📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (সা)-এর দরবারে পারসিক দূত

📄 মহানবী (সা)-এর দরবারে পারসিক দূত


ইহা ছিল হিজরী ষষ্ঠ সনের (৬২৮ খৃ.) শীতকালের ঘটনা। উক্ত দুইজন সর্দার তাইফের পথ ধরিয়া মদীনায় প্রবেশ করিলে তাইফের সর্দারগণ এবং মক্কার কুরায়শগণ ইরানের শাহানশাহ
মুহাম্মাদ-কে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে লোক প্রেরণ করিয়াছেন শুনিয়া উল্লসিত হইল। তাহারা ইরানী দূতদ্বয়কে অভ্যর্থনা জানাইল। এখানেই প্রথমবারের মত দূতদ্বয় মহানবী, মুসলমান জাতি এবং তাঁহাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বিশদভাবে জানিতে পারে। এখানেই তাহারা নবৃওয়াতের সূচনাকাল হইতে হুদায়বিয়ার সন্ধি পর্যন্ত সংঘটিত তাবৎ ঘটনা সবিস্তারে জানিবার সুযোগ লাভ করে। যদিও এই বিবরণ তাহারা ইসলামের শত্রুগণের মুখেই শ্রবণ করিল, তবুও যেন তাহাদের মনে যাঁহাকে তাহারা গ্রেফতার করিতে যাইতেছে, তিনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁহার প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে তাহাদের পূর্ব ধারণার অনেক উঁচু মানের মানুষ তিনি। তাই তাঁহাকে গ্রেফতার করার গুরুদায়িত্ব কীভাবে যে তাহারা পালন করিবে, তাহা তাহাদের বড় ভাবনার ব্যাপার হইয়া দাঁড়াল। তাহারা মদীনায় পৌঁছিয়া যখন সেখানকার অধিবাসিগণের জীবনযাত্রা এবং রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি তাঁহাদের ভক্তি ও ভালবাসার দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিল তখন তাহারা সম্যক উপলব্ধি করিতে পারিল যে, কী দুঃসাধ্য দায়িত্বভারই না তাহাদের উপর অর্পিত হইয়াছে! তাই রাসূলুল্লাহ-কে গ্রেফতার করার পরিকল্পনা বাদ দিয়া কেবল পারস্য সম্রাটের নির্দেশটি তাঁহার গোচরীভূত করিয়াই তাহারা ক্ষান্ত হইল। তাহারা নিবেদন করিল :
আমাদের শাহানশাহ আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য মালিক বাযানকে নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। আর মালিক বাযান এই উদ্দেশ্যে আমাদেরকে প্রেরণ করিয়াছেন। তাই আপনার পক্ষে উচিত হইবে আমাদের সহিত চলা। তাহাতে আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের মঙ্গল হইবে। আর আপনি যদি অসম্মত হন তবে তাহাতে অমঙ্গলকেই ডাকিয়া আনা হইবে। তাহা আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কারণ হইয়া দাঁড়াইবে। আপনাদের রাজ্য লুণ্ঠিত হইবে।
তাহারা অনেকটা ভয়ে ভয়েই এই পয়গাম পৌঁছাইল। তাহাদের ধারণা ছিল, ইহাতে প্রতিপক্ষ উত্তেজিত হইয়া দুই-চারটি কড়া কথা শুনাইয়া তাহাদেরকে বিদায় করিয়া দিবেন। তাহারা মনে মনে তাহা কামনাও করিতেছিল যেন তাহাই হয় এবং তাহারা নিরাপদে ইয়ামানে ফিরিয়া যাইতে পারে। কিন্তু তাহাদের বিস্ময়ের কোন সীমা রহিল না, যখন তাহারা লক্ষ্য করিল, আল্লাহ্র রাসূলের মধ্যে ইহার কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। এত বড় একটা কথা শোনার পরও তিনি একেবারেই নির্বিকার চিত্ত! ইরান সম্রাটের পয়গাম যেন তাঁহার মনে একটুও রেখাপাত করিল না। তাহারা আরও বিস্মিত হইল যখন দেখিল, তিনি ইহার কোন জবাব না দিয়াই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক অপর একটি ব্যাপারে তাহাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছেন। তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, আচ্ছা, তোমরা কাল আমার নিকট আসিও, তোমাদের এই কথার উত্তর দিব। এখন তোমরা আর একটি কথা শোন! আচ্ছা বল তো, আল্লাহ প্রদত্ত পুরুষসুলভ সৌন্দর্যময় দাড়িগুলি কাটিয়া এবং লম্বা লম্বা গোঁফ রাখিয়া তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডলকে এরূপ বিশ্রী করিয়া রাখিয়াছ কেন? তোমাদেরকে এই কুশিক্ষা কে দিয়াছে? তাঁহারা ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে উত্তর করিল, ইহা আমাদের প্রভুর (সম্রাটের) হুকুম। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, কিন্তু আমাদের প্রভু আমাদেরকে দাড়ি লম্বা করিয়া রাখিতে এবং গোঁফ ছাটিয়া ছোট করিতে হুকুম দিয়াছেন। বড়ই পরিতাপের বিষয়, তোমরা প্রকৃত প্রভুর আদেশ অমান্য করিয়া মনগড়া প্রভুর আদেশ পালন করিতেছ (হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৬৮৯)।
আসলে এই গোঁফ ছিল ইরানী সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মের অন্তর্ভুক্ত। লম্বা গোঁফ ছিল ইরানী সাম্রাজ্যের শক্তি ও দাপটের প্রতীক। এই গোঁফে তা আর প্যাঁচ দিতে দিতে তাহারা ইরান শাসিত
এলাকাসমূহে অত্যন্ত দম্ভ ও গর্ব সহকারে ঘোরাফেরা করিত। আর ঐসব এলাকার প্রজা- সাধারণকে অত্যন্ত তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে দেখিত। তাহাদের এবম্বিধ দম্ভদর্শনে শাসিত জাতি- সমূহের লোকজন ভিতরে ভিতরে ফুসিয়া মরিত, কিন্তু বাহিরে কিছু প্রকাশ করিতে পারিত না। রাসূলুল্লাহ-এর পরামর্শে আসলে তাহাদের এই দাম্ভিকতা পরিহারের দিকেই ইঙ্গিত ছিল।
পরদিন যখন কাহরামান ও খর-খসরা নামক দূতদ্বয় নবী কারীম-এর দরবারে পরম ঔৎসুক্য সহকারে তাঁহার জবাব শুনিবার জন্য আগমন করিল, তখন তিনি তাহাদেরকে এমনই এক সংবাদ দিলেন যাহা শ্রবণে তাহারা রীতিমত হতভম্ব হইয়া গেল। তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, ابلغا صاحبكما ان ربي قد قتل ربه كسرى في هذه الليلة لسبع ساعات مضت منها . "তোমাদের মনিবকে গিয়া বলিবে, আমার প্রভু বিগত রাত্রিতে তোমাদের মনিবকে হত্যা করিয়াছেন। শিরোইয়া তাহার পিতাকে হত্যা করিয়া সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছেন"।
উহা ছিল হিজরী সপ্তম সনের ১০ জুমাদাল উলা মঙ্গলবারের রাত্রির শেষ প্রহর। এতদশ্রবণে দূতদ্বয় অপ্রতিভ হইয়া কিছুক্ষণ নীরব রহিল। অতঃপর বলিল, ইহার ফল কিন্তু ভাল হইবে না। আমাদের শাহানশাহ আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করিয়াই ছাড়িবেন। পৃথিবীর মানচিত্রে এই দেশের নাম-নিশানা অবশিষ্ট থাকিবে না।
পূর্ণ প্রত্যয়ের সহিত গম্ভীর স্বরে রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, তোমাদের ঐসব চিন্তার কোন প্রয়োজন নাই। যাও, মালিক বাযানকে এই ঘটনার সংবাদ জানাইয়া আমার পক্ষ হইতে বলিয়া দিও, আমার ধর্ম বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হইবে। বিশ্বের যেখানেই কাহারও মুদ্রা (দাপট) চালু রহিয়াছে সেখানেই আমার প্রভাব-প্রতিপত্তি অনুভূত হইবে। মালিক বাযান যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তাঁহার শাসনাধীন রাজ্য তাঁহার হাতেই ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। ঐ রাজ্যের শাসকরূপে আমরা তাঁহাকেই বহাল রাখিব। বিদায়ের প্রাক্কালে নবী কারীম দূত খরখসরাকে একটি স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত কোমরবন্দ উপঢৌকনস্বরূপ দান করেন- যাহা তিনি কোন এক বাদশাহ্ পক্ষ হইতে উপঢৌকন পাইয়াছিলেন (আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮৫, ১৪৬; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দূতদ্বয়ের প্রতিবেদন ও গভর্নর মালিক বাযানের ইসলাম গ্রহণ

📄 দূতদ্বয়ের প্রতিবেদন ও গভর্নর মালিক বাযানের ইসলাম গ্রহণ


দূত কারামান ও খরখস্রা রাসূলুল্লাহ-এর এই পয়গাম লইয়া ইয়ামানে ফিরিয়া গেল। তাহারা বাযানকে আনুপূর্বিক সকল বৃত্তান্ত অবগত করিল। বাযান জিজ্ঞাসা করিলেন, নবৃওয়াতের এই নূতন দাবিদারকে তোমাদের নিকট কেমন মনে হইল? জবাবে তাঁহার একান্ত সচিব কাহরামান বলিলেন, রাজন! আমি পৃথিবীর অনেক বড় বড় রাজা-বাদশাহ্র দরবারে গিয়াছি। তাঁহাদের সহিত কথাবার্তা বলিয়াছি, একত্রে পানাহারও করিয়াছি, কিন্তু তাঁহার মত এমন গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব আমি অন্য কাহারও মধ্যে দেখি নাই।
বাযান অত্যন্ত কৌতূহলভরে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, ভক্ত-অনুরক্তদের কোন সামরিক বাহিনীও কি তাঁহার সহিত থাকে? জবাবে কাহরামান বলিলেন, না, তেমন কিছু আমাদরে দৃষ্টিতে পড়ে নাই। এইসব কথা শুনিয়া বাযান বেশ চিন্তাযুক্ত হইলেন। তারপর তিনি মন্তব্য করিলেন,
ইহা তো কোন সাধারণ মানুষের ব্যাপার হইতে পারে না। এইসব কথাবার্তা স্পষ্ট নবী-রাসূলের কথাবার্তার অনুরূপ মনে হইতেছে। তবুও আমরা প্রতীক্ষা করিয়া দেখিব, কিসরা সংক্রান্ত তাঁহার ভবিষদ্বাণী কতটুকু সত্য।
মালিক বাযানকে তারপর আর বেশীকাল অপেক্ষা করিতে হয় নাই। ইহার কয়েক দিন পরই ইরানের শাহী কাসেদ নূতন বাদশার ফরমানসহ ইয়ামানে তাঁহার নিকট উপস্থিত হইল। নূতন বাদশাহ তাঁহার ফরমানে লিখিয়াছেন, আমি কিসরাকে হত্যা করিয়াছি। কারণ, তিনি ইরানবাসীদের প্রতি রীতিমত অবিচার ও স্বেচ্ছাচারিতা চালাইয়া গিয়াছেন। সম্ভ্রান্ত লোকদেরকে নির্বিচারে হত্যা করিয়াছেন। তাহাদের ধনসম্পদ লুট করিয়াছেন। আমার এই ফরমান পৌঁছিবামাত্র তুমি আমার আনুগত্য স্বীকার করিবে। আর যে ব্যক্তিকে গ্রেফতার করিবার জন্য কিসরা তোমাদের নির্দেশ দিয়াছিলেন পুনরাদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তুমি তাঁহাকে উত্যক্ত করিবে না। তাহার পত্রের মূল পাঠ ছিল এইরূপ:
اما بعد فانی قتلت ابی کری ولم اقتله الاغضبا لفارس لما كان استحل من قتل اشرافيهم وتهجيزهم في بعوثهم فاذ اجاك كتابي هذا فخذ لى الطاعة عن بقبلك وانظر الرجل الذي كان كسرى كتب البك فيه فلا تهجه حتى يأتيك امرى فيه. (দ্র. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১৪৬; রাসাইলুন নাবিয়্যি, পৃ. ৫৯; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬০; ইয়া'কূবী, ২খ., পৃ. ৬১)।
শাহী দূত যখন কিস্সার হত্যার ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করিল তখন কাহরামান ও খরখস্রা সমস্বরে বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! কিস্সা ঠিক ঐ রাত্রেই নিহত হইয়াছেন যে রাত্রের কথা মুসলমানদের নবী আমাদেরকে বলিয়াছিলেন।
দরবারে উপস্থিত লোকজন এই কথা শ্রবণে বিস্ময়ভিভূত হইয়া গেল যে, আজ এতদিন পর যে সংবাদটি এই দরবারে পৌঁছিল, মুসলমানদের নবী তাহা সেই রাত্রিতেই কেমন করিয়া অবহিত হইলেন! বাযান বলিলেন, নিঃসন্দেহে তিনি আল্লাহ্র রাসূল। নিশ্চয় আল্লাহ্ পক্ষ হইতেই তিনি এই সংবাদ যথাসময়ে অবগত হইয়া থাকিবেন। অতঃপর তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন: আজ হইতে আমি আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ -এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিতেছি। তাঁহার রিসালাতকে আমি স্বীকার করিয়া লইলাম। তাঁহার আনুগত্য আমি সর্বান্তকরণে বরণ করিয়া লইলাম। তারপর তিনি পারিষদবর্গকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, খুনী অত্যচারী বাদশাহদের আনুগত্যের চেয়ে আল্লাহ্র সত্য নবীর আনুগত্য করাই কি উত্তম নহে [আল-ইসাবা কাহরামান আলোচনা প্রসঙ্গে) ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ১২৭-২৮]?
ইসলাম গ্রহণের পর মালিক বাযান একজন দূত প্রেরণ করিয়া রাসূলুল্লাহ -কে তাঁহার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ অবহিত করেন এবং তাঁহার দরবারে এই মর্মে দরখাস্ত পাঠাইলেন যেন তিনি তাঁহার কোন প্রতিনিধি ইয়ামানে প্রেরণ করিয়া ইয়ামানবাসিগণের ইসলাম শিক্ষার পথ সুগম করিয়া দেন। রাসূলুল্লাহ সেমতে মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-কে পত্রসহ মালিক বাযানের নিকট তথায় প্রেরণ করেন। বায়হাকীর তারীখ গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ-এর এই পত্রের কথা উল্লিখিত হইয়াছে কিন্তু তাহার মূল পাঠ পাওয়া যায় নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শাহ হরমুযানের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র

📄 শাহ হরমুযানের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র


কিসরার নিকট প্রেরিত রাসূলুল্লাহ -এর দূত আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) যথাসময়ে মদীনায় ফিরিয়া আসিয়া যখন তাঁহার সফরবৃত্তান্ত বর্ণনা করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ -কে জানাইলেন যে, কিসরা তাঁহার পত্রখানা টুকরা টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়াছে তখন অবলীলক্রমে তাঁহার পবিত্র মুখ হইতে এই কথাটি নির্গত হইল, আল্লাহ তাহার সাম্রাজ্যকেও টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিবেন।
মাত্র কিছুদিন যাইতে না যাইতেই আরব, ইয়ামান, সিরিয়া সর্বত্রই এই সংবাদ রটিয়া গেল যে, পারস্যে বিদ্রোহ দেখা দিয়াছে। বিদ্রোহীরা খসরু পারভেযকে হত্যা করিয়া তাহার পুত্র শিরোইয়াকে সিংহাসনে বসাইয়াছে। মহানবী -কে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে কিসরা লোক প্রেরণ করিয়াছেন শুনিয়া উল্লসিত কুরায়শ মহলের হর্ষ তখন বিষাদের রূপ পরিগ্রহ করিল (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৫)।
ঐতিহাসিক খাতীবের বর্ণনা হইতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ -এর পত্র খানি ছিঁড়িয়া ফেলিলে দূত আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) তাহাকে কঠোর বাক্য শুনান। সম্ভবত তাহাতে তাহার মনে পরিবর্তন সূচিত হইয়াছিল। অতঃপর খাতীব লিখেন:
"কিসরা দেরাজ হইতে কয়েক টুকরা রেশমী বস্ত্র বাহির করিয়া তাহা রাসূলুল্লাহ -এর জন্য উপঢৌকনস্বরূপ প্রদান করেন"। ঐতিহাসিক ইয়া'কূবী বলেন:
"কিস্সা তাঁহার উদ্দেশ্যে একটি পত্র লিখেন এবং উহা দুইটি রেশমী বস্ত্রের মধ্যে স্থাপন করিয়া উহার মধ্যে কস্তুরী স্থাপন করেন। দূত যখন উহা নবী কারীম -এর নিটক হস্তান্তরিত করিল তখন তাহা খুলিয়া উহার মধ্য হইতে এক মুষ্টি কস্তুরী লইয়া উহার সুগন্ধি গ্রহণ করিলেন এবং তাঁহার সাহাবীগণকেও দান করিলেন এবং বলিলেন, ঐ রেশমে আমাদের প্রয়োজন নাই। উহা আমাদের পরিধেয় নহে” (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৩)। এই সময় রাসূলুল্লাহ আরও বলেন:
"হয় তোমরা আমার দীনে প্রবেশ করিবে, না হয় আমি ও আমার সঙ্গিগণ তোমার নিকট আসিয়া পড়িব (বিজয়ী বেশে)। আর তোমার পত্র—আমি তোমার চেয়ে উহা সমধিক অবগত, উহাতে অমুক অমুক ব্যাপার রহিয়াছে। অথচ তিনি তাহা খুলেনও নাই এবং পড়িয়াও দেখেন নাই"।
ইয়া'কূবী বলেন, তারপর দূত কিসরাকে তাহা অবহিত করিল। কিন্তু এই বর্ণনাটি এককভাবে ইয়া'কূবীরই। মুসনাদে আহমাদে, ১খ., পৃ. ৯৬ ও ১৪৫-এও কিসরার রাসূলুল্লাহ -কে
কস্তুরী ও রেশমী বস্ত্র উপঢৌকনস্বরূপ প্রেরণের কথা বর্ণিত হইয়াছে (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৩)।
খাতীব বাগদাদী পত্রের পাঠও উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। পত্রখানার বক্তব্য শ্রবণের পর ক্রুদ্ধ কিসরা কাঁচি আনাইয়া পত্রখানাকে টুকরা টুকরা করিয়া তাহা আগুনে ভস্মীভূত করেন। কিছু দিন পর অনুতপ্ত হইয়া তিনি বলেন, এইবার আমাদের উচিত হইবে (অনুতাপের নিদর্শনস্বরূপ) কিছু উপঢৌকন পাঠাইয়া দেওয়া। তারপর তিনি রেশমী বস্ত্রে পত্র ও উপঢৌকনাদি প্রেরণ করেন। কিন্তু ২২ মে ১৯৬৪ তারিখে বৈরুতের আরবী দৈনিক আল-হায়াতে এবং পরবর্তীতে করাচীর উর্দু মাসিক আল-বালাগের মে, ১৯৬৮ সংখ্যায় প্রকাশিত তথ্য হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্র কাঁচিকাটা ও ভষ্মীভূত করা সংক্রান্ত খাতীব বাগদাদীর মন্তব্য নিছক অনুমান ভিত্তিক। আসল ঘটনা হইতেছে, পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলার পর কেহ একজন চুপিসারে সকলের অলক্ষে তাহা উঠাইয়া নিয়াছিলেন-যাহার ফলে অদ্যাবধি উহা সংরক্ষিত থাকা সম্ভব হইয়াছে। অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল ধরিয়া প্যারিসে অবস্থানকারী ভারতীয় গবেষক পণ্ডিত ড. হামীদুল্লাহ (২০০২) মাজমূ'আতুল ওয়াছাইকিস সিয়াসিয়্যা লিল-আহদিন নাবাবী ওয়া'ল-খিলাফাতির রাশিদা-তে এবং খালিদ সায়্যিদ আলী, রাসাইলুন নাবিয়্যিার ইলাল-মুলুকি ওয়াল-উমারা ওয়াল-কাবাইল" গ্রন্থে লেবাননের মিঃ হেনরী ফিরআউনের সৌজন্যে প্রাপ্ত উক্ত পত্রখানির ফটোষ্টাট কপি প্রকাশ করিয়াছেন। মিসরীয় পুরাতত্ত্ববিদ ড. সালাহুদ্দীন আল-মুনাজ্জিদ পত্রটির পুরাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের পর দীর্ঘ সন্দর্ভে মন্তব্য করেন যে, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে যে, ইহাই সেই পবিত্র পত্র যাহা নবী কারীমা পারস্য সম্রাটের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ড. হামীদুল্লাহ স্বচক্ষে উহা দেখিয়াছেন (সায়্যিদ মাহবুব রিযভী, মাকতুবাতে নাবাবী, পৃ. ১৫১-১৬৫; মওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, হাদীসের তত্ত্ব ও ইতিহাস, পৃ. ৭৩-৪, ১ম সংস্করণ ১৯৬৯ খৃ.)।
শাহ হরমুযানের নামে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পত্র নবী কারীম-এর আমলে ইরানের একাংশে শাহী খান্দানের একজন শাহযাদা হরমুযানের রাজত্ব ছিল। আহওয়ায, রামহরমুয, তুসতার ও সূস ছিল তাহার শাসিত এলাকাসমূহের বিখ্যাত শহর। নবী কারীম হরমুযানকেও ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র দেন। সেই পত্রখানার বাহক কে ছিলেন তাহা ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকিলেও কিস্সা-দরবারে যিনি দৌত্যের দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন সেই আবদুল্লাহ ইব্‌ন হুযাফা আস-সাহমী (রা)-ই এই দায়িত্বও পালন করিয়াছিলেন বলিয়া অনুমতি হয়। সেই পত্রখানার পাঠ ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم
من محمد عبد الله ورسوله الى الهرمزان اني ادعوك الى الاسلام اسلم تسلم. الله رسول محمد
"বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম- আল্লাহ্র দাস ও তদীয় রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে হরমুযানের প্রতি- আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন” (সীলমোহর, মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ) (মওলানা হিফজুর রহমান, বালাগুল মুবীন, পৃ. ১৪১; মাকতুবাতে নববী, পৃ. ১৬৫)।
হরমুযান পত্রখানির কী জবাব দিয়াছিলেন বা আদৌ কোন জবাব দিয়াছিলেন কি না, তাহা অজ্ঞাত। কিন্তু সেই সময় ইসলাম গ্রহণের তাওফীক তাহার হয় নাই। পরবর্তীতে হযরত উমার ফারুক (রা)-এর খিলাফত আমলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত উমার (রা) তাঁহার জন্য বার্ষিক দুই হাজার মুদ্রার ভাতা মঞ্জুর করিয়া তাঁহাকে মদীনায় অভিবাসিতও করিয়াছিলেন (মাকতুবাতে নাবাবী, পৃ. ১৬৬; বালাগুল মুবীন, পৃ. ১৩৯-১৪৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুকাওকিসকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র প্রেরণের প্রেক্ষাপট

📄 মুকাওকিসকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র প্রেরণের প্রেক্ষাপট


হিজরী সপ্তম সাল। ৬২৮ খৃস্টাব্দের গ্রীষ্মকাল তখন সবেমাত্র শুরু হইয়াছে। মদীনার দূত হাতিব ইব্‌ন আবী বালতা'আ (রা) প্রাচীন মিসরের বাবলিয়্যূন দুর্গে প্রবেশ করিয়া রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্র কিবতী জাতির নেতা মুকাওকিসের নিকট অর্পণ করিলেন। পত্রটির মূল পাঠ ছিল এই:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد عبد الله ورسوله الى مقس عظيم القبط سلام على من اتبع الهدى اما بعد فاني ادعوك بدعاية الاسلام اسلم تسلم يؤتك اجرك مرتين فان توليت فانما عليك اثم القبط ويأهل الكتاب تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ان لا نعبد الا الله ولا نشرك به شيئا ولا يتخذ بعضنا بعضا اربابا من دون الله فان تولوا فقولوا اشهدوا بانا مسلمون.
আল্লাহ রাসূল মুহাম্মদ
"পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহর নামে। আল্লাহ্ বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হইতে কিবতী জাতির মহান নেতা মুকাওকিসের প্রতি। শান্তি বর্ষিত হউক তাহার প্রতি যে সত্য পথের অনুসারী। আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাইতেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দিবেন। পক্ষান্তরে যদি অগ্রাহ্য করেন, তাহা হইলে গোটা কিবতী জাতির পাপের বোঝা আপনার উপরই বর্তাইবে। হে কিতাবী সম্প্রদায়ের লোকজন! আইস, এমন 'একটি ব্যাপারে আমরা একমত হইয়া যাই যাহাতে আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনই পার্থক্য নাই। তাহা হইল, আমরা এক অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাহারও যেন ইবাদত না করি। কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি আর আমাদের মধ্যকার কেহ আল্লাহকে বাদ দিয়া আমাদেরই মধ্যকার কাহাকেও প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00