📄 মুনযিরের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চতুর্থ পত্র
নবম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ্ যখন তাবুক যাত্রা করিতে মনস্থ করেন, তখন হযরত কুদামা ও আবূ হুরায়রা (রা)-কে জিযয়া বাবত সংগৃহীত অর্থ লইয়া আসিবার জন্য মুনযিরের নিকট প্রেরণ করেন। সেই সময় অপর একজন শাসককেও নির্দেশ প্রদান করা হয় তিনিও যেন তাহার এলাকা হইতে জিয়া বাবৎ সংগৃহীত অর্থ আবূ হুরায়রার মাধ্যমে মদীনায় পাঠাইয়া দেন। এই যাত্রায় তিনি মুনযিরকে লিখিয়াছিলেন:
من محمد رسول الله الله إلى المنذر بن ساوى فادفع اليهما كتابا آخر أما بعد فانی قد بعثت إليك قدامة وأبا هريرة فادفع إليهما ما اجتمع عندك من جزية أرضك والسلام وكتب أبي. "অতঃপর কুদামা ও আবূ হুরায়রাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিতেছি। আপনার দেশের যে জিয়া সংগৃহীত হইয়াছে তাহা তাহাদের নিকট দিয়া দিন। ওয়াসসালাম।
এই পত্রগুলি লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন উবাই ইব্ন কা'ব (রা) (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮২; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৬)।
আবূ রাবী, মুনযিরের ইসলাম গ্রহণ এবং মদীনায় গমন করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত সাক্ষাত করার কথা অস্বীকার করিয়াছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নাবিগ তাহা স্বীকার করিয়াছেন এবং মুনযিরকে সাহাবী বলিয়াছেন।
ঐতিহাসিক ইদুল আছীর 'উসদুল গাবা' গ্রন্থে এবং ইবন হাজার আল-ইসাবাতে মুনযিরের মাওলা (মুক্ত দাস) নাফে' আবূ সুলায়মান প্রসঙ্গে বর্ণনায় উক্ত মত সমর্থন করিয়াছেন এবং মুনযির মদীনায় আগত বাহরায়নের প্রতিনিধিদ দলে ছিলেন বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৪)। এমনকি মুনযিরের মৃত্যুকালে আমর ইবনুল আস (রা) তাঁহার মৃত্যু শয্যায় উপস্থিত ছিলেন বলিয়াও বলা হইয়াছে। মৃত্যুপথযাত্রী তাঁহার এক-তৃতীয়াংশ সম্পদের ব্যাপারে ওসিয়াত করিতে পারে বলিয়া আমর (রা) তাহাকে বলিয়াছিলেন। কিন্তু মুনযির সমস্ত সম্পত্তিই ভাগ করিয়া যাওয়া পসন্দ করেন।
মোটকথা, মুনযির ইবন সাওয়া তাঁহার জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান- রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। রাসূলুল্লাহ্-এর ইন্তিকালের অল্প পূর্বেই এবং বাহরায়নবাসীদের রিদ্দার প্রাক্কালে তাঁহার ইন্তিকাল হয়। 'আলা ইবনুল হাদরামী (রা) তহসীলদাররূপে মুনযিরের ঐখানেই নিযুক্ত ছিলেন। মুনযিরের ইনতিকালের পর তিনি মদীনার পক্ষ হইতে বাহ্রায়নের প্রথম গভর্নররূপে নিযুক্ত হন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৩)।
মুনযিরকে রাসূলুল্লাহ্ কোন সালে পত্র লিখিয়াছিলেন- ৬ষ্ঠ হিজরীতে না অষ্টম হিজরীতে, সেই সম্পর্কে মতভেদ আছে। কিন্তু প্রকৃত কথা হইল, বেশ কয়েকটি পত্রই তাঁহার নামে প্রেরিত হইয়াছিল। প্রথমবার ষষ্ঠ হিজরীতে অন্যান্য রাজ-রাজড়াকে পত্র লিখার সময়ই প্রেরিত হইয়াছিল। জিইররানা হইতে লিখিত পত্রটি যে অষ্টম হিজরীতে প্রেরিত তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। কেননা হুনায়ন অবরোধ অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের অব্যবহিত পরেই হইয়াছিল। সুতরাং বিভিন্ন পত্র বিভিন্ন সময়ে লিখিত হইয়াছিল- যাহার সূচনা হইয়াছিল ষষ্ঠ হিজরীতে এবং সমাপ্তি অষ্টম হিজরীতে।
📄 বাহ্রায়নের জনগণের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
নবী কারীম-এর যুগে হাজার-এর সর্দার ছিলেন উসায়বুখত। সেখত, সী-বুখত, উসায়হাব, উসায়খাব প্রভৃতি বিভিন্ন বানানে এই নামটি পাওয়া যায়। এইগুলির মধ্যে কোনটি যে তাহার প্রকৃত নাম আর কোনটি বিকৃত তাহা নির্ণয় করা কঠিন। তবে তিনি যে বাহরায়ন এলাকার হাজর-এর সর্দার ছিলেন এই ব্যাপারটি সর্বজন স্বীকৃত।
নবী কারীম উসায়বখতের নিকট ইসলামের দা'ওয়াত প্রেরণ করেন। তিনি আনন্দচিত্তে উক্ত আহ্বানে সাড়া দেন এবং যথারীতি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি আকরা' ইবন হাবিসকে দূতরূপে রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে স-সম্মানে গ্রহণ করেন এবং বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত তাঁহাকে আতিথ্য দান করেন। তাঁহাকে বিদায় দানকালে রাসূলুল্লাহ্ (স) যে পত্রটি তাঁহার হাতে তুলিয়া দেন তাহা নিম্নরূপ:...
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله إلى اسبيخت بن عبد الله صاحب هجر إنه قد جاءني الأقرع بكتابك وشفاعتك لقومك وإني قد شفعتك وصدقت رسولك الأقرع في قومك فابشر فيما سألتني وطلبتنى بالذي تحب ولكني نظرت أن أعلمه وتلقاني فإن تجتنا أكرمك وإن تقعد اكرمك أما بعد فإني لا أستهدى أحدا وإن تهد إلى أقبل هديتك وقد حمد عمالي مكانك وأوصيك بأحسن الذي أنت عليه من الصلاة والزكاة وقرابة المؤمنين وإني قد سميت قومك بنى عبد الله فمرهم بالصلاة وبأحسن العمل وأبشر والسلام عليك وعلى قومك المؤمنين. “বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে হাজার এলাকার প্রধান উসায়বুখতের প্রতি। হাম্দ ও সালাতের পর— আপনার পত্র ও আপনার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে সুপারিশসহ আমার নিকট আল-আকরা ইন্ন হাবিস আসিয়াছেন। আমি আপনার সুপারিশ মঞ্জুর করিয়াছি এবং আপনার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে তাহার সুপারিশ মানিয়া লইয়াছি। আমি আপনাকে সুসংবাদ দিতেছি, আমি আপনার আবেদন মঞ্জুর করিয়াছি এবং আমার নিকট যাহা চাহিয়াছেন তাহা দান করিয়াছি। আমি অপেক্ষা করিয়াছি যে, আপনি আমার নিকট উহা ব্যাখ্যা করিবেন। আপনি আমার নিকট আগমন করিলে আমি আপনাকে সসম্মানে গ্রহণ করিব। আর আগমন না করিলেও আপনার প্রতি সম্মানবোধ আমার অন্তরে রহিয়াছে। অতএব আমি কাহারও নিকট হইতে উপঢৌকনের প্রত্যাশা করি না, তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপনি উপঢৌকন দিলে তাহা গ্রহণ করিব। আমার কর্মচারিগণ আপনার উচ্চ মর্যাদার প্রশংসা করিয়াছেন। আমি আপনাকে সালাত, যাকাত ও মুসলমানদের সহিত সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের উপদেশ দিতেছি। আমি আপনার সম্প্রদায়ের নামকরণ করিয়াছি বন্ধু ‘আবদিল্লাহ্। সুতরাং তাহাদেরকে সালাত ও সৎকর্মের উপদেশ দিবেন। আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনার প্রতি ও আপনার সম্প্রদায়ের ঈমানদারগণের প্রতি সালাম” (তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৪-২৭৫)।
সাথে সাথে তাঁহার সম্প্রদায়ের লোকদের (হাজারবাসীর) উদ্দেশ্যেও স্বতন্ত্রভাবে একটি লিপি লিখাইয়া দূতের হাতে তুলিয়া দেওয়া হয়। তাহাতে লিখিত ছিল:
আমা বা'দ ফান্নি ওসীকুম বিল্লাহি ওয়া বিয়ানফুসিকুম আন লা তাদিল্লু বা'দা আন হুদিইতুম ওয়া লা তাউ'দু বা'দা আন রুশিদতুম. "হাম্দ ও সালাতের পর, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্র ব্যাপারে একনিষ্ঠ থাকার উপদেশ দিতেছি। সাথে সাথে তোমাদের নিজেদের ব্যাপারেও উপদেশ দিতেছি যে, হিদায়াত লাভের পর গোমরাহীতে পতিত হইও না এবং সরল পথের দিশা লাভের পর বক্র পথের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িও না"।
আমা বা'দ ফাক্বাদ জাআনী ওয়াফদুকুম ফালাম আ'তি ইলাইহিম ইল্লা মা সাররাহুম ওয়া লাও আন্নী আজতাহাদতু ফিকুম জুহদী কুল্লুহু আখরাজতুকুম মিন হাজরি ফাশাফ্ফাতু গাঈবাকুম ওয়া আফদালতু আলা শাহদিকুম ফাযকুরু নি'মাতা আল্লাহু আলাইকুম. "আমার কাছে তোমাদের প্রতিনিধিগণ আসিয়াছেন। আমি তাহাদের সহিত প্রীতিকর আচরণই করিয়াছি। আমি যদি তোমাদের প্রতি আমার পূর্ণ শক্তি ও অধিকার প্রয়োগ করিতাম, তবে তোমাদেরকে ভূমি হইতে বহিষ্কার করিয়া দিতাম। কিন্তু না, আমি তোমাদের অনুপস্থিতদের ব্যাপারে সুপারিশ গ্রহণ করিয়াছি এবং তোমাদের মধ্যকার উপস্থিতদের প্রতি উদার ব্যবহার করিয়াছি। সুতরাং তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা তোমরা স্মরণ রাখিবে।"
আমা বা'দু ফান্নাহু ক্বাদ আতানীয়াল্লাযী সানাতুম ওয়া আন্নাহু মিম্মান ইয়াহসানু মিনকুম লা আহমিল আলাইহি যাম্বাল মুসীয়ু ফাইজা জাআকুম উমারায়ী ফাতিয়ূয়হুম ওয়ানসুরুহুম আলা আমরিল্লাহি ওয়া ফী সাবিলিহী ফাইন্নাহু মাইয়্যামালু মিনকুম আমালান সালিহান ফালান ইয়াদিল্লা ইন্দাল্লাহি ওয়া লা ইনদী. "অতঃপর তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আমার নিকট সংবাদ পৌঁছিয়াছে। তোমাদের মধ্যকার সৎকর্মশীলগণকে দুষ্কর্মকারীদের দুষ্কর্মের জন্য দায়ী করা হইবে না। আমার নিযুক্ত আমীরগণ যখন তোমাদের নিকট পৌঁছিবেন তখন তোমরা তাহাদের আনুগত্য করিবে এবং আল্লাহ্র নির্দেশ পালন এবং তাঁহার পথে তোমরা তাহাদেরকে সহযোগিতা করিবে। তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তিই সৎকর্ম করিবে, আল্লাহ্র নিকট বা আমার নিকট সেই ব্যক্তি পথভ্রষ্ট বলিয়া গণ্য হইবে না” (দ্র. আল-আমওয়াল, পৃ. ১৯১; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৫-৭৬)।
বাহরায়নের আরেক নেতা হেলাল ইবন উমায়্যার নামে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্র
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম সালিম ওয়া আন্তা ফান্নি আহমাদু ইলাইকাল্লাহা আল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়া লা শারীকা লাহু ওয়া আদউকা ইলাল্লাহু ওয়াহদাহু তুমিন বিল্লাহি ওয়া তুতীয়ু ওয়া তাদখুলু ফীল জামাআতি ফাইন্নাহু খাইরুল লাকা ওয়াসসালামু আলা মানিত্তাবাআল হুদা. "পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহর নামে। আপনি শান্তিতে থাকুন! আমি আপনার নিকট ঐ আল্লাহর প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তাঁহার কোন শরীক নাই। আমি আপনাকে এক আল্লাহ্ দিকে আহ্বান জানাইতেছি। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করুন, তাঁহার আনুগত্য করুন এবং ইসলামী দলের অন্তর্ভুক্ত হউন। কেননা উহাই আপনার জন্য
📄 উমানের রাজন্যদ্বয়ের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
উত্তম। যে ব্যক্তি হিদায়াতের অনুসারী তাহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক" (তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ২৭৫)।
সাথে সাথে বাহ্রায়নের জনগণের উদ্দেশ্যেও রাসূলুল্লাহ্ -এর পক্ষ হইতে একটি লিপি প্রেরিত হয়। তাহা ছিল এইরূপ:
اما بعد فانكم اذا اقمتم الصلوة واتيتم الزكوة ونصحتم لله ولرسوله واتيستم عشر النخل ونصف عشر الحب ولم تمجسوا اولادكم فلكم ما تسلمتم عليه غير ان بيت النار لله ولرسوله وأن ابيتم فعليكم الجزية. "অতঃপর যখন তোমরা সালাত কায়েম করিবে, যাকাত প্রদান করিবে এবং আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি আন্তরিক হইবে, খেজুরের এক-দশমাংশ এবং অন্যান্য শস্যের বিশ ভাগের এক ভাগ পরিশোধ করিবে, নিজেদের সন্তানদেরকে অগ্নিউপাসক হইতে দিবে না, তাহা হইলে ইসলাম গ্রহণকালে তোমাদের যাবতীয় সম্পদের মালিকানা তোমাদেরই থাকিবে। তবে বায়তুন-নার আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের মালিকানাধীন থাকিবে। আর যদি তোমরা এই সমস্ত বিষয় অস্বীকার কর তাহা হইলে তোমাদেরকে অবশ্যই জিযয়া পরিশোধ করিতে হইবে" (আল-বালাযুরী, ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৭৯)।
প্রাচীন ভৌগোলিকগণ আরব উপদ্বীপকে পাঁচটি প্রদেশে বিভক্ত করিয়াছেন: (১) তিহামা, (২) হিজায, (৩) য়ামান, (৪) নাজদ এবং (৫) 'আরুদ (عروض)। এই শেষোক্ত প্রদেশটি পূর্ব নাজদ ও ইরাক সীমান্ত হইতে শুরু করিয়া আরব উপসাগর (যাহা আমাদের নিকট উমান উপসাগর নামে পরিচিত) পর্যন্ত বিস্তৃত। উমান বাহ্রায়ন ও ইয়ামামা ঐ আরবদেরই তিনটি রাজ্য (দ্র. মাকতুবাতে নবভী, পৃ. ১৭৫)। দেশটির উমান নামকরণ করা হয় হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রপৌত্র উমান ইবন সাবা ইবন ইয়াকযান-এর নামানুসারে।
হাসান ইব্ন আদিয়া বলেন, আমি একদা হযরত ইবন উমারের সহিত সাক্ষাত করিতে গেলে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কোন দেশের লোক? আমি বলিলাম, উমানের। তিনি বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট হইতে শ্রুত একটি হাদীছ তোমার নিকট বর্ণনা করিব না? আমি বলিলাম, আলবৎ। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ বলিয়াছেন:
اني لا علم ارضا من ارض العرب يقال لها عمان على شاطي البحر الحجة منها افضل او خير من حج من غيرها . "আমি এমন একটি আরব ভূমির নাম জানি যাহাকে উমান নামে অভিহিত করা হইয়া থাকে। দেশটি সাগর তীরে অবস্থিত। ঐ দেশ হইতে আসিয়া হজ্জ করিলে অন্য যে কোন ভূমি হইতে আগন্তুকদের হজ্জের তুলনায় উত্তম।"
অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন:
من تعذر عليه رزقه فعليه بعمان "যে ব্যক্তি জীবিকার কষ্টে পতিত হয় তাহার উচিত ওমানে যাওয়া” (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ১৫০)।
ওমানের উপকূলীয় এলাকা অত্যন্ত সবুজ-শ্যামল, সুজলা-সুফলা। দেশটির পাহাড়-পর্বত খনিজ দ্রব্যাদিতে, দরিয়া মুক্তায় এবং প্রান্তরসমূহ রকমারি শস্য ও ফল-ফলারীতে পরিপূর্ণ। এখানকার জঙ্গলে মূল্যবান সুগন্দি কাঠ পাওয়া যায়। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ। রাজধানী মঙ্কট। উহা ওমান উপসাগরের পশ্চিম কোলে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ্-এর আমলে ওমান ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ মজুসী ধর্ম প্রচলিত ছিল।
অষ্টম হিজরীর যী-কা'দা মাসে রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রসহ হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা), যিনি তাঁহার কূটনৈতিক পারঙ্গমতা এবং মিসর জয়ের কৃতিত্বের জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে, ওমানে গমন করেন। আবদ ও জা'ফার নামক দুই ভাই তখন সেখানকার রাজা ছিলেন। ঘটনাচক্রে আবদের সহিত আমর ইবনুল আসের পিতা আসের পূর্ব হইতেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে 'আমর সর্বপ্রথম 'আবদের নিকটেই গিয়া উঠেন। তাঁহার ভাষায়:
আমি যখন রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রসহ ওমানে গিয়া পৌঁছিলাম তখন সর্বপ্রথম আমার আবদের সহিত সাক্ষাত হয়। তিনি ছিলেন সর্দার এবং তাঁহার ভাইয়ের তুলনায় নম্র প্রকৃতির লোক। আমি তাঁহাকে জানাইলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে দূতের দায়িত্ব লইয়া এইবার আপনার এবং আপনার ভাইয়ের নিকট আমার আগমন। 'আবদ বলিলেন, দেখ, আমার ভাই আমার চাইতে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং রাজ্যের প্রকৃত রাজা তিনিই। আমি তোমাকে তাঁহার দরবারে পৌঁছাইয়া দিব। তবে আগে বল, তুমি তাঁহার পক্ষ হইতে কিসের দাওয়াত লইয়া আসিয়াছ?
জবাবে আমর ইবনুল আস (রা) বলিলেন, আমি একক লা-শারীক আল্লাহর দিকে আপনাদেরকে আহ্বান জানাইতে আসিয়াছি। উপরন্তু আপনাদেরকে আরও সাক্ষ্য দিতে হইবে যে, মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল। এই সময় তাঁহাদের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন হয়। ইহার বিবরণ একটু পরেই আসিতেছে। তাহাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ যে পত্র দেন তাহার পাঠ ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد بن عبد الله الى جيفر وعبد البنى الجلندى سلام على من اتبع الهدى اما بعد فاني ادعوكما بدعاية الاسلام اسلما تسلما انى رسول الله الى الناس كافة لانذر من كان حيا ويحق القول على الكافرين وانكما ان اقررتما بالاسلام وليتكما وان ابيتما ان تقرا بالاسلام فان ملككما زائل عنكما دخيلى تحل بساحتكما وتظهر نبوتي على ملككما. "পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহর নামে। আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে জুলান্দীর পুত্রদ্বয় আব্দ ও জা'ফারের প্রতি। শান্তি বর্ষিত হউক তাহার প্রতি যে হিদায়াতের অনুসরণ করে। অতঃপর আমি আপনাদের উভয়কে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাইতেছি।
আপনারা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন। আমি সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহ্র রাসূলরূপে প্রেরিত হইয়াছি- যাহাতে আল্লাহ্র বান্দাদেরকে সতর্ক করিয়া দেই এবং অগ্রাহ্যকারীদের উপর আল্লাহ্ দলীল পূর্ণ হইয়া যায়। আপনারা উভয়ে যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে আমি আপনাদের উভয়কেই শাসক পদে বহাল রাখিব। আর যদি অগ্রাহ্য করেন এবং ইসলাম গ্রহণে অসম্মত হন, তবে (মনে রাখিবেন) আপনাদের রাজত্ব টিকিবে না এবং আমার ঘোড়া (অশ্বারোহী বাহিনী) আপনাদের আঙিনায় ঢুকিয়া পড়িবে এবং আপনাদের রাজ্যে আমার নবৃওয়াতের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইবে” (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৮৪; আল-জামহারা, ১খ., পৃ. ৪৬; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩০৮-এর বরাতে; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, ৩খ., পৃ. ৪০৪; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৭)।
📄 পত্র প্রেরণের বৎসর ও বাহক সম্পর্কে মতভেদ
ফুতুহুল বুলদানে (পৃ. ৮৮) উক্ত হইয়াছে যে, পত্রখানির বাহক ছিলেন আবূ যায়দ, আর আমর তাহাদের নিকট প্রেরিত হইয়াছিলেন তাহাদের ইসলাম গ্রহণের পর যাকাত উত্তোলনের উদেশ্যে। লেখক উহার স্বপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়া বলিয়াছেন, পত্র প্রেরিত হয় ষষ্ঠ হিজরীতে আর আমর ইসলাম গ্রহণ করেন ৮ম হিজরীতে। সুতরাং ঐ সময়ে রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষে তাঁহার দৌত্যের প্রশ্নই আসে না। কিন্তু ইবনুল আছীর তদীয় আল-কামিল-এ (২খ., পৃ. ৮৮) এবং উসদুল গাবার লেখক তদীয় গ্রন্থে (১খ., পৃ. ৩১৩) এবং আল-ইসাবা জা'ফার-এর আলোচনায় লিখেন, পত্রটি ৮ম হিজরীতেই প্রেরিত হয় এবং উহার বাহক 'আমরই ছিলেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৮-৯)।