📄 শাহ হরমুযানের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র
কিসরার নিকট প্রেরিত রাসূলুল্লাহ -এর দূত আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) যথাসময়ে মদীনায় ফিরিয়া আসিয়া যখন তাঁহার সফরবৃত্তান্ত বর্ণনা করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ -কে জানাইলেন যে, কিসরা তাঁহার পত্রখানা টুকরা টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়াছে তখন অবলীলক্রমে তাঁহার পবিত্র মুখ হইতে এই কথাটি নির্গত হইল, আল্লাহ তাহার সাম্রাজ্যকেও টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিবেন।
মাত্র কিছুদিন যাইতে না যাইতেই আরব, ইয়ামান, সিরিয়া সর্বত্রই এই সংবাদ রটিয়া গেল যে, পারস্যে বিদ্রোহ দেখা দিয়াছে। বিদ্রোহীরা খসরু পারভেযকে হত্যা করিয়া তাহার পুত্র শিরোইয়াকে সিংহাসনে বসাইয়াছে। মহানবী -কে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে কিসরা লোক প্রেরণ করিয়াছেন শুনিয়া উল্লসিত কুরায়শ মহলের হর্ষ তখন বিষাদের রূপ পরিগ্রহ করিল (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৫)।
ঐতিহাসিক খাতীবের বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ -এর পত্র খানি ছিঁড়িয়া ফেলিলে দূত আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) তাহাকে কঠোর বাক্য শুনান। সম্ভবত তাহাতে তাহার মনে পরিবর্তন সূচিত হইয়াছিল। অতঃপর খাতীব লিখেন:
"কিসরা দেরাজ হইতে কয়েক টুকরা রেশমী বস্ত্র বাহির করিয়া তাহা রাসূলুল্লাহ -এর জন্য উপঢৌকনস্বরূপ প্রদান করেন"। ঐতিহাসিক ইয়া'কূবী বলেন:
"কিস্সা তাঁহার উদ্দেশ্যে একটি পত্র লিখেন এবং উহা দুইটি রেশমী বস্ত্রের মধ্যে স্থাপন করিয়া উহার মধ্যে কস্তুরী স্থাপন করেন। দূত যখন উহা নবী কারীম -এর নিটক হস্তান্তরিত করিল তখন তাহা খুলিয়া উহার মধ্য হইতে এক মুষ্টি কস্তুরী লইয়া উহার সুগন্ধি গ্রহণ করিলেন এবং তাঁহার সাহাবীগণকেও দান করিলেন এবং বলিলেন, ঐ রেশমে আমাদের প্রয়োজন নাই। উহা আমাদের পরিধেয় নহে” (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৩)। এই সময় রাসূলুল্লাহ আরও বলেন:
"হয় তোমরা আমার দীনে প্রবেশ করিবে, না হয় আমি ও আমার সঙ্গিগণ তোমার নিকট আসিয়া পড়িব (বিজয়ী বেশে)। আর তোমার পত্র—আমি তোমার চেয়ে উহা সমধিক অবগত, উহাতে অমুক অমুক ব্যাপার রহিয়াছে। অথচ তিনি তাহা খুলেনও নাই এবং পড়িয়াও দেখেন নাই"।
ইয়া'কূবী বলেন, তারপর দূত কিসরাকে তাহা অবহিত করিল। কিন্তু এই বর্ণনাটি এককভাবে ইয়া'কূবীরই। মুসনাদে আহমাদে, ১খ., পৃ. ৯৬ ও ১৪৫-এও কিসরার রাসূলুল্লাহ -কে
কস্তুরী ও রেশমী বস্ত্র উপঢৌকনস্বরূপ প্রেরণের কথা বর্ণিত হইয়াছে (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৩)।
খাতীব বাগদাদী পত্রের পাঠও উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। পত্রখানার বক্তব্য শ্রবণের পর ক্রুদ্ধ কিসরা কাঁচি আনাইয়া পত্রখানাকে টুকরা টুকরা করিয়া তাহা আগুনে ভস্মীভূত করেন। কিছু দিন পর অনুতপ্ত হইয়া তিনি বলেন, এইবার আমাদের উচিত হইবে (অনুতাপের নিদর্শনস্বরূপ) কিছু উপঢৌকন পাঠাইয়া দেওয়া। তারপর তিনি রেশমী বস্ত্রে পত্র ও উপঢৌকনাদি প্রেরণ করেন। কিন্তু ২২ মে ১৯৬৪ তারিখে বৈরুতের আরবী দৈনিক আল-হায়াতে এবং পরবর্তীতে করাচীর উর্দু মাসিক আল-বালাগের মে, ১৯৬৮ সংখ্যায় প্রকাশিত তথ্য হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্র কাঁচিকাটা ও ভষ্মীভূত করা সংক্রান্ত খাতীব বাগদাদীর মন্তব্য নিছক অনুমান ভিত্তিক। আসল ঘটনা হইতেছে, পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলার পর কেহ একজন চুপিসারে সকলের অলক্ষে তাহা উঠাইয়া নিয়াছিলেন-যাহার ফলে অদ্যাবধি উহা সংরক্ষিত থাকা সম্ভব হইয়াছে। অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল ধরিয়া প্যারিসে অবস্থানকারী ভারতীয় গবেষক পণ্ডিত ড. হামীদুল্লাহ (২০০২) মাজমূ'আতুল ওয়াছাইকিস সিয়াসিয়্যা লিল-আহদিন নাবাবী ওয়া'ল-খিলাফাতির রাশিদা-তে এবং খালিদ সায়্যিদ আলী, রাসাইলুন নাবিয়্যিার ইলাল-মুলুকি ওয়াল-উমারা ওয়াল-কাবাইল" গ্রন্থে লেবাননের মিঃ হেনরী ফিরআউনের সৌজন্যে প্রাপ্ত উক্ত পত্রখানির ফটোষ্টাট কপি প্রকাশ করিয়াছেন। মিসরীয় পুরাতত্ত্ববিদ ড. সালাহুদ্দীন আল-মুনাজ্জিদ পত্রটির পুরাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের পর দীর্ঘ সন্দর্ভে মন্তব্য করেন যে, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে যে, ইহাই সেই পবিত্র পত্র যাহা নবী কারীমা পারস্য সম্রাটের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ড. হামীদুল্লাহ স্বচক্ষে উহা দেখিয়াছেন (সায়্যিদ মাহবুব রিযভী, মাকতুবাতে নাবাবী, পৃ. ১৫১-১৬৫; মওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, হাদীসের তত্ত্ব ও ইতিহাস, পৃ. ৭৩-৪, ১ম সংস্করণ ১৯৬৯ খৃ.)।
শাহ হরমুযানের নামে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্র নবী কারীম-এর আমলে ইরানের একাংশে শাহী খান্দানের একজন শাহযাদা হরমুযানের রাজত্ব ছিল। আহওয়ায, রামহরমুয, তুসতার ও সূস ছিল তাহার শাসিত এলাকাসমূহের বিখ্যাত শহর। নবী কারীম হরমুযানকেও ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র দেন। সেই পত্রখানার বাহক কে ছিলেন তাহা ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকিলেও কিস্সা-দরবারে যিনি দৌত্যের দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন সেই আবদুল্লাহ ইব্ন হুযাফা আস-সাহমী (রা)-ই এই দায়িত্বও পালন করিয়াছিলেন বলিয়া অনুমতি হয়। সেই পত্রখানার পাঠ ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم
من محمد عبد الله ورسوله الى الهرمزان اني ادعوك الى الاسلام اسلم تسلم. الله رسول محمد
"বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম- আল্লাহ্র দাস ও তদীয় রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে হরমুযানের প্রতি- আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন” (সীলমোহর, মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ) (মওলানা হিফজুর রহমান, বালাগুল মুবীন, পৃ. ১৪১; মাকতুবাতে নববী, পৃ. ১৬৫)।
হরমুযান পত্রখানির কী জবাব দিয়াছিলেন বা আদৌ কোন জবাব দিয়াছিলেন কি না, তাহা অজ্ঞাত। কিন্তু সেই সময় ইসলাম গ্রহণের তাওফীক তাহার হয় নাই। পরবর্তীতে হযরত উমার ফারুক (রা)-এর খিলাফত আমলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রা) তাঁহার জন্য বার্ষিক দুই হাজার মুদ্রার ভাতা মঞ্জুর করিয়া তাঁহাকে মদীনায় অভিবাসিতও করিয়াছিলেন (মাকতুবাতে নাবাবী, পৃ. ১৬৬; বালাগুল মুবীন, পৃ. ১৩৯-১৪৫)।
📄 মুকাওকিসকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র প্রেরণের প্রেক্ষাপট
হিজরী সপ্তম সাল। ৬২৮ খৃস্টাব্দের গ্রীষ্মকাল তখন সবেমাত্র শুরু হইয়াছে। মদীনার দূত হাতিব ইব্ন আবী বালতা'আ (রা) প্রাচীন মিসরের বাবলিয়্যূন দুর্গে প্রবেশ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্র কিবতী জাতির নেতা মুকাওকিসের নিকট অর্পণ করিলেন। পত্রটির মূল পাঠ ছিল এই:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد عبد الله ورسوله الى مقس عظيم القبط سلام على من اتبع الهدى اما بعد فاني ادعوك بدعاية الاسلام اسلم تسلم يؤتك اجرك مرتين فان توليت فانما عليك اثم القبط ويأهل الكتاب تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ان لا نعبد الا الله ولا نشرك به شيئا ولا يتخذ بعضنا بعضا اربابا من دون الله فان تولوا فقولوا اشهدوا بانا مسلمون.
আল্লাহ রাসূল মুহাম্মদ
"পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহর নামে। আল্লাহ্ বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে কিবতী জাতির মহান নেতা মুকাওকিসের প্রতি। শান্তি বর্ষিত হউক তাহার প্রতি যে সত্য পথের অনুসারী। আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাইতেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দিবেন। পক্ষান্তরে যদি অগ্রাহ্য করেন, তাহা হইলে গোটা কিবতী জাতির পাপের বোঝা আপনার উপরই বর্তাইবে। হে কিতাবী সম্প্রদায়ের লোকজন! আইস, এমন 'একটি ব্যাপারে আমরা একমত হইয়া যাই যাহাতে আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনই পার্থক্য নাই। তাহা হইল, আমরা এক অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাহারও যেন ইবাদত না করি। কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি আর আমাদের মধ্যকার কেহ আল্লাহকে বাদ দিয়া আমাদেরই মধ্যকার কাহাকেও প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে।
📄 মিসর রাজের দরবারে মহানবী (সা)-এর দূত হযরত হাতিব (রা)-এর ভাষণ
না করে। তারপরও যদি তাহারা অস্বীকার করে তবে বলিয়া দাও, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণকারী মুসলিম।"
(সীলমোহর) আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ
(আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ১২৯; আস্-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৮০; আদ-দুররুল মানছুর, ২খ., পৃ. ৪০, আয়াতে মুবাহালার তাফসীরে; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৮; খিতাতুল মাকরীযী, ১খ., পৃ. ২৯; হুসুল মুহাদারা, ১খ., পৃ. ৪২; কাসতাল্লানী, মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ৩খ., পৃ. ৩৯৭; তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., প. ২৬৫)। মুকাওকিসের উদ্দেশ্যে লিখিত রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রের আরেকটি পাঠ পাওয়া যায়। তাহা নিম্নরূপঃ
من محمد رسول الله الى صاحب مصر والاسكندرية اما بعد فان الله تعالى ارسلنی رسولا وانزل على قرأنا وامرني بالاعذار وانذار ومقاتلة الكفار حتى يدينوا بدینی ويدخل الناس في ملتى وقد دعوتك الى الاقرار بوحدانية الله تعالى فان فعلت سعدت وان ابيت شقيت والسلام
الله رسول محمد
"মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ -এর পক্ষ হইতে মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসকের প্রতি। (আল্লাহ্র প্রশংসা বর্ণনার পর) অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছেন। আমার প্রতি তিনি কুরআন নাযিল করিয়াছেন। তিনি আমাকে অব্যাহতি দান ও সতর্কীকরণের এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দিয়াছেন যাবৎ না তাহারা আমার ধর্মে বিশ্বাসী হয় এবং লোকজন আমার মিল্লাতে প্রবেশ করে। আমি আপনাকে আল্লাহ্ একত্বের স্বীকারোক্তির প্রতি আহ্বান জানাইতেছি। যদি আপনি তাহা স্বীকার করিয়া লন তবে তাহা হইবে আপনার জন্য মঙ্গল আর আপনি তাহা প্রত্যাখান করিলে তাহা হইবে আপনার জন্য অমঙ্গল" (সীলমোহর)। (জামহারাতু রাসাইলিল আরাব, ১খ., পৃ. ৪৩; সুবহুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৮; মাজমূ'আতুল ওয়াছাইক, পৃ. ১৩৭)।
বৃদ্ধ পোপ বিন ইয়ামীন পত্রের বক্তব্য শ্রবণ করিয়া দীর্ঘক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। তারপর দূতকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, জবাবের জন্য আপনাকে অপেক্ষা করিতে হইবে। আপনি বাবিলিয়্যূন আমার মেহমানরূপে কয়েক দিন অবস্থান করুন।
পত্রের বক্তব্য বিন ইয়ামীনের অন্তরে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে। কত সহজ-সরল বক্তব্য এই পত্রের! আল্লাহর একত্বের এই দাওয়াত ইয়াকূবী ও মালাকানী খৃস্টানদের জটিল ধর্মীয় মারপ্যাচের অনেক ঊর্ধ্বে, অথচ কতই না চিন্তা উদ্দীপক! এই পত্রে সেই বিস্মৃত সত্যই যেন বাঙময়- হইয়া উঠিয়াছে যাহা ভারী ভারী খৃস্টীয় গ্রন্থাদির নিচে এতদিন চাপা পড়িয়া গিয়াছিল।
তাঁহার অন্তর যেন ডাক দিয়া বলিতেছিল, এই সেই শাশ্বত সত্য যাহার সুসমাচার পূর্ববর্তী ধর্মগুলি ও সত্যব্রতী মহাপুরুষগণ দিয়া গিয়াছেন। বস্তুত ইহাই একজন নবী ও রাসূলের আহ্বান। তবে কি আমার নিকট দূত ও বার্তাপ্রেরক সেই বহুল প্রতীক্ষিত সত্য নবীই? যেন তাহাই হয়। তবে জেরুসালেমের পরিবর্তে মক্কায়ই কেন তাঁহার অভ্যুদয় ঘটিল? কিবতী জাতির নায়ক এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন।
রাত্রিবেলা অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে তিনি মদীনার কাসেদকে একান্তে ডাকিয়া বলিলেন, দূত প্রবর! এইবার আমার কাছে আপনাকে প্রেরণকারীর কিছু পরিচয়ও ব্যক্ত করুন। কেমন তাঁহার অবয়ব, বংশমর্যাদা, চালচলন ও কথাবার্তা? তাঁহার অভ্যুদয়ের পর তাঁহার স্ব-জাতির মধ্যে কী পরিস্থিতির উদ্ভব হইল?
মিসরীয় ভাষায় অনর্গল কথা বলিতে পারঙ্গম সুভাষী দূত হাতিব ইব্ন আবী বাল্লা'আ (রা) মক্কা ও মদীনার মধ্যে সংঘটিত সব কাহিনীই একে একে বিবৃত করিলেন। হেরা গুহার সেই স্মরণীয় নির্জনতা, ওহী নাযিল হওয়ার কথা, সাফা পর্বতের সেই বহুবিশ্রুত উপদেশ, কুরায়শদের বিরোধিতা, মক্কা হইতে হিজরত বা বাস্তত্যাগ, তারপর একে একে সংঘটিত বদর, উহুদ, খন্দকের যুদ্ধসমূহ, উপরন্তু তাওহীদ, আখিরাত, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সেই বিপ্লবাত্মক দা'ওয়াত যাহা চিন্তার জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছে- তাহার এই বিবরণ হইতে উহার কিছুই বাদ পড়িল না। এই সময় মুকাওকিসকে লক্ষ্য করিয়া হাতিব (রা) যে ভাষণ প্রদান করেন হাফিফ ইবনুল কায়্যিমসহ অনেকেই তাহা নিজ নিজ গ্রন্থে উদ্ধৃত করিয়াছেন। ভাষণটি নিম্নে প্রদত্ত হইল:
মিসর রাজের দরবারে মহানবী -এর দূত হযরত হাতিব (রা)-এর ভাষণ انه كان قبلك من يزعم انه الرب الاعلى يعنى (فرعون) فاخذه الله نكال الآخرة والاولى فانتقم به ثم انتقم منه فاعتبر بغيرك ولا يقبر غيرك بك ان هذا النبي دعا الناس فكان اشدهم عليه قريش واعداهم له يهود وأقربهم منه النصارى ولعمرى ما بشارة موسى بعيسى عليهما الصلوة والسلام الاكبشارة عيسى بمحمد ﷺ. "(রাজন!) আপনার পূর্বে এই দেশে এমন এক ব্যক্তিও ছিল যে নিজেকে রব্বুল আ'লা বা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভু বলিয়া দাবি করিত (অর্থাৎ ফিরআওন)। ফলে আল্লাহ্ তাহাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কঠিন শাস্তিতে পাকড়াও করিলেন। আল্লাহর গযব যখন নামিয়া আসিল তখন সে বা তাহার রাজ্য লোক-লশকর কিছুই রহিল না। সুতরাং আপনি অন্যের ঘটনা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করুন। এমন যেন না হয়, আপনার ধ্বংসই অন্যের জন্য শিক্ষণীয় হইয়া দাঁড়ায়।
"এই নবী বিশ্বের তাবৎ মানব গোষ্ঠীকে এই সত্যের দাওয়াত দিয়াছেন। কুরায়শ জাতি তাঁহার ঘোরতর বিরোধিতা করিয়াছে, ইয়াহুদীগণ করিয়াছে তীব্রতর বৈরিতা। পক্ষান্তরে খৃস্টান সমাজ তুলনামূলকভাবে তাঁহার প্রতি সম্প্রীতির পরিচয় দিয়াছে"।
"কসম আল্লাহ্! যেভাবে হযরত মূসা (আ), হযরত 'ঈসা (আ)-এর আগমনের সুসমাচার দিয়া গিয়াছিলেন ঠিক তেমনই হযরত 'ঈসা (আ) মুহাম্মাদ -এর আগমনের সুসমাচার প্রচার করিয়া গিয়াছেন"।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-দূত ও মুকাওকিসের প্রশ্নাত্তর
وما دعاؤنا اياك الى القرآن الا كدعائك اهل التوراة الى الانجيل وكل نبي ادرك قوما فهم امة فالحق عليهم ان يطيعوه فانت ممن ادرك هذا النبي ولسنا ننهاك عن دين المسيح بل تأمرك به. "আমাদের বেলায় আপনাকে কুরআনের দাওয়াত দেওয়াটা ঠিক তেমনই যেমনটি আপনি তাওরাতপন্থীগণকে ইঞ্জীলের প্রতি দাওয়াত দিয়া থাকেন"।
"যে নবী যে জাতিকে পাইয়াছেন, তাহারাই তাঁহার উম্মত। তাঁহার অনুসরণ করা তাহাদের কর্তব্য। আপনি যেহেতু এই নবীর যুগ পাইয়াছেন, সুতরাং তাঁহার আনুগত্য করা আপনার কর্তব্য। আমরা আপনাকে মসীহ (আ)-এর ধর্ম পালনে বাধা দিতেছি না, বরং তাঁহার প্রচারিত বার্তার অনুসরণ করিতেই বলিতেছি। কেননা তিনি শেষ নবীর আনুগত্যের নির্দেশই আপনাদেরকে প্রদান করিয়াছেন" (রাহমাতুললিল আলামীন, ১খ., পৃ. ১৫৬-৫৭; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৯)।
একান্ত গোপন প্রশ্নোত্তরকালে মুকাওকিস ও দূতের মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা হইয়াছিল উহার বিস্তারিত বিবরণ দিয়াছেন ইবন সা'দ তাবাকাতুল কুবরা গ্রন্থে। তিনি দূতকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, আমি আজ তোমাকে তিনটি কথা জিজ্ঞাসা করিব। দূত বলেন: আমিও আপনাকে সঠিক জবাব দিব। তারপর তাঁহাদের মধ্যে যেসব কথাবার্তা হয়, তাহা নিম্নরূপ:
মুকাওকিস: মুহাম্মাদ কী দা'ওয়াত দিয়া থাকেন? দূত: তিনি দা'ওয়াত দেন যেন আমরা এক অদ্বিতীয় আল্লাহ্রই 'ইবাদত করি, দিবারাত্র পাঁচবার সালাত আদায় করি, রমযানের রোযা রাখি, আল্লাহর ঘরের হজ্জ করি, অঙ্গীকার পূর্ণ করি। তিনি আমাদেরকে বারণ করেন মৃত জন্তু ও রক্ত ভক্ষণ করিতে।
মুকাওকিস: তুমি তাঁহার অবয়ব ও আচরণ সম্পর্কে কিছু বল। দূত হাতিব বলেন: আমি সংক্ষেপে তাঁহার বর্ণনা দিলে মুকাওকিস বলিলেন: আরও কিছু ব্যাপার রহিয়া গিয়াছে যাহা তুমি বর্ণনা কর নাই। তারপর তিনি নিজেই সেগুলি বলিতে লাগিলেন: 'তাঁহার চক্ষুদ্বয়ে ঈষৎ লালিমা রহিয়াছে, কচিতই সেই লালিমা অনুপস্থিত থাকে। তাঁহার স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যে মোহরে নবৃওয়াত রহিয়াছে। তিনি গর্দভে আরোহণ করেন। তিনি ঢিলা-ঢালা চোগা পরিধান করেন। তিনি খেজুর ও রুটির ভগ্নাংশ ভক্ষণের দ্বারাই দিনাতিপাত করেন। সাক্ষাৎকারী পিতৃব্য না পিতৃব্য-পুত্র তাহার কোন পরোয়া তিনি করেন না অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজনের অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দেন না (আল-ইসাবা, ৪খ., পৃ. ৫০৩; সীরাত যায়নী দাহলান, ৩খ., পৃ. ৭৩; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ১৩০-১)।
দূতের মুখে সবকিছু শোনার পর মিসরের পোপ ও জাতীয় নেতার মধ্যে সত্যভাষী বিন ইয়ামীনের মুখ দিয়া তাঁহার মনের অজান্তেই বাহির হইয়া আসিল, "আমি পূর্বেই জানিতাম আল্লাহর শেষ নবীর শুভাগমন ঘটিবে। কিন্তু আমার ধারণা ছিল, শামদেশেই তাঁহার অভ্যুদয় ঘটিবে। কেননা পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ শামদেশেই আবির্ভূত হইয়াছেন। কিন্তু এইবার দেখিতেছি আমার ধারণাকে ভুল প্রতিপন্ন করিয়া তিনি আবির্ভূত হইয়াছেন কঠিন সাধ্য-সাধনার দেশ আরবের মাটিতে"। তারপর দীর্ঘক্ষণ মাথা নীচু করিয়া কী যেন ভাবিলেন, অতঃপর বলিলেন: