📄 বৈরী ভাবাপন্ন মুগীরা ও মুকাওকিসের কথোপকথন
রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রলাভ ও দূতের মুখে তাঁহার বিবরণ শ্রবণে মুকাওকিস যে কী পরিমাণ প্রভাবান্বিত হইয়াছিলেন, তাহার বিবরণ পাওয়া যায় মুগীরা ইব্ন শু'বার পরবর্তী কালের বর্ণনা হইতে। তিনি বলেন, ইবন মালিক ও আমি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মিসরে মুকাওকিসের দরবারে উপনীত হই। তখন মুকাওকিস আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের ও আমাদের মধ্যে তো মুহাম্মাদ ও তদীয় সঙ্গিগণ অন্তরায় হইয়া রহিয়াছেন। তাঁহারা তোমাদেরকে বাধা দেন নাই?
আমরা বলিলাম, আমরা সমুদ্রপথে আসিয়াছি এবং তাহাদের নিকট আমাদের আগমনের কথা গোপন রাখিয়াছি। তারপর তাহার ও আমাদের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তাহা এই:
মুকাওকিস: তাঁহার দাওয়াতের প্রেক্ষিতে তোমরা কী করিলে?
মুগীরা: আমাদের একটি লোকও তাহার অনুসারী হয় নাই।
মুকাওকিস: কেন তোমরা এরূপ করিলে?
মুগীরা: এক নূতন ধর্ম লইয়া তিনি আবির্ভূত হইয়াছেন যাহা আমাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম নহে, আবার জাহাপনার ধর্মও নহে। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষগণের ধর্মই আকড়াইয়া আছি।
মুকাওকিস: তাহার স্ব-সম্প্রদায়ের লোকজনের প্রতিক্রিয়া কী?
মুগীরা: তরুণরা তাঁহার অনুসারী হইয়াছে। তাঁহার স্ব-সম্প্রদায়ভুক্ত ও বাহিরের বিরুদ্ধবাদীদের সহিত বিভিন্ন স্থানে তাঁহাদের যুদ্ধ হইয়াছে। কখনও একপক্ষ জয়লাভ করিয়াছে, কখনও অন্য পক্ষ।
মুকাওকিস: তিনি কী করিতে বলেন?
মুগীরা: তিনি আমাদেরকে আহ্বান জানান, এক লা-শারীক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন কিছুর ইবাদত করিতে বারণ করেন, আমাদের দেবদেবীদেরকে ত্যাগ করিতে বলেন। তিনি আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করিতে এবং যাকাত দিতে বলেন। বিশ মিছকালে অর্ধ মিছকাল যাকাত আদায় করিতে এবং সর্বপ্রকার সম্পদের যাকাত দিতে বলেন।
মুকাওকিস: আদায়কৃত যাকাত তিনি কী খাতে ব্যয় করেন?
মুগীরা: তিনি তাহা দরিদ্রদেরকে ফিরাইয়া দেন। তিনি আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখিতে, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদয় আচরণ করিতে, প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করিতে, ব্যভিচার ও মদ্যপান না করিতে বলেন এবং গায়রুল্লাহ্র নামে যবেহকৃত পশুর গোশত ভক্ষণ করিতে বারণ করেন।
📄 মুগীরার ভাবান্তর ও খৃস্টান পাদ্রীর সহিত কথোপকথন
মুকাওকিস: তাঁহার বংশমর্যাদা কেমন? মুগীরা: তিনি উচ্চ বংশজাত লোক।
মুকাওকিস: নবী-রাসূলগণ উচ্চ বংশজাতই হইয়া থাকেন। তাঁহার সত্যতা সম্পর্কে তোমাদের অভিজ্ঞতা কী?
মুগীরা: বাল্যকাল হইতেই তিনি অত্যন্ত সত্যবাদী। এইজন্য আমরা তাঁহার প্রতি চরম বৈরী ভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাঁহাকে সাদিক (সত্যবাদী) ও আমীন (বিশ্বস্ত) নামে অভিহিত করিয়া থাকি।
মুকাওকিস: যে মানুষটি মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা বলেন না, তিনি কেমন করিয়া আল্লাহ্ ব্যাপারে মিথ্যা বলিতে পারেন? আচ্ছা, বল তো, কোন শ্রেণীর লোক তাঁহাকে বেশী অনুসরণ করে?
মুগীরা: তাহাদের অধিকাংশই গরীব-মিস্কীন ও নিঃস্ব লোক।
মুকাওকিস: সচরাচর ঐ শ্রেণীর লোকেরাই সর্বপ্রথম নবী-রাসূলগণের অনুসারী হইয়া থাকেন। ইয়াছরিবের (মদীনার) ইয়াহুদীরা তাঁহার সম্পর্কে কি মনোভাব পোষণ করে?
মুগীরা: উহারা তাঁহার প্রধান শত্রু।
মুকাওকিস: উহারা বিদ্বেষবশত তাঁহার প্রতি বৈরিতা করে। নতুবা তিনি যে সত্য নবী এই কথাটি তাহাদের সম্যক জানা রহিয়াছে। তাওরাতে শুভাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে এমন একজন নবীর আগমনের প্রতীক্ষায় তাহারা রহিয়াছে, যেমনটি প্রতীক্ষায় রহিয়াছি আমরা নিজেরাও।
তারপর মুকাওকিস আবার বলিতে শুরু করিলেন: "তিনি আল্লাহ্র সত্য রাসূল। বিশ্বব্যাপী আসমানী বার্তা পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্যই তাঁহার আগমন। কিবতী ও রোমকদের কাছে যদি তাঁহার পয়গাম বা বার্তা পৌঁছায়, তাহা হইলে তাহাদেরকেও তাঁহার অনুসরণ করিতে হইবে। হযরত 'ঈসা (আ)-এর প্রচারিত শিক্ষা অনুযায়ী তাঁহার আনুগত্য আমাদের জন্য অপরিহার্য। তুমি তাঁহার যে সমস্ত গুণের কথা বলিলে অতীতের নবী-রাসূলগণ এইসব গুণে বিভূষিত ছিলেন। তাঁহার সাফল্য অনিবার্য। তাহাদের তাঁহার বিরুদ্ধাচরণের কোন উপায় থাকিবে না। তাঁহার দীন জলে-স্থলে ছড়াইয়া পড়িবে।"
মুগীরা: সারা দুনিয়ার লোকও যদি তাঁহার অনুসারী হইয়া যায়, তবুও আমরা তাঁহার অনুসারী হইব না।
মুগীরা বলেন, আমাদের কথা শুনিয়া মুকাওকিস মাথা নাড়িয়া বলিলেন, এখনও তোমরা ইহাকে তামাশা মনে করিতেছ?
মুগীরা বলেন, মুকাওকিসের মন্তব্য আমাদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। আমি আমার সঙ্গীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলাম, আজমী (অনারব) রাজ-রাজড়াগণ পর্যন্ত তাঁহার ভয়ে তটস্থ, তাঁহারাও তাঁহার সত্যতায় আস্থাবান। অথচ আমরা তাঁহারই আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী হইয়াও তাঁহাকে কী ঘৃণাই না করি। এতদ্ব্যতীত এই নূতন ধর্মের নবীর প্রতিনিধিগণ আমাদের দ্বারে আগমন করিয়া আমাদেরকে তাঁহার ধর্মের দাওয়াত দেন। আমার মানসিক অবস্থা আলেকজান্দ্রিয়া ত্যাগের পর হইতেই আমাকে বিব্রত করিতেছিল। আমি বলিলাম, ইয়াহুদী-খৃস্টানদের সমস্ত গীর্জা-উপাসনালয় দর্শন না করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিব না। অতঃপর তন্নতন্ন করিয়া আমি এই নূতন নবীর নিদর্শনাদি ও বিবরণ জানিতে সচেষ্ট হই। সৌভাগ্যক্রমে ঐ সময় আমি ইউহান্স
নীজার শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত একজন অতি বিজ্ঞ কিবতী পাদ্রীর সাক্ষাত লাভ করি। লোকজন অসুস্থ হইলে তাঁহার নিকট দু'আর জন্য আসিত। তাঁহার মত বিজ্ঞ লোক আমি আর দেখি নাই। তাঁহার সহিত আমার নিম্নরূপ কথোপকথন হয়:
মুগীরা: আপনারা কি একজন নবীর প্রতীক্ষায় রহিয়াছেন? যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে অনুগ্রহপূর্বক সেই প্রতীক্ষিত নবী সম্পর্কে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহে বিবৃত নিদর্শনাদি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন।
পাদ্রী: হাঁ, আমরা একজন নবীর আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় আছি। তিনি আখেরী যমানার নবী। তাঁহার ও যীশুর মধ্যবর্তী সময়ে আর কোন নবী হইবেন না। যীশু আমাদেরকে তাঁহার অনুসরণ করিবার নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি হইবেন একজন উম্মী (নিরক্ষর) নবী। তিনি হইবেন আরব বংশোদ্ভূত। তাঁহার নাম হইবে আহমাদ। তাঁহার দৈহিক চিহ্নাদি ও বিবরণ নিম্নরূপ:
"তিনি হইবেন একজন মধ্যম গড়নের লোক। তাঁহার চক্ষুদ্বয়ে লালিমা মিশ্রিত থাকিবে। তাঁহার গাত্রবর্ণ ধবধবে শুভ্রও হইবে না, আবার ধূসর বর্ণও হইবে না। তিনি হইবেন দীর্ঘকেশী, মোটা বস্ত্র পরিধানকারী, অনাড়ম্বর আহারে অভ্যস্ত, যাহা পাইবেন তাহা খাইয়াই তুষ্ট থাকিবেন, তাঁহার স্কন্ধে তরবারি ঝুলন্ত থাকিবে। কে তাহার মুকাবিলায় অবতীর্ণ হইল তিনি তাহার পরোয়া করিবেন না। সতত আত্মসংগ্রামে লিপ্ত, উৎসর্গীকৃত প্রাণ, সঙ্গী-সাথী পরিবেষ্টিত। তাঁহারা তাঁহাকে নিজের সন্তান ও পিতামাতার চেয়েও অধিক ভালবাসিবে। তিনি তাহাদেরকে এক হারেম হইতে বাহির করিয়া অন্য হারেমে লইয়া যাইবেন। কঙ্করময় ও খর্জুর বীথির ভূমিতে তিনি হিজরত করিবেন। ইব্রাহীম (আ)-এর ধর্ম তিনি পালন করিবেন। মুগীরা: তাঁহার সম্পর্কে আরও কিছু বলুন। পাদ্রী:
يأتزر على اوسطه ويغسل اطرافه ويخص بما لا تخص الانبياء قبله وكان النبي يبعث الى قومه ويبعث هو الى الناس كافة. "তিনি লুঙ্গি পরিধান করিবেন এবং ধৌত করিবেন তাঁহার প্রান্তদেশসমূহ (উযূর প্রতি ইঙ্গিত), পূর্ববর্তী নবীগণ যে বৈশিষ্ট্যসমূহ লাভ করেন নাই তেমন বৈশিষ্ট্যে তিনি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হইবেন। পূর্ববর্তী কালে নবী কেবল তাঁহার নিজ সম্প্রদায়ের প্রতিই প্রেরিত হইতেন, কিন্তু তিনি প্রেরিত হইবেন সারা বিশ্বের মানবজাতির প্রতি। সারা বিশ্বের মাটি তাঁহার জন্য মসজিদ ও পবিত্র, যেখানেই সালাতের সময় হইবে সেখানেই তায়াম্মুম করিয়া সালাত আদায় করিবেন। অথচ পূর্ববর্তীগণ এই ব্যাপারে কঠোর নিয়মনীতির অধীন ছিলেন, তাঁহারা গীর্জা বা উপাসনালয় ছাড়া প্রার্থনা করিতে পারিতেন না" (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৯৩-৯৪)।
মুগীরা ইব্ন শু'বা বলেন, আমি তাঁহার ও অন্যান্যদের প্রত্যেকটি কথা অন্তরে গাথিয়া রাখিলাম। পাদ্রী রাসূলুল্লাহ্-এর বৈশিষ্ট্যস্বরূপ আরও একটি কথা বলিয়াছিলেন, "তিনি তাঁহার গোড়ালীর উপরে লুঙ্গি পরিবেন অর্থাৎ দাম্ভিক লোকের মত মাটি ঘেঁষিয়া লুঙ্গি পরিবেন না। মুগীরা বলিলেন, তাঁহার কথা শুনিয়া এবং অনুরূপ অন্যান্য পাদ্রীদের কথা শুনিয়া আমি অত্যন্ত অভিভূত হইয়া পড়ি এবং দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াই রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করি (খাসাইসুল কুবরা, পৃ. ১২-১৩; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৯৩-৯৪)।
📄 কিবতী জাতির মহান নেতা
মিসর-রাজ মুকাওকিস যদি রোমক সম্রাটের নিয়োজিত একজন গভর্ণর বা প্রাদেশিক শাসক পর্যায়ের নেতাই হইয়া থাকেন, তাহা হইলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে عظيم القبط বা কিবতী জাতির মহান নেতা অভিধায় অভিহিত করিয়া একজন স্বাধীন নৃপতির মর্যাদায় অভিষিক্ত করিলেন কেন, এই প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই কাহারও মনে উদিত হইতে পারে। সূক্ষ্মদর্শী সীরাতবেত্তা আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী এই প্রশ্নটির জবাব দিয়াছেন এইভাবে-
"সম্ভবত ৬২৭ খৃস্টাব্দে মিসরের উপর ইরানীদের প্রাধান্য ও বিজয় লাভের সময় কিবতী লাট পাদ্রী মুকাওকিস ক্ষমতার বাগডোর স্বহস্তে গ্রহণ করিয়াছিলেন। তথাপি সন্ধি চুক্তি ৬২৮ খৃস্টাব্দের পূর্বে হয় নাই। সম্ভবত এই বিরতিকালেই রাসূলুল্লাহ্-এর লিপি মুকাওকিসের নিকট পৌছে, যখন মিসরের গভর্নর প্রায় স্বাধীনই ছিলেন (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা (আরবী), পৃ. ২৫৩)।
📄 পত্র প্রেরণের উর্বর ভূমি
পারস্য উপসাগর, ফোরাত নদী, সিরীয় উপত্যকা এবং নজদের মধ্যবর্তী এলাকায়, যাহাকে আরব্য ইরাক বলা হইয়া থাকে, হীরার বাদশাহদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইহারা ছিলেন প্রাচীন আমালেকা আরব বংশোদ্ভূত। প্রথমদিকে ইরানের শাসকদের সহিত ইহাদের বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। শেষপর্যন্ত গোটা অঞ্চলটিই পারসিক সাম্রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিণত হয়; বরং ইহার উচ্চ এলাকাকে পারসিক সাম্রাজ্যের মধ্যে শামিল করিয়া লওয়া হয়। ইহার রাজধানী ছিল হীরা। হীরার রাজন্যবর্গ পারসিক সম্রাটকে যথারীতি কর পরিশোধ করিতেন। যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় তাহার সাহায্যার্থে সৈন্যবাহিনী প্রেরণে তাহারা বাধ্য ছিলেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে তাহারা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করিতেন। ইসলামের অভ্যুদয়কালে এখানে ইয়াহুদী, খৃস্টান, অগ্নি উপাসক ও নক্ষত্রপূজারী পৌত্তলিকরা বসবাস করিত।
ইরাকের অধিকার লইয়া প্রায়ই হীরা ও গাস্সানের রাজাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লাগিয়া থাকিত। দৃমাতুল জান্দালের উকায়দির রাজবংশ এবং সিরিয়ার গাস্সানী রাজবংশ উভয়েই ছিলেন রোমের করদ রাজা এবং খৃস্টান হীরার রাজন্যবর্গ সর্বদা ছিলেন ইরানের সহিত সংশ্লিষ্ট। এই হীরা রাজবংশের লোকজন ইরানী শাহযাদাদের গৃহশিক্ষক থাকিতেন। পারসিক সম্রাটগণ তাহাদের সন্তানগণকে মরুচারী জীবনযাত্রা ও শিকার বিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হীরার রাজাদের নিকট প্রেরণ করিতেন। ইরানের বিখ্যাত সম্রাট বাহ্রামগোরও এই রাজবংশের নিকট বিদ্যাভ্যাস করিয়াছিলেন। তাই তিনি সিংহাসনে আরোহণ করার পর হীরার রাজপুরুষদের প্রতি অত্যন্ত সম্মান ও আনুকূল্য প্রদর্শন করেন এবং তাহাদেরকে পারসিক উপনিবেশসমূহে সম্রাটের প্রতিনিধি বা ভাইসরয় নিযুক্ত করেন।
এইভাবে আরব্য ইরাকে হীরার বাদশাহগণের বিরাট প্রভাব-প্রতিপত্তি সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বাহায়ন ও হীরা রাজ্যে এই বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকটি খান্দান রাজত্ব করে। নবী কারীম-এর যুগে যাহারা বাহ্রায়নে রাজত্ব করিতেছিলেন তাহাদেরকে 'মানাযেরা' বলা হইয়া থাকে। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ সত্ত্বেও তাহারা আরব বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে মনেপ্রাণে একটি অনারব শক্তির আধিপত্য মানিয়া লইতে পারিতেছিলেন না। সর্বদাই এই অধীনতাপাশ ছিন্ন করার একটা আকাঙ্ক্ষা তাহাদের মনের মণিকোঠায় লালিত হইত। ইরানী সম্রাটগণ তাহা আঁচ
করিতে পারিতেন এবং সর্বদাই তাহাদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করিতেন। হীরার রাজন্যবর্গ এই দুর্বলতার সুযোগও গ্রহণ করিতেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ইরানের অনারব সংস্কৃতি হীরাবাসিগণকে প্রভাবান্বিত করে। ফলে সেই আজমী বিলাসব্যসন হীরার রাজ-দরবারেও দেখা দেয়। খসরু পারভেযের তীক্ষ্ণদৃষ্টি তাহা এড়াইতে পারে নাই। কিন্তু রোমকদের সহিত আসন্ন একটা বড় রকমের যুদ্ধের পরিকল্পনা থাকায় তিনি আপাতত সেদিকে দৃষ্টি দান সমীচীন মনে করেন নাই। কেননা ঐ আসন্ন যুদ্ধে হীরার রাজন্যবর্গের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ ছিল অপরিহার্য।
অবশেষে ইরান ও রোমের মধ্যে ঐ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হইলে খসরু পারভেযের বাহিনী আরব্য ইরাক, সিরিয়ার রোম শাসিত এলাকাসমূহ এবং ফিলিস্তীনকে পদদলিত করিয়া মিসরের নীল নদের তীর পর্যন্ত চলিয়া আসে। এই যুদ্ধে আরব্য ইরাক ও সিরিয়া ফ্রন্টে হীরার রাজন্যবর্গ বিরাট ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বিজয় লাভের পর খসরু পারভেয তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রসমূহকেই স্বীয় দরবারে প্রাধান্য দিতে থাকেন। ফলে হীরা ও বাহরায়নের রাজন্যবর্গ ইরানী দরবারের প্রতি ক্ষুব্ধ হইয়া উঠেন। তাহারা তাহাদের অধীনস্ত আরব গোত্রসমূহকে তলে তলে সংগঠিত করিতে লাগিলেন। খসরু তাহা আঁচ করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করিতে না করিতেই রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস বিরাট যুদ্ধ প্রস্তুতিসহ তাহার মাথার উপর আসিয়া দাঁড়াইলেন। খসরু কৌশলে তাহাদের মনোরঞ্জন পূর্বক সহযোগিতা লাভের চেষ্টা করিলেও তলে তলে তাহারা আরব গোত্রসমূহকে নিবৃত্ত রাখিতেই সচেষ্ট থাকেন। যুদ্ধে পারসিকদের পরাজয়ের ইহা একটি অন্যতম কারণ হইয়া দাঁড়ায়। লড়াইয়ে বাহরায়নের মানাযেরা রাজবংশ হৃষ্টচিত্তে ইরানীদের সাহায্য তো করেই নাই, উপরন্তু তাহারা এবং তাহাদের প্রভাবাধীন আরব গোত্রগুলি ইরানীদের রসদপত্র মওকা বুঝিয়া লুটও করিয়াছে। কিন্তু তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সিরীয় আরব গোত্রসমূহের অসন্তুষ্টির আশঙ্কায় যুদ্ধ জয়ের পর হিরাক্লিয়াসও তাঁহাদের মূল্যায়ন করেন নাই।
বাহরায়ন ও হীরার রাজন্যবর্গের জন্য ইহা ছিল রীতিমত এক ক্রান্তিকাল। ইরানীদের আস্থা তাঁহারা ইতোমধ্যেই হারাইয়াছে। ঐদিকে তাঁহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দূমাতুল জান্দাল ও সিরিয়ার প্ররোচনায় রোমক শক্তিও যে কোন সময় হামলা চালাইতে পারে এমন একটা আশঙ্কা সতত বিরাজমান। মুনযির উক্ত দুই শক্তির মুকাবিলায় তৃতীয় শক্তিরূপে সম্মিলিত আরব ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিতেছিলেন। কিন্তু যে বিরাট সামরিক শক্তি ও উদার সমাজনীতির মধ্যে নিহিত শক্তি এই অভাব পূরণ করিতে পারিত, তাহার কোনটাই তাহার কাছে ছিল না। ইসলামের নব আবির্ভূত রাষ্ট্রশক্তি এবং ইহার মধ্যে নিহিত ঐক্যপ্রতিষ্ঠার শক্তির কথা অবহিত হইয়া এবং তাঁহাদের হাতে কুরায়শদের উপর্যুপরি পরাজয়ের সংবাদ শ্রবণে তাঁহার মনে এমন একটি প্রত্যয় দানা বাঁধিয়া উঠিতেছিল যে, ইসলামের এই নব উত্থিত শক্তিই তাঁহার ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌছিবার ক্ষমতা রাখে। এমনই এক পরিস্থিতিতে নবী কারীম (স)-এর দা'ওয়াত লইয়া 'আলা ইবনুল হাদরামী (রা) বাহরায়নে গিয়া উপনীত হইলেন। নবী কারীম দূতকে বিদায় দানকালে বলিয়া দিলেন, মুনযির যদি সন্তোষজনক জবাব দেয়, তবে আমার পুনরাদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তুমি ঐ দেশেই অবস্থান করিবে এবং এই সময় তাহাদের ধনীদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিয়া সেখানকার দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করিবে। তখন হযরত 'আলা হাদরামী (রা) তাঁহার কাছে একটি
লিখিত নির্দেশ প্রার্থনা করেন এবং মহানবী সেমতে বিভিন্ন প্রকার মালের ও পশু সম্পদের যাকাতের হার উল্লেখপূর্বক একখানা লিপি তাঁহার সাথে দিয়া দেন। মুনযিরের উদ্দেশ্যে লিখিত পত্রখানা ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى المنذر بن ساوى سلام عليك فانی احمد اليك الله الذى لا اله الا هو واشهد ان لا اله الا هو اما بعد فاني ادعوك الى الاسلام فاسلم تسلم واسلم يجعل لك الله ما تحت يديك واعلم ان ديني سيظهر الى منتهى الخف ولحافي.
الله رسول الله محمد
"আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে মুনযির ইন্ন সাওয়াকে। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক। অতঃপর আমি আপনার নিকট সেই আল্লাহ্র প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি। সুতরাং ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি লাভ করিবেন। আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহা হইলে আপনার অধীনস্থ রাজ্য আল্লাহ আপনার হাতেই রাখিয়া দিবেন। জানিয়া রাখিবেন, আমার ধর্ম ভূভাগের সেই প্রান্ত অবধি বিস্তার লাভ করিবে যে অবধি ঘোড়া ও উট পৌঁছিতে সক্ষম।"
(সীলমোহর) মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ