📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উমানের রাজন্যদ্বয়ের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র

📄 উমানের রাজন্যদ্বয়ের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র


উত্তম। যে ব্যক্তি হিদায়াতের অনুসারী তাহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক" (তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ২৭৫)।
সাথে সাথে বাহ্রায়নের জনগণের উদ্দেশ্যেও রাসূলুল্লাহ্ -এর পক্ষ হইতে একটি লিপি প্রেরিত হয়। তাহা ছিল এইরূপ:
اما بعد فانكم اذا اقمتم الصلوة واتيتم الزكوة ونصحتم لله ولرسوله واتيستم عشر النخل ونصف عشر الحب ولم تمجسوا اولادكم فلكم ما تسلمتم عليه غير ان بيت النار لله ولرسوله وأن ابيتم فعليكم الجزية. "অতঃপর যখন তোমরা সালাত কায়েম করিবে, যাকাত প্রদান করিবে এবং আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি আন্তরিক হইবে, খেজুরের এক-দশমাংশ এবং অন্যান্য শস্যের বিশ ভাগের এক ভাগ পরিশোধ করিবে, নিজেদের সন্তানদেরকে অগ্নিউপাসক হইতে দিবে না, তাহা হইলে ইসলাম গ্রহণকালে তোমাদের যাবতীয় সম্পদের মালিকানা তোমাদেরই থাকিবে। তবে বায়তুন-নার আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের মালিকানাধীন থাকিবে। আর যদি তোমরা এই সমস্ত বিষয় অস্বীকার কর তাহা হইলে তোমাদেরকে অবশ্যই জিযয়া পরিশোধ করিতে হইবে" (আল-বালাযুরী, ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৭৯)।
প্রাচীন ভৌগোলিকগণ আরব উপদ্বীপকে পাঁচটি প্রদেশে বিভক্ত করিয়াছেন: (১) তিহামা, (২) হিজায, (৩) য়ামান, (৪) নাজদ এবং (৫) 'আরুদ (عروض)। এই শেষোক্ত প্রদেশটি পূর্ব নাজদ ও ইরাক সীমান্ত হইতে শুরু করিয়া আরব উপসাগর (যাহা আমাদের নিকট উমান উপসাগর নামে পরিচিত) পর্যন্ত বিস্তৃত। উমান বাহ্রায়ন ও ইয়ামামা ঐ আরবদেরই তিনটি রাজ্য (দ্র. মাকতুবাতে নবভী, পৃ. ১৭৫)। দেশটির উমান নামকরণ করা হয় হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রপৌত্র উমান ইবন সাবা ইবন ইয়াকযান-এর নামানুসারে।
হাসান ইব্‌ন আদিয়া বলেন, আমি একদা হযরত ইবন উমারের সহিত সাক্ষাত করিতে গেলে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কোন দেশের লোক? আমি বলিলাম, উমানের। তিনি বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট হইতে শ্রুত একটি হাদীছ তোমার নিকট বর্ণনা করিব না? আমি বলিলাম, আলবৎ। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ বলিয়াছেন:
اني لا علم ارضا من ارض العرب يقال لها عمان على شاطي البحر الحجة منها افضل او خير من حج من غيرها . "আমি এমন একটি আরব ভূমির নাম জানি যাহাকে উমান নামে অভিহিত করা হইয়া থাকে। দেশটি সাগর তীরে অবস্থিত। ঐ দেশ হইতে আসিয়া হজ্জ করিলে অন্য যে কোন ভূমি হইতে আগন্তুকদের হজ্জের তুলনায় উত্তম।"
অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন:
من تعذر عليه رزقه فعليه بعمان "যে ব্যক্তি জীবিকার কষ্টে পতিত হয় তাহার উচিত ওমানে যাওয়া” (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ১৫০)।
ওমানের উপকূলীয় এলাকা অত্যন্ত সবুজ-শ্যামল, সুজলা-সুফলা। দেশটির পাহাড়-পর্বত খনিজ দ্রব্যাদিতে, দরিয়া মুক্তায় এবং প্রান্তরসমূহ রকমারি শস্য ও ফল-ফলারীতে পরিপূর্ণ। এখানকার জঙ্গলে মূল্যবান সুগন্দি কাঠ পাওয়া যায়। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ। রাজধানী মঙ্কট। উহা ওমান উপসাগরের পশ্চিম কোলে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ্-এর আমলে ওমান ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ মজুসী ধর্ম প্রচলিত ছিল।
অষ্টম হিজরীর যী-কা'দা মাসে রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রসহ হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা), যিনি তাঁহার কূটনৈতিক পারঙ্গমতা এবং মিসর জয়ের কৃতিত্বের জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে, ওমানে গমন করেন। আবদ ও জা'ফার নামক দুই ভাই তখন সেখানকার রাজা ছিলেন। ঘটনাচক্রে আবদের সহিত আমর ইবনুল আসের পিতা আসের পূর্ব হইতেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে 'আমর সর্বপ্রথম 'আবদের নিকটেই গিয়া উঠেন। তাঁহার ভাষায়:
আমি যখন রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রসহ ওমানে গিয়া পৌঁছিলাম তখন সর্বপ্রথম আমার আবদের সহিত সাক্ষাত হয়। তিনি ছিলেন সর্দার এবং তাঁহার ভাইয়ের তুলনায় নম্র প্রকৃতির লোক। আমি তাঁহাকে জানাইলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে দূতের দায়িত্ব লইয়া এইবার আপনার এবং আপনার ভাইয়ের নিকট আমার আগমন। 'আবদ বলিলেন, দেখ, আমার ভাই আমার চাইতে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং রাজ্যের প্রকৃত রাজা তিনিই। আমি তোমাকে তাঁহার দরবারে পৌঁছাইয়া দিব। তবে আগে বল, তুমি তাঁহার পক্ষ হইতে কিসের দাওয়াত লইয়া আসিয়াছ?
জবাবে আমর ইবনুল আস (রা) বলিলেন, আমি একক লা-শারীক আল্লাহর দিকে আপনাদেরকে আহ্বান জানাইতে আসিয়াছি। উপরন্তু আপনাদেরকে আরও সাক্ষ্য দিতে হইবে যে, মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল। এই সময় তাঁহাদের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন হয়। ইহার বিবরণ একটু পরেই আসিতেছে। তাহাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ যে পত্র দেন তাহার পাঠ ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد بن عبد الله الى جيفر وعبد البنى الجلندى سلام على من اتبع الهدى اما بعد فاني ادعوكما بدعاية الاسلام اسلما تسلما انى رسول الله الى الناس كافة لانذر من كان حيا ويحق القول على الكافرين وانكما ان اقررتما بالاسلام وليتكما وان ابيتما ان تقرا بالاسلام فان ملككما زائل عنكما دخيلى تحل بساحتكما وتظهر نبوتي على ملككما. "পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহর নামে। আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে জুলান্দীর পুত্রদ্বয় আব্দ ও জা'ফারের প্রতি। শান্তি বর্ষিত হউক তাহার প্রতি যে হিদায়াতের অনুসরণ করে। অতঃপর আমি আপনাদের উভয়কে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাইতেছি।
আপনারা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন। আমি সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহ্র রাসূলরূপে প্রেরিত হইয়াছি- যাহাতে আল্লাহ্র বান্দাদেরকে সতর্ক করিয়া দেই এবং অগ্রাহ্যকারীদের উপর আল্লাহ্ দলীল পূর্ণ হইয়া যায়। আপনারা উভয়ে যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে আমি আপনাদের উভয়কেই শাসক পদে বহাল রাখিব। আর যদি অগ্রাহ্য করেন এবং ইসলাম গ্রহণে অসম্মত হন, তবে (মনে রাখিবেন) আপনাদের রাজত্ব টিকিবে না এবং আমার ঘোড়া (অশ্বারোহী বাহিনী) আপনাদের আঙিনায় ঢুকিয়া পড়িবে এবং আপনাদের রাজ্যে আমার নবৃওয়াতের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইবে” (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৮৪; আল-জামহারা, ১খ., পৃ. ৪৬; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩০৮-এর বরাতে; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, ৩খ., পৃ. ৪০৪; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পত্র প্রেরণের বৎসর ও বাহক সম্পর্কে মতভেদ

📄 পত্র প্রেরণের বৎসর ও বাহক সম্পর্কে মতভেদ


ফুতুহুল বুলদানে (পৃ. ৮৮) উক্ত হইয়াছে যে, পত্রখানির বাহক ছিলেন আবূ যায়দ, আর আমর তাহাদের নিকট প্রেরিত হইয়াছিলেন তাহাদের ইসলাম গ্রহণের পর যাকাত উত্তোলনের উদেশ্যে। লেখক উহার স্বপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়া বলিয়াছেন, পত্র প্রেরিত হয় ষষ্ঠ হিজরীতে আর আমর ইসলাম গ্রহণ করেন ৮ম হিজরীতে। সুতরাং ঐ সময়ে রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষে তাঁহার দৌত্যের প্রশ্নই আসে না। কিন্তু ইবনুল আছীর তদীয় আল-কামিল-এ (২খ., পৃ. ৮৮) এবং উসদুল গাবার লেখক তদীয় গ্রন্থে (১খ., পৃ. ৩১৩) এবং আল-ইসাবা জা'ফার-এর আলোচনায় লিখেন, পত্রটি ৮ম হিজরীতেই প্রেরিত হয় এবং উহার বাহক 'আমরই ছিলেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৮-৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দূত আমর ইবনুল আস ও ওমানের রাজার কথোপকথন

📄 দূত আমর ইবনুল আস ও ওমানের রাজার কথোপকথন


'আব্দ: তুমি হইতেছ তোমাদের কওমের সর্দারের পুত্র। আচ্ছা বল দেখি, তোমার পিতা এই ব্যাপারে কী করিয়াছেন? কেননা আমরা তাহাকে আমাদের আদর্শরূপে ধরিয়া নিতে পারি। আমর: তিনি তো মারা গিয়াছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তিনি নবী কারীম -এর প্রতি ঈমান আনয়ন করেন নাই। হায়, যদি তিনি ঈমান আনয়ন করিতেন, যদি ঈমানদার হিসাবে তাহার মৃত্যু হইত তাহা হইলে কতই না উত্তম হইত! আমিও প্রথম তাহার মতেরই অনুসারী ছিলাম। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহার পরম দয়ায় আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করিয়াছেন। আব্দ: তুমি কবে হইতে তাঁহার অনুসারী হইলে? আমর: এই অল্প কিছুদিন পূর্ব হইতে। আব্দ: কোথায় তুমি এই নূতন ধর্মে দীক্ষিত হইলে? আমর: (ইথিওপিীয়) রাজ নাজাশীর দরবারে। হাঁ, আর তিনিও তো ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন। আব্দ: তাঁহার প্রজাসাধারণ ইহাতে তাঁহার সহিত কী আচরণ করিল? আমর: তাঁহাকে তাহারা পূর্বের মতই বাদশাহরূপে বহাল রাখিয়াছে এবং তাহাদের মধ্যকার অনেকেও ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ওমানবাসীদের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র

📄 ওমানবাসীদের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র


আব্দ: বিশপ ও পাদ্রীরাও কি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন? আমর: হাঁ।
আব্দ: দেখ আমর, তুমি কী বলিতেছ? একটু ভাবিয়া-চিন্তা করিয়া কথা বলিও। মিথ্যা বলার চেয়ে একজন মানুষের জন্য অধিকতর জঘন্য ও অপমানজনক আর কিছুই হইতে পারে না। আমর: আমি একটুও মিথ্যা বলিতেছি না। আমাদের ধর্মে তাহা বৈধও নহে। আব্দ: তাহাতে হিরাক্লিয়াসের প্রতিক্রিয়া কী হইল? তিনি কি নাজাশীর এই ধর্মান্তরিত হওয়ার সংবাদ অবহিত হইয়াছেন? আমর: হাঁ, তিনি তাহা অবগত হইয়াছেন। আব্দ: তুমি কেমন করিয়া এই কথা বলিতেছ? আমর: কেন, নাজাশী তো হিরাক্লিয়াসের নিকট গিয়াছেনও। সম্রাটের ভাই নিয়াক তাহার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলিল, ইহা কেমন কথা? নাজাশী রোম দরবারের এক সামান্য গোলাম, তাহার মুখে এত বড় কথা? আবার সে সম্রাটের ধর্মও জলাঞ্জলি দিয়াছে! তখন হিরাক্লিয়াস বলিলেন: তাহাতে কী! সে তাহার নিজের জন্য একটি ধর্ম বাছিয়া লইয়াছে এবং তাহাতে দীক্ষিত হইয়াছে। আমার তাহাতে কী করণীয় থাকিতে পারে? কসম আল্লাহ্! এই সাম্রাজ্যের মায়া কাটাইয়া উঠিতে পারিলে আমিও তাহাই করিতাম। আব্দ: দেখ আমর, তুমি এই সব কী বলিতেছ? আমর: আল্লাহর কসম, আমি একটুও অতিশয়োক্তি করিতেছি না। আব্দ: আচ্ছা, এবার বল দেখি, তিনি কী করিতে বলেন, আর কী করিতে বারণ করেন? আমর: তিনি আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার আদেশ পালন করিতে এবং তাঁহার অবাধ্যতা হইতে বাঁচিয়া থাকিতে বলেন। তিনি সৎকর্ম, আত্মীয়তা রক্ষার আদেশ করেন এবং জুলুম-নিপীড়ন ও সীমালঙ্ঘনে বারণ করেন। তিনি বারণ করেন ব্যভিচার, মদ্যপান, পাথরপূজা, মূর্তিপূজা ও ক্রুশের পূজা করিতে।
আব্দ: তিনি কী উত্তম দীনের দাওয়াতই না দিয়া থাকেন! আমার ভাই যদি আমার কথা শুনিতেন, তাহা হইলে আমরা বাহনে সওয়ার হইয়া তাঁহার নিকট পৌছিয়া মুহাম্মাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করিতাম. এবং তাঁহার সত্যতার প্রত্যয়ন করিতাম। কিন্তু আমার ভাইটি রাজত্ব লিপ্সার কারণে তাহার মায়া ছাড়িতে পারিবেন না, নবীকে গ্রহণ করার পরিবর্তে পাপের পথই বাছিয়া লইবেন।
আমর: তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহা হইলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকেই কওমের সর্দাররূপে বহাল রাখিবেন। তিনি তখন সম্প্রদায়ের ধনীদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিয়া তাহাদের মধ্যকার দারিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করিবেন।
আব্দ: ইহা তো অতি উত্তম কথা। আচ্ছা যাকাত কী? আমর বলেন, তখন আমি আল্লাহ্ তা'আলা বিভিন্ন প্রকারের সম্পদের যে যাকাত ফরয করিয়াছেন তাহা তাঁহার নিকট ব্যাখ্যা করিয়া বলিলাম। ঐগুলির কথা বলিতে গিয়া যখন ফায় সম্পদের কথা উল্লেখ করিলাম তখন আব্দ বলিলেন, হে আমর! আমাদের যে ফায়গুলি বৃক্ষলতার উপর জীবনধারণ করে আর উন্মুক্ত জলাশয়সমূহের পানি পান করে। সেগুলির উপরেও যাকাত ধরা হইবে? আমি বলিলাম, হাঁ।
আব্দ- দূর অজগাঁয়ের লোকেরা তাহাদের অগণিত পশুর যাকাত আদায়ে সম্মত হইবে বলিয়া আমার তো মনে হয় না। আমর বলিলেন, ইহার পর আব্দ কয়েক দিন পর্যন্ত তাঁহার ভাইয়ের প্রাসাদে অবস্থান করিলেন এবং আমার আগমনের সংবাদ তাহাকে অবহিত করিলেন।
অতঃপর একদিন তিনি আমাকে তাহার দরবারে তলব করিলেন। আমি তাহার দরবারে প্রবেশ করিলাম। তাহার রক্ষীরা তখন আমার বাহুতে ধরিয়া রাখিল। তিনি বলিলেন, তাহাকে ছাড়িয়া দাও। আমি তখন বসিতে উদ্যত হইলাম। তাহারা তখন আমাকে ছাড়িতে চাহিল না। আমি তাঁহার দিকে তাকাইয়া তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করিলাম। তিনি বলিলেন, তুমি যে জন্য আসিয়াছ তাহা বল। তখন আমি নবী কারীম ﷺ-এর সীলমোহরযুক্ত পত্রখানা তাঁহার নিকট হস্তান্তর করিলাম। তিনি সীলমোহর ভাঙ্গিয়া পত্রখানা নিজে পড়িয়া তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট ভাইকে তাহা পড়িতে দিলেন। তিনিও তাহা পাঠ করিলেন। পর জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা কুরায়শরা এই ব্যাপারে কী করিয়াছে তাহা কি একটু বলিবে? আমি জবাব দিলাম, তাঁহারা তাহার ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া অথবা যুদ্ধের ভয়ে ভীত হইয়া তাহা গ্রহণ করিয়াছে।
তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তাঁহার সাথী কাহারা? আমি বলিলাম যাহারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া স্বীয় আত্মীয়-স্বজন ত্যাগ করিয়া তাঁহার আনুগত্য গ্রহণ করিয়াছে তাঁহারাই তাহার সঙ্গী-সাথী। তাহারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত হিদায়াত লাভে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছেন যে, ইতোপূর্বে তাহারা স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন। হে রাজন! আপনার পর্যায়ের আর কেহই আমার জানামতে অবশিষ্ট নাই। আজ আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করিয়া তাঁহার অনুসারী না হন তাহা হইলে মুসলিম বাহিনীর অশ্বরাজির খুরতলে আপনার শস্যশ্যামল প্রান্তরগুলি দলিত-মথিত হইবে। সুতরাং আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপত্তা লাভ করিবেন। তিনি আপনাকেই আপনার সম্প্রদায়ের নেতৃত্বভার অর্পণ করিবেন। আমি চাই, পদাতিক বাহিনী ও অশ্বারোহী বাহিনীর পদতলে আপনার প্রিয়ভূমি দলিত না হউক। তিনি জবাব দিলেন, আজিকার দিনটি তুমি আমাকে ভাবিতে দাও। আগামী কাল আবার আসিও।
পরদিন আমি পুনরায় তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলাম। কিন্তু তিনি আমাকে সাক্ষাতদানে অস্বীকৃতি জানাইলেন। আমি তাঁহার ভাইয়ের নিকট বলিলাম, আমি তো তাঁহার নিকট পৌঁছিতে সমর্থ হই নাই। তিনি আমাকে তাঁহার নিকট পৌঁছাইয়া দিলেন। তিনি বলিলেন, আমি তোমার দা'ওয়াতের ব্যাপারে ভাবিয়া দেখিলাম, আমি যদি আমার যথাসর্বস্ব এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দেই যাহার বাহিনী এখনও আমার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় নাই, তাহা হইলে আমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তি হিসাবে গণ্য হইব। আর যদি একান্তই তাঁহার বাহিনী আমাদের এখান পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিয়াই যায় তবে তাঁহার সহিত এমন প্রচণ্ড যুদ্ধই করিব যাহা হইবে ইতোপূর্বেকার তাঁহার সকল যুদ্ধের চেয়ে ভিন্নতর।
তখন আমি বলিলাম, বেশ, তাহা হইলে আমি আগামী কল্যই ফিরিয়া যাইতেছি। যখন তাঁহার নিশ্চিত বিশ্বাস হইল যে, সত্যসত্যই আমি চলিয়া যাইব, তখন তিনি একান্তে তাঁহার ভাইয়ের সহিত মিলিত হইলেন। পরদিন প্রত্যুষেই তাঁহারা আমাকে ইতিবাচক জবাব দিলেন এবং তাঁহারা দুই ভাইসহ সকলে ইসলাম গ্রহণ করিলেন। তাঁহারা আমার যাকাত গ্রহণ করায় অন্তরায় হইলেন না বরং আমার বিরোধীদের মুকাবিলায় তাঁহারা আমার সমর্থকে পরিণত হইলেন। তাঁহারা তো
মুসলমান হইলেনই, তাঁহাদের সহিত আরও অনেকে ইসলাম গ্রহণ করিলেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৯-৫১)।
আল-ইসাবায় (১খ., পৃ. ১৬২) জুলান্দা প্রসঙ্গে ইবন ইসহাকের বরাতে বলা হইয়াছে, নবী কারীম যখন আমর ইবনুল আসকে তাহার নিকট প্রেরণ করেন তখন ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে তাহাকে অবগত করাকালে তিনি বলেন:
ولني على هذا النبي الأمي انه لا يأمر بخير الا كان اول آخذ به ولا ينهى عن شر الا كان اول تارك له وانه يغلب فلا يبطر ويغلب ولا يهجر وانه يفي بالعهد وينجز الوعد واشهد انه نبي. "উহা আমাকে এমন একজন উম্মী নিরক্ষর নবী শিক্ষা দিয়াছেন যিনি এমন কোন সৎকাজের আদেশ করেন না যাহা সর্বপ্রথম তিনি না করেন এবং এমন কোন মন্দকাজ হইতে বারণ করেন না যাহা হইতে সর্বপ্রথম তিনি নিজে বিরত না হন। তিনি বিজয়ী হন, কিন্তু দম্ভ প্রকাশ করেন না, বিজয়ী হইয়া বিজিতদেরকে পরিত্যাগ করেন না। তিনি প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন, ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। এতদশ্রবণে তিনি (পত্রপ্রাপক) সাক্ষী দিলেন যে, তিনি প্রকৃতই আল্লাহর নবী"।
আর সাথে সাথে কবিতার ছন্দে তিনি বলিলেন:
اتانى عمرو بالتي ليس بعدها من الحق شيئي والنصيح نصيح فقلت له ما زدت ان جئت بالتي جلندى عمان في عمان يصيح فيا عمرو قد اسلمت لله جهرة ينادي بها في الواديين فصيح. "আমর আমার নিকট এমন সত্য লইয়া আসিয়াছে যাহার পরে আর কোন সত্য নাই। উহা সত্যই অপূর্ব নসীহত।
আমি তাহাকে বলিলাম, তুমি ওমানের জুলান্দার নিকট যাহা লইয়া আগমন করিয়াছ, তাহাতে কোন বাড়াবাড়ি নাই যাহা ওমানের সর্বত্র শ্রুত হইতেছে।
"হে আমর! আমি প্রকাশ্যে আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করিতেছি যাহা এক প্রাঞ্জলভাষী নবী প্রান্তরে প্রান্তরে ঘোষণা করিতেছেন"।
তারপর তিনি (ইসাবার লেখক) বলেন, পত্রপ্রাপক ছিলেন জায়ফার। এমনও হইতে পারে যে, পিতা জুলান্দা ও পুত্র জায়ফার উভয়েই পত্রের প্রাপক ছিলেন। জায়ফার প্রসঙ্গে আলোচনাশেষে তিনি বলেন, এমনটি হওয়া বিচিত্র নহে যে, জুলান্দা বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়ায় পুত্রদ্বয়ের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরিত করিয়া দিয়াছিলেন। আমর ওমানে থাকা অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ্ ইন্তিকাল করেন (মাকাতীবুর রাসূল, পৃ. ১৪৭-১৫১; তাবারী, ২খ., পৃ. ৫২০; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬২)।
من محمد رسول الله الى اهل عمان اما بعد فاقرؤا بشهادة ان لا اله الا الله وانى رسول الله وأدوا الزكوة وخطوا المساجد كذا والا غزوتكم. "আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে ওমানবাসীদের প্রতি। অতঃপর তোমরা দৃঢ়ভাবে সাক্ষ্য দান করিবে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তোমরা যাকাত দিবে এবং মসজিদ প্রতিষ্ঠা করিবে। অন্যথায় তোমাদের বিরুদ্ধে আমি অভিযান পরিচালনা করিব" (মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ১২৯; ই'লামুস সাইলীন, পৃ. ১০২; উসদুল গাবা, ৬খ., পৃ. ১৬৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00