতি নাই। পত্র পাওয়ার পর অন্য অনেকের মত ছুমামার মনেও হয়ত প্রথমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইয়াছিল। তাহার ইসলাম গ্রহণের বিবরণ হইতে জানা যায়, তিনি নবী কারীম-কে হত্যার উদ্দেশ্যেই মদীনায় প্রবেশ করিয়া মুসলিম বাহিনীর হাতে ধরা পড়িয়াছিলেন। সীরাতে হালাবিয়্যার পাদটীকায় (২খ., পৃ. ১৬৩) মুদ্রিত দাহলানের এই তথ্যও আশ্চৰ্যজনক ও বিভ্রান্তিকর যে, রাসূলুল্লাহ ষষ্ঠ হিজরীর মুহাররাম মাসের দশ তারিখ গত হইলে কার্তা অভিমুখে একটি অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং তাহারাই ছুমামাকে বন্দী করিয়া আনিয়াছিলেন।
রাওদাতুল কাফী গ্রন্থে (পৃ. ২৯৯) আবূ জা'ফার বাকির (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম প্রেরিত বাহিনীর হাতে ছুমামা বন্দী হন। ইতোপূর্বে রাসূলুল্লাহ তাঁহার ব্যাপার দু'আ করিয়াছিলেন "হে আল্লাহ! ছুমামাকে আমার বশে আনিয়া দিন।" রাসূলুল্লাহ বন্দি ছুমামাকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, আমি তোমাকে তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি দিতেছি: হয় আমি তোমাকে হত্যা করিব। সাথে সাথে বন্দী ছুমামা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি একটি মহা শত্রুকেই নিপাত করিবেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, অথবা পণ গ্রহণ করিয়া তোমাকে মুক্ত করিয়া দিব। ছুমামা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি ইহার চড়া মূল্য লাভ করিবেন। অথবা তোমাকে নিরাপত্তা দিয়া মুক্ত করিয়া দিব। সাথে সাথে ছুমামা বলিলেন, তাহা হইলে আপনি আমাকে কৃতজ্ঞ দেখিতে পাইবেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, আমি তোমার প্রতি অবশ্যই বদান্যতা প্রদর্শন করিয়াছি। ছুমামা বলিলেন, রাসূলুল্লাহ শেষপর্যন্ত তাহাকে নিঃশর্ত মুক্তি দান করিয়াছেন। সাথে সাথে এই সময় ছুমামা বলিয়াছিলেন :
فاني اشهد ان لا اله الا الله وانك محمد رسول الله وقد والله علمت انك رسول الله حيث رأيتك وما كنت لاشهد بها وانا في الوثاق "আমি সাক্ষ্য প্রদান করিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, আর নিশ্চয় আপনি হে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
"আল্লাহর কসম! প্রথম দর্শনেই আমি নিশ্চিত হইয়াছিলাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল কিন্তু বন্দী অবস্থায় উহা স্বীকার করা আমি শোভনীয় বিবেচনা করি না" (ইস্তীআব, আল-ইসাবার পাদটীকা, ১খ., পৃ. ২০৩; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৯-৪০)।
সিরিয়ার গভর্নর হারিছ ইবন আবী শামির আল-গাস্সানীর নিকট রাসূলুল্লাহ-এর পত্র
রাসূলুল্লাহ রাজ-রাজড়াদের উদ্দেশ্যে পত্র প্রেরণ করার সময় দূত শুজা' ইব্ন ওয়াহ্ আল-আসাদীর মাধ্যমে হারিছের নিকটও একখানি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রটির পাঠ ছিল নিম্নরূপ:
বিস্মিল্লাহির রহমানির রহীম। মিন মুহাম্মাদ রাসূলিল্লাহ ইলাল হারিস ইব্ন আবী শামির। সালামুন আলা মানিত্তাবা'আল হুদা ওয়া আমানা বিহী ওয়া সাদ্দাকা ওয়া ইন্নি আদউকা আন তু'মিনা বিল্লাহি ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু ইয়াবকা মুলকুক. "পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু আল্লাহ্র নামে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর পক্ষ হইতে হারিছ ইব্ন আবী শামিরকে। সালাম তাহার প্রতি যে হিদায়াতের অনুসারী হইয়াছে এবং তাহার প্রতি ঈমান আনিয়াছে এবং আস্থা প্রকাশ করিয়াছে। আমি আপনাকে সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের দা'ওয়াত দিতেছি যিনি একক, যাঁহার কোন অংশীদার নাই। (ঈমান আনয়নের ফলে) আপনার রাজত্ব টিকিয়া থাকিবে" (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৪-৩৫)।
পত্রবাহক শুজা' দামিশকে পৌঁছিয়া জানিতে পারিলেন, হারিছ সম্রাট হিরাক্লিয়াসের অভ্যর্থনা উপলক্ষে বায়তুল মুকাদ্দাসে রহিয়াছে। পারস্যের উপর বিজয়লাভ এবং পারসিকদের ছিনাইয়া লওয়া পবিত্র ক্রুশ পুনরুদ্ধারের পর উহার পুনঃস্থাপন উৎসবে যোগদানের উদ্দেশ্যে হিরাক্লিয়াস তখন পদব্রজে হিমস হইতে ঈলিয়ায় আগমন করিয়াছিলেন। অগত্যা দূত শুজাকে কয়েক দিন দামিশকে তাহার প্রতীক্ষায় থাকিতে হয়।
হারিছ দামিশকে প্রত্যাবর্তন করিলে দূত রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা তাহার নিকট হস্তান্তর করিলেন। পত্রপাঠে হারিছ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিল। নূতন নবীর প্রতি ঈমান আনয়ন না করিলে রাজত্ব হারাইতে হইবে এমন একটা প্রচ্ছন্ন হুমকিকে সে কোনমতেই সহজভাবে গ্রহণ করিতে পারিল না। সে পত্রখানি ছুঁড়িয়া মারিয়া গর্জিয়া উঠিল, আমার রাজ্য আবার কে ছিনাইয়া লইবে? সাথে সাথে তাহার উযীরকে অবিলম্বে মদীনা আক্রমণের জন্য সৈন্য-সামন্ত প্রস্তুত করিতে নির্দেশ দিল, অপরদিকে যুদ্ধের অনুমতি প্রার্থনা করিয়া এই ব্যাপারে রোমক সম্রাটের সম্মতি আদায়ের জন্যও সচেষ্ট হইল। হিরাক্লিয়াস এই ব্যাপারে তাহাকে বারণ করায় সে যুদ্ধযাত্রা হইতে বিরত থাকে (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৩৫)।
হযরত শুজা' বর্ণনা করেন, দামিশকে অবস্থানকালে বাদশাহর অভ্যর্থনা কক্ষের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মুরীর সহিত আমার কয়েক দিনের সহঅবস্থানের ফলে অনেকটা ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। লোকটি ছিল রোমান বংশোদ্ভূত। একদিন সে আমার নিকট আমাদের নবী কারীম সম্পর্কে জানিতে আগ্রহ প্রকাশ করিল। আমি তাহাকে তাঁহার বিবরণ শুনাইলে তাহার মনে বিরাট এক পরিবর্তন সূচিত হইল। আবেগভরা কণ্ঠে সে আমাকে বলিল :
"তুমি আমাকে তাঁহার সম্পর্কে যাহা যাহা বলিলে, ইনজীল কিতাবে আগমনকারী নবীর লক্ষণাদির সহিত তাঁহার অদ্ভুত মিল রহিয়াছে। আমরা তো তাঁহারই প্রতীক্ষায় রহিয়াছি। আমি সর্বান্তকরণে তাঁহার প্রতি ঈমান আনিয়াছি এবং তাঁহার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেছি। কিন্তু আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে কাহাকেও ঘূর্ণাক্ষরেও কিছু বলিতে যাইও না। আমার আশংকা হয়, হারিছ তাহা আঁচ করিতে পারিলে আমাকে সে প্রাণে বধ করিবে। এমনিতে কিন্তু সে আমার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল এবং তাহার মেযাজের উপর আমার বেশ দখল আছে।"
একদিন হারিছ অত্যন্ত শান-শওকতের সহিত দরবার অনুষ্ঠান করিল। মুরী সেখানে আমার আগমন সংবাদ তাহাকে অবগত করিলে সে আমাকে তাহার দরবারে ডাকাইল এবং পত্রখানা আমার হাত হইতে গ্রহণ করিয়া পাঠ করাইয়া শুনিল এবং ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিল।