📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেযের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র

📄 ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেযের নামে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র


যাহাতে তিনি বলেন, আমার মতে 'আরবীস সর্দার ও বড়দেরকে বলা হইয়া থাকে যাহাদের হুকুম তামিল করা হয় এবং যখন তাহারা আনুগত্য চাহে তখন তাহাদের আনুগত্য করা হয় (দ্র. লিসানুল আরাব ارس ধাতু)।
ইবনুল মানযূর (র) আযহাবীর বরাতে লিখেন: "ইরাকের সাওয়াদ এলাকার লোক যাহারা পারসিক সম্রাটের ধর্মের অনুসারী ছিল, তাহারা কৃষিজীবী ছিল। রোমকরা সাজ-সরঞ্জাম তৈরী ও শিল্পকর্মে নিয়োজিত ছিল। এইজন্য তাহারা অগ্নিউপাসকদেরকে আরীসিয়্যীন বা কৃষককুল বলিয়া অভিহিত করিত। আরবগণও ইরানীদেরকে ফাল্লাহীন বা কৃষককুল বলিয়া অভিহিত করিত" (নবীয়ে রহমত, পৃ. ৩১৫, ১ম সং ১৯৯৭ খৃ.)।
লক্ষণীয়, এহেন ইরানীদের সম্রাটের নামে প্রেরিত পত্রে রাসূলুল্লাহ কিন্তু উক্ত শব্দটি ব্যবহার করেন নাই। আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (র) তাই মন্তব্য করেন, উল্লেখিত কারণে আমাদের নিকট অগ্রাধিকারযোগ্য অভিমত এই যে, ইরীসিয়্যীন-এর অর্থ এইখানে আরিয়ুস মিসরী (২৮০-৩৩৬ খৃ.)-এর অনুসারীবর্গ যিনি একটি খৃস্টান উপদলের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি খৃস্টীয় আকীদা-বিশ্বাস ও সংস্কারে গোত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এই উপদল বায়যান্টাইন সাম্রাজ্য ও খৃস্টান গীর্জাকে দীর্ঘকাল পেরেশান করিয়া রাখিয়াছিল। আরিয়ূস তাওহীদ ও একত্ববাদের ধ্বনি উচ্চারিত কণ্ঠে তুলিয়া ধরেন এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টি ভাষায়) পিতা ও পুত্রের মধ্যে পার্থক্য করার দাওয়াত দেন (Encyclopaedia of Religion and Ethics, ১খ.)।
এইজন্য অগ্রাধিকারযোগ্য ও অনুমানসিদ্ধ কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ-এর সতর্ক বাণী : -فان تولیت فان علیک اثم الاریسيين বুঝান হইয়াছে। কেননা সেই যুগের খৃস্টান জগতের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব এবং বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের ক্ষমতা যাহার হাতে ছিল তিনি ছিলেন হিরাক্লিয়াস। তখনকার খৃস্টানদের মধ্যে এই ফেরকাই তুলনামূলকভাবে নির্ভেজাল তাওহীদের ধারক-বাহক এবং তাহারাই ঐ পর্যন্ত তাহার উপর কায়েম ছিল (The New Catholic Encyclopaedia, ১৪খ., পৃ. ২৯০, Holy Trenity শীর্ষক নিবন্ধ)।
ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজের নামে রাসূলুল্লাহ-এর পত্র
খসরু পারভেজের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: পারসিক ভাষায় খসরু শব্দের আরবী রূপ হইতেছে কিস্সা আরবীতে খসরু শব্দের সহীহ উচ্চারণ খুসরাত। ইহা সেই যুগের পারস্য সম্রাটগণের উপাধি ছিল, যেমনটি ছিল মিসরের 'ফিরআউন ও ইথিওপিয়ার সম্রাটগণের নাজাশী উপাধি। রাসূলুল্লাহ-এর পত্র প্রাপক কিস্সার নাম ছিল খসরু পারভেজ। তিনি বিশ্ববিখ্যাত ন্যায়পরায়ণ পারস্য সম্রাট প্রথম খসরু নওশেরোয়ার পৌত্র ছিলেন। তাহার পিতা হুরমুজ ৫৯০ খৃস্টাব্দে নিহত হওয়ার পর তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন। ৬২৮ খৃস্টাব্দে (৭ম হিজরীর ১১ জুমাদাল উলা) নিহত হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বৎসরকাল ধরিয়া তিনি রাজ্য শাসন করেন। তিনি পারসিক সাম্রাজ্যের ইতিহাসে ২য় খসরু নামে বিখ্যাত।
সিংহাসনে আরোহণের অব্যবহিত পরেই বিদ্রোহী বাহ্রাম চুবীনের হাতে পরাস্ত হইয়া তিনি সাসানী রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া বায়ান্টাইন সম্রাট মরীস (Maurice)-এর আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং স্বীয় রাজ্য পুনরুদ্ধারে তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করেন। মরিস বিশাল সৈন্যবাহিনীর দ্বারা সাহায্য

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র প্রেরণ

📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র প্রেরণ


করিলে তিনি তাহার পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধরে সক্ষম হন এবং পুনর্বার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তাঁহার বিপদের বন্ধু সম্রাট মরিস বিদ্রোহী কোকাসের হাতে নিহত হইলে কোকাসই বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট হইয়া যায়। তিনি তাহার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ৬১২ খৃ. রোমান সাম্রাজ্যের উপর আক্রমণ চালান। কোকাসের নিহত হওয়ার পরও তাঁহার সেই প্রতিশোধস্পৃহা স্তিমিত হয় নাই। তাঁহার বিজয় অভিযান রাজধানী কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। মিসর, সিরিয়া ও ফিলিস্তীনসহ বিশাল ভূভাগ তিনি রোমকদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লন। সেইজন্য তাঁহার উপাধি হয় পারভেজ বা বিজয়ী (আর-রাওদুল উনুফ, ২খ., পৃ. ২৫২; আল-মিসবাহুল মুদী, ২খ., পৃ. ১৫১)।
ইরানের ঐতিহাসিকগণ একমত যে, সম্রাট ২য় খসরু পারভেজ ইরানের ইতিহাসের সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী ও শান-শওকতের অধিকারী সম্রাট ছিলেন। তাহার শাসনামলে সাসানী সাম্রাজ্য উন্নতি, বিলাস ব্যসন ও সৌন্দর্য উপকরণে সমৃদ্ধির শিখরে উপনীত হইয়াছিল। ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমের রাজ্যগুলি অবধি তাহার মুদ্রা চালু ছিল তাঁহার নামের সঙ্গে যেইসব শানদার পদবী ও বিশেষণ তিনি নিজে ব্যবহার করিতেন তাহা এইরূপ, ঈশ্বরগণের মধ্যে অবিনশ্বর মানব, মনুষ্যগণের মধ্যে অদ্বিতীয় ঈশ্বর, তাঁহার ক্ষমতা ও মর্যাদা সর্বোচ্চে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বপ্রভায় উদিত হন, তাঁহার প্রভাব তিনি অন্ধকার রাত্রিসমূহকে প্রোজ্জ্বল করিয়া তোলেন (ইরান ব-'আহ্দে সাসানিয়া, পৃ. ৬০; থিওনীলেক্টিস-এর বরাতে); আস্-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যা, সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, পৃ. ২৫১, ষষ্ঠ মুদ্রণ, বৈরূত, ১৯৮৪ খৃ.)। ঐতিহাসিক তাবারী তাঁহার সম্পর্কে মন্তব্য করেন:
كان من اشد ملوكهم بطشا وانفذهم رأيا وأبعدهم غورا وبلغ خيما ذكر من البأس والنجدة والنصر والظفر وجمع الاموال والكنوز ومساعدة القدر ومماعدة الدهر اياه مالم يتهيأ لملك اكثر منه ولذلك سمى ابرويز وتفسيره بالعربية المظفر. "সর্বাধিক পরাক্রমশালী, সর্বাধিক সিদ্ধান্ত প্রদানক্ষম ও দূরদর্শী, বীরত্বে, শৌর্যবীর্যে, বিজয় সাফল্যে, ঐশ্বর্য-প্রাচুর্যে ভাগ্যের আনুকূল্যে অদ্বিতীয় ও অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত - যাহা অন্য কোন সম্রাটের ভাগ্যে ইতোপূর্বে জুটে নাই। এইজন্য তাঁহার লকব হয় পারভেজ আরবীতে যাহাকে মুজাফ্ফার বা বিজয়মণ্ডিত বলা হইয়া থাকে” (তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, পৃ. ৯৯৫; আস্-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৫২)।
ষষ্ঠ হিজরীর শেষদিকে রোমক বাহিনী ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজকে নিনোভার যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া টাইগ্রীস (দিজলা) নদীর অপর পাড়ে ঠেলিয়া দেয়। খসরু পারভেজের তখন চরম সঙ্কটকাল। রোমকদের হাতে পরাজয়ের গ্লানি তাঁহার মনমেজাজকে রুক্ষ করিয়া তুলিয়াছিল। দরবারের অমাত্যবর্গ এবং সেনাধ্যক্ষগণের প্রতি কথায় কথায় তাঁহার ক্রোধ প্রকাশ পাইতেছিল। কেননা তাঁহার ধারণা ছিল, এই অমাত্যবর্গ ও সেনাধ্যক্ষগণের কর্তব্যে উদাসীনতা, কাপুরুষতা ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই তাঁহাকে হিরাক্লিয়াসের হাতে পরাজয় বরণ করিতে হইল। তাহাদেরকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার তাঁহার ইচ্ছা ছিল। গোটা পারসিক সাম্রাজ্যের সকলেই তখন সম্ভ্রান্ত।
প্রতিদিন কোন না কোন আমীর বা অমাত্যের গ্রেফতারীর, কোন না কোন উযীরের ফাঁসির এবং কোন না কোন সেনাপতির পলায়নের খবর রাখিতেছিল। শাহানশাহ একটা ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফুঁসিয়া উঠিতেছিলেন। পরাজিত জাতি যেন চরম হতাশা ও আতঙ্কে শ্বাসরুদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল।
ঠিক এমনি পরিস্থিতিতে একজন ভিনদেশী লোক অদ্ভুত পোষাক পরিহিত অবস্থায় শ্বেত প্রাসাদের নিকটে দাঁড়াইয়া শাহানশাহে ইরানের রক্ষী অফিসারদের নিকট বারবার প্রাসাদ অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমাত প্রার্থনা করিতেছিল। তাহার গায়ে ছিল এক পশুর কম্বল যাহা সে কাকনের মত গলায় জড়াইয়া রাখিয়াছিল- তাহার বগলদ্বয়ের নীচ দিয়া দামন পর্যন্ত যাহা ছিল বাবুল কাটায় সেলাই করা, যাহার কোমরে বাঁধা ছিল একটা রজ্জু আর তাহার সাথে ঝুলতেছিল কোষ আবদ্ধ তাহার তলোয়ারখানা। তাহার মাথায় বাঁধা ছিল এক প্রস্থ রুমাল, কিন্তু পদযুগল ছিল পাদুকাশূন্য। এই অবস্থায় শ্বেত প্রাসাদের রক্ষীগণ কোনমতেই তাহাকে প্রাসাদ অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দিতেছিল না।
এমন সময় একদিন স্বয়ং শাহানশাহ খররু পারভেজ যখন আরবদের অদ্ভুত আচরণ সম্পর্কে মন্তব্য করিতেছিলেন তখন সুযোগ পাইয়া জনৈক পরিষদ তাঁহাকে জানাইলেন যে, এমনি এক অদ্ভুত বেশভূষার লোক গত কয়েকদিন ধরিয়া দরবারে প্রবেশের অনুমতি দানের জন্য প্রহরীদেরকে অনুরোধ করিতেছে। সে নিজেকে মদীনার দূত বলিয়া পরিচয় দিতেছে। খসরু পারভেজ তখনই তাহাকে দরবারে প্রবেশের অনুমতি দান করিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাসেদ আবদুল্লাহ ইব্‌ন হুযাফা সাহী (রা) তখন তাঁহার সেই দরবেশসুলভ বেশভূষায় খসরু পারভেজের সম্মুখে উপনীত হইলেন। পরিষদবর্গতো এই কম্বল পরিহিত আগন্তুকের নির্ভীক পদক্ষেপে দরবারে প্রবেশের ধরন-ধারণ দেখিয়াই অবাক। যে মহান শাহানশাহে ইরানের দরবারে প্রবেশের সময় বড় বড় রাজা-বাদশাহগণ পর্যন্ত থাকেন ভীত-সন্ত্রস্ত, কুর্ণিশরত, এই লোকটির মধ্যে তাহার কোন লক্ষণই দেখা যাইতেছে না। যেন ইহা সম্রাটের দরবার নহে, সরাইখানা। কিছু একটা জাতীয় প্রহরীগণ তাঁহাকে সতর্ক করিলেন, শাহানশাহের দরবারে প্রবেশকালে কুর্ণিশ করিতে হয় হে! কিন্তু আগন্তুক তাহাতে অসম্মতি প্রকাশ করিলেন, আল্লাহ্ ছাড়া কাহাকেও মোরা করিনাকো কুর্নিশ!"
আগন্তুকের এইরূপ বেপরোয়া উক্তি শ্রবণে রুক্ষ মেজাজের শাহানশাহ খসরু পারভেজ অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিলেন। কী, স্বয়ং শাহানশাহের মুখের উপর একটা গ্রাম্য মানুষের এত বড় স্পর্ধা! দরবারের লোকজন শাহানশাহের অগ্নিমূর্তি দর্শনে ভয়ে জড়সড় হইয়া তোল। কিন্তু আগন্তুক নির্বিকার। তিনি তাঁহার জামার আস্তিন হইতে পত্রখানা বাহির করিয়া নির্ভয়ে খসরু পারভেজের সন্মুখে রাখিয়া দিলেন। নকীব পত্রখানা লইয়া সসম্ভ্রমে বাদশাহর সন্মুখে দাঁড়াইয়া গেল। অতঃপর খসরু পারভেজের নির্দেশে উচ্চকণ্ঠে সে তাহা পড়িয়া শুনাইল। পত্রের পাঠ ছিল এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى كسرى عظيم فارس سلام على من اتبع الهدى وامن بالله ورسوله واشهد ان لا اله الا الله وانى رسول الله الى الناس كافة لينذر من كان حيا اسلم تسلم فان ابيت فعليك اثم المجوس.
১৬৩ "পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহ্ নামে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্র পক্ষ হইতে পারস্য প্রধান কিসরার প্রতি। যে হিদায়াতের অনুসরণ করে, আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করে তাহার প্রতি সালাম। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, লা-শরীক আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং আমি সমগ্র মানবজাতির প্রতি এই উদ্দেশ্যে প্রেরিত আল্লাহ্র রাসূল। যেন আমি সমগ্র জীবিত মানবজাতিকে সতর্ক করিয়া দেই। ইসলাম গ্রহণ করুন শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন, আর যদি অগ্রাহ্য করেন তাহা হইলে সমগ্র অগ্নি উপাসক জাতির পাপের বোঝা আপনার উপর বর্তাইবে"।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
সহীহ বুখারী, কিতাবু আখবারিল আহাদ, ৪র্থ অধ্যায়, ২খ., পৃ. ২৯৫-২৯৬; 'জামহারাতুর রাসাইলিল 'আরাব, ১খ., পৃ. ৩৫; সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৭৭; ইজাযুল কুরআন, পৃ. ১১২; আল-কামিল, ২খ., পৃ. ৮১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬৯; সুব্‌হুল আ'শা, ৬খ., পৃ. ৩৭৭; মুসনাদে আহমাদ, ৪খ., পৃ. ৭৫; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯০; মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া লিল-কাস্তাল্লানী, শারহে যুরকানী, ৩খ., পৃ. ৩৮৯; দালাইলুন নুবৃয়্যা (আবূ নুআয়ম), পৃ. ২৯৩, তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯৫-৬।
উপরিউক্ত পাঠ তাবারীর বর্ণনা হইতে লওয়া হইয়াছে। পক্ষান্তরে হামদুল্লাহ আল-মুস্তাওফীর উদ্ধৃত পত্রের পাঠ ও বর্ণনা বর্ধিত অংশসহ এইরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم. من محمد رسول الله الى يرويزبن هریز اما بعد مانی احمد الله لا اله الا هو الحي القيوم الذي ارسلني بالحق بشيرا ونذيرا الى قوم غلبهم السفه وسلب عقولهم ومن يهدى الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له ان اللله بصيرا بالعباد ليس كمثله شئ وهو السميع البصير اما بعد فاسلم تسلم او ائذن بحرب من الله ورسوله ولم تعجزهما - "পরম করুণাময় ও পরম দয়াময় আল্লাহ্ নামে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ হইতে হুরমুজ পুত্র পারভেজের প্রতি। সেই আল্লাহ্ প্রশংসা বর্ণনা করিতেছি যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক- যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে সেই জাতির প্রতি, যাহারা অজ্ঞতার মধ্যে ডুবিয়া রহিয়াছে এবং যাহাদের বিবেকবুদ্ধি লোপ পাইয়াছে। যাহাকে আল্লাহ্ হিদায়াত দান করেন তাহাকে কেহই পথভ্রষ্ট করিতে পারে না, এবং যাহাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন কেহই তাহাকে হিদায়াত করিতে পারে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাঁহার বান্দাদের ব্যাপারে সম্যক অবগত। কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা (৪২: ১১)। অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ
করিবেন, নতুবা আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করুন। আল্লাহ্ ও রাসূলকে আপনি অপারগ করিতে সক্ষম হইবেন না।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
ফাদিল সাবরী হামদানী, মুহাম্মাদ ও যেমামদারা (মুহাম্মাদ ইব্‌ন বালাআমী কৃত তাবারীর অনুবাদের বরাতে ভারতীয় মুদ্রণ, পৃ. ৩৬১; মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৬)।
এই ব্যাপারে শী'আ আলিম ও গবেষক 'আলী ইবন হুসায়ন 'আলী আল-আহমাদীর মন্তব্য প্রতিধানযোগ্য। তিনি লিখেন: আমার দৃঢ় ধারণা, প্রথমোক্ত পত্রখানিই সঠিক যাহা বড় বড় ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিছগণ বর্ণনা করিয়াছেন। আমার শায়খ (ইব্‌ন শাহ্ আশূব) এইজন্য তদীয় মানাকিব গ্রন্থে কেবল প্রথম রিওয়ায়াতই উদ্ধৃত করিয়াছেন- যদিও তাঁহার উদ্ধৃত পত্রের বক্তব্য অধিকাংশের বর্ণনার পরিপন্থী। ইহা সেই যুগের ইসলামের অবস্থার পরিপন্থীও বটে। কেননা পত্রখানি ষষ্ঠ বা সপ্তম হিজরীর, মুসলমানগণ সেই যুগে অর্থাভাব, সংখ্যাস্বল্পতা এবং রণসম্ভারের দিক হইতে অনেকটা রিক্ত ছিলেন। সুতরাং জিযয়াদান বা যুদ্ধ ঘোষণার জন্য পারসিক সম্প্রদায়ের মত বিপুল শক্তিধর সম্রাটকে চ্যালেঞ্জ করার মত অবস্থা তখন ছিল না।
অধিকন্তু নবী করীম -এর রোমক সম্রাট, ইথিওপীয় সম্রাট ও মিসর-রাজ প্রমুখকে লিখিত পত্রে যাহা ঐ একই সময়ে লিখিত হইয়াছিল- এই বক্তব্য নাই। তবে হাঁ, ইহা অপর পত্র হইতে পারে- যাহা জিয়া সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর লিখিত হইয়া থাকিবে। যেমন কিতাবুল আমওয়াল (পৃ. ২০)-এ রহিয়াছে, কিন্তু তাহাও বিশুদ্ধ হইবার উপায় নাই। কেননা কিসরা ইবন হুরমুজ যাহার কথা পত্রে উল্লিখিত হইয়াছে, ইহার পূর্বেই নিহত হইয়াছেন। আর জিয়ার আয়াত নাযিল হইয়াছে নবম হিজরীতে। আর কিতাবুল আমওয়ালে যাহা এককভাবে বর্ণিত হইয়াছে তাহাও নাজাশীকে লিখিত পত্রের বিপরীত। আর কিসরা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন না। তবে তাহা দশম হিজরীতে বা উহার কাছাকাছি সময়ে কিসরাকে লিখিত পত্র হইয়া থাকিতে পারে যখন ইসলাম বেশ শক্তি সঞ্চয় করিয়াছে এবং মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে, শক্তি-সামর্থ্য ও প্রস্তুতি উন্নত হইয়াছে, যাহা জ্ঞানীগণের নিকট বিদিত (মাকাতীবুর রাসূল, ১খ., পৃ. ৯৭)।
(৩) উপরিউক্ত বর্ণনাদ্বয় ছাড়াও খতীব বাগদাদী, আলী মুত্তাকী আল-হিন্দী (বুরহানপুরী) পত্রের পাঠ উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে:
من محمد رسول الله الى كسرى عظيم فارس أن اسلم تسلم من شهد شهادتنا واستقبل قبلتنا واكل ذبيحتنا فله ذمة الله وذمة رسوله. "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ -এর পক্ষ হইতে পারস্য প্রধান কিসরার প্রতি- ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করিবেন। যে ব্যক্তি আমাদের এই সাক্ষ্য দেয় (কলেমা শাহাদাত পাঠ করে) আমাদের কিবলাকে কিবলারূপে অনুসরণ করে, আমাদের যবেহকৃত গোস্ত খায়,

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খসরু পারভেযের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রপ্রাপ্তি সংক্রান্ত বিশেষ তথ্য

📄 খসরু পারভেযের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্রপ্রাপ্তি সংক্রান্ত বিশেষ তথ্য


তাহার জন্য আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের যিম্মা রহিল" (তারীখ বাগদাদ, ১খ., পৃ. ১৩২; কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ২৮৭)।
(৪) আবূ 'উবায়দ কাসিম ইবন সাল্লাম ও আলী মুত্তাকী কানযুল উম্মালের অন্যত্র লিখেন : كتب رسول الله ﷺ الى كسرى وقيصر ورالنجاشی کتابا واحدا بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى كسرى وقيصر والنجاشي اما بعد تعالوا الى كلمة سواء بيننا وبينكم ان لا نعبد الا الله ولا نشرك به شيئا ولا يتخذ بعضنا بعضا اربابا من دون الله فان تولوا فقولوا اشهدوا بانا مسلمون
আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মদ
"রাসূলুলুল্লাহ কিস্সা, কায়সার এবং নাজাশীকে অভিন্ন পত্র লিখেন এইভাবে : বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ হইতে কিস্সা, কায়সার ও নাজাশীর প্রতি- অতঃপর হে কিতাবিগণ! আইস সেই কথায় যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত কাহারও ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁহার শরীক না করি এবং আমাদের কেহ কাহাকেও আল্লাহ্ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ না করি। যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা মুসলিম" (৩ : ৬৪)।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
(আবূ 'উবায়দ, কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ২৩; কানযুল উম্মাল, ২খ., পৃ. ৩২০)। (৫) কিসরাকে লিখিত রাসূলুল্লাহ -এর পত্রের আরেকটি ভাষ্য পাওয়া যায়, যাহার পাঠ এইরূপ :
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله الى كسرى بن هرمزد اما بعد فاني احمد اليك الله الذي لا اله الا هو وهو الذى اوانى وكنت يتيما واغناني وكنت عائلا و هداني وكنت ضالا ولن يدع ما أرسلت به الا من قد سلب معقوله والبداء غالب عليه اما بعد يا کسری فاسلم تسلم او ائذن بحرب من الله ورسوله ولم تعجزهما والسلام محمد رسول الله. "বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ হইতে কিসরা ইবন হুরমুজদের প্রতি। অতঃপর আমি আপনার নিকট সেই আল্লাহ্র প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত অন্য কোন
ইলাহ নাই। তিনিই সেই পবিত্র সত্তা যিনি আমাকে আশ্রয় দান করিয়াছেন, অথচ আমি ছিলাম ইয়াতীম। তিনি আমাকে অভাবমুক্ত করিয়াছেন অথচ আমি ছিলাম নিঃস্ব। তিনি আমাকে পথনির্দেশ দিয়াছেন অথচ আমি ছিলাম পথ সম্পর্কে অনবহিত। আমি যাহা লইয়া প্রেরিত হইয়াছি তাহা ত্যাগ করিতে পারে না সেইসব লোক ব্যতীত যাহাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাইয়াছে, আর যাহাদের উপর বিপদ প্রবল হইয়াছে। অতঃপর, হে কিসরা, সুতরাং আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপত্তা লাভ করিবেন। নচেৎ আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করুন! আপনি তাহাদেরকে অপারগ করিতে সক্ষম হইবেন না। ওয়াস-সালাম.।
(সীলমোহর) আল্লাহ্ রাসূল মুহাম্মাদ
(প্রফেসার এডওয়ার্ড ব্রাউন, লিটারেরী হিস্ট্রি অব পারসিয়া, ১খ., পৃ. ১৮৩; তারীখে আদাবে ইরান, ফার্সীতে অনূদিত, পৃ. ২৯৬; মাকাতীবুর রাসূল ১খ., পৃ. ৯৫-৯৬; আল-ইরবু ফী আখবারিল কু'র সি ওয়াল আরাব)।
রাসূলুল্লাহ-এর পত্রের বক্তব্য শ্রবণে খসরু পারভেজ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিলেন। বেপরোয়া মানসিকতাসম্পন্ন পত্রবাহকের ঔদ্ধত্য দর্শনে এমনিতেই তিনি ক্রুদ্ধ ছিলেন। কেননা কিস্সার দরবারের প্রথানুসারে তিনি তাহাকে কুর্ণিশ করেন নাই। এইবার পত্রের মর্ম শ্রবণে তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। পত্রের ভাষা ও সম্বোধন ছিল এমনি ধরনের— যেন কোন প্রতাপান্বিত শাসক তাহার কোন প্রজাকে সম্বোধন করিতেছেন। আরবদের সম্পর্কে এতকাল তাঁহার ধারণা ছিল যে, ইহারা হইতেছে একটা নিছক উপজাতি। যুদ্ধজয়ীদের পিছনে পিছনে ঘুরিয়া কিছু উচ্ছিষ্ট লাভ করিয়া বা কিছু লুটপাট করিয়া আবার তাহারা তাহাদের মরু প্রান্তরে নিরুদ্দেশ হইয়া যায়।' তাহাদের গোত্রপতিগণ সর্বদাই ইরানের শাহানশাহের ভাতাভোগী এবং অনুগ্রহ প্রার্থীরূপে চলিয়া আসিতেছে। সেই আরবদেরই অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তাঁহাকে এমনভাবে সম্বোধন করিতেছেন যেন তিনি কোন সম্রাট নহেন, তাহার পশুপালের রাখাল! শাহানশাহ পরম ক্রোধভরে গর্জিয়া উঠিলেন, কী তাহার স্পর্ধা! আমার নামের পূর্বে সে কিনা তাহার নিজের নাম লিখিয়াছে।
ঐতিহাসিকগণের সাধারণ বর্ণনা মতে, পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়। তারপর পত্রখানার কী হইল সেই সম্পর্কে তাঁহারা নীরব। তখন কে জানিত যে, কিসরার সেই জমজমাট বিলাসবহুল দরবার অচিরেই চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। যেই পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দেওয়ায় উহা বাহ্যত বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে, ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু কালের কুটিল চক্রকে ভ্রুকুটি প্রদর্শন করিয়া সুদীর্ঘ চৌদ্দ শত বৎসর পরও সেইটি উহার অস্তিত্বসহ বিরাজমান। ইতিহাসের পাতায় ইহা এক বিস্ময়কর ঘটনা হিসাবে বিদ্যমান। এই বিষয়টির বিশদ বিবরণ নিম্নরূপ:
১৩৮২/১৯৬৩ সালে (মে মাসে) বৈরূতের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ বিশ্ববাসীকে বিস্ময়াভিভূত করে। উহা দ্বারা জানা যায়, লেবাননের ভূতপূর্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরী ফেরাউনের
পৈত্রিক সংরক্ষণাগারে রাসূলুল্লাহ -এর পারস্য সম্রাটকে লিখিত পত্রখানা পাওয়া গিয়াছে। খৃস্ট ধর্মাবলম্বী হেনরী ফেরাউন উক্ত পত্রখানার যথার্থতা যাচাই করিয়া দেখার জন্য তাহা ডক্টর সালাহুদ্দীন আল-মুনাজ্জিদকে দেন।
নানাভাবে যাঁচাই করিয়া দেখিয়া উক্ত ডক্টর আল-মুনাজ্জিদ বৈরূতের দৈনিক 'আল-হায়াতে' ২২ মে, ১৯৬৩ তারিখে একটি দীর্ঘ গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। হেনরী ফেরাউন অনেক অর্থের বিনিময়েও পত্রখানার স্বত্ব বিক্রয় করিতে সম্মত হন নাই। বিখ্যাত গবেষক ডক্টর হামীদুল্লাহ্ (প্যারিস) স্বচক্ষে উক্ত পবিত্র পত্রখানা প্রত্যক্ষ করেন। ডক্টর আল-মুনাজ্জিদ-এর প্রবন্ধটির ব্যাপারে তিনি প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে তাঁহার নিজের বর্ণনাও সংযোজিত করেন। ১৯৬৪ সালের মে মাসের সংখ্যা উর্দু মাসিক আল-বালাগ (করাচী)-এ তাঁহার বর্ণনাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হইয়াছে। উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহের দ্বারা নিঃসন্দেহে প্রতীয়মান হয় যে, কথিত পত্রখানা সত্য সত্যই খসরূ পারভেযকে লিখিত রাসূলুল্লাহ -এর আসল পত্র। আরবী দৈনিক আল-হায়াতের প্রথম পৃষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত প্রকাশিত উক্ত গবেষণা প্রবন্ধে ড. আল-মুনাজ্জিদ লিখেন :
গত বৎসর (১৯৬২ খৃ.) নভেম্বর মাসের শেষদিকে হেনরী ফেরাউন আমার নিকট একটি চর্মখণ্ড প্রেরণ করেন। তাহাতে কৃষ্ণী লিপির মত হরফে একটি লিপি উৎকীর্ণ ছিল। উক্ত চর্ম খণ্ডটির হেফাযতের উদ্দেশ্যে তাহার নীচে সবুজ বর্ণের কাপড় সাঁটিয়া দিয়া তাহা একটি ফ্রেমের মধ্যে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই বস্ত্রখণ্ডটি পঁচিয়া গিয়াছিল। কেবল ফ্রেমের সাহায্যেই চর্মখণ্ডটি নিজ অস্তিত্ব রক্ষা করিয়া চলিয়াছিল। যখন আমি গভীর মনোনিবেশ সহকারে উহার পাঠোদ্ধারে মনোযোগী হইলাম তখন আমার নিকট এই রহস্য উন্মোচিত হইল যে, আসলে ইহাই রাসূলুল্লাহ -এর সেই মুবারক পত্র যাহা তিনি পারস্য সম্রাট খসরূ পারভেযের নামে প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং যাহার মাধ্যমে তিনি তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলেন।
আমার জীবনে ইহা ছিল পরম সৌভাগ্যক্ষণ, যখন আমি রাসূলুল্লাহ -এর ঐ মুবারক পত্রখানা পাঠ করিলাম। এই পত্রখানার হরফ ও শব্দমালার গবেষণায় আমি গত কয়েক মাস অতিবাহিত করিয়াছি। আমি এই সংক্রান্ত ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থের মৌলিক গ্রন্থাদি পাঠ করিয়া পূর্ণ নিশ্চিত হইয়া আমার গবেষণাপ্রসূত প্রবন্ধটি প্রকাশ করিতে পারিয়া আনন্দবোধ করিতেছি। হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ আরব উপদ্বীপের রাজা-বাদশাহগণ এবং পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের শাসকদের নিকট ইসলামের দাওয়াতসম্বলিত পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রগুলির একটি ছিল পারস্য সম্রাট খসরূ পারভেযের নিকট, যাহার অধীনে ছিল ইরাক ও ইরান। উল্লেখ্য যে, আরবগণ সেইসব বস্তুর উপরই লিখিত যাহা সেই যুগে পাওয়া যাইত। যেমন হাড়, পাথর, খেজুরপাতা ও চর্ম। চর্মে লিখার প্রচলনই ছিল বেশী। উট ও হরিণের চর্মকে যতদূর সম্ভব পাতলা করিয়া তাহাতে লিখা হইত। লিখার এই চর্মকে তাহাদের পরিভাষায় বলা হইত রাক্ক। ইংরেজীতে ইহাকে Parchment বলা হইয়া থাকে। কাগজ আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে এই রাক্ক-চর্মেই লিখার প্রচলন ছিল এবং উহা অত্যন্ত মূল্যবান বলিয়া বিবেচিত হইত। তাওরাত-ইনজীল কিতাবাদি এই রাক্ক নামক বিশেষ ধরনের পাতলা চর্মেই লিখিত হইত। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণকে পত্র লিখার সময় এই রাক্ক ব্যবহারের প্রচলন ছিল। রাসূলুল্লাহ রাজা-বাদশাহগণের নিকট পত্র লিখিতে এই রাক্কই ব্যবহার করিয়াছিলেন। কুরআন শরীফের সূরা আত-তূর-এ রাক্ক শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অনুরূপভাবে বুসরার শাসকও রোম সম্রাটের নিকট প্রেরিত নবী কারীম-এর দূতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাহাকে সম্রাটের সহিত সাক্ষাতের সুযোগ করিয়া দেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পারস্যের রাজদরবারে মহানবী (সা)-এর দূতের ভাষণ

📄 পারস্যের রাজদরবারে মহানবী (সা)-এর দূতের ভাষণ


ইরানে মজুসী ধর্ম তথা অগ্নিপূজার প্রচলন ছিল। ইহা ছিল আরবদের আকীদা-বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। এইজন্য তাহাদের বিস্ময়ের সীমা রহিল না যে, আরবগণ তাহাদের নিকট এমন এক পত্র প্রেরণ করিয়াছে যাহাতে অন্য ধর্ম গ্রহণের দাওয়াত রহিয়াছে এবং তাহা অগ্রাহ্য করিলে শাস্তির সতর্কবাণীও উচ্চারিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ পারস্যের যে কিস্সার নিকট পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন, পারস্য-সম্রাটগণের মধ্যে সে-ই ছিল অত্যন্ত প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী সম্রাট। ইরান, ইরাক, বাহরায়ন ও ইয়ামান পর্যন্ত তাহার রাজত্ব প্রসারিত ছিল।
রাসূলুল্লাহ -এর দূত যখন ইসলামের দাওয়াতসম্বলিত পত্র লইয়া তাহার দরবারে উপস্থিত হইলেন তখন তিনি তাহা পাঠ করিয়া শুনানোর এবং সাথে সাথে তাহার অনুবাদ করার আদেশ দেন। পত্রখানা পড়িয়া শুনান শুরু হইল, কিন্তু তাহা পাঠ শেষ না হইতেই সে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়া তাহা ছিঁড়িয়া ফেলিল এবং সম্রাটসুলভ জোশে গর্জিয়া উঠিল, ঐ ব্যক্তিটি আমাকে এহেন পত্র লিখিয়াছে অথচ সেও আমার গোলাম বৈ নহে!
কিস্সা পত্রের ধরনই নিজের মর্যাদার পরিপন্থী বলিয়া ধারণা করে। সে লক্ষ্য করিল যে, তাহাতে লিখিত রহিয়াছে: মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে কিসরার প্রতি। মুহাম্মাদ তাঁহার নিজস্ব নাম দিয়া পত্র শুরু করিয়াছেন, তাহার ভ্রান্ত ধারণামতে ইহা ছিল তাহার একটি অবমাননা। দ্বিতীয়ত, প্রেরক ও প্রাপক উভয়ের নাম একই ছত্রে একই মর্যাদায় রাখা হইয়াছে। কিসরার ধারণামতে, মনিব ও গোলামের এই সমতা ছিল রীতিমত অবমাননাকর।
রাসূলুল্লাহ -এর কিসরাকে লিখিত পত্রের দূত ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা)। ইতোপূর্বে তিনি বহুবার ইরান সফর করিয়াছেন। তাঁহার এই পূর্ব-অভিজ্ঞতার জন্য রাসূলুল্লাহ তাঁহাকেই ইরানের দৌত্যকর্মের জন্য মনোনীত করিয়াছিলেন। পত্রখানা পাঠ সমাপ্ত না হইতেই কিসরা পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। ইরানে হুযাফা সেই দৃশ্য অবলোকন করিয়া নবী (স) দরবারে ফিরিয়া আসেন এবং তাঁহাকে কিসরার অবমাননাকর আচরণ সম্পর্কে অবহিত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ বলিলেন: আল্লাহ তাহার রাজত্ব ধ্বংস করুন! সত্য সত্যই তাহাই হইয়াছিল। এই ঘটনার পর একটি মাস অতিক্রান্ত না হইতেই খসরু পারভেযের পুত্র শাহরিয়া তাহাকে হত্যা করে। ইহাতে ঐ সাম্রাজ্যের পতনের সূত্রপাত হয়।
রাসূলুল্লাহ -এর পত্রের ব্যাপারে কিসরার আচরণকে বলা হইয়াছে মাস্ক (مزق), কেহ কেহ ইহাকে শাক্ক (شق)-ও বলিয়াছেন। কিন্তু আরবী ঐ শব্দ দুইটি اناء (নিশ্চিহ্ন ও অস্তিত্বহীন করিয়া দেওয়ার) অর্থ বহন করে না। রাসূলুল্লাহ -এর পত্রখানা লিখিত ছিল চর্মগাত্রে। চর্ম একটি বেশ শক্ত বস্তু, তাই তাহা ছিড়িয়া ফেলিয়া দিলেও একেবারে নিশ্চিহ্ন হইয়া যাওয়ার মত নহে। হাঁ, যদি তাহার উপর পানি ঢালিয়া দেওয়া হইত, তাহা হইলে হয়ত হরফগুলি মিটাইয়া ফেলা সম্ভব হইত। তাহা ছিল চর্মের উপর এবং তাহাও উত্তম চর্মের উপর। তাই যতদূর মনে হয়, কিস্সা যখন তাহা ছিঁড়িয়া তাচ্ছিল্যভরে ফেলিয়া দেয়, তখন তাহা উঠাইয়া আনিয়া ইবন হুযাফা (রা) রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে পুনরায় পেশ করিয়াছিলেন। পত্রবাহক যদি তাহা তথায় রাখিয়াই আসিতেন এবং কিস্সা বা তাহার লোকজন তাহা রাখিয়া দিত তাহা হইলে প্রাচীন ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে তাহা উল্লিখিত থাকিত। যেমনটি নাজাশী, মুকাওকিস ও হিরাক্লিয়াসের নিকটে লিখিত পত্রসমূহের ব্যাপারে উল্লিখিত হইয়াছে যে, তাঁহারা সেই পত্রগুলি নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করেন।
রাসূলুল্লাহ-এর লিখিত পত্রগুলি সম্পর্কে ইতিহাস গ্রন্থ ও অলংকারশাস্ত্র গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে। এইসব গ্রন্থে এই পত্রখানিরও উল্লেখ রহিয়াছে। উহাতে সামান্য কিছু শব্দের ব্যবহারের ঈষৎ পার্থক্য ছাড়া সব পত্রই প্রায় এক রকম। তাবারীর ইতিহাসগ্রন্থ হইতে উল্লিখিত পত্রের কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হইল। ইতিহাস পাঠে কয়েকটি ব্যাপার সম্মুখে আসে :
(১) রাসূলুল্লাহ তাঁহার একজন দূত কিসরার দরবারে প্রেরণ করিয়াছিলেন।
(২) ঐ দূত ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমী (রা)।
(৩) আবদুল্লাহ ইব্‌ন হুযাফা (রা) যখন রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানা কিসরার কাছে হস্তান্তর করিলেন, তখন তাহা তাহার নিকট অসহনীয় লাগিল এবং সে এমন ক্রুদ্ধ হয় যে, দোভাষীকে উহার পাঠ সম্পন্ন করিতেও দেয় নাই।
(৪) রাসূলুল্লাহ-এর পত্রখানার পাঠ অত্যন্ত মশহুর ছিল। মৌলিক গ্রন্থসমূহে তাহা সুসংরক্ষিত রহিয়াছে। অলংকার শাস্ত্রের অনেক লেখকও বিভিন্ন বিষয়ে প্রকৃষ্ট নমুনাস্বরূপ তাহা পেশ করিয়াছেন।
হেনরী ফেরাউন প্রেরিত পত্রখানার বৈশিষ্ট্যসমূহের ব্যাপারে গভীরভাবে মনোনিবেশ করিলে আমরা সুস্পষ্টরূপে বুঝিতে পারি যে, তাহা রাসূলুল্লাহ-এর পত্রই। ইহার বৈশিষ্ট্যসমূহ হইতেছে :
(১) এই উত্তম রাক্ক বা চর্মগাত্রে লিখিত। ইহা অনেকটা খাকী রঙের এবং ইহার প্রান্তভাগ কিছুটা কৃষ্ণাভ।
(২) ইহার আকৃতি অনেকটা আয়তাকার অর্থাৎ ইহা ছিল অনেকটা দীর্ঘাকৃতির। ইহার প্রান্তভাগ অসম। নীচের অংশ উপরের অংশের চেয়ে কম চওড়া। ইহার দৈর্ঘ্য ২৮ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ২১/২.১ সেন্টিমিটার।
(৩) ইহাতে পনেরটি ছত্র রহিয়াছে। সবগুলি ছত্রের দৈর্ঘ্য সমান নহে।
(৪) ছত্রগুলি যেইখানে শেষ হইয়াছে তাহারই নীচে একটি গোলাকৃতি সীলমোহরের চিহ্ন রহিয়াছে।
(৫) পত্রখানাদৃষ্টে ধারণা করা হয় যে, উপর দিক হইতে নিচের দিকে পানি বহাইয়া দেওয়া হইয়াছে-যাহার দরুন কোন কোন হরফ মুছিয়া গিয়াছে, আবার কোন কোনটি আবছা হইয়া গিয়াছে। ইহার সীলমোহরও একেবারে মুছিয়া গিয়াছে,, তবে ইহার মধ্যবর্তী স্থানে একটি 'রা' (ر) অবশিষ্ট রহিয়া গিয়াছে। সম্ভবত ইহাই রাসূল' শব্দের 'রা' বর্ণ হইবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সীলমোহরের মধ্যে সর্ব নীচের ছত্রে মুহাম্মাদ, মধ্যবর্তী লাইনে রাসূল এবং সর্বউপরের ছত্রে আল্লাহ শব্দটি অঙ্কিত ছিল।
(৬) এই পত্রের ডানদিকের তৃতীয় ছত্রের শুরু হইতে ছত্রের মধ্য পর্যন্ত ছেঁড়া। অতঃপর প্রন্থের দিকে আর ছেড়াঁ নাই, কিন্তু দৈর্ঘ্যের দিকে দশম ছত্র পর্যন্ত তাহা ছেঁড়ার দাগ রহিয়াছে।
(৭) পত্রের এই ছেঁড়াকে অত্যন্ত পাতলা চামড়া দ্বারা সেলাই করিয়া মেরামত করা হইয়াছে। কিন্তু ঐ নূতন সংযোজিত চর্ম রাক্ক-এর মত মূল্যবান ও টেকসই নহে, বরং মামুলী চামড়া। মূল পত্রে ব্যবহৃত চর্মের তুলনায় পরবর্তীতে সংযোজিত এই চর্মের বয়স যে কম তাহাও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
(৮) পত্রের লিখন পদ্ধতি হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তাহা একান্তই প্রাথমিক ও অনুন্নত লিখন পদ্ধতির যুগে লিখিত। এইজন্য তাহাতে কোন শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য বা বিন্যাস পরিলক্ষিত হয় না। ছত্রগুলি সোজা নহে। উপরন্তু উহার লিখন পদ্ধতি সেই যুগটিকেও চিহ্নিত করার জন্য সহায়ক।
ইহার কোন কোন ছত্রের শেষে লক্ষ্য করা যায়, একটি শব্দ হয়ত ঐ ছত্রে শুরু হইয়াছে, শব্দটির অপূর্ণ অংশ পরবর্তী ছত্রে লিখিয়া সম্পূর্ণ করা হইয়াছে। ঐ যুগের লিপিমালায় কোন নুকতা ব্যবহৃত হইত না। উক্ত পত্রখানাতেও কোন নুক্তা ও স্বরচিহ্ন ব্যবহৃত হয় নাই। ইহার পাঠ (Text) এবং ছত্রসমূহ ছিল :
(১) বিসমিল্লাহির রাহমানি (২) আর-রাহীম মিন মুহাম্মাদিন আবদিল্লাহি ওয়া (৩) রাসূলিহী ইলা কিসরা আযীমি ফা (৪) রিসি সালামুন আলা মানিত্ততাবা'আল হুদ (৫) (1) ওয়া আমানা বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি ওয়া (৬) শাহিদা আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া (৭) হ্দাহু লা-শারীকা লাহু ওয়া মুহাম্মাদ (আলিফ বা '। ন' অংশটি নাই) (৮) আবদুহু ও রাসূলুহু আদ্‌ 'উকা (৯) বি-দি 'আয়াতিল্লাহি ফা-ইন্নানী আনা রাসূ (১০) লু ল্লাহি' আলান না-সি কাফফাতান (১১) লি-উনযিরা মান কানা হাইআন ওয়া ইয়ূহিক্কা (১২) আল-কাওলু ইলাল কাফিরীন আ (১৩) স্লিম্ তাস্লিম ফাইন আবায়তা ফাই (১৪) ন্নামা 'আলায়কা ইছমুল মাজু (১৫) সি,
এইখানে সীলমোহর অঙ্কিত- যাহার মধ্যের ছত্রের 'রা' (১) বর্ণটি শুধু রহিয়াছে।
হেনরি ফেরাউনের নিকট রক্ষিত উক্ত প্রাচীন দলীলকে যখন আমরা সেইসব প্রাচীন ইসলামী কিতাবসমূহে উল্লিখিত পত্রের সহিত মিলাইয়া দেখি, তখন আমরা তাহাতে মিল দেখিতে পাই। মামুলী কিছু তফাৎ অবশ্য তাহাতে দৃষ্ট হয় যাহা ধর্তব্য নয়।
(১) উক্ত দলীলে 'মিন মুহাম্মাদিন আবদিল্লাহি ওয়া রাসূলিহী' রহিয়াছে আর কিতাবসমূহের বর্ণনায় শুধু রাসূলিল্লাহ রহিয়াছে (আবদিল্লাহ নাই)। কিন্তু রাসূলুল্লাহ -এর হিরাক্লিয়াস ও মুকাওকিসকে লিখিত পত্রদ্বয়ে এইরূপই রহিয়াছে যাহাতে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত দলীলখানার শব্দগুলিই যথার্থ।
(২) উক্ত দলীলে 'বি-দিয়াতিল্লাহ' আর কিতাবসমূহে 'বি-দু'আইল্লাহি রহিয়াছে। কিন্তু উক্ত দলীলের শব্দই বিশুদ্ধতর মনে হয়; কেননা আবূ নুআয়ম ইসফাহানীতে এরূপই হুবহু রহিয়াছে।
(৩) উক্ত দলীলে এবং কিতাবসমূহের বর্ণনায় 'ফাইন আবায়তা' শব্দ রহিয়াছে। কেবল ইবন কাছীরের বর্ণনায় শব্দটি ফাইন তাওয়াল্লায়তা' রহিয়াছে। যেহেতু উভয় শব্দই সমার্থবোধক তাই এই ব্যাপারে আর বেশী কিছু বলার প্রয়োজন হয়ত নাই।
(৪) উক্ত দলীলে 'ফাইন্নামা আলায়কা ইছমুল মাজুস' রহিয়াছে, আর কিতাবসমূহে রহিয়াছে 'ফাইন্না ইছমাল মাজুসে 'আলায়কা'। দলীলের মতনে ইন্না শব্দের সাথে 'মা' যুক্ত রহিয়াছে এবং তাহার পূর্বে আলায়কা রহিয়াছে। ইহা কুরআন শরীফের শব্দ প্রয়োগ পদ্ধতির সহিত অধিকতর সামঞ্জস্যশীল। যেমন কুরআন শরীফে রহিয়াছে, ফাইন তাওয়াল্লাও ফাইন্নামা আলায়কাল বালাগুল মুবীন (১৬:৮২)।
এই সামান্য শাব্দিক পার্থক্যে অর্থগত কোন তফাৎ হয় না। শব্দের গরমিল হওয়ার কারণ হয়ত এই যে, সেইসব কিতাবের লেখক-সংকলকগণ যাহাদের কিতাব হইতে এই পাঠ গ্রহণ করিয়াছেন মানুষ হিসাবে তাঁহাদের কিছু স্মৃতি বিভ্রম হইতে পারে।
উক্ত পত্রখানার লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যায়। উল্লেখ থাকে যে, আরবী লিপি শনাক্ত করিবার বিদ্যাটি একটি আধুনিক বিজ্ঞান। ডঃ আল-মুনাজ্জিদের এই পত্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলি নিম্নরূপ:
(১) ইহা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হইয়াছে যে, প্রাক-ইসলামী যুগের এবং ইসলামের আবির্ভাব-উত্তর যুগের আরবী হিজাযী বর্ণমালা হইতেছে নাবাতী বর্ণমালার সর্বশেষ রূপ (বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত-সম্পাদনা পরিষদ)।
(২) ইসলামের আবির্ভাবকালে হিজাযের বর্ণমালা কুফী বর্ণমালা ছিল না। কেননা কুফী বর্ণমালা কূফার সহিত সম্পৃক্ত আর কূফার উদ্ভব হইয়াছে ১৬ হি. সনে। তাহার পরই কুফী বর্ণমালার উদ্ভব হইয়াছে।
(৩) আরবরা জাহিলী যুগে এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইহাকে মক্কী লিপিমালা বলিয়া অভিহিত করিত। কিন্তু হিজরতের পর যখন ইসলামী রাষ্ট্র মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হইল, তখন মাদানী লিপিমালার প্রভাব বৃদ্ধি পায়। বিষয়টি অনিশ্চিত, মক্কী বর্ণমালা নামে কোন বর্ণ ছিল বলিয়া তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
(৪) মাদানী লিপিমালার আয়ুষ্কাল খুব দীর্ঘ নহে। হযরত উছমান (রা)-এর খিলাফাত আমলের শেষ পর্যন্ত ইহার অস্তিত্ব টিকিয়া রহিয়াছিল। তারপর হযরত আলী (রা)-এর খিলাফাত আমলে যখন কৃষ্ণা রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হইল এবং উমায়্যা শাসকগণও ইহার উন্নতির বিধান করিলেন, তখন কুফী বর্ণমালা আসিয়া ইহার স্থান দখল করিয়া নেয় এবং সর্বত্র তাহা প্রচলিত হইয়া যায় (মাদানী বর্ণমালা নামে কিছু তথ্য পাওয়া যায় না-স. প.)।
(৫) উক্ত পত্র রাসূলুল্লাহ -এর যুগের দলীলরূপে স্বীকার করিলে ইহার পরিচয়ের প্রমাণের জন্য ঐ দলীলকে সেই লিপিসমূহের সহিত তুলনা করিয়া দেখিতে হইবে, যেইগুলি প্রাক-ইসলামী যুগে, ইসলামের প্রথম যুগে এবং নবী কারীম -এর যুগে লিখিত হইয়া আমাদের যুগ পর্যন্ত টিকিয়া রহিয়াছে।
(৬) আমরা যখন অন্যান্য প্রাপ্ত লিপিমালার সহিত উক্ত দলীলের লিপিকে মিলাইয়া দেখি, কখনও মনে হয় তাহা যেন হুবহু ঐ লিপি, আবার কখনও তাহাতে সামান্য ফারাক দেখা যায় যাহা যুগের বিবর্তনের ফলে হইয়া থাকিবে।
(৭) আমরা মদীনার নিকটবর্তী সালাআ পর্বত গাত্রে ইসলামের প্রথম যুগের লিপি উৎকীর্ণ দেখিতে পাই। তাহাতে আবূ বাক্স (রা), উমার (রা) ও আলী (রা)-এর নামসমূহ উৎকীর্ণ
রহিয়াছে। ইহার লিখনকাল হইতেছে ৪/৬২৬ সাল। সালাআ পর্বতের উক্ত ফলকের সহিত আমাদের আলোচিত দলীলের লিপিমালার হুবহু মিল রহিয়াছে।
(৮) ২২ হিজরীতে লিখিত একটি লিপিও আমাদের হস্তগত হইয়াছে। উহা হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর অধীনস্ত কোন সিপাহসালারের পত্র যাহা আরবী ও হিব্রু উভয় ভাষায়ই লিখিত। আমরা লিপির সহিত উক্ত দলীলকে মিলাইয়া দেখিলে তাহাতে বর্ণগুলির অবয়বের মিল দেখিতে পাই। অবশ্য ২২ হিজরীতে লিখিত লিপিটি কিছুটা উন্নত। সময়ের বিবর্তনের সহিত তাল মিলাইয়া অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এই অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে।
(৯) আমাদের নিকট একটি সমাধিতে উৎকীর্ণ লিপিও রহিয়াছে যাহা ৩১ হিজরীতে মিসরে আবদুর রাহমান ইবন্ন খায়রের শিলালিপিরূপে উৎকীর্ণ করা হইয়াছিল। দস্তাবেযের সহিত উহা মিলাইয়া কোন কোন হরফের মধ্যে বিস্ময়কর মিল খুঁজিয়া পাই।
আমরা এমনও করিয়াছি যে, একটি ছক আঁকিয়া তাহাতে এই যাবৎ প্রাপ্ত লিপিসমূহের হরফগুলিকে সাজাই। অতঃপর ইহার পাশাপাশি আরেকটি ছকে উক্ত রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্রের হরফগুলিকে সাজাইলাম। এইরূপ নিরীক্ষার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, দস্তাবেযের বর্ণমালা একান্তই প্রাথমিক পর্যায়ের। ইহাতে কোন পরিপাট্য নাই এবং তাহা হইতেছে খৃস্টীয় সপ্তম শতকে হিজাযে যেই লিপিমালা প্রচলিত ছিল তাহাই, আর ইহাই রাসূলুল্লাহ -এর যামানা ছিল।
(১১) হিজরতকাল হইতে 'উছমান (রা)-এর খিলাফত আমলের শেষ পর্যন্ত সময়ের পরই কৃষ্ণী লিপির প্রচলন সূচিত হয়। ইহার প্রমাণ হইতেছে তাইফের সেই লিপি যাহা হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর আদেশে লিখিত হইয়াছিল। আর উহা হইতেছে ৫৭ হিজরী সালের ঘটনা। উপরিউক্ত দলীল-প্রমাণের দ্বারা ইহাই নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, আমাদের আলোচ্য দস্তাবেযের লিখন কার্য হিজরী ৭ম হইতে ৩৫ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে সম্পন্ন হইয়া থাকিবে।
(১২) যেহেতু ৭ম হইতে ৩৫ হিজরী সালের মধ্যে রাসূলুল্লাহ -এর কোন জীবনী লিখিত হয় নাই যে, কেহ রাসূলুল্লাহ -এর উক্ত পত্রের একটা কপি জীবনী রচনার উদেশ্যে নকল করিয়া রাখিয়াছেন বলিয়া সন্দেহ করা হইবে। তাই আমরা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি যে, ইহাই রাসূলুল্লাহ -এর সেই পত্র যাহা তিনি কিসরার প্রতি প্রেরণ করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ -এর উক্ত পত্রখানার আলোকচিত্র সম্মুখে রহিয়াছে। রাক্ক চর্মপত্রের ছেঁড়া ও সেলাই দ্বারা উহার মেরামতও লক্ষণীয়। কিস্সা পত্রখানার প্রথম বাক্যটি শুনিয়াই প্রথমে রাসূলুল্লাহ -এর নাম, তাহারপর কিস্সার নাম সহ্য করিতে পারে নাই। সে ইহাকে তাহার জন্য অবমাননাকর মনে করিয়া পত্রখানা ছিঁড়িয়া ফেলে। যতদূর মনে হয়, তাহার দরবারের কোন লোক উহা উঠাইয়া নিয়া সংরক্ষণ করে অথবা স্বয়ং দূত আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা (রা) চুপিসারে তাহা উঠাইয়া নিজের কাছে রাখেন যাহাতে তাহা কাহারও পদতলে না পড়ে। এমনও হইতে পারে, আবদুল্লাহ মুখে এই অপ্রীতিকর সংবাদটি দেওয়া অপেক্ষা উক্ত জীর্ণদশাগ্রস্ত পত্রখানাই কিসরার জবাবরূপে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট পেশ করিয়া থাকিবেন। রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি সাহাবীগণের যেইরূপ ভক্তি ও ভালবাসা ছিল তাহাতে এইরূপ করাটা আদৌ বিচিত্র নহে (দ্র. মাকতুবাতে নাবাবী, পৃ.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00