📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পত্র প্রেরণের উর্বর ভূমি

📄 পত্র প্রেরণের উর্বর ভূমি


পারস্য উপসাগর, ফোরাত নদী, সিরীয় উপত্যকা এবং নজদের মধ্যবর্তী এলাকায়, যাহাকে আরব্য ইরাক বলা হইয়া থাকে, হীরার বাদশাহদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইহারা ছিলেন প্রাচীন আমালেকা আরব বংশোদ্ভূত। প্রথমদিকে ইরানের শাসকদের সহিত ইহাদের বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। শেষপর্যন্ত গোটা অঞ্চলটিই পারসিক সাম্রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিণত হয়; বরং ইহার উচ্চ এলাকাকে পারসিক সাম্রাজ্যের মধ্যে শামিল করিয়া লওয়া হয়। ইহার রাজধানী ছিল হীরা। হীরার রাজন্যবর্গ পারসিক সম্রাটকে যথারীতি কর পরিশোধ করিতেন। যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় তাহার সাহায্যার্থে সৈন্যবাহিনী প্রেরণে তাহারা বাধ্য ছিলেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে তাহারা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করিতেন। ইসলামের অভ্যুদয়কালে এখানে ইয়াহুদী, খৃস্টান, অগ্নি উপাসক ও নক্ষত্রপূজারী পৌত্তলিকরা বসবাস করিত।
ইরাকের অধিকার লইয়া প্রায়ই হীরা ও গাস্সানের রাজাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লাগিয়া থাকিত। দৃমাতুল জান্দালের উকায়দির রাজবংশ এবং সিরিয়ার গাস্সানী রাজবংশ উভয়েই ছিলেন রোমের করদ রাজা এবং খৃস্টান হীরার রাজন্যবর্গ সর্বদা ছিলেন ইরানের সহিত সংশ্লিষ্ট। এই হীরা রাজবংশের লোকজন ইরানী শাহযাদাদের গৃহশিক্ষক থাকিতেন। পারসিক সম্রাটগণ তাহাদের সন্তানগণকে মরুচারী জীবনযাত্রা ও শিকার বিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হীরার রাজাদের নিকট প্রেরণ করিতেন। ইরানের বিখ্যাত সম্রাট বাহ্রামগোরও এই রাজবংশের নিকট বিদ্যাভ্যাস করিয়াছিলেন। তাই তিনি সিংহাসনে আরোহণ করার পর হীরার রাজপুরুষদের প্রতি অত্যন্ত সম্মান ও আনুকূল্য প্রদর্শন করেন এবং তাহাদেরকে পারসিক উপনিবেশসমূহে সম্রাটের প্রতিনিধি বা ভাইসরয় নিযুক্ত করেন।
এইভাবে আরব্য ইরাকে হীরার বাদশাহগণের বিরাট প্রভাব-প্রতিপত্তি সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বাহায়ন ও হীরা রাজ্যে এই বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকটি খান্দান রাজত্ব করে। নবী কারীম-এর যুগে যাহারা বাহ্রায়নে রাজত্ব করিতেছিলেন তাহাদেরকে 'মানাযেরা' বলা হইয়া থাকে। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ সত্ত্বেও তাহারা আরব বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে মনেপ্রাণে একটি অনারব শক্তির আধিপত্য মানিয়া লইতে পারিতেছিলেন না। সর্বদাই এই অধীনতাপাশ ছিন্ন করার একটা আকাঙ্ক্ষা তাহাদের মনের মণিকোঠায় লালিত হইত। ইরানী সম্রাটগণ তাহা আঁচ
করিতে পারিতেন এবং সর্বদাই তাহাদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করিতেন। হীরার রাজন্যবর্গ এই দুর্বলতার সুযোগও গ্রহণ করিতেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ইরানের অনারব সংস্কৃতি হীরাবাসিগণকে প্রভাবান্বিত করে। ফলে সেই আজমী বিলাসব্যসন হীরার রাজ-দরবারেও দেখা দেয়। খসরু পারভেযের তীক্ষ্ণদৃষ্টি তাহা এড়াইতে পারে নাই। কিন্তু রোমকদের সহিত আসন্ন একটা বড় রকমের যুদ্ধের পরিকল্পনা থাকায় তিনি আপাতত সেদিকে দৃষ্টি দান সমীচীন মনে করেন নাই। কেননা ঐ আসন্ন যুদ্ধে হীরার রাজন্যবর্গের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ ছিল অপরিহার্য।
অবশেষে ইরান ও রোমের মধ্যে ঐ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হইলে খসরু পারভেযের বাহিনী আরব্য ইরাক, সিরিয়ার রোম শাসিত এলাকাসমূহ এবং ফিলিস্তীনকে পদদলিত করিয়া মিসরের নীল নদের তীর পর্যন্ত চলিয়া আসে। এই যুদ্ধে আরব্য ইরাক ও সিরিয়া ফ্রন্টে হীরার রাজন্যবর্গ বিরাট ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বিজয় লাভের পর খসরু পারভেয তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রসমূহকেই স্বীয় দরবারে প্রাধান্য দিতে থাকেন। ফলে হীরা ও বাহরায়নের রাজন্যবর্গ ইরানী দরবারের প্রতি ক্ষুব্ধ হইয়া উঠেন। তাহারা তাহাদের অধীনস্ত আরব গোত্রসমূহকে তলে তলে সংগঠিত করিতে লাগিলেন। খসরু তাহা আঁচ করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করিতে না করিতেই রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস বিরাট যুদ্ধ প্রস্তুতিসহ তাহার মাথার উপর আসিয়া দাঁড়াইলেন। খসরু কৌশলে তাহাদের মনোরঞ্জন পূর্বক সহযোগিতা লাভের চেষ্টা করিলেও তলে তলে তাহারা আরব গোত্রসমূহকে নিবৃত্ত রাখিতেই সচেষ্ট থাকেন। যুদ্ধে পারসিকদের পরাজয়ের ইহা একটি অন্যতম কারণ হইয়া দাঁড়ায়। লড়াইয়ে বাহরায়নের মানাযেরা রাজবংশ হৃষ্টচিত্তে ইরানীদের সাহায্য তো করেই নাই, উপরন্তু তাহারা এবং তাহাদের প্রভাবাধীন আরব গোত্রগুলি ইরানীদের রসদপত্র মওকা বুঝিয়া লুটও করিয়াছে। কিন্তু তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সিরীয় আরব গোত্রসমূহের অসন্তুষ্টির আশঙ্কায় যুদ্ধ জয়ের পর হিরাক্লিয়াসও তাঁহাদের মূল্যায়ন করেন নাই।
বাহরায়ন ও হীরার রাজন্যবর্গের জন্য ইহা ছিল রীতিমত এক ক্রান্তিকাল। ইরানীদের আস্থা তাঁহারা ইতোমধ্যেই হারাইয়াছে। ঐদিকে তাঁহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দূমাতুল জান্দাল ও সিরিয়ার প্ররোচনায় রোমক শক্তিও যে কোন সময় হামলা চালাইতে পারে এমন একটা আশঙ্কা সতত বিরাজমান। মুনযির উক্ত দুই শক্তির মুকাবিলায় তৃতীয় শক্তিরূপে সম্মিলিত আরব ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিতেছিলেন। কিন্তু যে বিরাট সামরিক শক্তি ও উদার সমাজনীতির মধ্যে নিহিত শক্তি এই অভাব পূরণ করিতে পারিত, তাহার কোনটাই তাহার কাছে ছিল না। ইসলামের নব আবির্ভূত রাষ্ট্রশক্তি এবং ইহার মধ্যে নিহিত ঐক্যপ্রতিষ্ঠার শক্তির কথা অবহিত হইয়া এবং তাঁহাদের হাতে কুরায়শদের উপর্যুপরি পরাজয়ের সংবাদ শ্রবণে তাঁহার মনে এমন একটি প্রত্যয় দানা বাঁধিয়া উঠিতেছিল যে, ইসলামের এই নব উত্থিত শক্তিই তাঁহার ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌছিবার ক্ষমতা রাখে। এমনই এক পরিস্থিতিতে নবী কারীম (স)-এর দা'ওয়াত লইয়া 'আলা ইবনুল হাদরামী (রা) বাহরায়নে গিয়া উপনীত হইলেন। নবী কারীম দূতকে বিদায় দানকালে বলিয়া দিলেন, মুনযির যদি সন্তোষজনক জবাব দেয়, তবে আমার পুনরাদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তুমি ঐ দেশেই অবস্থান করিবে এবং এই সময় তাহাদের ধনীদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিয়া সেখানকার দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করিবে। তখন হযরত 'আলা হাদরামী (রা) তাঁহার কাছে একটি
লিখিত নির্দেশ প্রার্থনা করেন এবং মহানবী সেমতে বিভিন্ন প্রকার মালের ও পশু সম্পদের যাকাতের হার উল্লেখপূর্বক একখানা লিপি তাঁহার সাথে দিয়া দেন। মুনযিরের উদ্দেশ্যে লিখিত পত্রখানা ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى المنذر بن ساوى سلام عليك فانی احمد اليك الله الذى لا اله الا هو واشهد ان لا اله الا هو اما بعد فاني ادعوك الى الاسلام فاسلم تسلم واسلم يجعل لك الله ما تحت يديك واعلم ان ديني سيظهر الى منتهى الخف ولحافي.
الله رسول الله محمد
"আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে মুনযির ইন্ন সাওয়াকে। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক। অতঃপর আমি আপনার নিকট সেই আল্লাহ্র প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি। সুতরাং ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি লাভ করিবেন। আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহা হইলে আপনার অধীনস্থ রাজ্য আল্লাহ আপনার হাতেই রাখিয়া দিবেন। জানিয়া রাখিবেন, আমার ধর্ম ভূভাগের সেই প্রান্ত অবধি বিস্তার লাভ করিবে যে অবধি ঘোড়া ও উট পৌঁছিতে সক্ষম।"
(সীলমোহর) মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুনযিরকে মহানবী (সা)-এর দূতের উপদেশ ও তাঁহার প্রতিক্রিয়া

📄 মুনযিরকে মহানবী (সা)-এর দূতের উপদেশ ও তাঁহার প্রতিক্রিয়া


রাসূলুল্লাহ-এর দূত 'আলা ইবনুল হাদরামী (রা) বলেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রসহ মুনযিরের নিকট উপনীত হইলাম তখন তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলাম, হে মুনযির! এই দুনিয়ায় আপনি কতই না বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। আখিরাতের ব্যাপারে আপনি নির্বোধ ও অবিবেচক হইবেন না। এই মজুসিয়াত বা অগ্নি উপাসনার পারসিক ধর্ম হইতেছে নিকৃষ্টতম ধর্ম। এই ধর্মে এমন সব মহিলাকে বিবাহ করার বিধান রহিয়াছে যাহাদেরকে বিবাহ করা লজ্জাজনক। ইহারা এমন সব বস্তু ভক্ষণ করে যাহা ভক্ষণে অন্যরা রীতিমত ঘৃণাবোধ করে। এই দুনিয়ায় আপনারা এমন আগুনের পূজায় নিমগ্ন যাহা আখিরাতে আপনাদেরকে গ্রাস করিবে। আর আপনি তো নির্বোধ ও অবিবেচক নহেন! একটু ভাবিয়া দেখুন, যিনি দুনিয়ার ব্যাপারে কোন দিন মিথ্যা বলেন নাই, তাঁহাকে কি আমরা বিশ্বাস করিব না? যিনি কোনদিন বিশ্বাসভঙ্গ করেন নাই, তাঁহার প্রতি কি আমরা আস্থা স্থাপন করিব না? যিনি কোন দিন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন নাই, তাঁহার প্রতিশ্রুতিতে কেন আমরা বিশ্বাস করিব না? যদি তাহাই হইয়া থাকে (আর তাহা তো নিঃসন্দেহে এইরূপই) তাহা হইলে ইনিই তো সেই উম্মী নবী যাঁহার সম্পর্কে কোন সুবিবেচক ও জ্ঞানী ব্যক্তির এইরূপ বলার অবকাশ নাই যে, হায়! তিনি যাহার আদেশ করিয়াছেন তাহাতে যদি বারণ করিতেন অথবা তিনি যাহা বারণ করিয়াছেন, যদি তাহার আদেশ করিতেন।
জবাবে মুনযির বলিলেন, আমার স্বধর্ম সম্পর্কে চিন্তা করিয়া দেখিলাম, ইহা তো কেবল এই দুনিয়ার ব্যাপার, ইহাতে আখিরাত বলিতে কিছুই নাই। পক্ষান্তরে তোমাদের ধর্মে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টাই আছে। যে ধর্মে দুনিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষার সবটাই আছে, মৃত্যুকালীন স্বস্তি লাভের ব্যবস্থা আছে, তাহা বরণ করিয়া নিতে আমার বাধা কোথায়? গতকাল পর্যন্ত যাহারা এই দীন গ্রহণ করিত, তাহাদের জন্য আমি বিস্ময়বোধ করিতাম, আর আজ যাহারা এই দীন প্রত্যাখ্যান করে, তাহাদের জন্য আমি বিস্ময়বোধ করি (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৩)।
উক্ত পত্রখানা যতদূর মনে হয় হুদায়বিয়ার সন্ধির অব্যবহিত পরেই ষষ্ঠ হিজরীতে প্রেরিত হইয়াছিল। পত্রলাভের পর মুনযির ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্-এর দূত যখন এই সংবাদ মদীনায় পাঠাইলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ মুনযিরের নিকট অপর একখানি পত্র প্রেরণ করিলেন। পত্রখানির ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ:
من محمد رسول الله الى المنذر بن ساوى السلام عليك فاني احمد اليك الله الذي لا اله الا هو واشهد ان لا اله الا الله وان محمدا عبده ورسوله اما بعد فاني اذكرك الله عز وجل فان من ينصح لنفسه وانه من يطع رسلى ويتبع امرهم فقد اطاعنى ومن نصح لهم فقد نصح لى وان رسلى قد اثنوا عليك خيرا وانسى قد شفعتك في قومك فاترك للمسلمين ما اسلموا عليه وعفوت عن أهل الذنوب فاقبل منهم وانك مهما تصلح فلم نعز لك عن عملك ومن اقام على يهودية او مجوسية فعليه الجزية.
الله رسول محمد
"মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্-এর পক্ষ হইতে মুনযির ইব্‌ন সাওয়াকে। আপনার প্রতি আল্লাহ্ করুণা বর্ষিত হউক। আমি আপনার নিকট সেই এক আল্লাহ্র প্রশংসা বর্ণনা করিতেছি যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নাই। আমি সাক্ষ্য দিতেছি, আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই। মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল। অতঃপর আমি আপনাকে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করাইয়া দিতেছি। যে উপদেশ গ্রহণ করে সে তাহার নিজেরই উপকার করে। যে আমার দূতগণের আনুগত্য করে এবং তাহাদের আদেশ মান্য করে, প্রকৃতপক্ষে সে আমাকেই মান্য করে। আর যে তাহাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করে, প্রকৃতপক্ষে সে আমার প্রতিই সদ্ব্যবহার করে। আমার দূতগণ আপনার প্রশংসা করিয়াছেন। আর আপনি আপনার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে যে সুপারিশ করিয়াছেন আমি তাহা মঞ্জুর করিলাম। সুতরাং মুসলমানদেরকে তাহাদের অবস্থার উপর ছাড়িয়া দিন যেগুলির মালিক থাকা অবস্থায় তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে। যাহারা ত্রুটি করিয়াছে তাহাদের ত্রুটি আমি মাফ করিয়া দিয়াছি। আপনিও তাহাদেরকে মাফ করিয়া দিন। যতদিন পর্যন্ত আপনি সৎপথে থাকিবেন ততদিন পর্যন্ত আমরা আপনাকে পদচ্যুত করিব না। আর যে ব্যক্তি ইয়াহুদী অথবা মাজুসী (অগ্নি উপাসনার) ধর্মে অবিচল থাকিবে তাহাকে অবশ্যই জিযয়া দিতে হইবে" (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮০-৩৮১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুনযিরের প্রতি নবী কারীম (সা)-এর তৃতীয় পত্র

📄 মুনযিরের প্রতি নবী কারীম (সা)-এর তৃতীয় পত্র


এই পত্রের ভাষ্যদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, এই পত্রখানা মুনযিরের কোন পত্র অথবা পয়গামের জবাবেই প্রেরিত হইয়া থাকিবে। পত্রের ধরণ-ধারন সম্পূর্ণ রাজকীয়—যাহাতে মুনযিরকে শাসকপদে বহাল রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে এবং সাথে সাথে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সহিত তাঁহার কী আচরণ হইবে, তাহার নির্দেশনাও দেওয়া হইয়াছে।
মুনযির ইবন সাওয়া অতঃপর আর একটি পত্র লিখিয়া প্রথম পত্রের ব্যাখ্যা জানিতে চাহেন। তিনি তাঁহার সেই পত্রে জানিতে চাহেন যে, মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত লোকজন বলিতে কাহাদেরকে বুঝায় এবং যাহারা মুসলিম সমাজ বহির্ভূত থাকিবে তাহাদের নিকট হইতে কী হারে জিয়া লইতে লইবে। মুনযিরের সেই পত্রখানার ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ:
اما بعد يا رسول الله فاني قرأت كتابك على اهل البحرين فمنهم من احب الاسلام واعجبه ودخل فيه ومنهم من كرهه فلم يدخل فيه وبارضى يهود ومجوس فاحدث الى امرك في ذلك. -"অতঃপর ইয়া রাসূলাল্লাহ্! বাহরায়নবাসীদেরকে আমি আপনার পত্র পাঠ করিয়া শুনাইয়াছি। তাহাদের মধ্যকার কিছু লোক উহা পসন্দ করিয়াছে এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে। আবার কিছু লোক উহা অপসন্দও করিয়াছে এবং তাহারা ইসলাম গ্রহণ করে নাই। আমার দেশে ইয়াহুদী এবং অগ্নি উপাসকরাও রহিয়াছে। এই ব্যাপারে আপনার নির্দেশ দানে মর্জি হয়” (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৩)।
মুনযিরের প্রতি নবী কারীম-এর তৃতীয় পত্র
মুনযির ইবন সাওয়ার ব্যাখ্যা প্রার্থনার জবাবে নবী কারীম তাঁহার উদ্দেশ্যে নিম্নরূপ পত্র প্রেরণ করেনঃ
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى منذر بن ساوى سلام الله عليك فانى احمد اليك الله الذى لا اله الا هو اما بعد فمن استقبل قبلتنا واكل ذبيحتنا فذلك المسلم الذى له ما لنا وعليه ما علينا ومن لم يفعل فعليه دينار من قيمة المعافري والسلام ورحمة الله يغفر الله لك. "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্র পক্ষ হইতে মুনযির ইব্ন সাওয়াকে। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা বর্ষিত হউক! আমি আপনার নিকট সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই। অতঃপর সমাচার এই যে, যে ব্যক্তি আমাদের কিবলাকে কিবলা বলিয়া মান্য করে এবং আমাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খায় সে-ই মুসলিম বলিয়া গণ্য হইবে। তাহার অধিকারও ঠিক ততটুকু যতটুকু আমাদের মধ্যকার অধিকার রহিয়াছে এবং তাহার উপর ঠিক ততটুকু দায়িত্বও বর্তাইবে, যতটুকু আমাদের উপর বর্তাইয়া থাকে। আর যে তাহা করিবে না (আমাদের মূল্যবোধে বিশ্বাসী হইবে না) তাহার উপর মু'আফিরী কাপড়ের মূল্যের (এক দীনার) জিয়া ধার্য হইবে। সালাম ও আল্লাহ্র রহমত আপনার প্রতি বর্ষিত হউক। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন” (ইমাম আবূ ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১৩১, দারুল মা'রিফা, বৈরূত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুনযিরের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চতুর্থ পত্র

📄 মুনযিরের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চতুর্থ পত্র


নবম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ্ যখন তাবুক যাত্রা করিতে মনস্থ করেন, তখন হযরত কুদামা ও আবূ হুরায়রা (রা)-কে জিযয়া বাবত সংগৃহীত অর্থ লইয়া আসিবার জন্য মুনযিরের নিকট প্রেরণ করেন। সেই সময় অপর একজন শাসককেও নির্দেশ প্রদান করা হয় তিনিও যেন তাহার এলাকা হইতে জিয়া বাবৎ সংগৃহীত অর্থ আবূ হুরায়রার মাধ্যমে মদীনায় পাঠাইয়া দেন। এই যাত্রায় তিনি মুনযিরকে লিখিয়াছিলেন:
من محمد رسول الله الله إلى المنذر بن ساوى فادفع اليهما كتابا آخر أما بعد فانی قد بعثت إليك قدامة وأبا هريرة فادفع إليهما ما اجتمع عندك من جزية أرضك والسلام وكتب أبي. "অতঃপর কুদামা ও আবূ হুরায়রাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিতেছি। আপনার দেশের যে জিয়া সংগৃহীত হইয়াছে তাহা তাহাদের নিকট দিয়া দিন। ওয়াসসালাম।
এই পত্রগুলি লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন উবাই ইব্‌ন কা'ব (রা) (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ৩৮২; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৭৬)।
আবূ রাবী, মুনযিরের ইসলাম গ্রহণ এবং মদীনায় গমন করিয়া রাসূলুল্লাহ্-এর সহিত সাক্ষাত করার কথা অস্বীকার করিয়াছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নাবিগ তাহা স্বীকার করিয়াছেন এবং মুনযিরকে সাহাবী বলিয়াছেন।
ঐতিহাসিক ইদুল আছীর 'উসদুল গাবা' গ্রন্থে এবং ইবন হাজার আল-ইসাবাতে মুনযিরের মাওলা (মুক্ত দাস) নাফে' আবূ সুলায়মান প্রসঙ্গে বর্ণনায় উক্ত মত সমর্থন করিয়াছেন এবং মুনযির মদীনায় আগত বাহরায়নের প্রতিনিধিদ দলে ছিলেন বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৪)। এমনকি মুনযিরের মৃত্যুকালে আমর ইবনুল আস (রা) তাঁহার মৃত্যু শয্যায় উপস্থিত ছিলেন বলিয়াও বলা হইয়াছে। মৃত্যুপথযাত্রী তাঁহার এক-তৃতীয়াংশ সম্পদের ব্যাপারে ওসিয়াত করিতে পারে বলিয়া আমর (রা) তাহাকে বলিয়াছিলেন। কিন্তু মুনযির সমস্ত সম্পত্তিই ভাগ করিয়া যাওয়া পসন্দ করেন।
মোটকথা, মুনযির ইবন সাওয়া তাঁহার জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান- রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। রাসূলুল্লাহ্-এর ইন্তিকালের অল্প পূর্বেই এবং বাহরায়নবাসীদের রিদ্দার প্রাক্কালে তাঁহার ইন্তিকাল হয়। 'আলা ইবনুল হাদরামী (রা) তহসীলদাররূপে মুনযিরের ঐখানেই নিযুক্ত ছিলেন। মুনযিরের ইনতিকালের পর তিনি মদীনার পক্ষ হইতে বাহ্রায়নের প্রথম গভর্নররূপে নিযুক্ত হন (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ১৪৩)।
মুনযিরকে রাসূলুল্লাহ্ কোন সালে পত্র লিখিয়াছিলেন- ৬ষ্ঠ হিজরীতে না অষ্টম হিজরীতে, সেই সম্পর্কে মতভেদ আছে। কিন্তু প্রকৃত কথা হইল, বেশ কয়েকটি পত্রই তাঁহার নামে প্রেরিত হইয়াছিল। প্রথমবার ষষ্ঠ হিজরীতে অন্যান্য রাজ-রাজড়াকে পত্র লিখার সময়ই প্রেরিত হইয়াছিল। জিইররানা হইতে লিখিত পত্রটি যে অষ্টম হিজরীতে প্রেরিত তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। কেননা হুনায়ন অবরোধ অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের অব্যবহিত পরেই হইয়াছিল। সুতরাং বিভিন্ন পত্র বিভিন্ন সময়ে লিখিত হইয়াছিল- যাহার সূচনা হইয়াছিল ষষ্ঠ হিজরীতে এবং সমাপ্তি অষ্টম হিজরীতে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00