📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিজ্ঞজন প্রেরিত বিজ্ঞ দূত

📄 বিজ্ঞজন প্রেরিত বিজ্ঞ দূত


নবী কারীম-এর দূত হাতিব ইবন আবী বালতা'আ (রা) যখন ইসলামের নবীর সত্যতা সম্পর্কে মুকাওকিসের দরবারে তাঁহার বক্তব্য পেশ করিতেছিলেন, তখন মিসর-রাজের মনে
একটি প্রশ্নের উদয় হয় এবং তিনি তাহা হাতিবের নিকট ব্যক্তও করেন, "শত্রুদের নিপীড়নে বাধ্য হইয়া তিনি দেশান্তরিত হইলেন। তিনি যদি সত্য নবীই হইবেন তাহা হইলে অভিশাপ দিয়া শত্রুদেরকে নিপাত করিয়া দিলেন না কেন?"
হাতিব তাহাকে পাল্টা প্রশ্ন করিলেন, হযরত 'ঈসা (আ) যে সত্য নবী ছিলেন তাহা তো আপনি বিশ্বাস করেন। ক্রশবিদ্ধ করিয়া শত্রুরা তাঁহাকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও পায়তারা করিতেছে দেখিয়াও তিনি তাহাদেরকে অভিশাপ দিয়া নিপাত করিয়া দিলেন না কেন?
হতচকিত হইয়া মুকাওকিস বলিলেন, "তাই তো! আপনি সত্যিই বিজ্ঞজন প্রেরিত বিজ্ঞ দূত। বিজ্ঞজনোচিত উত্তরই আপনি দিয়াছেন” (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ১৩০-১; আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ১৮১; যায়নী দালান, ৩খ., পৃ. ৭০; নূরুল ইয়াকীন, শায়খ মুহাম্মাদ খিদারী বেককৃত, পৃ. ৬৯; হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা: সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৬৯৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বৈরী ভাবাপন্ন মুগীরা ও মুকাওকিসের কথোপকথন

📄 বৈরী ভাবাপন্ন মুগীরা ও মুকাওকিসের কথোপকথন


রাসূলুল্লাহ্-এর পত্রলাভ ও দূতের মুখে তাঁহার বিবরণ শ্রবণে মুকাওকিস যে কী পরিমাণ প্রভাবান্বিত হইয়াছিলেন, তাহার বিবরণ পাওয়া যায় মুগীরা ইব্‌ন শু'বার পরবর্তী কালের বর্ণনা হইতে। তিনি বলেন, ইবন মালিক ও আমি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মিসরে মুকাওকিসের দরবারে উপনীত হই। তখন মুকাওকিস আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের ও আমাদের মধ্যে তো মুহাম্মাদ ও তদীয় সঙ্গিগণ অন্তরায় হইয়া রহিয়াছেন। তাঁহারা তোমাদেরকে বাধা দেন নাই?
আমরা বলিলাম, আমরা সমুদ্রপথে আসিয়াছি এবং তাহাদের নিকট আমাদের আগমনের কথা গোপন রাখিয়াছি। তারপর তাহার ও আমাদের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তাহা এই:
মুকাওকিস: তাঁহার দাওয়াতের প্রেক্ষিতে তোমরা কী করিলে?
মুগীরা: আমাদের একটি লোকও তাহার অনুসারী হয় নাই।
মুকাওকিস: কেন তোমরা এরূপ করিলে?
মুগীরা: এক নূতন ধর্ম লইয়া তিনি আবির্ভূত হইয়াছেন যাহা আমাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম নহে, আবার জাহাপনার ধর্মও নহে। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষগণের ধর্মই আকড়াইয়া আছি।
মুকাওকিস: তাহার স্ব-সম্প্রদায়ের লোকজনের প্রতিক্রিয়া কী?
মুগীরা: তরুণরা তাঁহার অনুসারী হইয়াছে। তাঁহার স্ব-সম্প্রদায়ভুক্ত ও বাহিরের বিরুদ্ধবাদীদের সহিত বিভিন্ন স্থানে তাঁহাদের যুদ্ধ হইয়াছে। কখনও একপক্ষ জয়লাভ করিয়াছে, কখনও অন্য পক্ষ।
মুকাওকিস: তিনি কী করিতে বলেন?
মুগীরা: তিনি আমাদেরকে আহ্বান জানান, এক লা-শারীক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন কিছুর ইবাদত করিতে বারণ করেন, আমাদের দেবদেবীদেরকে ত্যাগ করিতে বলেন। তিনি আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করিতে এবং যাকাত দিতে বলেন। বিশ মিছকালে অর্ধ মিছকাল যাকাত আদায় করিতে এবং সর্বপ্রকার সম্পদের যাকাত দিতে বলেন।
মুকাওকিস: আদায়কৃত যাকাত তিনি কী খাতে ব্যয় করেন?
মুগীরা: তিনি তাহা দরিদ্রদেরকে ফিরাইয়া দেন। তিনি আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখিতে, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদয় আচরণ করিতে, প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করিতে, ব্যভিচার ও মদ্যপান না করিতে বলেন এবং গায়রুল্লাহ্র নামে যবেহকৃত পশুর গোশত ভক্ষণ করিতে বারণ করেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুগীরার ভাবান্তর ও খৃস্টান পাদ্রীর সহিত কথোপকথন

📄 মুগীরার ভাবান্তর ও খৃস্টান পাদ্রীর সহিত কথোপকথন


মুকাওকিস: তাঁহার বংশমর্যাদা কেমন? মুগীরা: তিনি উচ্চ বংশজাত লোক।
মুকাওকিস: নবী-রাসূলগণ উচ্চ বংশজাতই হইয়া থাকেন। তাঁহার সত্যতা সম্পর্কে তোমাদের অভিজ্ঞতা কী?
মুগীরা: বাল্যকাল হইতেই তিনি অত্যন্ত সত্যবাদী। এইজন্য আমরা তাঁহার প্রতি চরম বৈরী ভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাঁহাকে সাদিক (সত্যবাদী) ও আমীন (বিশ্বস্ত) নামে অভিহিত করিয়া থাকি।
মুকাওকিস: যে মানুষটি মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা বলেন না, তিনি কেমন করিয়া আল্লাহ্ ব্যাপারে মিথ্যা বলিতে পারেন? আচ্ছা, বল তো, কোন শ্রেণীর লোক তাঁহাকে বেশী অনুসরণ করে?
মুগীরা: তাহাদের অধিকাংশই গরীব-মিস্কীন ও নিঃস্ব লোক।
মুকাওকিস: সচরাচর ঐ শ্রেণীর লোকেরাই সর্বপ্রথম নবী-রাসূলগণের অনুসারী হইয়া থাকেন। ইয়াছরিবের (মদীনার) ইয়াহুদীরা তাঁহার সম্পর্কে কি মনোভাব পোষণ করে?
মুগীরা: উহারা তাঁহার প্রধান শত্রু।
মুকাওকিস: উহারা বিদ্বেষবশত তাঁহার প্রতি বৈরিতা করে। নতুবা তিনি যে সত্য নবী এই কথাটি তাহাদের সম্যক জানা রহিয়াছে। তাওরাতে শুভাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে এমন একজন নবীর আগমনের প্রতীক্ষায় তাহারা রহিয়াছে, যেমনটি প্রতীক্ষায় রহিয়াছি আমরা নিজেরাও।
তারপর মুকাওকিস আবার বলিতে শুরু করিলেন: "তিনি আল্লাহ্র সত্য রাসূল। বিশ্বব্যাপী আসমানী বার্তা পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্যই তাঁহার আগমন। কিবতী ও রোমকদের কাছে যদি তাঁহার পয়গাম বা বার্তা পৌঁছায়, তাহা হইলে তাহাদেরকেও তাঁহার অনুসরণ করিতে হইবে। হযরত 'ঈসা (আ)-এর প্রচারিত শিক্ষা অনুযায়ী তাঁহার আনুগত্য আমাদের জন্য অপরিহার্য। তুমি তাঁহার যে সমস্ত গুণের কথা বলিলে অতীতের নবী-রাসূলগণ এইসব গুণে বিভূষিত ছিলেন। তাঁহার সাফল্য অনিবার্য। তাহাদের তাঁহার বিরুদ্ধাচরণের কোন উপায় থাকিবে না। তাঁহার দীন জলে-স্থলে ছড়াইয়া পড়িবে।"
মুগীরা: সারা দুনিয়ার লোকও যদি তাঁহার অনুসারী হইয়া যায়, তবুও আমরা তাঁহার অনুসারী হইব না।
মুগীরা বলেন, আমাদের কথা শুনিয়া মুকাওকিস মাথা নাড়িয়া বলিলেন, এখনও তোমরা ইহাকে তামাশা মনে করিতেছ?
মুগীরা বলেন, মুকাওকিসের মন্তব্য আমাদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। আমি আমার সঙ্গীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলাম, আজমী (অনারব) রাজ-রাজড়াগণ পর্যন্ত তাঁহার ভয়ে তটস্থ, তাঁহারাও তাঁহার সত্যতায় আস্থাবান। অথচ আমরা তাঁহারই আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী হইয়াও তাঁহাকে কী ঘৃণাই না করি। এতদ্ব্যতীত এই নূতন ধর্মের নবীর প্রতিনিধিগণ আমাদের দ্বারে আগমন করিয়া আমাদেরকে তাঁহার ধর্মের দাওয়াত দেন। আমার মানসিক অবস্থা আলেকজান্দ্রিয়া ত্যাগের পর হইতেই আমাকে বিব্রত করিতেছিল। আমি বলিলাম, ইয়াহুদী-খৃস্টানদের সমস্ত গীর্জা-উপাসনালয় দর্শন না করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিব না। অতঃপর তন্নতন্ন করিয়া আমি এই নূতন নবীর নিদর্শনাদি ও বিবরণ জানিতে সচেষ্ট হই। সৌভাগ্যক্রমে ঐ সময় আমি ইউহান্স
নীজার শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত একজন অতি বিজ্ঞ কিবতী পাদ্রীর সাক্ষাত লাভ করি। লোকজন অসুস্থ হইলে তাঁহার নিকট দু'আর জন্য আসিত। তাঁহার মত বিজ্ঞ লোক আমি আর দেখি নাই। তাঁহার সহিত আমার নিম্নরূপ কথোপকথন হয়:
মুগীরা: আপনারা কি একজন নবীর প্রতীক্ষায় রহিয়াছেন? যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে অনুগ্রহপূর্বক সেই প্রতীক্ষিত নবী সম্পর্কে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহে বিবৃত নিদর্শনাদি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন।
পাদ্রী: হাঁ, আমরা একজন নবীর আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় আছি। তিনি আখেরী যমানার নবী। তাঁহার ও যীশুর মধ্যবর্তী সময়ে আর কোন নবী হইবেন না। যীশু আমাদেরকে তাঁহার অনুসরণ করিবার নির্দেশ দিয়াছেন। তিনি হইবেন একজন উম্মী (নিরক্ষর) নবী। তিনি হইবেন আরব বংশোদ্ভূত। তাঁহার নাম হইবে আহমাদ। তাঁহার দৈহিক চিহ্নাদি ও বিবরণ নিম্নরূপ:
"তিনি হইবেন একজন মধ্যম গড়নের লোক। তাঁহার চক্ষুদ্বয়ে লালিমা মিশ্রিত থাকিবে। তাঁহার গাত্রবর্ণ ধবধবে শুভ্রও হইবে না, আবার ধূসর বর্ণও হইবে না। তিনি হইবেন দীর্ঘকেশী, মোটা বস্ত্র পরিধানকারী, অনাড়ম্বর আহারে অভ্যস্ত, যাহা পাইবেন তাহা খাইয়াই তুষ্ট থাকিবেন, তাঁহার স্কন্ধে তরবারি ঝুলন্ত থাকিবে। কে তাহার মুকাবিলায় অবতীর্ণ হইল তিনি তাহার পরোয়া করিবেন না। সতত আত্মসংগ্রামে লিপ্ত, উৎসর্গীকৃত প্রাণ, সঙ্গী-সাথী পরিবেষ্টিত। তাঁহারা তাঁহাকে নিজের সন্তান ও পিতামাতার চেয়েও অধিক ভালবাসিবে। তিনি তাহাদেরকে এক হারেম হইতে বাহির করিয়া অন্য হারেমে লইয়া যাইবেন। কঙ্করময় ও খর্জুর বীথির ভূমিতে তিনি হিজরত করিবেন। ইব্রাহীম (আ)-এর ধর্ম তিনি পালন করিবেন। মুগীরা: তাঁহার সম্পর্কে আরও কিছু বলুন। পাদ্রী:
يأتزر على اوسطه ويغسل اطرافه ويخص بما لا تخص الانبياء قبله وكان النبي يبعث الى قومه ويبعث هو الى الناس كافة. "তিনি লুঙ্গি পরিধান করিবেন এবং ধৌত করিবেন তাঁহার প্রান্তদেশসমূহ (উযূর প্রতি ইঙ্গিত), পূর্ববর্তী নবীগণ যে বৈশিষ্ট্যসমূহ লাভ করেন নাই তেমন বৈশিষ্ট্যে তিনি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হইবেন। পূর্ববর্তী কালে নবী কেবল তাঁহার নিজ সম্প্রদায়ের প্রতিই প্রেরিত হইতেন, কিন্তু তিনি প্রেরিত হইবেন সারা বিশ্বের মানবজাতির প্রতি। সারা বিশ্বের মাটি তাঁহার জন্য মসজিদ ও পবিত্র, যেখানেই সালাতের সময় হইবে সেখানেই তায়াম্মুম করিয়া সালাত আদায় করিবেন। অথচ পূর্ববর্তীগণ এই ব্যাপারে কঠোর নিয়মনীতির অধীন ছিলেন, তাঁহারা গীর্জা বা উপাসনালয় ছাড়া প্রার্থনা করিতে পারিতেন না" (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৯৩-৯৪)।
মুগীরা ইব্‌ন শু'বা বলেন, আমি তাঁহার ও অন্যান্যদের প্রত্যেকটি কথা অন্তরে গাথিয়া রাখিলাম। পাদ্রী রাসূলুল্লাহ্-এর বৈশিষ্ট্যস্বরূপ আরও একটি কথা বলিয়াছিলেন, "তিনি তাঁহার গোড়ালীর উপরে লুঙ্গি পরিবেন অর্থাৎ দাম্ভিক লোকের মত মাটি ঘেঁষিয়া লুঙ্গি পরিবেন না। মুগীরা বলিলেন, তাঁহার কথা শুনিয়া এবং অনুরূপ অন্যান্য পাদ্রীদের কথা শুনিয়া আমি অত্যন্ত অভিভূত হইয়া পড়ি এবং দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াই রাসূলুল্লাহ্-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করি (খাসাইসুল কুবরা, পৃ. ১২-১৩; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৯৩-৯৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কিবতী জাতির মহান নেতা

📄 কিবতী জাতির মহান নেতা


মিসর-রাজ মুকাওকিস যদি রোমক সম্রাটের নিয়োজিত একজন গভর্ণর বা প্রাদেশিক শাসক পর্যায়ের নেতাই হইয়া থাকেন, তাহা হইলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে عظيم القبط বা কিবতী জাতির মহান নেতা অভিধায় অভিহিত করিয়া একজন স্বাধীন নৃপতির মর্যাদায় অভিষিক্ত করিলেন কেন, এই প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই কাহারও মনে উদিত হইতে পারে। সূক্ষ্মদর্শী সীরাতবেত্তা আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী এই প্রশ্নটির জবাব দিয়াছেন এইভাবে-
"সম্ভবত ৬২৭ খৃস্টাব্দে মিসরের উপর ইরানীদের প্রাধান্য ও বিজয় লাভের সময় কিবতী লাট পাদ্রী মুকাওকিস ক্ষমতার বাগডোর স্বহস্তে গ্রহণ করিয়াছিলেন। তথাপি সন্ধি চুক্তি ৬২৮ খৃস্টাব্দের পূর্বে হয় নাই। সম্ভবত এই বিরতিকালেই রাসূলুল্লাহ্-এর লিপি মুকাওকিসের নিকট পৌছে, যখন মিসরের গভর্নর প্রায় স্বাধীনই ছিলেন (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা (আরবী), পৃ. ২৫৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00