📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খসরু পারভেযের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রপ্রাপ্তি সংক্রান্ত বিশেষ তথ্য

📄 খসরু পারভেযের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রপ্রাপ্তি সংক্রান্ত বিশেষ তথ্য


তাহার জন্য আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের যিম্মা রহিল" (তারীখ বাগদাদ, ১খ., পৃ. ১৩২; কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ২৮৭)।
(৪) আবূ 'উবায়দ কাসিম ইবন সাল্লাম ও আলী মুত্তাকী কানযুল উম্মালের অন্যত্র লিখেন : كتب رسول الله ﷺ الى كسرى وقيصر ورالنجاشی کتابا واحدا بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى كسرى وقيصر والنجاشي اما بعد تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ان لا نعبد الا الله ولا نشرك به شيئا ولا يتخذ بعضنا بعضا اربابا من دون الله فان تولوا فقولوا اشهدوا بانا مسلمون
আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মদ
"রাসূলুলুল্লাহ কিস্সা, কায়সার এবং নাজাশীকে অভিন্ন পত্র লিখেন এইভাবে : বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ হইতে কিস্সা, কায়সার ও নাজাশীর প্রতি- অতঃপর হে কিতাবিগণ! আইস সেই কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ্ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ না করি। যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলিম" (৩ : ৬৪)।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
(আবূ 'উবায়দ, কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ২৩; কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ৩২০)। (৫) কিসরাকে লিখিত রাসূলুল্লাহ -এর পত্রের আরেকটি ভাষ্য পাওয়া যায়, যাহার পাঠ এইরূপ :
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى كسرى بن هرمزد اما بعد فاني احمد اليك الله الذي لا اله الا هو وهو الذى اوانى وكنت يتيما واغناني وكنت عائلا و هداني وكنت ضالا ولن يدع ما أرسلت به الا من قد سلب معقوله والبداء غالب عليه اما بعد يا کسری فاسلم تسلم او ائذن بحرب من الله ورسوله ولم تعجزهما والسلام محمد رسول الله. "বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ হইতে কিসরা ইবন হুরমুজদের প্রতি। অতঃপর আমি আপনার নিকট সেই আল্লাহ্র প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত অন্য কোন
ইলাহ নাই। তিনিই সেই পবিত্র সত্তা যিনি আমাকে আশ্রয় দান করিয়াছেন, অথচ আমি ছিলাম ইয়াতীম। তিনি আমাকে অভাবমুক্ত করিয়াছেন অথচ আমি ছিলাম নিঃস্ব। তিনি আমাকে পথনির্দেশ দিয়াছেন অথচ আমি ছিলাম পথ সম্পর্কে অনবহিত। আমি যাহা লইয়া প্রেরিত হইয়াছি তাহা ত্যাগ করিতে পারে না সেইসব লোক ব্যতীত যাহাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাইয়াছে, আর যাহাদের উপর বিপদ প্রবল হইয়াছে। অতঃপর, হে কিসরা, সুতরাং আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপত্তা লাভ করিবেন। নচেৎ আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করুন! আপনি তাহাদেরকে অপারগ করিতে সক্ষম হইবেন না। ওয়াস-সালাম.।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
(প্রফেসার এডওয়ার্ড ব্রাউন, লিটারেরী হিস্ট্রি অব পারসিয়া, ১খ., পৃ. ১৮৩; তারীখে আদাবে ইরান, ফার্সীতে অনূদিত, পৃ. ২৯৬; মাকাতীবুর রাসূল ১খ., পৃ. ৯৫-৯৬; আল-ইরবু ফী আখবারিল কু'র সি ওয়াল আরাব)।
রাসূলুল্লাহ-এর পত্রের বক্তব্য শ্রবণে খসরু পারভেজ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিলেন। বেপরোয়া মানসিকতাসম্পন্ন পত্রবাহকের ঔদ্ধত্য দর্শনে এমনিতেই তিনি ক্রুদ্ধ ছিলেন। কেননা কিস্সার দরবারের প্রথানুসারে তিনি তাহাকে কুর্ণিশ করেন নাই। এইবার পত্রের মর্ম শ্রবণে তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। পত্রের ভাষা ও সম্বোধন ছিল এমনি ধরনের— যেন কোন প্রতাপান্বিত শাসক তাহার কোন প্রজাকে সম্বোধন করিতেছেন। আরবদের সম্পর্কে এতকাল তাঁহার ধারণা ছিল যে, ইহারা হইতেছে একটা নিছক উপজাতি। যুদ্ধজয়ীদের পিছনে পিছনে ঘুরিয়া কিছু উচ্ছিষ্ট লাভ করিয়া বা কিছু লুটপাট করিয়া আবার তাহারা তাহাদের মরু প্রান্তরে নিরুদ্দেশ হইয়া যায়।' তাহাদের গোত্রপতিগণ সর্বদাই ইরানের শাহানশাহের ভাতাভোগী এবং অনুগ্রহ প্রার্থীরূপে চলিয়া আসিতেছে। সেই আরবদেরই অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তাঁহাকে এমনভাবে সম্বোধন করিতেছেন যেন তিনি কোন সম্রাট নহেন, তাহার পশুপালের রাখাল! শাহানশাহ পরম ক্রোধভরে গর্জিয়া উঠিলেন, কী তাহার স্পর্ধা! আমার নামের পূর্বে সে কিনা তাহার নিজের নাম লিখিয়াছে।
ঐতিহাসিকগণের সাধারণ বর্ণনা মতে, পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়। তারপর পত্রখানার কী হইল সেই সম্পর্কে তাঁহারা নীরব। তখন কে জানিত যে, কিসরার সেই জমজমাট বিলাসবহুল দরবার অচিরেই চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। যেই পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দেওয়ায় উহা বাহ্যত বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে, ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু কালের কুটিল চক্রকে ভ্রুকুটি প্রদর্শন করিয়া সুদীর্ঘ চৌদ্দ শত বৎসর পরও সেইটি উহার অস্তিত্বসহ বিরাজমান। ইতিহাসের পাতায় ইহা এক বিস্ময়কর ঘটনা হিসাবে বিদ্যমান। এই বিষয়টির বিশদ বিবরণ নিম্নরূপ:
১৩৮২/১৯৬৩ সালে (মে মাসে) বৈরূতের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ বিশ্ববাসীকে বিস্ময়াভিভূত করে। উহা দ্বারা জানা যায়, লেবাননের ভূতপূর্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরী ফেরাউনের
পৈত্রিক সংরক্ষণাগারে রাসূলুল্লাহ -এর পারস্য সম্রাটকে লিখিত পত্রখানা পাওয়া গিয়াছে। খৃস্ট ধর্মাবলম্বী হেনরী ফেরাউন উক্ত পত্রখানার যথার্থতা যাচাই করিয়া দেখার জন্য তাহা ডক্টর সালাহুদ্দীন আল-মুনাজ্জিদকে দেন।
নানাভাবে যাঁচাই করিয়া দেখিয়া উক্ত ডক্টর আল-মুনাজ্জিদ বৈরূতের দৈনিক 'আল-হায়াতে' ২২ মে, ১৯৬৩ তারিখে একটি দীর্ঘ গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। হেনরী ফেরাউন অনেক অর্থের বিনিময়েও পত্রখানার স্বত্ব বিক্রয় করিতে সম্মত হন নাই। বিখ্যাত গবেষক ডক্টর হামীদুল্লাহ্ (প্যারিস) স্বচক্ষে উক্ত পবিত্র পত্রখানা প্রত্যক্ষ করেন। ডক্টর আল-মুনাজ্জিদ-এর প্রবন্ধটির ব্যাপারে তিনি প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে তাঁহার নিজের বর্ণনাও সংযোজিত করেন। ১৯৬৪ সালের মে মাসের সংখ্যা উর্দু মাসিক আল-বালাগ (করাচী)-এ তাঁহার বর্ণনাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হইয়াছে। উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহের দ্বারা নিঃসন্দেহে প্রতীয়মান হয় যে, কথিত পত্রখানা সত্য সত্যই খসরূ পারভেযকে লিখিত রাসূলুল্লাহ -এর আসল পত্র। আরবী দৈনিক আল-হায়াতের প্রথম পৃষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত প্রকাশিত উক্ত গবেষণা প্রবন্ধে ড. আল-মুনাজ্জিদ লিখেন :
গত বৎসর (১৯৬২ খৃ.) নভেম্বর মাসের শেষদিকে হেনরী ফেরাউন আমার নিকট একটি চর্মখণ্ড প্রেরণ করেন। তাহাতে কৃষ্ণী লিপির মত হরফে একটি লিপি উৎকীর্ণ ছিল। উক্ত চর্ম খণ্ডটির হেফাযতের উদ্দেশ্যে তাহার নীচে সবুজ বর্ণের কাপড় সাঁটিয়া দিয়া তাহা একটি ফ্রেমের মধ্যে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই বস্ত্রখণ্ডটি পঁচিয়া গিয়াছিল। কেবল ফ্রেমের সাহায্যেই চর্মখণ্ডটি নিজ অস্তিত্ব রক্ষা করিয়া চলিয়াছিল। যখন আমি গভীর মনোনিবেশ সহকারে উহার পাঠোদ্ধারে মনোযোগী হইলাম তখন আমার নিকট এই রহস্য উন্মোচিত হইল যে, আসলে ইহাই রাসূলুল্লাহ -এর সেই মুবারক পত্র যাহা তিনি পারস্য সম্রাট খসরূ পারভেযের নামে প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং যাহার মাধ্যমে তিনি তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলেন।
আমার জীবনে ইহা ছিল পরম সৌভাগ্যক্ষণ, যখন আমি রাসূলুল্লাহ -এর ঐ মুবারক পত্রখানা পাঠ করিলাম। এই পত্রখানার হরফ ও শব্দমালার গবেষণায় আমি গত কয়েক মাস অতিবাহিত করিয়াছি। আমি এই সংক্রান্ত ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থের মৌলিক গ্রন্থাদি পাঠ করিয়া পূর্ণ নিশ্চিত হইয়া আমার গবেষণাপ্রসূত প্রবন্ধটি প্রকাশ করিতে পারিয়া আনন্দবোধ করিতেছি। হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ আরব উপদ্বীপের রাজা-বাদশাহগণ এবং পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের শাসকদের নিকট ইসলামের দাওয়াতসম্বলিত পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রগুলির একটি ছিল পারস্য সম্রাট খসরূ পারভেযের নিকট, যাহার অধীনে ছিল ইরাক ও ইরান। উল্লেখ্য যে, আরবগণ সেইসব বস্তুর উপরই লিখিত যাহা সেই যুগে পাওয়া যাইত। যেমন হাড়, পাথর, খেজুরপাতা ও চর্ম। চর্মে লিখার প্রচলনই ছিল বেশী। উট ও হরিণের চর্মকে যতদূর সম্ভব পাতলা করিয়া তাহাতে লিখা হইত। লিখার এই চর্মকে তাহাদের পরিভাষায় বলা হইত রাক্ক। ইংরেজীতে ইহাকে Parchment বলা হইয়া থাকে। কাগজ আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে এই রাক্ক-চর্মেই লিখার প্রচলন ছিল এবং উহা অত্যন্ত মূল্যবান বলিয়া বিবেচিত হইত। তাওরাত-ইনজীল কিতাবাদি এই রাক্ক নামক বিশেষ ধরনের পাতলা চর্মেই লিখিত হইত। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণকে পত্র লিখার সময় এই রাক্ক ব্যবহারের প্রচলন ছিল। রাসূলুল্লাহ রাজা-বাদশাহগণের নিকট পত্র লিখিতে এই রাক্কই ব্যবহার করিয়াছিলেন। কুরআন শরীফের সূরা আত-তূর-এ রাক্ক শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অনুরূপভাবে বুসরার শাসকও রোম সম্রাটের নিকট প্রেরিত নবী কারীম-এর দূতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাহাকে সম্রাটের সহিত সাক্ষাতের সুযোগ করিয়া দেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পারস্যের রাজদরবারে মহানবী (সা)-এর দূতের ভাষণ

📄 পারস্যের রাজদরবারে মহানবী (সা)-এর দূতের ভাষণ


ইরানে মজুসী ধর্ম তথা অগ্নিপূজার প্রচলন ছিল। ইহা ছিল আরবদের আকীদা-বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। এইজন্য তাহাদের বিস্ময়ের সীমা রহিল না যে, আরবগণ তাহাদের নিকট এমন এক পত্র প্রেরণ করিয়াছে যাহাতে অন্য ধর্ম গ্রহণের দাওয়াত রহিয়াছে এবং তাহা অগ্রাহ্য করিলে শাস্তির সতর্কবাণীও উচ্চারিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ পারস্যের যে কিস্সার নিকট পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন, পারস্য-সম্রাটগণের মধ্যে সে-ই ছিল অত্যন্ত প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী সম্রাট। ইরান, ইরাক, বাহরায়ন ও ইয়ামান পর্যন্ত তাহার রাজত্ব প্রসারিত ছিল।
রাসূলুল্লাহ -এর দূত যখন ইসলামের দাওয়াতসম্বলিত পত্র লইয়া তাহার দরবারে উপস্থিত হইলেন তখন তিনি তাহা পাঠ করিয়া শুনানোর এবং সাথে সাথে তাহার অনুবাদ করার আদেশ দেন। পত্রখানা পড়িয়া শুনান শুরু হইল, কিন্তু তাহা পাঠ শেষ না হইতেই সে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়া তাহা ছিঁড়িয়া ফেলিল এবং সম্রাটসুলভ জোশে গর্জিয়া উঠিল, ঐ ব্যক্তিটি আমাকে এহেন পত্র লিখিয়াছে অথচ সেও আমার গোলাম বৈ নহে!
কিস্সা পত্রের ধরনই নিজের মর্যাদার পরিপন্থী বলিয়া ধারণা করে। সে লক্ষ্য করিল যে, তাহাতে লিখিত রহিয়াছে: মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে কিসরার প্রতি। মুহাম্মাদ তাঁহার নিজস্ব নাম দিয়া পত্র শুরু করিয়াছেন, তাহার ভ্রান্ত ধারণামতে ইহা ছিল তাহার একটি অবমাননা। দ্বিতীয়ত, প্রেরক ও প্রাপক উভয়ের নাম একই ছত্রে একই মর্যাদায় রাখা হইয়াছে। কিসরার ধারণামতে, মনিব ও গোলামের এই সমতা ছিল রীতিমত অবমাননাকর।
রাসূলুল্লাহ -এর কিসরাকে লিখিত পত্রের দূত ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা)। ইতোপূর্বে তিনি বহুবার ইরান সফর করিয়াছেন। তাঁহার এই পূর্ব-অভিজ্ঞতার জন্য রাসূলুল্লাহ তাঁহাকেই ইরানের দৌত্যকর্মের জন্য মনোনীত করিয়াছিলেন। পত্রখানা পাঠ সমাপ্ত না হইতেই কিসরা পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। ইরানে হুযাফা সেই দৃশ্য অবলোকন করিয়া নবী (স) দরবারে ফিরিয়া আসেন এবং তাঁহাকে কিসরার অবমাননাকর আচরণ সম্পর্কে অবহিত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: আল্লাহ তাহার রাজত্ব ধ্বংস করুন! সত্য সত্যই তাহাই হইয়াছিল। এই ঘটনার পর একটি মাস অতিক্রান্ত না হইতেই খসরু পারভেযের পুত্র শাহরিয়া তাহাকে হত্যা করে। ইহাতে ঐ সাম্রাজ্যের পতনের সূত্রপাত হয়।
রাসূলুল্লাহ -এর পত্রের ব্যাপারে কিসরার আচরণকে বলা হইয়াছে মাস্ক (مزق), কেহ কেহ ইহাকে শাক্ক (شق)-ও বলিয়াছেন। কিন্তু আরবী ঐ শব্দ দুইটি اناء (নিশ্চিহ্ন ও অস্তিত্বহীন করিয়া দেওয়ার) অর্থ বহন করে না। রাসূলুল্লাহ -এর পত্রখানা লিখিত ছিল চর্মগাত্রে। চর্ম একটি বেশ শক্ত বস্তু, তাই তাহা ছিড়িয়া ফেলিয়া দিলেও একেবারে নিশ্চিহ্ন হইয়া যাওয়ার মত নহে। হাঁ, যদি তাহার উপর পানি ঢালিয়া দেওয়া হইত, তাহা হইলে হয়ত হরফগুলি মিটাইয়া ফেলা সম্ভব হইত। তাহা ছিল চর্মের উপর এবং তাহাও উত্তম চর্মের উপর। তাই যতদূর মনে হয়, কিস্সা যখন তাহা ছিঁড়িয়া তাচ্ছিল্যভরে ফেলিয়া দেয়, তখন তাহা উঠাইয়া আনিয়া ইবন হুযাফা (রা) রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে পুনরায় পেশ করিয়াছিলেন। পত্রবাহক যদি তাহা তথায় রাখিয়াই আসিতেন এবং কিস্সা বা তাহার লোকজন তাহা রাখিয়া দিত তাহা হইলে প্রাচীন ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে তাহা উল্লিখিত থাকিত। যেমনটি নাজাশী, মুকাওকিস ও হিরাক্লিয়াসের নিকটে লিখিত পত্রসমূহের ব্যাপারে উল্লিখিত হইয়াছে যে, তাঁহারা সেই পত্রগুলি নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করেন।
রাসূলুল্লাহ-এর লিখিত পত্রগুলি সম্পর্কে ইতিহাস গ্রন্থ ও অলংকারশাস্ত্র গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে। এইসব গ্রন্থে এই পত্রখানিরও উল্লেখ রহিয়াছে। উহাতে সামান্য কিছু শব্দের ব্যবহারের ঈষৎ পার্থক্য ছাড়া সব পত্রই প্রায় এক রকম। তাবারীর ইতিহাসগ্রন্থ হইতে উল্লিখিত পত্রের কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হইল। ইতিহাস পাঠে কয়েকটি ব্যাপার সম্মুখে আসে :
(১) রাসূলুল্লাহ তাঁহার একজন দূত কিসরার দরবারে প্রেরণ করিয়াছিলেন।
(২) ঐ দূত ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমী (রা)।
(৩) আবদুল্লাহ ইব্‌ন হুযাফা (রা) যখন রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা কিসরার কাছে হস্তান্তর করিলেন, তখন তাহা তাহার নিকট অসহনীয় লাগিল এবং সে এমন ক্রুদ্ধ হয় যে, দোভাষীকে উহার পাঠ সম্পন্ন করিতেও দেয় নাই।
(৪) রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানার পাঠ অত্যন্ত মশহুর ছিল। মৌলিক গ্রন্থসমূহে তাহা সুসংরক্ষিত রহিয়াছে। অলংকার শাস্ত্রের অনেক লেখকও বিভিন্ন বিষয়ে প্রকৃষ্ট নমুনাস্বরূপ তাহা পেশ করিয়াছেন।
হেনরী ফেরাউন প্রেরিত পত্রখানার বৈশিষ্ট্যসমূহের ব্যাপারে গভীরভাবে মনোনিবেশ করিলে আমরা সুস্পষ্টরূপে বুঝিতে পারি যে, তাহা রাসূলুল্লাহ-এর পত্রই। ইহার বৈশিষ্ট্যসমূহ হইতেছে :
(১) এই উত্তম রাক্ক বা চর্মগাত্রে লিখিত। ইহা অনেকটা খাকী রঙের এবং ইহার প্রান্তভাগ কিছুটা কৃষ্ণাভ।
(২) ইহার আকৃতি অনেকটা আয়তাকার অর্থাৎ ইহা ছিল অনেকটা দীর্ঘাকৃতির। ইহার প্রান্তভাগ অসম। নীচের অংশ উপরের অংশের চেয়ে কম চওড়া। ইহার দৈর্ঘ্য ২৮ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ২১/২.১ সেন্টিমিটার।
(৩) ইহাতে পনেরটি ছত্র রহিয়াছে। সবগুলি ছত্রের দৈর্ঘ্য সমান নহে।
(৪) ছত্রগুলি যেইখানে শেষ হইয়াছে তাহারই নীচে একটি গোলাকৃতি সীলমোহরের চিহ্ন রহিয়াছে।
(৫) পত্রখানাদৃষ্টে ধারণা করা হয় যে, উপর দিক হইতে নিচের দিকে পানি বহাইয়া দেওয়া হইয়াছে-যাহার দরুন কোন কোন হরফ মুছিয়া গিয়াছে, আবার কোন কোনটি আবছা হইয়া গিয়াছে। ইহার সীলমোহরও একেবারে মুছিয়া গিয়াছে,, তবে ইহার মধ্যবর্তী স্থানে একটি 'রা' (ر) অবশিষ্ট রহিয়া গিয়াছে। সম্ভবত ইহাই রাসূল' শব্দের 'রা' বর্ণ হইবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সীলমোহরের মধ্যে সর্ব নীচের ছত্রে মুহাম্মাদ, মধ্যবর্তী লাইনে রাসূল এবং সর্বউপরের ছত্রে আল্লাহ শব্দটি অঙ্কিত ছিল।
(৬) এই পত্রের ডানদিকের তৃতীয় ছত্রের শুরু হইতে ছত্রের মধ্য পর্যন্ত ছেঁড়া। অতঃপর প্রন্থের দিকে আর ছেড়াঁ নাই, কিন্তু দৈর্ঘ্যের দিকে দশম ছত্র পর্যন্ত তাহা ছেঁড়ার দাগ রহিয়াছে।
(৭) পত্রের এই ছেঁড়াকে অত্যন্ত পাতলা চামড়া দ্বারা সেলাই করিয়া মেরামত করা হইয়াছে। কিন্তু ঐ নূতন সংযোজিত চর্ম রাক্ক-এর মত মূল্যবান ও টেকসই নহে, বরং মামুলী চামড়া। মূল পত্রে ব্যবহৃত চর্মের তুলনায় পরবর্তীতে সংযোজিত এই চর্মের বয়স যে কম তাহাও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
(৮) পত্রের লিখন পদ্ধতি হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তাহা একান্তই প্রাথমিক ও অনুন্নত লিখন পদ্ধতির যুগে লিখিত। এইজন্য তাহাতে কোন শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য বা বিন্যাস পরিলক্ষিত হয় না। ছত্রগুলি সোজা নহে। উপরন্তু উহার লিখন পদ্ধতি সেই যুগটিকেও চিহ্নিত করার জন্য সহায়ক।
ইহার কোন কোন ছত্রের শেষে লক্ষ্য করা যায়, একটি শব্দ হয়ত ঐ ছত্রে শুরু হইয়াছে, শব্দটির অপূর্ণ অংশ পরবর্তী ছত্রে লিখিয়া সম্পূর্ণ করা হইয়াছে। ঐ যুগের লিপিমালায় কোন নুকতা ব্যবহৃত হইত না। উক্ত পত্রখানাতেও কোন নুক্তা ও স্বরচিহ্ন ব্যবহৃত হয় নাই। ইহার পাঠ (Text) এবং ছত্রসমূহ ছিল :
(১) বিসমিল্লাহির রাহমানি (২) আর-রাহীম মিন মুহাম্মাদিন আবদিল্লাহি ওয়া (৩) রাসূলিহী ইলা কিসরা আযীমি ফা (৪) রিসি সালামুন আলা মানিত্ততাবা'আল হুদ (৫) (1) ওয়া আমানা বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি ওয়া (৬) শাহিদা আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া (৭) হ্দাহু লা-শারীকা লাহু ওয়া মুহাম্মাদ (আলিফ বা '। ন' অংশটি নাই) (৮) আবদুহু ও রাসূলুহু আদ্‌ 'উকা (৯) বি-দি 'আয়াতিল্লাহি ফা-ইন্নানী আনা রাসূ (১০) লু ল্লাহি' আলান না-সি কাফফাতান (১১) লি-উনযিরা মান কানা হাইআন ওয়া ইয়ূহিক্কা (১২) আল-কাওলু ইলাল কাফিরীন আ (১৩) স্লিম্ তাস্লিম ফাইন আবায়তা ফাই (১৪) ন্নামা 'আলায়কা ইছমুল মাজু (১৫) সি,
এইখানে সীলমোহর অঙ্কিত- যাহার মধ্যের ছত্রের 'রা' (১) বর্ণটি শুধু রহিয়াছে।
হেনরি ফেরাউনের নিকট রক্ষিত উক্ত প্রাচীন দলীলকে যখন আমরা সেইসব প্রাচীন ইসলামী কিতাবসমূহে উল্লিখিত পত্রের সহিত মিলাইয়া দেখি, তখন আমরা তাহাতে মিল দেখিতে পাই। মামুলী কিছু তফাৎ অবশ্য তাহাতে দৃষ্ট হয় যাহা ধর্তব্য নয়।
(১) উক্ত দলীলে 'মিন মুহাম্মাদিন আবদিল্লাহি ওয়া রাসূলিহী' রহিয়াছে আর কিতাবসমূহের বর্ণনায় শুধু রাসূলিল্লাহ রহিয়াছে (আবদিল্লাহ নাই)। কিন্তু রাসূলুল্লাহ -এর হিরাক্লিয়াস ও মুকাওকিসকে লিখিত পত্রদ্বয়ে এইরূপই রহিয়াছে যাহাতে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত দলীলখানার শব্দগুলিই যথার্থ।
(২) উক্ত দলীলে 'বি-দিয়াতিল্লাহ' আর কিতাবসমূহে 'বি-দু'আইল্লাহি রহিয়াছে। কিন্তু উক্ত দলীলের শব্দই বিশুদ্ধতর মনে হয়; কেননা আবূ নুআয়ম ইসফাহানীতে এরূপই হুবহু রহিয়াছে।
(৩) উক্ত দলীলে এবং কিতাবসমূহের বর্ণনায় 'ফাইন আবায়তা' শব্দ রহিয়াছে। কেবল ইবন কাছীরের বর্ণনায় শব্দটি ফাইন তাওয়াল্লায়তা' রহিয়াছে। যেহেতু উভয় শব্দই সমার্থবোধক তাই এই ব্যাপারে আর বেশী কিছু বলার প্রয়োজন হয়ত নাই।
(৪) উক্ত দলীলে 'ফাইন্নামা আলায়কা ইছমুল মাজুস' রহিয়াছে, আর কিতাবসমূহে রহিয়াছে 'ফাইন্না ইছমাল মাজুসে 'আলায়কা'। দলীলের মতনে ইন্না শব্দের সাথে 'মা' যুক্ত রহিয়াছে এবং তাহার পূর্বে আলায়কা রহিয়াছে। ইহা কুরআন শরীফের শব্দ প্রয়োগ পদ্ধতির সহিত অধিকতর সামঞ্জস্যশীল। যেমন কুরআন শরীফে রহিয়াছে, ফাইন তাওয়াল্লাও ফাইন্নামা আলায়কাল বালাগুল মুবীন (১৬:৮২)।
এই সামান্য শাব্দিক পার্থক্যে অর্থগত কোন তফাৎ হয় না। শব্দের গরমিল হওয়ার কারণ হয়ত এই যে, সেইসব কিতাবের লেখক-সংকলকগণ যাহাদের কিতাব হইতে এই পাঠ গ্রহণ করিয়াছেন মানুষ হিসাবে তাঁহাদের কিছু স্মৃতি বিভ্রম হইতে পারে।
উক্ত পত্রখানার লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যায়। উল্লেখ থাকে যে, আরবী লিপি শনাক্ত করিবার বিদ্যাটি একটি আধুনিক বিজ্ঞান। ডঃ আল-মুনাজ্জিদের এই পত্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলি নিম্নরূপ:
(১) ইহা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হইয়াছে যে, প্রাক-ইসলামী যুগের এবং ইসলামের আবির্ভাব-উত্তর যুগের আরবী হিজাযী বর্ণমালা হইতেছে নাবাতী বর্ণমালার সর্বশেষ রূপ (বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত-সম্পাদনা পরিষদ)।
(২) ইসলামের আবির্ভাবকালে হিজাযের বর্ণমালা কুফী বর্ণমালা ছিল না। কেননা কুফী বর্ণমালা কূফার সহিত সম্পৃক্ত আর কূফার উদ্ভব হইয়াছে ১৬ হি. সনে। তাহার পরই কুফী বর্ণমালার উদ্ভব হইয়াছে।
(৩) আরবরা জাহিলী যুগে এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইহাকে মক্কী লিপিমালা বলিয়া অভিহিত করিত। কিন্তু হিজরতের পর যখন ইসলামী রাষ্ট্র মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হইল, তখন মাদানী লিপিমালার প্রভাব বৃদ্ধি পায়। বিষয়টি অনিশ্চিত, মক্কী বর্ণমালা নামে কোন বর্ণ ছিল বলিয়া তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
(৪) মাদানী লিপিমালার আয়ুষ্কাল খুব দীর্ঘ নহে। হযরত উছমান (রা)-এর খিলাফাত আমলের শেষ পর্যন্ত ইহার অস্তিত্ব টিকিয়া রহিয়াছিল। তারপর হযরত আলী (রা)-এর খিলাফাত আমলে যখন কৃষ্ণা রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হইল এবং উমায়্যা শাসকগণও ইহার উন্নতির বিধান করিলেন, তখন কুফী বর্ণমালা আসিয়া ইহার স্থান দখল করিয়া নেয় এবং সর্বত্র তাহা প্রচলিত হইয়া যায় (মাদানী বর্ণমালা নামে কিছু তথ্য পাওয়া যায় না-স. প.)।
(৫) উক্ত পত্র রাসূলুল্লাহ -এর যুগের দলীলরূপে স্বীকার করিলে ইহার পরিচয়ের প্রমাণের জন্য ঐ দলীলকে সেই লিপিসমূহের সহিত তুলনা করিয়া দেখিতে হইবে, যেইগুলি প্রাক-ইসলামী যুগে, ইসলামের প্রথম যুগে এবং নবী কারীম -এর যুগে লিখিত হইয়া আমাদের যুগ পর্যন্ত টিকিয়া রহিয়াছে।
(৬) আমরা যখন অন্যান্য প্রাপ্ত লিপিমালার সহিত উক্ত দলীলের লিপিকে মিলাইয়া দেখি, কখনও মনে হয় তাহা যেন হুবহু ঐ লিপি, আবার কখনও তাহাতে সামান্য ফারাক দেখা যায় যাহা যুগের বিবর্তনের ফলে হইয়া থাকিবে।
(৭) আমরা মদীনার নিকটবর্তী সালাআ পর্বত গাত্রে ইসলামের প্রথম যুগের লিপি উৎকীর্ণ দেখিতে পাই। তাহাতে আবূ বাক্স (রা), উমার (রা) ও আলী (রা)-এর নামসমূহ উৎকীর্ণ
রহিয়াছে। ইহার লিখনকাল হইতেছে ৪/৬২৬ সাল। সালাআ পর্বতের উক্ত ফলকের সহিত আমাদের আলোচিত দলীলের লিপিমালার হুবহু মিল রহিয়াছে।
(৮) ২২ হিজরীতে লিখিত একটি লিপিও আমাদের হস্তগত হইয়াছে। উহা হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর অধীনস্ত কোন সিপাহসালারের পত্র যাহা আরবী ও হিব্রু উভয় ভাষায়ই লিখিত। আমরা লিপির সহিত উক্ত দলীলকে মিলাইয়া দেখিলে তাহাতে বর্ণগুলির অবয়বের মিল দেখিতে পাই। অবশ্য ২২ হিজরীতে লিখিত লিপিটি কিছুটা উন্নত। সময়ের বিবর্তনের সহিত তাল মিলাইয়া অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এই অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে।
(৯) আমাদের নিকট একটি সমাধিতে উৎকীর্ণ লিপিও রহিয়াছে যাহা ৩১ হিজরীতে মিসরে আবদুর রাহমান ইবন্ন খায়রের শিলালিপিরূপে উৎকীর্ণ করা হইয়াছিল। দস্তাবেযের সহিত উহা মিলাইয়া কোন কোন হরফের মধ্যে বিস্ময়কর মিল খুঁজিয়া পাই।
আমরা এমনও করিয়াছি যে, একটি ছক আঁকিয়া তাহাতে এই যাবৎ প্রাপ্ত লিপিসমূহের হরফগুলিকে সাজাই। অতঃপর ইহার পাশাপাশি আরেকটি ছকে উক্ত রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রের হরফগুলিকে সাজাইলাম। এইরূপ নিরীক্ষার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, দস্তাবেযের বর্ণমালা একান্তই প্রাথমিক পর্যায়ের। ইহাতে কোন পরিপাট্য নাই এবং তাহা হইতেছে খৃস্টীয় সপ্তম শতকে হিজাযে যেই লিপিমালা প্রচলিত ছিল তাহাই, আর ইহাই রাসূলুল্লাহ -এর যামানা ছিল।
(১১) হিজরতকাল হইতে 'উছমান (রা)-এর খিলাফত আমলের শেষ পর্যন্ত সময়ের পরই কৃষ্ণী লিপির প্রচলন সূচিত হয়। ইহার প্রমাণ হইতেছে তাইফের সেই লিপি যাহা হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর আদেশে লিখিত হইয়াছিল। আর উহা হইতেছে ৫৭ হিজরী সালের ঘটনা। উপরিউক্ত দলীল-প্রমাণের দ্বারা ইহাই নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, আমাদের আলোচ্য দস্তাবেযের লিখন কার্য হিজরী ৭ম হইতে ৩৫ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে সম্পন্ন হইয়া থাকিবে।
(১২) যেহেতু ৭ম হইতে ৩৫ হিজরী সালের মধ্যে রাসূলুল্লাহ -এর কোন জীবনী লিখিত হয় নাই যে, কেহ রাসূলুল্লাহ -এর উক্ত পত্রের একটা কপি জীবনী রচনার উদেশ্যে নকল করিয়া রাখিয়াছেন বলিয়া সন্দেহ করা হইবে। তাই আমরা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি যে, ইহাই রাসূলুল্লাহ -এর সেই পত্র যাহা তিনি কিসরার প্রতি প্রেরণ করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ -এর উক্ত পত্রখানার আলোকচিত্র সম্মুখে রহিয়াছে। রাক্ক চর্মপত্রের ছেঁড়া ও সেলাই দ্বারা উহার মেরামতও লক্ষণীয়। কিস্সা পত্রখানার প্রথম বাক্যটি শুনিয়াই প্রথমে রাসূলুল্লাহ -এর নাম, তাহারপর কিস্সার নাম সহ্য করিতে পারে নাই। সে ইহাকে তাহার জন্য অবমাননাকর মনে করিয়া পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলে। যতদূর মনে হয়, তাহার দরবারের কোন লোক উহা উঠাইয়া নিয়া সংরক্ষণ করে অথবা স্বয়ং দূত আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) চুপিসারে তাহা উঠাইয়া নিজের কাছে রাখেন যাহাতে তাহা কাহারও পদতলে না পড়ে। এমনও হইতে পারে, আবদুল্লাহ মুখে এই অপ্রীতিকর সংবাদটি দেওয়া অপেক্ষা উক্ত জীর্ণদশাগ্রস্ত পত্রখানাই কিসরার জবাবরূপে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট পেশ করিয়া থাকিবেন। রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি সাহাবীগণের যেইরূপ ভক্তি ও ভালবাসা ছিল তাহাতে এইরূপ করাটা আদৌ বিচিত্র নহে (দ্র. মাকতুবাতে নাবাবী, পৃ.

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (সা)-কে গ্রেফতারের জন্য বাযানের লোক প্রেরণ

📄 মহানবী (সা)-কে গ্রেফতারের জন্য বাযানের লোক প্রেরণ


জনৈক বাংলাদেশী রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে লিখিত নবী কারীম -এর মূল পত্রের আলোকচিত্র সংগ্রহ করিয়াছেন। মহানবী স্বরণিকার ১৪১৯/১৯৯৯-২০০০ সালে প্রকাশিত "রাসূলুল্লাহ্র পত্রাবলী সন্ধিচুক্তি ও ফরমানসমূহ"-এর দ্বিতীয় সংস্করণে "পত্রগুলির প্রামাণ্যতা" শীর্ষক আলোচনায় বুখারী শরীফের ভাষ্যকার আল্লামা কাস্তাল্লানীর বরাতে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মালিক মানসূর কাল্লাদুন সালিহী ৬১২/১২৮৩ সনে স্পেন-সম্রাট আল-ফনসোর নিকট দূত প্রেরণ করিলে উক্ত সম্রাট দূত সায়ফুদ্দীন কুলায়জকে স্বর্ণের কৌটায় সংরক্ষিত একখানা পত্র দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, এই পত্রখানা তাঁহার পূর্বপুরুষ রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে রাসূলুল্লাহ লিখিয়াছিলেন। আমরা আরও উল্লেখ করিয়াছিলাম যে, জর্দানের বাদশাহ হুসায়নের পিতামহ এবং মক্কায় শরীফ হুসায়নের পুত্র 'আবদুল্লাহ স্পেন হইতে মক্কায় আগত জনৈক ব্যক্তির মাধ্যমে এই মহামূল্যবান পত্রখানা হস্তগত করিলে তাহা তাঁহার এক রাণীর হাতে চলিয়া যায়। অর্থের বিনিময়ে রাণী তাহা হস্তান্তরে সম্মত হইলে আবূ জাবীর শাসক শায়খ যায়দ ইব্‌ন সুলতান আন-নাহিয়ান দশ লক্ষ পাউন্ডের বিনিময়ে তাহা ক্রয় করিয়া আবুজাবীর ইসলামী মিউজিয়ামে সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। চর্মগাত্রে লিখিত উক্ত পত্রখানা ছিল ৮ ছত্রের। সুলতানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মিসরীয় গবেষক ডক্টর ইযযুদ্দীন ইবরাহীম পত্রখানার বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করিয়া নিশ্চিত হন যে, উহা হিরাক্লিয়াসকে লিখিত রাসূলুল্লাহ -এর পত্র [দ্র. রাসূলুল্লাহর পত্রাবলী, ২য় সংস্করণ, পৃ. ২১)।
পারস্যের রাজদরবারে মহানবী -এর দূতের ভাষণ পত্রখানা হস্তান্তরকালে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন হুযাফা (রা) আল্লাহর একত্ব ও মাহাত্ম সম্পর্কে একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিয়াছিলেন। কিসরার দরবারে তাহার সেই ভাষণটি ছিল নিম্নরূপ:
يا معشر القرس انكم عشتم باحلامكم لعدة ايامكم بغير نبى ولا كتاب ولا تملك من الارض الا ما في يديك ولا تملك منها اكثر وقد ملك قبلك ملوك اهل دنيا واهل اخرة فأخذ اهل الآخرة بحظهم من الدنيا وضيع اهل الدنيا خطهم من الآخرة فاختلفوا في سعى الدنيا واستووا في عدل الآخرة ولقد صغر هذا الامر انا اتيناك به وقد والله جائك من حيث خفت وما تصغيرك اياه بالذي يدفعه عنك ولا تكذبيك به بالذي بخرجك منه وفى وقعة فى تار على ذلك دليل. "হে পারস্যবাসিগণ! সুদীর্ঘ কাল ধরিয়া আপনাদের জীবন এমনভাবে অতিবাহিত হইয়াছে যে, আপনাদের নিকট কোন নবী বা কিতাব আসে নাই।"
আপনাদের যে রাজত্বের জন্য আপনারা আজ গর্বিত, আল্লাহ্র জমীন তাহার তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশী বিস্তৃত। আপনাদের সাম্রাজ্যের চেয়ে অনেক বড় বড় সাম্রাজ্য তাঁহাতে রহিয়াছে। অতীতেও এইরূপ অনেক সাম্রাজ্য বিদ্যামান ছিল। হে সম্রাট! আপনার পূর্বে অনেক রাজ-রাজড়া ও সম্রাট নৃপতি অতীত হইয়াছেন। তাঁহাদের মধ্যকার যাহারা পরকালকে তাঁহাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করিয়াছিলেন তাঁহারা পার্থিব জগতে তাঁহাদের জন্য নির্ধারিত ভোগ্যবস্তুসমূহ সফলভাবে ভোগ করিয়া সফলভাবে এই পৃথিবী হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন, আর যাহারা এই পার্থিব
জীবনের সুখভোগকেই তাহাদের চরম লক্ষ্যে পরিণত করিয়াছে, তাহারা তাহাদের পারলৌকিক কল্যাণ বিনষ্ট করিয়া ফেলিয়াছে। পার্থিব অর্জনের জন্য সকলেই কর্মরত এবং এই ব্যাপারে তাহারা বিভিন্নরূপ চিন্তাভাবনার অধিকারী, কিন্তু আখিরাতের ইনসাফের ক্ষেত্রে সকলেই এক ও অভিন্ন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমি যাঁহার বার্তা লইয়া আপনার নিকট আগমন করিয়াছি আপনি তাঁহার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করিলেন, অথচ আপনি সম্যক অবগত যে, এমন এক সত্তার নিকট হইতে ইহা আসিয়াছে যাহার আতঙ্ক আপনার অন্তরে বিদ্যমান রহিয়াছে। স্মরণ রাখিবেন, সত্যের এই আওয়াজ আপনার তাচ্ছিল্য প্রদর্শনে অবদমিত হইবার নহে। আর আপনার মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য আপনি তাঁহার কবল হইতে নিষ্কৃতি পাইবেন না। যু-কারের ঘটনাটি তাহার উজ্জ্বল প্রমাণ" (আর-রাওদুল উনুফ, ৪খ., পৃ. ৬৭-৮)।
প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য, কৃষ্ণার নিকটবর্তী যু-কার নামক জলাশয়ের নিকট— সিরীয় আরবদের নিকট পারস্য সম্রাটের বিশাল বাহিনী যুদ্ধে নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছিল— যাহাতে বেদুইন যাযাবর বলিয়া উল্লেখিত আরবদের সামরিক প্রতিভার অভিব্যক্তি ঘটিয়াছিল (আল-মুন্দি ফিল আ'লাম, পৃ. ২৯৯; বিশ্বনবীর রাজনৈতিক জীবন, পৃ. ২২৫-৬)।
আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) তাঁহার ভাষণে সেদিকেই ইঙ্গিত করেন, খুসরাও পারভেজ তো শুরু হইতেই ক্রুদ্ধ হইয়া রহিয়াছিলেন। আবদুল্লাহ ইবন হুযাফার সাহসিকতাপূর্ণ ভাষণ শ্রবণের পর তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। রাগে ক্ষোভে অপমাণে তিনি রাসূলুল্লাহ্ -এর পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিলেন। দূতকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, কী মজার কথা! আরবদেরকে পদদলিত করার ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র শঙ্কা নাই হে ! কাহারও কোন সাহায্য গ্রহণ ব্যতিরেকে অনায়াসেই আমি এই দেশটি দখল করিয়া লইতে পারি! তোমার কি জানা নাই যে, ফিরাউন কীভাবে বনূ ইসরাঈল জাতিকে পদদলিত করিয়াছিল? তোমাদের অবস্থা কোনক্রমেই বনূ ইসরাঈলের তুলনায় উন্নততর নহে। পক্ষান্তরে আমার ক্ষমতা ফিরাউনের তুলনায় অনেক গুণ বেশী। এমতাবস্থায় আমি যে তোমাদের উপর জয়লাভ করিয়া সহজেই তোমদেরকে দাস জাতিতে পরিণত করিতে পারি সেই ব্যাপারে কি তোমার কোন সন্দেহ আছে? তোমাদের এমন কী শক্তি আছে যে, আমাকে প্রতিরোধ করিবে?
বাকী রহিল আমার রাজত্ব ও সাম্রাজ্যের কথা। ইহার প্রতি কুকুরের মত তোমাদের লোলুপ দৃষ্টি ও উদ্যত দাঁত যে বসাইয়া রাখিয়াছ সেই সম্পর্কে আমি সম্যক সচেতন রহিয়াছি। তোমরা তাহা উদরস্থ করিতে এবং তাহার দ্বারা তোমাদের চক্ষু জুড়াইতে অভিলাষী। আর যূ-কারের যে ঘটনার কথা তুমি উল্লেখ করিয়াছ তাহা ছিল সিরিয়ার ঘটনা। ভুলিয়া যাইও না, ইহা সিরিয়া নহে— পারস্য।
তারপর দূতের প্রতি কটমট করিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিবাণ নিক্ষেপ করিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কী হে! আমার দরবারে প্রবেশকালে কুর্ণিশ কর নাই কেন? জবাবে দূত বলিলেন, আমরা মুসলমান। মুসলমান এক মহান আল্লাহ্ ছাড়া আর কাহাকেও প্রণিপাত করে না। ইহা আমাদের নবীর শিক্ষা। খসরু মুখ ভেঙচাইয়া দাঁত কটমট করিয়া বলিলেন, যদি দূত হত্যা নীতি বহির্ভূত কাজ না হইত তবে আমি এই মুহূর্তে তোমার গর্দান উড়াইয়া দিবার নির্দেশ দিতাম। এই কথা বলিয়া খসরু পারভেজ রাসূলুল্লাহ -এর পত্রখানা হাতে লইয়া টুকরা টুকরা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল। সাথে
সাথে আদেশ করিল, দূতকে দরবার হইতে বাহির করিয়া সাগরপাড়ে পৌঁছাইয়া দাও। আর কোন দিন সে যেন আমাদের রাজ্যের ত্রি-সীমার মধ্যে ঢুকিতে না পারে।
দূতকে অপমান করার উদ্দেশ্যে খসরুর নির্দেশে তাঁহার মাথায় একটুকরী মাটিও চাপাইয়া দেওয়া হয় বলিয়া এক বর্ণনায় জানা যায়। এতটুকুতেই তাহার ক্রোধ পড়িলনা। তিনি ইয়ামানের ইয়ানী গভর্নর বাযানের নিকট ফরমান প্রেরণ করিলেন, যেন হিজাযী ঐ ব্যক্তিটিকে গ্রেফতার করিয়া তাঁহার দরবারে পাঠাইয়া দেওয়া হয়— যে শাহানশাহের নামে ঔদ্ধত্যপূর্ণ পত্র প্রেরণের স্বর্ধা প্রদর্শন করিয়াছে (মওলানা হিফজুর রহমান সিওহারভী, বালাগে মুবীন, পৃ. ১৩৫-৬)।
ইয়ামের গভর্নর মালিক বাযানের তখন চরম সঙ্কটকাল। কেননা ইহার মাত্র কয়েক মাস পূর্বে ৬২৭ কৃস্টাব্দে রোম সম্রাট কায়সার নিনেভা অবস্থানকালে কিস্সাকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়াছিলেন। ইরানীদের এই পরাজয়ের সংবাদ যখন ইয়ামানে পৌছিল তখন ইয়ানীদের আধিপত্যে অসন্তুষ্ট গোত্রসমূহ আবার মাথাচাড়া দিয়া উঠে। ফলে ইয়ামানে রীতিমত এক অশান্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। নাজরানের খৃস্টান রাজ ছিল রোমের কায়সারের সমর্থক। তাহারা সর্বদাই গোত্রসমূহকে বাযানের বিরুদ্ধে উস্কানী দিত। অপরদিকে আবিসিনীয়রাও, যাহার শাসক নাজাশী ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, ইয়ামানের উপকূলবর্তী এলাকাসমূহে মহড়া দিতে থাকে। রোমকদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল তাঁহার জন্য একটা স্থায়ী হুমকিস্বরূপ। যে কোন সময় তাহারা ইয়ামানে হামলা চালাইতে পারে, অথচ ইরানের দিক হইতে তাঁহার সাহায্য লাভের কোন আশাই ছিল না। কেননা নিনেভার পতনের পর সমগ্র ইরানে খসরুর বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয় এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ভয়ে সবসময়ই তাঁহাকে সন্ত্রস্ত থাকিতে হইত।
এই আগ্নেয়গিরিতুল্য বিস্ফোরনোম্মুখ অবস্থায় বাযান একান্তই অসহায়বোধ করিতেছিলেন। কেননা যে কোন সময় সেখানে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারিত। এমনি পরিস্থিতিতে আরবের নবীকে গ্রেফতারের আদেশ সংক্রান্ত খসরুর ফরমানকে তিনি একটা অসময়োচিত পদক্ষেপ বলিয়া মনে করিতেছিলেন এবং কোনমতেই তাহা সমর্থন করিতেছিলেন না। কেননা রোমকদের মোকাবিলায় আরবদের মধ্যে বন্ধু সৃষ্টির পরিবর্তে শত্রু সৃষ্টি করা মোটেই বিজ্ঞজনোচিত কাজ ছিল না। অপরদিকে আবিসিনিয়ার সাথে যাহাতে সম্পর্ক তিক্ত হইয়া না উঠে তজ্জন্যও মুসলমানদের নবীর সহিত এইরূপ আচরণ না করা জরুরী ছিল। কেননা আবিসিনিয়া মুসলমানদের সহিত মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ ছিল এবং জোর গুজব রটিয়াছিল যে, বাদশাহ নাজাশী ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন।
বাযান এইসব ব্যাপার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন শাহানশাহে ইরানের প্রতিনিধি, আর ইরানী সামরিক অফিসারদের বর্তমানে শাহানশাহের আদেশ অমান্য করারও তাঁহার উপায় ছিল না। অগত্যা তিনি তাঁহার একান্ত সচিব কাহরামান (قهرمان) এবং খারখাস্ত্রা নামক অপর এক ব্যক্তিসহ হিজাযের দিকে রওয়ানা করিয়াছিলেন (আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ১৫৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (সা)-এর দরবারে পারসিক দূত

📄 মহানবী (সা)-এর দরবারে পারসিক দূত


ইহা ছিল হিজরী ষষ্ঠ সনের (৬২৮ খৃ.) শীতকালের ঘটনা। উক্ত দুইজন সর্দার তাইফের পথ ধরিয়া মদীনায় প্রবেশ করিলে তাইফের সর্দারগণ এবং মক্কার কুরায়শগণ ইরানের শাহানশাহ
মুহাম্মাদ-কে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে লোক প্রেরণ করিয়াছেন শুনিয়া উল্লসিত হইল। তাহারা ইরানী দূতদ্বয়কে অভ্যর্থনা জানাইল। এখানেই প্রথমবারের মত দূতদ্বয় মহানবী, মুসলমান জাতি এবং তাঁহাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বিশদভাবে জানিতে পারে। এখানেই তাহারা নবৃওয়াতের সূচনাকাল হইতে হুদায়বিয়ার সন্ধি পর্যন্ত সংঘটিত তাবৎ ঘটনা সবিস্তারে জানিবার সুযোগ লাভ করে। যদিও এই বিবরণ তাহারা ইসলামের শত্রুগণের মুখেই শ্রবণ করিল, তবুও যেন তাহাদের মনে যাঁহাকে তাহারা গ্রেফতার করিতে যাইতেছে, তিনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁহার প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে তাহাদের পূর্ব ধারণার অনেক উঁচু মানের মানুষ তিনি। তাই তাঁহাকে গ্রেফতার করার গুরুদায়িত্ব কীভাবে যে তাহারা পালন করিবে, তাহা তাহাদের বড় ভাবনার ব্যাপার হইয়া দাঁড়াল। তাহারা মদীনায় পৌঁছিয়া যখন সেখানকার অধিবাসিগণের জীবনযাত্রা এবং রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি তাঁহাদের ভক্তি ও ভালবাসার দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিল তখন তাহারা সম্যক উপলব্ধি করিতে পারিল যে, কী দুঃসাধ্য দায়িত্বভারই না তাহাদের উপর অর্পিত হইয়াছে! তাই রাসূলুল্লাহ-কে গ্রেফতার করার পরিকল্পনা বাদ দিয়া কেবল পারস্য সম্রাটের নির্দেশটি তাঁহার গোচরীভূত করিয়াই তাহারা ক্ষান্ত হইল। তাহারা নিবেদন করিল :
আমাদের শাহানশাহ আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য মালিক বাযানকে নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। আর মালিক বাযান এই উদ্দেশ্যে আমাদেরকে প্রেরণ করিয়াছেন। তাই আপনার পক্ষে উচিত হইবে আমাদের সহিত চলা। তাহাতে আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের মঙ্গল হইবে। আর আপনি যদি অসম্মত হন তবে তাহাতে অমঙ্গলকেই ডাকিয়া আনা হইবে। তাহা আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কারণ হইয়া দাঁড়াইবে। আপনাদের রাজ্য লুণ্ঠিত হইবে।
তাহারা অনেকটা ভয়ে ভয়েই এই পয়গাম পৌঁছাইল। তাহাদের ধারণা ছিল, ইহাতে প্রতিপক্ষ উত্তেজিত হইয়া দুই-চারটি কড়া কথা শুনাইয়া তাহাদেরকে বিদায় করিয়া দিবেন। তাহারা মনে মনে তাহা কামনাও করিতেছিল যেন তাহাই হয় এবং তাহারা নিরাপদে ইয়ামানে ফিরিয়া যাইতে পারে। কিন্তু তাহাদের বিস্ময়ের কোন সীমা রহিল না, যখন তাহারা লক্ষ্য করিল, আল্লাহ্র রাসূলের মধ্যে ইহার কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। এত বড় একটা কথা শোনার পরও তিনি একেবারেই নির্বিকার চিত্ত! ইরান সম্রাটের পয়গাম যেন তাঁহার মনে একটুও রেখাপাত করিল না। তাহারা আরও বিস্মিত হইল যখন দেখিল, তিনি ইহার কোন জবাব না দিয়াই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক অপর একটি ব্যাপারে তাহাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছেন। তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, আচ্ছা, তোমরা কাল আমার নিকট আসিও, তোমাদের এই কথার উত্তর দিব। এখন তোমরা আর একটি কথা শোন! আচ্ছা বল তো, আল্লাহ প্রদত্ত পুরুষসুলভ সৌন্দর্যময় দাড়িগুলি কাটিয়া এবং লম্বা লম্বা গোঁফ রাখিয়া তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডলকে এরূপ বিশ্রী করিয়া রাখিয়াছ কেন? তোমাদেরকে এই কুশিক্ষা কে দিয়াছে? তাঁহারা ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে উত্তর করিল, ইহা আমাদের প্রভুর (সম্রাটের) হুকুম। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, কিন্তু আমাদের প্রভু আমাদেরকে দাড়ি লম্বা করিয়া রাখিতে এবং গোঁফ ছাটিয়া ছোট করিতে হুকুম দিয়াছেন। বড়ই পরিতাপের বিষয়, তোমরা প্রকৃত প্রভুর আদেশ অমান্য করিয়া মনগড়া প্রভুর আদেশ পালন করিতেছ (হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৬৮৯)।
আসলে এই গোঁফ ছিল ইরানী সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মের অন্তর্ভুক্ত। লম্বা গোঁফ ছিল ইরানী সাম্রাজ্যের শক্তি ও দাপটের প্রতীক। এই গোঁফে তা আর প্যাঁচ দিতে দিতে তাহারা ইরান শাসিত
এলাকাসমূহে অত্যন্ত দম্ভ ও গর্ব সহকারে ঘোরাফেরা করিত। আর ঐসব এলাকার প্রজা- সাধারণকে অত্যন্ত তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে দেখিত। তাহাদের এবম্বিধ দম্ভদর্শনে শাসিত জাতি- সমূহের লোকজন ভিতরে ভিতরে ফুসিয়া মরিত, কিন্তু বাহিরে কিছু প্রকাশ করিতে পারিত না। রাসূলুল্লাহ-এর পরামর্শে আসলে তাহাদের এই দাম্ভিকতা পরিহারের দিকেই ইঙ্গিত ছিল।
পরদিন যখন কাহরামান ও খর-খসরা নামক দূতদ্বয় নবী কারীম-এর দরবারে পরম ঔৎসুক্য সহকারে তাঁহার জবাব শুনিবার জন্য আগমন করিল, তখন তিনি তাহাদেরকে এমনই এক সংবাদ দিলেন যাহা শ্রবণে তাহারা রীতিমত হতভম্ব হইয়া গেল। তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, ابلغا صاحبكما ان ربي قد قتل ربه كسرى في هذه الليلة لسبع ساعات مضت منها . "তোমাদের মনিবকে গিয়া বলিবে, আমার প্রভু বিগত রাত্রিতে তোমাদের মনিবকে হত্যা করিয়াছেন। শিরোইয়া তাহার পিতাকে হত্যা করিয়া সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছেন"।
উহা ছিল হিজরী সপ্তম সনের ১০ জুমাদাল উলা মঙ্গলবারের রাত্রির শেষ প্রহর। এতদশ্রবণে দূতদ্বয় অপ্রতিভ হইয়া কিছুক্ষণ নীরব রহিল। অতঃপর বলিল, ইহার ফল কিন্তু ভাল হইবে না। আমাদের শাহানশাহ আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করিয়াই ছাড়িবেন। পৃথিবীর মানচিত্রে এই দেশের নাম-নিশানা অবশিষ্ট থাকিবে না।
পূর্ণ প্রত্যয়ের সহিত গম্ভীর স্বরে রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, তোমাদের ঐসব চিন্তার কোন প্রয়োজন নাই। যাও, মালিক বাযানকে এই ঘটনার সংবাদ জানাইয়া আমার পক্ষ হইতে বলিয়া দিও, আমার ধর্ম বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হইবে। বিশ্বের যেখানেই কাহারও মুদ্রা (দাপট) চালু রহিয়াছে সেখানেই আমার প্রভাব-প্রতিপত্তি অনুভূত হইবে। মালিক বাযান যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তাঁহার শাসনাধীন রাজ্য তাঁহার হাতেই ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। ঐ রাজ্যের শাসকরূপে আমরা তাঁহাকেই বহাল রাখিব। বিদায়ের প্রাক্কালে নবী কারীম দূত খরখসরাকে একটি স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত কোমরবন্দ উপঢৌকনস্বরূপ দান করেন- যাহা তিনি কোন এক বাদশাহ্ পক্ষ হইতে উপঢৌকন পাইয়াছিলেন (আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮৫, ১৪৬; তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২৬০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00